এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    তারাদের কথা- পর্ব এক- কোটিপতির জুড়ি গাড়ি - হীরেন সিংহরায় | নামাঙ্কন: রমিতচার্লস রোলস-হেনরি রয়েস একদিকে দেওয়াল জোড়া ওক কাঠের প্যানেল, অন্যদিকে বিশাল আয়না, মেঝের কার্পেটে হাঁটু ডুবে যায়। ঘরের মাঝখানে টেবিল ঘিরে বসে আছেন সাত জন প্রবীণ ব্যক্তি। তাঁদের সামনে একটি চেয়ারে আসীন এই গাড়ি কোম্পানির চিফ ডিজাইনিং এঞ্জিনিয়ার। তিনি নবীনতম এঞ্জিনের গুণবত্তা ব্যাখ্যান শেষে বললেন, ‘আমাদের এঞ্জিনের বৈশিষ্ট্য তার নীরব নৈপুণ্য। এবার এমনকি একশো দশ মাইল স্পিডে চালালেও ঘড়ির কাঁটার টিক টিক বাদে আর কোন যান্ত্রিক শব্দ শোনা যাবে না।’ঘর জোড়া নৈঃশব্দ ভেঙ্গে পক্বকেশ এক বোর্ড ডিরেক্টর বললেন, ‘আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো গাড়ি বানাই একশো বছর ধরে, কারো শান্তি বিঘ্নিত না করে, মানুষের হাতে তৈরি ইঞ্জিন কাজ করে চলে নীরবে। ওই ঘড়ির আওয়াজটা বন্ধ করা যায় না?’গাড়ির নাম রোলস-রয়েস সেখানে কিছু বদলায় না সহজে কিন্তু এবার, একশ বছর বাদে হাতে গড়া সুইস ঘড়ির বদলে এলো ইলেক্ট্রনিক ঘড়ি সে নিখুঁত সময় দেবে নিঃশব্দে। চার্লি রোলস ও হেনরি রয়েসহেনরি রয়েসের জন্ম ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডের পিটারবরার কাছে অলওয়ালটনে। অভাবের সংসার; মা বাড়ি বাড়ি কাজ করেছেন, বাবা জেমস কল থেকে কলে কাজ খুঁজেছেন, পেয়েছেন, হারিয়েছেন। জেমস একদিন তিন মেয়েকে তাদের মায়ের কাছে রেখে ভাগ্যের সন্ধানে দুই ছেলেকে নিয়ে লন্ডন গেলেন, আটা কলে মজদুরি করলেন। হেনরি রয়েসের আট বছর বয়েস, সবে স্কুলের মুখ দেখেছে, বাবা মারা গেলেন। প্রায় অনাথ হেনরি, ক্ল্যাপহ্যাম স্টেশনের বাইরে খবর কাগজ ফিরি করে, ঠাণ্ডায় কুকুরকে জড়িয়ে ঘুমোয় কিছু উষ্ণতার সন্ধানে। এক সহৃদয়া কাকিমার অর্থ সাহায্যে গ্রেট নর্দার্ন রেলওয়েতে অ্যাপ্রেনটিসের কাজ জুটল, রাতে সিটি গিলডে অঙ্ক, ইঞ্জিনিয়ারিং শেখেন। প্রাথমিক স্কুল পাশ করেননি, কিন্তু যন্ত্রপাতি যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে। কাজ পেলেন ম্যাক্সিন- ওয়েষ্টন নামের এক ইলেকট্রিকাল সরঞ্জাম তৈরির কোম্পানিতে, সত্বর পেটেন্ট নিলেন বেয়নেট স্টাইল বালবের (যা ইংল্যান্ডে আজও চালু)। হাতে দু পয়সা এলো, বন্ধু ক্লেয়ারমন্ট এবং হেনরি মিলে মোট সত্তর পাউন্ড নিয়ে ম্যানচেস্টারে বিজলি বালব, ডায়নামো, ইলেকট্রিক ক্রেনের ব্যবসা খুললেন। তিরিশ বছর বয়েসে যে ডাইনামোর পেটেন্ট নিয়েছিলেন, তার অভাবনীয় বিক্রি থেকে এলো জীবনে প্রথম সাচ্ছল্য। অতঃপর বিয়ে এবং প্রথম গাড়ি, ফরাসি। চার চাকায় চড়ার প্রথম চমক কাটলে হেনরি লক্ষ করলেন গাড়ি যত না চলে শব্দ করে তার চেয়ে বেশি। তিতিবিরক্ত হয়ে গাড়ির কলকবজা খুলে একটি ইঞ্জিন বানালেন নিজের হাতে। এবার ট্রায়াল। ক্লেয়ারমন্ট বললে, হেনরি, গাড়ি বেশ বানালে, এ চলবে তো? হেনরি বললেন, নির্ঘাত চলবে। এই গাড়ি চালিয়ে শুক্কুরবার আমি এখান থেকে বাড়ি যাবো। পনেরো মাইল রাস্তা। এক কাজ করো এই হুলমের কুক স্ট্রিট থেকে তুমি আমার পেছনে পেছনে ওই ফরাসি দেকভিল চালিয়ে এসো। আমার গাড়ি যদি থেমে যায়, আমাকে তুলে নেবে; মনে হয় না তার প্রয়োজন হবে। অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন তখন অনেক দূরে, বিপদে পড়লে দমকল ভরসা, তারা বিপন্ন মানুষকে বড়জোর হাসপাতাল নয় বাড়ি পৌঁছে দেয়, গাড়ি সারায় না। ক্লেয়ারমন্ট অবাক হয়ে দেখলেন হেনরির গাড়ি দিব্যি পৌঁছুল নুটসফোর্ডে, বাড়ির সামনে কৌতূহলী জনতার ভিড়! হেনরির নিজের হাতে বানানো গাড়ি থেমে যায়নি। নতুন কিছু তিনি আবিষ্কার করেননি, যা পেয়েছেন তারই ওপরে খোদকারি করে বানালেন এমন গাড়ি যা চলে মসৃণ ভাবে। যে আমলে গাড়ি ছিল খাটারা, যার বিকট শব্দে পথচারী সন্ত্রস্ত হয়ে রাস্তা ছেড়ে দিতো সেই সময়ে হেনরির গাড়ি চলল, গাড়লের মতো না কেশে, লোককে জানান না দিয়ে! হেনরি আনলেন দশ হর্স পাওয়ার টু সিলিন্ডার সাইলেন্ট গাড়ি। ভবিষ্যতের রোলস-রয়েসের জন্ম হলো, সেদিন এপ্রিল ফুলস ডে, শুক্রবার, পয়লা এপ্রিল ১৯০৪। হুলমের হেনরি রয়েসকে চেনে কে? এ গাড়ি বেচবে কে? ঠিক একমাস বাদে হেনরির সহযোগী ডিরেক্টর, আরেক হেনরি (এডমানডস) একটা খবর দিলেন। বাপের বাউণ্ডুলে গোছের একটি যুবকের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে, ধন ও বিদ্যা দুইই তার প্রচুর, লন্ডনে গাড়ি বিক্রির শোরুম চালায়। ম্যানচেস্টারে আসবে শিগগির, তাকে লাঞ্চে ডাকা যাক। ব্রিটিশ এম্পায়ারের জৌলুসের দিন; পিটার স্ট্রিটে সবেমাত্র খুলেছে মিডল্যান্ড হোটেল (আজও সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, ইন্দ্রনীল ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে দেখা করতে গেলে সেখানে রাত্রিবাস করেছি)। মে মাসের চার তারিখ মিডল্যান্ড হোটেলের লাঞ্চের টেবিলে বসলেন সমাজের দুটি আলাদা পাড়ার মানুষ- কল মজুরের ছেলে চল্লিশ বছরের হেনরি রয়েস যিনি স্কুলের গণ্ডি পেরুতে পারেননি, নিজেই লিখে গেছেন পাটিগণিতটুকু (এরিথমেটিক) জানেন, স্লাইড রুল অবধি শেখেননি, দারিদ্র্যকে চিনেছেন অর্ধেক জীবন, একমাত্র হবি মেশিন। অন্যদিকে ওয়েলসের মনমাউথশায়ারের জমিদার লর্ড লিনগ্লটকের সাতাশ বছরের সন্তান চার্লস রোলস, জন্মেছেন লন্ডনের অভিজাততম পাড়া বারক্লে স্কোয়ারে, স্কুল ইটন, অতঃপর যা স্বাভাবিক, ট্রিনিটি কলেজ কেমব্রিজ; স্পোর্টসে দারুণ সফল, কেমব্রিজ হাফ ব্লু (অক্সফোরড -কেমব্রিজ ম্যাচে খেললে পুরো ব্লু), হবি হট এয়ার বেলুন চড়া, বাইসাইকেল রেসিং, মোটর রেসিং। আঠারো বছর বয়েসে প্যারিস থেকে পিউজো ফিটন গাড়ি কিনে সেটি চালিয়ে কেমব্রিজ পৌঁছে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছেন, কেমব্রিজের প্রথম স্বতসচলশকট! গাড়ি নিয়ে মেতে পড়েছেন, বাবার কাছ থেকে সাত হাজার পাউন্ড নিয়ে বন্ধু ক্লদ জনসনের সঙ্গে সি এস আর লিমিটেড নামে গাড়ির শোরুম খুলেছেন পশ্চিম লন্ডনের ফুলহ্যামে। শুধু ইউরোপিয়ান গাড়ি নয়, ব্রিটিশ গাড়িও সেখানে রাখতে চান।    প্রথম রোলস রয়েসবিশাল সামাজিক ব্যবধান সত্ত্বেও এক জায়গায় এই দুজনে মিল খুঁজে পেলেন – চোদ্দ বছর বয়েসে হেনরি ইলেকট্রিকাল যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করেছেন, একই বয়েসে চার্লস নানান মেশিন নিয়ে হাত নোংরা করেন। ঐতিহ্য মণ্ডিত ইটনে, যেখানে স্কুলের ছেলেরা ফ্রক কোট না পরে দরোজার বাইরে পা দেয় না তাঁর নাম হয়ে যায় ডারটি চার্লি। মিডল্যান্ড হোটেলে সেই সাক্ষাৎকারের কোন বিবরণী পাওয়া যায় না, কেউ নোট নেননি। হেনরি এডমানডস মোটামুটি রয়েসের দশ হর্স পাওয়ারের গাড়ির বর্ণনা দিয়ে রেখেছিলেন। লাঞ্চের সময়ে হেনরি রয়েস বলেছিলেন, আমার গাড়িটা একবার চালিয়ে দেখবেন? হোটেলের সামনে পার্ক করা আছে। এক ঘণ্টা বাদে সে গাড়ি চালিয়ে উচ্ছ্বসিত চার্লি রোলস হেনরির করমর্দন করে বললেন, শুধু টু সিলিন্ডার নয়, বানান চার, ছয় সিলিন্ডারের গাড়ি, আপনি বানাবেন, আমি বেচব।বাংলায়, আপনার কাজ আর আমার হাতযশ! বাকিটা ইতিহাস। হেনরির প্রথম ড্রাইভের ঠিক দু বছর বাদে আড়াই লক্ষ পাউন্ড মূলধন নিয়ে পনেরোই মার্চ ১৯০৬, লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটের লাগোয়া ১৪-১৫ কনডুইট স্ট্রিটে যে কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হল তার নাম রোলস-রয়েস লিমিটেড (আলফাবেট অনুযায়ী রোলস আসে রয়েসের আগে!)। চার্লসের বন্ধু ক্লদ জনসনের নাম কাটা গেলো; চার্লস বললেন রোলস-রয়েস-জনসন বড়ো খটমটো।মহাযজ্ঞে উপেক্ষিত ক্ষুণ্ণ হয়েও জনসন ঠাট্টা করে বলেছেন, আমি রয়ে গেলাম রোলস আর রয়েসের মাঝখানে, হাইফেনে! দু বছর বাদে চল্লিশ হর্স পাওয়ারের নতুন রোলস রয়েসের বিজ্ঞাপনে মাস্টার সেলসম্যান ক্লদ জনসন ট্যাগ লাইন লিখলেন – ‘সিক্স সিলিন্ডার রোলস-রয়েস - নট ওয়ান অফ দি বেস্ট বাট দি বেস্ট কার ইন দি ওয়ার্ল্ড’। এই লাইনটি টিকে গেল। চার্লি রোলস এক জায়গায় থিতু হবার মানুষ নন। আটলান্টিকের অন্য তীরে রাইট ভাইয়েরা প্লেন উড়িয়েছেন কয়েক বছর আগে। এবার তাঁরা ইউরোপে এলেন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হাওয়াই জাহাজ বিক্রি করতে। ট্রায়াল ফ্লাইটে উঠে কয়েক মাইল উড়েই রোলস বললেন, এই খেলনাটি তাঁর চাই! কিনলেন কিন্তু বছর খানেক বাদে বোর্নমাউথে এক উড়ানে সে প্লেন ভেঙ্গে পড়লে প্রাণ হারালেন দুঃসাহসী অস্থির চার্লস রোলস। তাঁর বয়েস মাত্র তেত্রিশ। চার্লি রোলসের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠলে হেনরি রয়েস প্রথমত এই উড়োজাহাজের ইঞ্জিনটাকে বুঝতে চাইলেন। একদিন যেমন তিনি ফরাসি দেকভিল গাড়ির বনেট খুলে ফেলে তাঁর মনের মতন করে নতুন ইঞ্জিন বানিয়েছিলেন তেমনই এবার ফরাসি রেনো কোম্পানির (রাইট ভাইয়েদের লাইসেন্স নিয়ে তাঁরা ইউরোপে কাজ করেছেন) ভি এইট ইঞ্জিন খুলে ফেলে তৈরি করলেন ঈগল ভি ১২! প্রথম মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তির অর্ধেক এয়ার পাওয়ার সরবরাহ করেছে রোলস রয়েস অ্যারো ইঞ্জিন, ক্রমশ এলো জেট ইঞ্জিন! আজ আপনি এয়ার বাস, বোইং, ড্রিমলাইনার যে কোন হাওয়াই জাহাজেই যখন উড়বেন, জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখুন তো কোথাও RR লেখা চোখে পড়ে কিনা! তখন মনে করবেন ফ্রেডেরিক হেনরি রয়েসকে। অদম্য উৎসাহে অক্লান্ত পরিশ্রমে হেনরি বানাচ্ছেন গাড়ি, অ্যারো ইঞ্জিন (যা একদিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আকাশে ওড়াবে বোমারু জাহাজ), একদিন তাঁর শরীর এমন ভেঙ্গে পড়ল যে ডাক্তাররা, কোম্পানি ডিরেক্টররা বললেন খবরদার, কারখানার একশো মাইলের মধ্যে পা দিলেই আপনার নির্ঘাত মৃত্যু। তাদের আদেশ মেনে নিয়ে হেনরি পরের বিশ বছর তিনজন ডিজাইনার দু জন সেক্রেটারি নিয়ে নির্বাসনে গেলেন- শীতকালে ফ্রান্সের সাঁ ত্রপের ভিলা লা মিমোসা, গ্রীষ্মকালে সাসেক্সে উইটারিঙ্গের বাড়িতে। ই মেল, ফেসবুক, জুম কল ছিলো না। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় ফরাসি ও ব্রিটিশ ডাকের ভরসায় তিনি তাঁর গাড়ি ও অ্যারো এঞ্জিনের ব্যবসা চালালেন কয়েকশ মাইল দূরে বসে। নিখুঁত ভাবে বলে দিতেন কোন মেশিন কোথায় বসবে। পরে তাঁর চিঠিগুলি একত্র করে ৩০১ পাতার একটি বাঁধানো ভলিউম তৈরি হয়, যার মাত্র ছটি কপির অস্তিত্ব জানা গেছে। তালা চাবি দিয়ে গোপন দেরাজে বন্ধ থাকে, এর নাম কোম্পানি বাইবেল। প্রয়োজনে মাত্র কয়েকজন নির্দিষ্ট ডিরেক্টর সেটি খুলতে পারেন। ১৯১৮ সালে হেনরি ও বি ই (অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার) খেতাব পেয়েছিলেন, ১৯৩০ সালে সালে রাজা পঞ্চম জর্জ তাঁকে নাইটহুড প্রদান করেন। সত্তর বছর বয়েসে তিনি যখন মারা যান ততদিনে ফ্র্যাঙ্ক হুইটল জেট এঞ্জিনের পেটেন্ট নিয়ে ফেলেছেন। এদের দুজনের মধ্যে কতটা যোগাযোগ ছিল তার সরকারি তথ্য মেলে না তবে পরের কয়েক বছরের মধ্যে রোলস- রয়েসের অ্যারো ইঞ্জিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নির্ণয়ে সাহায্য করবে। রোলস রয়েস  ফ্যান্টমসিটি ব্যাঙ্ক লন্ডনে রোলস-রয়েস রিলেশনশিপ ম্যানেজার ক্রিস কথা প্রসঙ্গে একদিন বললেন আমাদের সিনিয়র আমেরিকান কলিগরা রোলস-রয়েসের অফিস ভিজিটে গেলে প্রশ্ন করেন আপনাদের গাড়ি কেমন বিক্রি হচ্ছে! তাঁরা এখনো মনে করেন রোলস -রয়েস শুধু গাড়ি বানায়! তখনই, সেই আটের দশকে তাদের বার্ষিক আয়ের মাত্র দশ শতাংশ আসে গাড়ি বিক্রি থেকে (আজ পাঁচ শতাংশের কম), বাকিটা অ্যারো ইঞ্জিন থেকে। আরেক বড়ো আয় আফটার সেলস সার্ভিস, দুনিয়ার হাজারটা এয়ারপোর্টে রোলস রয়েসের সেবক আপনার সুরক্ষার জন্য হাজির। ক্রিসের কাছেই শুনেছি আরেক গল্প -তিনি বলেছিলেন আমরা তো সিটি ব্যাঙ্কে কামরাদেরির খুব বড়াই করি, রোলস-রয়েসে সেটা চোখে দেখি, কানে শুনি। অফিসার, স্টাফ যে যত উঁচু পদেই থাকুন না কেন, তাঁদের পরিচয় কেবলমাত্র নাম ও পদবির আদ্যক্ষর দিয়ে। ক্রিসের সময়ে হেড ডিজাইনার ছিলেন গ্রাহাম হাল, তাঁর বস ফ্রিতস ফেলার- কোম্পানির আরদালি থেকে শোফার, কারখানার ফিটার, যে কেউ তাঁদের সম্বোধন করতেন জি এইচ বা এফ এফ বলে, তার আগে সার তো নয়ই, এমনকি মিস্টারও বাদ। একমাত্র প্রয়াত হেনরি রয়েসের পরিচয় এক অক্ষরে, শুধুই আর! আই বি এমে সাদা শার্ট ডার্ক সুট পরার কড়াকড়ি চালু করেছিলেন টম ওয়াটসন। হেনরি রয়েস সবাইকে সমান করে দিয়েছিলেন এই আদ্যক্ষর নাম চালু করে! ধরা যাক কেউ হয়তো নাইটহুড পেলেন, অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার খেতাব পেলেন তখন তাঁদের সহকর্মীরা যারা একই সঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছেন একই পাবে বিয়ার পান করেছেন তাঁদের কি সার উইলিয়াম বা হনরেবল ট্রেভর বলতে হবে? ইনিশিয়াল দিয়ে ডাকলে সে ঝামেলা নেই। স্টেট ব্যাঙ্ক ইন্ডিয়াতে বিপরীত দৃষ্টান্ত দেখেছি। ২০০৮ সালে আমাদের উনিশশ বাহাত্তরের প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের ওমি (ওম প্রকাশ ভাট) ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান হলো। পরের বছর তার মেয়ের বিয়েতে গেছি। ওমির অফিশিয়াল বসত, মালাবার হিলসের সবচেয়ে মূল্যবান ভুখণ্ড, বিশাল প্রাঙ্গণ নিয়ে ‘ডানেডিন’। স্কটিশ ব্যাঙ্কারদের স্মৃতি! সেখানে আমাদের ব্যাচের অনেকে হাজির যেমন শ্রীধর (আমরা একসঙ্গে ফ্রাঙ্কফুর্টে তিন বছর কাজ করেছি, পরে সে এস বি আইয়ের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়েছে); অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমাদের ব্যাচের শ্রীধর, ভারতী রাও, দেবজ্যোতি রায় সবাই ওমিকে সার বলছে! আমার চোখে বিস্ময় দেখে শ্রীধর আমাকে আড়ালে ডেকে বললে, প্রশ্ন করো না, এটাই দস্তুর। কারো পদমর্যাদা বেড়ে গেলে সেই অনুযায়ী অ্যাড্রেস করতে হবে, ভুলে যাও কবে তার সঙ্গে কোন পাবে গিয়ে মদ্যপান করেছ, কোন নষ্টামি করেছ। আরেক ধাপ এগিয়ে বলল, কেন, পোপের নির্বাচনী পরীক্ষায় সব কার্ডিনাল একত্র বসেন, তার মধ্যেই তো যে জন পোপ হবেন, তিনি সবার বস! দূর থেকে উদ্ভ্রান্তের মতো সঞ্চরণরত কন্যা কর্তা ওমিকে দেখে পোপের সঙ্গে তার সাদৃশ্য খোঁজবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছি! ভেবেছি তার ড্রাইভার গাড়ির দরোজা খুলে দিয়ে কোনদিন কি বলতে পারবে, গুড মর্নিং, ও বি? জুড়ি গাড়ির যাত্রা কলকাতার ভিনটেজ কার র‍্যালিতে কখনো হাজিরা দিইনি, গেলে নিশ্চয় রোলস- রয়েস দেখতে পেতাম। সাতের দশকে লাইটহাউসে ইয়েলো রোলস-রয়েস ছবিটি দেখেছিলাম। কচি লেবু রঙের গাড়িটির মালিক বদলায়, তেমনই তিন বার বদলায় গল্পের মোড়; রেক্স হ্যারিসন, শারলি ম্যাকলেন, ওমর শরিফ, জিন মরো, ইনগ্রিড বের্গমান, আলাঁ দেলঁ মিলে একেবারে অল স্টার কাস্ট। কিন্তু ছবির শেষে মনে হবে গল্পের আসল হিরো, একটি রোলস-রয়েস, ১৯৩১ সালের ফ্যানটম টু! জার্মানিতে আমার প্রথম গাড়ি সাত বছরের পুরনো ফিয়াট মিরাফিওরি, কিনেছিলাম নগদ কড়কড়ে পাঁচশ মার্ক দিয়ে - আমাদের হিসেবে, শুনলে বিশ্বাস হবে না, তিন হাজার টাকা। তার ডিকি বন্ধ করতে হতো লকের জায়গায় একটা লোহার তার ঢুকিয়ে। কারো বাড়িতে গেলে সেই চলতি-কা-নাম গাড়িকে যতটা সম্ভব দূরে পার্ক করতাম। একদিন হেসেনের রাজধানী ভিজবাদেনের একটি পেট্রল পাম্পে গাড়িতে তেল ভরছি, পাশে এসে প্রায় নিঃশব্দে দাঁড়াল রাজ হংসের মতন সাদা রোলস রয়েস। এতো বড়ো গাড়ি কখনো চোখে দেখিনি, তখন ফোন ক্যামেরা থাকলে ধনী ও দরিদ্রের এ হেন সহাবস্থানের ছবিটি তুলে রাখা যেতো! চালক নিজেই নেমে এসে তেলের নল লাগিয়েছেন; বোকার মতন বলে ফেললাম কি সুন্দর গাড়ি! আচ্ছা এক লিটারে এ গাড়ি কতটা চলে? অসম্ভব পরিশীলিত উচ্চারণে সুবেশ মধ্য বয়স্ক জার্মান ভদ্রলোক মাথাটি কিঞ্চিৎ ঝুঁকিয়ে বললেন, ধন্যবাদ, দুনিয়ার সেরা গাড়ি। তেল কত খায় কে জানে। (ডের বেস্টে ভাগেন ডের ভেলট! হোয়ের পাসট আউফ ডেন বেনজিন ফেরব্রাউখ)? সিটি ব্যাঙ্ক লন্ডনে গাড়ি তিরিশ হাজার মাইল চলে অথবা তিন বছর বাদে নতুন গাড়ি পাওয়া যেতো। প্রথম বাহন ছিল ভলভো। বেতন ও গ্রেডের মনসবদারি বাড়লে মার্সিডিজ ২২০ অর্ডার করেছি। একদিন ফোন এলো তাদের স্টুটগার্ট অফিস থেকে। এ মাসের শেষ মঙ্গলবার গাড়িটি নিকটবর্তী জিনডেলফিঙ্গেনের কারখানায় তৈরি হবে, ইচ্ছে করলে সেদিনটা তাদের কারখানায় সেই গাড়ির নির্মাণ পর্ব নিরীক্ষণ করতে পারি, গাড়ির ফিজিকাল ডেলিভারি অবশ্য হবে তিন সপ্তাহ বাদে। গাড়ি দিচ্ছে তাই যথেষ্ট, ব্যাঙ্ক আমাকে স্টুটগার্ট আসা যাওয়ার খরচা দেবে না, ছুটি তো নয়ই। ধন্যবাদ সহকারে এই আমন্ত্রণ প্রত্যখ্যান করতে হল।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রোলস রয়েসের যে কোন মডেল, ফ্ল্যাগশিপ গাড়ি ফ্যানটম, ঘোস্ট, কালিনান (এসইউভি), ডন (কনভারটিবল) তৈরি হতে ছ মাস লাগে। ক্রেতা অনেক কিছুই কাস্টমাইজ করে নিতে পারেন, যেমন তাঁর অভিরুচি। তাতে সময় ও ব্যয় দুটি বাড়ে, তবে এ গাড়ির ক্রেতারা পাই পয়সা গোনেন না। গাড়ির ভেতরটি মুড়ে দেবার জন্য বরোদার গায়েকওয়াড় পাঠিয়েছিলেন বিশেষ সিল্ক, রানি তাঁর প্রিয় লিপস্টিক, যেটি হবে গাড়ির ইনটেরিয়র কালার। রোলস রয়েস এর ড্যাশবোর্ডযে কোন মডেল কিনলে পাবেন চার বছরের আনলিমিটেড ওয়ার‍্যান্টি, মাইলেজ যাই হোক। গড়ে পনেরো বছর অথবা ১,৫০,০০০ মাইল এ গাড়ি চলে কোন রিপেয়ার ছাড়াই। দশ সিলিন্ডার, ৫২০ থেকে ৬৫০ হর্স পাওয়ার সম্বলিত আড়াই হাজার কিলোগ্রাম ওজনের গাড়িকে তার সাসপেনশন ক্ষমতা পরীক্ষার জন্য চল্লিশ মাইল চালানো হয় রোলারের ওপরে, মেঠো গ্রাম্য পথে দেড়শ মাইল, তাকে ঝাঁকানো হয় অজস্রবার, বিশাল কৃত্রিম জল ধারার নিচে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় সারা দিন, ভেতরে যেন কণামাত্র জল না ঢোকে তা চেক করার জন্য, ডাস্ট ফ্রি চেম্বারে ছ সপ্তাহ ধরে গাড়ির ওপরে পাঁচ প্রস্থ রঙের পোঁচ পড়ে। অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচাটি দেড় সপ্তাহ। অটোমেটিক রিগ দিয়ে গাড়ির দরোজা এক লক্ষ বার খোলা বন্ধ করে দেখা হয় সেটি নিঃশব্দে সাধিত হচ্ছে কিনা। মোট টেস্টের সংখ্যা আঠানব্বুই। দুনিয়ার নব্বুই শতাংশ গাড়ি বানাতে গড়ে তেরো ঘণ্টা লাগে (ইনটেরিওরের কাজ বাদে)। খুঁতওলা রোলস-রয়েস হয় না। হেনরি রয়েস একবার বলেছিলেন, তেমন গাড়ি যদি ভুল ক্রমে তৈরি হয়েও থাকে, আমাদের দরোয়ান তাকে ফ্যাক্টরি থেকে বেরুনোর অনুমতি দেবে না, দরজায় আটকে দেবে! তবু দৈবের বশে গাড়ি যদি কোথাও থেমে যায়, অকুস্থলে প্রয়োজনে হাওয়াই জাহাজে মিস্ত্রী পাঠানো হতো মেরামতির জন্য (এখন কাছাকাছি সার্ভিস সেন্টার হতে মেকানিক আসেন)। হেনরি রয়েস এবং তাঁর সাথিরা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার; তাঁরা জানতেন যন্ত্রই আসল চালক, গাড়ির ভেতরে আসনের আবরণ লাগানো দরজির কাজ, ড্যাশবোর্ড বানাবে ছুতোর মিস্ত্রী। পরে দেখা গেলো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান এ গাড়ি যারা কিনবেন তাঁরা চাইলেন এর অভ্যন্তরকে নিজের মনের মতন করে সাজিয়ে নিতে। আজ যে কোন ক্রেতা বেছে নিতে পারেন কোনো গদির রং, লিনেন, আভ্যন্তরীণ কালার কম্বিনেশন, রিভলভিং বার, ফ্রিজ, ল্যাপটপের খোপ, ছাতা রাখা ও বের করার ইলেক্ট্রনিক ব্যবস্থা। তবে একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত আছে – ড্যাশবোর্ড, গাড়ির দরজার প্যানেলিং আখরোট কাঠের হতে হবে এবং সেটি কাটা হবে একটিমাত্র গাছের গুঁড়ি থেকে। আজ যে কোন গাড়িতে সতেরো সপ্তাহ লাগে রোলস রয়েসের ইনটেরিয়র সাজাতে। সিটে বসলে মাথার ওপরে যে কৃত্রিম আকাশ দেখেন, তার অঙ্গদকে তারায় তারায় খচিত করা, প্রতিটি আলো বসানো হয় ছুঁচ দিয়ে, যাবতীয় সেলাইয়ের কাজে ছ থেকে আট সপ্তাহ লাগে। ডাক্তার যেমন স্টেথোস্কোপ দিয়ে রুগী দেখেন, রোলস–রয়েসের দরজি, ছুতোর মিস্ত্রী গাড়িকে তেমনই সযত্নে বধু বেশে সাজান। ক্রেতার সকল আবদার বায়নাকে সমান আদর ও প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন রোলস-রয়েস। রোলস-রয়েস ও কোয়ালিটি সমার্থক। ‘আমরা রোলস-রয়েস সার্ভিস দিয়ে থাকি’ এই বাক্যবন্ধ আজ ইংরেজি ভাষার অঙ্গ। লা রোজা নোয়া ড্রপ টেলপ্রথম গাড়িটির দাম ছিল ৩৭৫ পাউন্ড, আজকের মাপে ষাট হাজার পাউন্ড। বর্তমান ফ্যানটম সিরিজের দাম শুরু হয় পাঁচ লক্ষ পাউন্ড থেকে, সবচেয়ে দামী গাড়ির নাম লা রোজ নোয়া (কালো গোলাপ) ড্রপ টেল, মূল্য তিন কোটি ডলার, কোন রইস আদমি সেটি অর্ডার করলে তবেই বানানো হয়, শো রুমে সাজানো থাকে না। গাড়ির মালিকের নাম ঠিকানা এক প্রাইভেট ইনফরমেশন, তবে যতদূর জানা যায় এ অবধি চারটে লা রোজ নোয়া বিক্রি হয়েছে, একটির মালিকের নাম গায়িকা বিওন্স। নিতান্ত হাঘরে ক্রেতাদের জন্য আছে এন্ট্রি লেভেল রোলস, ঘোস্ট সিরিজ, দাম মাত্র তিন লক্ষ পাউন্ড বা প্রায় চার কোটি টাকা। ট্যাক্সের কারণে ভারতবর্ষে সে গাড়ির দাম ডবল হয়ে যায় কিন্তু আজকের কোনো নুভো রিশের কাছে সে টাকা খোলামকুচি মাত্র। ফিল্ম স্টার কাজল তাঁর পতিদেব অজয় দেভগনের সঙ্গে সাত কোটি টাকার ঘোস্ট চড়েন। হংকং এই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ নয় কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে সেখানকার মানুষ রোলস-রয়েসের পুজো করেন! মাথা পিছু সবচেয়ে বেশি রোলস-রয়েস আছে সেখানে (জনসংখ্যা ৭০ লক্ষ, রোলস-রয়েস ১১০০)। সব মডেল মিলিয়ে বছরে কুড়ি লক্ষ নতুন মার্সিডিজ পথে নামে, এমনকি তাদের সবচেয়ে মহার্ঘ্য ব্র্যান্ড মাইবাখের বার্ষিক বিক্রির সংখ্যা বারো হাজার! ইংল্যান্ডের পথে দেখিনি, গত বছর যুবভারতীতে মোহনবাগানের খেলা দেখতে গিয়ে একটা মাইবাখ চোখে পড়ল; আমার স্কুলের ছেলে আর পি জির জাঁদরেল অফিসার প্রসেনজিত জানালে সেটি সঞ্জীব গোয়েঙ্কার ব্যক্তিগত শকট। ছ’হাজারের বেশি রোলস-রয়েস গুডউড ফ্যাক্টরির দরজা দিয়ে কোনো বছরে বেরোয় না। হেনরির মন্ত্র ছিল, এখনও সেটি মানা হয় - এ গাড়ির গৌরব তার নিপুণতায়, সেলস ফিগারে নয়। সেই প্রথম দিন থেকে যতগুলি রোলস-রয়েস গাড়ি পথে নেমেছে, তার ষাট শতাংশ এখনো চলার যোগ্য।মনে আছে জার্মানিতে ফেরারি ডয়েচল্যান্ডের অফিসে ব্যবসার আলোচনার সময়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রতি বছর গাড়ির সেলস বাড়ানোর চাপ আসে না মারানেলোর হেড অফিস থেকে? তিনি বলেছিলেন, তাঁর গাড়ির বিক্রি কম রাখাটাই তাঁর জব টার্গেট। ফেরারি দেয় মর্যাদা প্রেস্টিজ, অটোবানে ধাবিত হবার স্বাধীনতা। ফেরারি বিরল ব্র্যান্ড, সুপার মার্কেটে শপিং করার জন্য নয়। জার্মানিতে এক বছরে আটশো ফেরারি গাড়ি বিক্রির অনুমতি ছিলো (১৯৯১)। আজ সারা দুনিয়ায় বছরে তেরো হাজারের বেশি নতুন গাড়ি রিলিজ করা হয় না, অধিক ফেরারিতে বাজার নষ্ট; যেমন হীরের বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রেখে দে বেয়ারস তার দাম উঁচু জায়গায় বেঁধে রাখেন। জুড়ি গাড়ির আস্তাবল রোলস রয়েস কেবল বাহন নয়। চার্লি রোলস বলেছিলেন, এ গাড়ি হবে ঐশ্বর্য, বিলাস এবং সম্ভ্রমের সমার্থক, অ্যান্ড সামথিং ব্রিটিশ!আজ রোলস-রয়েস ব্র্যান্ডের মালিক জার্মান বি এম ডব্লিউ (বায়ারিশে মোটরেন ভেরকে), সিইও তুরস্কের মানুষ, কিন্তু তারা সেই ব্রিটিশনেস অক্ষুণ্ণ রেখেছে। রোলস রয়েসের সৃষ্টির প্রথম তিন দশকে তার ক্রেতা ও পৃষ্ঠ পোষক ছিলেন রাজন্যবর্গ। ব্রিটেনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ জর্জ থেকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন সকলেই ছিলেন রোলস রয়েসের পৃষ্ঠপোষক – শোনা যায় তাঁর গাড়ি তৈরির অগ্রগতি দেখার জন্য শিশুর মতন কৌতূহলে লুই মাউন্টব্যাটেন নিয়মিত হাজিরা দিতেন কারখানায়। ১৯১০ সালে জার নিকোলাস দুটি সেভেন সিটার অর্ডার করেন যার আপহোলস্টারি ছিল আগাগোড়া সিল্কের। জাপানের বর্তমান সম্রাটের প্রপিতামহ ইওশিহিতোর গাড়ির রং ছিল চেরি-রেড, দুই দরোজায় ওপরে সোনার জলে আঁকা চন্দ্রমল্লিকা। শ্যাম দেশের (থাইল্যান্ড) রাজা চতুর্থ রামার গাড়ি ছিল সম্পূর্ণ ক্রোমিয়াম প্লেটেড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের বিরুদ্ধে সিনাই পেনিনসুলাতে গেরিলা লড়াই চালানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার দুটি রোলস রয়েস গাড়ি ‘লোন’ দিয়েছিলেন অতি সাধারণ ঘরের এক মানুষ টমাস এডওয়ার্ড লরেন্সকে। যুদ্ধ জেতার পরে লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া একদিন বন্ধু লাওয়েল টমাসকে বলেন, জানো, অনেক টাকা থাকলে কিনতাম একটা রোলস রয়েস গাড়ি, অনেকগুলো টায়ার আর সারা জীবন চালানোর জন্য জরুরি তেল। মাত্র এক বছর পরে ডরসেটে মোটর বাইক অ্যাক্সিডেন্টে তিনি মারা যান। মিশরের শেষ ‘ফারাও’ রাজা ফারুকের একটি রোলস কালেকশন ছিল আলেকজান্দ্রিয়াতে। ব্রুনেইয়ের বর্তমান সুলতান হাসান আল বোলকিয়া হয়তো আরব্য রজনীর শেষ খলিফা – তাঁর আস্তাবলে পাঁচশোর বেশি রোলস রয়েস শোভা পায়। একদিন রাজন্যবর্গের স্থান নিলেন শিল্পপতি, রাষ্ট্রনেতা, ফিল্ম, স্পোর্ট সেলিব্রিটি - জন পিয়েরপন্ট মরগান, ভ্যানডেরবিলট পরিবার, ইওসেপ ব্রজ টিটো, সোভিয়েত ইউনিয়নের আনাস্তাস মিকোয়ান, ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস, এলভিস প্রেসলি, আদানি, আম্বানি, জেনিফার লোপেজ, ডেভিড বেকহ্যাম, শাকিল ও’নিল, সাইমন কাওল এবং আরও অনেকে। ঐতিহ্যের নাম রোলস-রয়েস, সেখানে সহজে কিছু বদলায় না কিন্তু তাদের নিজেদের তথ্য অনুযায়ী, একশ বছর আগে মাত্র পাঁচ শতাংশ মালিক নিজে গাড়ি চালাতেন, আজ মাত্র পাঁচ শতাংশ গাড়ি শোফার ড্রিভন। রোলস-রয়েসের প্রথম চার দশকের ইতিহাসের সঙ্গে আদ্যোপান্ত জড়িয়ে আছে ভারতীয় রাজাদের গল্প। হায়দ্রাবাদের সপ্তম নিজামের আস্তাবলে ছিল পঞ্চাশটি রোলস রয়েস; তাঁর প্রিয় গাড়িটির বডি রূপোর, পেছনের সিটটি সিংহাসনের মতন, সেটিকে ফ্ল্যাট করলে হয়ে যেত আরামদায়ক শয্যা। চল্লিশ বছরে গাড়িটি চলেছিল মোট চারশ মাইল। পাতিয়ালার মহারাজা একদা একসঙ্গে পাঁচটি রোলস অর্ডার করেন, সব সমেত তাঁর আস্তাবলে ছিল ৩৫টি। নিয়মিত ব্যবহারের গাড়িতে গোল্ড প্লেটেড ড্যাশ বোর্ড, বিশেষ সুইস ঘড়ি, মেডিসিন এবং পানীয় গেলাসের চেস্ট। শিকারের সময়ে দাঁড়িয়ে বন্দুক চালানোর জন্য রোলস-রয়েস বানিয়ে ছিলেন হুড খোলা, ফ্লাড লাইট লাগানো একটি বিশেষ গাড়ি। আরেক মহারাজা হাতির দাঁত সরবরাহ করেছিলেন তাঁর গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের জন্য। রাজ মহিষীদের ঝরোখার আড়াল থেকে বাইরের দুনিয়া দেখার সুবিধেও করে দিয়েছিল রোলস-রয়েস, প্রথম ফ্রস্টেড গ্লাস উইন্ডো! আমাদের সময়কার কারো মনে থাকতে পারে বহু বছর আগে, আজকের সানডে সাসপেন্সের মতন গল্প পাঠের আসর বসতো বিবিসিতে। সায়েদ জাফরির কণ্ঠে শোনা একটি গল্প এই প্রসঙ্গে আজ মনে পড়ছে (লেখকের নাম মনে নেই বলে দুঃখিত) –প্রিভি পার্স বাতিল হয়ে গেছে। এক ভারতীয় মহারাজার সংসারে আর্থিক দুর্দিন ঘনায়িত; লন্ডন টাইমসে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন - ফ্যানটম, রেথ মিলিয়ে ছটি রোলস রয়েস বিক্রি করবেন, তাঁর একান্ত অভিলাষ ক্রেতা তাঁর গাড়িগুলিকে ভালবাসবেন, তাদের সম্যক পরিচর্যা করবেন। লিভারপুলের এক ধনী ব্যবসায়ীর প্রতিনিধি এলেন; ইংরেজ এজেন্ট দরাদরি করলেন না। সেটা মহারাজাকেও মানায় না। গ্যারাজের দেউড়িতে দাঁড়িয়ে মহারাজা তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় গাড়িগুলির দিকে করুণ চোখে চেয়ে লন্ডনের এজেন্টকে জিজ্ঞেস করলেন, একটা কথা জানা হয়নি। আপনার প্রভু এই গাড়িগুলি নিয়ে কি করবেন?এজেন্ট একটু অবাক হয়ে বললেন, আই অ্যাম সিওর হি উইল ড্রাইভ দেম, ইওর ম্যাজেস্টি! মহারাজা বিষণ্ণ মুখে বললেন, হাউ স্যাড। পরিশিষ্ট উঠোনে রোলস রয়েসব্যাঙ্কের কাজ চুকলে অখণ্ড অবসর কাটানোর জন্য একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং বুটিকের ভার নিয়েছি। অফিস ছোট ক্ষতি নেই, সিইও আখ্যা জুটল। এক পুরনো বন্ধু, লন্ডন ফরফাইটিং এর টোনি নাইটের ছেলে ক্রিস তখন আমার অফিসের সব কাজের কাজি। একদিন দরোজায় উদিত হয়ে বললে, মুশকিলে পড়া গেছে বস। দুবাইতে আমাদের এক সহযোগী সংস্থার মালিক একটা রোলস-রয়েস কিনেছেন; তার এক্সপোর্ট ডকুমেন্ট বানাতে সময় লাগছে। তাঁদের অনুরোধ আমরা গাড়িটির সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। একে আমাদের অফিসের ছাদে বা কোন পার্ক হাউসে তুলে দেওয়া যায় না। আপনার বাংলোয় বড়ো ড্রাইভ আছে, সেখানে যদি কিছুদিনের জন্য রাখেন!ক্রিসকে বলতে হল আমার মতো সামান্য মানুষের দুয়োরে রোলস-রয়েস দাঁড়িয়ে থাকলে সারে পুলিস এমনকি এমআইফাইভের নজর পড়তে পারি, পাড়া প্রতিবেশীর তির্যক দৃষ্টির কথা বাদই দিলাম। বউকে বোঝাতে হবে আমার চাকরিতে হঠাৎ উন্নতি হয়নি এবং এটি চোরি কা মাল নয়! ক্রিস বললে গাড়ির দলিল এবং পারচেজ ডকুমেন্ট রাখুন না!তবে যতদূর জানি এই রোলস- রয়েসে অনেক কাজ করানোর আছে, সেটা নতুন মালিক দুবাইতে করাবেন।লম্বা গল্পকে ছোট করে বলি, উপরোধে ঢেঁকি গিলতে হয়েছিল। গাড়িটি এলো আরেক পেল্লায় গাড়িতে চড়ে কারণ এটি অযান্ত্রিক, চলার অবস্থায় নেই। অবাক হয়ে দেখলাম চল্লিশ বছর আগে জার্মানির ভিজবাদেনে আমার প্রথম দেখা সাদা রাজহংসের মতন! তবে ভেতরে ও বাইরে কাজ বাকি। এ গাড়ি চালানোর প্রশ্ন ওঠে না আমার ইনসিউরেন্স নেই। সাদা রাজহংসটি তার গভীর চলা গোপন রেখে আমাদের উঠোনে রয়ে গেল। আমাদের মালি ইয়ান ময়েস অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে একদিন বললে, এভাবে শুধু লক করে এ গাড়ি ড্রাইভে ফেলে রাখাটা কোন কাজের কথা নয়, একটা এক্সট্রা অ্যালার্ম লাগাবেন!মাস দুয়েক গাড়িটি আমাদের ড্রাইভের শোভা বর্ধন করেছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই অভ্যাগতকে (এমনকি আমার স্কুলের সহপাঠী চিন্ময়কে) বলেছি, ও গাড়ি আমাদের নয়! কে কতটা বিশ্বাস করেছে জানি না। বাড়িতে রোলস-রয়েস আছে এই গপ্প বাজারে ছেড়ো না এমন ওয়ার্নিং দেওয়া সত্ত্বেও আমার মেয়েরা মহা উৎসাহে গাড়িতে বসে নিজেদের ছবি তুলে নিয়ে পাঠিয়েছে একদিন।  সেই রোলস রয়েসে আমার মেয়েকৌতূহলী পাঠকের জন্য পিটার পিউ - দি ম্যাজিক অফ এ নেম আরভিং ওয়ালেস - দি সানডে জেনটলম্যান মিটিংস দ্যাট মেড হিস্টরি - অ্যান্ডমিটিংস.কম  
    উষ্ণতর ভবিষ্যৎ - স্বাতী রায় | অলংকরণ: রমিত আমাদের ছোটবেলায় নিয়ম ছিল পুজোর ছুটির পরে স্কুল খুললে আর নো ফ্যান। মার্চের পনেরো তারিখ অবধি ফ্যানের অ্যানুয়াল লিভ। আর এখন ? গত বছর তো ডিসেম্বর মাসের শেষেও আমার পশ্চিম-মুখী ঘরে ফ্যান চলেছে। আর মার্চ মাস অবধি অপেক্ষা সম্ভবই না, জানুয়ারির শেষেই ফ্যান চলবে কি চলবে না সেই নিয়ে এখন ঘোর দাম্পত্য কলহ শুরু হয়ে যায়। বিশ্ব জুড়ে উষ্ণায়নের জোয়ার এসেছে। কাজেই আমার রাজ্যই বা আর বাদ পড়ে কেন? জুন মাসের এক রাতে এই লেখাটা যখন লিখতে বসেছি, দেখছি কলকাতার তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি। কিন্তু সে শুধুই থার্মোমিটারের পারদ কতটা উঠেছে তার মাপ। তাই দিয়ে কিন্তু পুরো গল্পটা বোঝা যায় না। বাতাসের তাপমাত্রার সঙ্গে স্থানীয় আর্দ্রতা, বাতাসের গতিবেগ, আকাশে কতটা মেঘ করে আছে বা সূর্যের তাপ সরাসরি শরীরে কতটা পড়ছে – সব কিছু মিলিয়ে নির্ধারিত হয় যে এই পরিবেশে শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে গেলে শরীরকে কতটা পরিশ্রম করতে হবে। একটি আদর্শ পরিবেশের তাপমাত্রা কত হলে মানবশরীরে সেই একই পরিমাণ তাপীয় চাপ অনুভূত হবে সেটাই মূল হিসেব। আর একেই বলে ফিজিওলজিক্যালি ইক্যুইভ্যালেন্ট টেম্পারেচার বা PET। এই মাপের উপর নির্ভর করে মানুষ কোথাও কেমন থাকবে। এই যেমন এই মুহূর্তে বাতাসের তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি বলে আনন্দ পাওয়ার কিছুই নেই। কারণ এখন “ফিলস লাইক ৩৯ ডিগ্রি” – বেশ “ত্রাহি ত্রাহি” আবহাওয়া। নিজে গরমে খুব কষ্ট পাই বলেই জানতে ইচ্ছে হয়েছিল, ভবিষ্যতের বাংলায় আমাদের সন্ততিরা কেমন থাকবে? কিছুটা আভাস মিলল সৌরভ বল ও ইংগো কির্খনারের ২০২৩ সালের পেপার থেকে। সৌরভরা কলকাতার জন্য ধরেছেন যে ২৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৫.৭ ডিগ্রি অবধি স্লাইটলি ওয়ার্ম (সামান্য গরম বলি?), ৩৫.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪৩.৮৩ ডিগ্রি অবধি ওয়ার্ম (গরম) আর PET ৪৩.৮৩ ডিগ্রি ছাড়ালে সেটা হট (অসহ্য গরম বলি একে?)। ওঁরা বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গের ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ বাড়া মানে PET এর তার প্রভার পড়বে দ্বিগুণ। বিভিন্ন ক্লাইমেট মডেল ধরে ওঁরা হিসেব করেছেন যে বর্তমানের উচ্চমাত্রার গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে, এই শতাব্দীর শেষভাগে ২০৮০-২০৯৯ সালে শ্রীনিকেতন, আসানসোল, বীরভূম, মালদার মানুষদের বছরে ১০–১২.৫% (অর্থাৎ ৩৬ থেকে ৪৬ দিন) কাটবে অসহ্য গরমে। কলকাতা, দমদম, খড়গপুর, শিলিগুড়ির ক্ষেত্রে এই প্রখর দগ্ধকাল চলবে বছরে ২৩-৩২ দিন। তাঁরা আরও বলেছেন, যে শতাব্দীর শেষে শীতের শেষে ও বসন্তে (জানুয়ারি–এপ্রিল) গড় PET ৫–৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে। এমনকি বিপজ্জনক গ্যাসের নিঃসরণ যদি সবাই মিলে চেষ্টা করে নামিয়েও আনা যায়, তাহলেও জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের PET বাড়বে ২.৪ ডিগ্রি থেকে ৪.৮ ডিগ্রি। মধুর বসন্ত রইবে শুধু কবির কাব্যে। বাস্তব শুধুই দীর্ঘ দগ্ধ দিনের। আর আমাদের শরীরকে ক্রমাগত সহনমাত্রার উপরে টিকে থাকার পরীক্ষা দিতে হবে।ভবিষ্যৎ নাহয় বাদই দিলাম, বর্তমানের চেহারা কেমন? প্রখর তপন তাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে – শব্দগুচ্ছ এর থেকে ভালভাবে অনুধাবন করার এর থেকে ভাল সময় আর হয় না। গোটা বঙ্গের অবস্থাই ভীতিপ্রদ, কলকাতার অবস্থা যেন আরও বিপজ্জনক। Landsat-8 স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কলকাতার ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মেপেছেন মোহিত কুমার ও স্বাধীনা কোলে। তাঁরা দেখেছেন যে কলকাতার উত্তর-পূর্ব ও মধ্য-পশ্চিম অংশ সবচেয়ে বেশি গরম। কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চল তুলনামূলক ভাবে ঠান্ডা — কারণ সেখানে গাছপালা ও জলাশয় বেশি। তাঁরা জানিয়েছেন যে ২০২৪ সালের মে মাসে কলকাতার ৭-২৯ ও ৩৭-৪৭ নং ওয়ার্ডের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। নারকেলডাঙ্গা, ট্যাংরা, তিলজলা, মেটিয়াবুরুজ, খিদিরপুর, চিতপুর, কাশিপুরের মতন ঘন জন বসতি পূর্ণ এলাকাগুলোতে তাঁরা হটস্পট চিহ্নিত করেছেন। অয়ন চক্রবর্তী, শুভম লিমায়ে এবং আত্রেয় পাল ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের কলকাতা মেট্রোপলিটান এলাকার ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে ২০১৬ থেকে ২০২৪ এর মধ্যে এই এলাকার সর্বোচ্চ ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৪০.৮১ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৪১.৪৯ ডিগ্রি হয়েছে। মাত্র আট বছরেই এই পার্থক্য হলে, আগামীর ছবিটা ঠিক কেমন? তাঁদের হিসেবে যেখানে NDBI (Normalized Difference Built-up Index) এর মাত্রা বেশি, আর NDVI (Normalized Difference Vegetation Index) ও NDWI (Normalized Difference Water Index) এর মাপ কম, সেখানেই উষ্ণতা বেশি। তৈরি হচ্ছে আরবান হিট আইল্যান্ড। প্রসঙ্গত এটাও অবশ্য বলে রাখা ভাল যে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আর বাতাসের তাপমাত্রা কিন্ত এক জিনিস না। সাধারণভাবে সিমেন্ট, কংক্রিট বা পীচ বাতাসের তুলনায় তাপ শোষণ করে বেশি, ফলে বেশি গরম হয়ে ওঠে। এলাকায় বায়ু চলাচল ভাল হলে, বা অনেক গাছ পালা বা জলাশয় থাকলে, বাতাস তুলনায় কম গরম হয়। তবে সেসব কিছুই না থাকলে, তখন বাতাসের তাপ মাটির তাপের খুব কাছেই পৌঁছায়। এ অবশ্য কলকাতার বাসিন্দাদের রোজের অভিজ্ঞতা। ইঁট কাঠ বালির কাঠামোর মাঝে একটু সবুজের ও জলের ছায়া থাকলে জীবন যে অনেকটাই সহনীয় হয়, সেটা তাঁরা ভাল ভাবেই জানেন। খালি কথা হল, সকল অর্থনৈতিক স্তরের বাসিন্দাদের কী এই সবুজ বিলাসিতা আছে? আমার বড় হওয়া উত্তর শহরতলীর যে পাড়াতে, সেই পাতি মধ্যবিত্ত এলাকায় আমার যাতায়াতের পথে চোখে কটা বৃক্ষ পড়ত, সে বোধহয় এক হাতের আঙুলেই গোনা যায়। অবশ্য এই তাপমাত্রা বাড়ার সমস্যা আমরা যারা এসি বাড়িতে বাস করি, এসি গাড়িতে যাতায়াত করি, এসি অফিসে কাজ করি, তাদের ততটা নয়। অন্তত যতক্ষণ বিদ্যুতের বিলের যোগান দিতে পারা যাবে। যে কোন জলবায়ু বিপর্যয়ের মতোই এই চাপ প্রবল ভাবে গিয়ে পড়বে শহরাঞ্চলে মূলতঃ দুই শ্রেণীর মানুষের ঘাড়ে – এক, যারা শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সব সময়েই গণপরিষেবা দিতে নিয়োজিত, যেমন পুলিশ বাহিনী আর দুই নিম্নবিত্ত যারা পেটের টানে খোলা আকাশের নীচে কাজ করেন। অবশ্য মোকাবিলা করবেন আরেক দল মানুষ, নিম্নবিত্ত মেয়েরা, যারা বস্তিতে সামান্য জায়গায় জলের অভাব, স্যানিটেশনের অভাব নিয়ে সংসার করেন। ছোট্ট ঘরে, আগুন-তাতে তাদের রোজের কাজ করতে হয়, আবার স্রেফ মেয়ে হওয়ার দরুণ যাঁদের মধ্যে কারোর কারোর ঘরের বাইরে গিয়ে শরীর জুড়ানোর অধিকার থাকে না। বয়স্ক ও শিশুদের যেহেতু শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকে, তাই তাদের উপর প্রভাব পড়বে আরও বেশি। এছাড়া শহরাঞ্চলের বাইরেও যে দাবদাহ চলছে, আগামী দিনেও চলবে, ওই যে শ্রীনিকেতন, আসানসোল, বীরভূম, মালদার কথা সৌরভেরা তাদের পেপারে বলেছেন, তার প্রভাব পড়বে কৃষিজীবি থেকে শুরু করে সকলের উপরেই। এঁদের সকলকেই শারীরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে - প্রচণ্ড গরমে পেশিতে টান ধরা থেকে হিট স্ট্রোক অবধি সব কিছুর মোকাবিলা করতে হবে। প্রচণ্ড তাপীয় চাপে কিডনির উপর চাপ পড়বে, হৃদপিন্ডের কার্যক্ষমতা কমবে, ঘুমের মান কমবে। সব মিলিয়ে জীবন যাপন বিঘ্নিত হবে। গোদের উপর বিষফোঁড়া যে নিম্নবিত্তের বা নিম্ন-মধ্যবিত্তের চিকিৎসা করানোর ক্ষমতা থাকবে কতদিন? দেশের অর্থনীতিতেও কি কোন প্রভাব পড়বে না? Kjellstrom ২০০৯ সালে দেখিয়েছিলেন দিল্লির মে মাসের আবহাওয়ার দুপুরের তীব্র রোদে একজন ভারী কাজ করা শ্রমিকের কর্মক্ষমতা (Work Capacity) কমে মাত্র ২০%-এ দাঁড়ায়। অবশ্যই রাতের বেলা কাজ করা একটা সমাধান, কিন্তু হায় সব কাজকেই যদি রাতের কাজে বদলে দেওয়া যেত!সব কিছু মিলিয়ে ভবিষ্যৎটা কতটা মধুর হতে যাচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন। তবে এই জিনিসটা মোটামুটি নিশ্চিত যে প্রজন্মের জন্ম হবে ২০৬০ সালের পরের পশ্চিমবঙ্গে, তারা হয়ত মিউজিয়ামে গিয়ে খালি লেপ কম্বল দেখবে, আর দাদু-দিদার কাছে গল্প শুনবে যে তারা তাদের ছোটবেলায় ওই সব গায়ে দিয়ে ঘুমাতো। তারা অবাক হয়ে যাবে! পুনশ্চ – এই অবধি লিখেই ক্ষান্ত দেব ভেবেছিলাম। কিন্তু তারপর মনে হল, শুধুই একটা অন্ধকার ছবি দিয়ে শেষ করব? নাহ যে দেশে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারক মন্তব্য করেন যে “Show us even a single project in this country where these alleged environmental activists have said that we welcome this project. Country is progressing well, we welcome this project. Everything you drag to the court,” সে দেশে উন্নয়নের নামে জঙ্গল ধ্বংস, জলাভূমি বোজানো ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলে লাভ নেই। আর বিশ্বজুড়ে ক্ষতিকর গ্যাসের সার্বিক নিঃসরণ কমানো পুরোটা আমাদের হাতেও না। তাই সমস্যার সমাধান আমাদের আয়ত্বের বাইরে। সত্যি কথা বলতে কি, ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও করার তালিকা খুবই সীমিত। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া জিনিস কেনা বন্ধ করাটা একটা দীর্ঘমেয়াদী যাপন বদলের উপায়। যদিও সে নিয়ে একটা বহুব্যাপী আন্দোলন হয়ে ওঠার পথটাও সহজ না। আমাদের চারপাশের ভোগবাদী সমাজ সেটা সহজে মেনে নেবে কেন? তাছাড়া যেগুলো হাতে থাকে, সেগুলো সংকট নিরসনের না, সংকটে শুশ্রূষার ব্যবস্থা। নিজের বাড়িটিকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে তৈরি করা, বাড়িতে-পাড়ায় গাছ লাগানো, বাড়ির ছাদে প্রতিফলক রং (যা রোদ বা তাপ শোষণ না করে ফিরিয়ে দেয়) লাগানো, জলাশয় রক্ষা করতে এগিয়ে যাওয়া – এই সব ছোট ছোট কাজ করা যায়। তবে ব্যক্তির দৌড় আর কতটা! আজকের দিনে শহরের চৌহদ্দিতে বাড়ি করার জমিই দুর্লভ, তার উপর বিকল্প পদ্ধতিতে পরিবেশবান্ধব বাড়ি বানাতে চাইলেও সেটা আম-জনতা পেরে উঠবে না। তার জন্য উপযুক্ত জ্ঞান ভান্ডার, তৈরির মালমসলা, রক্ষণাবেক্ষণের স্কিল সকলের আয়ত্বে নয়। ছোট ছোট বদ্ধকূপের মত দশ ফুট বাই দশ ফুটের দুটি ঘর আর এক চিলতে বারান্দা এই তো এমনকি মধ্যবিত্তেরও বরাদ্দ। সে বারান্দায় লাগানো দেড় খানা পাতাবাহার আর এক খানা বেলি ফুলের গাছ দিয়ে তো আর প্রখর তপনতাপের মোকাবিলা করা যায় না। আর মধ্যবিত্তের এই হাল হলে, নিম্নবিত্তের পক্ষে কি আর তা আদৌ সম্ভব? আর রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিপ্রতীপতার দরুণ পাড়ায় বৃক্ষরোপন বা জলাশয় রক্ষা সত্যিই কতটা বাস্তবে সম্ভব, সে নিয়েও সন্দেহ থাকে। সত্যিকারের শুশ্রূষা দিতে পারে একমাত্র সরকারই। কলকাতায় কিছু কিছু এলাকায় বনসৃজনের কাজ হচ্ছে বটে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি অল্প। আর হটস্পট এলাকাগুলোর তাতে কি আদৌ কোন উপকার হচ্ছে? দরকার তো সমস্যা সমাধানের জন্য মানবিক ও দরদী নগর পরিকল্পনা। এলাকায় এলাকায় বনসৃজন, পুকুর খোঁড়া। তবে জীবিকার চাপে যে দেশে ফুটপাথ অবধি ঢাকা পরে যায়, আর সরকার কাজের মধ্যে কাজ করে পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, সে দেশে এইসব ভাবনার কোন মানে আছে কি? জায়গায় জায়গায় তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলছে, এখন আশু প্রয়োজন হিট একশন প্ল্যানের। আহমেদাবাদ কিন্তু ২০১৩ সালে হিট একশন প্ল্যান চালু করেছে। লোকের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে লোকদের সতর্ক করা, যারা বাইরে কাজ করেন বা বস্তিবাসী বা অন্যান্য অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য সাময়িক ছায়াশীতল জায়গার বন্দোবস্ত করা – এসব এই দেশেই করা গেছে। আমরা পারি না? রেফারেন্সঃBal, S.; Kirchner, I. Future Changes in Thermal Bioclimate Conditions over West Bengal, India, Based on a Climate Model. Atmosphere 2023, 14, 505. https://doi.org/10.3390/atmos14030505Kumar, M. and Koley, S.: Identifying temperature ‘hotspots’ for increasing urban resilience to heat stress in Kolkata, West Bengal, India, ISPRS Ann. Photogramm. Remote Sens. Spatial Inf. Sci., X-5/W2-2025, 333–339, https://doi.org/10.5194/isprs-annals-X-5-W2-2025-333-2025, 2025.Chakraborty, Ayan, Shubham Limaye, and Atreya Paul. 2025. “Spatio-Temporal Dynamics of LULC in the Kolkata Metropolitan Area (2016–2024): Insights from Landsat and MODIS Geospatial Data”. International Journal of Environment and Climate Change 15 (6):475-93. https://doi.org/10.9734/ijecc/2025/v15i64904.Kjellstrom T, Holmer I, Lemke B. Workplace heat stress, health and productivity - an increasing challenge for low and middle-income countries during climate change. Glob Health Action. 2009 Nov 11;2. doi: 10.3402/gha.v2i0.2047. PMID: 20052422; PMCID: PMC2799237.https://indianexpress.com/article/legal-news/single-project-welcomed-environmental-activists-supreme-court-10684921/https://www.nrdc.org/sites/default/files/ahmedabad-heat-action-plan-2018.pdf
    বিষণ্ণ আলপনা - মোনালিসা চন্দ্র | মূল ছবি: লেখিকা আট বছর আগের কথা। জীবনে প্রথমবার উত্তর আমেরিকায় পা দিতে চলেছি। ভিতরে উত্তেজনার গুরুগুরু রব। মহাদেশটি আমেরিকা হলেও গন্তব্য আমাদের কানাডা।দিল্লি থেকে চড়ে বসেছি বিমানে। সে পক্ষীরাজ ননস্টপ ষোল ঘন্টা উড়ান শেষে আমাদের নিয়ে গিয়ে ফেলবে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। সেখান থেকে দ্বিতীয় এক পক্ষীরাজ পৌঁছে দেবে আমাদের ফাইন্যাল গন্তব্যে। ভোর ছটায় দুগ্‌গা দুগ্‌গা করে দিল্লি থেকে শুরু হলো উড়ান। প্লেনে উঠে জানলার ধারে বসতে না পেলে আকাশে ওড়াই মাটি হয় আমার। ফলে টিকিট কাটার সময় আলাদা পয়সা গুণে জানলার ধারের সিট বাগিয়েছি। সেখানে গুছিয়ে বসে চোখ সেঁটে দিই জানলায়। প্লেন ছাড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যেই দিল্লি দূর অস্ত হয়ে গেল। প্লেন ঢুকে গেল মেঘের রাজ্যে। এইখানে পৌঁছে গেলে বেশিরভাগ মানুষ জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে রাখা টিভি স্ক্রিনে মন দেয়। আমার উলটোটা হয়। জানলায় মনযোগ তখন আরও বাড়ে আমার। জানলার বাইরের সাদা মেঘের রাজ্যটাকে দেখে মনে হয় রূপকথার দুধসাগর। আর নিজেকে লিটল মারমেইড। হ্যাঁ, পঞ্চাশ পেরিয়েও এই ফ্যান্টাসিটুকু ধরে রাখতে পেরেছি বলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াই। পক্ষীরাজ স্বদেশের সীমা পার হলেন উত্তর-পশ্চিম দিকে মুখ করে। তারপর পাকিস্তানকে বাঁদিকে রেখে, আফগানিস্তানের সীমানা ছুঁয়ে, তাজিকস্তান আর কিরিঘিজস্তান নামের ছোট ছোট দুটো দেশকে টপকে পড়লেন তিনি কাজাখস্তানের আকাশে। বলছি বটে, এটা পার হলেন, ওটা টপকালেন, তবে সেসব চোখে দেখে বুঝিনি। টিভির মনিটরে যাত্রাপথের ম্যাপ খুলে রেখেছি বলে জানতে পারছি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে দুধসমুদ্র একসময় হাপিস হয়ে যায়। চারদিকে তখন শুধুই নির্মেঘ আকাশ আর মহাশূণ্যের গাঢ় নীলিমা। নিচে তাকালে পঁয়ত্রিশ চল্লিশ হাজার ফুট নিচে পৃথিবীর বহুবর্ণ পৃষ্ঠপট। আমাদের যাত্রার দিনে দেখার ভাগ্য বড় ভালো ছিল। নিচে তাকিয়ে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম ‘পৃথিবীর ছাদ’ পামিরকে। আকাশ থেকে পামির গ্রন্থিকে এমন স্পষ্ট দেখতে পাওয়া এক লাইফটাইম অভিজ্ঞতা। তবে সে দৃশ্যের বর্ণনা করে এখন ফোকাস-চ্যুত হতে চাই না। আজ অন্য এক জিনিসের কথা বলতে এসেছি। কাজাখস্তান বড় দেশ, আয়তনে ভারতেরই মতো। তাকেও দু-আড়াই ঘন্টায় পার হয়ে পক্ষীরাজ এবার চললেন সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে। কখনো না গিয়েও সাইবেরিয়া বড় চেনা জায়গা আমার। আমাদের ছেলেবেলায় সোভিয়েত দেশের (আজকের রাশিয়া) নানান বই আর পত্রিকার অনুবাদ কী করে যেন অঢেল হাতে আসত আমাদের। দামে সস্তা, অথচ ছবিতে-লেখাতে অসাধারণ সেই সব বইয়ের কল্যাণে সাইবেরিয়া বড্ড পরিচিত হয়ে গেছিল আমার। সেই সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে উড়ে চলেছি ভেবে ওই বয়সেও গায়ে কাঁটা দিয়েছিল।একসময় সাইবেরিয়াকেও পার হয়ে পক্ষীরাজ, পা দিলেন আর্কটিক সার্কল বা উত্তর মেরুবৃত্তে। নিচে তখন আর্কটিক ওশান বা সুমেরু সাগর। যাত্রা শুরুর পর আট-দশ ঘন্টা কেটে গেছে তখন। এই সময়েই দেখা পেয়েছিলাম সেই আল্পনার, যার কথা আজ বলতে বসেছি। সুমেরু সাগর যখন পার হচ্ছি তখন চারিদিকে ‘চোখ যায় যদ্দূর, সোনা সোনা রোদ্দুর...’। নাহ, একটু ভুল হল, আসলে রুপো রুপো রোদ্দুর। ঝকঝকে নীলাকাশ থেকে ঠিকরে আসা রজতবর্ণ আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর। বিমানের ডবল কাচের জানলা চুইয়ে সে আলোর বন্যা ঢুকে যাচ্ছে বিমানের অন্তঃস্থলেও, যেখানে তখন সুষুপ্তির রাজ্য। সেই রাজ্যে আলো এক উপদ্রব। লম্বা ফ্লাইটের যাত্রীরা সাধারণত বিমানযাত্রার সময়টুকুর সদব্যবহার করে নেন নিদ্রা দিয়ে। যাদের নিতান্ত ঘুম আসে না তারা চোখের ওপর ‘আই মাস্ক’টি বেঁধে কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর ‘ধুত্তোরি’ বলে উঠে পড়ে নিজস্ব টিভি মনিটরটি খুলে বসে। সেখানে বেড়ে রাখা থাকে পঞ্চাশ ব্যঞ্জনের সম্ভার। তার কোনও একটাকে ধরে ‘খেতে’ থাকলেই কেটে যায় সময়। বাইরের তীব্র আলোর বন্যা যাত্রীদের সুষুপ্তির ব্যাঘাত ঘটায় বলে জানলার শাটার ফেলে রাখে সকলে। কিছু কিছু ‘হাইফান্ডা’র প্লেনে শাটারের বদলে জানলার নীচে থাকে একটা বোতাম, যেটাকে টিপে কাচটাকে প্রয়োজন মত হালকা থেকে গাঢ় নীল করে নেওয়া যায়। এতে করে বাইরেটা খানিকটা দেখাও যায় আবার বিমানে বেশি আলো ঢুকে পড়াটাও আটকানো যায়।কিন্তু আমার মত একজন ‘অকেশনাল ফ্লায়ার’, দুচোখে যার সর্বগ্রাসী খিদে, তার অমন ‘কম্প্রোমাইজড দেখা’য় চলবে কেন? যেটার যে রঙ তাকে সেই রঙেই তো দেখতে হবে আমাকে। অতএব জানলার কাচ নীল করি না আমি। বিমানবালারা বার তিনেক এসে ‘অনুরোধ’ করে নীল করে দিয়ে যায় জানলা। কিন্তু নীল কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরেটা দেখে সুখ হচ্ছে না বলে প্রতিবারই আমি কাচের রঙ ফের সাদা করে দিই। মনে মনে ঘুমন্ত লোকগুলোকে বলি, আর কত ঘুমুবি বাপু? ওঠ না এবার। মাটিতে থাকলে এখন তো কাজের জায়গায় নাকে দড়ি দিয়ে দৌড়তিস। বারকয়েক বিমানবালাদের সঙ্গে জানলা নীল সাদা করার লুকোচুরি খেলার পর দেখি আমার জানলা আর সাদা হচ্ছে না। বুঝলাম মুখের কথায় কাজ হচ্ছে না দেখে এবার তাঁরা অন্যভাবে টাইট দিলেন আমায়। এ জিনিস কন্ট্রোল করার একটা মাস্টার সুইচ নিশ্চয় আছে তাদের কাছে, সেখানেই কলকাঠিটি নেড়েছেন তাঁরা। অতএব উপায়ান্তর না দেখে নীল জানলা নিয়েই অগত্যা খুশি থাকতে হয় আমার দুখী মনুয়াকে। বিমানবালাদের দোষ দিই না আমি। সবাই চায় নিজের কাজ কমাতে। লোকে পড়ে পড়ে ঘুমুলে ‘চা খাব, জল খাব’ বলে জ্বালায় কম। অতএব আমার মত একটি দুষ্টু মধ্যবয়সিনীকে ঢিট করার জন্য ওটুকু ভদ্র চেষ্টা তারা করবেই। নীলকাচ সাদাকাচ নিয়ে এত ব্যাখ্যান কেন দিতে গেলাম, এবার সেই কথায় আসি। বিমানবালাদের প্যাঁচে পড়ে নীল কাচের মধ্যে দিয়েই বাইরেটা দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখি নিচে পৃথিবীর বুকে বিরাট এক আলপনা! নিচে তো সমুদ্র, সেখানে আলপনা দেবে কে! চশমার কাচ মুছে টুছে আবার দেখি। নাঃ, আলপনাই তো বটে! কাকে শুধোই? সঙ্গীটিকেই ঠেলে তুলি। তারপর দুজনে মিলে অনেকক্ষণ ধরে দেখি, তারপর বুঝি ওগুলো আলপনা নয়, ওগুলো বরফ। সমুদ্রে ভাসমান বরফ। গাঢ় নীল সাগরজলে ভাসছে সাদা সাদা বরফের ডেলা। হয়ত স্রোতের কারণে কিংবা বাতাসের প্রভাবে অথবা ওদের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া জাহাজের কারণে সমুদ্রে তৈরি হয়েছে ওইসব ‘আলপনা’। ওই আলপনার শোভা দেখতে গিয়ে, আর জিনিসটা কী বুঝতে গিয়ে এমন একাগ্র ছিলাম যে ছবি তোলার কথাটাই মাথায় খেলল না। অবশেষে যখন খেলল, তখন নীল কাচের জানলার ওপর হুমড়ি খেয়ে যতটুকু পারলাম ছবি তুললাম ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে বহু ভাল ভাল আলপনা পেছনে ফেলে চলে এসেছি। এইবার ওই ভাসমান বরফ, যাকে অভিহিত করা হয় ‘সী আইস’ নামে, তার বিষয়ে কয়েকটি কথা। অবস্থানগত বিশিষ্টতার জন্য সুমেরু সাগর বছরের অনেকটা সময় বরফের ‘সরে’ ঢাকা থাকে। বরফের সেই সরই হল - সী আইস। এ সরের বেধ সাধারণত দু থেকে চার মিটার হয়ে থাকে। সুমেরুতে যখন ‘সামার’, অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর, তখন সী আইস একটু একটু করে গলে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সেই ভাঙা টুকরোগুলো ভেলার মত ভাসতে থাকে সমুদ্রে। ভাসমান এই সী আইস কিন্তু আইসবার্গ নয়। আইসবার্গ বা হিমশৈল সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। মেরুপ্রদেশে জমে থাকা বরফের পাহাড় থেকে একটা চাঙড় কোনও কারণে ভেঙে সাগরের জলে ভাসতে থাকলে সেটা আইসবার্গ। আইসবার্গের খুব কম অংশ সমুদ্রের ওপর জেগে থাকে, বেশিরভাগটাই ডুবে থাকে সমুদ্রের নিচে। এই কারণেই বহু প্রচলিত প্রবাদবাক্যটির জন্ম, ‘এ আর কী দেখছ? এ তো জাস্ট ‘টিপ অব দা আইসবার্গ’’। অর্থাৎ বিপদের খুব অল্পই দেখতে পাচ্ছ, আসল বিপদ আরও অনেক বেশি ইত্যাদি। টাইটানিক ফিল্মের দৌলতে আইসবার্গ আজ আমাদের খুব চেনা নাম, কিন্তু সী আইস ততটা নয়। সী আইস সুমেরু সাগর বাস্তুতন্ত্রের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের এই বরফ আস্তরণ আসলে একটা আয়নার মত। সে আয়না খুব বড় একটা কাজ করে। সূর্যের তাপকে সে প্রতিফলিত করে ফেরত পাঠিয়ে দেয় মহাশূণ্যে। ফলে সুমেরুসাগরের জল ততটা তেতে উঠতে পারে না, যতটা সে তেতে উঠত এই তাপ সেজাসুজি সাগরের জলে পড়লে। তাছাড়া গরমকালে এগুলো যখন ভেঙে ভেঙে ভাসতে থাকে কিংবা গলে সমুদ্রে মিশতে থাকে তখন সমুদ্র স্রোতের নিয়ন্ত্রণেও এর ব্যাপক হাত থাকে। ভূমিকা থাকে মেরু ভল্লুক, সীল মাছ, ওয়ালরাসদের মতো প্রাণীদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারেও। এই ভাসমান বরফের তলায় একধরণের শ্যাওলা জন্মায়, যা এই বাস্তুতন্ত্রের আর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই সী আইসে এখন ঘুণ ধরেছে। তার কারণ, বহুশ্রুত আর ‘ক্লিশে’ হয়ে যাওয়া এক শব্দবন্ধ - ‘বিশ্ব উষ্ণায়ন’। এই শব্দবন্ধ কারও কাছে আজ আর অচেনা নয়, বরং অতি ব্যবহারে জীর্ণ। যত ধারালোই হোক, হাজার ব্যবহারে যে কোনও জিনিসের ধার কমে। এই শব্দেরও হয়েছে সেই দশা। শুনে শুনে কানে এমন ঘ্যাঁটা পড়ে গেছে যে বুকে আর ধাক্কা মারে না। কিন্তু বুকে ধাক্কা মারুক বা না মারুক, বিপর্যয় যা ঘটার তা ঘটেই চলেছে নীরবে নিভৃতে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে সুমেরু মহাসাগরের সী আইসের পরিমান শুধু যে কমে চলেছে তা নয়, তৈরিও তা কম হচ্ছে। শীতকালে যেটুকু তৈরি হচ্ছে গরমে তা সম্পূর্ণ গলে যাচ্ছে। ফলে ‘মাল্টিলেয়ার’ বরফ সর তৈরি হওয়ার অবকাশ পাচ্ছে না। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে যখন থেকে সুমেরু সাগর ও মেরু অঞ্চলগুলোর বরফের ওপর নজর রাখা শুরু হয়েছে, (গত শতাব্দীর সাতের দশক থেকে) তার ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ২০১৬-২০২৬ এর দশকটিতে সী আইস তৈরি হয়েছে সবথেকে কম। সী আইসের ঢাল সরে যাওয়ায় ক্রমাগত উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠছে মেরু সাগরগুলো। ফলে মেরুপ্রকৃতির হাল আজ অত্যন্ত বিপজ্জনক। বরফ ক্ষয়জনিত এই বিপর্যয় শুধুমাত্র মেরু অঞ্চলে আটকে থাকবে, একথা ভাবলে খুব ভুল করা হবে। এর ফল ভোগ করবে সমস্ত বিশ্ব। তাই এ বড় সুখের সময় নয়। ভয়ঙ্কর এ ভবিতব্য আটকানোও সহজ কাজ নয়। যাঁরা চেষ্টা করলে এ বিপর্যয় তবু খানিকটা কমাতে পারতেন, অর্থাৎ যাঁদের হাতে এই মুহূর্তে পৃথিবীর রাশ, তাঁরা কেউ এখনও নড়েচড়ে বসছেন না। কেন বসছেন না সে উত্তর খুঁজতে বসলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবার সম্ভাবনা। অতএব ও প্রসঙ্গ থাক। রাজনীতিকদের মাথা ঘামানোর বিষয়ের তালিকায় ‘পরিবেশ’ সবসময়েই যে একেবারে শেষের সারিতে থাকে এটা বুঝতে বুদ্ধিমান হতে হয় না। গ্রেটা থুনবার্গেরাই কেবল গলা ফাটিয়ে মরে।জানি না আজ আবার যদি পক্ষীরাজের পিঠে চেপে জুন মাসে সুমেরুসাগর পেরোতে যাই, সমুদ্রের বুকের সেই চোখজুড়োনো আলপনা আবার চোখে পড়বে কিনা, কিংবা পড়লে কতটা পড়বে। সঙ্গে রইল নীল কাচের বাধা ডিঙিয়ে বিমান থেকে তোলা বিষণ্ণ সুন্দর সেই ছবিগুলোর কয়েকটি...
  • হরিদাস পালেরা...
    বড় হওয়ার বিপদ - Amit Chatterjee | বাতাস তখন অন্যরকম একটু কড়া একটু মিঠে।সুয্যি মামা দিচ্ছে হামাছড়িয়ে আগুন মেঘের পিঠে।গাছেরা রয়েছে চুপটি করেওদের মনে দুঃখ ভারি।একে একে বন্ধুরা সবদূরের দেশে দিচ্ছে পাড়ি!দিস না ছায়া মানুষকে আর,হিজল বলে, বট কে ডেকে,কত কিছুই দিচ্ছি তবুপাচ্ছি দুঃখ ওদের থেকে।আমরা সবাই মানুষকে দিইফল ফুল আর মাথায় ছায়া।গাছ কেটে তাও বসত গড়েওদের মনে নেই তো মায়া।পাতার ফাঁকে পাখ-পাখালি।গাছকে ডেকে মন্ত্রণা দেয়।দিস না ছায়া মানুষকে আরওরা শুধুই যন্ত্রণা দেয়!চেয়ে থাকে অবাক চোখেছাগ-শিশু আর গাছের চারা,জানেনা তো বাড়লে বয়েসমাথার ওপর ঝুলবে খাঁড়া! 
    আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস - আজ সংকল্প গ্রহণের দিন  - Somnath mukhopadhyay | সাতসকালে হৈ চৈ শুনে বাইরে বেরিয়ে আসতেই মালুম হলো হট্টগোলের কারণটা। আমার প্রতিবেশী এক মায়ে–পোয়ে আলাপন চলছে, তবে কিনা একটু উচ্চগ্রামে। আর সে জন্যই কথাগুলো ঘরের চৌহদ্দি উপচে এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে ঢেউয়ের মতো। অন্যের কথা শোনা গর্হিত জেনেও বলছি, আসুন চুপচাপ ওদের কথায় কান পাতি। – “সব কিছুই একটা নিয়ম মেনে চলে। সেই নিয়ম ভাঙার খেলায় যদি তুই এখন থেকেই মেতে উঠিস, তাহলে তো আমাদের বাড়ির কোনো শৃঙ্খলাই আর অবশিষ্ট থাকবে না। প‌ইপ‌ই করে তোকে কতবার বারণ করেছি, অথচ তুই রোজ নিয়ম করে এই শৃঙ্খলা ভেঙে চলেছিস। আমার‌ও তো সহ্য করার একটা সীমা আছে! কত কষ্ট করে একটা ছোট্ট বাগান করেছিলাম, তোর খেলার জায়গা ছোট হয়ে যাচ্ছে বলে সেখানকার গাছগুলোকে সব ছারখার করে ফেললি। বাগানের একপাশে কায়দা করে রাজমিস্ত্রিকে দিয়ে ছোট্ট সুন্দর একটা বাঁধানো পুকুর মতো করেছিলাম যাতে কয়েকটা রঙিন মাছ ছাড়বো ভেবে। সেটাকেও নষ্ট করে ফেলেছিস। রাজ্যের আবর্জনা ফেলে তার হাল এখন রীতিমতো বেহাল, অমন নোংরা পচা জলে মাছেরা বাঁচে কখনো? বাড়িতে দু দুটো নীল আর সবুজ রঙের বালতি রাখা রয়েছে ময়লা আবর্জনা তুলে ফেলার জন্য। সেসবে কোনো হুঁশ নেই। সামান্য ময়লা তুলে ফেলতে গিয়ে তুই এই বালতির ময়লা ওই বালতিতে আর ওই বালতির ময়লা এই বালতির ভেতর ফেলছিস। এগুলো কি তুই ইচ্ছে করে করিস? কেন বুঝতে চাস না যে নিয়ম অনুযায়ী চললে আমরা সবাই ভালো থাকি, সুস্থ থাকি, স্বস্তিতে থাকি। যতদিন সত্যিকারের ছোট ছিলি, কাঁথায় মোড়া অবস্থায় শুয়ে থাকার বয়সে, ততদিন বেশ শান্তিতে ছিলাম সবাই। সকাল সকাল ভরপেট দুধ খাইয়ে, দুটো আলতো চাপড় দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতাম। কোনো চাপ ছিলনা। বাড়তি কাজের জন্য কত সময় থাকতো হাতে। আর এখন? তোর্ এই দস্যিপনার দাপটে সবকিছু তোলপাড়! আজ এটা ভাঙছিস্ তো কাল ওটা! তোর এই দস্যিপনার জ্বালায় বাড়িসুদ্ধ সব লোকজনের একেবারে পাগলপারা অবস্থা। আশপাশের বাড়িতেও যে তোর্ মতো দাদাগিরি করার ছেলেপুলেদের ভিড়! সবার মুখেই এক কথা – আর তিষ্টোতে পারছিনা। সব নিয়মকানুন নেড়ে ঘেঁটে একসা করে দিচ্ছে ! কেন তোরা বুঝিসনা যে এতোদিনের নিয়ম শৃঙ্খলার বাঁধন টুকু থাকার জন্য‌ই তো আমরা বেঁচে বর্তে আছি।” উচ্চগ্রামের কথোপকথন একতরফা হলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, আজ মায়ের মেজাজ একেবারে তুঙ্গে চড়ে আছে। আমরা কানাকানি করি – “সত্যিই ছেলেটা বড্ড বাড় বেড়েছে। বসুধার মতো রীতিমতো শান্ত শিষ্ট, সর্বংসহা মহিলার এমন রূপান্তর তো ভাবাই যায়না।”   ২.প্রভাতী আখ্যানের আপাতত এখানেই পরিসমাপ্তি। এবার যে যার কাজে লেগে পড়ি ঝটপট। তবে মাথার মধ্যে পাক খেতে থাকে মা বসুধা আর ছেলে মানবের কথোপকথনের খণ্ড খণ্ড পর্বগুলো। এই মুহূর্তে আমাদের পৃথিবীর সামনে সবথেকে বড়ো সমস্যা হলো বদলে যাওয়া বাতাবরণের সমস্যা। বসুধার কথা মতো মানব যতদিন কাঁথায় মোড়ানো জীবনে অভ্যস্ত ছিল, ততদিন বাড়ির শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো কোনো সমস্যার অস্তিত্ব ছিলোনা। গোল বাঁধলো সেদিন থেকে যেদিন ছোট্ট অসহায় মানব নিজের ইচ্ছে অনুসারে সবকিছুর ওপর নিজের দখলদারি কায়েম করতে উদ্যোগী হলো। এই এগিয়ে যাবার প্রবণতাটা একদমই সহজাত। প্রতিবেশী মানবকটি যে কারণে তার মায়ের কায়েম করা শৃঙ্খলার বেড়ার ভেতরে থাকতে চায়না, মায়ের দেওয়া বিধি নিয়মের বাইরে বেরিয়ে আসাতেই বুঝি তার আনন্দ, ঠিক একই ভাবে মানুষের অগ্রযাত্রার ইতিহাস তৈরি হয়েছে ওই নিয়ম ভাঙার খেলার মধ্য দিয়েই। এটাই যদি স্বাভাবিক হয়ে থাকে তাহলে হৈচৈ করছে কেন সবাই?    ৩.এখানেই নিহিত আছে আরও এক আখ্যান। বাড়ির মানবকটিকে নিজের নিয়মের বশে রাখতে মা প্রয়োজনমতো শাসনের শস্ত্র ধরেন, তাতে করে মানব কিছুদিনের জন্য সমঝোতার পথ বেছে নেয় বটে, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে নিয়ম ভাঙার খেলার অলিগলিতে। কিন্তু প্রকৃতি মা তো তেমনটি করেন না। আমাদের কাজের ঔচিত্য আর অনৌচিত্য নিয়ে মুখর হননা। তাহলে? তিনি নিরন্তর সংকেত পাঠান আমাদের উদ্দেশ্যে। তার তন্ত্রগুলোর বিচলন তাঁকেও বিচলিত করে।আর তাই আমাদের সতর্ক করেন নানান উপায়ে, নানান আঙ্গিকে। বাড়ির মায়ের মনোগতির হদিস যেমন পাই তাঁর মুখ ভঙ্গিমায়, ভ্রু যুগলের বিচিত্র বিভঙ্গে, চোখের গহীন চাউনিতে ঠিক তেমন‌ই প্রকৃতির মনের অবস্থার ইঙ্গিত মেলে গ্রীষ্মের অসহনীয় দাবদাহে, বর্ষার বিলম্বিত আগমনে, অতি বর্ষণের কারণে নদীর কুলপ্লাবি বন্যায়, বৃষ্টিহীনতার কারণে সংঘটিত প্রলম্বিত খরায়, বিধ্বংসী অরণ্যগ্নির উদ্দাম বহ্ন্যুৎসবে, যুগ যুগ ধরে মেরু অঞ্চলের সঞ্চিত সুবিশাল হিম স্তূপের আকস্মিক গলনে,আপন স্ফূর্তিতে বেড়ে ওঠা সমুদ্র সলিলের উন্মত্ত তরঙ্গে। আমরা এই সব সংকেতকে বুঝেও না বোঝার ভাণ করে এড়িয়ে যেতে চাই নিজেদের অবিমৃষ্যকারিতার কারণে। আর তাই দিকে দিকে ভাঙনের মাতন। প্রাকৃতিক তন্ত্রের বিনাশী বিশৃঙ্খলা।  ৪.বহু সহস্র বছর ধরেই আমাদের ধরিত্রী মা প্রত্যক্ষ করছে বাতাবরণের পরিবর্তন। একটা জ্বলন্ত অগ্নি পিণ্ড ধীরে ধীরে শীতল হলো। বাইরের আবরণীটি কঠিন হলেও তার ভেতরের অংশ আজ‌ও অগ্নিগর্ভা। এই শীতলীকরণের ফলে বেরিয়ে আসা গ্যাসীয় উপাদানগুলো নানান পরিবর্তনের পথ বেয়ে একসময় প্রাণবিকাশের উপযোগী হয়ে উঠলো। এই বিবর্তনের প্রতিটি পর্বেই পৃথিবীর গ্যাসীয় আবরণীর বিচিত্র লীলাখেলা প্রত্যক্ষ করেছে পৃথিবী। তাকে সমঝে চলার জন্য সতর্কবার্তা, কার্যক্রমের লক্ষ্য আর লক্ষ্য পূরণের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বারংবার। আমরা সে সব কথায় কান দিইনি। অনর্থক হৈচৈ করেছি, গড়িমসি করেছি, কোন্ পথে সমস্যার সমাধান হবে তা নিয়ে অযথা বাগারম্বর করেছি, অবহেলা করেছি বাতাবরণের ভারসাম্য রক্ষার কাজকে। আর এসবের কারণেই আজ বিপদের প্রান্ত সীমায় এসে পৌঁছেছে আমাদের বাসভূমি, আমাদের সবার পৃথিবী।  ৫.আজ কিন্তু আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, সত্যিকারের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে বলা হয়েছিল যে আমরা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেঁধে রাখবো শিল্প বিপ্লবের সময়ের তাপমাত্রার সাপেক্ষে। সেই সীমারেখা অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে চলেছি নতুন এক লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করতে। এই পরিস্থিতি আমাদের বিপদের ঝুঁকিকে যে আরও বাড়িয়ে তুলবে তা বলা বাহুল্য। জলবায়ুর শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হ‌ওয়ার অর্থ‌ই হলো আমাদের বাসভূমির এতো কালের প্রাণময় জীবনধারা স্তব্ধ হয়ে যাওয়া – এমন পরিণতি কখনোই আমাদের কাছে কাম্য নয়।  ৬.পৃথিবীর বর্ধমান উষ্ণতার আশু বিপদের কথা মাথায় রেখে প্রকৃতি পরিবেশের হাহাকার ধ্বনির প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে, আরও নিমগ্ন হয়ে শুনতে হবে, বুঝতে হবে প্রকৃতির অনুচ্চারিত সংকেতবার্তা। পরিবেশকে পরিশোধনের আয়োজন শুরু হয়েছে গোটা দুনিয়া জুড়েই। নতুন বিধিনিয়মের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটু করে এক সমান্তরাল বিকল্প যাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে বিশ্ববাসী। এদেশেও তার আভাস মিলছে ধীরে ধীরে। প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানি উৎসের পরিবর্তে টেকস‌ই সবুজ শক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে – বাড়ির ছাদে ছাদে বসছে সৌর বিদ্যুতের প্যানেল, দিগন্ত রেখায় মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে আধুনিক বায়ুকল। নতুন নতুন পরিবেশ বান্ধব চিন্তা ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক বসতি, যার ভিত্তি হলো বাস্তুতান্ত্রিক সহাবস্থানের মৌলিক আদর্শ। এই ব্যবস্থা হয়তো আগামীদিনে শহুরে তাপ দ্বীপের পরিসরকে অনেকটাই সংকুচিত করবে। বিকাশ আর উন্নয়নের নামে উজাড় হয়ে যাওয়া ধূসর প্রান্তরগুলো আবারও ফিরে পাচ্ছে তাদের হারিয়ে যাওয়া হরিয়ালি। এক্ষেত্রে ব্যষ্টিক প্রয়াস কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাপিয়ে যাচ্ছে সামুহিক উদ্যোগকেও। এ বড়ো আশার কথা, এ বড়ো সুখের কথা। দেরীতে হলেও দুনিয়া জুড়েই এক ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সবটাই শেষ হয়ে যাবার মতো নয়। ৭.আজ ৫ জুন, ২০২৬। সারা পৃথিবী জুড়েই আজ উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এই বছর ( ২০২৬ ) বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ হলো রিপাবলিক অফ আজারবাইজান। রাজধানী বাকুতে এই অনুষ্ঠানের সূচনা করা হবে। পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের সন্ধিস্থলে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার এই দেশটি তার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুগত বৈচিত্র্যের কারণে এক সম্পন্ন জীববৈচিত্রের অধিকারী। ২০১৫ সালের প্যারিস পরিবেশ চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ রূপায়ণের ব্যাপারে এই দেশটি অত্যন্ত সদর্থক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক দ্বন্দ্বের নীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে এক সুস্থিত, টেকস‌ই জীবন যাপনের অবসর তৈরি করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে এই দেশটি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক হিসেবে আজারবাইজানকে বেছে নেওয়ার পেছনে পরিবেশ রক্ষায় দেশটির অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকার খুব বড়ো ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ৮.হালফিল সময়ে আজারবাইজানের সরকার দেশটিকে এক নতুন সাজে সাজানোর কাজ করে চলেছে নিরলসভাবে। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বৈচিত্র্যময়তাকে অক্ষুন্ন রেখেই চলছে আগামীদিনের সুস্থিত রাষ্ট্র গড়ার কাজ।দেশটিতে খণিজ তেলের বিপুল ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশে সবুজ অর্থনীতি এবং অচিরাচরিত শক্তি উৎসকে আরও বেশি করে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সে দেশের সরকার। পরিবহন পরিষেবায় আনা হয়েছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। পেট্রোল বা ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের বদলে আনা হয়েছে ইলেকট্রিক ভেহিকল। কৃষি, শিল্প, নগরায়ন – সব ক্ষেত্রেই আধুনিক টেকস‌ই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এইসব কার্যক্রম দেশের সার্বিক উন্নয়নের সাথে সাথে পরিবেশ বান্ধব যাপনের অঙ্গীকারকে সত্যি সত্যিই অর্থবহ করে তুলছে। দুনিয়াজোড়া পরিবেশ আন্দোলনের ক্ষেত্রে আজারবাইজান আজ এক সম্ভ্রান্ত রাষ্ট্রের নাম। যোগ্য দেশের হাতেই ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। ৯.পরিবেশ নিয়ে সারা বিশ্বে আজ যে নতুন করে ভাবনার মন্থন তার পেছনে ভারতের একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৪ জুন তারিখে সংযুক্ত রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে সুইডেনের স্টকহোম শহরে আয়োজিত পৃথিবীর প্রথম পরিবেশ সম্মেলনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এক মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়েছিলেন। তার সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়কদের পরিবেশ ভাবনা নতুন খাতে ব‌ইতে শুরু করে। পরিবেশের অবনমন নিয়ে টনক নড়ে গোটা দুনিয়ার।এই বছর কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ দপ্তর মিশন লাইফ শীর্ষক যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তার অন্যতম অঙ্গ হলো এক পেড় মাকে নাম অর্থাৎ মায়ের নামে একটি করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ। নাগরিকদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানো হয়েছে ওই দিনটিতে মায়ের নামে একটি করে গাছ লাগানোর। আশা করছি এই কর্মসূচি সফল হবে। রেকর্ড সংখ্যক গাছ লাগানো হয়েছে – এমন ঘোষণা করেই যদি কর্মসূচির সফল রূপায়ণের দাবি তোলা হয় তাহলে কিন্তু এই মহতী উদযাপনের মূল উদ্দেশ্যটাই বিফলে যাবে। মাথায় রাখতে হবে এই দেশের মায়েরাই একদা ঘাতকদের কুঠারের সামনে দাঁড়িয়ে গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে রেখে চিপকো আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। আজ পৃথিবী বিপন্নতার প্রান্ত সীমায় এসে পৌঁছেছে। পৃথিবীর বাতাবরণ আজ কলুষিত। আমাদের কৃত কর্মের ফলেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাকে আবার বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হলে প্রকৃতির শাশ্বত অনুশাসনের নিবিড় অনুশীলন করতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই। ১০.শেষ করবো মহাভারতের অনুশাসন পর্বের কথা দিয়ে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। লোকক্ষয়,প্রিয়জন হানি, বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয় – এসবের মধ্য দিয়ে। শাসনের অধিকার অর্জন করেও একফোঁটা শান্তি নেই যুধিষ্ঠিরের মনে। ব্যাসদেবের পরামর্শে যুধিষ্ঠির শরশয্যায় শায়িত পিতামহ ভীষ্মের কাছে গেলেন সদুপদেশ লাভের জন্য। তিনি তখন‌ও দক্ষিণায়ণের শেষে উত্তরায়ণ পর্বের সূচনার অপেক্ষায় ছিলেন। ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে কতগুলো অনুশাসনের কথা বললেন। আমাদের বেহিসেবী জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আজ নতুন অনুশাসনের শৃঙ্খলায় বাঁধতে হবে। প্রিয় ধরিত্রী আজ সংকটের শরশয্যায় শায়িত। এমন পরিণতির জন্য দায়ী আমরাই।তাই তাকে আবার বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হলে যথার্থ পরিবেশানুগ যাপনে নিজেদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আজ কান পেতে ধরিত্রীর মর্মবাণী শোনার সময় এসেছে। আমরা যেন সজাগ হ‌ই। সোমনাথ মুখোপাধ্যায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস ৫ জুন, ২০২৬
    আরবিআই কি সোনা বিক্রি করেছে? তথ্য, ফাঁক, এবং প্রশ্ন - উদ্দালক | কী ঘটেছে?২ জুন ২০২৬ - ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের সিনিয়র ইন্ডিয়া ইকোনমিস্ট অভিষেক গুপ্ত একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। তাঁর অনুমান মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে, একই সাথে প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ কিনেছে। কারণ হিসেবে বলেছেন পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতজনিত চাপে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানো। [1]৩ জুন, আরবিআই পাল্টা বিবৃতি দেয় যে এই প্রতিবেদন সঠিক নয়। সোনার "physical stock" ৮৮০.৫২ টনে অপরিবর্তিত। সরকারের তরফেও পিআইবি ফ্যাক্ট চেক এই খবর "মিথ্যা" বলে চিহ্নিত করে। আরবিআই-এর দাবি বৈদেশিক মুদ্রা মজুতে সোনার অনুপাত বরং বেড়েছে: সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ১৩.৯২%, মার্চ ২০২৬-এ ১৬.৭০%, মে ২০২৬-এ ১৬.৮৫%। [2]যেখানে প্রশ্ন থেকে যায়আরবিআই-এর মাসিক বুলেটিনে বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের তথ্য আছে ২৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ ৮ থেকে ২২ মে পর্যন্ত। মাঝখানে প্রায় একমাসের তথ্যগত ফাঁক।[3]আরবিআই অবশ্য বলেছে ৮৮০.৫২ টন "as on date" — অর্থাৎ আজকের তারিখেও অপরিবর্তিত। কিন্তু এটি একটি বিবৃতি, প্রকাশিত ডেটা নয়। পাশাপাশি, আরবিআই-এর ২৯ মে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২২ মে সপ্তাহে মোট বৈদেশিক মুদ্রা মজুত ৭.৫১ বিলিয়ন ডলার কমে ৬৮১.৩৮ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।[3]আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় - আরবিআই সুনির্দিষ্টভাবে "physical stock" শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা "physically" না বিক্রি করেও গোল্ড সোয়াপ, গোল্ড লেন্ডিং বা ডেরিভেটিভের মাধ্যমে ডলার লিকুইডিটি জোগাড় করতে পারে। ফিজিক্যাল টন অপরিবর্তিত থাকা আর সোনা দিয়ে কোনো আর্থিক লেনদেন না হওয়া এই দুটি এক কথা নয়।যদি সত্যি হয়, তাহলে এর তাৎপর্য কী?সোনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শেষ আশ্রয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মুদ্রা রক্ষায় আগে বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ বিক্রি হয়। সোনায় হাত পড়া মানে ডলারের বাফার আর যথেষ্ট নয়।গত কয়েক বছরে ভারত ডলার-নির্ভরতা কমাতে ধারাবাহিকভাবে সোনা কিনে মজুত বাড়িয়েছে। সেই প্রবণতা উলটে গেলে বার্তাটি গুরুতর। অর্থনীতি যতটা স্বাভাবিক দেখানো হচ্ছে, বাস্তব ততটা স্বাভাবিক নয়।লক্ষণীয়, আরবিআই এবং অর্থ মন্ত্রণালয় উভয়েই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।আরবিআই এর মে মাসের বুলেটিন প্রকাশিত হলে ছবি স্পষ্ট হবে।সূত্রনির্দেশ[1] Bloomberg — "RBI May Have Sold Gold to Save FX Reserves" (২ জুন ২০২৬) — https://www.bloomberg.com/news/articles/2026-06-02/rbi-may-have-sold-gold-to-save-foreign-reserves-be-report-shows[2]Business Standard — "RBI dismisses gold sale rumours" (৩ জুন ২০২৬) — https://www.business-standard.com/economy/news/rbi-dismisses-gold-sale-rumours-physical-reserves-steady-at-880-52-tonnes-126060300452_1.html[3] Upstox News — "RBI rejects reports of gold reserve sale" (৩ জুন ২০২৬) — https://upstox.com/news/business-news/financial-regulations/rbi-rejects-reports-of-gold-reserve-sale-says-physical-stock-unchanged-at-880-52-tonnes/article-194723/
  • জনতার খেরোর খাতা...
    মনপলাশীর ধারাস্নান - Manali Moulik | তুমি বলেছিলে, শাল-মহুয়ার ছায়া মেলাক দূরেপলাশ ফোটা প্রান্তর আচ্ছাদিত থাক নববধূর লাল চেলীর সাজে।মাঝে‍ যদি রাধাচূড়া তাকে গোটাকয়েক স্বর্ণালঙ্কার পরায়,তবে তো অভিমানের কিছু নেই।তবু বিকেলের ফেরিওয়ালার ডাকের সঙ্গে মিশে যায় বালিকার কাঁচের চুড়ির কামনা-কঙ্কনা?মায়াকোভস্কির শেষ সাতদিনের কথা মনে পড়লে এখনো সোভিয়েত অনুবাদ খোঁজো? গ্রীষ্মের ছাপোষা-দুপুরের জাদুমন্ত্রে একা হতে হতেদাঁতে দাঁত চেপে পণ করেছিলে, “অন্তরবাহিনী নদী হবো। মরুচারিণীর জীবন, মিলনমৃত‍্যু বালুস্তরে। উৎস আর মোহনা খুঁজে খুঁজে মরুক ভূতাত্ত্বিকের দল!” কুলটা চাঁদ হেসেছিলো চকোর-সইয়ের সঙ্গে ছড়া গেয়ে, “বুকে পাথরের ইতিহাস ছাড়া কি নদী হওয়া যায়, মেয়ে?”
    ভালো বিরোধী - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | পশ্চিমবঙ্গে যেমন দুগ্গাপুজো করতে দেওয়া হতনা, সেইরকমই সম্ভবত ছাত্রছাত্রীদের সিবিএসইতে পড়তে দেওয়া হতনা, নিটে বসার তো প্রশ্নই নেই। সেই জন্যই কলকাতার বিরাট বিরাট মিডিয়ায় নিট বা সিবিএসই নিয়ে কোনো খবর নেই। তাতে অবশ্য কোনো ক্ষতি হয়নি, কারণ কলকাতায় সাংবাদিকতা আর রাজনীতিটা দুর্ধর্ষ হয়। সেখানে নানারকম নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েই চলেছে। বিরোধী দলের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পরপর দুবার দুটো পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছেন। তারপর কোন একটা দলের নেতা হয়েছেন, সেটা কী কেউ জানেনা। চিত্রতারকা দেব তৃণমূলের প্রচারে প্রচুর ঘাম ঝরিয়ে হেরে যাবার পর বলেছেন তৃণমূল জিতে গেলে সব্বোনাশ হত। গ্রিক ট্র‌্যাজেডির চেয়েও বড় ট্রাজিক চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছেন জয়প্রকাশ মজুমদার। বিজেপিতে গিয়ে তিনি তৃণমূলের লাথি খেয়েছেন, তৃণমূলে গিয়ে অতিবামদের লাথি খেয়েছেন, কিন্তু পৃথিবীতে কোনো ন্যায় নেই বলে সবশেষে গ্রেপ্তার হয়ে গেছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যে তারকাদের ডান এবং বাম দিকে নিয়ে ঘুরতেন, সেই রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জুন মালিয়ারা কোথায় গেলেন, সেটা অবশ্য জানা যাচ্ছেনা। ওদিকে মিডিয়ায় নির্বাচনোত্তর হিংসা বলতে কেবল দেখানো হচ্ছে বিরোধীদের। এই প্রথম ভোটে হেরে বিরোধীরাই সন্ত্রাস করছে, বিরোধীরাই অপকর্ম করছে, বিরোধীরাই শিরোনামে। সরকার নিয়ে অবশ্য বলার কিছু নেই। মুখ্যমন্ত্রী তিনদিন অন্তর দিল্লি দৌড়চ্ছেন। অনেক কষ্ট করে এক মাস বাদে একটা মন্ত্রীসভা বানিয়েছেন, ব্যস কাজ খতম। এখনও দপ্তর-টপ্তর ভাগাভাগি করা হয়নি। ওসব ফালতু কাজে কে সময় দেয়। সরকারের আসল কাজ হল অর্ধেক বিরোধীকে জেলে পোরা, আর বাকি অর্ধেককে জেলে ঢোকানোর ভয় দেখিয়ে নিজেদের দিকে নিয়ে আসা, সেটা তো হয়ে গেছে। এরকম আগে বাংলাদেশ-পাকিস্তানে হত, ভারতবর্ষে এই প্রথম। বিশ্বে ১৫৭ নম্বর র‌্যাঙ্কে থাকা মিডিয়া বলছে ওইটাই গণতন্ত্র। এখন হকার হটানোর নাম হয়েছে রাস্তা পরিষ্কার। লোক জড়ো করে ইট ছোঁড়ার নাম হয়েছে ডিম-ছোঁড়া, পচা ডিমের দাম নিয়ে গম্ভীর প্রতিবেদনের নাম হয়েছে খবর। বিরোধী দলের লোকেদের ঠ্যাঙানোর নাম হয়েছে গণরোষ। রাজনৈতিক গ্রেপ্তারের নাম হয়েছে দুর্নীতিদমন। কিন্তু সেটায় তেমন জমছেনা বলে চারদিকে পাওয়া যাচ্ছে খাট আর কন্ডোম। রাম-বামরা সেই দেখে দু-হাত তুলে নাচছেন। ভুলে গেছেন, এই কন্ডোম পাওয়া শুরু হয়েছিল জেএনএউ থেকে। উমর খলিদ এইরকমই গ্রেপ্তার হয়ে এখনও মুক্তি পাননি। এটা অবশ্য নতুন রেকর্ড না। নিজের পশ্চাদ্দেশে কদিন পরেই বাঁশ ঢুকবে ভুলে গিয়ে দেশভাগের সময়ও বাঙালি ভদ্রজন এইভাবেই দুহাত তুলে নেচেছিল। মোট কথা সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের অবস্থা দুর্ধর্ষ। ডলার ১০০ ছুঁতে চলেছে, কোন এক নেত্রী বলেছেন ১০০ তো কেবল এক সংখ্যামাত্র। মার্কো রুবিও বলেছেন রাশিয়া থেকে তেল কেনার সুখের দিন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করতে হবে। তাতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ সব বিরোধীপক্ষই এখন ভালো বিরোধীপক্ষ। হুমায়ুন কবীর মহামেডানের মাথা হয়েছেন, নৌশাদ সিদ্দিকি আইন মেনে গোরক্ষা করতে বলছেন, মুস্তাফিজুর নির্ভয়ে অন্নপূর্ণার ফর্ম ভরতে বলছেন, আর ঋতব্রত বলছেন গঠনমূলক বিরোধিতা করতে হবে। হকারদের নিয়ে একটু চেঁচামেচিও করতে দেওয়া হচ্ছে, সিবিএসই ইশকুলের অভিভাবক বা গর্গ চাটুজ্যের মতো গ্রেপ্তার করা হচ্ছেনা। ফলে দেখাই যাচ্ছে গণতন্ত্র অক্ষত আছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই। সর্বত্র শান্তিকল্যাণ।
    জীবন বিশেষত - Srimallar Speaks | জবাব দাও লিখতে না জানলেও, লেখার চেষ্টা করতে থাকে যারা— তাদেরই মধ্যে আজ দেখতে পাচ্ছি, শ্রীমল্লারকিশোর। যারা প্রাক্তনবান্ধবীর প্রশংসাকে পৌরসভার ময়লা নিতে আসার গাড়িতে তুলে দেয় আর গণ্ডির বাইরে না বেরোতে পেরে, বাবা-মা’র দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করে— ‘কেন জন্ম দিয়েছিলে আমাকে? জবাব দাও!’   প্রশংসা আর ক্ষতি‘না রে আমার জীবনানন্দ পড়া হয়নি। দিব্যেন্দু পালিত অল্প অল্প জানি। এসবের বাইরে সিলভিয়া আর এলিয়ট আমার কাছেরপ্রিয়। আর তোর কবিতা পড়ছি। নতুন রকমের ভাবনা আর ছন্দ নিয়ে বেশ একটা ব্যাপার স্যাপার, বেশ লাগছে। তুই লেখ। লিখে চল...’  প্রাক্তনবান্ধবীর বর্তমানবার্তা এমন। কল্পনা করা যেতে পারে, কতটা গভীরভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, শ্রীমল্লারকিশোরেরা!
  • ভাট...
    commentalbert banerjee | //ফিউডাল সিস্টেমের এটা প্রচলিত প্রথা//
    "The Man Who Laughs" by Victor Hugo
    commentalbert banerjee | //অথবা, যাক বাবা, কলেজ স্ট্রীটটা ভাঙছে না।// সেকেন্ড করছি।
    আপনি আমার জীবন কেড়ে নিতেই পারেন ফিউডাল সিস্টেমের এটা প্রচলিত প্রথা, এবং সেটাতে আপনারা বেশ ভালোই রপ্ত। কিন্তু আমি, আমরা, আমাদের মরার যে ইতিহাস সেটা কেড়ে নিতে হলে তো ভাই একটু প্রব্লেম আছে। প্রব্লেম টা হলো
    যে সংখক লোক কে মারতে চেয়েছেন তারচেয়ে একজন কে বেশী মারতে হবে।
    এবার আপনারা মারার জন্য বাজেট টা একটু বাড়িয়ে নিন। সময়টাও বেশি লাগবে তার ও দাম আছে।
    comment+=- | উফফ। এই জন্যেই বলে মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত