এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ৯৩

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১০৯ বার পঠিত
  • বিভূতিবাবু খবরটা পেলেন সকাল দশটা নাগাদ । তিনি শশধরবাবুর বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলেন । পঞ্চমীর মা হন্তদন্ত হয়ে এদিকে আসছিল । বোধহয় গজেন বোসের বাড়ি কাজে যাচ্ছে । বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেছে । পা চালিয়ে আসছিল কি চিন্তা করতে করতে ।  রাস্তায় বিভূতিবাবুর মুখোমুখি হয়ে গেল ।
    বলল, ' খবর শুনেছেন তো দাদাবাবু ? '
    ---- ' কি ? '
    ---- ' আওনবাড়িতে ওই  বুড়ো মানুষটা মারা গেছে আজ ভোরবেলায় ... এখনও  নিয়ে যায়নি ... অনেক লোকজন ওখানে ... '
    কথাটা ভিতরে ঢুকতে সময় লাগল বিভূতিবাবুর । 
    তিনি হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন পদ্মার মুখের দিকে । প্রায় পঞ্চাশ বছরের নানা স্মৃতি আচমকা তালগোল পাকিয়ে ভেসে এলো শূন্যে , তারপর এক নিমেষে কোন সুদূর দিগন্তে মিলিয়ে গেল । শশধরবাবুকে আর নাটকের মঞ্চে তোলা হল না বিভূতিবাবুর ।  তিনি ধরা ছোঁয়ার বাইরে কোন মহা মঞ্চের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন কাউকে আগাম কিছু না জানিয়েই ।
    পদ্মা ' আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে । আমি যাই বাবু ...',
    বলে চলে গেল ।
    বিভূতিবাবু ওখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন , আর  কি কি হারানোর আছে পড়ে থাকা সময়টুকুতে ।

         শশধরবাবুর নিস্পন্দ  দেহদর্শনে যাওয়ার জন্য পা সরল না বিভূতিবাবুর । তিনি পিছন ফিরে হাঁটতে লাগলেন গঙ্গার দোকানের দিকে । ভাবলেন ওখানে বসে কিছু কথাবার্তা বলবেন নিজের সঙ্গে নিজে । হারিয়ে যাওয়া কিছু কথা ।

          সাগরের সেলাই কাটা হয়ে গেল নিরাপদেই । কানু , বাদল , শম্ভু, মাণিক ছাড়া উল্লেখযোগ্য হল আরও দুজনের উপস্থিতি । সন্তোষ দাস আর মন্টু সরখেল, মানে যারা সেই রাত্রির পিছু ধাওয়া করেছিল গোয়াবাগান পার্ক পর্যন্ত । তারা বোধহয় সাগরের আনুগত্য স্বীকার করল । যে কোন  কারণেই হোক সাগরকেই তাদের ত্রাতা বলে মনে  হয়েছে হয়ত । কানুদের সঙ্গে বহুদিনের পরিচিত সহকর্মীর মতো কথা বলতে লাগল । রোজগার করার সুলুক সন্ধান  নিয়ে আলোচনা করতে লাগল । রোজগার ছাড়া তো জীবন বাঁচে না ।   জীবনের অস্তিত্বের রক্ত হল অর্থ । রক্ত ছাড়া যেমন শরীর বাঁচে না , অর্থ ছাড়া জীবন বাঁচে না । তবে রক্তাল্পতা যেমন ক্ষতিকর, রক্তাধিক্যও নানা উপসর্গ সৃষ্টি করে । 
    সে যাই হোক, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং হসপিটালে আর একজনের উপস্থিতি তো অবশ্যই ছিল । সে হল রাত্রি । ব্যান্ডেজ খুলে সেলাই কাটা এবং তার পরে ডাক্তারবাবুর ওষুধপত্র বুঝিয়ে দেওয়া সবই রাত্রি সামলালো।
    সাগরের করণীয় কিছু ছিল না । সে শুধু আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে ভাবতে লাগল , যা যা ঘটছে তার জীবনে সবটাই কি স্বপ্ন , নাকি সত্যিই ঘটছে !
    শুশ্রূষাপর্ব মিটে গেলে সাগর আর রাত্রি সার্জিক্যাল বিল্ডিং-এর বাইরে চলে এল । একটা ট্যাক্সি দাঁড় করানো আছে । সন্তোষ আর মন্টু তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল । সন্তোষ বলল , ' আমরা এসেছি .... আপনি এখন ঠিক আছেন তো দাদা ? একটু দেখবেন আমাদের ... '
    সাগর কোন কথা না বলে নরম চোখে সন্তোষের দিকে তাকিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল । সন্তোষ কৃতার্থ ভঙ্গীতে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল  । 
    মাণিক ভাবল, দাদার চোখে মুখে সেই জোশটা কোথায় ? হয়ত এখন লুকিয়ে রেখেছে ... সময়মতো বার করবে । 
    কানুর কাছে সরে এসে ফিসফিস করে সে বলল, ' সব কেমন গড়বড় হয়ে যাচ্ছে ...  মাল দুটোর ওপর নজর রাখিস কিন্তু ... বিশ্বাস কিছু নেই  ... অত ইজি কেস না ... '
    কানু বলল, ' হুমম্ ... কিন্তু দাদা তো ক'দিন ধরে কেমন ভ্যাবলা মেরে আছে ... ঠিক স্টেডি হয়নি এখনও... '
    ----- ' ওটা নিয়ে চিন্তা করিস না । এইসময়ে ওরকম হয় ... ' মাণিকের চোখে কৌতূক খেলা করছে ।
    ----- ' কিরকম হয় ? '
    ----- ' ও আছে ... তুই বুঝবি না ... '
    ----- ' ওরে শালা... তুই বুঝিস বুঝি ? '
    মাণিক এক চোখ টিপে একগাল হেসে বলল, ' ওই একটু একটু ... '

         সাগরের সঙ্গে আরও তিনজন গাড়িতে উঠল । কানু আর রাত্রি উঠল না । রাত্রি বলল, ' ঠিক আছে , আপনারা এগোন ... ' । সাগরের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল, ' সাবধানে থাকবেন ... '
    সাগর রাত্রির মুখের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল। 
    তার একটাই বলার কথা ছিল, ' আবার তা'লে কবে .... ' । কিন্তু দুরন্ত, বেপরোয়া সাগর মন্ডলের গলা আটকে গেল । সে অনেক চেষ্টা করেও কথাটা বলে উঠতে পারল না ।
    মিনিটখানেক নীরবতার পর সাগর কানুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ' বাড়ি পৌঁছে দিস । কোন অসুবিধে না হয় ... '
    রাত্রি কোন আপত্তি করল না ।
    সাগর তারপর কানুকে অবাক করে দিয়ে বলল, ' সন্তোষ আর মন্টুকে সঙ্গে নিয়ে নিস ... '
    মন্টু বলল, ' হ্যাঁ হ্যাঁ ... এই তো ... কোন অসুবিধে হবে না ... আর একটা ট্যাক্সি ধরে নিচ্ছি ... '
    মাণিক ভাবল, দাদা কি তার মনের কথা পড়ে ফেলেছে !
    সাগরের ট্যাক্সি ছেড়ে দিল । করিতকর্মা মন্টু সরখেল রাস্তা থেকে মিনিট চারেকের মধ্যে আর একটা ট্যাক্সি ধরে আনল ।
    ওদের চারজনকে তুলে নিয়ে ট্যাক্সিটা যখন আর জি কর-এর গেটের দিকে যাচ্ছে তখন জানলার ধারে বসা রাত্রি চমকে উঠল ...  হাসপাতালের রাস্তার একপাশে তাদের ট্যাক্সির দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে প্রায় কুড়ি ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে একজন মোটাসোটা কালো মতো লোক । তাদের গাড়িটা ওর কাছাকাছি যেতেই উল্টোদিকে
    ঘুরে দাঁড়াল ঝন্টুকাকা ।

         সেদিন শ্যামবাজার ট্রাম ডিপোয় কাবেরীর সঙ্গে পার্থপ্রতিমের দেখা হবার পর থেকে কাবেরী আর পার্থপ্রতিম আবার দেখা সাক্ষাৎ করতে শুরু করেছে বিভিন্ন জায়গায় ।
    কাবেরী গত বুধবার বিকেলবেলায় কলেজ স্কোয়্যারের বেঞ্চে বসে বলল, ' এভাবে আর ভাল লাগছে না ... ' 
    ------ ' তা'লে কিভাবে ভাল লাগবে শুনি ? '
    ------ ' একটা ডিসিশান নেওয়ার দরকার ... '
    কাবেরীর সঙ্গে ভাব বিনিময়ের অভিজ্ঞতা আগেই হয়েছে পার্থর।  সুতরাং সে রেখে ঢেকে কথা বলবার দরকার মনে করল না ।
    বলল, ' কেন , অমিতাভর হ্যাং ওভার এখনও কাটেনি নাকি ? নাকি অন্য কেউও আছে ... '
    ----- ' সে আবার কি ! এসব কথা আসছে কিসে ? আমি একটা সিম্পল কথা বললাম ... '
    ----- ' আরে বাবা ...  আমিও তো সিম্পল কথা বললাম । তোমার ট্র্যাক রেকর্ড তো আমার জানা ... তুমি কি আদৌ কোন ডিসিশানে স্টিক করে থাকতে পারবে ? আমার কোন বদারেশান নেই .... '
    ----- ' তুমি কি আজকে ঝগড়া করবে বলে প্রিপেয়ার্ড হয়ে এসেছ ... একটা পিকিউলিয়ার মুডে রয়েছ তুমি ... সব কথার ব্যাঁকা মানে করছ ... '
    ----- ' ব্যাঁকা মানে ? আচ্ছা ! কয়েক মাস আগের কথা ভুলে গেলে । সে অপমান আমি কিন্তু ভুলিনি ...'
    কাবেরী আজ খুবই ধৈর্য্যের পরিচয় দিচ্ছে । তার গলায় আপোষের সুর ।
    বলল, ' ওঃহো ... কেন আবার ওসব পুরণো কথা আবার তুলছ ? ভুলে যাও না ... ক্ষমা চাইছি ... হয়েছে ? '
    পার্থপ্রতিমের নীরিক্ষা বোধহয় সফল হল ।
    সে ভাবতে লাগল, কাবেরীর পুরণো রোগ কি তবে সেরে গেছে । নাকি এটা একটা সাময়িক বিরতি ।
    পার্থপ্রতিমের মনে হল, সে ব্যাপারে এখনই নিশ্চিত হওয়া মুশ্কিল । আরও বাজিয়ে দেখার দরকার । পার্থ ঠিক করেছে,  কাবেরীর বিষদাঁত সে ভেঙেই ছাড়বে ।
    কাবেরী বলল, ' কাল চল না ... একটা সিনেমা দেখে আসি ... হাওয়া ভারি ক'র না প্লিজ ... '
    পার্থপ্রতিম নির্বিকারভাবে বলল, ' চল উঠি এবার ... কাজ আছে ... '

         ( চলবে )
    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন