এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • নিউ নর্মাল করোনাকালীন পর্ব উনিশ

    Anuradha Kunda লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৬ মে ২০২৩ | ৪২২ বার পঠিত
  • এবার শীত বড় জ্বালাচ্ছে। ময়না তীক্ষ্ণ চোখে বড়বউয়ের হাঁটা চলা দেখছিল। হাতে কাজ নেই তবু চলনবলনে এত চমকদমক কেন? তার ছেলে জান কবুল করে পয়সা আনছে আর মেয়েমানুষটা পায়ে গয়না লাগিয়ে ছমছম করে সত্যনারাণের সিন্নি খেতে চলে গেল! একবার বললো না ময়নাকে! ময়নার দম বন্ধ লাগছে। কাজটা যাবো যাবো করে চলেই গেল। ভেবেছিল লকডাউনের পর ওরা ডেকে নেবে। কবে যাব ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, এইরকম ভাবছিল ময়না। তো ওরা বলে দিল, আর আসতে হবে না।

    দুম করে এইরকম একটা কান্ড হবে ময়না ভাবে নি। কাজটা হালকা ছিল। খাইদাই ভালো। সে মেজাজ দেখালেও ওরা তেমন কিছু বলতো না। সব হিসেব গুলিয়ে গেছে ময়নার। বয়স তো হল। হিসেব যদিও রাখে না ময়না, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে পঁয়ষট্টি, তবে মনে মনে জানে সত্তর পার হয়েছে তার। এখন আর আগের মত খাটতে পারে না। লকডাউনে যাদের যাদের কাজ গেছিল, সবাই নতুন কাজ খুঁজে নিয়েছে। তারা সব জোয়ান মানুষ। খাটতে পারবে। ময়না এখন আর ভারি কাজ পারবে না। শরীরে নেয় না। একে তো ওজন বেশি। তারপর খাওয়ার মুখ হয়ে গেছে ভালো। নিজের টাকাতে রোজ রোজ বোয়াল সর্ষে, দই রুই, টোম্যাটো দিয়ে পমফ্লেট জুটবে না। মনটা তাই ভালো নেই। কাজ খুঁজতে বেরোতে হবে। বড় বউয়ের বাপের বাড়ি সত্যনারাণ। একবার বললো না পর্যন্ত। ময়নার দুটো শখ। খাওয়া। আর কীর্তন শোনা। দুটোতেই ভাঁটা পড়েছে।
    ছোটো ছেলের বউ তো দিল্লি দিল্লি করে উঠে পড়ে লেগেছে। বিশু একটা বিল্ডিং এর কাজে আপাতত লেগেছে বটে কিন্ত মদ খাওয়া খুব বেড়ে গেছে। ফলে মেজাজও বেড়েছে। রোজ ঠোকাঠুকি। চিৎকার। মারামারি। গতরাতেও হয়েছে। মার খেয়ে মানি গাল ফুলিয়ে পাশের বাড়ি কাঁদুনি গাইতে গেছে। ময়না পষ্ট দেখেছে মানির কোমরে কালশিরের দাগ। হাঁটতে পারছে না ভালোমতো। তবু ডেকে কিছু বলেনি। খাক মার। মাগীর বড় দেমাক।
    বড়ছেলে ময়ামাছ ধরেছে। দয়া করে ময়নার ঘরে দিয়েছে কিছু। সকালে উঠে ময়না তার আদ্যিকালের লেপ তোষক বালিশ সব রোদে দিয়েছে। ঘর খানা মুছেছে কোনোমতে। ঝুল ঝেড়েছে। এবার ময়ামাছের টক রাঁধবে তেঁতুল দিয়ে। ভালোমন্দ খাওনের জন্য মন বড় আনচান করে।
    মানি পাশের বাড়িতে কাঁদতে যায় নি। এখন তার হাতে কিছু পয়সা চাই। পাশের বাড়ির দাদা শ্রমজীবী ইনডিস্ট্রিয়াল কো অপারেটিভ সোসাইটির কর্মচারী। ওখানে হ্যান্ড ওয়াশ, স্যানিটাইজার, ফিনাইল, ডিটারজেন্ট, সাবান এমনকী আচার, বড়ি সব মেলে। ওখানে একটা কাজ চাই। মানি ফ্যাক্ট্রিতে কাজ করতে পারে, সেলসে কাজ করতে পারে, হোম ডেলিভারির কাজও করতে পারে। যে করে হোক কাজ চাই। হাতে টাকা থাকা দরকার। যে টাকার জোরে তার শাশুড়ি কাউকে তোয়াক্কা করে না। ডাল ভাতের টাকা ব্যাঙ্কে মজুত আছে। তবে কীনা মানিকে ছেলের কথা ভাবতে হয়। তার জন্যও তো কিছু রাখা চাই। কোমরে কাঠ দিয়ে মেরেছে বিশু। জায়গাটা টনটন করছে। পাল্টে মানিও ছেড়ে দেয়নি। কীল চড় ঘুষি। যা পারে মেরেছে। ব্যাপারটা ময়না টের পেয়েছে। কিছু উচ্চবাচ্চ্য করেনি। ওরা যা করছে করুক। সে মরছে নিজের জ্বালাতে। তারপর আবার সিন্নিটুকুও জুটল না।

    মানির কাজ জুটে গেল আশাপাড়া শ্রমজীবী কোঅপারেটিভে। সেলসের কাজ। এও দিল্লির গুণ। মানি বাংলা আর হিন্দি দুটোই বলতে পারে তরতর করে। দু চারখানা ইংরিজি শব্দ জানে। যাকে বলে স্মার্ট। কো অপারেটিভের দিদিমণি সুপ্রভা মিত্র বারবার করে বলে দিল, কামাই করবে না। সান ডে ছুটি। তাছাড়া টাইমলি আসবে।
    ফেরার সময় মানির জ্বালা একটু কমলো। মেহতা হাউসে কাজ করার পর আর অন্য কোথাও কাজে মন টিকবে না ঝট করে। সে বেশ জানে। তার চেয়ে এই ভালো হল। বাড়ির বাইরে যতটা থাকা যায়। বিশুর মুখের দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করে না তার। সুপ্রভাদি বলেছে সামনের মাসে এক্সিবিশন হবে। তাতেও মানিকে রাখা হবে। যদি ভালো কাজ দিতে পারে।
    মানি ফিরে দেখে ময়না মুখ শুকিয়ে বসে আছে। জাঁদরেল শাশুড়ির দিকে তেমন ফিরে তাকায় না সে। কিন্ত এখন মন ভালো আছে। মানির বুকের ভেতর মোচড়। আহা। মানুষটা একটু নেমন্তর আশাতে  ছিল! তাও জুটল না! তারপর বুড়ির কাজটাও গেছে। ঘরে বিশু নেই। মানি ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল। পাশেই মুদীর দোকান। ময়দা আর গুড় কিনল আধাকিলো করে। অর্ধেক নারকেল রাখা আছে। খেজুর নিল একটু। যদিও তেমন সরেশ না। তবু। কাজু নাহয় নাই ছুটল। ঘরেই সিন্নি বানাবে মানি। ছেলেটাও ভালোবাসে। বুড়ির মুখেও রুচবে। হোক খান্ডারনি। তবু মেয়েমানুষ তো! জীবনে কতকিছু যে না পাওয়া থাকে!
    শ্বশুরকে জীবনে দেখে নি। সে নাকী দুটো ব্যাটা একটা বেটীর জন্ম দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে গেছিল। দুঃখ বেশি হলে ময়না গজরায়। হারামজাদা গেলি তো গেলি ব্যাটা বেটির জন্ম না দিয়েই যেতি।আমার পায়ে বেড়ি পড়িয়ে গেলি কেন।
    বরকে আর কোনোদিন দেখেনি ময়না। শুনেছে মারা গেছে। শাঁখা সিঁদুর জলে দিয়ে কাজে লেগে গেছে। একসময় চপ ঘুগনির দোকান দিয়েছিল মানি। যিশু বড় হয়ে যেই দোকান চালাতে গেল, সব লাটে উঠেছে। সেই থেকে লোকের বাড়ির কাজ ধরেছে ময়না। আহা! দুটো সিন্নিই তো খাবে! ভেবে ময়দাতে কাঁচা দুধ ঢালে মানি।
    আর মেহতাদের কথা ভাবে। সুনন্দিতার হাতের সিন্নি। কতরকম যে ফল পড়ে তাতে আর কী স্বাদ। আমেলিয়ার জন্য আলাদা পিরিচে করে সিন্নি যায়। চামচ দিয়ে খাইয়ে দেয় মানি। আর বুড়ি সুরুৎ সুরুৎ করে খায়। মেমসাহেবের মুখে হিন্দি শুনে খুব অবাক লাগতো মানির। পরের দিকে সয়ে গেছিল।
    কলাগুলো ভাঙতে ভাঙতে মানির আমেলিয়ার ঘরের কথা মনে পড়ে। দেরাজভর্তি কাপড়জামা।সিন্দুক ভর্তি পুতুল। আহা গো! তাও নড়তে চড়তে পারে না! তার শাশুড়ি তো তবু চলে ফিরে খেতে পারে। কী কপাল!
    এই বড়দিনে মেহতাহাউসে কত আয়োজন। চোখ বুজে মানি যেন দেখতে পায়। টাটকা খেজুর আর স্ট্রবেরির গন্ধে মানির ভাঙা ঘর ম ম করে। ঘরের কোন কোণাতে একটু কিশমিশ রাখা ছিল। খুঁজে পেতে তাও দিল মানি সিন্নিতে। আমেলিয়ার পরিজ বানাতো সে নিজে হাতে। এখন কে করছে কে জানে।নিকিবাবার ফরমাসের খাবার। মানির টিনের চালের মধ্যে দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে। আর ঢোকে স্যাঁৎস্যাঁতে মদের গন্ধ। বিশু। ভর সন্ধেবেলা গিলে এসেছে। দশদিনের কাজ ছিল। আজ শেষদিন। তাই রাগ। তাই ফূর্তি। মানির চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে ফেলে বিশু। তারপর একলাথি দিয়ে সিন্নির বাটি ফেলে দেয়।
    - কার সঙ্গে শুতে গেলি কাজ পাবার জন্য?
    মানির মাথাতে আগুন জ্বলে। কোমরের ব্যাথা দপদপ করছিল এমনিতেই। আঁচড় কামড়ের জ্বালা। সব মিলিয়ে অন্যরকম হয়ে ওঠে মানি। মানুষ নয় যেন। ঋতুকালীন যন্ত্রণা, অস্বস্তির সঙ্গে মিশে যায় প্রবল গাঢ় রাগ। যার রঙ লাল। ঠান্ডা হাওয়া ঝাপটা মারে শরীরে।
    বিশুর মাতলামির আওয়াজে ফিরেও তাকায় না ময়না। লেপ তোশক নিয়ে ঘরে ঢোকে। রোদ পড়ে গেছে। নদীর হাওয়ায় বড় শীত।
    সিন্নির মোটা স্টিলের বাটি তুলে বিশুর মাথাতে এক ঘা বসিয়ে দেয় মানি। বিশু চিৎ হয়ে পড়ে যায়।
    বহু কষ্টের সঞ্চিত টাকাতে কেনা আধাকিলো দুধ, ময়দা, খেজুর, গুড়ের সঙ্গে মিশে গড়াতে থাকে রক্ত। কোনটা বেশি ঘন বোঝা যায় না।

    (চলছে)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ২৬ মে ২০২৩ | ৪২২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন