এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • যেখানে উত্তর নেই

    Pameli Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ জুলাই ২০২৬ | ২২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • আমার মনে হয়, আজকাল আমার চিন্তাভাবনা এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজম—এই দুই দর্শনের মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। কখনও মনে হয় এক্সিস্টেনশিয়ালিস্টদের কথাই ঠিক, আবার কখনও মনে হয় অ্যাবসার্ডিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তবতার কাছাকাছি। এই দ্বন্দ্ব থেকেই আমি বারবার ভাবতে বাধ্য হই।
     
    যখন প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার করা শুরু করি, তখন আমার মনে হতো—জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমি পৃথিবীতে কেন এসেছি? মানুষের অস্তিত্বের কোনো চূড়ান্ত অর্থ কি আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞান, দর্শন এবং বিভিন্ন লেখালেখি পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব মূলত এক বিশাল কাকতালীয় ঘটনার ফল। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অসংখ্য শর্ত পৃথিবীতে একসঙ্গে মিলে গিয়েছিল বলেই এখানে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে আগে থেকে নির্ধারিত কোনো উদ্দেশ্য ছিল—এমন কোনো প্রমাণ নেই। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব নিজে আমাদের জীবনের কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ দেয় না।
     
    এখানেই এক্সিস্টেনশিয়ালিজম আমার কাছে অর্থবহ মনে হয়। তারা বলে, জীবনের আগে থেকে কোনো অর্থ না থাকলেও মানুষ নিজের জীবনকে অর্থ দিতে পারে। একজন মানুষ যদি সারা জীবন নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে, শেখে, সত্যের অনুসন্ধান করে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, ভালোবাসতে শেখে, সততার সঙ্গে বাঁচে—তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে হয়তো ফিরে তাকিয়ে বলতে পারবে, "হ্যাঁ, আমার জীবন অর্থপূর্ণ ছিল।" সেই অর্থ মহাবিশ্ব দেয়নি; সে নিজেই তৈরি করেছে। এই ভাবনাটা আমার কাছে গভীরভাবে আকর্ষণীয়।
     
    কিন্তু তারপরই অ্যাবসার্ডিজমের কথা মনে পড়ে, আর তখন আমার মনে হয়, বাস্তবতা বোধহয় আরও কঠিন।
     
    ধরো, একজন মানুষ সারা জীবন অবহেলিত হয়েছে। সে ভালোবাসা পায়নি, প্রথাগত শিক্ষা বা নতুন কোনো কিছু শেখার সুযোগ পায়নি, সমাজ তাকে বারবার বঞ্চিত করেছে। তার জীবন কেবলই সংগ্রাম আর কষ্টে কেটেছে। তাহলে তাকে যদি বলা হয়, "নিজের জীবনের অর্থ নিজেই তৈরি করো", তাহলে কথাটা কি তার প্রতি ন্যায়সঙ্গত শোনায়?
     
    এই জায়গাতেই অ্যাবসার্ডিজম আমাকে স্পর্শ করে।
    সব মানুষের কি সমান সুযোগ আছে অর্থ তৈরি করার?
    কেউ জন্ম থেকেই সুবিধাপ্রাপ্ত, কেউ নয়।
    তাহলে কি অর্থ তৈরির ধারণাটাও কিছুটা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের জন্য সহজ?
    কারণ জীবন যে কারও প্রতি ন্যায়বিচার করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কে ভালোবাসা পাবে, কে পাবে না; কে সুযোগ নিয়ে জন্মাবে, আর কে বঞ্চিত হবে—এসবই অনেকটাই কাকতালীয়। জীবন কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, কোনো ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিও দেয় না। তবু জীবন চলতে থাকে।
    তাই আমার মনে হয়, এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজম—দুটোর মধ্যেই সত্যের একটা অংশ রয়েছে। একদিকে আমি বিশ্বাস করি, মানুষ নিজের মূল্যবোধ, ভালোবাসা, কৌতূহল, জ্ঞানচর্চা ও নৈতিকতার মাধ্যমে নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে। অন্যদিকে আমি এটাও অস্বীকার করতে পারি না যে, সেই অর্থ তৈরি করার সুযোগও সবার জীবনে সমানভাবে আসে না। মানুষের জীবনের পরিস্থিতি, সৌভাগ্য, বঞ্চনা—এসবের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।
     
    হয়তো এই কারণেই আমি কোনো একটিমাত্র দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারি না। আমার মনে হয়, মহাবিশ্বের নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য নেই; কিন্তু মানুষ চাইলে নিজের জীবনে অর্থ খুঁজে নিতে পারে। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সেই পথ সবার জন্য সমান নয়। এই দুই উপলব্ধিই আমার কাছে সত্য বলে মনে হয়। তাই আজও আমি এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি—কোনোটিকেই পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারছি না, আবার কোনোটিকেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতেও পারছি না।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Srimallar | ২৫ জুলাই ২০২৬ ২২:৫৫741955
  • A truly remarkable piece of writing! It gives voice to my own thoughts. I know I'll come back to it time and again—this is a piece that deserves to be read repeatedly.
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন