• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা পর্ব ১০

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ৩০ এপ্রিল ২০২১ | ১৮৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ছবি আঁকার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল ছেলে বেলা থেকেই, পুসুমার উতসাহে বাড়ির পাশে আঁকার স্কুলেও যাওয়া শুরু হয়েছিল, প্রায় হাতেখড়ির সঙ্গে সঙ্গেই আসলে বাড়ির সামনে ছিল একটা কাঁচা হাইড্রেন, বর্ষাকালে সব পুকুর উপছে ওই হাইড্রেনের মধ্যে মাছেদের আনাগোনা বেড়ে গেলে খেপলা জাল নিয়ে আশে পাশের সকলেই মাছ ধরতে শুরু করত আর আমি বাকিদের মাছ ধরা দেখতে দেখতে কাগজের নৌকা ভাসাতাম সে এক দারুন মজা আর  এই হাইড্রেনটা পেরোলেই  জিটি রোডের গাড়ি ঘোড়া আসলে,আমাদের বাড়িটা ছিল বাস রাস্তার লাগোয়া  তাই বাড়ির বাইরে যাতে খুব বেশি যেতে না হয়, তারজন্যই  হয়তো ছবি আঁকার পাঠ  শুরু হয়েছিল আমার খেলাধুলা  আমায় কোনও কালেই টানেনি পুসুমার দৌলতে খবরের কাগজের সাথে সাথে আসত   চাঁদমামা  আর বামপন্থী ছোটকাকুর দৌলতে আসত সোভিয়েত  ইউনিয়ন পত্রিকা  ছবিতে রুশ উপকথার গল্প, আর চাঁদমামার উত্তর রামায়ণ আর বিক্রমাদিত্যের বেতালের  গল্প আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন

     

     স্কুলের পড়াশোনার সাথে সাথে অনেকগুলো বছর ছবি আঁকার প্রতি  ভাললাগাও ছিল বহুদিন স্কুলের বন্ধু  সম্রাটের মাধ্যমে পরিচিত  হই দ্য গ্রেট আর্টিস্ট বিভিন্ন নামী শিল্পীদের আঁকা ছবি  দেখতে দেখতে ছবির দেখার চোখ তৈরীর পাশাপাশি বিখ্যাত শিল্পীদের তৈলচিত্রের নগ্ন পুরুষের  ওপরেও একটা অন্য রকম আকর্ষণ তৈরী হতেও থাকে  আর ওদিকে আমার আঁকার মাষ্টার মশাইএর দৌলতে মনে মনে আর্টকলেজের ছাত্র হিসাবে নিজেকে দেখতেও একটা  ইচ্ছে তৈরী  হয় পুসুমার পক্ষে  আঁকার স্কুলের মাইনে  বহন ছাড়া আর বেশি সাধ্য ছিলনা, এবং পারিবারিক রাজনীতিতে  সেটাও বন্ধ হল আচমকাই  কেননা তখন আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন আসন্ন  পাশাপাশি আরও একটা ভাঙন দেখা দিল আমার আঁকার স্কুলেও  যার কাছে আমার আঁকার বিভিন্ন দিক নিয়ে জানা ছবির পাশাপাশি ছবি তৈরীর গল্প শুনে স্বপ্ন দেখা তিনিও ওই স্কুল ছেড়ে নিজের নতুন  স্কুল খুললেন সেটাও প্রায় এক পাড়াতেই  কিন্তু চক্ষুলজ্জার খাতিরে পারিবারিক সিদ্ধান্তে আমি রয়ে গেলাম পুরোনো স্কুলেই আর এদিকে তখনই  জলরঙ পেরিয়ে অয়েল পেন্টিং শেখার সময় হল আমার বাধ্য হয়ে বাবার দ্বারস্থ  হতে হলে আমাকে  বাবা উত্তর দিল, "এসব খরচ আমার দ্বারা হবেনা  যখন আঁকা শুরু করেছিলে তখন তো তোমার পুসুমা আমায় জিজ্ঞাসাও করার প্রয়োজন বোধ  করেনি"  শুধু মাত্র বড়দের দড়ি টানাটানিতে  আটকে গেল আমার  কৈশোরের স্বপ্ন  ততদিনে যদিও আমি বুঝতে শিখেছি  খরচ বহন করা আমার বাবার পক্ষে যতটা না আর্থিক সমস্যার  তার থেকেও  অনেক বেশি তার দিদির সাথে ইগোতে জিততে চাওয়া বয়সের সাথে সাথে ততদিনে আমি পরিচিত,  বাড়িতে ওদের ভাইবোনেদের মধ্যে  ওনার বেশি পড়াশোনা বেশি রোজগারের কারণে  ওনার  অ্যটেনশান পাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছে  কখনও কখনও দাঁত নখ বার করে বেড়িয়ে আসে  উনি মনে করতেন তাঁর কথাই শেষ কথা আর তার বেড়ে ওঠা  দিয়ে তিনি এটাও মনে করতেন পড়াশোনা  ছাড়া বাকী সব এক্সট্রা  ক্যারিকুলার অ্যকটিভিটির কোনও মুল্য নেই  সেই সঙ্গে ছিল প্রবল পেট্রিয়ার্কাল ভাবনা চিন্তা আর তার সাথে সাথে  ছিল অফিসে কয়েকজন সহকর্মীর সাথে প্রবল প্রতিযোগিতার নেশা আর তাই তাদের ছেলেদের সঙ্গে  আমার তুলনা, বা তাদের শ্বশুরবাড়ির সাথে আমার মামার বাড়ির তুলনা তিনি করতেন অকপটে সব মিলিয়ে আমারও একটা অন্যরকম জেদ তৈরী  হয়, ঠিক করি আমি আর কখনও ছবি আঁকব না  তারপর থেকে ভুলে যেতে চেষ্টা  করি আমি কখনও ছবি আঁকতে পারতাম

    অন্য কারও ছবি আঁকা বা ছবি দেখতে দেখতে হারিয়ে যাওয়া তারপর থেকে বহুদিন  পর্যন্ত নেশায় পেয়ে গিয়েছিল এতবছর বাদে সেদিন আলাপ হওয়া নতুন বন্ধুর    নিজের মত আঁকা গুলো দেখতে দেখতে কখন যেন হারিয়ে গেছিলাম  মনে মনে আবার নিজের ভাললাগা গুলো কেমন যেন চাগাড় দিয়ে উঠছিল আর ওদিকে সে আবার  নিজেকে ভ্যান গঁ বা পিকাসো ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারত না  কোলকাতা শহরে বিভিন্ন  ভাবে নিজের ছবির প্রদর্শনী  তৈরী  করতে চাইত  মজাটা হচ্ছে  মানত না ওর মত শিল্পী  কোলকাতায় অনেক রয়েছেন সঠিক পৃষ্ঠপোষকের অভাবে তাদের ছবির সঠিক মূল্যায়ন হয়না  কিছুতেই ওর ছবির সমালোচনা  মানতে পারত না  একদিন কথায় কথায় আমায় বলে উঠল, " তুমি ছবির কি বোঝ? তুমি তো কখনও ছবি আঁকার কথাই ভাবোনি! " শুনে মনে মনে হেসে ফেলেছিলাম, অনেকের মতই ওকেও জানানোর প্রয়োজন মনে করি নি আমার আঁকিবুকির ওপর ভালবাসার কথা

     

    হ্যাঁ ছেলেটির বাবা চেয়েছিলেন, আমি ছেলেটির  ভাল বন্ধু  হই, হয়তো আরও বেশি কিছু চেয়েছিলেন মনে মনে, কিন্তু  আমি জানতাম আমরা দুজনেই দুজনের সঙ্গ পছন্দ  করলেও শুধু  বন্ধুত্ব তৈরী হওয়াটাও তেলে জলে মিশবে না ওর রোজগার না করেও অহেতুক  খরচ, কিংবা ওর উচ্চ লাইফস্টাইল আমার সঙ্গে  খাপ খাবে না  এটুকু বুঝেছিলাম  ছেলে  এদেশে ফেরত এসেছে, নাতো এদেশকে ভালবেসে,নাতো  ওর বাবাকে ভালবেসে বাবার সম্পত্তির লোভে আর তাই ওর বাবা যে স্নেহ দিয়ে ওদের বাড়ীতে আমি থাকলে খুশি হতেন, সকালের ব্রেকফাস্ট তৈরী থেকে শুরু করে আমার লাঞ্চবক্স প্যাক করে দিতেন তা আমার কাছে অনেক অমুল্য সম্পদ হলেও ওর বাবার কোনও মর্যাদা ওর কাছে নেই আর হেন ছেলের  মুখে যখন শুনলাম, ওর বাবার সঙ্গে  আমার সম্পর্ক,  ওর সাথে আমার বন্ধুতা আসলে সবটাই ওর বাবার সম্পত্তির লোভে তখন খুব একটা অবাক হইনি আহত হয়েছিলাম, তারপর থেকে ছেলেটির  সাথে কোনও যোগাযোগ  রাখিনি

    ওর বাবা ভদ্রলোক  কিন্তু সেই প্রথম দিনের বলা বন্ধুতার অঙ্গীকার আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন শুধু মাত্র নিয়মিত যোগাযোগ  রাখাই না, আমার জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত নিতেও সুপরামর্শ নিয়ে পাশে আছেন, আশা করি ওনার শেষদিন পর্যন্ত  হয়তো সেটা থাকবেনও

     


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ৩০ এপ্রিল ২০২১ | ১৮৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন