• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা পর্ব ১৯

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১৫ জুন ২০২১ | ৬২৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • এরপর বেশ কিছু দিন কেটে গেছে, আমি গৌড়ীয় শিখছি। ততদিনে মহুয়া আন্টির সঙ্গেও একটা হৃদ্যতা তৈরী হয়েছে। আমার সাহিত্যের পড়াশোনার সাথে সাথে ভবিষ্যতে গৌড়ীয় নিয়ে নানান গবেষনা করার ব্যাপারেও আন্টির সাথে নানান গল্প হত। আন্টি ও নাচের বন্ধুরা বেশ একটা পরিবার। সকলেই ভীষণ মাটির কাছাকাছি। যদিও এতদিন রণ-র সাথে চলাফেরার যে কৌলিন্য তা যেন কোথাও একটা মিসিং। তাও নিজের নাচ শেখা নিয়ে আমি ভালই ছিলাম। আজকাল রণ-র সাথে না হলেও নাচের ক্লাসের গল্প রণ-র বৌএর সাথে বেশ জমে।

    রণর সাথে দূরত্ব ততদিনে একটু হলেও বেড়েছে। একদিন দুপুরে কলেজ থেকে রণ-র বাড়ি গিয়েছিলাম। বসার জায়গায় রণ আর রণর বৌ আড্ডা দিচ্ছিল। আমাকে দেখে রণ মজা করে বলে উঠল, 'যখন তখন চলে আসিস,'ওরে আমাদের একটু স্পেস দে'। সেই মুহুর্তে মজা করে নিলেও গায়ে লেগেছিল ভীষণ। বুঝতে পারছিলাম না চাইলেও হয়তো ওদের মাঝখানে এসে পড়ছি। অভিমানে কমালাম যাতায়াত। যদিও নাচের অনুষ্ঠান বা কোলকাতার বাইরে অনুষ্ঠান করতে গেলে স্টেশনে সি-অফ করতে যাওয়াটুকুর অভ্যেস তখনও ছাড়তে পারিনি। এরকম একদিন রণ-কে ছাড়তে হাওড়া স্টেশনে গেছি। রণ-র বন্ধুরা কেউ কেউ আমার গৌড়ীয় শেখা নিয়ে জানতে চাইছে । আমি বুঝলাম রণ ওদের কাছে এখবরটা দিয়েছে। তারপরেও ট্রেন ছাড়তে দেরী থাকায় আমিও ওখানে রয়েছি। একথা ওকথায় সময় কাটছে। তার পরের সপ্তাহে ফিরে এসে নেক্সট অনুষ্ঠানে বাইরে যাওয়ার জন্য দলের সবার ট্রেন টিকিট কাটার ব্যবস্থা করার জন্য দিদি মানে রণ যাঁর কাছে নাচ শিখত উনি রণকে অনুরোধ করলেন। নির্ধারিত দিনে তার আগে ওনার বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসার কথাও উনি বললেন। রণ নির্ধারিত সময়ে যেতে পারবেনা এবং রণর পরিবর্তে আমি গিয়ে ওনার বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসব জানালে উনিও রাজী হলেন। ট্রেন ছেড়ে দিল।

    নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত সময়ে ওনার বাড়ী পৌঁছালাম। উনি সকালটা রেওয়াজ করেন। সাধারণত কাউকে যেতে বলেন না। তবুও সেদিন সকালেই গেলাম। উনি ইশারায় বসতে বললেন। আমি বসে অপেক্ষা করছি। উনি রেওয়াজ সেরে মুখোমুখি বসলেন। সরাসরি জানতে চাইলেন, "শুনলাম তুমি গৌড়ীয় শিখছ"। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। তারপরের প্রশ্ন " তুমি ক্লাসিকাল নৃত্যের অন্য কোনও নৃত্যশৈলী বা ঘরানায় শিখছ না কেন? চোখে চোখ রেখে উত্তর দিলাম, "আমার ভাল লাগে, আর এই বয়সে এসে নতুন করে শুরু করছি এখন অন্যকোনও নৃত্যশৈলীতে জমি তৈরী করা কঠিন।" উত্তর পেলাম "শেখার কোনও বয়স হয়না, যদিও ছোট থেকে শিখলে সুবিধা হয়, শরীরের নমনীয়তা থাকে।" এরপরের কথাটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। উনি বললেন, "ইংরেজী শক্ত হলেও সেটা অল্প শিখলেও জীবনে কিছু করা যায়। কিন্তু যত ভালই সাঁওতালি ভাষা শেখো না কেন তাতে করে আমাদের দেশে চাকরি জোটে না, হয়তো শেষে গিয়ে কুকুর কাটতে হবে।" তারপর উনি সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আচ্ছা গুরু হিসাবে তোমার আমাকে কেমন লাগে, তোমার কি মনে হয় আমি কি গুরু হিসাবে খুব খারাপ হবো!" আমি তখন লজ্জায় অধোবদন। উনি বললেন, "আমি চাই তুমি পরের দিন থেকে আমার ক্লাসে আসা শুরু কর।" স্তম্ভিত, অভিভূত আমি, ওনার মত মানুষ আমাকে ওনার ক্লাসে যেতে বলছেন। শুধু বললাম বাড়ীতে বলি, উনি বললেন যাই হোক পরের দিন ক্লাসে দেখা হচ্ছে । টিকিটের জন্য টাকাটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম।

    খুশিতে ডগমগ আমি, ওনার বাড়ী থেকে বেড়িয়েই ফোন করলাম রণকে। কিন্তু আমার যত উচ্ছ্বাস, রণ-র গলার স্বরে সে উচ্ছাস পেলাম না। রণ-র বাড়ীতে পৌঁছলে, রণ-র প্রথম রিঅ্যাকশান," দিদির ওখানে নাচের খরচ নিয়ে তোর বাবাকে তো আগে বল"। রণর মা বলল, "তোর বাবা রাজী হয় কিনা দ্যাখ"। বুঝলাম তারটা কোথাও কাটছে। বাড়ী এলাম, বাবা মা কে সবটা বললাম, আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবা বলল," যাও, তবে বাংলায় এম এ টা কমপ্লিট করে এসব করলে ভাল করতে। আমাদের দেশে শিল্পীরা তো খেতে পায়না শেষ পর্যন্ত।"

    ওদিকে রণ-র বৌও নিজের পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনের প্রয়োজনে দিদি-র কাছে তালিম নিতে যাবে ঠিক হয়েছিল। একই দিনে দুজনে প্রথমদিন ক্লাসে গেলাম। রণ প্রথম দিনেই দিদিকে বলেছিল, "এরা দুজন ইনডিভিজুয়াল হিসাবে আপনার কাছে আসছে, কোনও ভুল করলে মারুন কাটুন যা খুশি করুন, কোনও কথা আমাকে বলবেন না। " দিদি হেসে বলেছিলেন, "তোমার বৌ তো আমার ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ও বটে। আর, আর একজনকে তো আমি ডেকে এনেছি, ওর সব শিক্ষার দায় আমার।"

    এরপর উনি যেটা করলেন,সেটাতে রণ সহ বাকি অনেকের গাত্রদাহের কারণ হলাম আমি। ওনার বাড়ীতে যখন খুশি যাওয়ার ছাড়পত্র দিলেন আমাকে। প্রত্যেক সপ্তাহে অরবিন্দ ভবনে ক্লাসের আগের সকালবেলায় ওনার সিনিয়র ছাত্র ছাত্রীরা ওনার বাড়ী যেত রিহার্সাল করতে। আমিও সকাল বেলা থেকে গিয়ে ওদের মাঝখানে বসে থাকতাম আর দেখতাম। এভাবেই আমার চোখ আর কান তৈরী হচ্ছিল। বিগিনার হিসাবে বাড়ীতে প্র্যাকটিস করার জন্য যে ক্যসেট ওনার সমস্ত ছাত্র ছাত্রী কিনত তা একদিন ওদের সবার মাঝখানে আমাকে উপহার হিসাবে দিলেন। ওখানে দু একজন সিনিয়র ছাত্রী ছিল যারা ওনার স্কুলের অ্যডমিনিস্ট্রেশনের কাজকর্ম করে দিত। ওদের কাছে যখন নাচের স্কুলের ফী নিয়ে কথা বলতে গেলাম ওরা পরামর্শ দিল সরাসরি 'দিদি'-র সাথে কথা বলতে। ওনাকে জানালে উনি বললেন,"ওসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই। আমি তো নিজে তোমায় ডেকেছি।"

    একই দিনে একই সময়ে ক্লাস হওয়ার ফলে আমার গৌড়ীয়নৃত্য শিখতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।

    উনি, এরপর থেকে কোলকাতার সমস্ত অনুষ্ঠানে আমাকে সংগে করে নিয়ে যেতে শুরু করলেন। আগেও অনেক জায়গায় আমি গেছি, রণর সাথে রণর বন্ধু হিসাবে, এখন যাই ওনার ছাত্র হিসাবে। বিশেষ করে নামী জায়গার অনুষ্ঠান হলে তো কথাই নেই। এসব জায়গায় ওনার সাথে যেতে যেতে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মেশা, আদবকায়দা শেখা এগুলোও তৈরী হত আমার। মজার ব্যপার হল রণ বা রণর বন্ধুরা ওনাকে তেল মেরে কে কতটা ওনার কাছের হবে সেটাতে ব্যাস্ত থাকলেও আমার সে বালাই ছিলনা। নাচের একই কোরিওগ্রাফি রিহার্সাল ও অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে আমার পুরো মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। কখনও কোনওদিন রিহার্সালের মত জোশ অনুষ্ঠানে দেখতে না পেলে আমি সত্যিটা ওনাকে বলে দিতে পারতাম। যা বাকীরা ভয় পেত।

    এসব কিছুতে রণ আর রণর বন্ধু দের ধারণা হল, "দিদি আমাকে নিয়ে বড্ড আদিখ্যেতা করছেন।" সুযোগ পেলে সেটা ওরা সেটা আমাকে শোনাতেও ছাড়ত না।

    দিদির বাড়ীতে নাচের ক্লাস ছাড়াও সময় পেলে অনেক সময় চলে যেতাম। প্রচুর বই ছিল ওনার বাড়ীতে। সেগুলো পড়তাম। রেওয়াজের ফাঁকে সময় পেলে ওনার সাথে অনেক সময় আমার পড়াশোনা ওনার বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিয়েও কথা বলতাম দুজনে। আস্তে আস্তে শুধু গুরু শিষ্য না, উনি আমার ফ্রেন্ড-ফিলসফার-গাইড হয়ে উঠেছিলেন। এরকমই এক আড্ডায় উনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন, সবাই নৃত্যশিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। কেউ কেউ নাচ ভালবেসে নাচের সমঝদারও হয়। নাচ নিয়ে আমি যেন কখনও কেরিয়ার তৈরীর কথা না ভাবি। এতদেরীতে মনের আনন্দে নাচ শেখাটাই ভাল। আরও বুঝিয়েছিলেন, বাবা আছেন, এখনও রিটায়ার্ড নন। কিন্তু 'বাবার টাকা বাবার'। কোনও কাজই ছোট না, যদি সকাল বেলা লোকের বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ পৌঁছে দিয়ে একশ টাকাও রোজগার হয় সেটা নিজের উপার্জনের টাকা। সে টাকার আনন্দ অনেক। আমি যদি কেরিয়ার তৈরী করে ওনার সাথে ওনার অনুষ্ঠানে যাই তার সম্মান অনেক বেশি । না হলে লোকে কদিন বাদে বলবে, কোনও কাজ নেই হাতে অঢেল সময় তাই ওনার খিদমতগারী করে বেড়াই। সুতরাং আস্তে আস্তে কেরিয়ার তৈরির দিকেও মন দেওয়া দরকার।

  • দুটো সম্পর্কে একসঙ্গে থাকতে গেলে যে পারস্পরিক সম্মান ও ভালবাসা দরকার তা রণ দেখাতে পারেনি। আমার অনেক খারাপ লাগা তৈরী হলেও মুখে আমি বলতে পারতাম না তখন, আজও অনেক অনুভুতি প্রকাশ করতে পারিনা আমি। আমাদের প্রথম দেখা, প্রথম অনেক কিছুই আমি মনে রাখলেও রন কোনও দিন মনে না রাখায় অনেক সময় অভিমান করলেও আবার অল্প আদরেই তা গলে জল হয়ে যেত আমার। রাগ অভিমান আমার অনেক বেশি হলেও তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগত না তখনও পর্যন্ত।

    অথচ স্বাভাবিক ভাবেই(?) রণর রেজিস্ট্রির দিন বা বিবাহবার্ষিকি মনে থাকাই না, ওর বৌএর জন্য আনা দামি উপহার দেখে হিংসে হয়েছিল আমার। সেদিন চুপ করে না থেকে রণকে বাঁকা কথা শোনাতে ছাড়িনি। কেননা তার কদিন আগেই আমাদের প্রথম দেখার দিনের অ্যনিভার্সারিতে রণ একটা চকোলেটও দেয়নি আমাকে।

    এসব ছোটখাটো কারণ আর দিদির কাছে নাচ শেখা রণ-র সঙ্গে দূরত্ব টা বাড়ছিল দুটো কারণেই।, তবুও যাতায়াত বা বন্ধুত্বটা তখনও কমেনি। রণ বা রণর বৌ দুজনেই অনেক ব্যাক্তিগত কথা আমাকে বলত। এরকম একদিন রণর বৌ জানাল, ও প্রেগন্যান্ট। কিন্তু ওরা কেউই এখুনি প্রস্তুত না। অ্যবরশান করাতে চায়।আর এ ব্যাপারে বাড়ির কাউকে জানাতে চায়না। সিদ্ধান্ত ওদের। কোথাও যেন আমার না পাওয়া মাতৃত্বটা একবার হলেও উঁকি দিয়ে গেছিল আমার মনে।

    সেদিনটা আজও মনে আছে আমার। বন্ধু হিসাবে রণ আমার ওপর তখনও নির্ভর করা কমায় নি। আর তাই তিনজনে মিলেই ডক্টরের কাছে গিয়েছিলাম সেদিন। সব মিটে যাওয়ার পর ডক্টর বলেছিলেন সেইদিন যেন ও কমপ্লিট রেষ্ট নেয়। বাড়ী ফিরে এসেছিলাম তিনজনেই। বিকালে রণর বৌ কোথাও বেরোতে চেয়েছিল। রণ-র সাথে তাই নিয়ে মনকষাকষি ঝগড়া আর তার পর রণ বেড়িয়ে চলে গিয়েছিল পাড়ার ক্লাবে। সবটাই ঘটে আমার সামনে। তারপর রণর বৌ হঠাতই রণ কে শাস্তি দিতে রেস্ট না নিয়ে শুরু করে নাচ প্র্যকটিস। আর তার ফলে আচমকা ব্লিডিং শুরু হয়। ভয় পেয়ে যাই আমি। বাধ্য হই রণ-র মা আর বৌদিকে সবটা জানাতে। ওরা এসে ব্যপারটা সামাল দেন। অবিশ্বাস আর ঘৃনায় "গোপনীয়তা ভঙ্গের" জন্য আমাকে দায়ী করে রণর বৌ। কয়েকদিন বাদে রণ বলে বসে "তুই আমাদের সংসারে আগুন লাগাচ্ছিস, তুই আর আসিস না" অপমানে অভিমানে বেড়িয়ে আসি আমি। শেষ হয়ে যায় আমাদের পাঁচটা বছরের ভাললাগা, ভালবাসা...

    যদিও দিদির অনুষ্ঠানে দেখা হতো তারপর থেকে। দিদির কোরিওগ্রাফিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কাজী নজরুল এর লেখা গান "ব্রজগোপী খেলে হোরি"। এই কোরিওগ্রাফিতে আবিরের বিকল্প হিসাবে ব্যাবহার করা হত রঙীন কাগজ কুঁচি।একদিন অনুষ্ঠানের মধ্যে ভুলবশতঃ রণ-র ছোঁড়া কাগজ দিদির চোখে লাগায় নাচ শেষে উইংসের বাইরে এসে দিদি সম্পূর্ণ রিফ্লকশনের বশে রণর গালে একটা চড় মারেন। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। রণ-র আত্মসম্মান আহত হয়। সেদিন একসাথে ফেরার সময় রণর কয়েকজন সতীর্থ ওকে ওস্কায়, এভাবে সবার সামনে চড় মারাটা দিদির উচিত হয়নি। সেদিন থেকে রণ দিদির ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে। আমি রণকে বোঝাতে চেয়েছিলাম ওটাতে রণর অপমানিত হওয়ার মত কিছুই হয়নি। কিন্তু রণর মায়ের ইন্ধনে রণ সে কথা মানতে চায়না। ওর মনে হয় দিদি যেমন আমাকে নিয়ে আদিখ্যেতা করেন আমিও তাই দিদির কোনও দোষ দেখতে পাইনা। চুপ করে যাই আমি।

    আমার অভিজ্ঞতা থেকে এটা জানতাম অনেক কোরিওগ্রাফি বা নাচ গুরুমুখী। এবং গুরুর অনুমতি ছাড়া, তিনি যদি কখনও না শেখান তা মঞ্চে পরিবেশন করা যায় না। এমন অনেক আইটেম রণ নিজের একক অনুষ্ঠানে পারফর্ম করত। রণ বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করতে থাকে। কখনও কখনও কোনও না কোনও লোকাল খবরের কাগজেও সে খবর বের হয়। সেবার একটা কাগজে এরকম খবর বেড়িয়েছিল রণ-র প্রশংসা করে একটা কোরিওগ্রাফির,যা রণকে কখনও দিদি সেখান নি। কিন্তু ওটা দিদি নিজে করতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। ও তখন কোলকাতার বাইরে, আমাদেরই কোনও এক কমন বন্ধু সেটা আমাকে দিয়েছিল। আর সে খবরটা খুশি হয়ে আমি রণ-র মাকে জানাই। তার কদিন বাদেই দিদির স্কুলের অ্যানুয়াল শো রবীন্দ্র সদনে । ওখানে ওই খবরের কাগজের কপিটা ওনাকে দেওয়ার কথা ছিল। সেদিন টিকিট কাউন্টার থেকে বেরিয়ে গ্রীণরুমে পৌঁছে কি মনে হওয়াতে ব্যাগ থেকে টিকিট বিক্রির সমস্ত টাকাটা বারকরে একজন সিনিয়র এর হাতে দিয়ে ব্যাগটা রেখে অনুষ্ঠান দেখতে মঞ্চের পাশে যাই। খানিকটা বাদে এসে দেখি ব্যাগটা নেই। বুঝতে পারি ব্যাগটা খোয়া গেছে। আমার পুরো মাথায় হাত। আমার ওই ব্যাগের মধ্যেই যা টাকা পয়সা ছিল। আর একজন বন্ধুবাড়ির চাবিও রাখতে দেওয়ায় সেটাও ওখানে ছিল।

    সেদিনের অনুষ্ঠান দেখতে রণর মা আর বৌ ও গিয়েছিল। রণ-র মাকে জানাই বিষয়টা আরও জানাই আমি ওনার সাথেই ফিরব কেননা সে মুহূর্তে ব্যাগ খোয়া যাওয়ায় আমি কপর্দকশুন্য । যে বন্ধু চাবি রাখতে দিয়েছিলো সেই বন্ধু কে পুরোব্যাপারটা জানিয়ে দিদির সঙ্গে সৌজন্যমুলক সাক্ষাত সেরে ফিরে এসে দেখি ওনারা আমার জন্য অপেক্ষা না করে চলে গেছেন। দিদির কাছে গিয়ে পুরোটা বলে ওনার থেকে বাড়ি ফেরার টাকা নিয়ে তবে আমি বাড়ী ফিরেছিলাম সেদিন। ভীষণ খারাপ লেগেছিল সেদিন। তার চেয়েও খারাপ লেগেছিল যখন ওনাকে ফোন করে বলেছিলাম তখন উনি উত্তর দিয়েছিলেন," তুইতো কাগজ টা দিলিনা, তুই দিদির সাথে আদিখ্যেতা করছিলি তোর হয়তো আরও দেরী হত তাই আমরা অপেক্ষা করিনি।" বিশ্বাস করাতে পারিনি আমার ব্যগের সাথে কাগজটাও খোয়া গেছিল। রণও বিশ্বাস করেছিল, আমি ওই খবরের কাগজের কাটিংটা দিদিকে দিয়ে দিদির সাথে ওর দূরত্ব বাড়াতে চেষ্টা করেছিলাম। এনিয়ে রণকে আমি আর কোনওদিন কোনও কথা বলিনি।

    এইসময় আমি আস্তে আস্তে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম নাচ কে। দিদি শিখিয়েছিলেন পি.সি. সরকারের বলা সাফল্যের তিনটি মন্ত্র প্র্যকটিস, প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস। আর তাই দিদির ক্লাসের আর এক ছাত্র এগিয়ে এল তালিম দিতে। সপ্তাহে আরও একটা দিন করে বাড়ল প্রথাগত অভ্যেস। শুরু হল তার বাড়ীতে আলাদা করে যাওয়া। সাম্মানিক গুরুদক্ষিনা দিতে আমি অরাজী ছিলাম না, সেও হাত পেতে নিতে অরাজী হয়নি। একটা ভাল সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। কোনও একদিন দিদির নাচের অনুষ্ঠানের শেষে বেশ রাত হওয়ায় তার বাড়িতে থেকে গিয়েছিলাম। আর রাতের বেলা আমার শরীরে উঠে এসেছিল সে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম তাকে। হিসহিসিয়ে উঠেছিল, "তোমার রণ তো তোমায় এর আগেই এতদিন ধরে ভোগ করেছে। আর আমার বেলায় এত সতীপনা!" ঘেন্নায় কুঁকড়ে উঠেছিলাম। এখানেই শেষ হয়নি টলিউডি সংলাপ! হিসহিসিয়ে বলে উঠেছিল, "কি মনে করিস আমরা কেউ কিছু বুঝিনা, দিদির ওখানে আমরা সবাই তোকে নিয়ে আলোচনা করি, বেশী নাটক করিস না। এরপর তুই ওখানে কি করে মুখ দেখাস দেখবো।" লজ্জায় কুঁকড়ে গেছিলাম সেরাতে, ভোর হতেই বেড়িয়ে এসেছিলাম।

    সেদিন কেন জানিনা মনে হয়েছিল "নাচ শেখা" আমার জন্য না। ওদিকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে নিজের কেরিয়ার নিয়ে ভাবাটাই ভাল বলে মেনে নিয়েছিলাম। সেদিনের পর থেকে নিজের নাচ নিয়ে স্বপ্ন আর দেখিনি।

    দিদির কাছে যাতায়াত একেবারে বন্ধ হয়নি তা’বলে। অনেক পরে দিদির কাছেই জানতে পেরেছিলাম, ওরা কেউ কেউ দিদির কাছে আমার সেক্সুয়্যালিটি নিয়ে মন্তব্য করলে, দিদি বলেছিলেন, "এটা ওর ব্যক্তিগত বিষয়। ক্লাস থেকে বেড়িয়ে কে কার হাত ধরে কোথায় যায় আমি তো নাক গলাই না, তাহলে ওর ব্যাপারে এত মাথাব্যাথা না করলেও সকলের চলবে ।" তারও বহুদিন বাদে এক ঘরোয়া আড্ডায় দিদি মজা করতে করতে বলেছিলেন, "যদি জীবনে কিছু ভাল কাজ করে থাকি তা হলো তোকে রণর কাছ থেকে বের করে আনা, আমি দেশে বিদেশে বহু মানুষ দেখেছি, অনেক রকম সম্পর্ক ও দেখেছি। কিন্তু তোর ভালবাসার যোগ্য রণ ছিলনা। ও আর ওর পরিবার শুধু তোকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল..."

    গৌড়ীয়নৃত্য - কত্থক - সমাজ - নাপ্রেমের দড়ি টানাটানিতে আমার মতো এক কিশোরের স্বপ্ন ভাঙার জন্য দায়ী কাউকেই করিনি কোনওদিন । আজকাল টিভির চ্যানেলে চানেলে নাচের রিয়েলিটি শো, কত সুন্দর সুন্দর কোরিওগ্রাফি। আমার বাবা মা ভাই সবাই দেখে। শুধু আমিই দেখিনা...
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৫ জুন ২০২১ | ৬২৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Rajkumar Mahato | ১৫ জুন ২০২১ ১৫:৩৯494963
  • পড়লাম,ভালো লাগলো। আগের পর্বগুলো পড়ার ইচ্ছে জাগল।

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন