এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ২৬

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ২৫০ বার পঠিত
  • নলিন সরকার স্ট্রীটের সুশোভন সেদিন প্রতিবিম্বকে বলল, ' রবিবারে বাড়িতে আয়। পুজোর গান কিনেছি কিছু ... শোনাব। মানবেন্দ্র খুব নাম করেছে জানিস তো ... ও একটা দারুণ গান করেছে .... কি যেন ... বনে নয় মনে মোর পাখি আজ গান গায়। দারুণ লাগল। আসিস কিন্তু ...।
    পুজো এসে পড়ল প্রায়।

    রবিবার দুপুরের দিকে সুশোভনের বাড়ি গেল প্রতিবিম্ব। শুধু বনে নয় ... না , আরও অনেক গান টান শোনা হল। পাঁচটা বাজলে সুশোভন যথারীতি বলল, ' চ... লক্ষ্মীনারায়ণ সাউয়ে গিয়ে পেঁয়াজি খাই .... '
    বৃন্দাবন বসু লেনের মুখে দাঁড়িয়ে দুজনে পেঁয়াজি খেতে লাগল। সুশোভন বলল, ' সামনের শুক্রবার তো কলেজের অ্যানুয়াল সোশ্যাল। অনেক আর্টিস্ট আনছে শুনেছি। যাবি তো ? '
    ----- ' দেখি .... যদি সময় পাই... '
    ----- ' সময় পাবি না কেন ? পরীক্ষার তো দেরি আছে ... পড়া ছাড়া আর কিছু জানিস না তুই ? '
    ------ ' না, তা না ... অন্য কাজও থাকে। মামাকে সাহায্য করতে হয় ... '
    ----- ' তাতে কি হয়েছে ? দু তিন ঘন্টা সময় বার করতে পারবি না ? বছরে তো একবারই। পাশ করে বেরিয়ে গেলে তো আর এ সবের সঙ্গে কোন সম্পর্ক থাকবে না। তাছাড়া চাঁদা তো দিয়েছিস।
    ----- ' হ্যাঁ তা দিয়েছি ... '
    ----- ' তবে ? কার্ড পাবি। হেমন্ত আসছে .... পাকা খবর আছে আমার কাছে। একটা কার্ডে দুজন অ্যালাওড। সঙ্গে একজনকে নিয়ে যেতে পারবি।'
    ------ ' আমি আর কাকে সঙ্গে নিয়ে যাব ... আমার আর তেমন কেই বা আছে ? '
    কথাটা বলার পরই প্রতিবিম্বর মনে আচমকা একটা ছোট্ট ঢেউ খেলল। হেদুয়ার পুকুরের ধারে দুপুর আড়াইটের সময়ে কাঁধে ঝোলা নিয়ে ভোরের নরম আলোর মতো দৃষ্টি ফেলে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা বেথুন কলেজের একটা মেয়ের কথা মনে পড়ল।
    সুশোভন পেঁয়াজির শালপাতাটা পাকিয়ে পাকিয়ে ফেলে দিল। বলল, 'দেখ কাউকে পাস কিনা ... নইলে একাই যাবি .... আমি ওখানে থাকব ... '
    ----- ' আচ্ছা ঠিক আছে ... দেখি কি হয় ... '
    ----- ' হুঁ হুঁ ... নে চল ... '

    সরীসৃপের মহড়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কালিপুজোর আগেই নাটক মঞ্চস্থ হবে ঠিক হল। বিভূতিবাবু একশ টাকা দিয়ে হলে বায়না করে ওদের খাতায় লিখিয়ে এসেছেন। এবার একদিন গিয়ে অনুষ্ঠানের দিনটা বলে আসতে হবে।
    অসিত যেভাবে পুরো স্ক্রিপটা নাটকের চেহারায় এনে ফেলল পাড়া থেকে সংগৃহীত অ্যাক্টরদের নিয়ে, তাতে তার এলেম দেখে সকলে চমৎকৃত। সংসারনাথবাবু নির্দ্বিধায় মত প্রকাশ করলেন যে, ছেলেটার মধ্যে তিনি ভবিষ্যতের শিশির ভাদুড়ীকে দেখতে পাচ্ছেন।
    মহড়ার এখন শেষ পর্যায়। শেষ টানটা দেবার জন্য এবার দুটো ফিমেল ক্যারেক্টার দরকার। তাদের অবশ্য কোন ডায়লগ নেই। খানিকটা কাটা সৈনিক গোছের রোল আর কি। কিন্তু অসিতের মতে, আবহ তৈরির জন্য দরকার আছে এই সংযোজনের।
    অসিত একটা ফিমেল ক্যারেক্টারের জন্য শ্রীলেখাকে ভেবে রেখেছে। আর একটা রোল করার জন্য বিভূতিবাবুর পুত্রবধূ দেবযানী নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অসিত ঠিক করেছে সংলাপ না থাকলেও ওনার উপস্থিতিটা একটু দীর্ঘায়িত করবে। নাটকের মূল সুরটা বেদনাত্মক। অসিত আপ্রাণ চেষ্টা করছে নাটকের শেষে যেন সেই সুরটা অনুরণিত হয়।
    নাটক পরিচালনায় অসিত এত নিবিষ্টচিত্ত হয়ে পড়েছে যে শ্রীলেখা এত কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়েও অসিতের ঠিক নাগাল পাচ্ছে না। সব সময়ে কি যেন চিন্তায় ডুবে আছে। শ্রীলেখার গা জ্বলে যায় রাগে ... ও বাবা .. পাড়ার নাটক নিয়ে এত তপস্যা ... খেলা দেখাচ্ছে বটে। তার দিকে তাকাবার পর্যন্ত সময় নেই ! নাটকের দিন যত এগিয়ে আসছে ততই যেন অসিতের বৈরাগ্য বাড়ছে। শ্রীলেখা ভাবে, সেও দেখাবে মজা ... তারও সুযোগ আসবে ... নাটকটা একবার হয়ে যাক না তারপর দেখা যাবে কত ধানে কত চাল ...এক মাঘে শীত পালায় না। তারা যখন হেদুয়া ছেড়ে চলে যাবে তখন বুঝবে মজা। এর মধ্যে একদিন বিভূতিবাবুর ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্রীলেখা অসিতকে শুনিয়ে শুনিয়ে জেঠিমাকে বলল, ' আমরা আর কদিনই বা আছি .... এই তো পুজোর পরেই এ পাড়া ছেড়ে চলে যাব .... '। কিন্তু এ প্রচেষ্টাও বিফলে গেল। অসিত নাটক নির্মাণে মন প্রাণ সঁপে বসে আছে। তার কানে বোধহয় কিছু ঢুকল না, কিংবা ঢুকলেও মনে কোন নাড়া দিল না। কি বিচিত্র ব্যাপার !

    এদিকে আর এক কান্ড ঘটল। শেষ দুপুরবেলায় সুমনাদের বাড়িতে সদর দরজায় কে যেন দরজা-ঘন্টি বাজালো। অলোকেন্দুবাবুর শরীরটা আজ তেমন ভাল নেই। তাছাড়া একটা মামলার ব্যাপারে কাল হায়দ্রাবাদ যাবেন। তাই তিনি আজ বেরোননি। বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছেন। বাসন্তীদেবী মধ্যাহ্নভোজনের পর রেডিও খুলে শুয়ে শুয়ে বিবিধ ভারতীতে ফিল্মী গান শুনছেন ... রাজ কি আয়েগী বরাত, রঙ্গিলী হোগী রাত, ম্যায় নাচুঙ্গি ...... আয়েগী বরাত ...। সুমনারা তিন বোনই কলেজে। দিবাকর একতলায় সিঁড়ির পাশে তার ঘরে একটু গড়িয়ে নিচ্ছে। সবে একটু তন্দ্রা মতো এসেছে, এমন সময়ে ডোরবেল বেজে উঠল। দিবাকরকে গা তুলতেই হল। ' উঃ , আর পারিনা ... ' বলতে বলতে একরকম ঘুমচোখে নড়বড় করতে করতে গিয়ে দরজা খুলল সে। খুলে দেখল যে একজন ছাব্বিশ সাতাশ বছরের সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। দিবাকর ঘুমমাখা চোখে ভ্রু কুঁচকে তাকে সনাক্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
    আগন্তুক এক গাল হেসে দিবাকরকে বলল, ' ভাল আছ ? '
    দিবাকর একটু শুকনো হেসে এমনভাবে ঘাড় নাড়ল যার মানে হ্যাঁ-ও হয় , আবার না-ও হয়।
    যুবক আবার বলল, ' আমাকে চিনতে পারছ তো ?'
    দিবাকর ঠাহর করার চেষ্টা করতে লাগল। ছেলেটাকে একটু যেন চেনা চেনা লাগছে। আগে কোথাও দেখেছে মনে হচ্ছে।
    সে সবিনয়ে বলল, ' কাকে চান যদি বলেন ? '
    ----- ' মিস্টার অলোকেন্দু মিত্র কিংবা মিসেস মিত্র ... '
    ----- ' আচ্ছা আচ্ছা ... একটু দাঁড়ান , আমি খবর দিচ্ছি ... আপনার নাম কি বলব ? '
    ------ ' আমার নাম শঙ্খ ... শঙ্খ সেন ... ভবানীপুর থেকে আসছি। আমি পনের কুড়িদিন আগে এসেছিলাম এ বাড়িতে ... '
    দিবাকরের এক নিমেষে মনে পড়ে গেল সব
    কিছু।

    ( চলবে )
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন