এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ২৪ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১২১ বার পঠিত
  • নিতাইবাবুর বাড়িতে রাত দশটার সময় রাশি রাশি তালের বড়া ভাজা হচ্ছে। বাজারে আজ বেশ সস্তায় তাল পাওয়া গেল। গন্ধে ম ম করছে বাড়ি।
    নিতাইবাবু অঞ্জলির সঙ্গে দীর্ঘ পরামর্শের পর ঠিক করে ফেলেছেন যে তিনি বি টি রোড থেকে খানিকটা ভিতরের দিকে ওই সিঁথির জমিটাই কিনবেন।
    দমদমে হনুমান মন্দিরের কাছে অনেক জমি আছে। দামও কম। কিন্তু ওখান থেকে যাতায়াতের খুব অসুবিধা।
    নিতাইবাবু ক'টা গরম তালের বড়া সাবড়ানোর জন্য হা পিত্যেশ করে বসে আছেন। ছেলেমেয়েরা কড়া থেকে নামা মাত্র টপাটপ তুলে নিল গোটা কয়েক। অঞ্জলি বড়া ভাজতে ভাজতে নিতাইবাবুকে বলল, ' তোমার আর এখন খেয়ে কাজ নেই ... এক্ষুণি তো খেতে বসবে ... সকালে খেও বরং ... '
    ----- ' না না ... খাব না এখন ... দু একটা টেস্ট করব শুধু ... ' নিতাইবাবু তীর্থ কাকের মতো বসে আছেন।
    ----- ' দেখ ... শরীর বুঝে খেও। তোমার তো আবার অম্বলের ধাত ... '
    ----- ' আরে না না ... ও কিছু হবে না ... তুমি তাড়াতাড়ি দাও তো .... '

    রাত্রে একটু দেরি করেই খেতে বসল ওরা। খেতে বসে নিতাইবাবু ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন, ' আমাদের নতুন বাড়ি হবে বুঝলি তো ... ওই সিঁথির ওদিকে। এই বছরের শেষে, নতুন বছরের গোড়ায় আমাদের চলে যেতে হবে বুঝলি তো ... '
    অনিমেষ আর শ্রীলেখা কোন কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে যেতে লাগল। ওরা বোধহয় বুঝতে পারছে এ বাড়ি ছেড়ে দেওয়াটা অনিবার্য। আপত্তি তুলে কোন লাভ হবে না।
    নিতাইবাবু বললেন, 'বাড়িওয়ালারও অসুবিধা হচ্ছে ... আর তোদের ভবিষ্যতের কথাও তো ভাবতে হবে। আমি রিটায়ার করার আগে মাথা গোঁজার একটা ব্যবস্থা করে যেতে পারলে নিশ্চিন্ত হই। এর পর জমির দাম বেড়ে গেলে আমাদের সাধ্যের বাইরে চলে যাবে ... মন খারাপ একটু হবে ঠিকই... কিন্তু এ ছাড়া তো উপায় নেই... বুঝলি ... '
    অঞ্জলি বলল, ' হুঁ হুঁ ... '। ছেলেমেয়ে চুপচাপ খেয়ে যেতে লাগল।

    নৈঋত পত্রিকার ব্যাপারে সহপাঠিনীদের থেকে উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পেয়ে কাবেরীর আগ্রহ পল্লবিত হয়ে উঠল। শ্যামবাজারের কফিহাউসে, মাঝে মাঝে কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউসে অমিতাভ, স্নেহাংশুদের আড্ডায় সে নিয়মিত হাজির হতে লাগল কলেজ ছুটির পর। তার বাড়ির অত বাঁধন নেই। যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে। ছুটির পর সুমনা অগত্যা তার দিদিদের সঙ্গে রুটিনমাফিক বাড়ি ফিরে আসে। পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। জোরদার প্রস্তুতি দরকার, সুমনা বুঝতে পারছে। কিন্তু মন কেমন এলোমেলো হয়ে যায় মাঝে মাঝে মেঘলা দিনের মতো।
    কাবেরী আজকাল লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে মেতে উঠেছে ভীষণভাবে। পড়াশোনা কি করছে না করছে জানে না সুমনা। সুমনার মনে একটা অনুমান মাথা চাড়া দিচ্ছে কদিন ধরে। সেটা হল, কাবেরীর জীবনে শুধু নৈঋত পত্রিকাই আসেনি, আরও কেউ নিশ্চিত ঢুকে পড়েছে তার একান্ত বৃত্তে। তবে, একটা আপাত নিশ্চিন্তি তার মনে দোল খাচ্ছে। কাবেরী এখন আর হেদুয়ায় ঢোকার নামও করে না।

    আজ ফার্স্ট পিরিয়ডের পর ক্লাসের বাইরে এসে কাবেরী আর সুমনা বাগানে একটা জায়গায় বসল।
    কাবেরী বলল, ' অনেকদিন তোর সঙ্গে কথা হয়নি ... এই শোন না ... তোকে একটা কথা বলছি ... কাউকে বলিস না এখন ... মানে, কি বলব ... '
    সুমনা কৌতূহল মাখা চোখে তাকিয়ে রইল কাবেরীর মুখের দিকে।
    ----- ' কাল আমি আর অমিতাভ সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম উত্তরায় ... হারানো সুর। পারলে দেখে নিস ...' কাবেরী সামান্য লাজুক ভঙ্গীতে বলল, যে ভঙ্গীটা তার স্বভাবের পক্ষে বেমানান।
    সুমনার জন্য এটা একটা অসম্ভব দুঃসাহসিক কাজ। শুনে চোখ কপালে উঠল তার।
    বলল, ' অ্যাঁ ... বলিস কি ! তারপর কি হল ? '
    ----- ' কি আবার হবে। হল থেকে বেরিয়ে দুজন দুদিকে চলে গেলাম। কেউ এখনই দেখা ফেলাটা তো ঠিক না ... '
    'কেউ এখনই দেখে ফেলাটা তো ঠিক না ' ব্যাপারটা বেশ অর্থবহ মনে হল সুমনার কাছে। যাই হোক, সে শুধু বলল, ' বাবারে ... তোর কি সাহস ! আমার তো শুনেই ভয় লাগছে ... কিছু চিন্তাভাবনা করেছিস নাকি ? '
    ------ ' নাঃ, তেমন কিছু ভাবিনি ...দেখি কি হয়... বলব তোকে .... '
    ----- ' দেখিস ... খুব সাবধানে কিন্তু ...'
    ----- ' তুই আর কচি খুকিদের মতো ন্যাকামি করিস না তো ... সাবধান হবার কি আছে ... আমি কি বাঘের খাঁচায় ঢুকতে যাচ্ছি নাকি ! '
    সুমনা আর কথা বাড়াল না এ ব্যাপারে। কিন্তু তার মেঘলা মনে অকারণেই একটা নিশ্চিন্তির আলো লুটোপুটি খেতে লাগল। কেন কে জানে।

    প্রতিবিম্ব অনেকদিন পর দুপুর আড়াইটে নাগাদ হেদুয়ায় ঢুকে তার প্রিয় ওই বেঞ্চটায় বসল। কয়েকটা খালি গায়ের বাচ্চা ছেলে রেলিং টপকে জলের ধারে গিয়ে একের পর এক জলে ঝাঁপ মারছে। তারপর সাঁতারপটু ছেলেগুলো জলের পোকার মতো হেদোর জলের দাপাদাপি শুরু করল। প্রতিবিম্ব কোলের ওপর দুহাত রেখে একমনে বাচ্চাগুলোর জলক্রীড়া দেখতে লাগল। ভাবল, ইশশ্ কি নিশ্চিন্ত এদের জীবন। এমন যদি তারও হত ! পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করে বেরোন, তারপর একটা সম্মানজনক চাকরি জোগাড় করা তার জন্য ভীষণ জরুরী। মামা তো তার মুখ চেয়ে বসে আছে। মা বাবা চলে যাবার পর মামা মামী কম তো করেনি তার জন্য। নিজের সন্তানদের থেকেও তার বেশি যত্ন নিয়েছে তারা। যখন একা থাকে মায়ের মুখটা মনে পড়লে এখনও চোখে জল চলে আসে প্রতিবিম্বর। এই শরতের নীরব দুপুরে হেদুয়ার জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এখন যেমন হল তার। অতীতের নানা বেদনার স্মৃতিভারে তার দুচোখ ঝাপসা হয়ে এল।

    সে রুমালে চোখ চাপা দিয়ে মাথা নীচু করে বসে রইল খানিকক্ষণ। পুকুরের জলে ছেলেগুলো মনের আনন্দে দাপাদাপি করে যাচ্ছে।
    একটু পরে প্রতিবিম্ব রুমালটা পকেটে রেখে চোখ তুলে সামনে তাকাল। তার চোখ এখনও ঝাপসা। ঝাপসা চোখে সে দেখল যে ফুট চারেক দূরে একজন দাঁড়িয়ে আছে।
    নিবিড় আর্তি মাখানো নরম নারীকন্ঠে কে যেন বলল, ' কি ... হয়েছে ? '
    চোখ একটু পরিষ্কার হলে প্রতিবিম্ব দেখল অ্যাডভোকেট অলোকেন্দু মিত্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফুচা নামের সেই মেয়েটা কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে ভোরের নরম আলো ফেলে।

    ( চলবে )
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন