• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা পর্ব ১১

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৩ মে ২০২১ | ১১০৪ বার পঠিত
  • আমাদের পুরানো এজমালি বাড়ির একটা অদ্ভুত প্যাটার্ন ছিল। পুসুমার মুখে শুনেছিলাম একটা সময় বাড়িটা ছিটে বেড়ার ছিল। একটু বেশি ঝড় বৃষ্টি হলে এলাকার লোকজন খোঁজ নিতে আসত বাড়ির লোকজন চাপা পড়ে গেছে কিনা। যদিও এ চত্বরে পাকা বাড়ি সে অর্থে আমিও দেখিনি ছোটবেলায়।বাড়িতে গরু পুষলেও আমার বাবা কাকুরা আসেপাশের বাড়ি থেকে ভাতের ফ্যান চেয়ে আনত গরুকে খাওয়াবে বলে। আমার বাবা নাকি দশটা পাঁচটা করে ইঁট কিনে জমিয়ে ইঁটের পাঁজা তৈরী করে সামনের অংশটুকু পাকা করে। তাই বাড়িটা দুভাগে ভাগ। একদিকটা পাকা আর একদিকটা টালি আর করোগেটেড টিনের ছাউনি। মনে আছে বর্ষাকালে টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে একটা ঘ্যানঘেনে আওয়াজ হত।আর এই দুভাগের মাঝখান দিয়ে সরু প্যাসেজ দিয়ে এগিয়ে সিঁড়ির জানলার সামনে কলতলা। আমার ছোটবেলায় যখন বাড়িটা একতলা ছিল তখন থেকেই দেখেছি ওই পাকা অংশের সামনের দিকে তিনটে ঘর, তার মধ্যে দুটো দোকানঘর, এই ঘর দুটো বাড়ির ভিতর থেকে যাওয়া যেত। যার একটাতে ছিল সাইকেল রিপেয়ারিং এর দোকান। আর দোকানঘরের সামনে দিয়ে লম্বা দালান । দালানের শেষ প্রান্তে সিঁড়ি । সিঁড়ির কোনার ঘরটা ঠাকুর ঘর। ঠিক এমন ভাবেই দোতলা হওয়ার সময় দোতলায় তিনটে ঘর সামনে লম্বা বারান্দা । আর দোতলায় রাস্তার দিকে টানা লম্বাঝুল বারান্দা। দোতলা হওয়ার পর দক্ষিন দিকে আমাদের ঘর। মাঝে পাপার ঘর আর সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই কোনার ঘরটা কাকুর। যৌথবাড়িতে হাঁড়ি আলাদা হওয়ার পর আমাদের ওই একটাই ঘর। খাবার ঘর, বসার ঘর, শোওয়ার ঘর সব কিছু সেখানেই। ঘরের সামনের দালানের একপাশে মা রান্না করত। আমার নিজের কোনও ঘর ছিলনা। অনেক পরে রাস্তার ধারের বারান্দায় প্লাইউড এর পার্টিশন দিয়ে ঘিরে আমি আমার থাকার জায়গা বানিয়েছিলাম।

    আগেই বলেছি উচ্চ্ মাধ্যমিকের দোরগোড়ায় গিয়ে আলাপ হয়েছিল রণজয়ের সাথে । প্রথম দিন রণজয়ের বাড়িতে গিয়ে ভাল লেগেছিল, তিনতলার পুরোটা নিয়ে ওর নাচের ঘর, সবচেয়ে টেনেছিল ওই ঘরের একটা দেওয়াল জুড়ে বেলজিয়াম গ্লাসের আয়না। আর ঘরের লাগোয়া একটা সুন্দর গোলাপি রঙের বাথরুম। যেটার নাম দিয়েছিলাম পিংক সিটি। পরবর্তী কালে এই গোলাপি গোসলখানার জন্য গোলাপি কিছু দেখলেই সংগ্রহ করা আমার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল।এ যেন আমার কাছে একটা স্বপ্নের জগত। সবমিলিয়ে এহেন সুপুরুষ সুদর্শন শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীর সাথে সকাম প্রেমে ভেসে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আস্তে আস্তে আমার নাচের প্রতি ভাললাগা যেন আমি রনজয়ের মধ্যেদিয়ে ফেরত পেতে শুরু করলাম। আর তাই আমার হারিয়ে যাওয়া ভাললাগা ভালবাসায় পরিণত হতে সময় লাগেনি।

    রণজয়ের বাবা রেলে চাকরি করতেন, মা ছিলেন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা।রণজয়ের দাদা ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে কলকাতার বাইরে চাকরি করত।আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে আগেই রণজয়ের বাবা মারা যায়। পরবর্তীকালে রণজয় আমার সম্পর্ক যত এগিয়েছে তার থেকেও বেশি এগিয়েছিল আমার আর রণজয়ের মায়ের সম্পর্ক। উনি নিজে ছিলেন বাংলার শিক্ষিকা। লেখালেখি আর পড়াশোনার কারণে আমাদের প্রচুর গল্প হত। শুধু তাইনা, রণজয়ের বাবার পর ওনার সমস্ত লেখার পাঠক ছিলাম আমি। এমন কি বাজার দোকান নাটক সিনেমা, বইমেলা ওনার সবকিছুর সঙ্গী ছিলাম আমি। পারমিতার একদিন দেখতে গিয়ে রণ মন্তব্য করতে ছাড়েনি আসলে 'ওটা ' ওর মা আর আমার সম্পর্ক।উনি পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু বুঝতেন না। ওনার জন্যই কোলকাতার কলেজের বিজ্ঞান পড়তে পড়তে একটা বছর নষ্ট করে বাবাকে লুকিয়ে বাড়ীর কাছের কলেজে সাম্মানিক বাংলা নিয়ে ভর্তি হওয়ার সাহস পেয়েছিলাম আমি। রনজয়ের তুতো ভাইবোনের সকলেই কোনও না কোনও স্কুল বা কলেজে পড়ায়। রণই একমাত্র যে কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডী মাড়ায় নি।

    উচ্চ মাধ্যমিকে রণজয়কে দেওয়া কথা কতটা রাখতে পেরেছিলাম জানিনা, তবে যা নম্বর পেয়েছিলাম তা নামী কলেজে সাম্মানিক বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার মত না। তবে পিতৃআদেশ পালন করার জন্য জয়েন্ট এন্ট্রান্সে বসলেও শিকে ছেঁড়েনি কারণ আমি প্রায় সাদা খাতা জমা দিয়েছিলাম। আবারও শুরু হলো দড়ি টানাটানি। সাহিত্য আর বিজ্ঞানের। ভেবেছিলাম এবার অন্তত আমার পিতৃদেব হার মানবেন। বাংলায় যে পরিমান নম্বর লাভ করেছিলাম আর জয়েন্ট্র এন্ট্রান্স যেহেতু শিকে ছেঁড়েনি তাহলে আসা করি এবার নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা যাবে। কাকস্য পরিবেদনা। কোলকাতার সবচেয়ে ভাল কলেজ যা পরর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান পেয়েছে সেখানে বাংলা নিয়ে পড়ব বলে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও শুধুমাত্র পিতৃ-আজ্ঞা পালনের জন্য আরও একবার জয়েন্ট এন্ট্রান্সে বসার প্রহসনে সামিল হতে সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ে কোলকাতার এক কলেজে ভর্তি হতে হল। কয়েকমাস যাওয়ার পর বুঝলাম বিজ্ঞান সাধনা আমার কাজ না। যদিও কলেজ আসা যাওয়া বন্ধ করতে পারিনি। এই কলেজ জীবনে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল। আন্ত-কলেজ প্রতিযোগিতায় হঠাৎ করে আবারও আধুনিক নৃত্য বিষয়ে অংশ নিলাম, সেই পুরানো 'অবাক পৃথিবী' । সসম্মানে প্রথম হয়েছিলাম। আমার নিজের নাচের প্রতি আগ্রহ প্রথম প্রকাশ পেল রনজয়ের কাছে। যদিও অত বেশি বয়সে নাচ শেখার জন্য কোনও প্রকার উৎসাহ ওর তরফ থেকে আসেনি।

    এই নতুন কলেজে আমার নতুন কিছু বন্ধু হয়েছিল। উল্লেখ না করলেই না অমৃতা তাদের মধ্যে অন্যতম। আমি দেবাশীষ , উষ্ণীষ, অমৃতা আমরা সকলে মিলে একদিন আড্ডা দিতে দিতে ওদের কাছে প্রকাশ করলাম আমি হোমো। কলেজ জীবনে এই শব্দটাই প্রচলিত। পরের দিন সকালে হঠাৎ করে অমৃতা আমাকে প্রোপোজ করে। আমি হাসতে হাসতে বলি "সবজানার পরেও... " অমৃতা উত্তর দিয়েছিল," তুই তো সৎভাবে স্বীকার করতে পেরেছিস। কতলোক তো বাইসেক্সুয়াল হয়, অন্যকাউকে যদি কখনও বিয়ে করি আর সে সবটা লুকিয়ে রাখে আমার থেকে।" অদ্ভুত একটা বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছিলাম সেদিন। এর আগে পর্যন্ত এভাবে কেউ বলেনি, আর তখনও পর্যন্ত আমিও কোনও বিবাহিত সমকামী পুরুষের সম্মুখীন হইনি। পরবর্তী কালে ওই সময়কার বন্ধুবৃত্তে আমার ক্রাশ দেবাশীষকে বিয়ে করে অমৃতা এখন বিদেশে আছে। আমার সঙ্গে আজও দুজনেরই যোগাযোগ আছে। এই এরকম একটা সঠিক অর্থে ত্রিকোণ সম্পর্ক নিয়ে আমরা আজও মজা করি।

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৩ মে ২০২১ | ১১০৪ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ০৩ মে ২০২১ ২২:০৫105412
  • পড়ছি।

  • Jaydip Jana | ০৩ মে ২০২১ ২২:২৩105413
  • ধন্যবাদ Ranjan বাবু! 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন