• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা পর্ব ৫

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২৩ এপ্রিল ২০২১ | ৩০৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  •  

    যৌথ পরিবারে বড় হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়েও অনেক রকম মুল্যবোধ তৈরী হয়। ঠাকুমা কাকে বলে না জানলেও আমার সে অভাব পূরণ হয়েছিল, আমার বাবার বড়দিদি বড়মার হাত ধরে। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিল। বড় পিসেমশায়ের ব্যাপারে এত কম কথা হয়েছে বাড়ীতে আমি আজও জানিনা। তাকে আমার দেখার কথাও না। বড়মা  মাঝে মাঝেই আমাদের বাড়ী এসে থাকত। বড়মার ছেলে মেয়েরা অনেকেই আমার মায়ের থেকে বড়।অভাবের সংসারে তাদের কেউ কেউ আমাদের বাড়ীতেই  থাকত। ছেলেবেলায় যতদিন না আমার ভাই হয়েছে ততদিন কেউ জানতে চাইলে বলতাম আমরা চারভাইবোন। ভাই হওয়ার পর অনেকদিন পর্যন্ত সেটা বেড়ে পাঁচ বলার অভ্যেস হয়েছিল।বড়দাদা, দাদা,দিদি, আমি, ভাই। বড়দাদা যে কিনা দিল্লি রোডের দোকান আর বাকি সব কিছু দেখা শোনা করত সে যে আমার বড়মার ছেলে বোধদয় হয়েছিল অনেক পড়ে।  কে সেটা মনে নেই তবে এটুকু মনে আছে কেউ একজন বয়স্কা মহিলা জানতে চেয়েছিল, "তোমার মায়ের পেটের ভাইবোন কয়ডা",  জেঠিমাকে মা বলায় উত্তর দিয়েছিলাম তিন, কেন না আমার মা তো আমার কাছে মিষ্টিমা। তার কথাতেই মা যে জ্যেঠুমা, আর ভাই ছাড়া বাকীরা তুতো দাদাদিদি বোধদয় হয় আমার

     

    কি বিচিত্র মানব জীবন। পুরানো কথা মনে করার একটা নেশা আছে, চোখ বুজলেই তাই আজও কত কথা মনে পরে...

    পুসুমার উতসাহে বাড়িতে একটা অন্যরকম পরিবেশও তৈরী  হয়েছিল, যা ওই নুন আনতে পান্তা ফুরানো  পরিবারে একটুকরো  বিলাসিতা আবার হয়তো ওটাই  তার বেঁচে থাকার রসদ ছিল তার খবর  আজও  জানিনা ... , আর তাই জাঠতুতো দিদির গান শেখা, দাদার তবলার পাশাপাশি  মনিমার গীটার  বাজানোটা পাপার কাছে হয়তো বুংবুঙি আখ্যা পেয়েছিল।  

    মনিমা পুসুমাই ছিল যত আব্দার মেটানোর জায়গা, আমার মায়ের থেকেও ওরাই ছিল অনেক বেশি। কেননা   একান্নবর্তী  সংসারে অতজন মানুষের দুপুরের রান্না খাওয়া মিটতে মিটতেই মা জেঠিমাদের সকলের রাতের খাওয়ার বন্দোবস্ত  করার কথা ভাবতে হত।  তাই ইসকুল নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে কোথাও বেড়ানো নয়তো গীটার শুনিয়ে গল্পের বই পড়ে, গান শুনিয়ে ছোট্ট আমাকে আগলে রাখাটা বোধ হয় মনিমারই কাজ ছিল। রবিঠাকুরের লেখায় কৃষ্ণকলির কথা যতই মর্যাদা পাক না কেন, বাস্তবে গায়ের রঙ কালো হওয়ায় বিয়ের বাজারে মনিমার দাম ওঠেনি। যে মেয়ে জন্মের আগেই তার বাবাকে হারায়, যৌবনের শুরুতেই মাকে হারায় তার বিয়ের জন্য তার দাদারা অহেতুক খরচা বাড়াতে চায়নি  হয়তো বা। নিয়ে বিতর্ক চাইলে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো  শেষ হবে না, তবুও প্রখর আত্ম সম্মানের সাথে ট্যুইশানি আর  মাঝ বয়সের শেষদিন পর্যন্ত পৌরসভার স্বাস্থ্যকর্মীর কাজের মধ্যে দিয়ে নিজের হাতখরচ বা ভাত-কাপড়ের  যোগাড়  করলেও মরার পর তার দাদাদের  দানসাগর করে নিজেদের সম্মান  বাঁচানোর চেষ্টা অনেকগুলো বছর বাদে আজও স্মৃতিমেদুরতায় নিয়ে  গিয়ে ভাবিয়ে তোলে আমায় 

     মনিমা ছাড়াও ছেলেবেলার অনেকটা সময় কাটত বড়মার সঙ্গে। আমি যখন ছোট  তখনই বড়মার মাথার প্রায় সব চুল পেকে গিয়েছিল। তাও পাকা চুল  বেছে তুলে দিতে বলত। যদি সব চুল তুলতাম তাহলে বোধহয়  টাক ছাড়া কিছু দেখা যেতনা, আজ মনে হয় সেটা ভেবেই হয়তো কখনও একটা দুটো চুল তোলার পর আবদার করতাম গল্প শোনানোর। বড়মা খুব ভাল গল্প বলত। দুপর বেলা খাওয়ার পরে  চুল শুকোতে বসলে আমি রোজ বড়মার কাছে গল্প শুনতাম।  এভাবেই টোকাটুকির গল্প, টুনটুনির গল্প, ঠাকুমার ঝুলির গল্প এমনকি রামায়ণ মহাভারতের  গল্প শুনতে  শুনতে চুল আঁচড়ে দিতে দিতে আমি যেমন খুশি চুল বাঁধতে চেষ্টা  করতাম। বিকেল হলেই মা জেঠিমা মনিমাদের চুল আঁচড়ে তিনগুছি,চারগুছি বিনুনি করে  কাঁটা গুজে খোঁপা বেঁধে দিত বড়মা, তারপর ঘুঁটে দেওয়ার মত হাত দিয়ে থাপড়ে থাপড়ে  সে খোঁপা সেট করত। তাই আমি তার নাম দিয়ে ছিলাম ঘুঁটে খোপা।বড়মার দেখাদেখি কখনও কখনও আমিও মা বা মনিমার চুল বাঁধার চেষ্টা করতাম। আজ বুঝি পরবর্তী কালে এভাবেই আমার  বিভিন্ন  হেয়ার স্টাইলিংএর হাতে খড়ি। 

    বড়মা সারাদিন টুকুর টুকুর করে গাছপালা বসাতো।তারমধ্যে ফুলগাছও যেমন ছিল, তেমন গোয়ালঘরের চালে পুঁইমাচা,লাউ কুমড়ো এসবও বাদ ছিলনা। বাড়ির  মাঝখানের উঠোনে  একটা বিশাল পিয়ারাগাছ ছিল, যেটার অস্তিত্ব  আমাদের বাড়ির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত  ছিল। বড়মা আর ছোটকাকু মিলে কতবার ওই পিয়ারাডালে আমাদের জন্য দোলনা বানিয়ে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বাড়ির বাইরে ছিল একটা শিউলি গাছ, শিউলি ফুলের সময় ভোরবেলায় দিদির সাথে  ফুল কুড়োনোর একটা অদ্ভুত  নেশা ছিল। আর একটা গাছ সেটাও আমাদের বাড়ির ট্রেডমার্ক   ছিল, তা হল বড়মার হাতে বসানো লতানো বেলফুলের গাছযেটা অনেক পড়ে দোতলা ছাপিয়ে ছাদ পর্যন্ত বেড়ে ছিল। প্রচুর ফুল হত তাতে।  বড়মার হাতধরেই আমার মালাগাঁথার হাতেখড়ি। পুসুমা বড়মা এদের অনেকটা সময় কাটত  ঠাকুর  ঘরে। আচারবিচার পুজো আচ্চা সংস্কারের আখড়া ছিল আমাদের বাড়ি।  আজও মনে পড়লে মজা লাগে বাড়ির কাছে গঙ্গা হওয়ায় বারব্রত পুজো পার্বণ তো বটেই চন্দ্র গ্রহণে রাতের বেলায় গঙ্গাচান করতে যাওয়ারও বেশ ঘটা ছিল আমাদের।  শুধু গাছপালার গোড়ায় মাটি দেওয়া নয়, বাড়ির উনুন ভেঙে গেলে সেটাও তৈরি  হত বড়মার হাত ধরেই। ছেলবেলার পুতুলখেলার সঙ্গীও ছিল বড়মা, আমাকে কতবার আমার খেলনা বাটির সত্যিকার উনুন মাটি দিয়ে তৈরী করে তাতে কয়লার আঁচ দিয়ে দিয়েছে আর আমি একটা ছোটবাটিতে সত্যি  সত্যি সব্জী দিয়ে বাটিচচ্চড়ি বানিয়েছি।  সেই বোধ হয় আমার প্রথম রান্নার হাতেখড়ি

     

     


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৩ এপ্রিল ২০২১ | ৩০৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
বাবা  - Mousumi GhoshDas
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন