এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ৩৯ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮৪ বার পঠিত
  • সুমনার মনটা ভাল নেই। মুখেও তার একটা ছায়া পড়েছে। সে আগে থেকেই শিরিষ গাছের নীচে এসে বসে আছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই প্রতিবিম্ব হন্তদন্ত হয়ে এসে হাজির হল।
    -----' সরি ম্যাডাম... দেরি হয়ে গেল ... ল্যাব ছিল...'
    ----- ' হমম্ ... '
    ------ ' মুখটা কেমন মেঘলা মনে হচ্ছে। কি কেস ? '
    সুমনা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
    ----- ' বড়দির এ বিয়েটাও ভেঙে গেল ... জান ? '
    ----- ' সেকি ! কেন ? '
    ----- ' ওরা লোক ঠিক না ... '
    ----- ' লোক ঠিক না মানে ? '
    ------ ' ছেলের চাকরিটা ঠিক না ... মানে, ওই কলেজে পার্টটাইম টিচার ... জেনেশুনে কেউ এখানে মেয়ের বিয়ে দেবে ? মায়ের মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। বাবার রিয়্যাকশানটা ঠিক বলতে পারব না ... '
    ------ ' না, পরে হয়ত ফুলটাইম হবে ... সেটা তো জানার দরকার ... ' প্রতিবিম্ব জানায়।
    ----- ' সেসব জানিনা ... নিশ্চয়ই সেরকম কোন সম্ভাবনা নেই। বাবার পাঠানো লোক খবর নিয়ে এসেছে। যাই হোক, সম্বন্ধটা ভেঙে গেছে। দু দুবার এরকম বাধা পড়ল ... খারাপ লাগে না ? '
    ----- ' খারাপ লাগার কি আছে ... বাধা পড়ারই বা কি আছে ? তোমার দিদি একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, সে কি এমনি পড়ে থাকবে নাকি ? ব্রাইট কেরিয়ার আছে না ... ওসব সংষ্কার নিয়ে মাথা ঘামিও না ... ' প্রতিবিম্ব বেশ বিচক্ষণ ব্যক্তির মতো মত দেয়।
    ------ ' হমম্ ... কিন্তু ... '
    ----- ' আর কিন্তু টিন্তু কিছু না....একটা কথা বলব ?'
    প্রতিবিম্ব বেশ কুন্ঠার সঙ্গে বলল।
    সুমনা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল প্রতিবিম্বর দিকে।
    ----- ' কি ? '
    ------ ' আমাদের একটা সিনেমা দেখতে গেলে হয় না ? সবাই তো যায় ... '
    প্রতিবিম্বর মুখটা এক শিশুর মতো দেখাচ্ছিল।
    সুমনা ওর আনাড়িপনা দেখে হেসে ফেলল।
    ----- ' কি হল হাসছ যে ... ', তারপর বিব্রত মুখে বলল, ' না ... এমনি বললাম আর কি ... কলেজের সোশ্যালে তো গেলে না তাই ... '
    কিন্তু সুমনা প্রতিবিম্বকে অবাক করে দিয়ে বলল, ' কি বলব ... আমি ঠিক এই কথাটাই বলব ভাবছিলাম ক'দিন ধরে ... '
    ----- ' কোন কথাটা ? '
    ----- ' এই সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথাটা .... কিন্তু ঠিক সাহসে কুলোয়নি ... '
    ----- ' কেন ? '
    ----- ' ভয়ে বুক দুরদুর করে ... কোথা দিয়ে কে দেখে ফেলবে। বাপি ছাড়া আর তো কেউ ব্যাপারটা জানে না ... রঙীন গল্প ফেঁদে বদনাম রটাবার লোকের তো অভাব নেই... '
    ----- হুঁ ... সেটাই তো চিন্তা ... ' প্রতিবিম্ব একমত হয়।
    ------ ' বরং আর কিছুদিন যাক ... তারপরে নয় ... '
    ------ ' ঠিক আছে, তাই হোক ...', বলে বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল --- ধৈর্য মানো, ওগো ধৈর্য মানো... বরমাল্য তব আজও হয়নি ম্লান, আজও হয়নি ম্লান ... '
    ------ ' সে আবার কি ? '
    ----- ' কিছু না ... গাইতে ইচ্ছে করল, তাই
    গাইলাম ... '

    পশুপতিবাবুর আশি বছর বয়স হল। এখনও যথেষ্ট কর্মক্ষম আছেন। ঘোর বর্ষাবাদলের দিন ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই বাজারে যান। মাণিকলাল চ্যাটার্জির পাশের বাড়িতে থাকেন পশুপতিবাবু, মানে পশুপতি গুহ। হাফ ডজনের ওপর ছেলে মেয়ে তার দুই পক্ষ মিলিয়ে। তাছাড়া নাতিপুতি তো আছেই। প্রথম পক্ষ গত হয়েছেন প্রায় চল্লিশ বছর আগে। এখন প্রায় কুড়ি বছরের ছোট দ্বিতীয় পক্ষকে নিয়ে সংসার করেন। দুই নাতনির বিয়েও হয়ে গেছে।
    আজকেও বাজারে গেছেন। দেখেশুনে কচি পেঁয়াজকলি কিনছিলেন। বেগুন আর মুলোও কিনেছেন। ঠিক করেছেন ছোট ছোট ট্যাংরা মাছ কিনবেন। পেঁয়াজকলি দিয়ে রান্না হবে।
    তার তিন ছেলে ভাল রোজগার করে। বাড়িতে গুষ্টির লোক হলেও কোন অনটন নেই। পশুপতির জীবনে তেমন সমস্যা বলতে কিছু নেই।
    সমস্যা শুধু একটি ...
    নিতাইবাবুর সঙ্গে বাজারে দেখা হয়ে গেল।
    ------ ' আরে, গুহবাবু যে ... অনেকদিন পরে দেখা ... আজকাল বাজারে তেমন আসা হয় না ... তা আছেন কেমন ? '
    ------- ' এমনি তো ঠিকই আছি। আমার ওই একটাই সমস্যা ... কোষ্ঠকাঠিন্য...হেঁ হেঁ ...'
    ------ ' ও আপনার সেই প্রবলেমটা ... রোজ ঢেঁড়স সেদ্ধ খান ... ফল পাবেনই। থোড় আর মোচা খেতে পারলে আরও ভাল ... '
    ------ ' বলছেন ? আচ্ছা দেখি পাই কিনা ... ঢেঁড়স এখন পাব বলে মনে হয় না। দেখি খুঁজে ... মোচা থোড় পাব হয়ত ... যাক, সেদিন বিভূতিবাবুর সঙ্গে দেখা হল। শুনলাম আপনি নাকি এ পাড়া ছেড়ে উঠে যাচ্ছেন। শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বড় মায়া পড়ে গেছে, সেই কবে থেকে আছি এখানে ... সেই ব্রিটিশ আমলের থেকে। কেউ চলে গেলে বড় কষ্ট পাই ... বিভূতিবাবুকেও বেশ মনমরা দেখলাম ...
    নিতাইবাবু রীতিমতো বিব্রত বোধ করতে লাগলেন।
    বললেন, ' কি করব বলুন ... ভবিষ্যতের কথা ভেবে ... এখানে তো আর সারা জীবন ... ছেলেমেয়ে দুটোরও ভবিষ্যতের একটা ব্যাপার আছে ... '
    ------ ' আহা .... ভবিষ্যতের কথা ভাববেন না
    কেন ? তার একটা ব্যবস্থা করলেন, সে তো ভাল কথা। পরে করতে গেলে খরচ আরও বেড়ে যেত। বাড়িটা করা থাক না ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু এক্ষুণি তো বিভূতিবাবুর বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কোন দরকার নেই। আপনারই কি ভাল লাগবে ? '
    কথাটা বিদ্যুচ্চমকের মতো ঝলসে উঠল নিতাইবাবুর মনে।
    তিনি নীচুস্বরে বললেন, ' তাই তো ...তাই তো ... দেখি কথা বলে ... '
    ------ ' কার সঙ্গে ? '
    ------ ' ওই ... মানে, পরিবারের সঙ্গে ... '
    পশুপতি গুহ বললেন, ' বটেই তো, বটেই তো ... '

    অসিত ঘোষাল কাশী বোস লেনে তার দোতলার পড়ার ঘরে জানলার ধারে বসে ছিল। জানলার ঠিক বাইরে মালতিলতার ঝাড় উঠেছে একতলা থেকে দড়ি বেয়ে বেয়ে। রূপোলি রোদ্দুর ভাসছে জানলার বাইরে। অসিত আনমনে তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে।
    তার মনে হল, শ্রীলেখার প্রতি সে বোধহয় একটু অবিচার করে ফেলছে। মেয়েটার তো তার ওপর একটা নির্ভরশীলতা এবং অধিকারবোধ জন্মে গেছে। তার মনে হল, সেটাই তো স্বাভাবিক। তার নিজেরও তো শ্রীলেখার জন্য মনে একটা নরম জায়গা আছে। প্রেম টেম অত কিছু সে বোঝে না। কিন্তু এই অল্প বয়সেই তার মনে ন্যায় অন্যায়ের বোধ প্রবলভাবেই জাগ্রত। কোন কোমল প্রাণে ছ্যাঁকা দেওয়ার প্রতিঘাত যে সুখদায়ক হয় না সে সম্বন্ধে তার পরোক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। তাদের পরিবারেই তো এমন লোক আছে। অসিতের বাবা
    শিবতোষ ঘোষাল বলেন, এ জন্মের পাপের মাশুল
    এ জন্মেই শোধ করে দিয়ে যেতে হবে। জন্মান্তর বলে কিছু নেই।
    হঠাৎ মনে হল, ওরা তো এ এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে সিঁথির দিকে। কথাটা মনে হতেই মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। অসিত ভাবল, মন খারাপের কারণ কি শ্রীলেখা ? হেদোর ওদিকে গেলে আর শ্রীলেখার দেখা পাওয়া যাবে না এই ভাবনাটা কি তার মনের আকাশ মেঘে ছেয়ে দিল ?
    কালকেই শ্রীলেখাকে কিছু বলবে বলে ঠিক করল অসিত। মালতিলতার দুধে আলতা কোমল কুসুমদল ঘিরে উড়ছে কত মৌমাছি। অসিত তাকিয়ে রইল সেদিকে।

    ( চলবে )
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন