• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা পর্ব ৬

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২৬ এপ্রিল ২০২১ | ৯৪০ বার পঠিত
  • আমাদের বাড়িটার একটা অদ্ভুত অবস্থান ছিল। আমাদের কোনও পাড়া ছিলনা সেই অর্থে। সামনে জিটি রোড দুপাশে দুটো বাড়ীর দুপাশ দিয়ে দুটো গলি।ওই গলি ধরে গেলে দুদিকে দুটো পাড়া। বাড়ির পিছনের বাড়িগুলো বা পাড়াগুলো কখনও আমি সেভাবে যেতাম না। আমাদেরকে মিশতেও তেমন দেওয়া হতনা। আমাদের বাড়ির লোকজনকেও পিছন দিকের পাড়া-প্রতিবেশির সঙ্গে খুব বেশি যাতায়াত করতে দেখিনি। তবে বিকেল হলেই এপাড়া ওপাড়ার সবাই পুসুমার কাছে ঘুঁটে কিনতে আসত নয়ত দুধ নিতে আসত। সেইসময়টুকু যতটা এপাড়া ওপাড়ার আলোচনায় আমার জগত দর্শন।

    আমাদের বাড়ীর পাশেই রাস্তা পার হলেই একটা বড় খেলার মাঠ। সারাবছর সে মাঠে খেলাধুলো ছাড়াও অনেক অনেক মিটিং অনেক অনেক উৎসব অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। যেহেতু মেইন রাস্তার ধারে, তাই দোতলার বারান্দায় বসলেই মিটিং মিছিল সমস্ত কিছুর আঁচ পাওয়া যায়। প্রত্যেক বছর শীতকালে শিশুউৎসব হয়। মাঠ আশেপাশের সমস্ত ক্লাব শিশু-সংগঠন নিয়ে একটা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শিশুউৎসব এলে বোঝা যায় বয়স বাড়লেও মনের মধ্যে মানুষ শিশুই থেকে যায়। আমারও বেশ মনে হত এরকম শিশুউৎসবে যেতে, আমাদের এলাকায় এরকম দুএকটা ক্লাব-মনিমেলা ছিল। একটু বড় হতেই পুসুমার উতসাহেই মনিমেলা যাওয়া। পড়াশোনার সাথে সাথে একটু শরীরচর্চা বাড়ন্ত বাচ্চাদের জন্য জরুরি। আমাদের স্কুলে কো এড ছিল ক্লাস ফোর পর্যন্ত। তারপর মেয়েরা অন্য সকুলে ভর্তি হত। যদিও তথাকথিত খেলাধুলোর ওপর আকর্ষন না থাকলেও মনিমেলার মাঠ আমার কাছে একটা আকর্ষণ ছিল যেহেতু অনেক বয়সের অনেক রকম বন্ধু, হুটোপাটি, ড্রিলপ্যারেড, গান কবিতা লোকনৃত্য সবকিছুর মিশেল ছিল ওই জগতটা। ওখানের ছেলেরা সবাই ড্রিল প্যারেড ব্যন্ডবাজাতে শিখলেও আমার খুব বেশি ভাল লাগত জিমন্যস্টিক আর লোকনৃত্য। বড় হতে হতে এটাও বুঝতে পারি ওখানে ছেলেদের থেকে আসল আকর্ষণ আমার মেয়ে বন্ধুরা। বাড়ীতেও যেমন মনিমা পুসুমা দিদি, তেমন এখানেও এরাই আমার বেশি বন্ধু। আর তাই সারাবছরের মনিমেলার অনুষ্ঠানে তথাকথিত ছেলেদের তুলোনায় মেয়েদের কাজগুলো করতেই ভালবাসতাম।

    মনিমেলার মাঠের কথা মনে করলে, মনে পড়ে বাড়ি স্কুলের গন্ডীর বাইরে শুধু খোলা হাওয়া না, খোলা মনে যাখুশি করার জায়গাও ছিল ওটা। আমাদের এলাকায় ওই পাড়াতেই সংস্কৃতির চর্চা হোত। রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা থেকে বর্ষবরণ, শারদোৎসব, নাট্যমেলা, কবিতার আসর সবকিছুই ওখানে। তখন অনেক অনেক জায়গায় এসব হলেও আমাদের যেহেতু পাড়া ছিলনা কোনও কিছু এদিকটায় হত না। আমাদের আশে পাশের বাড়ির লোকজনের কাছে দুবেলাপেটের ভাত যোগাড়টাই অনেক ছিল। আমার ভক্তকুলে প্রহ্লাদ হওয়ার আরও একটা কারণ ছিল আমার স্কুল। এলাকার সবথেকে নামী স্কুল রামকৃষ্ণ আশ্রমে ভর্তি হতে পারার কৃতিত্ব আমার বা আমার বাড়ীর লোকের যতনা অনেক বেশি ছেলেবেলায় পড়াতে আসা মনিমার বন্ধু সর্বাণীদির। স্কুলের ফর্ম তোলা থেকে ভর্তি করার পুরো প্রচেষ্টা ছিল ওর। আজও মনে আছে ক্লাস ওয়ানে ওখানে ভর্তিপরীক্ষার প্রথম মেধা তালিকায় আমার নাম আসেনি কিন্তু বাড়ীর সামনের স্কুলে ভর্তিপরীক্ষার মেধাতালিকার প্রথম নামটা আমার ছিল। সর্বানীদি যেহেতু জানত আশ্রমের সম্পাদক মহারাজ পুর্বাশ্রম থেকেই বাবার পরিচিত,তাই বাবাকে বলেছিল ওনার কাছে সুপারিশ করতে।বাবা রাজী ছিলনা, বলেছিল" আমার ছেলে নিজের যোগ্যতায় যদি ভর্তিহতে পারে তো হবে, নইলে বাড়ীর সামনের স্কুল যেখানে বাড়ির সকলে পড়েছে পাড়ার সবাই পড়ে সেখানেই মানুষ হবে।" কয়েকদিনের মধ্যেই সর্বাণীদিই খবর এনেছিল, রামকৃষ্ণ আশ্রমের ভর্তির দ্বিতীয় মেধা তালিকায় প্রথম নামটাই আমার। আজ ভাবলে ভাল লাগে মানুষটার ওপর হাজার খারাপ লাগা থাকলেও আমার মধ্যে সৎ ভাবে চলার শিক্ষাটা হয়তো ওখান থেকেই শুরু। বোধ হওয়ার পর থেকেই পাখি পড়ার মত বাবাকে একটা কথা বলেতে সারাজীবন শুনে এসেছি "সৎ ভাবে থাকবে,সৎপথে চলবে"।

    মনিমেলার গল্প বলতে গেলে অনেক কিছুর সাথে সাথে যেটা বেশি করে মনে পড়ে তা আমার নাচ গান । আগেই বলেছি ওই এলাকাটা ছিল আমাদের এলাকার সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র, সম্ভ্রান্ত পাড়ার বাড়িগুলোও ওই পাড়ার মানুষগুলোর মতই কেমন যেন জাত্যাভিমানে ভরা।আমার ইসকুলের অনেক ছেলেরাই ওখানের বাসিন্দাও। ওরা টিফিন নিয়ে আসে লুচি পরোটা চিঁড়ের পোলাও, ম্যাগী, কিংবা ফলের টুকরো, সন্দেশ আমি ইসকুলে টিফিন নিয়ে যাই, রুটি আলুভাজা নয়তো মুড়ি-চানাচুর। মনিমার সঙ্গে ওদের একটা আলাদা রকমের সখ্যতা আছে, কেননা ওপাড়ায় অনেকেই মনিমার স্কুলবেলার বা গীটারবেলার বন্ধুবান্ধব। কোনও কোনও বাড়ীতে মনিমা পড়াতেও যায়। একদম ছোটতে আমাকে ইসকুলেও নিয়ে যেত মনিমা। মনিমার সূত্রে ওপাড়ার সকলের কাছেই আমি আদরের। আমাদের মনিমেলার বেশিরভাগের বাড়িও ওখানে। শর্মিষ্ঠাদি, শর্মিষ্ঠাদির বোন দেবযানীদি মিঠুদি এরা খুব ভাল নাচত। আর ছেলেদের মধ্যে নাচত শোভনদা। যতদূর মনে পড়ে শর্মিষ্ঠাদি কলকাতার কলামন্ডলমে থাঙ্কুমনি কুট্টির কাছে নাচ শিখলেও শোভনদার নাচ শেখা পাড়ার শিল্পীমাসির কাছে নাচের আনন্দে। মফস্বল শহরের লোকজন উদয়শঙ্কর, শম্ভু ভট্টাচার্যের নাচ নিয়ে অনেক আদিখ্যেতা করলেও নিজের পাড়ায় ছেলেদের নাচ নিয়ে স্বছ্যন্দ ছিলনা। তাই শোভনদার নাচ নিয়ে খুববেশি কথা বলতে চাইত না। শোভনদার কাছেই মনিমেলার মাঠে আমার নাচের হাতেখড়ি। আজও আমার শোভনদার শেখানো প্রথম কোরিওগ্রাফি ধিতাং ধিতাং বলে গানের সাথে পুরোটাই মনে আছে। জ্বর হওয়ায় বেশ কয়েকদিন, আমার মনিমেলায় যাওয়া হয় নি। মনিমা পড়িয়ে ফিরে জানাল বনধুদের সাথে গঙ্গায় চান করতে গিয়ে শোভনদা বাড়ি ফেরেনি। পরের দিন দুপুরে আরও অনেকটা দূরে চটকলের জেটিতে শোভনদার নিথর দেহ পাওয়া যায়। শোভনদা শিখিয়েছিল মনের কথা মুভমেন্টে কিভাবে প্রকাশ করতে হয়। নাচ শেখা নিয়ে আমার আগ্রহ থাকলেও আমার বাবার কোনও আগ্রহ কোনও কালেই ছিলনা। বাবা মনে করত নাচ মানেই মঞ্চের হাতছানি, আর আমাদের দেশে শিল্পীদের কোনও কদর নেই। আর ছেলে হয়ে নাচবে কি যদি মনে হয় গান শেখা ভাল।কিন্তু ওটা ওই পর্যন্তই।গানও আমি গাইতাম মনিমা আর দিদির থেকে শুনে শুনে। তবে লুকিয়ে লুকিয়ে ওপাড়ার দিদিদের কাছে একটু আধটু শিখে মনিমেলার অনুষ্ঠানে কয়েকবার নাচ করেছিলাম। যার ফলে আমার মনিমেলা যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

     

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৬ এপ্রিল ২০২১ | ৯৪০ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন