• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • পুরানো কথা পর্ব ১৩

    Jaydip Jana লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৬ মে ২০২১ | ২৬৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • আমার মামারবাড়ি  গ্রামে  আমার মায়ের দাদু ছিলেন গ্রামের মোড়ল আমার মায়ের প্রপিতামহী  গঙ্গাযাত্রা থেকে বেঁচে ফেরার পর  সন্তান লাভ করেছিলেন আজ থেকে অতগুলো বছর আগে ঠিক কোন শারীরিক ব্যাধির কারণে তাঁকে গঙ্গাযাত্রায় পাঠানো  হয়েছিল তা আমি জানতে পারিনি মাকেও জিজ্ঞাসা করিনি কখনো তাই সেটুকু আমার অজানাই রয়ে গেছে তবে গ্রামের লোক অনেক পরেও গঙ্গাপুত্রের বংশ বলে মোড়লদের অভিহিত করতো সেটুকু আমি ছেলেবেলায়ও দেখেছি মায়ের সেই বড়ঠাকুমার দান  ধ্যানের গল্প আজও শোনা যায় অত বছর আগে গ্রামীণ পাঠশালা তৈরির জন্য জমিও তিনি দিয়েছিলেন বলে জানা যায় সে পাঠশালা আজ প্রাথমিক ইস্কুলে পরিণত হয়েছে   কালের নিয়মে আজ সে সব কথা হারিয়ে  গেলেও আজও কান পাতলে  শোনা যায়


    আমার দাদুরা ছিল সাত ভাই।  সাত দাদুর ছেলেপুলে মিলিয়ে বিশাল মোড়ল পাড়া। দাদুরা অনেকেই  চাষবাসের পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যোগ দেন। এক  দাদু রেলে চাকরি করতেন। একদাদু ইছাপুর গান ফ্যাক্টরি আর এক দাদু চ্যাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। আমার দাদু ছিলেন স্কুলমাস্টার আশে পাশের পাঁচ গায়ের লোকজন এক ডাকে মোড়লদের চেনে।  দাদুকেও চেনে। স্কুলে পড়ানো আর চাষবাসের সাথে সাথে বিভিন্নরকম ব্যবসা করতে করতে দাদু নিজেও জমিজমা বাড়িয়েছিল অনেকটা। ছেলেবেলায় দাদুরসঙ্গে চাষের জমিতে কিষানদের তদারকিতে গেলে দাদু খুব গর্বের সঙ্গে বলত," ধানজমির যতদূর পর্যন্ত তোমার নজর যাচ্ছে  ততটাই তোমার দাদুদের।এই কিষাণদের দুরকম ভাগ ছিল। কয়েকজন মনিষ ছিল গ্রামের। এরা সারাবছর জন খাটত। চাষের সাথে সাথে বাড়ির কাজ, বাগান বাগানো এসব করত, আর কিছু ছিল দূরের গ্রাম থেকে ট্রেনে করে কাছের রেল স্টেশনে সকালে এসে সারাদিন কাজ করে দুপুরের পর ফিরে যেত। এরা  লোকমুখে পরিচিত ছিল গাড়ির কিষেন বলে। গাড়ির কিষেনরা বেশিরভাগ ফসল কাটার সময় বা রোপনের সময় কাজে আসতো।   


     


     মেইন বাড়ীর সদর দরজার বাইরে ছিল বৈঠকখানা বাড়ি। আর তারপাশে পুরানো ঠাকুরদালান।  বিভিন্ন পুজো পার্বনের পাশাপাশি অষ্টমপ্রহর নাম  সংকীর্তনের প্রচলন ছিল বহুদিন। পরে তাতে আর পুজো হতনা তবে পায়রাদের সংসার ভরে উঠেছিল। সেটা পেরোলেই দুটো ধানের মরাই। আর একপাশে ঢেঁকিশাল। ঢেঁকিশালের পাশে ছিল মুড়িভাজার উনান। সারাবছর একজন আসতেন মুড়ি ভাজতে। মুড়িভাজার বড় মাটির পাত্রকে বলা হত খোলা আর ছোট মাটির পাত্রটা খুলি। নারকেলকাঠি চেঁছে কয়েক গোছা একসাথে করে তৈরী হত চুঁচিকাঠি বা চাঁচুনি। প্রথমে উনুনের অল্প পাতার জ্বালে খোলায় চাল নেড়ে নিয়ে রাখা হত। তারপর পাটকাঠির বা তুঁষের গনগনে আগুনে খুলিতে বালি দিয়ে গরম করে সেই চাল চাঁচুনি দিয়ে নাড়লে সাদা জুঁই ফুলের মত মুড়ি তৈরী হত। সে মুড়ির স্বাদ আর এখনকার ইউরিয়া দেওয়া মেশিনের মুড়ির স্বাদে  আকাশপাতাল ফারাক। দুমহলা বাড়ির  পিছনের বাড়ির বাতাবিলেবু তলায় বড় দুটো উনুনে মাঝে মাঝেই ধানসেদ্ধ করা হত চাল তৈরীর জন্য। ওই উনুনের তুঁষের ভিটভিটে আগুনে দুপুরে সকলে যখন ঘুমাতো আমরা ছোটরা আলুপোড়াতে দিতাম


    মোড়লদের জমিজমা প্রচুর। বাড়ির লাগোয়া কয়েক বিঘা জমিতে বিশাল আমবাগান, পেরোলে সবেদা বাগান, পেরোলে লিচু বাগান, পেরোলে কলাবাগান। এক বাগান থেকে আর এক বাগানে যেতে নিচু পগাড় কাটা থাকত। বর্ষাকালে জল যাওয়ার জন্য। আর পগারের ধার ধরে ছিল আনারসের ঝোপ। লিচুগাছে খুব হনুমানের উপদ্রব হত। আর তাই কাকতাড়ুয়ার মত হাঁড়ি মুখো টাঙানো হত। ছেলেবেলায় বেশ ভয় পেতাম। গাছের মধ্য ক্যানেস্তারা টিন ঝোলানো হত বাঁশ টুকরো বেঁধে। হনুমানে লিচুর নরম ডালে লাফালে টিনগুলো বেজে উঠত। আর ছিল  দিঘির  মত বড় বড় পুকুর। তার একটা পুকুরে গলদা  চিংড়ি চাষ হত। গরম পড়লে গাঁদি লাগত। পুকুড়ের পাড় বরারর চিংড়ি উঠে আসত।  বিকালে গা ধুতে গেলেই গামছা ভর্তি চিংড়ি  তুলত প্রায় সকলে। এখনকার মত  হরেক রেসিপি না। আলু আর চিংড়ি দিয়ে ঘি আর গরমমশলা সহযোগে  ঝোল বানাত আমার দিদা।  সে রান্নার স্বাদ ছিল অমৃতসমান।  আর একটা রান্না ছিল দিদার ট্রেডমার্ক। কুমড়ো রাঙালু মটরডালের বড়ি আর তেঁতুল দিয়ে টক।  সে টকের স্বাদ আর কখনো কোথাও আমি পাইনি। 'দিদা খুব ভাল আচার বানাত। শীতের দুপুরে ছাদের আচারের বয়ামের আচার প্রায়ই কমে যাওয়ার পেছনে আমাদের ছোটদের দায় ছিল অপরিসীম। তবে দিদা জানলেও কোনওদিন বকুনি খাইনি। মেজদাদুর বাড়ির লাগোয়া একটা বিশাল বড় তেঁতুল  গাছ ছিল। মনে আছে একবার হনুমানে ছাদের টিভির অ্যান্টেনা বাঁকিয়েই ক্ষান্ত  হয়নি। ছাদের দরজা খোলা পেয়ে সটান দোতলায় নেমে এসে বইয়ের আলমারির কাঁচ আর টিভিও ভেঙে দিয়েছিল


     


    আমার মায়েরা ছয়ভাই তিন বোন। বাকী দাদুদের প্রায় ওরকম কয়েক গন্ডা ছেলেপুলে। তখনও ইন্দিরাগান্ধীর "হাম দো হামারা দো" স্লোগান বাজারে আসেনি কিনা।মামারবাড়ির গুষ্টির কারও বিয়ে অন্নপ্রাশনে পুরো উৎসব লাগত। দুদিন আগে থেকে  বাড়িতে ভিয়েন বসত।  অনুষ্ঠানের সকালে পুকুরে জাল ফেলা হত। আমার ছোটমাসীমনির বিয়েতে খুব সুন্দর  তত্ত্ব  এসেছিল। আজকাল ঠিক যেমন সাজিয়ে গুজিয়ে কাপড় ভাঁজ করে অরিগ্যমি মোটিভ তৈরী হয় তেমন। এই তত্ত্বের ট্রে আনপ্যাক করতে করতে আমার তত্ত্ব সাজানো শেখা


    শীতকালে মামামাসীদের অনেকের শহুরে বন্ধুরা আমবাগানে পিকনিক করতে আসত। তবে আমার ছোট মাসীমনির উদ্যোগে শীতের ছুটিতে আমবাগানে আমাদের ছোটদের চড়ুইভাতির ডিমের ঝোল ভাত কিংবা ডিমভাজা খিচুড়ি মনে পড়লে আজও মনে হয় আবার যদি ছোটবেলাটা ফেরত পেতাম

     


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৬ মে ২০২১ | ২৬৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন