এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3মেয়েদের প্রস্তুতির ফাঁকে বড় মাতাজী জিজ্ঞেস করলেন - ‘তুমি কি উঠবে ভাবছ?’ বললুম - ‘হ্যাঁ মাতাজী।’ কলেজে এমনিতেই সবাই আমাকে ছিনে জোঁক হিসেবে চেনে, কোন সমস্যা সামনে এলে তার শেষ না দেখে ছাড়িনা। তাই এখানে কোন ছাড়ান ছুড়িনের প্রশ্ন নেই। সুযোগের সদব্যবহার করতেই হবে। বড় মাতাজী আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘তাহলে আমিও উঠবো।’ উঠতে হবে আগের মতই চার হাত পা কাজে লাগিয়ে। পাহাড়ের মাথায় ট্রেনারদের একটি দল দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, দড়ির অন্য প্রান্তটা ধরে আছেন নিচে যে প্রশিক্ষকেরা রয়েছেন, তাঁরা। মাঝখানে সেই হারনেস আর ক্যারাবিনারের গল্প। তবে গল্পটা আগের দিনের জাল বাওয়ার থেকে কিছুটা আলাদা। মুখ্য প্রশিক্ষক বিভুজিৎ মুখোটির কয়েকটি কথা কানে গমগমিয়ে উঠলো আমার। তিনি বললেন, পাহাড়কে তোমরা যতই ভালোবাসো, মনে রাখবে আরোহণের সময়ে ও একটা obstacle and an obstacle should not be negotiated, it should be overcome. শুনে চমকে উঠলাম, মনে মনে কয়েকবার আবৃত্তি করে নিলাম বাক্যটি। সত্যিই তো নেগোশিয়েশন আর কম্প্রোমাইজের কম প্রলোভন তো এলনা জীবনে। একবার পা পিছলে গেলে পতন ও মৃত্যুই ভবিতব্য - সে কথা সব ক্ষেত্রেই খাটে - তা সে পর্বতারোহণ বা জীবন নির্বাহ যাই হোক না কেন। এইরকম জীবনের পরীক্ষা যতবার এসেছে সামনে, ততবার মন্ত্র জপেছি একতানমনে - ‘সত্যের জন্য সব ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না।’ ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরল সম্মিলিত হাঁকডাকে। জীবনে যাই হয়ে থাক, এখন এই মাঠা পাহাড়কে ওভারকাম করি কেমনে।বিভুজিৎ বাবুর নির্দেশগুলি মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করি। চার হাত পায়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া থাকে ঢালের সমান্তরালে, কিন্তু শরীর ঢালের থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ভালোবেসে পাহাড়ের দিকে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলে, ভারসাম্য হারিয়ে পপাত চ, মমার চ, হতে এক পলও দেরি হবেনা। আবার নামার সময়ে মেরুদন্ড থাকবে ঢালের সঙ্গে উল্লম্ব। মুখ থাকবে শিখরের দিকে। পিছনে হেঁটে নেমে আসতে হবে। তখন ডান হাত থাকবে কোমরের সামনের দিকে - এই হাতই এখন পা-গাড়ির স্টিয়ারিং। বাঁ হাত থাকবে কোমরের পিছনে, সেই হাত ব্রেকের মত কাজ করবে। বাঁ হাত দিয়ে দড়ি টেনে যোগান দিলে তবেই সামনের দড়ির অংশ বাড়বে আর আমি নামতে পারব। বাঁ হাত লক করে দিলে আটকে যাব, আর এগোতে পারবোনা। এই কৌশলের নাম হল র‍্যাপলিং। আসলে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া ঢালের সমান্তরালে রাখলে শরীরের ভরকেন্দ্র (Center of Mass) নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শরীর পাহাড়ের কাছাকাছি এলে ভরকেন্দ্র পিছলে গিয়ে ভারসাম্য নষ্ট হবে। আর নামার সময়ে দড়ি, ক্যারাবিনার, কোমর আর হাত ছন্দোবদ্ধ ভাবে ঘর্ষণ বল (Friction force) তৈরি করে। আমরা যদি শুধু হাত দিয়ে দড়ি ধরে নামতে যেতাম, তবে হাতের চামড়া ছড়ে যেত অথবা আমি সোজা নিচে গিয়ে পড়তাম। কিন্তু ক্যারাবিনার, হারনেস, দড়ি এবং দুই হাতের অবস্থান—এই পুরো সিস্টেমটা মিলে একটা হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক (Human-Mechanical Friction Brake) হিসেবে কাজ করে। আমি শেষ পর্যন্ত নিয়ম মেনে উঠে আবার নেমে আসতে সফল হলাম। ওপরে ওঠার পর মনে হচ্ছিল বুকের খাঁচাটা বুঝি ফেটে যাবে। কিছুক্ষণ সেখানে শান্ত হয়ে বসে ধীরে ধীরে চোখ মেললাম। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বিস্তৃত বনরাজি, মাঝে মাঝে মেঠো পথ, সেই লাল জমিনের প্যাটার্ন, দূরে দূরে বিক্ষিপ্ত গ্রাম, মাঝে কিছু চাষবাস - সব মিলিয়ে পুরুলিয়ার বন্য সৌন্দর্য বিহগ দৃশ্যে আমার চোখের সামনে ঝলমলিয়ে উঠলো। যেন আমি বঙ্কিমের আর এক নবকুমার যে ‘তালতমালীবনরাজিনীলার’ রূপে মুগ্ধ হয়েছে। তবে এই নেমে আসার পর মুহূর্তেই একটা ঘটনা ঘটল। অনেক ছোটবেলায় জুল ভার্নের টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সী এর বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম - সেখানে এক জায়গায় সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিন নটিলাস আটকে যাওয়ায় বিজ্ঞানী পিয়ের, ক্যাপ্টেন নিমোকে জিজ্ঞেস করেন - ক্যাপ্টেন, নটিলাসের কি কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে? নিমো উত্তর দেন, না প্রফেসর, নটিলাসকে আপনি চেনেননা, একটা ঘটনা ঘটেছে মাত্র। গল্পটা মনে ভেসে উঠলো, তার কারণ আমাদের ঘটনাটা দুর্ঘটনা হতেই পারতো, কিন্তু হলনা। আসলে আমাদের সঙ্গে দুটি এমন মেয়ে ছিল, যাদের হার্টে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ট্রেনাররা ভরসা দিয়েছিলেন, যে কিচ্ছু সমস্যা হবেনা। হয়ওনি। মাঠার ঐ ঢালে নেমে এসে একটা সংকীর্ণ পথ দিয়ে আবার মেয়েদের জটলার মধ্যে ফিরে আসতে হচ্ছিল। আমি নেমে আসার পর, ঐ সার্জারি হওয়া একটি মেয়ের ওঠার কথা। আমি যখন ঐ অপরিসর পথে সাবধানে হেঁটে ফিরছি, ততক্ষণে ঢালে পা রেখে পজিশন নিয়ে ঐ ছাত্রীটির কোমরে ক্যারাবিনার বাঁধা হয়ে গেছে। কিন্তু মনের টেনশন চাপতে না পেরে ও পিছন ফিরে বন্ধুদের দিকে তাকাতে গেল। ব্যাস, পা ফস্কে ঘুরে আমার পিঠের ওপর পুরো ওজন নিয়ে পড়ল। আমি তো ওর দিকে পিছু ফিরে, কিছু দেখিনি। কিছু বোঝার আগেই সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আমি ছিটকে নিচের গর্তে পড়ে গেলাম, মানে অগভীর একটা খাদ, যার জন্য ঐ জায়গাটা অপরিসর। ভিতরে ঝোপ ঝাড় ছিল। শীতের ভোরে রক ক্লাইম্বিং-এ বেরিয়েছি, সোয়েটার, জ্যাকেট, নী গার্ড, কাঁটালো জুতো - হেন তেন প্রোটেকশন সব পরাই ছিল আমার। ঝোপগুলো পুরো গদির মত কাজ করেছে। কিন্তু হাতের পাতা, চোখমুখ এগুলো তো খোলা ছিল। যাই হোক টেনে তোলার পর দেখা গেল, অবিশ্বাস্য ভাবে আমার কোন ইনজুরি হয়নি। কাটা ছড়াটুকুও নেই। হাড়ে ব্যাথা, মচকানোও নেই। আর আমার ওপরে পড়ার ফলে মেয়েটিরও কিচ্ছুটি হয়নি। যেভাবে পড়েছি, দলের কেউ বিশ্বাস করতে পারছেনা যে আমার কিছু হয়নি। একলা বসে ভাবি, যতই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকুক, সব কিছু পজিটিভ ফ্যাক্টর একসঙ্গে কাজ করা - কোন ইনজুরি না হওয়া - এটা এমনই ব্যাপার, সহজ বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলেনা। জীবনে আরও কয়েকবার ফিল্ডে এমন ন্যারো এসকেপ হয়েছিল আমার। না - আসলে আমার না বলে আমাদের বলা ভালো। আর একবার তো বলা যেতে পারে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। যদিও গল্প শুনতে শুনতে বেলাইনে যাওয়া মানে ডিসট্র্যাকশন আমি পছন্দ করিনা মোটে, তবুও এই পাকাচুলো বুড়ির মনে যখন কোন কথা উথলে ওঠে, তখন না বললে শান্তি হয়না। অনেক বছর আগের কথা। যৌবন তখনও শরীর ছেড়ে যায়নি। সেবার আমরা হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম, গন্তব্য লখনৌ হয়ে কাঠগোদাম স্টেশন। সেখান থেকে নৈনিতাল, রানিক্ষেত, কৌশানি। সবার মনে খুশির হাওয়া। কিন্তু একটি ছাত্র এসে পৌঁছতে পারলোনা। ট্রেন যখন ছেড়ে দিয়েছে, অন্য ছাত্ররা বলে উঠলো, ঐ দেখুন ম্যাডাম, ও পাগলের মত প্ল্যাটফর্মে দৌড়চ্ছে। কী হবে ছেলেটার!! অজানা আশংকায় আমরা যে যেখানে পারলাম চেন টানলাম। কিন্তু আমরা তো আইন জানতাম না, যাত্রাপথের মাঝখানে বিপদ ঘটলে চেন টানা যায়, কিন্তু শুরুতে নয়, ওটা দন্ডনীয় অপরাধ। আর পি এফ এসে, আমাদের এত বড় দল, সহজেই আইডেন্টিফাই করল, কারা করেছে এই কাজ, আর সঙ্গে সঙ্গে বল্লরীদি, আর মধুসূদনকে নামিয়ে নিয়ে চলে গেল। তারপর ঘটনা শুনে মেয়ে বলে বল্লরীদিকে ছেড়ে দিল, কিন্তু মধুসূদনকে ছাড়লোনা। এদিকে বল্লরীদি ট্রেনে ওঠার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। তখন আমাদের তরুণ বয়স তো, ও ছুটতে ছুটতে চলন্ত ট্রেনে আমাদের কামরার পা দানিটা ধরে ফেলল। আর আমি সেই দরজায় দাঁড়িয়ে কীকরে যে ওকে টেনে তুলেছি, বা ও উঠতে পেরেছে, ফস্কায়নি - আমরা দুজনেই জানিনা। কারণ ট্রেন ততক্ষণে স্পীড নিয়ে নিয়েছে। আমরা তো আর হিন্দি সিনেমার শাহরুক, কাজল ছিলাম না, বাস্তবটা ভয়াবহ। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, কী হয়ে যেত সেদিন। তারপর আর কী - কলেজ থেকে সহকর্মীদের দৌড়, বাড়ি থেকে পরিবারের সদস্যদের দৌড় - অবশেষে সেই রাতেই মধুসূদনের ছাড়া পাওয়া - রেলের কোটায়, রেলের আধিকারিকেরাই টিকিট বুক করে দিলেন। আমরা লখনৌ পৌঁছেছি ভোরে, আর মধুসূদন এসে যোগ দিল বিকেল সন্ধের মুখে। আর একবার হলদিয়া ডকে আমরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে জাহাজ দেখছিলাম। ডকে ঘোরার অফিসিয়াল পারমিশন ছিল। তখন কলেজে যোগ দিয়েছি, হয়তো বছর দুয়েক হবে। হঠাৎ দলের এক সদস্য একটা বিদেশি জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো কর্মীকে জিজ্ঞেস করল - ভেতরটা দেখা যাবে? সে বলল - অবশ্যই, ওয়েলকাম। এতে যে কোন সমস্যা হতে পারে, আমাদের ধারণায় আসেনি। বয়সটা তিরিশে পৌঁছয়নি তখনও। একটা সরু লোহার সিঁড়ি বেয়ে ছেলেমেয়েরা যেই উঠতে শুরু করেছে, সঙ্গে সঙ্গে আর্মি ছুটে এসে আমাদের নামিয়ে দিল। তারপর টিচার হিসেবে আমরা তাঁদের কাছে খুবই বকুনি খেলাম, নিজেরাও মরমে মরে গেলাম। ঘটনা হচ্ছে, আমরা তো জানিনা যে, ডকে দাঁড়ানো জাহাজের ভেতরে আমাদের দেশের আইন কানুন খাটেনা। যে দেশের জাহাজ - সেই দেশের আইন চলে। ফ্ল্যাগ স্টেট জুরিসডিকশন ও টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স - এই আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের বন্দরে আন্তর্জাতিক জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকলেও, জাহাজের ডেভিস বা ভেতরের অংশটি সংশ্লিষ্ট যে দেশের পতাকা বহন করছে, সেই দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড বলে গণ্য হয়। মাসের পর মাস জলে থাকা নাবিকেরা যদি আমাদের নামতে না দেয়, আমরা তো সরকারের অনুমতি নিইনি - সরকার তো জানবেওনা আমরা কোথায় গেলাম। আর্মিকে আজও আমি মনে মনে ধন্যবাদ জানাই। পাহাড় থেকে নিরাপদে নামার জন্য যেমন বায়োমেকানিক্স বা ‘হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক’-এর কারিগরি দক্ষতা শিখে রাখাটা দরকার, ঠিক তেমনই আমরা যে সমাজে এবং রাষ্ট্রে বাস করছি, করে কম্মে খাচ্ছি, তার আইনগত পরিধি সম্পর্কে সচেতন থাকাটাও ভৌগোলিকের জন্য সমান জরুরি। প্রাকৃতিক নিয়ম বা প্রকৃতির তৈরি আইন মানায় ত্রুটি হলে যেমন প্রকৃতি ক্ষমা করে না, তেমনই রাষ্ট্রের আইন না মানলে সমাজ ক্ষমা করে না। দুটি ক্ষেত্রেই ল্যাটিন প্রবাদটি সত্যি - ‘Ignorantia juris non excusat’ "আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়"। পরের ঘটনা যেটা বলতে যাচ্ছি, সেটা হল দীঘা ফিল্ডে, আর সেইবারই সাইট সীয়িংয়ে গিয়ে উড়িষ্যার তালসারিতে। তখন সবে আগের বছর আমি আর বল্লরীদি এক মাস আগে পরে কলেজে যোগ দিয়েছি - হরিহর আত্মা। বাংলার বর্ষীয়ান অধ্যাপক শ্যামল বাবু শারদা, বল্লরী আলাদা না বলে একসঙ্গে দুজনকে শাল্লরী বলে ডাকতেন। সেবারে আমাদের সার্ভে গ্রামের নাম ছিল গোবিন্দবসান। নির্ধারিত দিনে মৌজা ম্যাপ দেখে দেখে এগিয়ে চললাম সার্ভে করতে। অর্ধেক রাস্তা গিয়ে দেখি সামনে উত্তুঙ্গ বালির পাহাড় - মানে বেশ বড়সড় একটা বালিয়াড়ি, কিন্তু সেটা ম্যাপে নেই। মানে আছে কিন্তু ঠিক সেই জায়গায় নেই। ব্যাপারটা কী দেখতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ চেষ্টা চরিত্র করে সেই ঝুরঝুরে বালির পাহাড়ের মাথায় যেই না চড়েছি, একটা ভেজা দমকা নোনা বাতাসের ধাক্কা লাগল চোখে মুখে। ওমা! সামনে নীল সাগরের ঊর্মিমালা। কিন্তু ম্যাপে দেখাচ্ছে গ্রামের জমি আরও অনেকটা বিস্তৃত, সমুদ্র বেশ দূরে। আসলে ইংরেজ আমলে মানচিত্র তৈরির সময় যেমন ছিল সেটাই আঁকা রয়েছে। কিন্তু এখন ২০০০ সালে সেটা নেই। গ্রাম ছোট হয়ে গেছে। চোখের সামনে সিভিয়ার কোস্টাল ইরোশন দেখে সবাই হতবাক। আমরা তখন যদিওবা টীচার, স্টুডেন্টদের থেকে খুব বেশি বয়সে বড় তো নই - আর সেই আমাদের অত বড় আবিষ্কার! শাল্লরীর মন তখন ডানা মেলে উড়ছে। সী ফেসিংয়ে বালিয়াড়ি ভেঙে ভেঙে জায়গায় জায়গায় ভিতরের গঠন বেরিয়ে পড়েছে। মানে যে সময়ে যেমনভাবে বাতাস বয়েছে, সেভাবে বালি এসে জমেছে। কোথাও প্যারালাল স্ট্রাকচার, কোথাও ক্রিসক্রস বা ক্রস বেডিং দেখা যাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মহানন্দে সেগুলো খুঁজে বেড়াতে লাগলো, আর রিজ লাইন বরাবর আমরা দুজন এগিয়ে গেলাম একটু দূরে। একটা জায়গায় পাথর দিয়ে নিচু দেয়ালের মত সাজানো, মনে হচ্ছে ভিউ পয়েন্ট। সেখানে পৌঁছে দেখি জায়গাটা বেরিয়ে আসা স্পার, ঝুলন্ত বারান্দার মত, তলায় আন্ডারকাট আছে, মানে তলার বালি খেয়ে গেছে। হয়তো যখন পাথর সাজানো হয়েছিল, তখন বালির ঢালটা উল্লম্ব ছিল, এখন নেগেটিভ ঢাল হয়ে গেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক যেটা, সেটা হল অনেক নিচে সমুদ্রের ঢেউগুলো এত জোরে আছড়াচ্ছে আর ঘুরপাক খাচ্ছে, যে জলের ছিটে আমাদের গায়ে লাগছে। একবার নিচে তাকিয়ে মনে হল - এ যেন যমুনার জলে হওয়া এক অবিরাম যুদ্ধ যাতে কালীয় নাগের ফণাগুলো আক্রোশে ফোঁসফোঁস করে চলেছে। আমরা সেই বালি - ছাদের পাথুরে আলসের পাশে দাঁড়িয়ে অলস গল্প জুড়লাম, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমার বামপাশে সমুদ্র, বল্লরীদির ডানপাশে। ক্ষণিকের মধ্যে পলক ফেলার আগেই মনে হল বাঁপাশে একটা বিশাল কালো অন্ধকার ধেয়ে আসছে, মস্তিষ্ক সময় পায়নি, সুষুম্না ক্রিয়া মানে পরিবর্ত ক্রিয়ায় আমি একটা বিশাল লাফ দিলাম ডানপাশে। এর আগে কখনও অমন লাফাইনি, পরে তো প্রশ্নই ওঠেনা। বাঁকাধে যেন একটা ভয়ানক জোরে থাপ্পড় এসে পড়ল, আমি তো পুরো বেসামাল। সম্বিৎ ফিরলে বুঝতে পারলাম, যে বিশাল একটা ঢেউ এসে আমাদের আক্রমণ করেছিল। এত ওপরে যে ঢেউ উঠতে পারবে, সেটা আমরা কল্পনা করতে পারিনি। নিজের সম্বিৎ ফিরে পাবার পর বল্লরীদির কী হল এই ভেবে কেঁপে গেলাম, দেখলাম বল্লরীদি যেখানে ছিল সেখানেই ভিজে চুপচুপে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন একটা মূর্তি - বিশাল ঢেউটা ওর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। আমি কোনরকমে ছুটে গিয়ে ওকে দুহাতে ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছি। তারপরে দেখি নড়ে উঠলো। আমি বললাম তুমি তখন দাঁড়িয়ে রইলে কেন? সরে যাবে তো! বল্লরীদি বলল, আমি ভেবেছি - আমি তো লম্বা, ঢেউয়ে কিছু হবেনা। আমি তো তাজ্জব, বললাম, তুমি নিজেকে সমুদ্রের চেয়ে লম্বা কীকরে ভাবলে? এইখানে কাহিনী মে কুছ টুইস্ট হ্যায় - মানে কুছ হিস্টোরিকাল ফ্যাক্ট হ্যায়। বল্লরীদি সত্যিই বাঙালি মেয়ের গড় থেকে মাথায় অনেকটাই বেশি উঁচু, এদিকে আমি উল্টো - খর্বকায়। নিজেরাই নিজেদের নাম নিয়েছিলাম পেনসিল - রবার। আর স্টুডেন্টরা আরও এক কাঠি সরেস। তারা হেসে হেসে বলেছিল, ম্যাডাম, আপনাদের আমরা নাম দিয়েছি এল. এম. আর বি. এম. - মানে হচ্ছে বল্লরী ম্যাম হলেন ল্যান্ড মার্ক আর শারদা ম্যাম হলেন বেঞ্চ মার্ক। এক্কেরে সাচ্চা ভূগোলের ছাত্র - আমরা তো হেসে খুন। তবে ফিল্ড উজিয়ে এই গল্প যখন কলেজের স্টাফ রুমে এল, তখন বিপদের আশঙ্কা, আমাদের অবিমৃশ্যকারিতা সব বাদ দিয়ে ‘বল্লরী সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ - এই তথ্যই মুখ্য হয়ে উঠলো। অট্টহাসির ঢেউ উঠতে লাগলো। আজ সিকি শতাব্দী পরেও আর্জি আসে - অ্যাই শারদা - ‘সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ টা প্লিজ বলো। আমার আবার একটু হাত পা নেড়ে, অভিব্যক্তি দিয়ে গল্প বলায় নামডাক আছে। হাজারো বার শোনা গল্প আবার শোনাই। বল্লরীদি রেগে যায়। এবার যে এই গল্পটা আমি স্টাফরুমের বাইরে ফাঁস করলাম, বল্লরীদির সজোর চাঁটি থেকে কেউ আমাকে বাঁচাতে মনে হয় পারবেনা। কিন্তু হাসি মজার আড়ালে একটি গভীর সত্য আছে - যার প্রভাবে দীঘার নোনা জলে ভেজা বালুকাবেলা আর রোদ্দুরে পোড়া মাঠা পাহাড়ের নেড়া ঢাল পাশাপাশি একই মঞ্চে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। গ্রামবাসীরা শুনিয়েছিলেন সেই কাহিনী - মাঠে ঘাটে হাটে বাটে পাওয়া সেইসব জ্ঞান না পেলে, পুঁথির মুক্তো ফেলে ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক না কুড়োলে আজ আমাদের ভৌগোলিক হওয়া হতনা।চলবে...
    আমার বই আর মফস্বলের ভোর - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতআশির প্রথমভাগ প্রায় শেষ হবার পথে তখন। বারোয়ারী উঠোনের আমাদের আনন্দবাড়িতে তখনও প্রতিবেলা পাত পড়ে জনা পঁচিশের। নিজেরা বাদেও জমির ফসলে দিনখাটা মানুষ, সংসারের কাজে হাত লাগানো পূর্ণির মা কন্যাসহ, তাঁতঘরের ড্রাম মাষ্টার, ম্যানেজার আর কখনো কখনো মাদলা গ্রামের আইনুল চাচা। বলা যায়, উৎসব ছাড়াও বাড়ির উঠোনে পরবের কমতি ছিল না একটুও। সবদিনই আনন্দের, সবদিনই পরবের। আর আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয়। বাড়ির পাশে এক নতুনধারার ইশকুল। কিন্ডারগার্টেন। পাশের বাড়ির বলাকা ফুফু সে ইশকুলের আপা। চেয়ারম্যান দাদুর এক শরিকের পড়ে থাকা খালি বনেদি ভবনে সাইনবোর্ড ওঠলো ‘‘উদয়ন কিন্ডারগার্টেন’। শোনা যায়, সে শরীক আমেরিকায় গিয়ে আর ফেরেননি। কাগজপত্রের জটিলতার কারণে নিজ দেশে তাঁর ফিরে আসাও অনিশ্চিত। কিন্তু দেশের জন্য পরান তো কাঁদে। তাঁর ইচ্ছাতেই সে ভবনের ফাঁকা ঘরগুলো হয়ে উঠেছিলো ক্লাশ রুম। হয়ে উঠেছিলো আমাদের শৈশবের কাগজনৌকা সময়।পাড়ায় প্রথম এমন ইংরেজি ইশকুল। সোরগোলের অতিশয্য। কেউ ফটকে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় তো কেউ জানালার শিক ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যেন সার্কাসের দল এসেছে! আর এসেম্বলিতে যখন ‘ অ্যাটেনশন’ ‘স্ট্যান্ড ইজি’ বলে শারীরিক শিক্ষক গলা চড়াতেন তখন চারপাশের চোখগুলো গোলগাল হয়ে ঘিরে ধরতো ইশকুলের মাঠকে।বিড়ম্বনা। অদ্ভুত বিড়ম্বনা। সে বিড়ম্বনার আড় পেরিয়েই আমি বলাকা ফুফুর হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম জীবনের প্রথম শিক্ষা নিকেতনে। নিজের আড়ষ্টতা আর জড়তা কাটিয়ে একটু একটু অভ্যস্ত হচ্ছিলাম আমি,পুষি ক্যাট পুষি ক্যাট হোয়্যার হ্যাভ ইউ বিনআই হ্যাভ বিন টু লন্ডন টু ভিজিট দ্যা কুইন…ঠিক তখনি এক দুপুরে বাবা বাড়িতে হাজির হলো বদলির আদেশ হাতে নিয়ে। পরের মাসে জয়েন করতে হবে সদ্য জেলা শবরের খেতাব পাওয়া এক শহরে। খুব দূরে নয়, আবার এমন কাছেও নয় যে বাবা দিনে গিয়ে অফিস সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে পারবে। তাহলে উপায়?আমাদেরকে চলে যেতে হবে বাবার সঙ্গে শহরে। তল্পিতল্পা নিয়ে অংশিদার হতে হবে উদবাস্তু জীবনের। সেই প্রথম আমাদের বাড়ির বারোয়ারী উঠোনের একচালা আনন্দে ভাঙন ধরলো। লাল বারান্দায় পড়া পাতের সংখ্যা কমলো। উঠোনে রোদে ভেজা তিল তিসির দুপুরে চড়ুই তাড়ানোর মানুষ কমলো। কিন্তু ওই যে, জীবনের গতি একমুখী! সে গতির সঙ্গে হয় পাল্লা দাও নয়তো ছিটকে যাও রেস থেকে!তাই জীবনের নিয়ম মেনেই এক শীতের সকালে বাকশো পেটরা, গুড়ের মেটে হাঁড়ি, মুড়ির টিন, ডানো দুধের কৌটায় কুমড়ো বড়ি আর একটা সোনালী চুলের বিদেশী পুতুল কোলে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলাম আবার ফিরবো এই প্রতিজ্ঞা করে!তখন অবশ্য ফুলজোড় নদীতে সেতু হয়নি। স্টিমারে নদী পাড় হতে হতো। ভেপু বাজিয়ে যখন নদীর জল কেটে স্টিমার এগোচ্ছিলো তখনও আমার শৈশবসূলভ অস্বীকৃতি একমুখী সেই যাত্রায়,মা কবে ফিরবো আমরা…পূজার ছুটি আসতে কত দেরী…আমার ইশকুলের বন্ধুরা তো কাল থেকে ক্লাসে আমাকে পাবে না…পূজার ছুটিতে ফিরলে ওরা চিনতে পারবে তো আমাকে…সোনালী চুলের পুতুল বুকে জড়িয়ে রাখা মেয়েটিই জানতোই না,একবার পথে নামলে আমরা আসলে আজীবনের পথিক হয়ে যাই।নতুন শহর। মফস্বলি নিরিবিলি শহর। আমাদের মফস্বলি জীবন, নেহাতই সাদামাটা কিন্তু প্রাঞ্জল। সে জীবনে সবকিছু নতুন। নতুন ঘর। নতুন প্রতিবেশী। নতুন পাড়া। নতুন বিদ্যালয়। নতুন স্কুল ইউনিফর্ম। নতুন জুতো। আর নতুন আমি।সবে শহরের গায়ে জেলা সদরের ভারিক্কি নাম ঝোলানো হলেও আচারে আচরণে সে শহর ছিল একদমই সাদামাটা। রাস্তার মোরে কিংবা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা টিনের আটচালা ঘরগুলো তখনও সাক্ষ্য দিতো আড়ম্বরহীন সময়ের। তবে সেসবের মাঝেও বেশকিছু বনেদি বাড়ি এখানেসেখানে ছড়িয়ে থেকে নিভৃতে বয়ান করতো শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা। মন খারাপের আকাশভাঙা কান্না নিয়ে যখন বাড়ি আর ঠাকুমাকে ছেড়েছিলাম তখনও কিন্তু জানতাম না নদী পাড়ের সেই শহরের সঙ্গেই হয়ে যাবে আমার আজীবনের বোঝাপড়া! নদীর পাশেই নীচু এক পাড়া, আমলাপাড়া। আমাদের অস্থায়ী ঠিকানার প্রারম্ভ। তখনও যমুনা নদীতে শহর রক্ষা বাঁধ পড়েনি। তাই বাঁধনহারা নদী ইচ্ছে হলেই চলে আসতো বাসার উঠোনে। এজন্য নদী আর জলেই আমার শৈশবের কাগজনৌকা ভেসে বেড়াতে শুরু করলো ইছেমতন যখন তখন। তবে সেসব বাঁধাহীন দুরন্তপনা শেষে আমাকে যথারীতি ফিরতেও হতো বাঁধাধরা জীবনে। দাদুর কাছে হাতেখড়ি আর পন্ডিত স্যারের কাছে শ্লেট চকে স্বরবর্ণ জীবন এরপর আক্ষরিক স্কুলজীবন উদয়ন কিন্ডারগার্টেন হুট করে ফুরিয়ে গেলেও পুস্তকাদি জীবন তো আর উপেক্ষা করা যায় না।তাই ভর্তি করা হলো আমাকে বাসার সবচেয়ে নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে। গন্তব্য গৌরি আরবান প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটা চারকোনা নতুন টিনের বাক্স। তার ভেতরে নতুন বই, নতুন রুলটানা খাতা আর নতুন কাঠ পেন্সিল। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। নিরিবিলি আর নেহাতই আটপৌরে মফস্বলি সে শহরের এক শান্ত ভোরে শুরু হলো আমার পাঠশালা দিন। বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় থাকে তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগরে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে আগুন দিতো ঘষিতে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিকশা। রহিম চাচা। প্যাডেলে পা। রিকশার টুংটাং বেল। কুয়াশা কেটে আমার প্রথম বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া।আকাশী রঙের স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা কেডস। সাদা স্কার্ফ। চুলে দুই ঝুঁটি। আমার বইয়ের প্রথম ভাগ। এসেম্বলিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে ছড়িয়ে,আমি শপথ করিতেছি যে, দেশের প্রতি অনুগত থাকিবো...জাতীয় পতাকায় স্যালুট, জাতীয় সংগীতে গলা মেলানো। শেষ হলেই বেজে উঠতো দফতরির ঘন্টা। একবার। প্রথম পিরিয়ড। প্রথম শ্রেণির স্কুলবেঞ্চ। রূপা, রনি, রাজিব, সবুজ সবাই এক বেঞ্চে। অশোকা দি'র গম্ভীর মুখ। সবুজ রঙের হাজিরা খাতা। রোল কল। দাঁড়িয়ে উচ্চকন্ঠে 'উপস্থিত আপা'।কালিবাড়ি মন্দিরের গা ঘেঁষা ইটের ওয়ালগাঁথায় ঢেউটিনের দোচালা। ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট চোখে প্রথমদিনই দেখে নিয়েছিলাম গোল্লাছুট খেলার অবারিত মাঠ আর টলটলে এক টুকরো পুকুরকে। হাতে ধরা আমার বই, প্রাথমিক গণিত আর সামনে শিক্ষকের টেবিলে ঊষা মাসি, মঞ্জু দি, অশোকা দি, আলপনা আপা। হাজিরা খাতায় ভর্তি রোল ২৭।ব্ল্যাকবোর্ড ডাস্টার চক। আমার বইয়ের প্রথম পাতা। আতা গাছে তোতা পাখি। রুলটানা খাতার প্রথম পাতা ভরে নিজের নামের বানান শেখা। আমার উত্তরণ। আমার বড় হওয়ার ভান করা। স্কুলের মাঠ। দাঁড়িয়াবান্ধা। ছুঁয়ে দিয়ে ভোঁ দৌঁড়। কালিবাড়ির গৌরমন্দিরে বাল্যভোগ। আর হলুদ কল্কি ফুলের ডালে একটা দুটো কাঠঠোকরা,ঠক...ঠক...ঠক...দফতরির একটানা ঘন্টা। ছুটি। মাটি জড়ানো পা কেডসে ঢোকানো। স্কুল গেটে হজমির পুরিয়া। লাল সবুজ কাঠি বরফ। আর চার আনায় পাওয়া নারকেল ছড়ানো সাদা বরফ।এরপর প্রতিদিনের একই নির্ঘন্ট…প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরফপানি দিন। এলান্টিং বেলান্টিং দিন। ওপেন্টি বায়োস্কোপের বিবিয়ানার এঁটে বাঁধা চুলে মুক্তো জড়াতে জড়াতে আমি এগোতে থাকি সাহেববাবুর বৈঠকখানার দিকে। চলবে...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
  • হরিদাস পালেরা...
    আরশোলা বিপ্লব নিয়ে দু-একটা কথা - ফরিদা | এ এক নতুন ভারতবর্ষ! আমার অচেনা এযাবৎ। ২০১৪ সালের আগে সাধারণ মানুষজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বা আলাপচারিতায় কেউ কারো ব্যক্তিগত ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে ভাবতাম না বড় একটা। সাধারণ কথাবার্তায় কোনটা বলা উচিৎ বা অনুচিৎ তা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত সবারই একটা স্পষ্ট ধারণা ছিল। ২০১৪ র পরে সেই মূল্যবোধের সংজ্ঞাই গেছে বদলে। এখন অনেক কথাই বিনা প্রশ্নে হজম করতে হয় আর আশ্চর্য হতে হয় — কেন এই বিশ্রী বিভাজনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠছে না বলে। এতে আজকাল আমার মতো ও আমার কাছাকাছি অনেকেই বিভিন্নভাবে নিজেদের জীবনযাত্রা জটিল করে তুলেছি। উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, চলাফেরার প্রতিটি পদক্ষেপ একবার যাচাই করে নিই — এতে কোনো বিপদে পড়তে হবে না তো?কারণ জানি, এর অন্যথা হলে জীবিকা ও জীবনযাত্রায় এর যা প্রভাব পড়বে তা সামাল দেওয়ার রেস্ত নেই। না যথেষ্ট টাকাপয়সা, না সময়।এটা এখন একটা চুড়ান্ত কর্তৃত্ববাদী দেশ। আপাতত এখানে যাদের রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা আছে, তাদের সবাই সেটা টিকিয়ে রাখতে সারাক্ষণ খেটে যাচ্ছে। বাকিরা নিজের যোগ্যতার চেয়ে নিচে কাজ খুঁজে খুঁজে প্রাণপাত করেও গুটিকয় ছাড়া কেউ সুবিধা করতে পারছে না। সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান প্রায় নেই বললেই চলে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যা আছে তাতে খেয়ে পরে সংসার চলে না।যারা পড়াশোনা করে কিছু করবে বলে ভাবছিল, তারাও দেখতে পাচ্ছে একের পর এক মাইলফলক পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে। তাতে দুর্নীতি সীমাহীন। দেওয়ালে পিঠ থেকে গেলে, আমরা প্রৌড়ত্বের দোরগোড়ায় এসে জানি ঘুরে দাঁড়াতে হয়। আর সেটা দেওয়ালের দিকে মুখ করে। সামনের চেয়ে পিছনে চাপ নেওয়াটা সুবিধাজনক বলে। আর এখনকার প্রজন্ম ঘুরে দাঁড়ানোর সঠিক অর্থ খুঁজে পেয়ে এই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাল।দেখলাম, এদের মগজধোলাই এখনও করে উঠতে পারে নি এই রাষ্ট্রযন্ত্র। এরা দেখেছে শিখেছে জেনেছে নিজের চোখে দেখে, নিজের কানে শুনে, আর নিজে বিপদে পড়ে। আমাদের নিজের সন্তান হলেও এদের ভাষা আমাদের অচেনা, এদের প্রতিক্রিয়া আমাদের সঙ্গে মেলে না।ভাগ্যিস তাই। সেই জন্যই এরা দেশের প্রধাণমন্ত্রীকে একপ্রকার বাধ্য করে মধ্যরাতে নিজের নাকের খুঁটিনাটি দেখিয়ে এদের ইন্সটাগ্রামে পৌঁছতে।ওই ২০ তারিখের ভীষণ অত্যাচারেও যখন এরা প্রকৃত আরশোলার মতো টিকে গেল, তখনই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের রক্ষণ ভেঙেছে। গোলটা হল বৃহস্পতিবার মাঝরাতে প্রধাণমন্ত্রীর ইন্সটাগ্রাম লাইভে। গতকালের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ তো ওই গোলের বাঁশি।এদিকে, আমাদের যন্তর মন্তরে যাওয়া হয়ে উঠছিল না। ২০ জুলাইয়ের রাষ্ট্রের ভয়ানক পীড়ন দেখে ভীষণ রাগ হচ্ছিল কিন্তু উপায় ছিল না। ফেসবুকের পাতায় আটকে বুঝতে চাইছিলাম কী হচ্ছে যন্তর মন্তরে আর দেখছিলাম ওরা বিন্দুমাত্র দমে নি। বরং ওদের প্রতিরোধ আস্তে আস্তে সংক্রমিত হিচ্ছে সারা দেশে।গতকাল দুপুরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের খবর পেয়ে আর থাকতে পারলাম না। ওখানে পৌঁছতে রাত আটটা প্রায়। এক জায়গায় গাড়ি পার্ক করে হেঁটে যেতে গিয়ে আটকে গেলাম পুলিশের ব্যারিকেডে। ঘুরে অন্য পথে পৌঁছতে হবে। কেন এমন — সে প্রশ্নের জবাব নেই। রাস্তা বন্ধ। কারা করেছে? — ওরাই। ব্যস।তা ঘুরে অন্য পথে, সেখান থেকে আরও ঘুরে তবে পৌঁছনো গেল। দিল্লির ভ্যাপসা গরম সত্ত্বেও সেখানে তখনও দেদার আড্ডা চলছে। এক একটা ছোট ছোট জটলায় কেউ কিছু বলছে তার ভিডিও তোলা হচ্ছে। কোথায় বা জটলার মধ্যে থেকে স্লোগান ভেসে আসছে। ডাফলি সহযোগে তা গান হয়ে উঠছে। বিপুল সংখ্যক খাকি পোশাকের পুলিশ ও নীল জংলা পোশাকের অন্য ফোর্স ও দেখলাম। তবে তাদের শরীরী ভাষা উগ্র নয়। মুখচোখও ভদ্র সভ্য।রাস্ত ঝাঁট দিচ্ছিল দুজন, একজন বড় কালো প্লাস্টিকে ভরে রাখছিল উচ্ছিষ্ট খাবারের প্লেট, জলের বোতল অন্যান্য বর্জ্য।কিছুটা এগিয়ে দেখলাম রাস্তায় দুটো ধর্ণামঞ্চ। আর রাস্তার দুপাশে কয়েকটা মেডিক্যাল ক্যাম্প ধরণের ব্যবস্থা, বসার জন্য শতরঞ্চি পাতা। সেখানেও অনেকে বসে। একটু দম নিয়ে নিচ্ছেন যাতে ফের রাস্তার কোনও জটলা হয়ে যাবেন একটু পরেই আর ফের গান গেয়ে উঠবেন। বক্তব্য রাখবেন। এক জায়গায় পায়ে প্লাস্টার বাঁধা হুইল চেয়ারে বসা বন্ধুর সঙ্গে দুজন। হাতে ভগৎ সিং এর ছবিওলা পোস্টার। কিছু জলের বোতল, বিস্কুটের প্যাকেট আর ও আর এস নিয়ে গিয়েছিলাম। শতরঞ্চিতে বসা একটা গ্রুপের কেউ জল চাইছিল কারো কাছে। তাকে জলের বোতল এগিয়ে দিতে, আরও কয়েকটা হাত উঠল। শুধু জল দিতে নেই বলে বিস্কুটের প্যাকেট বের করলাম। তাও নিল অনেকে। আমাদের জায়গা করে দিল ওরা শতরঞ্চিতে। বসতে দিল। একটি ছেলে দুহাতে দুটো ফ্লেক্সের টুকরো নিয়ে দাঁড়িয়ে হাওয়া করতে লাগল। অস্বস্তি হচ্ছিল, তাকে বারণ করাতে, একটি মেয়ে পাশ থেকে বলে উঠল, আঙ্কেল, ওকে এটুকু করতে দিন। হতভাগা দিল্লি পুলিশে কাজ করে, আমার হাজবেন্ড। ওরই সহকর্মীরা আমাদের মেরেছে সেদিন। ছেলেটির মুখ তখন দেখার মতো। ওরা বিহার থেকে এসেছে, কেউ তিন চারদিন আগে, কেউ বা গতকালই পৌঁছেছে। টুকটাক কথা হচ্ছিল। একটি মেয়ে এগিয়ে এসে রেশমীর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল, সে নিজস্ব একটা নিউজ পোর্টাল চালায়। তার সঙ্গী ছেলেটা মোবাইলে রেকর্ড করছিল। প্রশ্ন ছিল, আমরা কে, কেন এসেছি, এই আন্দোলন কে আমরা কীভাবে দেখছি, এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে বলে আমরা মনে করি— এইসব। আর কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা চিকেন খাও? আমি কিছুটা চিকেন বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাতে সোয়া সস খানিক বেশি হয়ে যাওয়াতে নাম দিয়েছিলাম ককরোচ-চিকেন। সঙ্গে টুথপকের বাক্স নিয়ে গিয়েছিলাম খাওয়ার তুলে খাওয়ার জন্য।তা খেয়ে ওরা তো খুবই খুশি। সবাই ভাগ করে খেল দেখে এত ভাল লাগছিল!যখন পৌঁছেছিলাম ওখানে, ফোনে নেট কাজ করছিল না। ওখানে শতরঞ্চির আড্ডা ছেড়ে আর একটু ঘুরে বেড়াতেই দেখলাম দিব্য নেট কানেকশন রয়েছে মোবাইলে। পট্ট কে ফোন করা হল। অনেকক্ষণ ভিডিও কলে দেখালাম কী চলছে ওখানে। ইন ফ্যাক্ট ওইই জানাল কিছুক্ষণ আগে সিজেপি ওদের আন্দোলন তুলে নেওয়ার ঘোষণা করেছে।এর শুরুতে সন্দিহান ছিলাম, মনে হয়েছিল সিজেপি হয়ত বিজেপির সেফটি ভালভ এর দায়িত্ব নিয়েছে। এখন সে প্রশ্ন অবান্তর। এই সব ছেলেমেয়রা একটা জিনিস শেখাল তা হল ভয়ালতম শাসককে নিয়েও খিল্লি করা যায়। নেচে গেয়ে হেসে ও হাসিয়েও কঠিনতম প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। গতকালের সাফল্য সেই প্রতিরোধের সাফল্য। ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল, কর্মসংস্থানের ঘাটতি দেশে অসুবিধা ও অভাবের অভাব নেই।এরা শেখাল — হিন্দু-মুসলমান বা পাকিস্তান-বাংলাদেশ এগুলো শাসকের প্রিয় খেলার মাঠ। মানুষের নিজের অপ্রাপ্তির দাবি জানানো ও শাসককে তার জন্য জবাব দেওয়ার জন্য বাধ্য করার নামই গণতন্ত্র।আর সে গণতন্ত্রের চর্চা কিছুতেই দেশদ্রোহিতা নয়। 
    ভাগবত পুরাণ - ২/২ - Kishore Ghosal | "ভূমিশয্যা থাকতে অন্য শয্যার প্রয়োজন কী? স্বাভাবিক বাহু থাকতে উপাধানের (বালিশের) কী দরকার? যখন অঞ্জলি আছে, তখন নানা ধরনের তৈজসপত্রের (থালা-বাটির) কী দরকার? দিক-বল্কল (দিগম্বর) থাকতে পট্টবস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা পণ্ডশ্রম নয় কী? যারা নিজেদের ফলে অন্যের পুষ্টি সাধন করে, সেই বৃক্ষরাজি কী ফল ভিক্ষা দানে বিমুখ হয়েছে? নদীসমূহ কী শুকিয়ে গিয়েছে?" "ভাগবত পুরাণ " - দ্বিতীয় স্কন্ধ - দ্বিতীয় পর্ব - ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /২
    বাংলার হিন্দুত্ব এবং শ্যামাপ্রসাদের শিক্ষা-এজেন্ডা: কিভাবে হতে পারে বিকল্প বাম প্রস্তুতি? - Tuhinangshu Mukherjee | রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু সংসদ বা বিধানসভার আসনের হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রকৃত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় সুপারস্ট্রাকচার-এর মধ্য দিয়ে: বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, বুদ্ধিজীবী সমাজ, সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন সাধারণ মানুষের চেতনায়। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামশিয়ান কৌশল সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থেকে তারা আইসিএআর, ইউজিসি, এনসিইআরটি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্য নিয়োগ পর্যন্ত — প্রতিটি স্তরে একটি সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক হেজেমনি প্রতিষ্ঠার প্রকল্প চালিয়ে গেছে এবং সামাজিক গণমাধ্যমে নিজস্ব বয়ান নির্মাণকে একটি অন্য স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।পশ্চিমবঙ্গ যে এতদিন এই প্রকল্পের বাইরে ছিল — এইরকম টা মনে করবার কোন কারণ আর অন্তত আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু,৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন এবং পরবর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে বাংলার সাংস্কৃতিক জমি, চিন্তার জগৎ, বৌদ্ধিক পরিসর বা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডর— সবকিছুতেই একটি বাম-উদারনৈতিক সংস্কৃতির আধিপত্য বজায় ছিল। তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে বাম দলগুলির সাথে নানা রকম নিপীড়নমূলক কাজ কারবার করে থাকলেও এই বাম ঘেঁষা সংস্কৃতিকে একপ্রকার নিজের মতন থাকতে দিয়েছিল।সর্বভারতীয় মিডিয়াগুলির একমুখী প্রচার, গণমাধ্যমের এক তরফা উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান,হিংসানির্ভর সিনেমা, কংগ্রেস মুক্ত রাজনীতি এসব কিছুর ভারেও বাংলার নাগরিক মননে সেই ঝোঁক রয়েই গেছে বেশ কিছুটা। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচন পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, এই চিত্র ক্রমশ বদলাবার আয়োজন চলছে — এবং এই বদলের একটি কেন্দ্রীয় হাতিয়ার হয়ে উঠছেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।শ্যামাপ্রসাদবাবুকে কেন্দ্রে রেখে একটি নতুন শিক্ষা-এজেন্ডা তৈরি হচ্ছে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী (২৩ জুন) এবং জন্মবার্ষিকী (৬ জুলাই) উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা, তাঁর নামে স্কুল-কলেজে প্রচার, সেমিনার আয়োজন, পাঠ্যক্রমে তাঁর অন্তর্ভুক্তি — এই সমস্তকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলি একটি সুসংগত হেজেমোনিক প্রকল্পের অংশ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরাসরি রাজনৈতিক উপস্থিতি — এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা — একটি বহুস্তরীয় শিক্ষা-রাজনীতির নমুনা উপস্থাপন করতে চলেছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি, আইআইএম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে যে ধারণাগত পরিবর্তন হয়েছে বা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে, তারই ছায়া বাংলার উচ্চশিক্ষায়ও পড়তে চলেছে এ কথা বলাই যায়।কোন একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ একটি প্রতীকী রাজনীতির অংশ। নতুন দিল্লির শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্কুল থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ — এবং সম্প্রতি ফিউচার এডুকেশন সংস্থার মাধ্যমে "২৫ বছরের শিক্ষাগত উৎকর্ষ" উদযাপনে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুবার্ষিকীর উপর জোর দেওয়া — এই সামগ্রিক প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে। রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক পার্থ চ্যাটার্জি তাঁর The Nation and Its Fragments গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে উপনিবেশোত্তর ভারতে জাতীয়তাবাদ একটি "বাহ্যিক" বা material domain এবং একটি "অভ্যন্তরীণ" বা spiritual domain-এর মধ্যে বিভক্ত। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সুচতুরভাবে এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিকে — অর্থাৎ সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা — নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছে বিগত প্রায় এক শতক ধরেই, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাদের এই প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কায়দায় এগিয়েছে। তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে, গ্রামে গঞ্জে, মফস্বলে মূলত ধর্ম এবং ভারতীয় সংস্কৃতি র মোড়কে একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারার ভেতর সংখ্যাগরিষ্ঠ কে আটকাতে পেরেছে এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। বর্তমানে বাংলায় শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিত্বকে সেই প্রকল্পের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এক্ষেত্রে সুবিধের জায়গাটি হল তিনি একজন শিক্ষাবিদ, প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য এবং মুসলিম লীগের বিরোধী হিসেবে পরিচিত, পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলা ভাষা এবং পৃথক রাজ্যের দাবির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রগণ্য ছিলেন তাও সত্য— ফলে তাঁকে একটি মধ্যপন্থী ও গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ, এবং কোলকাতা কেন্দ্রিক যে উত্তর ঔপনিবেশিক এলিট মনন সেখানে প্রবেশ করাও খানিকটা সুবিধাজনক প্রতিপন্ন হবার সুযোগ আছে।ইতিমধ্যেই এনসিইআরটি পাঠ্যপুস্তকে যে সমস্ত পরিবর্তনগুলি হয়েছে যেমন, মুঘল ইতিহাসের সংক্ষেপণ, হিন্দু সভ্যতার গৌরবায়ন, দেশভাগের একতরফা বয়ান কিংবা অতি সম্প্রতি রুশ বা ফরাসি বিপ্লবের অপসারণ - এই সমস্তকিছু একটি বৃহত্তর হিস্টোরিওগ্রাফিক প্রকল্পের অংশ। বাংলার প্রেক্ষাপটে, এই প্রকল্পে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত ও একমাত্রিক করে উপস্থাপনের প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীনতার ইতিহাস এবং দেশভাগের ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। হিন্দু মহাসভার সাথে তাঁর যোগাযোগ, বাংলা ভাগের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান, এবং পরবর্তীতে জনসংঘ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা — এই প্রতিটি বিষয়ে ঐতিহাসিক গবেষণার বহু সূক্ষ্মতা আছে যা হিন্দুত্ববাদী বয়ানে উপেক্ষিত থাকে। শ্যামাপ্রসাদ এর ভূমিকা অস্বীকার করবার কোন কারণ নেই, তা থাকা উচিতও নয়, কিন্তু তাতে বেশ কিছু অস্বস্থিও সমভাবে উপস্থিত যা এড়িয়ে যাবার কারণ নেই।নতুন হেজেমনিক প্রকল্পের মূল বক্তব্যগুলি নিম্নরূপ:প্রথমত, শ্যামাপ্রসাদকে বাংলার "রক্ষাকর্তা" হিসেবে উপস্থাপন — বিশেষত অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে।দ্বিতীয়ত, তাঁর শিক্ষাগত অবদানকে — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণতম উপাচার্য হিসেবে তাঁর কার্যকাল — হিন্দু শিক্ষাদর্শের প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা।তৃতীয়ত, কাশ্মীর প্রশ্নে তাঁর মৃত্যুকে "আত্মবলিদান" হিসেবে উপস্থাপন করে একটি শহীদ-আখ্যান তৈরি করা।চতুর্থত, এই আখ্যানকে বিশ্ববিদ্যালয় সেমিনার, পাঠ্যবই এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়া।কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল তথা শিক্ষা প্ৰতিষ্ঠান এবং তৎ সম্পর্কিত যে ডিসকোর্স, সেটিই বলা বাহুল্য হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। কারণ যতদিন কোলকাতা, যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক চর্চা এবং আনন্দবাজার-এর মতো মিডিয়া প্রতিষ্ঠান বামপন্থী ও উদারনৈতিক বয়ানের পক্ষে থাকবে, ততদিন বাংলায় হেজেমনির লড়াই অসম্পূর্ণ থাকবে। কাজেই একটু একটু করে এই বয়ানকে যত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো যাবে, ততই হিন্দুত্ব ভাবনাকে শহুরে মননে একটি প্রতি চেতনা হিসেবে দাঁড় করানো যাবে। শ্যামাপ্রসাদ কে সামনে রেখে এই চেতনা নির্মাণের প্রকল্পটিকেই শুরু করা হচ্ছে বলে মানতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। সত্যি বলতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার যে সোপানে এই মুহূর্তে এই শক্তি দাঁড়িয়ে আছে, তাতে খুব বেশি বাধার সম্মুখীন হওয়াও কল্পনীয় নয়। খুব উল্লেখযোগ্য ভাবে ইতিমিধ্যেই কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে বই এর চাহিদা কিংবা কোলকাতা বইমেলা কেন্দ্রিক নতুন কিছু প্রস্তাব – সেই দিকেই ইঙ্গিত রাখে। এখন প্রশ্ন হল- এই অবস্থার মোকাবিলা কিভাবে করা যেতে পারে? প্রথমত দীর্ঘ একটি সামাজিক অবস্থানের ফলে আপনা থেকেই কিছু প্ৰতিরোধ এর বিরুদ্ধে তৈরী হচ্ছে বা হবে বলে মনে করা যেতে পারে, কিন্তু কিছু মৌলিক বদল বা চিন্তার অবকাশ অবশ্যই থাকছে।বিনায়ক দামোদর সাভারকার ১৯২৩ সালে তাঁর Hindutva: Who Is a Hindu? পুস্তিকায় "হিন্দুত্ব"-এর যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেটি মূলত একটি রাজনৈতিক-ভৌগোলিক পরিচয় — ধর্মীয় নয়। সাভারকার নিজে ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন। তাঁর "হিন্দু" ধারণায় প্রধান মানদণ্ড ছিল: ভারতকে পিতৃভূমি (fatherland) এবং পুণ্যভূমি (holy land) উভয়ই মনে করা। এই সংজ্ঞানুযায়ী মুসলিম ও খ্রিস্টানরা স্বতঃই বাদ পড়েন কারণ তাদের "পুণ্যভূমি" ভারতের বাইরে। এই ধারণাটি মূলত ইউরোপীয় জাতিবাদী আন্দোলন — বিশেষত জার্মান রাষ্ট্রবাদ এবং ইতালীয় ফ্যাসিবাদ — থেকে অনুপ্রাণিত। এম এস গোলওয়ালকার তাঁর We or Our Nationhood Defined (১৯৩৯) গ্রন্থে নাৎসি জার্মানির "জাতিশুদ্ধি"-র প্রশংসা করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক তথ্য অস্বীকারযোগ্য নয়। হিন্দুত্ব তাই হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি নয় — এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক আদর্শ যা ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ছাঁচে ভারতীয় ধর্মীয় পরিচয়কে ঢেলে সাজিয়েছে।ভারতীয় দর্শন-ঐতিহ্যে "হিন্দু ধর্ম" বলে কোনো একক, একশাসিত ধর্মব্যবস্থা কখনো ছিল না। সনাতন ধর্মের যে বহুত্ববাদী কাঠামো, তা মূলত বিভিন্ন দর্শন-সম্প্রদায়ের একটি বিচিত্র সমাহার:সাংখ্য দর্শন — প্রকৃতি ও পুরুষের দ্বৈততা, জগতের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার প্রবণতামীমাংসা — বেদের কর্মকাণ্ডের যুক্তিসিদ্ধ ব্যাখ্যা, ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অপ্রয়োজনীয় মনে করাচার্বাক — ভারতীয় বস্তুবাদ, প্রত্যক্ষকে একমাত্র প্রমাণ বলে মানাবৌদ্ধ ঐতিহ্য — যা বৈদিক কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেঅদ্বৈত বেদান্ত — শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ, যেখানে ব্যক্তি ও ব্রহ্মের অভিন্নতাবিশিষ্টাদ্বৈত ও দ্বৈত — রামানুজ ও মধ্বাচার্যের ভিন্ন পথমহাভারতের বিখ্যাত উক্তি: "নাহং জানামি কেবলম্" — "আমি একা জানি না" — এই বাক্যটিই ভারতীয় জ্ঞানঐতিহ্যের মূল মনোভঙ্গির প্রতিফলন। পুরাণগুলি পরস্পরবিরোধী আখ্যানে পরিপূর্ণ। বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ এবং দেবী পুরাণের মধ্যে কোনো একক মতবাদগত ঐক্য নেই — এবং সেটাই এই ঐতিহ্যের শক্তি। হিন্দুত্ব এই বহুত্বকে মুছে দিয়ে একটি একমাত্রিক, একশাসিত ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে চায়। এটি হিন্দু সনাতন ধর্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিনিধিত্ব নয়। এই জায়গাটিকে অনুধাবন করে একটি প্রতি আঘাত এই মুহূর্তে ভীষণ জরুরি নাগরিক পরিসর থেকে, বিশেষ করে গৌড় বঙ্গে চৈতন্য দেবের ধারার সাথে যদি এই আলোচনাকে সংযুক্ত করা যায়।পাশাপাশি আরএসএস এবং হিন্দুত্ববাদীরা স্বামী বিবেকানন্দকে তাদের "আদর্শ পুরুষ" হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু বিবেকানন্দের প্রকৃত দর্শনের সাথে হিন্দুত্বের মূলগত বিরোধ অনস্বীকার্য। স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্ম সংসদে বলেছিলেন: "আমি সেই ধর্মের প্রতিনিধি যা বিশ্বকে সহিষ্ণুতা এবং সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা শিখিয়েছে।" তিনি বলেছিলেন: "যে কেউ যেকোনো পথে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে পারে।" তাঁর বিখ্যাত উক্তি: "দরিদ্র নারায়ণের সেবাই ঈশ্বরের সেবা" — এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের দর্শন, যা বর্ণ-বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে। তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্তৃত্বকে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন ভারতের মুক্তি আসবে নিচের মানুষদের উত্থানের মাধ্যমে। বিবেকানন্দ একজন ব্যাপক ভ্রমণকারী ছিলেন — আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, শ্রীলঙ্কা — এবং তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও চিন্তার সাথে সংলাপে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল উন্মুক্ত, বিশ্বজনীন এবং সামাজিক পরিবর্তনমুখী। আরএসএসের হিন্দুত্ব যেখানে বিভাজন এবং সংকীর্ণ পরিচয় তৈরি করে, বিবেকানন্দ সেখানে সংযোগ এবং বিশ্বমানবতার কথা বলেছেন। এই দুটি মনোভঙ্গি মূলগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া তিনি মূলত শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্তের উপর কাজ করেছেন, এবং যে জ্ঞানযোগের ধারণা রেখেছেন তা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় হিন্দুত্বকে আটকে দেয়, এই বৈপরীত্য কে তুলে আনতে হবে জনসমক্ষে।নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকেও হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদের করে নিতে চান। কিন্তু নেতাজির রাজনৈতিক দর্শন হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।নেতাজি ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী যিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিতে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান — সকল ধর্মের মানুষকে একত্রিত করেছিলেন। আইএনএর যুদ্ধ-স্লোগান "জয় হিন্দ" কোনো ধর্মীয় বার্তা বহন করে না — এটি একটি ভারতমাতার প্রতি ধর্মনিরপেক্ষ আবেদন। নেতাজি ১৯৪০ এ ফরোয়ার্ড ব্লকের সাথে মুসলিম লীগের সংযুক্ত ফ্রন্ট তৈরিতে আগ্রহী হন, যা হিন্দু মহাসভার কট্টর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়, আব্দুর রহমান সিদ্দিকী মেয়র নির্বাচিত হন এই ফ্রন্টের দ্বারাই, ইতিহাসের সেই মহুর্তে তিনি বুঝতে পারেন যে হিন্দু মুসলিম যৌথ অংশগ্রহন অনেক বেশি জরুরি ব্রিটিশ দের বিপক্ষে। এছাড়া, ১৯৩০ নাগাদ তার নিজের মেয়র থাকাকালীন সময়ে তিনি যে ধরণের কর্মসূচি নিয়েছিলেন তা সরাসরি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার মডেলের দিকও ইঙ্গিত করে, তাঁর ভবিষ্যৎ ভারতের পরিকল্পনায় সুস্পষ্টভাবে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা অর্থনীতির কথা ছিল। নেতাজির ইউরোপ-প্রবাস এবং জার্মানি-জাপানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ককে অনেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি — ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়। এই মূলগত পার্থক্যটি স্থাপন করা আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি। নেতাজি এবং সাভারকার — উভয়ই ব্রিটিশ বিরোধী ছিলেন, কিন্তু দুজনের ভারত-দর্শন ছিল মৌলিকভাবে ভিন্ন। সাভারকার যেখানে একটি হিন্দু রাষ্ট্র চাইতেন, নেতাজি চাইতেন একটি সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ ভারত যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান।বাংলার বামপন্থী রাজনৈতিক পরিসরকে এই ব্যাপারগুলি নিয়ে ভাবতে হবে, তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক সংকটে ভুগছে — যাকে আমরা আদর্শগত আউটসোর্সিং বলতে পারি। রাশিয়া, চীন বা পশ্চিম ইউরোপের মার্কসবাদী তত্ত্বকে যান্ত্রিকভাবে ভারতীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করার এই প্রবণতা বামপন্থাকে ভারতীয় সমাজের গভীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, এ সমালোচনা নতুন নয়, আজকেরও নয়। কিন্তু আজকের নিরিখে যে বদল প্রয়োজন তার কতটা কাছাকাছি তারা আসতে পারছেন বলা মুশকিল। বেশ কিছু বদল দেখা যাচ্ছে,কিন্তু গণ কর্মসূচির মধ্যে সেগুলো আসছে না।সমস্যাগুলি নির্দিষ্ট করে বলা যাক:প্রথমত, ধর্মের প্রতি সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি- মার্কসের "ধর্ম হল আফিম" উক্তিটির প্রেক্ষাপট ছিল ইউরোপীয় ক্যাথলিক চার্চের শ্রেণিগত ভূমিকা। কিন্তু ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য — ভক্তি আন্দোলন, কবির, রবিদাস, মীরাবাই — বহুক্ষেত্রেই সামাজিক বিদ্রোহের ভাষা হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। কবির যখন বলেন: "মন না রঙ্গায়ে, রঙ্গায়ে জোগী কপড়া" — তিনি একটি গভীর সামাজিক সমালোচনা করছেন। ভারতীয় বামপন্থা এই সূক্ষ্মতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।তাদের ধর্মের এই ক্ষেত্রটিকে চিহ্নিত করতে হবে এবং লাগাতার প্ৰচার করতে হবে।দ্বিতীয়ত, পরব সংস্কৃতির সাথে সংযোগের অভাব- ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনে পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মতো বাস্তব অর্জন থাকলেও, উৎসব সংস্কৃতির প্রশ্নে বামপন্থা প্রায়শই একটি "উপর থেকে আরোপিত" অনুভূতি দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্গাপূজা, কালীপূজা, মহরম পালনের সাথে বামদলের সম্পর্ক কখনো পারস্পরিক এবং সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন পর্ব পালা অনুষ্ঠান, বিবিধ উৎসব বহু বছর ধরে হয়ে আসছে, এই পরিসরগুলিতে একেবারেই কোন রাজনীতি নেই বা রাজনৈতিক বোধ বা চেতনা নেই এই গোঁড়ামি একান্তভাবে বর্জনীয়, বরং এই পরিসরকে ছদ্ম হিন্দুত্ত্ববাদ থেকে কিকরে আগলানো যায় তা ভাবতে হবে। কেবল পুজোর মণ্ডপের বাইরে স্টলকেন্দ্রিক ভাবনা দিয়ে চলবেনাতৃতীয়ত, শ্রেণি-বিশ্লেষণের একমাত্রিকতা। ভারতীয় সমাজে শ্রেণি ও জাত প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু বাংলার বামপন্থা জাতের প্রশ্নকে শ্রেণির মধ্যে দ্রবীভূত করে দেখার ভুল করেছে। দলিত আন্দোলন, আদিবাসী অধিকার — এই প্রশ্নগুলিতে বামপন্থার অবস্থান প্রায়ই অস্পষ্ট ছিল। এই নিয়ে একটি সম্পূর্ন দীর্ঘ আলোচনা দরকার- সেই দিকে না গিয়েও বলা যায় যে, একটি সংখ্যালঘু শিক্ষিত চাকরিজীবী বর্গের বাইরে যে বিপুল মধ্যম বর্গ রয়েছে গ্রাম মফস্বলে তাদের সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে, তাদের ভেতর থেকে নেতা তৈরি করতে হবে এবং তাদের মধ্যে দিয়েই দেশীয় চিন্তা চেতনাকে নিম্ন স্তরে নিয়ে যেতে হবে। এই বর্গের মানুষের শহুরে এলিট কালচারের প্রতি যে ক্ষোভ রয়েছে প্রথমত তাকে সম্মানের সাথে বুঝতে হবে। যে ধরণের নেতৃত্ব এই বিভাজনকে উস্কে দিতে পারে তাদের পরিহার করতে হবে।চতুর্থত, তাত্ত্বিক জড়তা। লেনিন, মাও বা গ্রামশির পাঠ গুরুত্বপূর্ণ — কিন্তু ভারতীয় বাস্তবতায় কার্যকর বাম-তত্ত্বের জন্য ভারতীয় চিন্তক ও ঐতিহ্যের সাথে গভীর সংলাপ অপরিহার্য। এমন বহু ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা একই সাথে গভীরভাবে ভারতীয় এবং সামাজিকভাবে প্রগতিশীল। বাম নাগরিক পরিসরের জরুরি প্রয়োজন এই ব্যক্তিত্বদের নতুনভাবে আবিষ্কার করা এবং তাদের চিন্তাকে বর্তমান প্রাসঙ্গিকতায় উপস্থাপন করা:ভগত সিং — কমিউনিস্ট ছিলেন, কিন্তু একজন ভারতীয় কমিউনিস্ট। তাঁর Why I Am an Atheist প্রবন্ধটি ভারতীয় যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের সাথে সংলাপে লেখা। তিনি একই সাথে জালিয়ানওয়ালা বাগের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন এবং বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলেন।আম্বেদকর — বামপন্থা আম্বেদকরের সাথে তার সম্পর্ক নতুনভাবে নির্মাণ না করলে দলিত-বহুজন সমাজের সাথে সংযোগ অসম্ভব। আম্বেদকরের বৌদ্ধ-দর্শনের অনুপ্রেরণা এবং তাঁর সাংবিধানিক প্রজ্ঞা — দুটিই ভারতীয় বামপন্থার জন্য অমূল্য সম্পদ।পেরিয়ার — দক্ষিণ ভারতের এই মহান যুক্তিবাদী ঐতিহ্য বাংলার বামপন্থায় যথেষ্ট চর্চিত নয়।বিরসা মুন্ডা — আদিবাসী মুক্তিসংগ্রামের এই মহান নায়ক "ধরতি আবা" (পৃথিবীর পিতা) হিসেবে পরিচিত। তাঁর আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও জমিদারি উভয়ের বিরুদ্ধে ছিল — এটি বাংলার বাম-আন্দোলনে কতটা উপস্থিত?তিতুমীর এবং সিধো-কানহু — বাংলার নিজস্ব বিদ্রোহের ইতিহাস। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা শুধু ব্রিটিশবিরোধী নয়, জমিদার-বিরোধীও ছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ — (১৮৫৫)— শ্রেণি, জাতি এবং উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে একটি ত্রিমুখী লড়াই।সর্বোপরি, গৌতম বুদ্ধ, যিনি নিজে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিপরীতে হিংসার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন, যার ভারতীয় ঐতিহ্য নিয়ে আজকের হিন্দুত্ববাদীরা শ্লাঘা বোধ করতে চান। এছাড়া রয়েছেন বিংশ শতকেরই অগণিত ভারতীয় চিন্তক, যেমন ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, ক্ষিতিমোহন সেন কিংবা স্বামী লোকেশ্বরানন্দ যারা হিন্দু ধর্মের ওপর সবিস্তার আলোচনা করেছেন একাধিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা হিন্দুত্ত্ববাদী চিন্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের নেশন বিরোধী চিন্তা, যা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই মুহূর্তে।হিন্দুত্বের নতুন আধিপত্যের মুখে বামপন্থার জন্য কিছু পরিষ্কার সতর্কবার্তা:প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া চলবে না- শ্যামাপ্রসাদকে শুধু খারিজ করা বা হিন্দু প্রতীককে আক্রমণ করা বামপন্থাকে "হিন্দু-বিরোধী" তকমা পেতে সাহায্য করবে — যা হিন্দুত্ববাদীরাই চায়। হিন্দু ধর্মকে অন্যভাবে উপস্থাপন করাই এর কার্যকর বিকল্প হতে পারে।অতীতের আদর্শিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি চলবে না- ১৯৬৮-৬৯ সালের প্রেসিডেন্সি কলেজ পত্রিকায় "ইয়াঙ্কি সংস্কৃতি ধ্বংস করো" — এই ভাষা ও মনোভঙ্গি আজকের সমাজে অকার্যকর, আন্তর্জাতিক অবস্থান অবশ্যই জরুরি কিন্তু তার ভাষা এবং উপস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে। ৯০ পরবর্তী সময়েও যা বাস্তব ছিল, আজকের সমাজমাধ্যম নির্ভরতার দিনে আর তা বাস্তব প্রতিরোধের বয়ান নয়। সাম্প্রতিক ভারতে বেশ কিছু নতুন রেটরিক উঠে আসছে যুব আন্দোলনের ভেতর থেকে, সেগুলিকে নিয়ে ভাবতে হবে গভীরতার সাথে।পরিচয়-রাজনীতির ফাঁদে পড়া চলবে না - হিন্দুত্বের সাথে "মুসলিম পরিচয়"-এর বিপরীত মেরু হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করলে বাংলার হিন্দু কৃষক ও মধ্যবিত্ত থেকে বামপন্থা আরও দূরে সরে যাবে। শহরের ও আধা শহরের একটি বিরাট অংশের মানুষ হিন্দুত্ত্ববাদী প্রচারে ইতিমধ্যেই নিমজ্জিত, কেবল সংখ্যালঘু অধিকারের বয়ান একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং পরিত্যাজ্য তাদের কাছে। বরং এই মেরুকরণের পরেও হিন্দু সমাজের প্রান্তিক বা মধ্যবিত্তের অবস্থার যে কোন বদলই হচ্ছেনা – এটিকে সামনে আনা কার্যকর হলেও হতে পারে।বাম বুদ্ধিজীবিতার একটি বড় দুর্বলতা হল ভারতীয় দর্শনের সাথে তার দূরত্ব। এই দূরত্ব কমাতে হবে — এবং দেখাতে হবে যে ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যেই এমন উপাদান আছে যা সামাজিক সাম্যের পক্ষে:চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন — ভারতের সবচেয়ে পুরনো বস্তুবাদী দার্শনিক ঐতিহ্য। "প্রত্যক্ষমেকং প্রমাণম্" — প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ — এই দার্শনিক অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনোভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।ভক্তি আন্দোলন — কবির, রবিদাস, মীরা, নামদেব — এঁরা সবাই বর্ণ-শ্রেণির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন ধর্মের ভাষায়। ভারতীয় বামপন্থা যদি এই ঐতিহ্যকে নিজেদের করে নিতে পারে, তাহলে ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা কঠিন হবে।বাউল-ফকির ঐতিহ্য — বাংলার এই অসাধারণ সম্পদ হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বাইরে একটি মানবতাবাদী আধ্যাত্মিকতার কথা বলে। লালন ফকির বলেছেন: "সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে" — জাতি-ধর্মের সমস্ত বিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি।রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ — রবীন্দ্রনাথ না বামপন্থী ছিলেন, না হিন্দুত্ববাদী। তাঁর জাতীয়তাবাদ-সমালোচনা (Nationalism, ১৯১৭), তাঁর গান্ধী-সমালোচনা, তাঁর রাশিয়া-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা — এই সবকিছু মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র ভারতীয় মানবতাবাদের প্রকল্প। বামপন্থা রবীন্দ্রনাথকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।এক্ষেত্রে আর একটি বিরাট ভূমিকা নিতে পারে মহাভারত। বহুস্বরী, বহুমাত্রিক মহাকাব্য এটি— কোনো মনোলিথিক "হিন্দু আদর্শের" পাঠ্যপুস্তক নয়। এতে রয়েছে:শান্তিপর্ব — যেখানে রাজনীতি, নীতি ও ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর আলোচনা আছেকর্ণের আখ্যান — বর্ণব্যবস্থার শিকার একজন যোদ্ধার ট্র্যাজেডিদ্রৌপদীর কণ্ঠস্বর — যিনি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেনএকলব্যের গল্প — বর্ণীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি অসাধারণ সাক্ষ্যইরাবতী কর্ভে তাঁর গ্রন্থে মহাভারতকে একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে পড়েছেন — দেবতার মহিমাগাথা হিসেবে নয়। এই ধরনের পাঠ বামপন্থার জন্য মূল্যবান সম্পদ। বেদ এবং উপনিষদেও এমন উপাদান আছে যা হিন্দুত্বের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার বাইরে। "সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ, সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ" — "সকলে সুখী হোক, সকলে নিরোগ হোক" — এই উপনিষদিক উচ্চারণের সাথে সামাজিক ন্যায়বিচারের সংযোগ স্থাপন করা কঠিন নয়।পাশাপাশি, হিন্দুত্ববাদী শিক্ষা-প্রকল্পের মোকাবিলায় বামপন্থাকে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল তৈরি করতে হবে:পাঠ্যক্রম বিকল্প: মুক্তিসংগ্রামের বহুকণ্ঠস্বর ইতিহাস — হিন্দু, মুসলিম, দলিত, আদিবাসী সবার অংশগ্রহণ — পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলতে হবে। এনসিইআরটি পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একাডেমিক প্রতিরোধ সংগঠিত করতে হবে।গবেষণা অগ্রাধিকার: সাবলটার্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলার ইতিহাস পুনর্লিখন — তিতুমীর, সিধো-কানহু, নামশূদ্র আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন — এই বিষয়গুলিতে নতুন গবেষণা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন, ভারতীয় ধর্ম, বেদান্ত, মীমাংসা, চার্বাক কে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা।সেমিনার ও প্রকাশনা: হিন্দুত্ববাদী সেমিনারের বিরুদ্ধে বিকল্প একাডেমিক পরিসর তৈরি করতে হবে — যেখানে বাংলার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলগত চরিত্র কে সামনে আনতে হবে।কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য — গণনাট্য, কফিহাউসের আলোচনা, লিটল ম্যাগাজিন, রবীন্দ্রসংগীত থেকে বাউল — এই সবকিছুকে পুনরায় সক্রিয় করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি-প্রকল্প মূলত একটি একঘেয়েমির সংস্কৃতি — সেই একঘেয়েমির বিরুদ্ধে বাংলার বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা একটি নিশ্চয়ই দিয়ে রাখা প্রয়োজন: ভারতীয়করণের নামে বামপন্থা যেন ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতির দিকে ঝুঁকে না পড়ে। লক্ষ্য হবে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানবতাবাদী ও সামাজিক ন্যায়বিচারের উপাদান গ্রহণ করা — ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি নয়। বাংলার বাম উদারনৈতিক পরিসরের সামনে পরিস্থিতি কঠিন — কিন্তু সম্পদ আছে, ঐতিহ্য আছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের দৈনন্দিন লড়াই আছে। বাংলায় হিন্দুত্বের শিক্ষা-প্রকল্প — শ্যামাপ্রসাদকে কেন্দ্র করে বিনির্মিত — একটি সুচিন্তিত গ্রামশিয়ান কৌশলের অংশ। এই কৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নতুন হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তবে হিন্দু ধর্মের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য হিন্দুত্বের একচেটিয়া দাবির চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং অনেক বেশি প্রগতিশীল। সেই সমৃদ্ধিকে চিনতে পারা এবং তার সাথে সংলাপ করতে পারাই বামপন্থার আজকের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ। যে দ্বিজাতি তত্ত্বর ভুত চাপানোর চেষ্টা চলছে ও চলবে বাঙালির উপর মনে রাখতে হবে যে, তা সুচিন্তিত কিন্তু আর বিরাট মজবুত কিছু নয়। দুটি পৃথক রাষ্ট্রের এতদিনের অভিজ্ঞতার পর নতুন করে এই বিভাজনের উপর একটি জাতিকে প্রভাবিত করা অত সহজও হবেনা, দীর্ঘদিনের যে চিন্তা পরিসর বা জ্ঞানতাত্বিক কাঠামোয় পশ্চিমবাংলা লালিত, তার উপর ভরসা রেখে আরো বেশি দেশীয় এবং নিজস্ব ইতিহাসের চর্চা করলে ইতিবাচক ফল আসবে বলে আশা করাই যায়।
  • জনতার খেরোর খাতা...
    ভালো মিডিয়া - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | একটু আগে দেখলাম, সবেধন 'বাম' বিধায়কও বিজেপির বিধায়কদের সঙ্গে কালো ব্যাজ লাগিয়ে হাঁটছেন। 'সাংবাদিক নিগ্রহ'এর প্রতিবাদে। উনিও 'ভালো' হয়ে গেছেন, কিনা এখনও জানিনা। কিন্তু এই সুযোগে দলে দলে বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্রের মতো সাংবাদিকের জন্ম হচ্ছে চারদিকে, আর তাঁরা বিষ ছড়িয়ে চলেছেন। কোনো রাখঢাক নেই। মুখ্যমন্ত্রী আকারে ইঙ্গিতে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কথাবার্তা বলছেন। বিখ্যাত 'সাংবাদিক' ময়ূখরঞ্জন ঘোষ খোলাখুলি লিখেছেন, মিছিলে 'গোলমাল' নাকি করেছে 'দুধেল শুক্রবাড়ি গ্যাং'। এতেও একটা বানান ভুল। এবং গ্রেপ্তার অতি অবশ্যই কেবল এবং কেবলমাত্র সংখ্যালঘুরা। তথাকথিত সাংবাদিক নিগ্রহের প্রতিকারই হচ্ছে বটে। এছাড়াও তিনি গর্ব করে আরও জানিয়েছেন, যে, নরেন্দ্র মোদির ছবিতে আগুন লাগানোর জন্য একজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। দেশে কোনদিন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বা প্রধানমন্ত্রীর ছবি বা কুশপুত্তলিকায় আগুন দেওয়া বেআইনী হল, এই প্রশ্ন করার সাহস অবশ্য বিদ্যাসাগর কলেজের কোনো 'সাংবাদিক'এর হয়নি। হবেও না। তাঁরা ডিম-পাথর ছোঁড়া, নিগ্রহ করাকে 'জনরোষ' বলে উদযাপন করেছেন, এবার কুশপুত্তলিকা জ্বালানোয় গ্রেপ্তারকে 'কী ভালো কী ভালো' বলে লাপাবেন, বিজেপি যখন স্পনসর করবে তখন বাক-স্বাধীনতার পক্ষে মিউ মিউ করে জ্বলে উঠবেন, ছাতার মাথা ডিম্মিডিয়ার বেচারি কর্মীদের কাছে শিরদাঁড়া বলতে এর চেয়ে বেশি কেউ কিছু আশাও করেনা। কিন্তু বামদের কাছে এর চেয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল নিঃসন্দেহে। কারণ, এক, সিপিএমের লাহেক আলি এখনও বন্দী, তাঁর জন্য মিছিল হয়েছে, বামরাই করেছেন। দুই, 'ভালো তৃণমূল' আর সিপিএম ছাড়া কাউকে রাজ্য সরকার মিটিং মিছিলের অনুমতি দিচ্ছেনা। পরশু আরশোলাদের দেয়নি। কাল তৃণমূলকে দেয়নি। এটা বিজেপির কৌশল, বামদের সেই সুযোগ কাজে লাগানোই উচিত। লাগাচ্ছেনও, এবং একদম ঠিক করছেন। কিন্তু সেটার বিনিময়ে কৃতজ্ঞতাবশত যদি বিজেপির সঙ্গে কালো ব্যাজ লাগিয়ে হাঁটতে হয়, তাহলে ঋতব্রতর সঙ্গে মোস্তাফিজুরের একবিন্দুও তফাত থাকেনা।স্বাধীন বামঘেঁষা মিডিয়ার লোকজনের কাছেও এর থেকে বেশি প্রত্যাশা ছিল। তাঁরা আমতা আমতা করছেন। অথচ কথা পরিষ্কার ছিল। গোদি মিডিয়ায় আদৌ কোনো সংবাদমাধ্যম না। তার মানে এই নয় যে তাদের ধরে ঠেঙিয়ে দেওয়া যায়। ওটার নিন্দে হওয়াই দরকার। কিন্তু ওইটুকুই। তার বাইরে, খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার, এক, এর চেয়ে অনেক বড় বড় হিংসার ঘটনা গোটা দেশ জুড়ে এই আন্দোলনে ঘটেছে, সরকারপক্ষ একতরফা ভাবে ঘটিয়েছে। জুনেইদ বলে একটি ছেলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছিল যন্তর মন্তরে, অভিযোগ, বহু দূরে উত্তরপ্রদেশে তার বাড়ির লোক, এমনকি বোনের শ্বশুরবাড়ির লোককেও পাকড়াও করা হয়েছে, স্রেফ সাম্প্রদায়িক জিগির দেবার জন্য। বিহারে পুলিশ খোলা বন্দুক হাতে গুলিয়ে চালিয়েছে গতকালও। দিল্লিতে পেলেট গানে আহত করেছে ছেলেমেয়েদের। এসব ছেড়ে দিয়ে, কোথায় দুটি মাথা গরম ছেলে দুজন সাংবাদিক নামধারীকে হেনস্থা করেছে, তাও খালি হাতে, নিঃসন্দেহে সেটাও অনুচিত কাজ, কিন্তু তার গুরুত্ব বেশি হল? ডিম-পাথর-নিগ্রহকে এঁরা 'জনরোষ' বলে চালিয়েছিলেন, সাংবাদিকতার নাম করে ন্যক্করজনক ভূমিকা পালন করেছেন, সেসব কী ভুলে যেতে হবে নাকি? এই সমস্ত কিছু নিয়ে কিন্তু দিল্লিতে আলোচনা হয়েছে। ছাত্রদের শর্ত সরকার মেনে নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যে, আন্দোলন সংক্রান্ত সমস্ত এফআইআর প্রত্যাহার করা হবে। তার মধ্যে সেদিনের মিছিলের এফআইআরও আছে। সেটা কোনো দয়া দাক্ষিণ্য না। এবং সেই প্রতিশ্রুতি না মেনে সাড়ম্বরে গ্রেপ্তার চলছে। খুব স্পষ্টত পশ্চিমবঙ্গ সরকার দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। সম্পূর্ণ উল্টোদিকে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিচ্ছেন 'শুক্রবারি' দের নিয়ে, এবং নতুন করে ধরপাকড় শুরু করেছেন। দিল্লির প্রতিশ্রুতিকে মিথ্যে প্রমাণ করছেন। তিনি কি আজকাল 'মোদির গ্যারান্টি' মানছেন না? আরেক দফা আন্দোলন শুরু হলে কিন্তু ধর্মেন্দ্র প্রধান না, হয়তো তাঁর পদই চলে গেল। এই কথাগুলো সজোরে না বলার অর্থ কিন্তু একটাই। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে তোল্লাই দেবার রাস্তা খুলে দেওয়া। আসলে মাথার মধ্যে এখনও ঢুকে বসে আছে, ওরে বাবা ওরা হল প্রতিষ্ঠান। সংবাদের বড়দা। ডিলার এবং হোলসেলার। তা কিন্তু আদৌ না। এই বিরাট আন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছে ওদের কেউ পোঁছেনা। চাট্টি বুড়ো লোক ছাড়া কেউ দেখেও না। গোদি-মিডিয়া আসলে যে সংবাদ-প্রতিষ্ঠান, এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। হ্যাঁ, সকলেরই কিছু পরিচিত লোকজন ওখানে কাজ করেন, সে তো নানা কোম্পানিতেই করেন, তা বলে সেই কোম্পানিগুলোকে মাথায় তুলে রাখতে হবে নাকি? গোদি মিডিয়াকে সম্পূর্ণ দুধেভাতে করে দিন, এবং সর্বাঙ্গীণ বয়কট করুন। আমি তো প্যানেলিস্টদেরও যেতে বারণ করব, যদি যানও, অনুগ্রহ করে সেগুলো এসে সমাজমাধ্যমে শেয়ার করবেন না। আর স্বাধীন মিডিয়াকে বলব, সব্বাইকে বলব, কারণ, আমরা সবাই এখন মিডিয়া, আপনারা যদি এই পুরোটাতে একটুও আমতা-আমতা করেন, তার মানে কিন্তু একটাই। আপনাদের কথাগুলো মানুষের কানে পৌঁছবেনা। ওদের যন্ত্র ঠিকই কাজ করছে, সাম্প্রদায়িক বিভাজনটা কিন্তু ঠিকই পৌঁছবে। মুস্তাফিজুর যা খুশি করুন, সিপিএম-তৃণমূল-আপ-কংগ্রেস নিজের লাইনে চলুক, আপনি এইটাই চান কিনা সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।
    যেখানে উত্তর নেই - Pameli Ghosh | আমার মনে হয়, আজকাল আমার চিন্তাভাবনা এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজম—এই দুই দর্শনের মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। কখনও মনে হয় এক্সিস্টেনশিয়ালিস্টদের কথাই ঠিক, আবার কখনও মনে হয় অ্যাবসার্ডিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তবতার কাছাকাছি। এই দ্বন্দ্ব থেকেই আমি বারবার ভাবতে বাধ্য হই। যখন প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার করা শুরু করি, তখন আমার মনে হতো—জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমি পৃথিবীতে কেন এসেছি? মানুষের অস্তিত্বের কোনো চূড়ান্ত অর্থ কি আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞান, দর্শন এবং বিভিন্ন লেখালেখি পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব মূলত এক বিশাল কাকতালীয় ঘটনার ফল। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অসংখ্য শর্ত পৃথিবীতে একসঙ্গে মিলে গিয়েছিল বলেই এখানে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে আগে থেকে নির্ধারিত কোনো উদ্দেশ্য ছিল—এমন কোনো প্রমাণ নেই। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব নিজে আমাদের জীবনের কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ দেয় না। এখানেই এক্সিস্টেনশিয়ালিজম আমার কাছে অর্থবহ মনে হয়। তারা বলে, জীবনের আগে থেকে কোনো অর্থ না থাকলেও মানুষ নিজের জীবনকে অর্থ দিতে পারে। একজন মানুষ যদি সারা জীবন নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে, শেখে, সত্যের অনুসন্ধান করে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, ভালোবাসতে শেখে, সততার সঙ্গে বাঁচে—তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে হয়তো ফিরে তাকিয়ে বলতে পারবে, "হ্যাঁ, আমার জীবন অর্থপূর্ণ ছিল।" সেই অর্থ মহাবিশ্ব দেয়নি; সে নিজেই তৈরি করেছে। এই ভাবনাটা আমার কাছে গভীরভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু তারপরই অ্যাবসার্ডিজমের কথা মনে পড়ে, আর তখন আমার মনে হয়, বাস্তবতা বোধহয় আরও কঠিন। ধরো, একজন মানুষ সারা জীবন অবহেলিত হয়েছে। সে ভালোবাসা পায়নি, প্রথাগত শিক্ষা বা নতুন কোনো কিছু শেখার সুযোগ পায়নি, সমাজ তাকে বারবার বঞ্চিত করেছে। তার জীবন কেবলই সংগ্রাম আর কষ্টে কেটেছে। তাহলে তাকে যদি বলা হয়, "নিজের জীবনের অর্থ নিজেই তৈরি করো", তাহলে কথাটা কি তার প্রতি ন্যায়সঙ্গত শোনায়? এই জায়গাতেই অ্যাবসার্ডিজম আমাকে স্পর্শ করে।সব মানুষের কি সমান সুযোগ আছে অর্থ তৈরি করার?কেউ জন্ম থেকেই সুবিধাপ্রাপ্ত, কেউ নয়।তাহলে কি অর্থ তৈরির ধারণাটাও কিছুটা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের জন্য সহজ?কারণ জীবন যে কারও প্রতি ন্যায়বিচার করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কে ভালোবাসা পাবে, কে পাবে না; কে সুযোগ নিয়ে জন্মাবে, আর কে বঞ্চিত হবে—এসবই অনেকটাই কাকতালীয়। জীবন কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, কোনো ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিও দেয় না। তবু জীবন চলতে থাকে।তাই আমার মনে হয়, এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজম—দুটোর মধ্যেই সত্যের একটা অংশ রয়েছে। একদিকে আমি বিশ্বাস করি, মানুষ নিজের মূল্যবোধ, ভালোবাসা, কৌতূহল, জ্ঞানচর্চা ও নৈতিকতার মাধ্যমে নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে। অন্যদিকে আমি এটাও অস্বীকার করতে পারি না যে, সেই অর্থ তৈরি করার সুযোগও সবার জীবনে সমানভাবে আসে না। মানুষের জীবনের পরিস্থিতি, সৌভাগ্য, বঞ্চনা—এসবের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। হয়তো এই কারণেই আমি কোনো একটিমাত্র দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারি না। আমার মনে হয়, মহাবিশ্বের নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য নেই; কিন্তু মানুষ চাইলে নিজের জীবনে অর্থ খুঁজে নিতে পারে। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সেই পথ সবার জন্য সমান নয়। এই দুই উপলব্ধিই আমার কাছে সত্য বলে মনে হয়। তাই আজও আমি এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি—কোনোটিকেই পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারছি না, আবার কোনোটিকেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতেও পারছি না।
    চিত্রকল্প ও মনখারাপ - পাগলা গণেশ | তারপর একদিন মেঘ এল,খুব বৃষ্টি হল সেদিন।প্রলয়ের মতো।বাড়িতে বসে আমি তখন নিজের বুকটাকে খুলে মেলে ধরলাম বৃষ্টিতে,ভেতরের সব আবর্জনা ধুয়ে গেল,আমি আবার ফিরে গেলাম ঘরের ভেতর।এরকম হতেও পারত,এটা চিত্রকল্প না হয়ে বাস্তব হতো যদি?যদি তুমি ছেড়ে গেলে ধুয়ে নেওয়া যেত তোমার স্মৃতি,মা মরে গেলে যদি তার হাসি বারবার মনে পড়ে বুকটা ভার না করত আর?-ধুয়ে নিলে একবার!এমন তো হতেই পারত,শুধু আবছা অবশেষ পড়ে থাকত স্মৃতির,মাঝে মাঝে শেষ পাতের আচারের মতো জিভে দিতাম একটু,তেমন কাতর করত না আমায়।কিন্তু এমন বৃষ্টি হয় না এ ধরায়,যাতে মন ধোয়া যায়।লোকে পাপ ধোয় যদিও,মন ধোয় না কেউ।
  • ভাট...
    commentরমিত চট্টোপাধ্যায় | এই লিংকটায় গিয়ে এতজন নাৎসিকে একসাথে দেখতে পেয়ে বুঝলাম, কোনোদিন নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে এইসব জাতিবিদ্বেষী দের জন্য নূরেমবার্গ এর মত ট্রায়াল কতটা জরুরি। এইসব বিদ্বেষকে সারজল দিয়ে দশকের পর দশক জুড়ে বাড়ানো হয়েছে।
    commentদিদিমনি মাওবাদী চিনতেন, আমি অছাত্র চিনি | https://www.facebook.com/100006115038599/posts/4404252206455237/
    commentX | সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা আর নেহা বোরা - এই তিন জনেই হৃদয় জিতে নিয়েছে! তবে অভিজিতও অন‍্যদের স্পেস দিয়েছে এটা মানতে হবে। আরো ভালো লাগলো আমাদের কলকাতা খুব পিছিয়ে পড়েনি দেখে
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত