এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    বিপ্লবের আগুন - পর্ব চোদ্দ - কিশোর ঘোষাল | ছবি: রমিত চট্টোপাধ্যায়১৪সূর্যাস্ত হয়ে গেলেও পশ্চিম আকাশ এখনও কিছুটা রঙ আর আলো ধরে রেখেছে। পূবের আকাশে সে রঙের কোন আভাস নেই। গোটা আকাশটাকে অজস্র তারার চুমকি বসানো কালো পর্দার আড়ালে ঢেকে দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে সন্ধ্যাকাল। যেমন অপেক্ষা করছে নিশাচর জীবেরা – রাত্রি নামলে তারা বের হবে জীবিকার সন্ধানে। অন্যদিকে সারাদিন জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত পাখিরা এখন বাসায় ফিরছে। আশেপাশের গাছগুলি থেকে তাদের কলধ্বনি কানে আসছে। সন্ধ্যা আসছে, তার পিছনে আসছে রাত্রি।এই সন্ধিক্ষণেই গ্রামপ্রধান জুজাক নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন, কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। তাঁর পিছনে ঘরের দরজার পাশে মাটি-লেপা দরমার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন কমলিমা। দুজনেই দূরের পাহাড়, ঝোপঝাড়-জঙ্গল, পূবের আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। নির্লক্ষ্য বোবা, নির্বিকার দৃষ্টি মেলে। সবকিছুই তাঁদের দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে, কিন্তু তাঁদের মনে কোন ছায়া পড়ছে না। এই জীবন, ওই প্রকৃতি, দিন-রাত্রি এসবই তাঁদের কাছে আজ যেন মূল্যহীন মনে হচ্ছে। মাত্র হাত তিনেক দূরে বসে থাকা দুই জীবনসঙ্গী নিজেদের মধ্যে কথাও বলছেন না। দীর্ঘ দাম্পত্যের প্রেম-ভালোবাসা-ক্ষোভ-অভিমান-অভিযোগের কথা। কিংবা সাধারণ সাংসারিক সুখদুঃখের কথা, প্রয়োজনের কথা। সব কথাই যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাঁদের জীবন থেকে যেন ফুরিয়ে গেছে সমস্ত অনুভব।কেন এবং কতক্ষণ তাঁরা এভাবে বিমনা বসে আছেন, সে কথা একবারের জন্যেও তাঁদের মনে আসেনি। তাঁদের সম্বিৎ ফিরল কবিরাজদাদার ডাকে, “জুজাকভায়া, বাড়িতে একা একা বসে কী করছ?” জুজাক দাওয়া থেকে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন উঠোনে। “আসুন আসুন, কবিরাজদাদা। কী আর করব, এই বসে ছিলাম একটু…”। “সন্ধ্যে হয়ে গেল, আলো জ্বালাওনি, তুলসীতলায় প্রদীপ দেখাওনি। কী ব্যাপার? চুপ করে দাওয়ায় বসে দুটিতে কী ভাবছিলে বলো তো, মা?”কবিরাজদাদার ডাকে কমলিমাও উঠে পড়েছিলেন। আড়া থেকে আসন পেড়ে, দাওয়ায় বিছিয়ে দিয়ে, বললেন, “আসুন কবিরাজদাদা, বসুন। সত্যিই বড়ো ভুল হয়ে গেছে”। তিনি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে প্রদীপ জ্বালালেন। কাচা কাপড় পরে প্রদীপ হাতে, দ্রুত পায়ে নেমে গেলেন উঠোনের তুলসীতলায়। প্রথমে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন, তারপর গলায় আঁচল জড়িয়ে মাটিতে গড় হয়ে প্রণাম সারলেন। তারপর ঘরে ঢুকে প্রদীপ জ্বালিয়ে, সলতেটা ছোট করে বাইরে দাওয়ায় এসে বসলেন, নিজের জায়গাটিতেই। ঘরের স্তিমিত আলোয় এবং বাইরের ক্ষুদ্র দীপালোকে – অন্ধকার কিছুটা ফিকে হয়ে উঠল। আর তখনই পুবের পাহাড় চূড়ায় দেখা দিল চাঁদ। গতকাল পূর্ণিমা ছিল, আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। গতকালের পূর্ণতা আজ তার আর নেই – আগামী প্রতিদিনই সে শীর্ণ হতে থাকবে। কবিরাজদাদা জুজাকের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “গ্রামের পরিস্থিতি কী বুঝছো, জুজাক?” মুখে বিষণ্ণ হাসি নিয়ে জুজাক বললেন, “তুমি কী বুঝছো, কবিরাজদাদা?” কবিরাজ দাদা মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মোটেই ভালো বুঝছি না, হে। দিনকাল আগের মতো থাকছে না। অবশ্য দিনকাল যে চিরদিন একই রকম থাকবে, তা না। বদল হবেই। কিন্তু এ বদল যেন বড্ডো তাড়াতাড়ি ঘটে চলেছে”।জুজাক একই রকম বিষণ্ণ সুরে বললেন, “সব কিছুই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, কবিরাজদাদা। আমাদের বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে আর তাল রাখতে পারছি না”।সকলেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর জুজাক বললেন, “শুনলাম গত রাত্রে আস্থানের শিবিরে নাকি ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতদের হাতে নাকি তিন-তিনজন রক্ষী প্রাণ দিয়েছে। তুমি আমি এই গ্রামেই আশৈশব বড়ো হলাম, দাদা। এমন ডাকাতির কথা কোনদিন শুনেছ? আমাদের গ্রামের কথা ছেড়েই দাও আশেপাশে যত গ্রাম আমি চিনি কোথাও কোনদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। আজ কারা এইসব করছে? কে তাদের সাহস যোগাচ্ছে?”কবিরাজদাদা মন দিয়ে জুজাকের কথা শুনছিলেন। ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি নিয়ে তিনি বললেন, “তোমার নিজের প্রশ্নগুলির উত্তর তুমি তো নিজেই দিয়ে ফেললে জুজাক”। জুজাক কবিরাজদাদার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কোন কথা বললেন না। কবিরাজদাদা বিষণ্ণ হেসে বললেন, “বুঝতে পারলে না, না? আচ্ছা, গতকাল আমাদের গ্রামের পনের-ষোলোজন ছেলে রাত্রে বাড়িতে ছিল না”।“হ্যাঁ। ওরা তো রামকথা শুনতে গিয়েছিল”। “আশেপাশের গ্রামগুলোতে এমনকি আমাদের এই গ্রামেও নানান উৎসবে, পূর্ণিমায় এমন রামকথা তো প্রায়ই হয়। এ সব ধর্ম কথা শুনতে গ্রামের মহিলারা যায়...বয়স্ক মানুষরা যায়। অনেক ভক্ত আমাদের প্রতিবেশী গ্রামগুলিতেও যায়। কিন্তু জুজাক, তুমি আমায় বলো তো – আমাদের ছোকরা ছেলে-পুলেদের এত বড়ো দল কবে কোথায় গিয়েছে ধর্মকথা শুনতে? তাও কাছাকাছির মধ্যে প্রতিবেশী গ্রামে নয়, গভীর জঙ্গল-পথে এতটা হেঁটে, পাশের রাজ্যে? আমার তো মনে পড়ে না”। জুজাক চমকে উঠলেন, “তার মানে? ওরা কাল রাত্রে রামকথা শুনতে যায়নি? তাহলে কোথায় গিয়েছিল?”কবিরাজদাদা বললেন, “তা তো জানি না, ভাই। আরও একটা কথা - পাশের সুকরা গ্রামের চারজন গতকাল রাত্রে সত্যিই বটতলি গ্রামে গিয়েছিল রামকথা শুনতে। আমাদের ছোঁড়াগুলো যদি রামকথা শুনতে নাই গিয়ে থাকে, তাহলে ওই চারজন এসে ওদের সঙ্গে কোথায় জুটল? কেন জুটল?” জুজাক বললেন, “তুমি কি গতকাল আস্থানে ডাকাতির সঙ্গে আমাদের ছেলেদের সংযোগ খুঁজে পাচ্ছ”? কমলিমা এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, শুধু শুনছিলেন। এখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কী বলছো, এ কোনদিন হতে পারে? আমাদের ছেলেরা যাবে আস্থানে ডাকাতি করতে? কবিরাজদাদা, তুমি কি সত্যিই তাই সন্দেহ করছো? আমাদের ছেলেদের তুমি চেন না? তারা করবে ডাকাতি?”কবিরাজদাদা ম্লান হেসে বললেন, “কেন চিনব না? খুব ভালো করেই চিনি, মা। কিন্তু প্রথমেই যে বললাম, অনেক কিছু খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে”।কবিরাজদাদার কথাটা কমলিমার মনঃপূত হল না, বললেন, “তাই বলে ডাকাত?”কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “ডাকাত বলতে সাধারণ চোর-ডাকাতের কথা আমি বলিনি, মা। যাদের কথা আমরা সাধারণতঃ শুনে থাকি। তারা হিংস্র, লোভী, স্বার্থপর। পরের ধন-সম্পদ লুঠ করা তাদের জীবিকা। আস্থানে যে ডাকাতির কথা শুনলাম, মা, তাতে আর কিছু নয়, লুঠ হয়েছে প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র। কর সংগ্রহের সময় আস্থানের ভাণ্ডারে যথেষ্ট শস্য এবং অর্থ সঞ্চিত থাকে বা রয়েছে – এ কথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই ডাকাতরা আস্থানের শস্যভাণ্ডার কিংবা অর্থভাণ্ডার স্পর্শও করেনি। কেন? এই ডাকাতির সঙ্গে সাধারণ ডাকাতির কোন মিলই খুঁজে পাচ্ছি না। এই ডাকাতির উদ্দেশ্য অন্য কিছু…”। কমলিমা মানতে রাজি নন, তিনি বললেন, “এ কেমন তর ডাকাতি আমি বুঝি না, কবিরাজদাদা। কিন্তু তুমি যে বললে আস্থানে তিনজন রক্ষী নিহত হয়েছে। আমাদের ছেলেরা হত্যা করতে পারবে? একথা তুমি বিশ্বাস করো?”কবিরাজদাদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিছু বললেন না। এই গ্রামে বধূ হয়ে আসা থেকে তিনি কমলিকে চেনেন, স্নেহ করেন নিজের ভগ্নীর মতো। এই মেয়েটির মনে বিরাজ করে, সারল্য, বিশ্বাস, মায়া, ভালোবাসা আর মাতৃত্ব। তার ছোট্ট মনোজগতের বাইরের বিশাল জগৎ যে সর্বদা নিষ্ঠুর তঞ্চক ক্রূর ও কুটিল খেলায় মগ্ন রয়েছে, সে কথা কমলির কাছে কোনমতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা তুলসীতলার দীপ শিখাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কিন্তু আমি যে টের পাচ্ছি, মা, ধিকিধিকি আগুন জ্বলা শুরু হয়েছে”।জুজাক অনেকক্ষণ পর কথা বললেন, “এই আগুনের উৎস কি ভল্লা, কবিরাজদাদা?” কবিরাজদাদা উত্তরে “হ্যাঁ” কিংবা “না” কোন কথাই বললেন না, একই ভাবে তাকিয়ে রইলেন মঙ্গলময় স্নিগ্ধ দীপ শিখাটির দিকে। কিন্তু জুজাকের প্রশ্নের উত্তরে কবিরাজদাদা কিছু না বলাতে, ক্ষোভে ফেটে পড়লেন কমলিমা, বললেন, “যারে দেখতে নারি, তার চলন ব্যাঁকা? এ তোমাদের ভীষণ অন্যায় কবিরাজদাদা। ছেলেটাকে তোমরা কোনদিনই সহজ চোখে দেখতে পারো না। ছেলেটা আমাদের গ্রামের ছোঁড়াদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। কাজ নেই কর্ম নেই, তারা অলস দিন কাটাতো। সেই আলসেমি কাটিয়ে, সে তাদের মানুষ করে তুলছে...”। প্রাথমিক উত্তেজনায় কমলিমা এতগুলো কথা বলে ফেলে একটু শান্ত সংযত হলেন, তারপর আবার বললেন, “সেই কোন কাল থেকে তোমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে নালা বয়ে চলেছে। সেই জলকে কাজে লাগিয়ে যে চাষ করা সম্ভব, সে কথা কেউ তো বলতে পারেনি। ছেলেটা সেটাও করে দেখিয়েছে। আজ আমাদের নোনাপুর এবং সুকরার কিছু চাষি নতুন কিছু আবাদী জমি পেয়েছে। নতুন কিছু ফসল ফলানোর সুযোগ পেয়েছে। এ কি কম কথা, কবিরাজদাদা?”কমলিমায়ের কথা শেষ হতে কেউই কোন কথা বললেন না, অনেকক্ষণ চুপ করে বসে নিজেদের মনে চিন্তা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা বললেন, “ভল্লা অসুস্থ অবস্থায় যখন এসেছিল, প্রথম দেখাতেই আমি বলেছিলাম – এ ছোকরা অসাধারণ এবং বীর যোদ্ধা। মনে আছে? পরে আমরা জানলাম, ছোকরা নির্বাসন দণ্ড পাওয়া অপরাধী। যদিও মানবিক দিক দিয়ে বিচার করলে এত গুরু দণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ কী ও করেছে? আমাদের সহজাত বিবেচনায় মনে হয়, না করেনি। দু-পাঁচ বছরের কারা দণ্ডই হয়তো ওর ন্যায্য শাস্তি হতে পারত”। কবিরাজদাদা কিছুক্ষণ বিরতি দিলেন, কিছু চিন্তা করলেন। তারপর আবার বললেন, “প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নির্বাসন হয়েছে - কিন্তু নির্বাসনের জন্যে, তাকে এতদূরে রুক্ষ, উষর পশ্চিম প্রান্তে আসতে হল কেন? আমার মনে হয়েছে ও পূর্বাঞ্চলের লোক। সেক্ষেত্রে রাজধানী থেকে পূর্ব সীমান্তের দিকেই যাওয়াই ওর পক্ষে স্বাভাবিক হত। রাজধানী থেকে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের দূরত্ব, পূর্ব সীমান্তের থেকে অনেকটাই বেশি। ছোকরা তাহলে কেন আমাদের সীমান্তে এসে উপস্থিত হল। প্রশাসনের নির্দেশে?” যদিও দুজনের মনোভাবে বিস্তর ফারাক, কিন্তু জুজাক এবং কমলিমা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কবিরাজদাদার কথা শুনছিলেন। কবিরাজদাদা একটু থেমে আবার বললেন, “রাজধানীতে যা যা ঘটেছিল, ভল্লার মুখে আমরা সবাই শুনেছি। যাদের রাজধানীতে নিত্য যাওয়া আসা আছে, তাদের মুখেও যা শুনেছি - ভল্লা এতটুকুও মিথ্যা বলেনি। এও শুনেছি রাজধানীর সাধারণ মানুষ ভল্লার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এবং এই ঘটনার পর ভল্লা সাধারণের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে”। জুজাক নির্বিকার মনেই শুনছিল, কিন্তু কমলিমা ঘাড়ে ঝটকা দিয়ে কবিরাজদাদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে? মানুষ চিনতে আমি মোটেই ভুল করিনি, কবিরাজদাদা”। কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক। কিন্তু আমিও ওকে চিনতে এতটুকু ভুল করিনি, মা। শুধু দেখার চোখটাই যা আলাদা। যে কথা বলছিলাম, রাজধানীর ঘটনাটা যেদিন ঘটেছিল, শুনেছি সেই রাত্রেই ভল্লা রাজধানী থেকে রওনা হয়েছিল। রাজধানী ছাড়ার পর চতুর্থ দিন ভোরে সে আমাদের গ্রামে এসে পৌঁছেছিল পায়ে হেঁটে। বিপর্যস্ত অবস্থায়। রাজধানী থেকে আমাদের গ্রামের যা দুরত্ব, সেটা তিনদিন, তিন রাত পায়ে হেঁটে আসা অসম্ভব। বিশেষ করে ওরকম অসুস্থ অবস্থায়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ও বেশিরভাগ পথটাই এসেছিল হয় ঘোড়ায় চড়ে অথবা রণপায়”। একটু থেমে আবার বললেন, “আমাদের গ্রাম থেকে সবথেকে কাছের চটি হল বীজপুরের জনাইয়ের চটি। সেখান থেকে ভোর ভোর রওনা হলে, পায়ে হেঁটে পরের দিন ভোরে আমাদের গ্রামে হেসেখেলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ভল্লার মতো ছোকরাদের পক্ষে ছয়-সাত প্রহরই যথেষ্ট। কিন্তু ভল্লার অনেকটাই বেশি সময় লেগেছে, কারণ ও তখন ভয়ানক অসুস্থ”।কথা শেষ করে কবিরাজদাদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এঃ লক্ষ্যই করিনি রাত্রি অর্ধ প্রহর পার হতে চলল, আমি এখন আসি”। জুজাকও যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, বললেন, “চলো, তোমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিই”। “তুমি আবার বেরোবে কেন, জুজাক? চাঁদের আলোয় টুকটুক করে চলে যাবো”।“তা হোক, তোমার সঙ্গে কিছুটা যাই”। কবিরাজদাদা হাসলেন, উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলি রে, মা। রাগ করিস না। অনেক কথাই বললাম, তোর হয়তো ভালো লাগল না”।কমলিমা সংকোচের সুরে বললেন, “আমিও অনেক কথা বলে ফেললাম, রাগ করবেন না কবিরাজদাদা”। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুজনে নিঃশব্দে হেঁটে চললেন বেশ কিছুক্ষণ, তারপর জুজাক চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভল্লা কেন এখানে এসেছে, কিছু বুঝতে পারলে, কবিরাজদাদা? তার উদ্দেশ্যটা কি?”“ভল্লার এখানে আসার ব্যক্তিগত কোন উদ্দেশ্যই নেই জুজাক। ভল্লা এসেছে প্রশাসনের নির্দেশে কোন বিশেষ একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে। ভল্লার পিছনে আছে প্রশাসনের অদৃশ্য হাত”। “কী বলছ, কবিরাজদাদা? তাহলে তার এই নির্বাসন দণ্ড। আস্থানে শষ্পকের ওরকম অশ্রাব্য গালিগালাজ। মৃত্যুদণ্ডের হুমকি…এ সব কেন?”কবিরাজদাদা বললেন, “সবটাই সাজানো – নাটক। সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া…। তবে এটাও ঠিক ভল্লা রাষ্ট্রের ওপর এতটাই বিশ্বস্ত, এ কাজে সে নিজের প্রাণ পণ রাখতেও এতটুকু দ্বিধা করবে না। সে কাজে যদি তার বিবেকের সায় না থাকে – তাও”।বিস্মিত জুজাক জিজ্ঞাসা করলেন, “এভাবে একটা অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করায় রাষ্ট্রের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?”কবিরাজদাদা মাথা নাড়লেন, জানেন না। তারপর বললেন, “তুমি এবার এসো জুজাক, আমি তো প্রায় এসেই গেছি। এবার বাড়ি যাও – কমলিমা একলা রয়েছে বাড়িতে”। - - - -বটতলির ছোকরা পাঁচজন চলে যাওয়ার পর, ভল্লা চুপ করে বসেই রইল দণ্ড তিনেক। জঙ্গলের অন্ধকারে চুপচাপ বসে নানান চিন্তাভাবনা করতে তার ভালই লাগে। আঁধারে চোখের কাজ সীমিত হয়ে যায়। অবশ্য আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। জঙ্গলের বাইরে পূর্ণিমার মতোই জ্যোৎস্না ফুটেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু জঙ্গলে ঘন গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে তার ঝিলিমিলিটুকুই চোখে পড়ে। সেই আলো-আঁধারী ছায়া-প্রচ্ছায়াতে চোখে বেজায় বিভ্রম সৃষ্টি করে। এ সময় ভল্লা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার কানের ওপর। ভল্লার মনে হয়েছিল এসময় রামালি আসতে পারে। কিন্তু সন্ধের পর প্রায় তিন দণ্ড পার হয়ে গেল, রামালি এল না দেখে, সে রান্নার যোগাড়ে লাগল। কিছু কাঠকুটো জ্বেলে গুঁজে দিল উনুনের গর্তে। তারপর পোড়া মালসায় জল নিয়ে তিন মুঠো ভুট্টার দানা ঢেলে দিল তাতে। চাপিয়ে দিল আগুনের ওপর। শুকনো পাতা আর গাছের ডালের টুকরো ঠেলে দিল জ্বলন্ত উনুনের গর্তে। আগুন উলসে উঠল ভালোই। তারপর ঘর থেকে আনল একটু নুন আর গোটা পাঁচেক গোলমরিচের দানা। আর কাঁচা লঙ্কা ভেঙে ফেলে দিল উষ্ণ হতে থাকা মালসার জলে। এখন তার আর কিছু করার নেই, আগুনটাকে উস্কে তোলা ছাড়া। জল ফুটবে। ভুট্টার দানা সেদ্ধ হবে, সময় নেবে – দণ্ড খানেক তো বটেই। হঠাৎ তার পিঠে কেউ হাত রাখল, কর্কশ শক্তিশালী হাত। ভল্লা বিদ্যুৎ বেগে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত তুলল আঘাত করার জন্যে, আগন্তুক ভয় পেয়ে মাথা নামিয়ে বলল, “আরেঃ শালা, মারবি নাকি রে?” ভল্লা চিনতে পারল, মারুলা। হেসে ফেলে হাত নামিয়ে বলল, “ওঃ তুই”?“তা নয়তো কাকে ভেবেছিলি? এই জঙ্গলে তোকে সেই কখন থেকে খুঁজছি জানিস? কিছুতেই আর ঠাহর করতে পারছিলাম না। শেষে ওই আগুনের আলোয় বুঝতে পারলাম তুই এখানে। কী রাঁধছিস? ভুট্টার ঝোল? আমার জন্যেও দু মুঠো ফেলে দে, ভল্লা। খিদে পেয়েছে বেশ”। “তুই এখানে হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলি, হতভাগা”? বলতে বলতে ভল্লা উঠে ঘরে গেল, মুঠো তিনেক ভুট্টা এনে মালসায় ঢেলে দিয়ে, আরও একটু নুনের ছিরিক মেরে দিল। “আমি এখানে আছি সে বার্তা তোকে কে দিল?”মারুলা বলল, “তোকে এখানে যারা পাঠিয়েছে, তারাই আমাকে বলেছে তোর পোঁদে লেগে থাকতে। এঁটুলির মতো। কিন্তু একটা কথা ভল্লা, তুই কিন্তু বেশ ভোঁদা মেরে গেছিস। আমি তোর এত কাছে চলে এলাম, তোর পিঠে হাত রাখলাম, তার আগে পর্যন্ত তুই টেরই পেলি না? যে ভল্লাকে আমরা সবাই চিনি, সে ভল্লা তো তুই নোস। কী হয়েছে, ভল্লা?”ভল্লা একটু লজ্জাই পেল। মারুলা অত্যন্ত দক্ষ গুপ্তচর। ভল্লার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করছে। নিঃশব্দ চলাফেরায় মারুলা তার মতোই দক্ষ। কিন্তু তার এত কাছে এসে পড়া সত্ত্বেও ভল্লা টেরই পেল না, এটা আদৌ স্বস্তির বিষয় নয়। ভল্লা নিজেও চিন্তিত হল। বলল, “ঠিকই বলেছিস, মারু। আমার আরো সতর্ক থাকা উচিৎ ছিল”। মারুলা একটু হাল্কা সুরেই বলল, “ঠিক আছে...হয়তো আগুন জ্বলার শব্দ, জল ফোটার শব্দ, তার ওপর মাথায় চিন্তার জট পাকানোর শব্দ – কিছুটা আনমন হয়ে গিয়েছিলি। আচ্ছা, একটা কথা মনে পড়ে গেল, তুই কোনদিন জঙ্গলে হাতির কাছাকাছি গিয়েছিস?” ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “বেশ কয়েকবার। প্রাণ হাতে করে, চুপটি করে লুকিয়ে থেকেছি ঝোপের আড়ালে। তখনই শুনেছি হাতির পেটের শব্দ। সাত-আট হাত দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায় – বড়ো জালার মধ্যে জল ফোটার মতো, কিংবা তার থেকেও ভয়ংকর। সেই শব্দের কথাই বলছিস তো?”“আমাদের কিংবা আমাদের কর্তাদের মগজে যখন নানান কুবুদ্ধি খেলা করে বেড়ায় তখনও নিশ্চয়ই ওরকম আওয়াজ হয় – ভুটভাট, শোঁ শোঁ...”। ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “তুই কি আমাকে হাতির বাতকম্মো শোনাতে এসেছিস? কী ব্যাপার বল তো?”মারুলা একটু চাপা স্বরে বলল, “অনেক কথা আছে, পরে বলব, এখানে নয়, অন্য কোথাও। তোর এই ঘরে আমি জানি অনেক লোকের যাতায়াত...। ততক্ষণ একটু ফকড়েমি করি না। তুই আর শালা কোনদিন শুধরোবি না। চব্বিশ ঘন্টা পোঁদে আটা লাগিয়ে কাজ আর কাজ। তাও যদি মুতিকান্ত না হয়ে একটু রতিকান্ত হতে পারতিস...” বলে খিঁক খিঁক করে ফিচেল হাসতে লাগল। ভল্লাও হেসে ফেলল, বলল, “তুই শালা পারিসও বটে”। রতিকান্ত আর মুতিকান্ত রাজধানীর রক্ষী শিবিরে প্রচলিত অত্যন্ত চালু রসকথা – অবশ্যই আদিরসাত্মক। দীর্ঘদিন নারীসঙ্গবর্জিত রক্ষী শিবিরের একঘেয়ে জীবনে শব্দদুটি অত্যন্ত অর্থবহ। পুরুষের একটি বিশেষ প্রত্যঙ্গ দুটি কর্মে ব্যবহৃত হয়, প্রস্রাব কর্মে এবং রতিকর্মে। অধিকাংশ পুরুষ প্রাকৃতিক কারণেই দ্বিতীয় কর্মে সেই প্রত্যঙ্গের বহুল ব্যবহার কামনা করে। কিন্তু রক্ষীরা সে ভাগ্য করে আসেনি। রাজ্য-রাজধানীর সুরক্ষার জন্যে তাদের প্রায়ই মাঠে-ঘাটে, জঙ্গলে-পাহাড়ে, আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। অতএব তাদের পুরুষাঙ্গটি শুধুমাত্র যত্রতত্র প্রস্রাব করাতেই ব্যবহার হয়। অতএব তারা সকলেই মুতিকান্ত। কিন্তু রাজার শ্যালক রতিকান্ত সারারাত প্রস্রাবের থেকে রতিকর্মেই বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাই তিনি সার্থকনামা।কাঠের হাতা দিয়ে দু-তিনটে ভুট্টার দানা তুলে, ভল্লা টিপে টিপে দেখল, সেদ্ধ হয়েছে কিনা। হয়নি, আরেকটু হবে। দানাগুলো মালসার জলে ছেড়ে দিয়ে তাকাল মারুলার দিকে। আগুনের কমলা রঙে, মারুলার মুখটাও লালচে দেখাচ্ছে। ভল্লার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মারুলা এক চোখ টিপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভুট্টার দানা টিপেই টিপেই রাত কাটাবি, ভল্লা?”মারুলার ইশারাটা বুঝে ভল্লা মিচকে হাসল, বলল, “সে হিসেব তোকে দেব নাকি রে, মদনা? এমন ভাব করছিস, তুই যেন রোজ রাতে টিপতে পাস?”মারুলা নিরীহ মুখে বলল, “সে টেপাটেপি তো করতেই হয়, বন্ধু। সারাদিন হেঁটেহেঁটে পায়ে যা ব্যথা হয়, রেড়ির তেল নিয়ে পাদুটো টিপলে বেশ ভালই লাগে। তুই কোন টেপার কথা বলছিস, ভল্লা?” ভল্লা মুখ বেঁকিয়ে হাসল, বলল, “ন্যাকা, তুই শালা পা টেপার কথা বলছিলি, বুঝি?”মারুলা আকাশ থেকে পড়ল, বলল, “তুই কী ভেবেছিলি? এ রাম, ছি ছি, তোর মনটা শালা মাছির মতো, গুড়ের কলসি দেখলেই ভনভন করে জুটে যাস...”। ভল্লা এবার উনুন থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো বের করে হাসতে হাসতে মারুলার দিকে এগিয়ে নিয়ে বলল, “আজ তোকে ষাঁড়-দাগা করেই ছাড়বো, হতভাগা ধর্মের ষাঁড়”।দুহাত বাড়িয়ে আত্মরক্ষার ভঙ্গি করে মারুলা বলল, “তোর সঙ্গে দুটো রসের কথা বললাম বলে তুই ষাঁড় বললি? তোর সঙ্গে কাজের কথা ছাড়া আর কোন কথাই বলব না”। কপট অভিমানে মুখ গোমড়া করে বসে রইল মারুলা। ভল্লা জ্বলন্ত কাঠটা উনুনে গুঁজে দিতে মারুলা বলল, “তুই ছোটবেলায় পাঠশালে গেছিলি ভল্লা”? মারুলা কথাটা কোনদিকে নিয়ে যেতে চায় বুঝতে না পেরে, ভল্লা সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল মারুলার দিকে, বলল, “গিয়েছি বৈকি, বছর দুয়েক মতো”।মারুলা বলল, “দু-বছর? তাহলে তুই তো পণ্ডিত রে? আমি তো শালা ছমাসের মাথায় পণ্ডিতমশাইয়ের হাতে এমন গোবেড়েন খেয়েছিলাম, তারপর আর ওই মুখো হইনি”। “কেন?” “সে আর বলিস না। আচ্ছা, তুই বল, ভল্লা, ষণ্ড মানে ষাঁড়, ভণ্ড থেকে ভাঁড়, তাহলে গণ্ড থেকে যে গাল হবে আমি কী করে বুঝবো বল তো? পণ্ডিতমশাই শুধোলো – গণ্ড মানে কি? বললাম। আমার উত্তর শুনে পাঠশালের অন্য ছেলেরা হ্যা হ্যা করে এমন হাসলে – পণ্ডিতমশাই একেবারে জ্বলে উঠল। তারপর গাল দিয়ে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে করতে ছড়ি দিয়ে এমন পেটাল, বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়েছিল শালা...”।ভুট্টার মালসা নামিয়ে, ঘরের ভেতর থেকে দুটো মাটির সরা আনল ভল্লা। গরম ভুট্টাসেদ্ধ সমান দুভাগ করে ঢালল সরায়, তারপর মারুলার হাতে একটা সরা তুলে দিয়ে বলল, “কোথায় পেটাল, তোর গণ্ডে?”মারুলা খুবই বিষণ্ণ মুখে বলল, “তুই আর সেই ভল্লা নেই রে। আগে বন্ধুদের জন্যে তোর কত দরদ ছিল, আজ তুই আমার দুর্দশার কথায় ঠাট্টা করছিস?”। ভল্লা কিছু বলল না, ভুট্টা খেতে লাগল মন দিয়ে। মারুলা ঝোলে চুমুক দিয়ে বলল, “বেড়ে বানিয়েছিস তো শালা? দুদিন আগে জনাইয়ের চটিতে গমের রুটি আর এরকমই ভুট্টার ঝোল খেয়েছিলাম। অ্যাঃ সে শালা মুখে তোলা যায় না। আর তুই এখানে এই জঙ্গলে, হাতের কাছে মশলাপাতি কিছুই নেই, এমন ঝোল বানালি কী করে?” দুজনেরই খাওয়া সাঙ্গ হতে উনুনের আগুন নিভিয়ে দিয়ে ভল্লা ঝোপের মধ্যে লুকোনো দুজোড়া রণপা বের করল। একজোড়া মারুলাকে দিয়ে বলল, “এবার চল, কোথাও গিয়ে বসে কাজের কথাগুলো সেরে ফেলে যাক। কিন্তু তার আগে নোনাপুর গ্রামের সর্বশেষ পরিস্থিতি কেমন সেটা জানা দরকার। আজ সারাদিন নোনাপুর গ্রামের ছেলেরা কেউই আসেনি। তাদের আসা সম্ভবও নয়। তাই ভাবছি একবার নোনাপুর গ্রামে যাবো”। “পাগল হয়েছিস নাকি? এত রাত্রে কে তোর জন্যে বসে থাকবে?” ভল্লা হাসল, বলল, “আছেন, একজন আছেন, আমার কমলিমা। যে সংবাদ আমি জানতে চাইছি, তাঁর থেকে ভাল আর কেউ বলতে পারবে না”। “কমলিমা? মানে গ্রামপ্রধানের বউ? বোঝ, গ্রামপ্রধানের বুড়ি বউ তোকে কী খবর দেবে? তোকে দেখলে হয়তো খানিক কান্নাকাটি করে পাড়া মাথায় তুলবে”।“না রে, বুড়ি মোটেই আউপাতালে নয়, বেশ শক্ত মনের মানুষ। কমলিমার থেকে গ্রামের আজকের পরিস্থিতিতে জুজাক কী ভাবছে, কী বলছে, সেটা সহজেই জেনে যাব। সেই সঙ্গে, ভাগ্য ভাল হলে, আরেকজনার কথাও”। “আরেকজন কে?” “কবিরাজ”। “কবিরাজ! হ্যাঁ কবিরাজের কথা আস্থানেও শুনেছি। শুনেছি বুড়োটা খুব ধূর্ত”!ভল্লা বলল, “ধূর্ত বলিস না, বল বিচক্ষণ, দূরদর্শী। আমি যদি রাজরক্ষী না হয়ে, এই গ্রামের লোক হতাম, বুড়োকে বুকে করে রাখতাম। বুড়োর গায়ে এতটুকু আঁচড়ও লাগতে দিতাম না। কিন্তু কে জানে… হয়তো আমাদের কাজের স্বার্থে...। যাগ্‌গে শোন বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। তুই গাঁয়ের বাইরেই কোথাও আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে থাক। কমলিমায়ের সঙ্গে দেখা করে – আমি তোর কাছে আসছি...”। “তাই হোক” দুজনেই রণপায়ে চড়ে জঙ্গলের পথে রওনা হল নোনাপুর গ্রামের দিকে। ক্রমশ...
    ক্যালিডোস্কোপে দেখা – ভো-কাট্টা - অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ছবি: রমিত চট্টোপাধ্যায়কর্মসূত্রে নিজের বেছে নেওয়া নাগরিকত্বে আমি আমেরিকান। জন্মসূত্রে ছিলাম ভারতীয়। কিন্তু মর্মসূত্রে যে ভূখন্ড, যে সত্তা দূর শৈশব থেকে আমার চেতনায় জুড়ে গিয়েছিল, তার নাম বাংলাদেশ। আমার মা, বাবা, তাদের আগের বহু প্রজন্ম ধরে তারা সেই ভুমির বাসিন্দা ছিল, সেই সত্তার অংশীদার ছিল। আমার সেই অংশীদার হওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু মা-বাবা-ঠাকুমা আমাদের বড় করার সময়, তাদের চিন্তা-চেতনা-স্মৃতি দিয়ে আমাদের গড়ে তোলবার সময় একটু একট করে সেই দেশ নিয়ে, সেখানে যাপিত তাদের জীবন নিয়ে, তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা আর অনুভূতিগুলো আমাদের মধ্যে বুনে দিয়েছে। কনিষ্ঠতম ভাই তাদের খ্যাতনামা নাটকের দলের সাথে গিয়ে প্রিয় স্মৃতি বুকে করে ঘুরে আসে সেই দেশ থেকে, মেজভাই তার সুগায়িকা স্ত্রীর গানের অনুষ্ঠান উপলক্ষে বেড়িয়ে আসে সেই স্বপ্নের দেশ থেকে, বাংলাদেশ থেকে।আমার কখনও সেখানে যাওয়া হয়নি, আর হবে বলে ভাবিও না। এক সময় সেই দেশেরই কিছু স্বপ্ন দেখা মানুষের যত্নে-ভালোবাসায়-পরিশ্রমে গড়া অনলাইন সাহিত্য মঞ্চ সচলায়তন আমায় এই ক্যালিডোস্কোপ নিয়ে দেখার লেখা লিখতে জায়গা করে দিয়েছিল। প্রিয় সেই দেশ মাথা উঁচু করে এগিয়ে চললে আমিও এগোই, সেই দেশ বিপন্ন হলে আমার যন্ত্রণা হয়; স্বজন রক্তাক্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। আমি অত্যন্ত তুচ্ছ একটি অস্তিত্ব, বাস্তবের নিরিখে এতই বিচ্ছিন্ন, এমনকি নিজের কাছেও দাবি করতে পারি না যে সে দেশের বেদনাকে তার সামগ্রিক কার্য-কারণে বুঝে উঠতে পারি। আতঙ্কিত হই, আবার বুঝি সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। লেখার সূত্রেই পরিচিত বন্ধুরা, যারা জানেন শোনেন, বোঝেন, খবর রাখেন তারা মর্মাহত, চূড়ান্ত উদ্বিগ্ন। এমনও পড়ছি, শুনছি, কেউ কেউ লিখছেন, বলছেন লণ্ডভণ্ড অনেক দিনই হয়ে চলেছে, এখন আর চাপা থাকছে না, থাকবে না। হবেও বা। কত জন যে আবার এই দুর্যোগেকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে নেবে দেশের ভালোর অছিলায় কে জানে! কত মানুষের প্রাণের, অস্তিত্বের বিনিময়ে পাওয়া দেশ, কত স্বপ্ন তার প্রজন্মের পর প্রজন্মে … এই সংকট সে কাটিয়ে উঠবে, উঠবেই। কতটা মূল্যে - জানা নেই। বাবা ভালবাসত গুছিয়ে কথা বলতে। যেভাবে যত্ন করে জামা কাপড় ইস্ত্রী করে সাজিয়ে রাখত, কথাও বলত তেমনি করে। পদ্মাপারের বাচনরীতি প্রবলভাবেই হাজির থাকত তার কথায়। বাড়িতে টেপ-রেকর্ডার ঢোকার পর নিজের অজান্তে ফিতে-বন্দী হয়ে যাওয়া ‘বাঙাল ভাষায়’ বলা নিজেরই কথা শুনে আমাদের প্রশ্ন করেছিল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন নুতন রেকর্ড কিনেছি কিনা আমরা। তার কথায় চলিত শব্দের পাশাপাশি সাধুভাষার শব্দরাও থাকত অনেকই। বড় হয়েছিল সাধুভাষায় লেখা বই পড়ে। হ’তে পারে সে কারণেই। বেশী কথা বলত না বাবা। কিন্তু তার সাধ্যমত আমার মাথায় বিভিন্ন সময় ভরে দিয়েছিল নানা গল্প, ইতিহাস, চিন্তা, দর্শন, জীবনের অভিজ্ঞতা। নিজের আত্ম-পরিজন-বন্ধুদের কথা খুব একটা বলত না। শৈশবে পিতৃহারা মানুষটির মনে হয়ত কোন অভিমান কাজ করত। কিংবা অন্য কোন গভীরতর কারণ ছিল কি? পদবী ইত্যাদির কথায় জেনেছিলাম আমরা অনেক প্রজন্ম আগে ছিলাম মুখোপাধ্যায়, এপার বাংলার কোথাও, সম্ভবত বর্ধমান থেকে গিয়ে এক পূর্বপুরুষ হাজির হয়েছিলেন পদ্মাপাড়ের দেশে - ঢাকা, পানাম, সোনার গাঁ। উপাধি পেয়েছিলেন রাজচক্রবর্ত্তী, পরে কেঁটেছঁটে চক্রবর্ত্তী। শৈশবে প্রশ্ন জাগেনি মনে, আজ ভাবি, কি সে কাজ করেছিলেন সেই বহু আগের সময়ের মানুষটি যাতে তিনি রাজচক্রবর্ত্তী উপাধি পান? কবে পেয়েছিলেন, ইংরেজ আমলে? তা হলে নিশ্চয়ই তাদের খুশী করে পেয়েছিলেন, ভালো কোন কাজ কি আদৌ? সন্দেহ হয়। শুনেছি তাদের কাপড়ের বাণিজ্য ছিল। ওনারা কি তবে ওখানে গিয়ে রাজশক্তির সাহায্যে স্থানীয় মানুষদের থেকে তাদের ব্যাবসা ছিনিয়ে নিয়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে গিয়েছিলেন? জানি না। শুধু এইটুকু জানি, বাবা এদের কথা বলতে কখনও কোন আগ্রহ দেখায়নি, আর জানি, ঠাকুর্দা এই ব্যবসায় যোগ দেননি। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পেশা নিয়ে, স্বর্ণকার হয়ে রাজস্থানের বিকানেরে গিয়ে জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। টাকা-পয়সা জমলে বাড়ি এসে ঘুরে যেতেন। আর বাবা বিনা কপর্দকে ভিটেমাটি ছেড়ে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে গিয়েছিল, ফিরে আসে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে। বিশ্বাস করত বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সে পথে হাঁটা হয়ে ওঠেনি তার, লক্ষ্মীলাভও ঘটেনি। বলাই বাহুল্য, বাণিজ্য করতে পারার মত মানুষ সে ছিল না; চড়াই-উতরাই সামলে চাকরি করেই কেটে গেছে পুরো জীবন। তবে উপরের দিকে চাকরির সুবাদে কুচবিহারের তিনটি বছরেই আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সবচেয়ে ভাল জায়গায় ছিল। ঐ তিনটি বছরে আমি চারপাশের জগৎকে চোখ মেলে দেখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু যথেষ্ট মনোযোগের সাথে খেয়াল করে, নজর করে সেই দেখার কাজটি করা হয়নি। আর সময়ও হয়ত যথেষ্ট ছিল না। ফলে এমন পরিমাণ বা গুণমানের রসদ আমার সংগ্রহে আসেনি যা দিয়ে ঐ সময়ের বা ঐ ভূখন্ডের মানুষদের জীবন যাপন নিয়ে কোন উল্লেখ করার মত কিছু সৃষ্টি করতে পারি। তিন আয়নার ঘুর্নিকলে দেখা আমার এ স্মৃতিচারণ তাই নিজেকে ফিরে দেখার বেশি কিছু নয়।কুচবিহারে গিয়ে অবধি আমার দীর্ঘকালীন অনুভূতি ছিল বিষণ্ণতার, অনেক বন্ধুর ভালোবাসায় ভরে থাকা শহরজীবনের কলকল্লোলে মুখরিত দিনগুলোকে হারিয়ে ফেলার। হয়ত সেই কারণেই নিজের অসম্ভব ব্যস্ততা সত্ত্বেও বাবা চেষ্টা করত যতটা পারা যায় তার সঙ্গ দিয়ে আমাদের ঘিরে রাখার। বড় হয়ে বুঝেছি, বাবাকে এই নিবিড় করে পাওয়া – কখনো আমায় লেখাপড়া শেখানোয়, কখনো গল্প বলায়, খেলায় খেলায়, প্রাত্যহিকের বা ছুটির দিনের সময় কাটানোর আলাপচারিতায়, কখনো বা তার নিজের জীবন যাপনের ধারায়, আমার গড়ে ওঠায় গভীর প্রভাব রেখে গেছিল।বাবার বেশ বড় একটি সাইকেল ছিল। তার অনেক বছরের সহযাত্রী। বদলির চাকরির সব কটি কর্মস্থলে সে এটিকে সাথে নিয়ে ঘুরেছে। বাজারে যাওয়া হোক কি অফিসে - ঐটি তার চলাচলের নিত্য সঙ্গী। কখনো কখনো সামনের রডে বা পিছনের ক্যারিয়ারে আমরা, ভাইরাও সওয়ার হয়ে যেতাম। ওই সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসেই কুচবিহারের এয়ারপোর্টে আমার প্রথম এরোপ্লেন দেখতে যাওয়া, রানওয়ের উপর, সামনে থেকে। প্লেন দেখায় মগ্ন আমি খেয়াল করিনি লোকজনেরা কোথায় কি করছে। হঠাৎ দেখলাম বোঁ বোঁ করে প্রপেলার চালু হয়ে গেছে আর হাওয়ার দাপটে পিছু হটতে গিয়ে আমি প্রায় শূণ্যে উড়ে যাওয়ার মত করে ছিটকে পড়েছি। তবে সেদিন আরো দুর্ভোগ এসে জড়ো হয়েছিল। ফিরতি পথে হঠাৎ বিকট আওয়াজ করে সাইকেল থেমে গেল। পিছনের ক্যারিয়ারে বসা আমার ডান পায়ের গোড়ালি চাকার স্পোকের ফাঁকে ঢুকে গিয়ে স্পোকের সজ্জা এবং আমার গোড়ালি দুইই বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। হাসপাতাল হয়ে বাড়ি ফেরা, মোটা চামড়ার বুট জুতো পড়া থাকায় গোড়ালির হাড় ভাঙ্গেনি, তবে প্রবল ভাবে মচকে গিয়েছিল, ভুগতে হয়েছিল অনেক দিন।এই সাইকেলটিকে বাবা কিছুদিন পর পর একটি একটি করে বড়-ছোট সমস্ত অংশ খুলে খুলে বারান্দায় সাজিয়ে ফেলত। তারপর চাকার কেন্দ্রে থাকা চাকতির মধ্যে সাজানো বলবিয়ারিং ব্যবস্থার থেকে ইস্পাতের নিখুঁত নিটোল গোল দানাগুলো বের করে এনে, ধুয়ে মুছে শুকিয়ে, কোনটা খারাপ হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে বদলে দিয়ে, আবার তাদের ঐ চাকতির কৌটোয় খাঁজে খাঁজে বসিয়ে গ্রিজ লাগিয়ে, কৌটোর ঢাকনা আটকে, চাকতিটাকে একটার পর একটা স্পোক লাগিয়ে চাকার বড় বেড়টায় জুড়ে চাকার ধাতুর কাঠামোটাকে তার নিজের চেহারায় ফিরিয়ে আনত। একে একে পুরো সাইকেলটাই আবার যেন এক অলৌকিক দক্ষতায় তার পূর্ণতা ফিরে পেত। এক পর্যায়ে পাতলা রাবারের টিউব ভরা মোটা শক্ত রাবারের টায়ার ঐ চাকার বেড়ে জুড়ে দিয়ে রাবার টিউবে হাত-পাম্প চালিয়ে হাওয়া ভরে নেওয়া, বাবার হাতের পেশীগুলো ফুলে উঠত। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। কয়েক দশক পার করে বাবা যখন একদিন খুলে ফেলা এক কাঠের আলনাকে ফিরে জোড়া লাগাতে গিয়ে আমার হাতে যন্ত্র তুলে দিয়ে নীচু গলায় বলেছিল, আমার হাতে আর তেমন জোর পাই না, নিজের হাতের জোরের স্বীকৃতির আনন্দ চাপা মন খারাপে মিইয়ে গিয়েছিল। উত্তরবঙ্গে যাওয়ার আগে আমরা যখন দমদম ক্যান্টনমেন্টে থাকতাম, মাঝে মাঝেই একটি লোকের দেখা মিলত। সে সাইকেলের মত দেখতে একটি প্যাডেল আর চাকাওয়ালা যন্ত্র ঘাড়ে করে ঘুরে বেড়াত। আমাদের বাসার সামনে এসে রাস্তার ধারে সেই যন্ত্র নামিয়ে তাতে চড়ে বসত। ইতিমধ্যে আশেপাশের বিভিন্ন বাসা থেকে মেয়ে-বৌরা, কাজের বাচ্চারা ছুরি, কাঁচি, দা, বটি নিয়ে এসে ঘিরে দাঁড়াত। তারা সব তার কাজের খরিদ্দার। হাতের অস্ত্র শান দিতে নিয়ে এসেছে। লোকটি তাদের কারো কাছ থেকে একটি কাটাকাটির যন্ত্র হাতে নেয়। তার চড়ে বসা যন্ত্রে পায়ের চাপে প্যাডেল ঘুরছে। প্যাডেল লাগানো, স্পোক-ওয়ালা বড় চাকাটাও তাই ঘুরছে। সেই সাথে ঘুরে চলেছে, ঐ বড় চাকার সাথে বেল্ট দিয়ে আটকানো একটা তুলনায় ছোট কিন্তু নিরেট চাকা, শানপাথর বলে বুঝি তাকে। লোকটি তার হাতের ছুরি কিংবা কাঁচির ফলার ধার ঐ ঘুরতে থাকা শানপাথরের গায়ে চেপে ধরে। প্রবল ঘষার ফলে আগুনের ফুলকি তারাবাজির মত ছিটকে বের হতে থাকে, পোড়ার গল্ধ ভেসে আসে। এক সময় লোকটি হাতের অস্ত্রটি তুলে নেয়, চোখের সামনে এনে দেখে, সাবধানে তার গায়ে হাত বোলায়, কখনো সেটাকে আবারো চেপে ধরে ঘূর্ণায়মান পাথরের গায়, অথবা তুলে দেয় তাদের যারা নিয়ে এসেছে তাদের হাতে। কাজের দাম নিয়ে কোমরের থলেতে রেখে দেয়। কুচবিহারের জীবনে এদের দেখা মেলেনি। শান দেওয়ার কাজ বাবা নিজেই করত। নাঃ, ঐ রকম কোন শান দেওয়ার চাকা ছিল না। সেই কাজ সারা হত লাল ইঁটের টুকরোয় ঘষে ঘষে। কোন কোন দিন আবার ঐ ইঁটের টুকরো দিয়ে ভারী লোহার ইস্তিরিটার চকচকে পিঠটাও আরো ঘষে ঘষে আয়নার মত মসৃণ করে তুলত। ঘষার কাজে আরো একটি বস্তুর ব্যবহার হত - একটি ঝামা পাথরের টুকরো। পায়ের গোড়ালি মসৃণ করার কাজে লাগত তা। আমাদের সেই ছোটবেলায় তেল কিনে আনা হত টিনের কৌটোয়। শক্তপোক্ত কৌটো। নতুন কিনে আনা কৌটোর পাটা দিক দুটোর যেটা কৌটোর গায়ের ছবির উপরের দিকে, সেইটিতে বাঁকের কানা ঘেঁষে মোটা পেরেক ঠুকে একটা ফুটো করা হত বা একটা মোটা ছুরি ধরে সেটাকে ঠুকে একটু চিরে দেওয়া হত। আর এরপর ঐ পাটা দিকটাতেই যতটা সম্ভব দূরে কানা ঘেঁষে একটা তুলনায় ছোট ফুটো করে দেওয়া হত। কৌটো কাত করে বড় ফুটো দিয়ে তেল ঢালার সময় কৌটোয় হাওয়া ঢুকত ঐ দ্বিতীয় ফুটোটা দিয়ে। পরে একসময় এই বিদ্যে কাজে লেগেছিল ওল্টানো জলভরা পাত্র থেকে ইচ্ছে মত জল পড়তে দেওয়া বা না-দেওয়ার যাদু দেখানোর সময়। সে অবশ্য অন্য ছবির গল্প। কৌটোগুলো তেল ফুরিয়ে খালি হয়ে যাওয়ার পর তাদের কোন কোনটাকে ফেলে না দিয়ে অন্য কাজে লাগানো হত, যেমন চৌবাচ্চা কি বালতি থেকে জল তোলবার মগ বানানো বা যন্ত্রপাতি রাখার কৌটো বানানো। ফুটোওয়ালা পাটা দিকটা কানা ঘেঁষে মোটা ছুরি ধরে ঠুকে ঠুকে কেটে কেটে গোল বেড়টা থেকে আলাদা করে ফেলা হত। এই কাটা কাটা ধারওয়ালা চাকতিটা সাবধানে না ধরলে একটুতেই হাত কেটে যেতে পারত। বাবা নিজে হাতে বাড়ির পিছন দিকে এক কোণায় আবর্জনা ফেলার জায়গায় এই চাকতিটাকে সাবধানে ফেলে দিয়ে আসত। এরপর 'পিটানি' দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে খোলা কৌটোর কাটা ধারটা কৌটোর বেড়ের ভিতরের গায়ে মিশিয়ে দিয়ে চমৎকার একটা কৌটো বানিয়ে ফেলত।এই রকমই একটা বড় আর একটা ছোট মাপের কৌটোয় বাবা তার সমস্ত যন্ত্রপাতিগুলো রাখত। এই যন্ত্রপাতিগুলোর মধ্যে বাবার নিয়মিত ব্যবহারের তিনটি বস্তু ছিল একেবারে তার নিজের কায়দার। প্রথমটি পেটাপেটি করার – নাঃ হাতুড়ি নয়, অনেক অতীতে যোগাড় করে আনা, বাইসাইকেলের প্যাডেলের একটি ডাণ্ডা। বাবা সেটাকে ‘পিটানি’ বলত। আমি অনেক বয়স হওয়ার আগে পর্যন্ত জানতাম না যে এই কাজের জন্য হাতুড়ি নামের অন্য একটি বস্তু আছে। জানার পরেও ‘পিটানি’ থেকে হাতুড়িতে অভ্যস্ত হতে সময় লেগেছিল আমার। আর দ্বিতীয়টি ছিল বাবার নিজের হাতে বানানো একটি কাগজ কাটার বা পেন্সিল চাঁছার ছুরি। আধা ইঞ্চি চওড়া আর আট ইঞ্চি মত লম্বা একটি লোহার পাত, তার গোলাকৃতি দুই প্রান্তের একদিকের সিকি ইঞ্চি মত ভিতরে একটি ফুটো আর বিপরীত প্রান্তের মাথা থেকে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত একটা পাশকে একটু আগে বলা ইঁটের টুকরোর গায়ে ঘষে ঘষে ধারালো করে তোলা হয়েছে। এই ছুরিটার মত আরো কয়েকটি পাত ছিল বাবার সংগ্রহে, সম্ভবত কোন যন্ত্রের বাতিল টুকরো তারা, একদিন তাদের একটিকে শান দিয়ে আমার প্রথম ছুরিটি বানিয়ে নিয়েছিলাম। তৃতীয়টি আগেই উল্লেখ করা মোটা ছুরিটি। আকারে আরেকটু বড় আর অনেক মোটা। কামারশালা থেকে বানিয়ে আনা। দরকারমত শান দিয়ে দিয়ে বাবা এটাকে ভোঁতা হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখত। তুলনায় মোটা দাগের কাটাকাটির কাজে যেমন, কাঠের টুকরো কি টিনের কৌটো কেটে ফেলতে, এর ব্যবহার হত।আমাদের স্কুল থাকত সোম থেকে শুক্রবার এগারটা থেকে সম্ভবত চারটা পর্যন্ত। আর শনিবারে একটা নাগাদ ছুটি হয়ে যেত। ফলে এই ছয় দিন রোজ সকালে আর সন্ধ্যায় বাড়িতে নিয়মিত পড়তে বসতে হত। স্কুলের পড়ার যে অংশটা বাড়ির কাজ হিসেবে দেওয়া থাকত সেটা ঐ সময়ে সেরে ফেলার চল ছিল। শনিবারের সন্ধ্যায় সেরে রাখবার কাজ রবিবারে গড়িয়ে না গেলে রবিবার স্কুলের পড়া তৈরি করার থেকে ছুটি। এক রবিবার সকালে বাবা ঘরের কোথা থেকে একটা ঘুড়ি ওড়ানোর লাটাই আর এক বান্ডিল নানা রঙের কাগজ নিয়ে চওড়া ভিতর-বারান্দায় পিঁড়ির উপর গুছিয়ে বসল। আমাদেরও ডেকে নিল। কাগজের পাশে দেড় হাত মত লম্বা বাঁশের টুকরো।- কি বানাবে তুমি? ঘুড়ি?- দেখতেই পাবি। যা, ওই দাওটা নিয়া আয়। এই সব দা-কাঁচি-ছুরি-পিটানি-স্ক্রু ড্রাইভার-ছেনি-বাটালি-তুরপুন-ওলন দড়ি ইত্যাদি রাখার দুটি কৌটোর সাথে আরো কয়েকটি অবশ্য প্রয়োজনীয় বস্তু ছিল বাবার যন্ত্রপাতি রাখার জায়গায় – নানা মাপের কয়েকটি কাঠের টুকরো। বাবা বারান্দায় বসে একধাপ নিচের সিঁড়িটায় একটা যুৎসই উচ্চতার কাঠের টুকরো রেখে তার উপর বাঁশের টুকরোটা দাঁড় করিয়ে দা দিয়ে সেটাকে লম্বালম্বি কয়েকটা টুকরোয় চিরে ফেলল। তারপর তাদের একটার গা থেকে দা দিয়ে কয়েকটা ছিলকা বার করে নিয়ে ছুরি দিয়ে সেগুলোকে চেঁছে চেঁছে কয়েকটা মসৃণ এবং নমনীয় কাঠি বানিয়ে নিল। এরপর রঙিন কাগজের বান্ডিল থেকে একটা কাগজকে টেনে নিয়ে সেটাকে ভাঁজ করে, ভাঁজ বরাবর ছুরি টেনে তার থেকে একটা বর্গাকার টুকরো বার করে আনল। এরপর ঐ কাঠিগুলোর একটাকে সেই কাগজের টুকরোটার উপর রেখে কাঠির গোড়া যদি এক নম্বর কোণায় রাখা হয়েছে ধরি, তবে অন্য প্রান্তকে তিন নম্বর কোণার দিক করে বসিয়ে কোণা ছাড়িয়ে দুই কি তিন ইঞ্চি দূরে ছুরি দিয়ে কাঠির গায়ে দাগ কেটে তারপর দাগ বরাবর দু’ টুকরো করে, দাগের প্রান্ত আর গোড়ার প্রান্তকে একটা সুতো দিয়ে আলগা করে বেঁধে একটা ধনুক বানিয়ে ফেলল। সুতোটা তখনো ঢিলা রেখে ধনুকটাকে এবার চৌকো কাগজের উপর বসিয়ে ঠিকমত আকারে এনে সুতোর সেই ছিলা টাইট করে বেঁধে ফেলা হল। ধনুকের দুই মাথা কাগজের এক আর তিন নম্বর কোণা ছুঁয়ে আছে। আমরা ভিতরে ভিতরে উত্তেজনায় ছটফট করলেও শান্তভাবে বসে দেখে যাচ্ছি।মা ইতিমধ্যে বাটিতে ময়দা জ্বাল দিয়ে আঠা বানিয়ে এনে রেখে গিয়েছে। আর দিয়ে গেছে সুতোর কাটিম।ধনুকটাকে কোনাকুনি করে রাখা বর্গাকার কাগজের উপরের অর্ধে ররাকাহ হল। তারপর ছোট ছোট কয়েকটা কাগজের টুকরোয় আঠা মাখিয়ে তাই দিয়ে ধনুকের কাঠিটাকে কাগজের গায় সেঁটে দেওয়া হল। এবার তীরের জায়গায় আরেকটা কাঠি ধনুকের তলা দিয়ে বসিয়ে আঠাওয়ালা ছোট ছোট কাগজের টুকরো দিয়ে আটকে দেওয়া হল। এই কাঠির মাথা উপরে দুই নম্বর কোণা পর্যন্ত আর নীচে চার নম্বর কোণা ছাড়িয়ে একটু বেরিয়ে আছে। এরপর একটা খুব ছোট চৌকো কাগজ ভাঁজ করে মাছের লেজের মত ছোট তিন কোণা লেজ বানিয়ে ঘুড়ির নিচের দিকে আঠা দিয়ে আটকে দেয়া হল। লেজের ছুঁচলো দিকটা উপরমুখী আর তার উল্টোদিকটা তীরের কাঠির নীচের দিকটাকে পকেটের মত করে পেটের ভিতর নিয়ে রেখেছে। এবার এই তিনকোণা লেজের শেষে জুড়ে দেয়া হল লম্বা ফিতের মত লেজ। ঠিক যেমন ছবির বইয়ে দেখা ঘুড়ি!এবার ঘুড়িকে ওড়ানোর কল বাঁধা। বাঁকানো কাঠিকে সোজা কাঠি যেখানে ছুঁয়েছে সেখানে কাগজে কাঠিদের দুপাশে কোণাকুণি দুটো ফুটো করে ঐ দুই ফুটোর মাঝের কাগজ আর দুই কাঠিকে একসাথে নিয়ে একটা সুতোর প্রান্ত দিয়ে বাঁধা হল। সুতোর টুকরোটার অন্য প্রান্ত বাঁধা হল ঘুড়ির নিচের প্রান্ত থেকে কিছুটা উপরে সোজা কাঠির দু পাশে, প্রায় গায়ে গায়ে, কাগজে দুটো ফুটো করে সেই ফুটো দিয়ে সুতো ঘুরিয়ে এনে। এবার সুতোটাকে ইংরেজি ভি অক্ষরের মত করে ধরে ভি-র গোড়ায় একটা ফাঁস রেখে গিট্টু পাকিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর কল বানিয়ে ফেলা হল। কলের প্রান্ত ধরে হাওয়ায় টান দিয়ে দেখে নেওয়া হল দুদিকের ভারসাম্য রেখে সে ঠিকমত উড়তে পারছে কিনা। বাবার বানানো ঘুড়ি সব সময় ঠিক মত উড়ত। পরবর্তিতে আমার বানানো ঘুড়ি অনেক সময় একদিকে কেৎরে যেতে চাইত। তখন অন্যদিকে কান্নিক গুঁজে মানে ছোট কাগজের টুকরো আটকে ওজনের ভারসাম্য আনা হত। এখন যেমন সার্ভিসিং-এর দোকানে নিয়ে গিয়ে গাড়ির চাকা ব্যালান্স করানো হয়।এইবার লাটাইয়ে আচ্ছা করে সুতো পাকিয়ে সুতোর খোলা মাথাটা ঘুড়ির কলের ফাঁসের সাথে বেঁধে দেওয়া হল। ঘুড়ি এখন ওড়বার জন্য প্রস্তুত। আমাদের তিন ভাইয়ের জন্য সেদিন সেই মুহুর্তটা যে কি উত্তেজনার ছিল, এখনো ভাবলে রোমাঞ্চকর লাগে।ঘুড়ি বানানো শিখে নিতে সময় লাগেনি। কিন্তু কোনদিনই ঘুড়ি ওড়াতে পারিনি। ভাইয়েরা পারত। কেউ উড়িয়ে দিলে সেটা কিছুটা সময় আকাশে উড়িয়ে রাখার কাজটা মাঝে মাঝে পেরেছি। এইটা আমার সারা জীবনের কাজকম্মের রূপক হিসেবেও সত্যি বলা চলে।ঘুড়ি ওড়ানোর দিনগুলোয় প্রবল উত্তেজনার ছিল ঘুড়ির লড়াইয়ে সুতো ছিঁড়ে ভো-কাট্টা হয়ে যাওয়া ঘুড়ি ধরে নিজের দখলে নিয়ে আসা। কনিষ্ঠতম ভাইটি এই ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করতে চলেছিল। আর সেই করতে গিয়েই একদিন রক্তারক্তি হয়ে গেল।তিন পিঠোপিঠি ভাইয়ের সবচেয়ে ছোট হওয়া নিশ্চয়ই বেশ চাপের আর সেই কারণেই ছোটবেলায় তার মেজাজ বেশ চড়া তারে বাঁধা থাকত এবং তার মতিগতি বোঝা বাড়ির বাকিদের পক্ষে কঠিন ছিল। বড়দের জারি করা সতর্কতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোটা সম্ভবত নিজের অস্তিত্বের আবশ্যিক এবং প্রাথমিক শর্ত হিসেবে সে গণ্য করত। ভো-কাট্টা হয়ে হাওয়ায় ভাসতে থাকা ঘুড়ি ধরবার জন্য ছুটে চলবার সময় আর কোনদিকে হুঁশ না থাকায় হোঁচট লেগে উল্টে পড়ার বড় রকম সম্ভাবনা থাকে। ফলে ঐ কাজটায় বারণ ছিল। যত বারণ তত উৎসাহ। এক রবিবারের সকালে স্নানের প্রস্তুতিতে বাবা বাড়ির ভিতরের উঠানে আমাদের তিন ভাইকে সারা গায়ে তেল মাখিয়ে দিচ্ছে। ছোট জনের আগে হয়ে গেছে, সে ভিতরের উঠান আর বাইরের উঠানের মাঝের দরজা খুলে বাড়ির সামনের দিকে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে কোথাও অদৃশ্য হয়েছে। হঠাৎ অনেক বাচ্চার আওয়াজ, আর পাড়ার বড়দের কেউ ছোট ভাইকে পাঁজা কোলা করে খোলা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে এল, আরেকজন বড় কেউ তার ডান হাতের একটা আঙ্গুল চেপে ধরে আছে, গলগল করে সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। বিবরণ যা পাওয়া গেল, ভাই একটা নীচু হয়ে ভাসা ঘুড়ি ভো-কাট্টা হয়েছে ভেবে তার সুতো ধরে নিয়েছিল; সুতো ধরে টান দিতে সেই মাঞ্জা দেওয়া সুতো আঙ্গুল কেটে বসে যায়। আমাদের বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার বন্দোবস্ত গুছিয়ে রাখা থাকত। তখনো ব্যান্ড-এইডের যুগ আসেনি। ডেটল, মারকিউরোক্রোম, আর গজ-ব্যান্ডেজ-অ্যাাডহেসিভ টেপ। আর শীতকালে বাড়িতে হওয়া গাঁদা ফুলের পাতা থেতো করে পাওয়া প্রাকৃতিক অ্যাান্টিসেপ্টিক। এই সব দিয়ে কাজ সামলাতে না পারলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সেলাই। অল্পের জন্য তার আঙ্গুলের ক্ষত হাড় পর্যন্ত পৌঁছায়নি। আর বাবার করা ব্যান্ডেজে একসময় রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালেও নিতে হয়নি। আমাদের পরিবারে সেই সকালের গল্প বহুদিন পর্যন্ত করা হত। সেই দিনগুলোতে কাটা-ছড়ায় ডেটল, বোরোলীন, মারকিউরোক্রোম আর পোড়া-ছ্যাঁকায় বার্নল লাগানো, গলা ব্যথা কি মুখের ভিতরের ফুস্কুড়ির চিকিৎসায় পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বা আয়োডিন দিয়ে গার্গল আর কুলকুচি করা, হাত-পা মচকানোয় গরম চুন-হলুদের প্রলেপ দেওয়া, কাশিতে বাসক পাতার রস খাওয়া আর চামচে করে একটু একটু করে চেটে চেটে জেফ্রল সিরাপ … আর চ্যবনপ্রাশ … একটু বড় হয়ে শরীর ভালো করার জন্য কিংবা খেতে পারি তাই খাব, হরলিক্স, ভিভা, বর্নভিটা … মাঝে মাঝে তরল ভিটামিন বি কমপ্লেক্স … হজমের গোলমালে অ্যাকোয়া টাইকোয়াটিস … কোন কোন বাড়িতে ভীষণ দুর্বল শরীরে শক্তি ফিরিয়ে আনতে গরম দুধে কয়েক ফোঁটা ব্র্যান্ডি, এমনকি কৈশোরেও … আর কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, ছোটোরা লুকিয়ে অমৃতজ্ঞানে, দ্রাক্ষারিষ্ট আর মৃত সঞ্জীবনী … জীবন গিয়েছে চলে আমাদের তিন কুড়ি বছরের পার … ছবির পর ছবি, আসে, মিলিয়ে যায়। পর্বে পর্বে গোছাতে গিয়ে কিভাবে শুরু করি, কোথায় থামি, খেই হারায়। আজ বরং ঘুড়িতেই ভো-কাট্টা হই। প্রায় দেড় দশক আগে ফ্লিকারে ফটো পোস্ট করা, তাতে মন্তব্য করা রোজকার জীবন যাপনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। ফটোগ্রাফার বন্ধুদের পোস্ট করা ছবি মনের গহীনে জমা থাকা ছবিদের তুলে আনত; এক ছবি থেকে অনেক ছবির স্মৃতি, কিংবা নিছকই কল্প-কাহিনি। এক সময় সেই পর্ব থেকে সরে আসতে চেয়ে ফটোস্ট্রীমে শেষ ছবি পোস্ট করে দেওয়ার পর বন্ধু ফটোগ্রাফার অমর আচার্য্য, ‘মনে পড়ে’ এই শিরোনামে একটি ছবি আমায় উপহার দিয়ে পোস্ট করে। ছবিতে দেখা যায় নারকেল গাছের মাথায়, পাতার সারির ফাঁক, আটকে থাকা একটি ঘুড়ি। ভালোবাসার, ভালো লাগার পোস্ট। কিন্তু পোস্টের ছবিটি সেখানেই না থেমে আমায় অন্য এক চিত্রকল্পের দিকে নিয়ে যায়। আমি লিখি - কাটা ঘুড়িএসে গেছেন?ঠিক আছে।একটু জিরিয়ে নিন তা হলে।আমার আর কি, লটকেই তো গেছি।এখানেই আছি,যদ্দিন না ছিঁড়ে ফর্দা-ফাই।ভাবছেন, তাও কেন বক্‌বক্‌!হাওয়া দ্যায় যে!জানেন, এখনো বুকের মধ্যেশিরশির করে।সেই যখন উড়তামতার হাতে, তার মনের সাথে –মনে পড়ে।উল্লাস – আমার ডাইনে হাওয়াবাঁয়ে হাওয়া, উপরে, নীচে –যেমন সে চালায়,টেনে রাখলে টানটান,ঢিলে দিলে ঢিলে।জানি, যে কোন মুহুর্তেঘটে যেতে পারে অঘটনছোঁ মেরে নেমে আসতে পারেকারো অহংকারছিঁড়ে-খুঁড়ে আমায়শেষ করে দেবে বলে।শুধু আমি উড়ছি বলে,শোভন-সুন্দর-দীপ্ত!এমন কি আমার প্রাণ যার হাতে,সেও মেতে যেতে পারেমরণ খেলায় – আমার!আমার বুক কাঁপত,কিন্তু উড়াল ছাড়িনি –শন্‌-শন্‌, শন্‌-শন্‌!প্রেম করেছেন কখনো?ভো-কাট্টা হয়েছেন?ভো-কাট্টা?কি দেখছেন আমার দিকে?ছবি নেবেন?ছোটবেলার – আপনার?মনে পড়ে যায়?ঠিক আছে, এবার আসুন তা হলে।জল আসছে, বাড়ি যান।সাবধানে যাবেন।আমি ভিজি,গলে যাই …একসময় ক্যালিডোস্কোপ ঘোরাতাম একটা সুপ্ত ইচ্ছা নিয়ে – কোনদিন দুই মলাটে দেখা যাবে ভেসে ওঠা ছবিদের। তারপর সময় শিখিয়েছে, সেই ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়ার কোন কারণ নেই। ভো-কাট্টা হওয়ার আগে বরং আরো কয়েকবার ঘুরিয়ে নেওয়া যাক তাকে – লেখার কারণেই পাওয়া সেই সব বন্ধুদের ভালোবাসার ডাকে সাড়া দিয়ে, এই লেখা থামিয়ে দিলে যারা জানতে চায়, কি হল, পরের পর্ব এল না কেন এখনও … ক্রমশ...
    চেকিয়া এক - হীরেন সিংহরায় | ফ্রাঙ্কফুর্ট ভালড স্টাডিয়ন৫ মার্চ ১৯৮০ফ্রাঙ্কফুর্ট ভালড স্টাডিয়নে এক সন্ধ্যামাঠে তিল ধারণের স্থান হয়তো আছে মনুষ্য ধারণের জন্য নেই। আইনত্রাখত ফ্রাঙ্কফুর্ট বনাম জব্রোইয়ভকা ব্রনোর ইউ ই এফ এ কাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা। সহকর্মী শ্রীধরকে তার চিরাচরিত নিয়মনিষ্ঠা থেকে বিচ্যুত করে আগে ভাগে অফিস থেকে নিয়ে এসেছি – যেমন এককালে স্টেট ব্যাঙ্ক কেটে মোহন বাগানে মাঠে খেলা দেখতে গেছি।আইনত্রাখত ফ্রাঙ্কফুর্ট মোহনবাগান স্থাপনার দশ বছর বাদে ফ্রাঙ্কফুর্টের ফুসবাল ক্লুব ভিক্টোরিয়া ও কিকারস এই দুটি স্থানীয় দল মিলে আইনত্রাখত (সম্মিলনী /ইউনাইটেড ) ফ্রাঙ্কফুর্ট দল স্থাপনা করে। সে আমলে গোটা দেশে উত্তর দক্ষিণ আঞ্চলিক লিগের খেলা হতো – ধরে নিন বীরভূম বর্ধমান বাঁকুড়া মিলে একটা লিগ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার ন বছর বাদে জার্মান ফুটবল টিম বিশ্বকাপ জেতে (বার্নের বিস্ময় – জার্মানি ৩-হাঙ্গেরি ২) কিন্তু সিনিয়র লিগ শুরু ১৯৬৩ সালে, যাকে আমরা বুন্দেসলিগা বলে চিনি এবং বায়ার্ন মিউনিক প্রায় প্রতি বছরে চ্যাম্পিয়ন হয়। একাধিকবার জার্মান কাপ (ডে এফ বে পোকাল) জিতলেও ইউরোপীয় মঞ্চে আইনত্রাখত তখন (১৯৮০) অবধি কোন ট্রফি জেতে নি। বিশ বছর আগে ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে রানার্স আপ হওয়াটা একমাত্র মাইলস্টোন। এবার তাদের টিম জবরদস্ত – আগের রাউনডে টপ ডাচ টিম রটারডামের ফাইনুরদকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, অতএব উত্তেজনা তুঙ্গে।প্রতিপক্ষের নাম উচ্চারণ করতে দন্ত কৌমুদী বিধ্বস্ত হবার সম্ভাবনা। ইউরোপে ইতিমধ্যে আমার বছর দুয়েক কেটেছে। ইংল্যান্ড হল্যান্ড ফ্রান্স জার্মানির বাইরে পূর্ব ইউরোপের কিছু ফুটবল টিমের খবরাখবর রাখি যেমন ডিনামো কিভ, লোকোমোটিভ সোফিয়া, ডিনামো ড্রেসডেন, রেড স্টার বেলগ্রেড, স্টেউয়া বুখারেসট, স্পারতাক মস্কো। কিন্তু জব্রোইয়ভকা ব্রনের নাম শুনিনি। সে সময়ে ট্রেনে বা গাড়িতে শহর থেকে এয়ারপোর্ট যাবার পথে দেখা বনানী পরিবৃত ভালড স্টাডিয়নের সঙ্গে আজকের বহু অর্থে স্পন্সর করা ডয়েচে ব্যাঙ্ক পার্কের কোন তুলনা চলে না। সেখানে এবারে ইউরো ২৪ প্রতিযোগিতার কিছু খেলা হয়তো আপনারা দেখেছেন (জার্মানি- সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম -স্লোভাকিয়া ইত্যাদি)। সাতের আটের দশকে আমরা সিমেন্ট বাঁধানো গ্যালারিতে বসে বা দাঁড়িয়ে খেলা দেখতাম। দাদাকে একবার ফ্রাঙ্কফুর্ট বনাম লেভারকুসেনের লিগ ম্যাচ দেখাতে নিয়ে যাই- দাদা বলেন হ্যাঁরে, মোহনবাগানের কাঠের গ্যালারি এর চেয়ে আরামের। খেলা শুরুর অনেক আগেই হাজির হয়েছি – অ্যাটমসফিয়ারের স্বাদ গন্ধ নেওয়ার জন্য। আমার পাশে যিনি বসেছিলেন তাঁকে বাকি স্টেডিয়ামের উন্মত্ত জনতার অংশ বলে মনে হল না। জার্মানে প্রশ্ন করলে পরিষ্কার ইংরেজিতে জবাব দিলেন, নাম ফ্রান্তিসেক, শিক্ষক, এসেছেন ওই ব্রনো শহর থেকে। বার্লিন দেওয়াল ভাঙ্গা পড়তে তখনো প্রায় দশ বছর বাকি – চেক সীমান্ত পার হওয়া নিশ্চয় কঠিন ব্যাপার ছিল? সে কথা ঠিক জিজ্ঞেস করা গেলো না। যখন ইউরোপ এসেছি শীতল যুদ্ধ একেবারে তুঙ্গে। লাল নীল দুই পক্ষ কোন কারখানায় বসে কোন ছুরি শানাচ্ছেন বা কত বড়ো পেটো বাঁধছেন এ নিয়ে কানাকানি চলে, মানুষের ভয় ভীতি বাড়ে ; সত্যি মিথ্যে কেউ জানে না। কিন্তু এই কঠিন সময়েও ফুটবলের মাঠে ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দেশের খেলা চলেছে বাধা বন্ধহীন। আলাপ জমে গেলো ফ্রান্তিসেকের সঙ্গে। টি টুয়েন্টি নামক দানবের দুরাচার শুরু হবার আগে টেস্ট ক্রিকেটের মাঠে গল্প বেশি জমতো - অনেকক্ষণ যাবত মাঠে কিছুই ঘটে না, স্যাকরার ঠুক ঠাক চলে ব্যাটে বলে। ফুটবলের মাঠে সেটা সম্ভব নয়। তবু খেলার আগে, মাঝে, হাফ টাইমে কিছু কথা। আমরা তাঁকে একাধিক বিয়ারে আপ্যায়িত করেছি, কিছুতেই দাম দিতে দেব না! ভারত ও পূর্ব ইউরোপের ভাইচারা যুগ যুগ স্থায়ী হোক। দুজন ভারতীয়ের সঙ্গে এই ফ্রাঙ্কফুর্টের মাঠে দেখা হবে তিনি ভাবতে পারেন নি! আমার ট্রিভিয়া লাইব্রেরির শ্রীবৃদ্ধির জন্য যত না প্রশ্ন, ভারত সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞানস্পৃহা অনেক বেশি। ততক্ষণে তাঁর টিম আইনত্রাখত ফ্রাঙ্কফুর্টের হাতে বেশ ঝাড় খাচ্ছে, ৩-০ গোলে পিছিয়ে এবং তাঁর মনোযোগ বিভ্রান্ত। তাই প্রস্তাব দিলাম- তিনি যদি চান আমরা একত্র হেঁটে শহরে ফিরতে পারি, এক ঘণ্টার পথ। ট্রামে বেজায় ভিড় হবে। ফ্রান্তিসেক বললেন যদি আমরা তাঁকে ট্রেন স্টেশনের কাছাকাছি অবধি সঙ্গ দিতে পারি তাঁর খুব উপকার হয়, রাতের ট্রেন ধরবেন। সেটাই আমাদের লজিস্টিক, ফ্রাঙ্কফুর্ট হাউপটবানহফের সামনে আমরা বারো নম্বর ট্রাম ধরে বাড়ি ফিরব। ব্রনো ৪-১ গোলে হারল কিন্তু আমাদের একটি বন্ধু লাভ হলো। মার্চ মাসের সন্ধ্যে, সবে কারনেভাল শেষ, শীত বিদায় নিয়েছে। ভালড স্টাডিয়ন ছাড়িয়ে, রেসের মাঠ পেরিয়ে গাছে ঢাকা পথ দিয়ে আমরা তিনজন গল্প করতে করতে হাঁটলাম। আরও অনেকে চলেছেন, একটি সুখী জনতার মিছিল। জব্রোইয়ভকা ব্রনো জানতে চাইলাম এই যে আপনাদের টিমের যে কঠিন নাম, তার অর্থ কি? জব্রোইয়ভকা কথাটার মানে অস্ত্রাগ্রার ( আমাদের আর্সেনাল!)। আসলে এই নামের একটি কোম্পানি আছে যারা রাইফেল বন্দুক ইত্যাদি হাতিয়ার বানায়,,তাদের নামে দলের নাম। শহরের নাম BRNO! উচ্চারণ করেন কি করে? ফ্রান্তিসেক হাসলেন, “ চেক এবং স্লোভাক ভাষা ভাওয়েলের ব্যবহারে বিশেষ কার্পণ্য করে! আপনাদের চেনা কোন ভাষার মতন নয়। এই দেখুন ফরাসিরা সতেরোটা অক্ষর লিখে চারটে উচ্চারণ করে কিন্তু তারা স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণের সঙ্গে সদাচার করে থাকে। আমরা করি না। জেনে রাখুন ঘাড়ের চেক KRK এক মুঠো হলো čtvhrst বৃহস্পতিবার čtvrtek! উচ্চারণের চেষ্টা করবেন না! অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন করলেন, আপনারা প্রাগ গেছেন? কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়? কিন্তু এই মউকা! একজন চেক নাগরিকের কাছে মনের যাবতীয় দুঃখের কথা উজাড় করে দেওয়া যাক। জানালাম সে চেষ্টা শ্রীধর করে নি। তবে আমি এই মাত্র ন মাস আগে কয়েকজন বন্ধু সহ আপনাদের সীমান্ত থেকে ফিরে এসেছি, ভিসা থাকা সত্ত্বেও ঢুকতে দেয় নি। প্রথম দিন বলেছে ঠিক সম্মতি দেওয়া যাবে কিনা তার খবর নেবেন প্রাগ থেকে, একদিন বাদে আসুন। আমরা কাছের গ্রাম ভালডসাসেনে রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে আবার হাজিরা দিয়েছি। এবার আমাদের পরিষ্কার বলা হলো, আপনাদের ভিসা থাকলেও প্রবেশের অনুমতি নেই! শুনে ফ্রান্তিসেক বেশ অবাক হলেন, সীমান্ত চৌকির নাম জানতে চাইলেন -বললাম জার্মান এগার, চেক খেব। বললেন তিনিও সেই বর্ডার পেরিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্টের ট্রেন ধরেছেন। কড়াকড়ি আছে সে দেশের লোকের আসা যাওয়ার ব্যাপারে কিন্তু ভিসা সমেত বিদেশিকে আটকাবে কেন? তিনি একটু বিভ্রান্ত হলেন। আর চেষ্টা করেন নি? পারলে একবার আসুন,প্রাগ আপনাদের খুব ভালো লাগবে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ফ্রাঙ্কফুর্টে আমাদের নির্ধারিত তিন বছর কাল প্রায় উত্তীর্ণ হতে চলেছে। আমাদের কি আর সে সুযোগ হবে? পশ্চিম ইউরোপটাই তখনো দেখা হয়ে ওঠে নি। ম্যাপ দেখি আর ভাবি দেশে ফিরে গিয়ে কি মুখ দেখাব? স্পেন পর্তুগাল আয়ারল্যান্ড ডেনমার্ক সুইডেন নরওয়ে ফিনল্যান্ড অবধি দেখি নি, হ্যাটা হয়ে যাব। প্রাগ তো অনেক দূরের নক্ষত্র। ‘এ দেশে পাওয়া যায় কিনা জানি না তবে একবার আমাদের দেশে এসে চেক বিয়ার টেস্ট করে দেখুন!’ যুদ্ধোত্তর চেক জার্মান সম্পর্ক এবং সুদেতেনল্যান্ডের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলাম। ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেন স্টেশনে প্রায় পৌঁছে গেছি এখান থেকে সিধে খেবের ট্রেন যায়। তখন রাত্তির দশটা বেজে গেছে। তবে ফ্রান্তিসেক বললেন বেশি রাতে ট্রেন আছে, ঘুমিয়ে চলে যাবেন, ছ ঘণ্টা লাগে। বিদায় নেবার সময়ে বললেন প্রাগ নামের ভেতরে প্রয়াগ শব্দ নিহিত আছে, যেখানে দুটি নদীর ধারা মিশে যায় - ভ্লাতাভা ও লাবেম (যাদের জার্মান নাম মলদাউ ও এলবে)। শুনে বিস্মিত এবং একই সঙ্গে উৎসাহিত হয়েছিলাম কিন্তু পরে অনেক খোঁজ খবর করেও এই মন্তব্যের সারবত্তা উদ্ধার করতে পারি নি।হাউপটবানহফের সামনে উষ্ণ করমর্দন করে শুভযাত্রা জানালাম। আর কোনদিন দেখা হবে না তাঁর সঙ্গে কিন্তু সন্ধ্যাটি মনে রয়ে যাবে। পরিশিষ্ট: এক মাঝে আশিসদাআগের বছর (১৯৭৯) চেকোস্লোভাকিয়ার দুয়োর থেকে ফেরত পাঠানোর কারণ জেনে উঠতে না পেরে বিশেষ ধন্দে ছিলাম। আমার চেহারা দেখে হয়তো অবাঞ্ছিত বিদেশি মনে হতে পারে কিন্তু আশিসদা, শ্রাবণী বউদি, আলো বউদি? যেতে নাহি দিব বললে কেন? এই মাগ্যি গণ্ডার বাজারে ওদের তো দুটো ডয়েচে মার্কের আমদানি হতো? কারণটা জানলাম কয়েকমাস বাদে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ফ্রাঙ্কফুর্টে একটি রিসেপশানে আলাপ হলো মহেন্দ্রর সঙ্গে, ফ্রাঙ্কফুর্টের ভারতীয় কনসুলেটে কমার্শিয়াল আতাশে। প্রায় আমাদের বয়েসি, খুব শিগগির আলাপ বন্ধুত্বে পরিণত হয়। তিনি অত্যন্ত অতিথি বৎসল এবং সজ্জন। ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেন স্টেশন এবং মাইনের মাঝামাঝি ভারতীয় কনসুলেটের বাড়ির তিন তলায় তাঁর আস্তানায় ডিউটি ফ্রি মদ্য পান তখন আমাদের একটি বিশেষ আকর্ষণ – বলতেন সরি, বোতল উপহার দিতে পারি না, সরকারি মানা। তবে জো পিনা হ্যায়, য়হাঁ পিও! জি ভরকে পিও। চেক অভিজ্ঞতার পরে প্রায় এক বছর কেটে গেছে। একদিন দারুর ঝোঁকে বর্ডার থেকে ফেরত পাঠানোর গল্পটা শোনালাম। মহেন্দ্র এই হৃদয় ও পকেট বিদারক কাহিনি মন দিয়ে শুনলেন।* কবে? দিনটা মনে আছে? সেটা কি আর ভোলা যায়? জুনের ১৬/১৭, ১৯৭৯। তিনি টেবিলে রাখা একটা ডায়েরির পাতা উলটে কি দেখলেন। তারপর হাসলেন। - আপনাদের যাত্রা কে ভঙ্গ করেছেন জানেন? আমাদের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই! আজ্ঞে হ্যাঁ! দেশাইজি এসেছিলেন ইউরোপ সফরে। পোল্যান্ড রাশিয়া জার্মানি ঘুরে প্রাগে গেছিলেন ১৬-১৮ জুন। আপনারা গুটিকয় ভারতীয় ঠিক সেই সময় ব্যাভেরিয়ান সীমান্ত দিয়ে চেকোস্লোভাকিয়া প্রবেশ করার চেষ্টা করছিলেন! স্বচ্ছন্দে অনুমান করতে পারি আপনারা প্রাগে পৌঁছে দেশাইজিকে লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেল না হোক, ডিম বা টমেটো ছুঁড়তে পারেন এই আশঙ্কায় আপনাদের গতি রুদ্ধ করা হয়! কমিউনিস্ট ইউরোপে এমনটা আকছার ঘটে! আমাদের খোদ ডিপ্লোম্যাটিক মিশনের লোক যখন বলছেন তাহলে সত্যি কথা। এ রাগ পুষে রাখা ছাড়া আর কি উপায়? স্বয়ং প্রধান মন্ত্রী যখন বাধা। সেদিন ভাবতে পারি নি দু বছর বাদে এক চেক ভদ্রলোকের অধীনে কাজ করব, চেক বা চেখিয়া যাবো। তিন দশক বাদে দাঁড়াব ব্রনো শহরের চত্বরে। প্রিয়তম বান্ধব অরটউইনের সূত্রে সুদেতেনল্যান্ডের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হবো। বাণিজ্যিক কারণে চেকের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হবে, কনফারেন্সে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেবো! কারলসব্রুইকের (চার্লস ব্রিজ) ওপরে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবো মলদাউ (ভ্লাতাভা ) নদীর সাতটি সেতু। কাফকার বাড়ি যাবো! রাশিয়া গিয়েছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন যাওয়া হয় নি। তেমনই চেকোস্লোভাকিয়া আমার অদেখা থেকে গিয়েছে। পনেরো বছর বাদে উত্তরে ড্রেসডেন থেকে এলবে নদী পেরিয়ে যে দেশে প্রবেশ করেছি, তার নাম চেখিয়া, চেক রিপাবলিক। স্লোভাকিয়া ততদিনে এক আলাদা দেশ। দুই মোহনবাগানের বিকল্প নেই জানি তবু স্থানীয় টিম হিসেবে আইনত্রাখত ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রতি ভালোবাসা জন্মে যায়। সে বছর (১৯৭৯-৮০ ) আইনত্রাখত কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রনোকে ৪-১ গোলে হারায়, সেমি ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিককে নিজের মাঠে ৫-০ গোলে এবং ফাইনালে বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথম ইউরোপিয়ান ট্রফি বিজয়ী হয়। এর পরের সাফল্য আসে চার দশক বাদে, ২০২২ সালে যখন তারা ইউরোপীয় লিগ জেতে। *পূর্ব ইউরোপের ডায়েরি প্রথম খণ্ডে পূর্ব জার্মানি পর্বে আমাদের চেকোস্লোভাকিয়া অভিযানের ব্যর্থতার বিশদ গল্প বলেছি।
  • হরিদাস পালেরা...
    আক্রমণকারী তৈমুরকে কী  চোখে দেখতেন হিন্দুস্থানের মোঘল বাদশাহরা : উপল মুখোপাধ্যায়  - upal mukhopadhyay | তৈমুর হিন্দুস্থান আক্রমণ করেন ও হাতের কাছে হিন্দু –মুসলমান যাকে পেয়েছেন  মারকাট ,লুটপাট করে আবার মধ্য এশিয়ায় চলে যান মুলতানে তাঁর সেপাইসালার খিজির খানকে  রেখে। তিনি এসব করেন তেরোশো সাতানব্বই  থেকে নিরান্নব্বইয়ের মধ্যে দিল্লীর সুলতান মাহমুদ  তুঘলকের ফৌজকে হারিয়ে  । হিন্দুস্থানের চোখে ওটা একটা ভয়াবহ  মঙ্গোল আক্রমণই ছিল যার ঠ্যালায় আর ঠিক পরের মহামারীতে উজাড় হওয়ার দশা হয়  দিল্লীর ।এক  নিদারুণ ট্র্যাজেডি বটে। । দুটো ফার্সি স্মৃতি নির্ভর অতীত কথা বা তারিখে এই আক্রমণের বর্ণনা জানা যাচ্ছে। একটা আক্রান্তের দিক থেকে সমালোচনামূলক লেখা তারিখ এ মোবারাকশাহী  যা লিখেছিলেন ইয়াহয়া সিরহিন্দি চোদ্দোশো চৌতিরিশের মধ্যে সুলতান  মোবারক শাহের আমলে । অন্যটা তৈমুর বংশের শাহী তারিখ জাফরনামা যা লিখেছিলেন শারাফ আল দিন ইয়াজদি  চোদ্দোশো পঁচিশের মধ্যে।  প্রথমটার  লেখা পরে শেষ হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিতে লেখা আর আক্রমণের অংশটা অনেক আগেই লেখা বলে ধরা হয় । তবে ছোটোখাটো তফাৎ ছাড়া   দুটো ন্যারেটিভে ঘটনাক্রমের মিল আছে। তৈমুর প্রথমে দিল্লীর অধিবাসীদের ছেড়ে দিলেন করদানের শর্তে ( মাল এ আমানি ) . দিন চারেকের মাথায় তাঁর কী  খেয়াল হল সবাইকে ক্রীতদাস বলে ঘোষণা করেন। এর মধ্যে হাজার হাজার দক্ষ কারুশিল্পী ছিলেন যাঁদের তৈমুর আর তাঁর চেলাচামুন্ডাদের সঙ্গে যেতে হয়। আক্রমণকারীরা এক লক্ষ লোক মেরেছে এমনটা   ইয়াজদি দাবি করছেন আর সিরহিন্দির কথা অনুযায়ী সেটা পঞ্চাশ হাজার। দ্বিতীয়টাই সঠিক বলে অনুমান করছেন অধ্যাপক ইরফান হাবিব কারণ প্রথমটায়  অনেক একপেশে কথা  আছে। ধর্ম –অধর্ম এসব নিয়েও অনেক তালগোল পাকানো কথা বলছেন   ইয়াজদি ।যেমন বিধর্মী হিন্দুদের ( হেন্দুআন –এ গাবর) সম্পর্কে বলা হচ্ছে যারা ঘরের মেয়েদের আর নিজেদের আত্মাহুতি দিতে শুরু করতে গিয়েছিল । দিল্লীর তিন শহরের সব তৈমুরের সৈন্যরদের  জ্বালিয়ে দেবার কথা বলা হচ্ছে । আরও বলা হচ্ছে অবিশ্বাসী হিন্দুরা জড়ো হয়েছিল পুরনো দিল্লীর মসজিদে আর তৈমুরের সৈন্যরা তাদের কচুকাটা করছে তেরোশো আটানব্বইয়ের উন্তিরিশে  ডিসেম্বের । অধ্যাপক হাবিবের মন্তব্য – “ ইয়াজদির হিন্দুরা’’   মুসলিমদেরও ধরে।“ The “pagan Hindus” (Henduân-e gabr) having had the temerity to begin immolating their women and themselves, the three cities of Delhi were put to sack by Timur’s soldiers. “Faithless Hindus”, he adds, had gathered in the Congregation Mosque of Old Delhi and Timur’s officers put them ruthlessly to slaughter there on the 29th of December. Clearly, Yazdi’s “Hindus” included Muslims as well. {Timur in the Political Tradition and Historiography of Mughal India Irfan Habib ( source- Open Edition Journal) }এইভাবে ধর্ম নির্বিশেষে  হাজার হাজার দিল্লীর অধিবাসীদের গণহত্যা করে হিন্দুস্থানে তৈমুরের ইমেজ মোটেই ভালো ছিল না । তাই পরবর্তী কালে  বাবর নিজেকে তৈমুরের মুখ্য উপাধি  সাহিব - এ কিরান বা  গ্রহযোগের সম্রাট  না বলে শুধু বেগ বলে উল্লেখ করছেন । পনেরশো সাতাশে রানা  সংগ্রাম সিংহ কে হারানোর পর ফতেহনামায়ও তৈমুরের কোন উল্লেখ বাবর করেন না । হিন্দুস্থানে তৈমুরের কথা বেশি বলায় অসুবিধে ছিল।আকবরের ফরমানের সিল মোহরে  তৈমুর ঐতিহ্যের উৎযাপন আছে বিশেষ করে দান খয়রাতির ফরমানের সিল মোহরের গোল চক্রে তৈমুর ঐতিহ্যের চিহ্ন আঁকা  থাকত। অধ্যাপক হাবিব দেখিয়েছেন  পনেরোশো একষট্টির সাতই এপ্রিল এক হিন্দু কাপড় চোপড় রঙের ওস্তাদকে দানের ফরমানে লেখা আছে শুধুমাত্র আমির তৈমুর। পরের দিকের অন্য এক ফরমান পনেরোশো আটানব্বইয়ের এগারোই সেপ্টেম্বর আগ্রার কাছে বৃন্দাবন মন্দিরের দান ফরমানে আবার আমির তৈমুর লেখার পর ঐতিহ্য শাস্ত্র অনুযায়ী সাহিব -এ  কিরান বলে উল্লেখ করা হচ্ছে তৈমুরকে। আকবর কখনো নিজেকে সাহিব -এ কিরান উপাধি দিয়েছেন বলে উল্লেখ নেই কিন্তু কিছু আধাসারকারি শিলালিপিতে তাঁকে এসব  বলে তৈমুরের যোগ্য উত্তরসূরি বলা হয়েছে । আরেফ কান্দাহারি বাদশাহের  জীবনী লেখার সময় , আকবরকে সাহিব -এ কিরান বলে উল্লেখ করলেন পনেরোশো উনআশিতে। দেখা যাচ্ছে একটার পর একটা সাফল্যে গর্বিত আকবরকে তৈমুরের প্রধান উপাধি সাহিব -এ কিরান বা গ্রহযোগের সম্রাট  বলে উল্লেখ করার লোভ দরবারী অভিজাতরা সামলাতে পারছেন না আবার সরকারি ভাবে প্রকাশ্যে তৈমুর ঐতিহ্যের জয়গানেও দ্বিধা ছিল আকবরের সময়। এর চূড়ান্ত প্রকাশ দেখা যায় আকবরের দায়িত্বপ্রাপ্ত তারিখকার -গেজেটিয়ার - সলাহকার আবুল ফজলের লেখায়।বাবরের হিন্দুস্থান জয়ের সঙ্গে পূর্বপুরুষ তৈমুরের বিশ্ব জয় আর মঙ্গোল রাজশক্তির আদি প্রতীক অমুসলিম এলান কোয়ার ঐতিহ্যশালী আলোকবর্তিকা যে বিজয়ী আকবরকেও রাস্তা চেনাচ্ছে এসব আকবরনামাতে  বলছেন আবুল ফজল সাহেব। প্রশ্নটা হল বলছেন কী ভাবে ? না অনেক কায়দার কুশলতায় কথা বলতেই হচ্ছে তাঁকে ! হিন্দুস্থানের জাত -ধর্ম নির্বিশেষ আম লোক কী করে তৈমুরের অত্যাচারী খড়গ কৃপাণের ভীমরণ ভূমে রণনের    কথা ভোলে ?  একথা তাঁর থেকে আর তাঁর  প্রভু হিন্দুস্থানী ঐতিহ্যের উদযাপনে নতুন এক শক্তিশালী  সালতানাত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর আকবরের থেকে  ভালো জানবে কে ? তাই  কাজ টা বড়ই ঝামেলার ছিল আবুল ফজলের।   ইয়াজদির  জাফরনামার শাহী তারিখের ওপর নির্ভর করে তাঁকে লিখতে হবে  তৈমুরের জন্য আলাদা পরিচ্ছদ।  তিনি সংক্ষেপে  সারছেন তৈমুরের হিন্দুস্থান জয়ের প্রসঙ্গ , বীরত্বের কথা :মহরমের দ্বাদশ দিনে হিজরি আটশো এক ,তিনি সিন্ধু পার হলেন নৌকো  দিয়ে খাড়া করা সেতুতে , আর , ভাগ্যলক্ষ্মী তাঁর হিন্দুস্থান বিজয়ে সহায়ক হল। “On the 12th of Moḥarram 801, he crossed the Indus after constructing a goodly bridge [of boats], and, with fortune accompanying him, conquered India25”. {Timur in the Political Tradition and Historiography of Mughal IndiaIrfan Habib ( source- Open Edition Journal)আকবরনামার তৃতীয় খণ্ড আইন ই আকবরিতে আবুল ফজল আর একবার তৈমুর প্রসঙ্গ টানলেন,  তবে সেটা তৈমুরের  হিন্দুস্থান আক্রমণের সময় বিশাল ফৌজের  তুলনায় , পানিপথের প্রথম  যুদ্ধে  বাবরের অনেক ছোট  ফৌজের প্রসঙ্গেঃযখন দিল্লীর মসনদে  বসলেন সুলতান ফিরোজ তুঘলকের নাতি সুলতান মাহমুদ , মাল্লু খান যখন উজির , গুণের কদর আর কাজের সুনাম লুটোয় ধূলোয় , তখতের শান হয়  নিস্প্রভ । সেসময় তৈমুরের শাহী পাতাকা দিল্লীর মাটিতে পোঁতা হয় । যদিও বিপুল জন সংখ্যার এ দেশ তাঁর তাঁবেতে এল , কিন্তু এ দেশে তাঁর জন্য তেমন লুটের  মালই ছিল না তাই দেশের টানে তিনি ফিরে যান । “When the sovereignty of Delhi came into the hands of Solṭân Mahmud, the grandson of Solṭân Firuz [Toghloq], and the viziership in the hands of Mallu Khân, the thread of worth-recognition and work-taking fell from the hand, and sovereignty lost its lustre. At this moment, the Imperial banners [of Timur] arrived, as has been briefly noted27. Although such a populous country came into his [Timur’s] hands, it did not have [for him] the desired booty: out of love for home, he went back”.(  Â’in-i Akbarî, ed. Nawal Kishore, Lucknow, 1892, vol. III, p. 163. ) ঘুরিয়ে খানিকটা ঠেস দিয়েই বলছেন আবুল ফজল। যদিও তার কথায় অসচ্ছতা স্পষ্ট কারণ মুঘোল দরবারে থেকে এরকমটাই বিধেয় ।আকবরের সময়ের অন্য  অনেক তারিখ লিখিয়ে   আবার রাখঢাকের তোয়াক্কা না করে তৈমুরের দিল্লী অভিযানকে সিরহিন্দির   তারিখ এ মোবারাকশাহী র কায়দায় কাঠগড়ায় তুলে ছেড়েছিলেন।তাঁদের মধ্যে বাদায়ুনি , যিনি গোঁড়া অবস্থান  থেকে আকবরের সুল ই কুল বা সহনশীলতার নীতির বিরোধিতা করেছেন তিনি কিন্তু  তৈমুরের দিল্লীতে অত্যাচারের বিরোধী তারিখকার সিরহিন্দির সুরে সুর মিলিয়ে গণহত্যার বিরোধিতা করছেন ,  বিরূপ মন্তব্য করছেন তাঁর বুদ্ধিদাতা উলেমাদের সম্পর্কে দিল্লীর  নিরীহ মুসলমানদের কচুকাটা করার জন্য । বাদায়ুনি অবশ্য অন্য তারিখকারদের মতোই কিছু গুলগাপ্পা ঢুকিয়েছেন তাঁর ন্যারেটিভে যেমন দিল্লীর অধিবাসীদের সবাইকে দাস বলে গণ্য করা থেকে ছেড়ে দেওয়ার  ব্যাপারে সুফি সন্ত শেখ আহমদ খাটটুর অবদানের কথা।সুফিদের বিষয়ে তাঁর দুর্বলতার জন্য  তৈমুর ওই সন্তকে ছেড়ে দিয়েছিলেন এটা মনে করা হচ্ছে  কিন্তু অন্যদের পোড়া কপাল , পুড়েই ছিল।বাদায়ুনিরই সমসাময়িক তারিখকার নিজাম আল-দিন আহমদ তাঁর তাবাকাত -এ আকবরি বইতেও   তারিখ এ মোবারাকশাহী  র বর্ণিত  গণহত্যার  কথা একটু রেখে ঢেকে    বলছেন যে ,  পঞ্চাশ হাজার বন্দীর  মধ্যে কিছু লোককে কোতল করা হয় ইত্যাদি।  এক কথায় এই দুই গুরুত্বপূর্ণ তারিখকারই হিন্দুস্থানি হিসেবে , তৈমুরকে আক্রমণকারী বলে সমালোচনা করেছেন  ।আকবরের পরে জাহাঙ্গীর তৈমুরের ঐতিহ্য নিয়ে নিজে খুব একটা ভাবিত ছিলেন না। এর ব্যতিক্রম ছিলেন শাজাহান ।  পনেরোশো একানব্বই -বিরানব্বই ছিল ইসলামী ক্যালেন্ডারের নতুন সহস্রাব্দ। নতুন সহস্রাব্দের সূচনায় জন্মান   শাজাহান । এই ঘটনাকে নিজের মহিমা কেত্তনের শাজাহানি প্রোপাগান্ডার অঙ্গ করছেন তিনি। নিজের আবির্ভাবের  অভূতপূর্ব গ্রহযোগের বিশেষ ধারণার নির্মাণ করছেন শাজাহান । নিজেকে তৈমুরের সঙ্গে তুলনা করছেন  তিনি , নিজেই নিজেকে উপাধি দিলেন  গ্রহ যোগের দ্বিতীয় কর্তা হিসেবে -সাহিব –এ  কিরান । ইতিহাসকার সঞ্জয় সুব্রামনিয়াম এই প্রবণতাকে রাজনৈতিক মসিহার আবির্ভাবের প্রত্যাশী চিন্তা (political millenarianism)* বলেছেন।  কী মোঘল ভারতে,  কী পর্তুগালে সর্বত্র রাজা বাদশাহদের ছিল একই চিন্তা। সবাই মসিহা হতে চাইছেন।  এছাড়া শাজাহান বাবা  জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন শাহাজাদা হিসেবে। সে যুদ্ধও চলে চলল ষোলোশো  বাইশ থেকে সাতাশ , পাঁচ বছর । সারা হিন্দুস্থান জুড়ে চলা বাপ-ছেলের  যুদ্ধে   বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তাঁর  জিতে বা বেঁচে ফিরে আসার ক্ষমতা অনেকটা যেন তৈমুরের মতোই।  সে জন্য তারিখ লিখিয়ে  কাজউইনি বলেছিলেন , " নতুন বাদশাহর সঙ্গে কাজেকম্মে তৈমুরের অনেক মিল আছে। "  এছাড়া মধ্য এশিয়ার উজবেক খানেদের মধ্যে বা ইরানের সাফাভিদ দের মধ্যে গণ্ডগোলের সুযোগে  সেখানে নাক গলানোর ইচ্ছেতে শাজাহানের নিজেকে বিশ্বজয়ী তৈমুর ঐতিহ্যের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি  ভাবাটাও একটা কারণ বটে । সে করতে তাঁর প্রধান হাতিয়ার হলেন শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব। এজন্য ছেলে বয়স থেকেই   শাহজাদাকে আলাদা করে তৈরি  করছিলেন শাজাহান এমন মনে করার কারণ আছে। আবার কাজউইনির  স্মরণাপণ্ণ হতে হবে এ জন্য। উনি লিখছেন যে   তৈমুরের স্মৃতিমালার চাঘতাই  তুর্কি পাণ্ডুলিপি  ছিল ইয়েমেনের শাসকের কাছে । মির আবু তরবাতি এর  অনুবাদ করেন ফার্সিতে।  বইটার নাম দেন  ওয়াকাত এ সাহেবকিরানি।  এ বইতে তৈমুরের অনেক ফরমান যেন তার নিজের মুখেই শোনা যায় এরকম ভনিতা আছে সোজাসাপ্টা চাঘতাই  তুর্কিতে।ষোলোশো সাঁইতিরিশে  শাজাহানকে অনেক বইয়ের মতো এটাও পড়ে  শোনালে তিনি খুব খুশ হয়ে এর কিছু অংশ মুখস্ত করে  স্বর্গীয় বিভায় উদ্ভাসিত দরবারে বারবার উচ্চারণ করেন আর ভুলঠিক দেখার  জন্য পাঠালেন তাঁর  সুপুত্র শাহাজাদা সুলতান -ঔরঙ্গজেব বাহাদুরের কাছে , কদিন  আগেই যিনি দরবারের আদেশে দাক্ষিণাত্য সুবার রাজধানী দৌলতাবাদে গেছেন।অবশ্য শাজাহানের নিজেকে তৈমুর প্রতিপন্ন করার উচ্চাভিলাষে মধ্য এশিয়া আক্রমণ হাস্যকর প্রমাণিত হল। পারস্যের সাফাভিদরা দূরের কথা,  উজবেক খানদের হাতেই ভালো রকম হেনস্থা হয়ে,  বালখ দখল করেও সেখান থেকে কোনরকমে  থেকে পালাতে হয় ঔরঙ্গজেবকে ষোল শো সাতচল্লিশের শেষে । আর শাহজাহানের পর শেষ  গ্রেট মোঘল ঔরঙ্গজেব কখনোই ওসব তৈমুর ইত্যাদি হবার চেষ্টাও করেননি।দরবারি নথিতে  ঐতিহ্যের সূত্রে তৈমুর আওড়ানো হলেও   একান্তই হিন্দুস্থানের বাদশাহ হয়েই  কাম সেরেছেন তিনি । এই ভাবে বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব সব  মোঘল বাদশাহরা হিন্দুস্থানের  চিহ্নিত আক্রমণকারী তৈমুরকে  কী  চোখে  দেখতেন তার চর্চার মধ্যে আমরা থাকতে পারি ঐতিহাসিকদের সঙ্গে। সূত্রঃ১) Timur in the Political Tradition and Historiography of Mughal India Irfan Habib ( source- Open Edition Journal)২) Aurangzeb as seen from Gujarat: Shi‘i and Millenarian Challenges to Mughal Sovereignty , SAMIRA SHEIKH Published online by Cambridge University Press: 25 April 2018, pp. 557-581 
    ঔপনিবেশিক হিন্দু আইন  - এলেবেলে | It is significant that the early colonial rulers of Bengal introduced the code of Hindu law in Bengal during the last three decades of the eighteenth-century, when legal codes were not well known in Europe. The Code Napoleon was produced only in 1804. The German code was introduced even later. Indeed the colonial rulers of Bengal evoked the model of Justinian in preparing the legal codes of Bengal.— Nandini Bhattacharyya-Panda, The East India Company and Hindu Law in Early Colonial Bengalহিন্দু ধর্মশাস্ত্রে বিবৃত শ্লোকসমূহের চুলচেরা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে প্রথমে রামমোহন ও পরে বিদ্যাসাগর তাঁদের সতীদাহ নিবারণ, বিধবাবিবাহ প্রচলন ও বহুবিবাহ নিবারণ বিষয়ক যুক্তিজালকে শানিত করেন। তাঁদের সংস্কার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার জন্য, তৎকালীন প্রভাবশালী সমাজকর্তারাও অন্যান্য সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের সহায়তায় এ বিষয়ে বিবাদ-বিতর্কে অবতীর্ণ হন। সতীদাহ, বিধবাবিবাহ ও বহুবিবাহের সমর্থক ও বিরোধী—  উভয় পক্ষই যেহেতু ধর্মশাস্ত্রের আশ্রয় নেন, সেহেতু রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের সংস্কার প্রচেষ্টার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় ‘হিন্দু’ আইনের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের বিষয়টি বিশদে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।১৭৬৫ সালে কোম্পানির দেওয়ানি লাভ করার আগে পর্যন্ত, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রত্যেকের জন্য একই আইন প্রযোজ্য ছিল। বিশেষত তদানীন্তন বাংলার প্রচলিত রীতি অনুসারে প্রতিটি নিজামত (ফৌজদারি) আদালতে অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তির বিষয়টি দেখভাল করতেন একজন কাজি, একজন মুফতি ও দুজন মৌলবি। তবে দেওয়ানি আইনের ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য ঔরঙ্গজেবের সময় থেকেই সুন্নি হানাফি স্কুলের ওপর ভিত্তি করে মুসলিম আইনের একটি সারসংক্ষেপ— ফতোয়া-ই-আলমগিরি— বলবৎ থাকলেও হিন্দুদের জন্য আলাদাভাবে নির্দিষ্ট কোনও গ্রন্থ কিংবা বিধিবদ্ধ আইন প্রচলিত ছিল না। সেই সময়ে ভারতবর্ষের হিন্দুরা সচরাচর স্থানীয় স্তরেই তাঁদের যাবতীয় বিবাদ-বিসংবাদের নিষ্পত্তি করতেন। যদি কোনও ব্যক্তি সেই মীমাংসায় সন্তুষ্ট না হয়ে দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হতেন, সেক্ষেত্রে উত্তরাধিকার, বিবাহ, জাতপাত এবং ধর্মসংক্রান্ত যাবতীয় বিবাদের নিষ্পত্তির জন্য, আদালতে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের সাহায্য বা পরামর্শ নেওয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল। যদিও কাজিরাই চূড়ান্ত রায়দানের অধিকারী ছিলেন।এই প্রসঙ্গে দেওয়ানি আমলে (১৭৬৫-৭২) বাংলার রাজস্ব আদায়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী মহম্মদ রেজা খাঁ-র উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক ন্যায়বিচারের ধারা সম্পর্কিত ব্রিটিশ আধিকারিকদের প্রশ্নের জবাবে রেজা খাঁ বলেন: “যদি হিন্দুরা তাঁদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও বিভাজন ইত্যাদি যাবতীয় বিবাদের নিষ্পত্তির বিষয়ে তাঁদের ব্রাহ্মণদের কথা অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাঁরা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে অভিযোগ করবেন কেন। কিন্তু যখন তাঁদের ব্রাহ্মণরা এ বিষয়ে তাঁদের বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারেন না, তখন তাঁরা আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করেন এবং তাঁর মতামতকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসাবে মান্য করতে বাধ্য হন।” [১] রেজা খাঁ-র বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, হিন্দু প্রজাদের উত্তরাধিকার, বিবাহ, জাতপাত ইত্যাদি সম্পর্কিত বিবাদের নিষ্পত্তির জন্য শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের পরামর্শ নেওয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু পণ্ডিতদের মতামতকে আইন হিসাবে বিবেচনা করা হত না। কেবল আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট অর্থাৎ কাজিদেরই ন্যায়বিচারের অধিকার ছিল।যদিও হিন্দুদের জন্য দেওয়ানি আদালতে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের পরামর্শ দেওয়ার প্রথা থাকলেও কোনও সময়েই তাঁরা তাঁদের মর্জিমাফিক এই বিবাদ-বিরোধের মীমাংসা করতেন না। ষোড়শ শতাব্দীর বিখ্যাত ভাষ্যকার রঘুনন্দন ব্যবহারতত্ত্ব গ্রন্থে জানিয়েছেন, শাস্ত্রীয় রীতিনীতিগুলির চেয়ে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্থানীয় স্তরে কোনও বিরোধের সমাধান না করা গেলে, তার নিষ্পত্তির জন্য বিবদমান গোষ্ঠী রাজার শরণাপন্ন হবে। সেক্ষেত্রে রাজা একজন ‘প্রাড়্‌বিবাক’ (শাস্ত্র ও সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ব্রাহ্মণ, ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ গুণসম্পন্ন ক্ষত্রিয়ও হতে পারেন) নিয়োগ করবেন। এই বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষকে প্রশ্ন করার পরে তাঁর মতামত উপস্থাপন করলে রাজা চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবেন। [২] ফলে প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থায় যাবতীয় আইনি বিবাদের মীমাংসার বিষয়ে ব্রাহ্মণ অথবা ক্ষত্রিয় শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতরা নন, রাজা কিংবা কাজিই ছিলেন চূড়ান্ত রায়দানের অধিকারী।কিন্তু ভারতবর্ষে ব্রিটিশ প্রশাসন প্রথম থেকেই স্থির করে, ভারতীয়দের ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমান উভয়েই মুসলিম ফৌজদারি আইন দ্বারা আগের মতোই শাসিত থাকলেও হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক দেওয়ানি আইন চালু হবে। তাই ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই তারা প্রচলিত আইনব্যবস্থাটিকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয় এবং কেবল নিজেদের স্বার্থপূরণের উদ্দেশ্যে পরিকল্পনামাফিক এই বিভাজনমূলক কাজটি সম্পাদন করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। এই বিষয়ে সলতে পাকানোর কাজটি মূলত শুরু করেন স্ক্র্যাফটন (Luke Scrafton), হলওয়েল (John Holwell), বোল্টস (William Bolts), ভেরেলস্ট (Harry Verelst) প্রমুখ কোম্পানির কিছু হর্তাকর্তা। সংস্কৃত ভাষা এবং ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কে বিশুদ্ধ গণ্ডমূর্খ স্ক্র্যাফটন ১৭৭০ সালে বলেন: “ব্রাহ্মণরা বলে, তাদের আইন প্রণেতা ব্রুমা [ব্রহ্মা] তাদের জন্য বিদম [বেদ] বলে একটি বই রেখে গেছেন, যেখানে সমস্ত মতবাদ ও প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ আছে। কেউ কেউ বলে, যে মূল ভাষাতে এটি লেখা হয়েছিল সেটি হারিয়ে গেছে এবং বর্তমানে তাদের কাছে কেবল একটি ব্যাখ্যা আছে, যাকে শাস্তহ (SHASTAH) [শাস্ত্র] বলা হয়। এটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত, যা বর্তমানে একটি মৃত ভাষায় পরিণত এবং যারা এই ভাষার অধ্যয়ন করে, কেবল সেই ব্রাহ্মণদের কাছে পরিচিত। ...যদিও লাহোর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত মহাদেশের সমস্ত জেন্টু [হিন্দু] বিদমকে স্বীকার করে, তবুও তারা এর [শাস্ত্র] ভেতরে ব্যাপক দুর্নীতি করেছে ...।” [৩] বলা বাহুল্য, তাঁর ‘SHASTAH’ শব্দটি ধর্মশাস্ত্রের ইঙ্গিত করলেও সেই ধারণা যে কতদূর ভ্রান্ত ছিল, সে বিষয়ে আমরা অচিরেই মনোযোগী হব। একই সুরে স্ক্র্যাফটনের বক্তব্যের প্রায় অনুবৃত্তি করে The History of Hindostan গ্রন্থের লেখক আলেকজান্ডার ডাও বলেন: “প্রত্যেক মুসলমান, যারা কোরান বিড়বিড় করতে পারে, কোনও অনুমতি বা নিয়োগপত্র ছাড়াই নিজেকে একজন বিচারকের পদে উত্থাপন করে এবং প্রতিটি ব্রাহ্মণ কোনও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই তার নিজস্ব মর্জিমাফিক ন্যায়বিচার বিতরণ করে।” [৪] স্ক্র্যাফটন কিংবা ডাও-এর এই অপরিসীম অবজ্ঞাসূচক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যসমূহ থেকে এ কথা স্পষ্ট, তাঁরা প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন।একই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে এবং অতীতের বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করে দেওয়ানি লাভের মাত্র ৭ বছরের মধ্যেই গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস, পৃথক ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ দেওয়ানি আইনের সংকলন গ্রন্থ তৈরি করার বিষয়ে উদ্যমী হন। ১৭৭২-এর ১৫ অগস্ট সরকারিভাবে ঘোষিত হয়: “উত্তরাধিকার, বিবাহ, জাতপাত ও অন্যান্য ধর্মীয় আচরণ বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সমস্ত মামলায়, মুসলমানদের কোরানের আইনসমূহ এবং হিন্দুদের ক্ষেত্রে শাস্ত্রব্যবস্থা চিরকাল সম্মানের সঙ্গে মেনে চলতে হবে। এই সমস্ত [মামলা] উপলক্ষে যথাক্রমে মৌলবিরা বা ব্রাহ্মণরা আইনটির ব্যাখ্যা করার জন্য [আদালতে] উপস্থিত থাকবেন এবং তারা রিপোর্টে স্বাক্ষর করে ডিক্রি পাস করতে সহায়তা করবেন।” [৫] হেস্টিংসের দৌলতে এই প্রথম ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র আইনত প্রয়োগযোগ্য হয়ে ওঠে। তাঁর প্রত্যক্ষ সহায়তা ও আর্থিক অনুদানের ভিত্তিতে পণ্ডিত ও মৌলবিদের সাহায্য নিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য এই বিষয়ে দুটি পৃথক সংকলন গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এই সংকলন গ্রন্থ তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল— ক) আরবি ও সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ইংরেজ বিচারকদের রায়দানের বিষয়ে সহায়তা করা এবং খ) তাঁদের রায়দানের ক্ষেত্রে আদালতের পণ্ডিত ও মৌলবিদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টি যথাসম্ভব কমিয়ে ফেলে এই শ্রেণিটিকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া।অথচ যে ধর্মশাস্ত্রের ওপর ব্রিটিশরা এত গুরুত্ব আরোপ করে তাকে ‘আইন’-এ পর্যবসিত করে, সেই ধর্মশাস্ত্রগুলি কোনও কালেই হিন্দুদের কাছে ‘আইন’ হিসাবে বিবেচিত হত না। এই গ্রন্থগুলি ছিল মূলত তাদের ‘code of conduct’ বা আদর্শ আচরণবিধির দ্যোতক। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ পাণ্ডুরং বামন কাণে বলেন: “ধর্মশাস্ত্রকাররা ‘ধর্ম’ বলতে কোনও ধর্ম নয়, বরং এমন জীবনযাপন বা আচরণবিধির কথা বলেছেন, যা সমাজের সদস্য হিসাবে একজন ব্যক্তির কর্ম ও ক্রিয়াকলাপকে নিয়ন্ত্রিত করে এবং যাকে মানব অস্তিত্বের লক্ষ বলে মনে করা হয়েছিল, ক্রমান্বয়ে সেখানে পৌঁছতে সক্ষম করে তোলে।” [৬] ফলত স্বাভাবিকভাবেই প্রাক্‌-ঔপনিবেশিক আদালতে ধর্মশাস্ত্রগুলি কোনও দিন আইনের মর্যাদা পায়নি। যদিও ১৭৭৩ সালের অক্টোবরে ভারতবর্ষের প্রথম গভর্নর জেনারেল হওয়ার অব্যবহিত পরে, হেস্টিংস এই উদ্দেশ্যে চালু করেন ‘Regulating Act’ বা নিয়ামক আইন। তারই অনুষঙ্গে সরকারি ব্যয়ে ও হেস্টিংসের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু শাস্ত্রীয় গ্রন্থগুলি থেকে নির্বাচিত অংশের অনুবাদ প্রক্রিয়া জোরকদমে শুরু হয়ে যায়। ইংরেজিতে এই অনুবাদের দায়িত্ব পান ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড। তাঁর সংস্কৃত জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত ছিল। এই কারণে দায়িত্ব পাওয়ার পরে, তিনি বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ১১ জন পণ্ডিতকে— রামগোপাল ন্যায়ালঙ্কার, বীরেশ্বর পঞ্চানন, কৃষ্ণজীবন ন্যায়ালঙ্কার, বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার, কৃপারাম তর্কসিদ্ধান্ত, কৃষ্ণচন্দ্র সার্বভৌম, গৌরীকান্ত তর্কসিদ্ধান্ত, কৃষ্ণকেশব তর্কালঙ্কার, সীতারাম ভট্ট, কালীশঙ্কর বিদ্যাবাগীশ ও শ্যামসুন্দর ন্যায়সিদ্ধান্ত [৭]— এই অনুবাদের কাজে নিয়োগ করেন। পাশাপাশি ঔপনিবেশিক হিন্দু আইনের জন্য সংকলন গ্রন্থটিতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার, অপরিচিত ব্যক্তির সম্পত্তি বিক্রয়, অংশীদারিত্ব, মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার, দত্তকগ্রহণ, জমি চাষে ভাগের পরিমাণ ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির জন্য জরিমানা, ঋণ, দাসত্ব, মানহানি, ব্যভিচার, জালিয়াতি, বিক্রয়কর ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই গ্রন্থটিতে আলোচিত বিষয়গুলির বিস্তৃত পরিসর ইঙ্গিত দেয় যে, সংকলকদের নির্দিষ্ট কোন কোন বিষয়ের উপর মন্তব্য করতে হবে, সে ব্যাপারে হ্যালহেডের তরফে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়। অবশেষে গুপ্তিপাড়ার প্রখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের প্রত্যক্ষ সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে ১৭৭৩-এর মে থেকে এই অনুবাদকর্ম শুরু হয়ে শেষ হয় ১৭৭৫-এর ফেব্রুয়ারি মাসে। সংকলন গ্রন্থটির নাম দেওয়া হয় বিবাদার্ণবসেতু। প্রথমে এই সংকলনটি ফারসিতে অনূদিত হয় ও পরে তাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন স্বয়ং হ্যালহেড। ১৭৭৬ সালে এটি A Code of Gentoo Laws, or, Ordinations of the Pundits নামে প্রকাশিত হয়।এই অনুবাদ প্রসঙ্গে গ্রন্থটির ভূমিকায় হ্যালহেড বলেন: “বর্তমান গ্রন্থটি সংকলনের উদ্দেশ্যে বাংলার প্রতিটি অংশ থেকে এই সমস্ত অভিজ্ঞ আইনজীবীকে নির্বাচন করা হয়। তাঁরা সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন মূল [অংশ] থেকে বাক্য ধরে ধরে বেছে নিয়েছিলেন এবং প্রাচীন পাঠ্যগুলির কোনও অংশ সংযোজন বা বিয়োজন করেননি। পরবর্তীকালে এইভাবে সংগৃহীত [শাস্ত্রীয়] নিবন্ধগুলি তাঁদের নিজস্ব একজন [ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত] পরিদর্শকের অধীনে ফারসি ভাষায় আক্ষরিকভাবে অনুবাদ করা হয়। তারপর সেই ফারসি অনুবাদটির প্রতি যথাযথ বিশ্বস্ততা বজায় রেখে সেটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়।” [৮] লক্ষণীয়, এই উদ্ধৃতিটিতে হ্যালহেড সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের ‘অভিজ্ঞ আইনজীবী’ হিসাবে চিহ্নিত করেন। তবে মূল সংস্কৃত সংকলন থেকে অনুবাদের সময়ে কোনও বিচ্যুতি ঘটেনি বলে হ্যালহেড যতই দাবি করুন না কেন, এই বিষয়ে পরবর্তী আলোচনায় তাঁর তথা শাসকদের দৃষ্টিকোণ ক্রমে প্রকাশিত হবে।আইনটির আওতায় নানাবিধ প্রসঙ্গের অবতারণা করা হলেও এই আইন প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল— ক) বৃহৎ জমিদারদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা ও খ) তদানীন্তন বাংলার একাধিক মহিলা জমিদারদের সম্পত্তি সুকৌশলে হাতিয়ে নেওয়া। পলাশি যুদ্ধে জয়লাভের পর থেকেই কোম্পানি অস্বাভাবিক হারে রাজস্ব আদায় করতে শুরু করে। এই কারণে ১৭৬০ সালে বীরভূমের রাজা আসাদ জামান খান বর্ধমানের রাজার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেন। পরবর্তী কয়েক দশক জুড়ে মেদিনীপুরের রামরাম সিং, ধলভূমের রাজা (১৭৬৯-৭৪), রংপুরের জমিদার (১৭৮৩), বিষ্ণুপুরের জমিদার (১৭৮৯) প্রমুখ ব্রিটিশ শাসকদের তীব্র বিরোধিতা করতে শুরু করেন। [৯] বিদ্রোহী রাজা ও জমিদারদের আয়ত্তে আনতে যে আইনি ছলচাতুরি করা হয়, এই আইনটির সঙ্গে ধর্মশাস্ত্রে বিবৃত বিধির তুলনামূলক আলোচনা করলেই তা স্পষ্ট হবে।সম্পত্তি বিভাজনের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠপুত্রের অগ্রাধিকারের কারণ হিসাবে মনুসংহিতা-র নবম অধ্যায়ে লিখিত আছে:জ্যেষ্ঠেন জাতমাত্রেণ পুত্রীভবতি মানবঃ।পিতৃণামনৃণশ্চৈব স তস্মাৎ সর্ব্বমর্হতি।।যস্মীন্নৃণং সন্নয়তি যেন চানন্তমশ্নুতে।স এব ধর্ম্মজঃ পুত্রঃ কামজানিতরান্‌ বিদুঃ।।পিতেব পালয়েৎ পুত্রান্‌ জ্যেষ্ঠো ভ্রাতন্‌ যবীয়সঃ।পুত্রবচ্চাপি বর্ত্তেরন্‌ জ্যেষ্ঠে ভ্রাতরি ধর্ম্মতঃ।। ৯. ১০৬-০৮(জন্ম হওয়া মাত্রই জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বারা মানব পুত্রবিশিষ্ট হয় এবং [পুন্নাম নরক থেকে নিস্তার পেয়ে] পিতৃঋণমুক্ত হয়। [তাই] জ্যেষ্ঠই পুত্রপদবাচ্য, মধ্যমাদিরা তা নয়, এ কারণে জ্যেষ্ঠ সকল ধনসম্পদ পাওয়ার যোগ্য। যে জ্যেষ্ঠের উৎপত্তিমাত্র পিতা পিতৃঋণ শোধ করেন এবং যার দ্বারা পিতা মোক্ষলাভ করেন, সেই জ্যেষ্ঠকে ধর্মজ সন্তান বলা যায়। যেহেতু কনিষ্ঠ পুত্ররা কামহেতু উৎপন্ন হয়, সেহেতু এদের কামজ সন্তান বলা যায়। অতএব জ্যেষ্ঠ সকল পৈতৃক ধনসম্পদ পাওয়ার যোগ্য। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কনিষ্ঠ ভ্রাতাদের সঙ্গে একত্রে অবস্থান করে পিতা যেমন পুত্রদের প্রতিপালন করেন, তেমনভাবে কনিষ্ঠ ভ্রাতাদের প্রতিপালন করবেন এবং কনিষ্ঠেরা পিতার মতো জ্যেষ্ঠের অনুগত থাকবেন)। [১০]তবে এই শ্লোকত্রয়ের পরবর্তী দুটি শ্লোকে এই ব্যবস্থার সামান্য পরিবর্তন করে মনু জানান:জ্যেষ্ঠস্য বিংশ উদ্ধারঃ সর্ব্বদ্রব্যাচ্য যদ্বরম্‌।ততো[হ]র্দ্ধং মধ্যমস্য স্যাত্ত রীয়ন্তু যবীয়সঃ।।জ্যেষ্ঠশ্চৈব কনিষ্ঠশ্চ সংহরেতাং যথোদিতম্‌।যে[হ]ন্যে জ্যেষ্ঠকনিষ্ঠাভ্যাং তেষাং স্যান্মধ্যমং ধনম্‌।। ৯. ১১২-১৩(যখন সমস্ত ভাই মিলে পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ করবেন, তখন সমস্ত সম্পত্তি বিশ ভাগ করে তার এক ভাগ জ্যেষ্ঠকে দেবেন। মধ্যমকে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ এবং সর্বকনিষ্ঠকে আশি ভাগের এক ভাগ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পত্তি সকলে সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। অন্য ভাইয়েরা মধ্যম ভ্রাতার মতোই চল্লিশ ভাগের এক ভাগ পাবেন)। [১১]এই বিষয়ে স্মৃতিশাস্ত্রের দুই প্রধান ভাষ্যকার— দায়ভাগ-এর জীমূতবাহন এবং মন্বর্থমুক্তাবলী-র কুল্লুকভট্ট— একই কথা বলেন।কিন্তু লোকাচার ও শাস্ত্রব্যাখ্যাকে অমান্য করে আইনে স্পষ্ট বলা হয়: “যদি কোনও ব্যক্তি মারা যায় বা কোনও অপরাধের জন্য তার গোত্র, তার আত্মীয়স্বজন এবং স্বজাতি থেকে বহিষ্কৃত হয় বা তার সমস্ত সম্পত্তি— জমি বা অর্থ বা গবাদি পশু বা পাখি— ত্যাগ করতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে তা [সম্পত্তি] তার পুত্র পাবে; যদি একাধিক পুত্র থাকে তবে তারা সবাই সমান ভাগ পাবে।” [১২] এভাবে প্রথমে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠপুত্রের যে অতিরিক্ত অংশ প্রাপ্য, আইনের সাহায্য নিয়ে তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয় এবং সেই সম্পত্তি সমস্ত পুত্রের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আইনে আরও বলা হয়, একইভাবে পুত্রের অনুপস্থিতিতে পৌত্রদের মধ্যে এবং পৌত্র না থাকলে প্রপৌত্রদের মধ্যে সম্পত্তিটি বিভক্ত করা উচিত। [১৩] এই যুগপৎ আইনি পরিবর্তনের ফলে জমিদারির আয়তন ক্রমশ ছোট হতে শুরু করে। ফলে এক দিকে যেমন কোম্পানির পক্ষে একটি বৃহৎ জমিদারির পরিবর্তে অসংখ্য ক্ষুদ্র জমিদারিগুলিকে শাসন করা সহজ হয়ে যায়, অন্য দিকে তেমনই এই জমিদারিগুলি থেকে রাজস্ব আদায় করার পথটিও সুগম হতে শুরু করে। একই উপায়ে ধূর্ত ইংরেজরা আইনি আবডালের সাহায্যে সম্পত্তির উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গটিকে ক্রমশ পিতৃতান্ত্রিক করে তোলে এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে নারীদের বঞ্চিত করতে শুরু করে। প্রাক্‌-ব্রিটিশ ভারতবর্ষে হিন্দুদের সম্পত্তি বিভাজন ও উত্তরাধিকারের বিষয়ে দুটি টীকাভাষ্য— দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা— মান্য করার চল ছিল। বাংলা ও অসম ছাড়া গোটা দেশে বিজ্ঞানেশ্বর (আনুমানিক ১১০০ সাল)-এর মিতাক্ষরা আইন প্রচলিত থাকলেও বাংলা ও অসমে মূলত বঙ্গীয় নিবন্ধক জীমূতবাহন (আনুমানিক ১১০০-১১৫০ সাল)-এর দায়ভাগ প্রথা চালু ছিল। দায়ভাগের প্রধান তিনটি ভাষ্য হল— জীমূতবাহন-এর দায়ভাগ, রঘুনন্দন-এর দায়তত্ত্ব ও শ্রীকৃষ্ণ তর্কালঙ্কার-এর দায়ক্রমসংগ্রহ। অন্য দিকে, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মিতাক্ষরা চালু থাকলেও সর্বত্র বিজ্ঞানেশ্বর-এর মূল ভাষ্যকে মান্য করা ছাড়াও সর্বমোট চারটি ভিন্ন ধারা ছিল— ১. বীরমিত্রোদয়-এর বেনারস ধারা, ২. বিবাদরত্নাকর, বিবাদচন্দ্র ও বিবাদচিন্তামণি আশ্রিত মিথিলা ধারা, ৩. ব্যবহারমুখ্য, বীরমিত্রোদয় ও নির্ণয়সিন্ধু-র ওপর গুরুত্ব আরোপ করা মহারাষ্ট্র ধারা এবং ৪. স্মৃতিচন্দ্রিকা, ব্যবহারনির্ণয় ও সরস্বতীবিলাস আশ্রিত দ্রাবিড় ধারা। [১৪] অর্থাৎ সারা ভারতবর্ষে সম্পত্তি বিভাজন ও উত্তরাধিকারের বিষয়ে কেবল একটি বিধি বা প্রথা মান্য করার চল ছিল না, বরং অঞ্চলভেদে যথেষ্ট তারতম্য ছিল।সংক্ষেপে দায়ভাগ ও মিতাক্ষরার মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য হল— ক) দায়ভাগ অনুযায়ী কোনও সম্পত্তির অধিকারীর মৃত্যুর পরে কিংবা তিনি যদি সামাজিকভাবে ‘পতিত’ হন বা সন্ন্যাসী হন, কেবল তখনই সেই সম্পত্তির পরবর্তী উত্তরাধিকারীর প্রসঙ্গ উঠতে পারে। কিন্তু মিতাক্ষরা মতে, পুত্র, পৌত্র বা প্রপ্রৌত্র জন্মগতভাবে পিতা বা অন্য পূর্বপুরুষের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার অর্জন করতে পারে। খ) দায়ভাগ অনুসারে পৈতৃক ও স্বোপার্জিত সম্পত্তিতে বাঙালি হিন্দুর সম্পূর্ণ অধিকার আছে এবং তাঁরা তাঁদের ইচ্ছানুসারে সেই সম্পত্তি  দান বা বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু মিতাক্ষরা অনুযায়ী যেহেতু জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই পৈতৃক সম্পত্তিতে পিতার সঙ্গে পুত্রের সমান স্বত্ব জন্মায়, সেহেতু পিতা তাঁর পুত্র ও পৌত্রদের সম্মতি ছাড়া তাঁর সম্পত্তি অবাধে দান বা বিক্রি করতে পারেন না। গ) দায়ভাগ মতে, কেবল পৃথগন্ন পরিবারে নয়, এমনকি অবিভক্ত অর্থাৎ যৌথ পরিবারেও অপুত্রক ব্যক্তির মৃত্যুর পরে, তাঁর বিধবা পত্নী তাঁর স্বামীর বিভক্ত বা অবিভক্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির সমগ্র অংশের মালিকানা লাভ করতে পারেন। তবে তিনি সেই সম্পত্তি অন্য কাউকে দান বা বিক্রি করতে পারেন না। কিন্তু মিতাক্ষরা অনুযায়ী, কোনও অপুত্রক বিধবা তাঁর স্বামীর কেবল বিভক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পরে সেই সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে নয়, তাঁর স্বামীর পরবর্তী উত্তরাধিকারী অর্থাৎ তাঁর ভাইদের কাছে চলে যাবে। আর যৌথ হিন্দু পরিবারের সদস্য হিসাবে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় শুধুমাত্র ভরণপোষণ পেতে পারেন, পরিবারের সম্পত্তিতে তাঁর অন্য কোনও অধিকার নেই। [১৫]তদানীন্তন ভারতবর্ষে, বিশেষত বাংলায়, প্রচলিত ঐতিহ্য ও শাস্ত্র— দু’দিক থেকেই সম্পত্তিতে নারীদের, এমনকি বিধবাদেরও অধিকারের বিষয়টিকে মেনে নেওয়া হয়। এই সময়ে বাংলার যে তিনটি অন্যতম বৃহৎ জমিদারির প্রত্যেকে কোম্পানিকে বছরে ১ লক্ষ পাউন্ডেরও বেশি রাজস্ব দিত, সেই তিনজন জমিদারই ছিলেন মহিলা ও বিধবা। বছরে ৩৫০,০০০ পাউন্ডেরও বেশি রাজস্ব দেওয়া বর্ধমান ছিল তিলকচাঁদের বিধবা পত্নী ও তেজচাঁদের জননী রানি বিষ্ণুকুমারীর শাসনাধীন। ২৬০,০০০ পাউন্ডেরও বেশি বার্ষিক আদায়যুক্ত রাজশাহী শাসন করতেন শ্রদ্ধেয়া রানি ভবানী, যিনি ১৭৪৮ সালে রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পরে রাজশাহীর রাজকার্য পরিচালনার ভার নিজের হাতে নেন। আর কোম্পানিকে বছরে ১৪০,০০০ পাউন্ডেরও বেশি খাজনা দিতেন দিনাজপুরের রাজা বৈদ্যনাথের বিধবা পত্নী রানি সরস্বতী। [১৬]কিন্তু সমসাময়িক ইংল্যান্ডে মহিলাদের সম্পত্তির মালিকানা পাওয়া কিংবা তার পরিচালনা করার অনুমতি ছিল না। ফলত তৎকালীন রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে যুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বর্ধমানের রানি বিষ্ণুকুমারী, নাটোরের রানি ভবানী, দিনাজপুরের রানি সরস্বতী, মহিষাদলের রানি জানকী, তমলুকের রানি কৃষ্ণপ্রিয়া ও সন্তোষপ্রিয়া, কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি কিংবা মেদিনীপুর বা রাজশাহীর একাধিক মহিলা জমিদারদের প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে দাপট ও দক্ষতার বিষয়টিকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিতে পারেনি। দেওয়ানি ব্যবস্থা চালু ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন— এই মধ্যবর্তী টালমাটাল সময়কালে, ব্রিটিশরা তাদের শাসনব্যবস্থাকে সুসংহত ও শক্তিশালী করে তোলার জন্য বাংলার বিদ্রোহী রাজা ও জমিদারদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে দ্বিধা করেনি। কিন্তু রাজস্ব প্রদানকারী বাংলার মহিলা জমিদারদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে তাঁদের আয়ত্তে আনা শাসকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই সম্পত্তির অধিকার থেকে মহিলাদের সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করার জন্য, তারা অস্ত্রের পরিবর্তে আইনের সাহায্য নিয়ে নারীদের সম্পত্তিগুলিকে পুরুষদের হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করে।এই বক্তব্যের সমর্থনে কেবল তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে। প্রথমত, মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে, এই আইন তৈরি করার সময়ে ব্রিটিশরা ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রের মূল দুটি শাখা—মিতাক্ষরা ও দায়ভাগ— সম্পর্কে চূড়ান্ত ঔদাসীন্য প্রকাশ করে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, বাংলাতে প্রচলিত দায়ভাগ অনুযায়ী কেবল পৃথগন্ন পরিবারেই নয়, যৌথ পরিবারেও অপুত্রক ব্যক্তির মৃত্যুর পরে তাঁর বিধবা পত্নী তাঁর স্বামীর সম্পত্তির সমগ্র অংশের মালিকানা লাভ করতেন। শুধু তাই নয়, দায়ভাগ অনুসারে পিতার মৃত্যুর পরে পিতৃসম্পত্তির বিষয়ে অবিবাহিতা কন্যারাও পুত্রদের সঙ্গে সমান অংশের অধিকারী ছিল। কিন্তু এই প্রচলিত ঐতিহ্যকে মান্য করার বিষয়ে শাসকদের তীব্র অনিচ্ছার কারণেই বিবাদার্ণবসেতু সংকলনের সঙ্গে জড়িত ১১ জন বাঙালি পণ্ডিত বাংলায় প্রচলিত দায়ভাগ ব্যবস্থা সম্পর্কে নীরব থাকতে বাধ্য হন। ফলে বাংলার বিধবারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করেন।দ্বিতীয়ত, এই আইনটিতে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বিভাজনের বিষয়ে একটি সূক্ষ্ম অথচ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন করা হয়। দায়ভাগ অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির কোনও পুত্র, পৌত্র বা প্রপৌত্রের অবর্তমানে উক্ত ব্যক্তির বিধবা স্ত্রী সেই সম্পত্তির পরবর্তী উত্তরাধিকারী হতেন। কিন্তু হ্যালহেডের আইনটিতে এই বিষয়ে মৃত ব্যক্তির দত্তক পুত্রের উল্লেখ করে বলা হয়: “যদি কোনও ব্যক্তির পুত্র, পৌত্র বা প্রপৌত্র না থাকে, তাহলে তার সমস্ত সম্পত্তি তার দত্তক পুত্র পাবে। যদি কোনও দত্তক পুত্র না থাকে, তবে তা দত্তক পুত্রের পুত্র পাবে। যদি কোনও দত্তক পুত্রের পুত্র না থাকে, তবে তা দত্তক পুত্রের পৌত্র পাবে।” [১৭] এ কথা সত্যি যে, বাংলায় একজন পুরুষ উত্তরাধিকারীর অনুপস্থিতিতে সম্পত্তি সংরক্ষণের জন্য দত্তক পুত্র নেওয়ার প্রথা চালু ছিল। বিশেষত বিধবারা পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যদের থেকে তাঁদের অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য পুত্রদের দত্তক নিতেন। উদাহরণস্বরূপ, অপুত্রক রানি ভবানী শেষ জীবনে দত্তক পুত্রের হাতে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব সঁপে দেন কিংবা অপুত্রক রানি সরস্বতী রাধানাথকে দত্তক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। কিন্তু এই প্রথার মাধ্যমে সম্পত্তি তাঁদের হাতেই থাকত, পরিবারের অন্যদের কাছে যেত না। আরও আশ্চর্যের কথা এই, মূল সংকলন গ্রন্থ বিবাদার্ণবসেতু-তে দত্তক গ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনাও করা হয়নি। এটি শুধুমাত্র বিবিধ বিভাগে শেষের দিকে দায়সারাভাবে উল্লিখিত হয়। [১৮] কাজেই অনুবাদের সময় হ্যালহেড যে এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনটি করেন, তা স্পষ্ট বোঝা যায়।শুধু তাই নয়, মনুসংহিতা-র নবম অধ্যায়ের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে:ঊর্দ্ধং পিতুশ্চ মাতুশ্চ সমেত্য ভ্রাতরঃ সমম্‌।ভজেরন্‌ পৈতৃকং রিকথ্‌মনীশাস্তে হি জীবতোঃ।। ৯. ১০৪(পিতা ও মাতার মৃত্যুর পরে ভ্রাতৃগণ মিলিত হয়ে পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ করবে; কারণ তাঁরা জীবিত থাকতে পুত্রগণ [সম্পত্তির] অধিকারী নয়)। [১৯] অথচ আইনে লেখা হয়: “If a Man, having a Wife, and Sons born from that Wife, dies, … so long as that Wife lives, it is not a right and decent Custom, that those Sons should share, and receive among themselves the Property left by that Person; if the Wife aforesaid gives them Instructions accordingly, then the Sons have Authority to divide it: At the Time of Division, if the Wife is desirous to receive a Share, she shall take One Share, at the Rate of the Share of One Son….” [২০] অর্থাৎ পিতার মৃত্যুর পরে, মাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভাগ করা ‘যথাযথ ও শালীন’ প্রথা নয়। তবে ‘তিনি যদি সেই বিষয়ে নির্দেশ দেন তবে পুত্রদের সম্পত্তি ভাগ করার অধিকার আছে’ এবং ‘স্ত্রী যদি অংশীদার হতে আগ্রহী হন, তবেই তিনি তার ছেলের সঙ্গে সমান অংশ পাবেন’। ঔপনিবেশিক শাসকদের বদান্যতায়, প্রথমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারীরূপে দত্তক পুত্রের উল্লেখ করে এবং পরে বিধবা স্ত্রীর জীবদ্দশাতেই সেই সম্পত্তি ভাগ করার আইনি অনুমতি প্রদান করে, বিধবাদের আর্থিক দিক থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার পিতৃতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি সমাজে ক্রমশ জাঁকিয়ে বসে।তৃতীয়ত, এই বিষয়ে স্ত্রীধনের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করে আইনটিতে সম্ভবত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটানো হয়। ‘স্ত্রীধন’ হল মহিলাদের একচেটিয়া সম্পত্তি যা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যথা বিবাহের আগে ও পরে পিতামাতা, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, নিকটাত্মীয়, বন্ধুবান্ধব প্রমুখ মহিলাদের দান করেন। মনুসংহিতা-র নবম অধ্যায়ের ১৯৪ সংখ্যক শ্লোকে ‘স্ত্রীধন’ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিয়ে মনু বলেছেন:অধ্যগ্ন্যধ্যাবাহনিকং দত্তঞ্চ প্রীতিকর্ম্মণি।ভ্রাতৃমাতৃপিতৃপ্রাপ্তং ষড়্‌বিধং স্ত্রীধনং স্মৃতম্‌।।(স্ত্রীধন [অন্ততপক্ষে] ছ’টি সূত্রে অর্জিত হতে পারে— অধ্যগ্নি (বিবাহের সময়ে পিত্রাদিদত্ত ধন), অধ্যাবাহনিক (পিতৃগৃহ থেকে স্বামীগৃহ গমনের সময় স্ত্রীর লব্ধ ধন), প্রীতিদত্ত (বিবাহের সময়ে ও পরে স্বামী ও অন্যদের দেওয়া নানা উপহার) এবং যে কোনও সময়ে ভ্রাতৃদত্ত, মাতৃদত্ত ও পিতৃদত্ত উপহার)। [২১] এই স্ত্রীধন নারীরা আমৃত্যু তাঁদের নিজস্ব সম্পদরূপে রেখে দিতে পারতেন। কেবল মাতার মৃত্যুর পরেই তাঁর পুত্রকন্যারা সেই স্ত্রীধনের উত্তরাধিকারী হতে পারত। এই কারণে স্ত্রীধনই ছিল বিধবাদের রক্ষাকবচ।স্বামীর মৃতুর পরে বিধবাদের আর্থিক দুর্দশা লাঘবের জন্য মনু যে বিধান দিয়েছিলেন, তা হল:পত্যৌ জীবতি যঃ স্ত্রীভিরলঙ্কারো ধৃতো ভবেৎ।ন তং ভজেরন্‌ দায়াদা ভজমানাঃ পতন্তি তে।। ৯. ২০০(পতির জীবদ্দশায় স্ত্রী তাঁর অনুমতিতে যে অলংকার ধারণ করবেন, স্বামীর মৃত্যুর পরে তা উত্তরাধিকারীরা ভাগ করতে পারবে না। করলে তারা পতিত হবে)। [২২] কিন্তু হ্যালহেডের আইনে বলা হয়: “WHATEVER Woman be of a Disposition altogether malevolent, or wanting in female Modesty, or careless of her Property, or unchaste, such Woman is incapable of possessing what has been specified to be a Woman’s Property.” [২৩] এভাবেই আইনে বিধবাদের ‘শালীনতা’ ও ‘সতীত্ব’ রক্ষা করার নিখাদ পিতৃতান্ত্রিক অছিলায় সম্পত্তির ক্ষেত্রে মহিলাদের বঞ্চিত করার প্রথা শুরু হয়। [লেখাটির তৃতীয় পর্বে এই বিষয়ে উদাহরণ সহযোগে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।]একই কারণে এই ঔপনিবেশিক আইনে সতীপ্রথার ওপর অভূতপূর্ব গুরুত্ব আরোপ করে লেখা হয়: “স্বামীর মৃত্যুর পরে তার মৃতদেহের সঙ্গে তার স্ত্রীর আগুনে আত্মাহুতি দেওয়াই যথাযথ। প্রত্যেক স্ত্রী, যে এভাবে [আগুনে] আত্মাহুতি দেবে, সে তার সৌভাগ্যের জন্য স্বামীর সঙ্গে সাড়ে তিন কোটি বছর স্বর্গে থাকবে। যদি সে আত্মাহুতি না দিতে পারে, সেক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই অলঙ্ঘনীয় সতীত্ব রক্ষা করতে হবে। যদি সে সর্বদা সতীত্ব বজায় রাখতে পারে, তবে সে [মৃত্যুর পরে] স্বর্গবাসী হবে; আর যদি সতীত্ব রক্ষা না করে, তবে সে নরকে যাবে।” [২৪] হ্যালহেডের আইনটির মাধ্যমে বিধবাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এবং ‘সতীত্ব’ বজায় রেখে জীবনযাপন করার যে প্রথা চালু হয়, তার রেশ ঔপনিবেশিক শাসনপর্বের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় থাকে।হ্যালহেডের আগে পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিবাদার্ণবসেতু নামে ধর্মশাস্ত্রের কোনও ভাষ্য বা নিবন্ধের অস্তিত্বই ছিল না। ব্রিটিশ শাসকদের বদৌলত এই অর্বাচীন ও অকিঞ্চিৎকর সংকলন গ্রন্থটিই শেষ পর্যন্ত আইনি কেতাবে পরিণত হয়। শুধু হিন্দুরাই নয়, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের উপজাতি সম্প্রদায় সমেত শিখ, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মানুষরাও তার আওতাভুক্ত হতে বাধ্য হন। হেস্টিংস-হ্যালহেড জুটি সচেতনভাবে ভারতবর্ষের মাটিতে যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেন, পরবর্তীকালে কর্নওয়ালিস-জোন্স জুটি তাকে সযত্নে লালন করে আরও পুষ্ট করে তুলবেন। নারীদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে ভুলক্রমে যতটুকু ফাঁক রেখে যাবেন হ্যালহেড, পরবর্তী আইনটিতে তাঁর অনুগত শিষ্য জোন্স সেটুকুও ভরাট করে দিয়ে শাসকের পরম প্রার্থিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরবেন। তাঁর দৌলতে মনুসংহিতা  হয়ে উঠবে হিন্দুদের সবচেয়ে ‘প্রাচীন’ ও ‘প্রামাণ্য’ আইনগ্রন্থ।*****************************************************************উল্লেখপঞ্জি:১. N. K. Sinha, The Economic History of Bengal: From Plassey to the Permanent Settlement, Vol. II, Calcutta, 1960, p. 191২. Raghunandana Bhattacharyya, Vyavaharatattva, L.N. Sharma (ed.), Calcutta, 1829, p. 225; উদ্ধৃত Nandini Bhattacharyya-Panda, Appropriation and Invention of Tradition: The East India Company and Hindu Law in Early Colonial Bengal, New Delhi, 2008, p. 21৩. Luke Scrafton, Reflection on the Government of Indostan, with a Short Sketch of the History of Bengal from 1739-1756 and an Account of the English Affairs to 1758, London, 1770, pp. 4-5৪. Alexander Dow, The History of Hindostan, Vol. III, London, 1770, p. lxxiii৫. Proceedings of the Committee of Circuit, 15 August 1772, p. 26; উদ্ধৃত Nandini Bhattacharyya-Panda, Appropriation and Invention of Tradition: The East India Company and Hindu Law in Early Colonial Bengal, p. 76৬. Pandurang Vaman Kane, History of Dharmasastra: Ancient and Mediaeval Religious and Civil Law, Vol. II, Pt. 1, Poona, 1941, p. 2৭. ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পাদিত), সংবাদপত্রে সেকালের কথা, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৩০-১৮৪০, পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, ষষ্ঠ মুদ্রণ, কলিকাতা, ১৪২৫, পৃ. ৭১৮৮. N. B. Halhed, A Code of Gentoo Laws, or, Ordinations of the Pundits, London, 1776, pp. x-xi; এরপর কেবল A Code of Gentoo Laws লেখা হবে।৯. Sashi Bhusan Chaudhuri, Civil Disturbance during the British Rule in India (1765-1857), Calcutta, 1955, pp. 54-67১০. ভরতচন্দ্র শিরোমণি, মনুসংহিতা, মেধাতিথি ও কুল্লুকভট্টের ভাষ্য সংবলিত চতুর্থ সংস্করণ, কলকাতা, ১৩৩৬, পৃ. ৭৮৯১১. তদেব, পৃ. ৭৯১-৯২১২. N. B. Halhed, A Code of Gentoo Laws, Chapter II, Sect. I, p. 29১৩. তদেব১৪. Pandurang Vaman Kane, History of Dharmasastra: Ancient and Mediaeval Religious and Civil Law, Vol. III, Second Edition, 1973, pp. 544-45১৫. তদেব, পৃ. ৫৫৮-৫৯১৬. Romesh Dutt, The Economic History of India under Early British Rule, London, Second Edition, 1906, p. 61১৭. N. B. Halhed, A Code of Gentoo Laws, Chapter II, Sect. I, p. 30১৮. Nandini Bhattacharyya-Panda, Appropriation and Invention of Tradition: The East India Company and Hindu Law in Early Colonial Bengal, p. 112১৯. ভরতচন্দ্র শিরোমণি, মনুসংহিতা, পৃ. ৭৮৮২০. N. B. Halhed, A Code of Gentoo Laws, Chapter II, Sect. XII, p. 86২১. ভরতচন্দ্র শিরোমণি, মনুসংহিতা, পৃ. ৭৮৮২২. তদেব, পৃ. ৮২২২৩. N. B. Halhed, A Code of Gentoo Laws, Chapter II, Sect. III, p. 44২৪. তদেব, অধ্যায় ২০, পৃ. ২৮৬ 
    যোগীনদাদা এখন - শেখরনাথ মুখোপাধ্যায় | সে ছিল এক অন্যরকমের সময়। কোথায় পাখতুনখোয়ার ডেরাস্মাইল খাঁয়ের গাঁ, আর কোথায় ছন্দৌসির গাড়িতে সরহরোয়া বুলন্দশর ফিরোজাবাদ পেরিয়ে হাৎরাস জংশনে খালি-গায়ে হাওয়া লাগাতে লাগাতে ঠোঙায়-ভরা পকৌড়ি আর মটরভাজাসহ চায়ের সঙ্গে পাঁউরুটি দংশন করতে করতে কার হাতে পড়ে – রাজপুত্র না খোদ রাজাসাহেব? – তা বুঝতে-না-বুঝতেই স্বপ্নটা কেমন জানি ঘুলিয়ে গেল! ঘুম ভাঙতে বোঝা গেল, রাজপুত্র তো নয়ই, এমনকি দেবপুত্রও নয়! দেবতা স্বয়ং! খোদ নারায়ণ! নারায়ণ এক্কেবারে! সাকার!! আর ওই জৌনপুর-মৈনপুরী-ভুলগাড়ী সব মিলিয়ে যে রাজ্য তার মালিক তো এখন খোদ যোগীন দাদাই। যোগীরাজ্য!ভুলগাড়ীতে উনিশ বছরের যে-মেয়ের ধর্ষণের পর তার মরদেহটি কোন সরকারি ময়নাতদন্ত ছাড়াই সৎকার করে দেওয়া হয়েছিল – সরকারি অর্থব্যয়ে এবং উদ্যোগে – সে ছিল দলিত বাবা-মায়ের সন্তান। আহা, দলিতদের জন্যে এইটুকু অনুদানও না দিয়ে কি থাকতে পারেন যোগীনদাদা? আর বিশ্বহরি নারায়ণ সাকারের সৎসঙ্গে উৎসর্গ হল তিন-অঙ্কের যে মানবসন্তান ক'টি, তারা প্রায় সবাই-ই তো অন্তত দলিতসন্তান বটেই! (মানবসন্তান যদি পুরোপুরি না-ও হয়ে থাকে!)!মৈনপুরী তো প্রায় ঢিল-ছোঁড়া দূরত্ব! বাবার আশ্রম সেখানেই। সেই সাকার বাবা, যিনি চাকরি এবং পুলিশি ধরাচুড়ো বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে দেবার সময়েই স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলেন, দেবতাদের ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করতে যেও না বাবারা। মানুষের বেলায় যা অন্যায়, দেবতার বেলায় তা অন্যায় তো না-ই হতে পারে! দেখলি না ক্ষুদ্র মানবকরা, এবারের নির্বাচনের প্রচারে যখন বোকা-বোকা লোকরা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের বাছাই-করা অংশগুলোকে মিথ্যাভাষণ বলে তড়পাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই প্রধানমন্ত্রী যে আসলে জৈব অর্থাৎ বায়োলজিকাল ন'ন, সে কথাটা ঘোষণা করে দিলেন; ফাঁস করে দিলেন যে তিনি দেবতা স্বয়ং! এবং দোষেগুণে সাকার!! অতএব, মিথ্যাভাষণের ঊর্ধ্বে!আহা, ফিরে আসি হাৎরাসে। এ যোগীনদাদা সে যোগীনদাদা নয়। শোনা যাচ্ছে যোগীরাজ্যের যোগীনদাদা এখনও হাৎরাসে গিয়ে উঠতে পারেননি। এমনকি, একটা এফ-আই-আরও হয়নি সাকারবাবার নামে। ভালোই। রেগেমেগে শেষ পর্যন্ত পৌঁছতেনও যদি দাদা (যোগীন অর্থাৎ যোগীরা বাবাও আবার দাদাও), তাহলে আবার অনত্থ হয়ে যেতে পারত, তাই না? যোগীনদাদা শুনেছি আজকাল বুলডোজার ছাড়া আর কিছু চড়েনই না!
  • জনতার খেরোর খাতা...
    হারিয়ে যাওয়া মানুষ রহিত বসু - Eman Bhasha | আজ সাংবাদিক রহিত বসুর চলে যাওয়ার দিন। একটা লেখাও রহিতদাইমানুল হকদর্দ সে মেরা দামন ভর দে২০১৮-র ২২ জুলাইয়ে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া এই গানটি পোস্ট করেন।  রহিতদা, তখন কি তুমি জানতে, আর দু'বছর পর তুমি আর শারীরিকভাবে থাকবে না, এই দুনিয়ায়।তোমার কলম আর পড়তে পাবে না অনুরাগী পাঠকেরা!রহিতদার সঙ্গে তর্ক হয়েছে। কিন্তু আঘাতহীন।কেউ কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলি নি।যদিও মধ্যবিত্তের নিয়ম অনুযায়ী হওয়ার কথা। একে অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া যখন দস্তুর।রহিতদার সঙ্গে আমার আলাপ ১৯৯৫ এ। আনন্দবাজার পত্রিকায় নাম দেখেছি। আলাপ হয় নি। কিন্তু তাঁকে প্রতিদিন রাত আটটা থেকে নয়টার সময় আজকাল অফিসে একবার আলোচনা হবেই। তুলবেন গৌতম রায়। রহিত কাল কী লিখবে বলো তো? আচ্ছা, ও এই খবরটা নিশ্চয়ই পাবে না! কিংবা কাল সকালে একটা থাপ্পড় ঠিক মারবে রহিত। তারপর ঝাড় কে আটকায়।বসে থেকো না, ফোন ঘোরাও।রহিতদা কলকাতায় সাংবাদিক জীবনে এলো অ-দেখা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে। বাম বিটের নামী সাংবাদিক তখন রহিত বসু। ওকে বিট 'করা'টাই লক্ষ্য হয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গেসিপিএমের ভিতরের খবর করায় তখন রহিত বসু একনম্বর নাম।এইসময় আমি যোগ দিলাম 'আজকাল'-এ।বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদের 'সত্যবাবু মারা গেছেন' পড়ে আমি একটি কাগজে কাজ করতে যাই, পিছনের পকেটে পদত্যাগপত্র ভরে। একদিন রাগের মাথায় দুম করে চাকরি ছেড়ে দিলাম। দু মাস বইমেলা  প্রেম  ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলন জয়দেব মেলা শান্তিনিকেতনইত্যাদি করে কাটলো। এবার জমানো টাকা শেষ। চাকরি খুঁজছি। সংবাদপত্রেই। কিন্তু ডেস্কে কাজ করতে চাই। রিপোর্টিংয়ে নয়। সিপিএমের ভিতরের খবর করতে চাই না বলে। ১৯৯৫এর  মার্চের শুরুতে কিন্তু সে-কাজই করতে হলো। সিপিএমের রাজ্য সম্মেলন সে-বার যাদবপুর স্টেডিয়ামে।  সম্মেলনের প্রথম দিন হাতে এসে গেলো সম্মেলনের প্রতিবেদন। গৌতমদা শুনে বললেন, রহিত এতোটা পারবে কি?পরদিন 'আজকাল'এর প্রথম পাতা, পাঁচের পাতা জুড়ে সিপিএমের প্রতিবেদন আর প্রতিবেদন। আমার নাম কাগজে গেলো না। আমার প্রচণ্ড সংকোচ। সিপিএমের বহু নেতা আমাকে ভালোবাসেন। এই খবর আমি করেছি, যদি দেখেন। আমার সামনে বিশেষ করে বিমান বসুর মুখ। নাম এইভাবে পাঁচদিন বের হল না। আমার নাম গেল না তো দেবাশিস ভট্টাচার্য গৌতম রায় শুভাশিস মৈত্র-- এইসব বাঘা সাংবাদিকদের কারো নাম গেল না। শেষে ১২ মার্চ সিপিএম সম্মেলনে পুঁজিপতি প্রতিনিধি এই শিরোনামে এক সংবাদে আমার ও গৌতম রায়ের নাম বের হল।ইতিমধ্যে রহিতদার খবর বের হচ্ছে। রহিতদার রাজনৈতিক বুদ্ধি ছিল প্রখর। ভালো খবর রহিতদাও করছেন। কিন্তু ফোন ভরসা। রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন এমন প্রমাণ নেই।সে-সময় সিপিএমের প্রতিবেদন ছাপাকে বিরাট বড়ো খবর ভাবা হতো। আজ বুঝি কতো হাস্যকর ছিল।এর কদিন পরেই রহিতদা একটা গোপন খবর করে বোমা ফাটালেন।আমরা পড়লাম সমস্যায়। মিস হলো কী করে? আরো সংযোগ ও মনোযোগ বাড়াতে হবে।রহিতদার সঙ্গে এর কদিন পরেই দেখা হল। গৌতম রায় আলাপ করিয়ে দিলেন। সুদর্শন বুদ্ধিদীপ্ত মুখ। ব্যঙ্গ বিদ্রূপ বা তাচ্ছিল্যের লুকানো হাসি নেই। বছরখানেক পরে পেশা ছেড়ে  কলেজে পড়াচ্ছি। প্রাথমিকে ইংরেজি ফেরানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। কিন্তু পয়সা না নিয়ে বিনা বেতনে 'আজকাল' এ খবরও করে দিই। পবিত্র সরকার কমিটি করেছে সরকার। সবাই জানেন, পবিত্র সরকার সরকারি ইচ্ছেয় শিলমোহর দেবেন। কিন্তু কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় কোন ক্লাস থেকে? এ-নিয়ে প্রবল কৌতুহল।এর আগে ১৯৯৮-এ আনন্দবাজার পত্রিকা আমাদের আন্দোলনের খবর বহু করেছে। সবই বিরুদ্ধে খবর। আমার বা ভাষা ও চেতনা সমিতির নাম নেই। বিমান বসুর স্নেহধন্য আন্দোলন গোছের কথা ঠারেঠোরে আছে। আমিও লেগে আছি পবিত্র সরকার কমিটির রিপোর্ট জোগাড়ে। পবিত্র সরকার কমিটির রিপোর্ট আমার হাতে এসে গেলো। 'আজকাল'-এ বের হলো। সেদিন সন্ধ্যায় আনন্দবাজার পত্রিকা দপ্তর গেছি। তখন এতো নিয়মকানুন ছিল না। রহিত দার কাছে। রহিতদাই মেতে বলেছিলেন, কথা বলবেন বলে। আমরা তখন বাংলা বন্ধ ডাকার কথা ভাবছি। আমাকে আনন্দবাজার পত্রিকার দপ্তরছ দেখে এক রিপোর্টার ব্যঙ্গ করে বললেন, 'আজকালে' পবিত্র সরকার কমিটির রিপোর্ট ফাঁস করে আনন্দবাজার এসেছে।রহিতদার মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। রহিত বসু আমাকে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ঘরে নিয়ে গিয়ে আলাপ করিয়ে দিলেন।'আজকাল'-এ কাজ করার সময় ফোনে কথা হতো। গৌতম রায় তো মাঝেমাঝেই ফোন করে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলতেন, রহিত বেশি ডোবাস না ভাই দাদাকে।রহিতদা হাসতেন।এরপর রহিতদা আনন্দবাজার ছেড়ে 'খাসখবর'-এ যোগ দিলেন। সবাই অবাক। আমিও। আনন্দবাজার পত্রিকার তুখোড় সাংবাদিক। ছেড়ে দেয় কেউ? দেখা করতে গেলাম।  আমার যা স্বভাব উপযাচক হয়ে বললাম, রহিতদা ঠিক হল না মনে হচ্ছে গো!বললেন, ভাই ডবল মাইনে। আর এই জগৎটা নতুন। দেখি না। শিখি।রহিত বসু ভালো ছাত্র নেতা ছিলেন। ভালো ছাত্র। পিএইচডি করেছেন বিজ্ঞানে। অনায়াসে অধ্যাপনা করতে পারতেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে। করেন নি। ঝুঁকিপূর্ণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন।এরপর আবার  'খাস খবর' ছাড়লেন। খাস খবরে থাকাকালীন একটা বড়ো ঘটনা ঘটল। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের অধ্যাপক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু পুলিশ অফিসিয়ালি স্বীকার করছে না। রাত ১১ টা নাগাদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আত্মীয় লেখক অধ্যাপক সুবক্তা জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় ফোন করলেন। বললেন, আমার খুব প্রিয় কৌশিক। কোনো খবর পাচ্ছি না। মেরে না ফেলে। পুলিশ তো আজ ভোরে তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু স্বীকার করছে না। রহিত চেষ্টা করছে। তুমিও করো। এরপরেই রহিতদার ফোন, তুমি একটু খোঁজ নেবে। আমার কাছেই থাকে। দুজনকে তুলে নিয়ে গেছে। পুলিশ স্বীকার করছে না। বললাম, খবর করে দাও। বলল, বোঝো তো এই চ্যানেলে একটু সমস্যা। আর হলেও এখন তো খবর যাবে না, পুলিশ স্বীকার না করলে। তখন তো সারাদিন খবর নয়। বাঁধা সময়ে খবর। যতদূর মনে পড়ে, দিনে দুবার। মালিকের সঙ্গে সরকারের ভালো যোগাযোগ।আমি অনেক চেষ্টা করে জানতে পারলাম, অর্জুনপুর ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। প্রচণ্ড পেটানো হচ্ছে। এক আই পি এসের নেতৃত্বে। এই অফিসার অকালে মারা গেছেন বছরখানেক আগে‌। জানলাম, কাল সকাল ১০ টায় মেদিনীপুর নিয়ে যাবে।  অনেক সাংবাদিককে বললাম। কেউ খবর করতে রাজি হলো না। প্রতিদিনের সুতীর্থ চক্রবর্তী আর টেলিগ্রাফের মিতা মুখোপাধ্যায় করলেন, আমার নামে কিন্তু বিবৃতি যাবে। বন্দিমুক্তি কমিটি সদ্য গড়া হয়েছে। আমার আর প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যৌথ বিবৃতিতে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের মুক্তি দাবি করে খবর হলো।পরে রহিতদা জানালেন, কৌশিকের সঙ্গে তুলে নিয়ে যাওয়া অভিজিতের দেহ রেললাইনে পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, আত্মহত্যা। পরদিন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অরুণ মাজি মেদিনীপুর কোর্টে কৌশিকের পক্ষে হাজির হলেন। অরুণদা ঘটনাচক্রে সেদিন মেদিনীপুরে ছিলেন। আমার মুখে শুনে যোগ দেন।এরপর রহিতদা যোগ দিলেন আজকের কলমে। তৈরি করলেন, মূল্যায়ন পত্রিকা। তার আগে একটি পাক্ষিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। নাম মনে পড়ছে না।সরস্বতী পূজার আগে ব্রহ্মা ও সরস্বতীর সম্পর্ক নিয়ে প্রচ্ছদ নিবন্ধ করে হইহই ফেলে দিলেন। আজকে হলে মেরেই ফেলতো।'আজকের কলম' এ লিখতে বললেন। আমি কুড়ে লোক লেখায়। হল তেমন হলো না। জ্যোতি বসু নিয়ে লিখেছি। পরে আবার লিখলাম,  মূল্যায়নে। ত্রয়ণের সঙ্গে সেই যোগাযোগ। রহিতদা এরপর উত্তরবঙ্গ চলে গেলেন। মাঝে কিছু দিন মুম্বাইয়ে। মেয়ের কাছে। রহিতদার লেখাগুলো পড়তাম। সবসময় মতে মিলতো না। সে-নিয়ে কথা হতো। একবার ফেসবুকে ২০১৬-তে আমি সিপিএমের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের  অবস্থান নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। রহিতদা ফেসবুকে লিখলেন, এগুলো লিখো না। ফোনে বললেন, বিমানদা ও অন্য নেতাদের সঙ্গে তোমার ভালো সম্পর্ক কথা বলো। আমি আর সে-সময় লিখলাম না।#রহিত বসু চলে গেলেন অকস্মাৎ।শুনে কদিন ভালো করে ঘুমাতে পারি নি। বৌদিকে চিনি রহিতদাকে চেনার আগেই। 'গণশক্তি'তে ছিলেন।অত্যন্ত ভদ্র জুটি।রহিতদা নেই আজো বিশ্বাস হচ্ছে না।সেই হাস্যোজ্বল স্নিগ্ধ ঈর্ষাহীন‌ বিদ্বেষহীন নিরহংকার শীলিত শাণিত বুদ্ধিদীপ্ত মুখ।রহিতদা দেখা নিশ্চিত হবে।আড্ডা দেবো।তোমার আমার জিজ্ঞাসা মেলাবো-- বামপন্থীরা কি আর পুরানো শক্তি ফিরে পাবে না?
    হেদুয়ার ধারে - ১৬০  - Anjan Banerjee |       ঘরটায় মনে হচ্ছে অনেকদিন ঝাঁট পড়েনি । দেয়ালের এ কোণে ও কোণে ঝুল জমেছে । ঘরে কয়েকটা চেয়ার আর একটা মাঝারি সাইজের টেবিল আছে । একপাশে একটা ক্যাম্বিশের খাট কাত করে রাখা আছে ।মজিদ আর বাবলু রাত ন'টা নাগাদ ঢুকে দেখল মনোরঞ্জনবাবু একটা চেয়ারে বসে সিগারেট টানছেন । ঘরে একটা ষাট পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে।      মনোরঞ্জন বললেন, ' হুঁ ... আয় আয় ... পকেটে মেশিন টেশিন নেই তো ... ওসব দরকার হবে না ... আমি নিরামিষ  খাই ... '----- ' সে জানি মোনাদা ... আমরাও এখনও পর্যন্ত  মেশিন হাতে তুলতে পারিনি । তাই ওসব চিন্তা বাদ দাও।  কাজের কথায় এস । এই ঘরটা কার ? '----- ' বাবার ঘর । না না রাজনীতির বাবা না ... 'মোনাবাবু সিগারেটের শেষ টানটা মেরে টুকরোটা ঘরের মধ্যেই ফেলে চটি পরা পা দিয়ে ঘষে দিলেন। এই  ঘষে দেওয়াটা বাবলুর চোখে যেন বেশি জোরাল মনে হল ।মনোরঞ্জন বললেন, ' ... নে, ওই চেয়ার দুটো একটু ঝেড়েঝুড়ে বস ... 'ওরা ঝেড়েঝুড়ে , ফুঁ দিয়ে বসল ।মজিদ বলল , ' একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে । হাতে সময় কম । রাত বাড়ছে ... কি বলবে বল ... 'মোনা মজুমদার ঠোঁটের কোণে একটা অভিবাবকসুলভ  হাসি ঝুলিয়ে বাবলুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাবলু বলল, ' কি হল ... '----- ' তোরা এ ক'দিনে বেশ তৈরি হয়ে গেছিস কিন্তু  ... '----- ' তাই  ? '---- ' কথাও শিখে গেছিস অনেক  ... '---- ' তাই  ... তাই  ? '---- ' দেখে ভাল লাগছে ... মানে, বুকে বল পাচ্ছি ...'---- ' সে যদি বল ,  তুমি তো এমনিতেই গাছপাকা।  সাগরদার সুবিধেই হবে , আর জাগ দেবার দরকার হবে না ... ' মজিদ বলল ।----- ' বলছিস ? '----- ' তবে না তো কি ? আমরা কি তোমায় চিনি না নাকি ? '----- ' হমম্ ... '----- ' সন্তোষদার সঙ্গে দেখা করে নেবে নাকি এখনই ? কাজটা মিটে যায় তালে ... তারপর না হয় ... '----- ' সন্তোষ কোথায় ? ' ---- ' বাইরে আছে । হাজার হোক ভদ্রতার তো  একটা ব্যাপার আছে ... তুমি পারমিশন দিলে ভিতরে ডাকতে পারি ...অভদ্রতা করাটা ঠিক না ...'মনোরঞ্জন এবার হেসে ফেললেন ।----- ' কি হল ? ' বাবলু বলল ।----- ' নাঃ ... তোরা সত্যিই অনেক কথা শিখে গেছিস... কচি বলদ ... তোদের হবে হবে ...  ডাক , সন্তোষকে ডাক ...'         সন্তোষ আদৌ কোন গৌরচন্দ্রিকা করল না । বলল, ' আপনার সঙ্গে আগে পরিচয় হয়নি । যাক , এখন তো হল । আশা করি আপনি মনস্থির করে নিয়েছেন ... 'মনোরঞ্জন মজুমদার কোন দিক দিয়েই ছেলেমানুষ নন , যথেষ্ট পোড় খাওয়া এবং পরিপক্ক। তিনি ধানাই পানাই করাও পছন্দ করেন না । বললেন, ' তা বলতে পার । এ নিয়ে আগেও  চিন্তা করেছি । সত্যি কথা বলতে কি , সাহস পাইনি ... এখন তোমাদের দেখে ভরসা পাচ্ছি । সাগরের সঙ্গে কথা বলতে চাই।  সাগর আমাকে ভালভাবে  চেনে ... '----- ' হ্যাঁ নিশ্চয়ই .... কথা তো সাগরদার সঙ্গেই বলবেন ... আমি আর কে ?  কালকেই দেখা  করিয়ে দেব । কিন্তু কানুর মার্ডারের ব্যাপারটায় খোঁজ নেবার ভার পড়েছে আমার ওপর তাই ... 'এ কথাটা যে উঠবে মনোরঞ্জনবাবুর জানাই ছিল । তিনিও কোন নতুন প্যাঁচ কষলেন না ।পরিষ্কার ভাষায় বললেন, ' জানতে পারলে কি  করবে ঠিক করেছ ? মানে, পুলিশকে দিয়ে কেস লড়াবে , না নিজেরাই ব্যবস্থা করে নেবে ?'----- ' ব্যবস্থাটা কি হবে সেটা আমি বলতে পারব না । সেটা সাগরদার ব্যাপার । আপনি আমাকে শুধু নামটা বলে দিন ... ' , সন্তোষ দাস কোন ভনিতা না করে দাবি করে ।----- ' মাথার নাম  , না খুনির নাম ? '----- ' ধরেন দুটোই,  দুটোই দরকার ... কাউকে ছাড়া নেই  ... কানু যে সাগরদার কি ছিল কি বলব ... '----- ' হ্যাঁ, সেটা অনেকেরই জানা আছে ... আমারও অবশ্যই  জানা । মার্ডারের ব্যাপারটা  আমার জানাই ছিল না ...  অবশ্য জানা থাকলেই  বা কি করতাম ... সে যাকগে ... ' মনোরঞ্জন  আর একটা সিগারেট ধরালেন । বোধহয় কিছুটা টেনশন জড়িয়ে ধরছে তাকে ।----- ' হ্যাঁ ... সে যাকগে , আসল কথাটা বলুন ... '------ ' আপনারা কানুর দাদা প্রীতিময় ঘোষ আর ও পাড়ার  ফার্নিচার ব্যবসায়ী শক্তিপদ দাসকে ধরুন ... সব পেয়ে যাবেন .... '----- ' ও-ও-ও আ... চ্ছা ... বুঝেছি ।  ইশশ্ ... আমি কি গাধা ... সেদিনই ধরে নেওয়া উচিত ছিল ... 'সন্তোষ দাস আক্ষেপ প্রকাশ করতে লাগল ।মোনাবাবু এবার টেনশনের কম্বল সরিয়ে দিয়ে  বেরিয়ে এলেন ...----- ' কাদের হাত দিয়ে মার্ডারটা হল সেটা আমার জানা নেই।  সেটা তোমাদের রগড়ানি দিয়ে বার করে নিতে হবে । আর মাথা ? সেটা নিশ্চয়ই আর বলার দরকার নেই।  তবে ওটাকে তোমরা ছুঁতে পারবে বলে মনে হয় না ... '----- ' একটা বেশ বড় খেলা হবে বলে মনে হয় ... তা'লে ওই কথাই রইল  ... কাল কোথায় আসবেন তা'লে ? ' সন্তোষ বলল ।----- ' তুমিই বল ... '----- ' সকাল এগারোটার সময় বটতলা থানার সামনে আসুন খাঁড়াবাবুর ওখানে সকালের ডিউটি সেরে । '----- ' নাঃ , ডিউটিতে আর যাব না ভাবছি ... ' রাস্তা দিয়ে একটা রিক্শা গেল টুং টুং করতে করতে । দুটো মাতাল তাতে সওয়ার হয়ে জড়ানো জড়ানো কথায় আবোল তাবোল বকবক করতে করতে চলে গেল । রাত দশটা বেজে গেল । রাস্তায় লোকজন নেই  ।   রাত দশটার পরে এগারোটা বাজল । তারপর মানিকলাল মুখার্জীর বাড়ির গ্র্যান্ডফাদার ক্লক টং টং টং করে বারোটা ঘন্টা বাজিয়ে মাঝরাত  ঘোষণা করল । সৌদামিনী দেবী পাশ ফিরে শুলেন । মাণিকবাবু ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে কি একটা বললেন । রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে রাত্রির মধ্যযাম জাঁকিয়ে বসেছে ।      তবে কেউ কেউ জেগে আছে এখনও , যেমন কাবেরী । সে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে একটা কবিতা মকশ করছে কাল বিকেলে নিখিল স্যারকে দেখাবে বলে । লেখাটা অনেক কাটাকুটি করে শেষ পর্যন্ত এই রকম দাঁড়াল ...এই রাস্তা গেছে ওই অনেক দূরে বেঁকে, শিশির আর রোদ্দুর ধোয়াসরল ধানের মতো কোন দারিদ্রমাখা দেহাতের দিকে।পোড় খাওয়া শাল শিমূলের পত্রালিতে মর্মর জাগে রম্য বসন্ত হাওয়ায় ।একটা শান্ত লোক সাইকেল চালিয়ে কোথায় কি    কাজে যাচ্ছে যেন শাল পিয়ালের সুগন্ধ হিল্লোলে ভেসে।বাঁকের মুখে গাছের সারির ক্ষণিক থামা... শীতল ধীর দীঘির ধারেযেখানে প্রশান্ত হাঁসেরা জলে মনোরম দাগ কেটে কেটে সাঁতরায়।ওই দূরে বৃষ্টি খাওয়া কালচে বিচুলি ছাওয়া  চারটে চাষার কুঁড়ে, উদার বিপুল বটগাছ এক.....  ছায়ায় বসে তিনটে গাভী প্রশান্ত থির..... চোখ বোজা শান্তির রোমন্থনে ।এর পর আবার পথ যায় সটান দীর্ঘ....          পিতা প্রপিতামহ রাধাচূড়া  জারুল  নিমফুল ছাওয়া গাছের স্নেহে স্নেহে,নীলাভ  জলরঙা আকাশতলে  সুধাময় কাকলিডাহুক কুবো বসন্তবৌরির ।তরুণ চৈত্রের ইতিউতি তাপে  সেঁকা দুরন্ত বালকের ধারা ছুটন্ত হাওয়া .... খেলছে ......খেলছে থেকে থেকে পাতাপত্তরের ফাঁক দিয়ে ,ছাতা হাতে মাথা বাঁচিয়ে ডানদিকে বাঁক নিল এক পায়ে চলা মানুষ।আজ বোধহয় বেচাকেনা হবে ভাল.... ওই ওদিকে কালিতলা গঞ্জের হাটে।গাড়ি ঘোড়া চাই না কিছু , না চাইসাজানো দালান বসতবাড়িএমনই হাঁটুভরা দূর গাঁয়ের ধুলো মেখে হেঁটে হেঁটে ওই দূর দিগন্ত ছুঁয়ে আসতে চাইমাঠঢাকা  নালিঘাসের আগায় হলদে সবুজ গঙ্গাফড়িং-এর মতউড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে ।বাসন্তী হাওয়া যাচ্ছে বয়ে কত ..... কত দূরে দূরে ।কাবেরী ভাবল , দূর এটা একটা কবিতা হয়েছে নাকি ! যত সব আবোল তাবোল । তাছাড়া এটা তো কোন বিদ্রোহ বিপ্লবের কবিতা না যে স্যারের ভাল লাগবে । কি সব যেন ... বোকা বোকা ... কোন মানে হয় না । তবু এত রাত জেগে লিখেছে যখন, স্যারকে দেখাবে সে । বলা তো যায় না ,  স্যার হয়ত সেদিনের মতো বলতেও পারেন , ' কাবেরী ... কবিতাটা সত্যি তুই নিজে লিখেছিস ? '   ( চলবে )********************************************
    কোটা নিয়ে বাঙলা দেশে হৈ হুল্লোড় - PRABIRJIT SARKAR | শেখ হাসিনা হয়তো ফ্যাসিস্ট। জালি করে ভোটে জেতে। তবে 2018 এ জনগনের দাবি মেনে কোটা তুলে দিয়েছিলেন। সম্প্রতি হাইকোর্ট তার নির্দেশ বাতিল করে কোটা ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু উনি সুপ্রিমকোর্ট থেকে স্টে এনে কোটা চালু আটকেছেন। এবার সুপ্রিম কোর্ট কি বলবে না জেনেই এই লাঠি সোটা নিয়ে হৈ হুল্লোড় ভাঙচুর কত টা যুক্তি যুক্ত? মূল্যবান প্রাণ দান করলেই হল? আজকের শেষ খবর 56 শতাংশ কোটা কে 7 শতাংশ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা যথেষ্ট মৌলবাদী নয় তাই ওকে তাড়িয়ে কট্টর ভারত বিরোধী সরকার আনাই লক্ষ্য। কোটা নিয়ে আন্দোলন আসলে লোক দেখানো।
  • ভাট...
    comment&/ | বেগুনী খুব ভালো ছিল , থ্যাংকু :)
    comment&/ | ত্রিপুরের  লোকগুলোর কষ্টটা   একবার ভাবো , দেখা হয় না  , এক ভাই হয়তো লোহায়  পোস্টেড , অন্য ভাই   রূপোয় , দেখা হয়না দেখা হয় না . প্রেমিক হয়ত  লোহার দুর্গে সৈনিক  আর প্রেমিকা থাকে স্বর্ণ দুর্গে , দেখা হয়না , খালি ফোন আর পাখি
    comment&/ | বাংলা থেকে  ইংরেজি কোরো , নতুন কোনো ফিকশন  :)
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত