এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • নিউনর্মাল করোনাকালীন 

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৮ এপ্রিল ২০২৩ | ৪৪৯ বার পঠিত
  • টুপুর মেধার বাড়ির গ্যারাজে স্টক রাখতে এসেছিলো। প্রচুর ব্যাগ। মাস্ক বেশ কিছু। আনলক পিরিয়ডে মাস্কের চাহিদা কমে গেছে। ইউজ অ্যান্ড থ্রো আছে। এন ফিফটি ফাইভ কিনছে না কেউ আর। মানে কনফিউজড। প্রথমে বলা হয়েছিল যে এন নাইন্টি ফাইভ ইজ আইডিয়াল। তারপর বলা হল ওটাই ক্ষতিকর। মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না। ফ্যাশনেবল কাঁথা স্টিচের মাস্ক, কলমকারি মাস্ক, কবিতার লাইন লেখা মাস্ক এখনো কিছুটা চলছে। এমনকী বেনারসী মাস্ক। কোভিডের মোকাবিলায় ফ্যাশন পর্যন্ত এলো চলে। বিয়েবাড়ির জন্য জমকালো মুখবন্ধনী। কিছু ভালো কোয়ালিটির গামছা। ব্যাগ এখন নানারকম বানাচ্ছে ওরা। করুণাকে বলেছে টুপুর, বাজারের ব্যাগ বানাও কাপড়ের। অ্যান্টি প্ল্যাস্টিক স্ট্যান্ড। প্লাস টেকসই। ওয়াশেবল। দেখতে ভালো। একটু প্রচার দরকার। তার আগে করুণা আর প্রতিমাকে কলকাতাতে শিফট করানো প্রয়োজন। যেভাবে নিতাই সামন্ত পেছনে লেগেছে, যে কোনো সময় তুলে নিয়ে যেতে পারে মেয়ে দুটোকে। গ্রামের কেউ ভয়ে টু শব্দটি করবে না। একবার বেঁচেছে। কিন্ত এখন একেবারেই ঘরবন্দি। আবার বিয়ের চেষ্টা চলছে। কিছু ঘটার আগে ওদের কলকাতাতে নিয়ে আসা খুব জরুরি।
    গ্যারাজটা বিশাল বড়। তাই স্টক রাখা যাচ্ছে। কিন্তু এইভাবে বেশিদিন চলে না। একটা ঠিকঠাক জায়গা চাই। জিনিস এবং মানুষ। উভয়ের। 
    ঈশান ফোন করল। টুপুর স্টক গোছাচ্ছিল। মেধা লিখছে। হিসেব মেলাচ্ছে। টুপুর ফোন কেটে দিল। মেসেজ করল। কলিং ইউ।
    ঈশান রিপ্লাই করল, টেক ইওর টাইম। হোয়াট অ্যাবাউট মেকিং আ ট্রিপ টু বোলপুর? আই অ্যাম সাফোকেটেড। বহুদিন কোথাও যাওয়া হয় না। যাবে?

    করুণা কোথায় থাকবে? মেধার বাড়িতে একজনকে রাখা যায়। তাহলে প্রতিমা? টুপুরের বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠল।
    মা! মা বাড়িতে থাকলে সহজেই প্রতিমাকে বাড়িতে রাখা যেত। ও খুব শান্ত মেয়ে। মালবিকার অসুবিধে হত না কিছুই। হয়তো ভালোই লাগত। কিন্ত এখন বাড়ি ফাঁকা। মালবিকা নেই। তাঁকে ছাড়া বাড়ির চেহারা একদম অন্যরকম। শ্যামা চলে গেছে নিজের বাড়িতে। দুবেলা এসে কাজকর্ম করে দিয়ে যায়। সকালবেলাটাই বেশিক্ষণ থাকে। খুব ঝকঝকে বাড়িঘর এখনো। রান্নাঘরে হলুদ টাইলসে তেমনি রোদ পড়ে। শ্যামা রান্না শেষ হলে সাদা, সবুজ, গোলাপি ন্যাপকিন সার্ফের জলে কেচে ঝুলিয়ে দেয়। বাটামাছের ঝোল। একদম আদাবাটা, হলুদ দিয়ে কখনো। কখনো চিকেন স্ট্যু। কুচো মাছ টম্যাটো, আলু ঝিরিঝিরি করে কেটে। একটু সুক্তো। ত্রিদিবের ব্ল্যাক আউটের পরে এইরকম রান্না হবে, বলে গেছেন মালবিকা।
    উইক এন্ডে আসেন। সব দেখাশোনা করেন। ঘরের দরজা বন্ধ করে একটা রাত কাটিয়ে চলে যান।
    - হস্টেলে তো কেউ নেই মেয়েরা এখন। অতবড় ফ্ল্যাট সুপারের। তুমি একা একা কী করো?
    ত্রিদিব জিজ্ঞেস করছেন। ডাইনিং টেবলে খেতে বসেছেন। সামনে সাদা পোর্সেলিনের প্লেটে দুটো রুটি। সবজি। ডাল। টক দই।
    মালবিকা উত্তর দিলেন না। এক কাপ চা নিয়ে বসেছেন।
    - বাড়িতে থাকা কী খুব অসুবিধাজনক ছিল?
    ত্রিদিব খুব কাতর ভাবে প্রশ্ন করছেন। শয়নকক্ষে একা থাকা তাঁর টেনশন বৃদ্ধি করে। পাশে মালবিকা নেই। পরিচিত দেহসৌরভ নেই। প্রয়োজনে অভ্যাসবশে দেহকাতরতাকে রিপ্রেস করতে হচ্ছে। তারপর ভয় করে। যদি আবার ব্ল্যাক আউট হয় কখনো!
    এইসব ভয়ের মুহূর্তে ত্রিদিবের রীণা যোশিকে মনে পড়ে না কখনো। মালবিকাকে হাতড়ে খুঁজতে থাকেন। আঠাশ ভার্সাস পাঁচ। বলা ভালো তিরিশ ভার্সাস পাঁচ। যদি প্রেমপর্ব ধরা যায় মালবিকার সঙ্গে, তবে তিরিশ। রীণা পাঁচ। সময় সত্যি বলবান। অথবা ত্রিদিব অপারচুনিস্ট। সুযোগসন্ধানী। মালবিকা অভ্যেস ও রীণা বিনোদন! এমন সুবিধাযোগ কেটে গেলে অসুবিধে তো হবার কথা বটেই। ত্রিদিবের ঘাম হতে থাকে।
    - তুমি কী বাড়ি থেকে কাজ করতে পারো না মালবিকা?
    ত্রিদিব মালবিকা বলে ডাকেন না বহুদিন। হঠাৎই। মালবিকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নির্বিকারভাবে বললেন, পারি। কিন্ত থাকবো না। উইক এন্ডে আসবো। যেমন এসেছি। আবার চলে যাবো।
    - আমার যদি আবার ব্ল্যাক আউট হয়? রাতে? ঘুমের মধ্যে যদি কিছু হয়?
    এইসব প্রশ্ন যদি পাঁচবছর আগে করতেন ত্রিদিব, মালবিকা আর্দ্র হতেন। হয়তো কাঁদতেন। ভীষণ বিচলিত হতেন। সেটাই টেকন ফর গ্রান্টেড। সমাজ, সিরিয়াল ও স্বামীরা এটাই আশা করেন।

    মালবিকা চা শেষ করলেন ধীরে সুস্থে। মনে মনে বললেন, ব্ল্যাক আউট হোক আর না হোক, ইউ হ্যাভ নট স্টপ্ড মিটিং রীণা যোশি। ইউ ডু এনজয় হার কম্পানি। করো।
    মুখে কিছু বললেন না। তাঁর বাঁধে। আত্মসমর্পণ না আর। আত্মরক্ষা করছেন। অফেন্সে খেলবেন না। ডিফেন্স।
    - হলেও আমি তো আটকাতে পারবো না। তাছাড়া, ধরো আমি যদি দুরে চাকরি করতাম? বা মরেই যাই? হোয়াট উইল ইউ ডু? একাই তো ঘুমাবে? অব কোর্স ইউ ক্যান থিংক অব রিম্যারেজ ইন দ্যাট কেস।
    ইচ্ছে করে খোঁচাটা দিলেন। জানেন। খুব ভালো করে জানেন কাপুরুষরা কখনো রীণা যোশির হাত ধরতে পারে না।
    মালবিকা ঠোঁটের কোণ মুছলেন আঁচল দিয়ে। কোনও তাড়াহুড়ো নয়। আবেগকে আটকাতে শিখে গেছেন এখন।
    - কিছু হবে না। লাইফস্টাইলটা ঠিক রাখো। মদ খাওয়া ছাড়ো। অ্যান্ড কিপ ইন টাচ উইদ দ্য ডক।
    ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়লেন। শ্যামা এসেছে তিনি এসেছেন বলে। রাতের রান্না করে গুছিয়েগাছিয়ে যাবে।
    ত্রিদিবের ডাক্তারের সঙ্গে মালবিকা নিজেই যোগাযোগ রাখেন নিয়মিত। বাট টাইম হ্যাজ কাম। এখন ত্রিদিব নিজে বুঝতে শুরু করুন নিজেরটুকু। মালবিকা বুঝে দিয়েছেন অনেকদিন। এমনকি ত্রিদিবের কখন খিদে পায় সেটাও।
    ইনাফ ইজ ইনাফ।
    অদ্ভুতভাবে  ক'দিনেই ফ্ল্যাটটার ওপর একটা টান জন্মেছে মালবিকার। ছিমছাম করে গুছিয়ে নিচ্ছেন। অসুবিধে হচ্ছে না কিছু। এমনকী ভয় লাগছে না পর্যন্ত। ইন্টারকম এবং ইন্টারনেট।দুটোই আছে। মেট্রন আছেন। সাবিরা হোসেইন। ইট ইজ ফাইন ওভারঅল। সকালের দিকে নিজের রান্নাবান্না করে নেন। তারপর অনলাইন ক্লাস। ফাঁকফোঁকরে বাজার হাট নয় এখনো। সব অনলাইনে কিনছেন। তবে ফ্ল্যাট সাজিয়ে নিচ্ছেন মনের মত। সন্ধের পর দুটি মেয়ে পড়তে আসে। সেটা খুব ভালো টনিকের কাজ করছে। ফেসবুকে একটা রান্নার ব্লগ লিখতে শুরু করেছেন মালবিকা। বেশ ভালো রেসপন্স পাচ্ছেন। ফেলে আসা ঋতুচক্রের বিরহ আপাতত ভোগাচ্ছে না তাঁকে। ভেবেছেন নাচটা শুরু করবেন আবার। সুনন্দিতাই ইন্সিপিরেশন। একটা একটু করে আর্দ্রতা ফিরছে মনে হচ্ছে।

    - শ্যামা, টুপুর খাবে না রাতে?
    শ্যামা বাসন তুলে দিচ্ছে দেখে জিজ্ঞেস করলেন।
    - দিদি তো নেই। বোলপুর যাবে বলে বেরিয়েছে।
    মালবিকা ত্রিদিবের দিকে তাকালেন।
    - বলে গেছে?
    ত্রিদিব অন্যমনস্ক ভাবে খেয়ে যাচ্ছেন। সন্ধেটা ফাঁকা যাচ্ছে বড় আজকাল। কী ই বা করতে পারেন ত্রিদিব?
    কখনও কখনও জীবন সামনে কোনও বিকল্প রাখে না। এখন দিব্য বুঝতে পারছেন। কী তীব্র শূণ্যতা!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ২৮ এপ্রিল ২০২৩ | ৪৪৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন