• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা  পর্ব ৩

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২১ এপ্রিল ২০২১ | ১৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ছোটবেলায় পিসিমনিদের কাছে খুব শুনতাম আমার জন্মের আগে আগে মানে আমার মা যখন বিয়ে হয়ে আসেও নি তখন মৃত্যু শয্যায় থাকা আমার ঠাকুমা, আমার বাবাকে নাকি বলেছিল,পরের জন্মে তিনি তার ছেলের কাছে সন্তান হিসাবে আসতে চান,  আর ভদ্রলোক ও বলেছিলেন, "এসো, তবে ছেলে হয়ে এসো মেয়ে হলে তো তোমাকে পরের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে "। 


    আমার গ্রাম্য অথচ শিক্ষিত মায়ের মুখে শুনেছি বিয়ের আগে মা দাদু কে বলত ' চাষীর বাড়ি না শহরে  আমায় বিয়ে দিও। দাদু কথা রেখেছিলেন।কিন্তু  বিয়ে হয়ে এসে মা যা দেখল  তাতে মায়ের কাছে শহুরে ভাবনাচিন্তার কল্পনা  কোথাও একটা হোঁচট  খেল.... পা  থেকে মাথা পর্যন্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ননদ জা ভাসুর নিয়ে তার ভরা সংসার। প্রায় দ্বিগুন বয়সী স্বামীটিও কম যাননা, তিনি আসলে তাঁর দাদা দিদিদের হাতের পুতুল, এবং আসলে যে যুগে ছেলেরা বিয়ের সময় দাসী আনতে যাচ্ছি  বলত তিনি সেযুগেই পড়েছিলেন। খালি তার মা তার বিয়ের আগে গত হওয়ায় একথাগুলো তিনি বোধহয় তার দিদি দাদাদের বলে ছিলেন এটুকুই  যা তফাত।


    আর তাই ননদ জা ভাসুর পরিবেষ্টিত  শ্বশুরবাড়িতে পা দিয়েই বুঝে গিয়েছিল যতই পাড়াগাঁয়ে সম্ভ্রান্ত চাষীর ঘর থেকে বেরিয়ে শহরে বিবাহের সাধ তাঁর  গ্রাম্য স্কুল মাস্টার বাবা  পূরণ করার চেষ্টা  করুন না কেন, আসলে" টকের জ্বালায় পালিয়ে এসে তেঁতুল তলায় বাস" করা শুরু  হল। মুখচোরা  মেয়েটির  কাছে সেদিন তার বাবার মানসম্মান নিজের সুখের থেকেও অনেক বেশি  বলে মনে হয়েছিল।  আর তাই মানিয়ে নিতে চেয়েছিল  সবকিছুকে । সেকালে  মধ্যবিত্ত বাঙালির  ডেসটিনেশন  পুরীতে মধুচন্দ্রিমায়  শ্বশুরবাড়ির গুষ্টিসুদ্ধ লোকের সাথে যাওয়ার কারণে মধুর অভাব থাকলেও মানিয়ে নিতে কসুর করেনি সে। অবিবাহিত  ননদদের সাথে অশান্তি  এড়াতে  সুবিবেচনার সাথে  স্বামীকে বলেছিল সমুদ্রের  ধারে  গিয়ে বসার থেকে হলিডে হোমের ঘরে বসে স্বামীর গীতাপাঠ শুনতে তার অনেক বেশি ভাল লাগবে। অদ্ভুত ভাবে মধ্যবয়সী স্বামী  ভদ্রলোক  ধর্মকর্মে স্ত্রীর মতিগতিতে যারপরনাই  খুশি  হয়ে একবারও খোঁজ নেননি তরুনী স্ত্রীর  মনে অন্য কোনও স্বপ্ন  থাকলেও থাকতে পারে কিনা। আধুনিক  মনস্ক শিক্ষিত কলেজপাশ সদ্য যুবতী সবটুকুকেই ভবিতব্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।কেননা এক গ্রাম্য স্কুল শিক্ষকের শিক্ষায় মূল্যবোধ ও রুচিবোধের  কোনও অভাব কখনও ঘটেনি। 


    তারপরেও বহুবছরে বহুসাধ নিজের মনের মাঝেই  রেখে দেওয়া প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় আসা মহিলাটিকে  কদিন আগেও যখন আড্ডা দিতে দিতে জানতে চাইলাম এতগুলো বছর কিভাবে কাটালে, উত্তর এল অতগুলো  বছর আগে উপায় কি ছিল বল্,  ছোট থেকে তো শিখেছিলাম  স্বামীর ঘরই মেয়েদের ঘর। যতই ওই সময়ে শহরের কলেজ থেকে গ্র্যজুয়েশন কমপ্লিট করি না কেন আসলে তো গ্রাম মফস্বলে বেড়ে ওঠা  মুল্যবোধ বিসর্জন দিতে পারিনি। বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠলে একটা সময়ের  পরে কিন্তু দাদা -ভায়েদের সংসারে ঝি গিরি করতে হত, তার থেকে তো নিজের সংসার অনেক ভাল। আর তোদের মত কথায় কথায় অতগুলো বছর আগে বিয়ে ভাঙা এত সহজ ছিল না। আজও তো মেয়েরা বিয়ে ভাঙলে লোকে তাদের দিকেই  আঙুল তোলে সেখানে অতদিন আগে অত সাহস আমার ছিল না। গ্রাম ঘরে ঢিঢি পড়ে যেত। তার থেকে  এ অনেক ভাল। 


    অথচ ভাবি এই মানুষটাই নিজের সন্তান ও সন্তানসমদের ভাল থাকার জন্য ভারতীয় সংবিধানের ৩৭৭ ধারা রদ করার জন্য সব কিছু কে অতিক্রম করে ভারতীয় সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে লিখিত আবেদন করতেও পিছপা হননি।কেউ কিছু বললে বলতেন সমাজ আবার কি? সমাজ তো আমি আর তুমি, সমকামী বিসমকামী বুঝিনা, গর্ভে থাকা সন্তান ছেলে না মেয়ে নাকি অন্য কিছু জানার দরকার নেই, সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতেই মায়েরা চায়, আর তাই আমাদের মত তথাকথিত যৌনতার বাইরে থাকা সন্তানদের পাশে দাঁড়ানোয় এতটুকু পিছপা হননি যে মানুষটা তিনি আমার গর্ভধারিনী ভেবে আজ নিজের পিঠটা নিজেই চাপড়াই...


    ছেলেবেলার কথা মনে হলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয় ছেলেবেলাটা অনেক বেশি ভাল ছিল। ঠাকুমার পুনর্জন্মের ইচ্ছা  আর কিছু না হোক আমার মেয়েলিপনা বা ঠাকুমাপনায় কোনও অসুবিধা  ঘটায় নি।তাই একটা বয়স পর্যন্ত চুড়ি হার টিপ চাইলেই  পেতাম। আমার সব কিছুতেই সকলের প্রশ্রয় একটা থাকতই। 


    আমার প্রথম পাঁচ বছরের জন্মদিনে মনিমা, মানে আমার বাবার ছোট বোন আমাকে জাতকের গল্প উপহার দিয়েছিল।তারও অনেক আগে সঠিক বোধ তৈরী হওয়ার আগের ভোরবেলাগুলো যখন পিসা যে কিনা দাদাদিদিদের ডাকমত একসময় পুসুমা হয়ে গেছিল, তার সঙ্গে খুব ভোরবেলাঘুম ভেঙে সকালে উঠয়া আমি মনে মনে বলি/ সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি/ আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে / আমি যেন সেইকাজ করি ভালমনে' আওড়াতাম সেদিন থেকেই নিজের অজান্তেই নিজের মূল্যবোধ তৈরী হতে শুরু করেছিল।


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২১ এপ্রিল ২০২১ | ১৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন