• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা পর্ব ৭

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২৭ এপ্রিল ২০২১ | ১৮৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  •  

    বেড়ে ওঠার সাথে সাথে  আমার মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল গণসংগীতস্বাধীনতা  দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস কিংবা নেতাজীর জন্মদিনে এগান বেশি বেশি শোনা যেত  তখনও পর্যন্ত এইচ এমভি থেকে বেড়োত পুজোর গানআধা শহরে বেড়ে ওঠা পুজোপ্যান্ডেলে প্যান্ডেলে সে গান বাজত তখন এত থিমপুজোর বাড়বাড়ন্ত ছিলনা আমাদের শহরে তো নয়ই  কাপড়ের প্যান্ডেলে ঢাকের আওয়াজ, ছোটদের  ক্যাপ ফাটানোর গন্ধে অন্য পুজো আধুনিক বাংলা গান বলতে তখন  বুঝতাম রেডিওতে অনুরোধের আসর রবীন্দ্রনাথের গান,   নজরুলগীতি ছাড়া কখনও সখনও রজনীকান্তঅতুল প্রসাদী দিজেন্দ্রগীতি কানে এলেও  রবি নজরুলের কৌলিন্যে সেগান আলাদা করে খুব বেশি  রেখাপাত করেনি আমার মামারবাড়ি  ছিল গ্রামে ওখানে ছাড়াও মফস্বলে আমার বাড়ীর আশেপশেও মাঝে মাঝে অষ্টম প্রহর হরিনাম সংকীর্তন শোনা যেত  চারঘন্টায় এক প্রহর  এই অনুষ্ঠানে হাত ধরেই রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী কানে আসে কীর্তন গান যারা করতেন তাদের বলা হত কীর্তনিয়া সে যুগে জনপ্রিয় কীর্তন শিল্পী  ছিলেন ছবি বন্দোপাধ্যায়  তখনও বাংলা গানে জীবনমুখী  গানের জোয়ার আসেনি যে সময়ের কথা বলছি তখনও বাড়িতে বাড়িতে টিভি ছিলনা হিন্দি ছায়ছবির গান শোনা মানে টিভিতে বুধবারের চিত্রহার শনিবার স্কুলের  হাফ ছুটি হত ফেরার পথে রেডিও তে শুরু হত  " শনিবারের বারবেলা" সঙ্গে ওয়েসিসের বিজ্ঞাপন তখনও মাঝে মাঝে বাড়িতে মানিকপীর আসতেন তার অবোধ্য ভাষায় গাওয়া গানের সুর আজও টানে মফস্বল শহরে বা গ্রামে তখনও ভোরবেলা দলবেঁধে  কীর্তনীয়ারা নগরকীর্তনে বেরোতেন তখনও পয়লা বৈশাখে লাল খেরোর খাতায় লাল সিঁদুরেতেল দিয়ে  ষষ্ঠীপুতুল বা স্বস্তিক আকাঁর ওপর সিদ্ধি ছড়িয়ে রুপোর কয়েনের সিঁদুর ছাপ নিয়ে বাঙালীর গনেশ-লক্ষ্মী পুজোদিয়ে বাঙালির  ব্যবসা শুরু হত বেওসা নয়   

     

     

    আমাদের স্কুলে  বারো মাসে তেরো পার্বনের রেওয়াজ ছিল, তবে সব থেকে আকর্ষনীয় ছিল তিনদিনব্যাপী বার্ষিক পুরস্কার  বিতরনী  অনুষ্ঠান। ওই মঞ্চে অনুষ্ঠানের আগ্রহ অনেকের মতই আমিও মনে মনে পোষণ করতাম। ছোটখাটো অনুষ্ঠান, লোকনৃত্য সকলের সাথে ইস্কুলের মাঠের পোগ্রামে করলেও ওই বড়মঞ্চ টা খুব টানত।  সে সময় আমার বাড়িতে টেপরেকর্ডার  ছিলনা, রেডিও টিভির গান শুনে শুনে বাড়িতেই নাচ তুলতাম নিজের মনে।মাথার মধ্যে থাকত শোভনদার শেখানো কথা মনের ভাব মুখে আর শরীরের মুভমেন্টে  ফুটিয়ে তুলতে পারলেই নাচ হয়। সে সময় কোলকাতা দূরর্শনে বেশ কয়েকবার শম্ভু  ভট্টাচার্যের  নাচ দেখেছি, হেমন্ত  মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে  সুকান্ত  ভট্টাচার্য এর কবিতা রানার এর সঙ্গে  অদ্ভুত  ভাবে এই অ্যালবামের সব গানগুলোই আমাকে টানত। পাশেরবাড়ির দাদার একটা টেপরেকর্ডার  এই  অ্যালবামটা প্রায়ই  বাজত আর আমি শুনে শুনে কোরিওগ্রাফি  তৈরীর চেষ্টা  করতাম। এই অ্যালবামের   একটা গান আমার খুব প্রিয় ছিল। এতবার শুনেছি মুখস্থ  হয়ে গেছিল। একদিন দাদার কাছ থেকে টেপরেকর্ডার  আর ক্যাসেট টা চেয়ে নিয়ে এসে একটা খাঁচা তৈরী করলাম। কাঠামো তো হল মাটি দেবে কেশরণাপন্ন হলাম স্কুলের একজন  মাষ্টার মশাইয়ের।  ওনার স্ত্রী  নাচ শেখাতেন আমাদের স্কুলের অবৈতনিক বিভাগে। কাকিমনি আর স্যার এর উৎসাহে কাঠামোয় মাটিই পড়ল না, রঙ পড়ল। সন্ধ্যেবেলা স্যারের বাড়ি পড়া বুঝতে যাওয়ার নামে বেশ কিছুদিন চলল মহড়া।কেউ কিছুই  জানল না, তখন আমি ক্লাস এইট। বার্ষিক  পুরস্কার  বিতরনী  অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান  দেখার জন্য প্রতিবারের মত   মাও গিয়েছিল অনুষ্ঠান সূচীতে আমার নাম দেখেও কল্পনাও করেনি ওটা আমি হতে পারি। আমার প্রথমবার নাচের বড় অনুষ্ঠান হেমন্ত মুখার্জির গাওয়া অবাক পৃথিবী  গানে, অবাক হয়েছিল সারা স্কুল। কেননা তার আগে পর্যন্ত আমার ভালবাসার খবর কেউই পায়নি।  পরদিন থেকে আমার নামই হয়ে  গিয়েছিল  অবাক পৃথিবী।  সেদিন থেকে স্কুলের সব পার্বণেই আমার অংশ নেওয়া ছিল অবধারিত  আর প্রত্যেকবার কাকিমনি আর স্যার পাশে থেকেছেন

     

    অবাক পৃথিবী  আমাকে সত্যিই অবাক করেছিল। লাইম লাইটের আলো আগেও আমার ওপর ছিল।তবে সেদিনের অনুষ্ঠানের পর থেকে নাচ নিয়ে একটা অদ্ভুত  পরিচিতি  হতে শুরু করে। আমার আপাত মেয়েলি নরমসরম হাবভাবের জন্য মনে করা শুরু হল নাচই কারণ।  একটা নির্দিষ্ট খোপে পড়ে গেলাম।  পড়াশোনায় একবারে প্রথম শ্রেনীর  না হলেও সকল স্যাররা ভালবাসতেন।  আর যাই হোক সকলেই আমরা কমবেশি  সমান বিচ্চু হলেও ক্লাসে শান্তশিষ্ট  স্বভাবের ছিলাম।  কোনও একজন স্যার সুযোগ পেলেই নাচ নিয়ে হেনস্তা  করতে ছাড়তেন না। সকলের মাঝে অকারণে নাচুনি বলে টোনও করতেন।   কোন পাকা ধানে মই দিয়েছিলাম তা আজও জানিনা।  যদিও বন্ধুরা কোনও দিন কোনওপ্রকার টোন বা ব্যুলি করেনি নিয়ে। আমাদের স্কুলের প্রার্থনা সভায় প্রতিদিন বেশ কিছুটা সময় বরাদ্দ  থাকত বিভিন্ন ক্লাসের ছেলেদের থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। ওই সময় তাদের কোনও কোনও অ্যকটিভিটি পরিবেশন করতে হত। এটা সোশাল অ্যাংসাইটি বা জড়তা কাটানোর একরকম পদ্ধতি ক্লাসের হয়ে প্রতিনিধিত্ব কাউকে না কাউকে করতে হত। যদি কেউ না থাকত, তাৎক্ষণিক ভাবে কাউকে উঠতে হত।  এরকম একদিন তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই আমায় উঠতে হল, আমি পড়লাম বিড়ম্বনায়। সেই মাস্টার মশায় তখন ভারতীয়  নৃত্যের ইতিহাস নিয়ে কিছু বলতে বললেন। কোনওরকমে মান বাঁচালেও বুঝলাম আমার নাচ নিয়ে আরও পড়াশোনা দরকার। এবং যতই মনের আনন্দে নাচ করি না কেন ব্যকরণ গত ভাবে শাস্ত্রীয় নৃত্য অনুশীলন  প্রয়োজন

    কিন্তু বাদ সাধল বাবা, কোনও ভাবেই রাজী করাতে পারলাম না। এদিকে অদম্য ইচ্ছা  নাচ শেখার। অথচ খরচ যোগাড় করব কিভাবে জানিনা। সব জেনে মুশকিল আসান হয়ে এলেন জুনিয়র বেসিকের এক দিদিমনি।  কাছাকাছি  তার পরিচিত  একজনকে সুপারিশ করলেন বিনা পারশ্রমিকে নাচ শেখানোর। লুকিয়ে  লুকিয়ে শুরু করলাম নাচ। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই শরীর দিয়ে চোকাতে হল গুরুদক্ষিণা। লজ্জা আর ঘেন্নায় বন্ধ  হয়ে গেল নাচ শেখা। 

     

     


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৭ এপ্রিল ২০২১ | ১৮৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন