এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ইতিহাস  শনিবারবেলা

  • পূর্ব ইউরোপের ডায়েরি – ম্যাসিডোনিয়া ৩

    হীরেন সিংহরায়
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ১৬ মার্চ ২০২৪ | ৩২০ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • স্কপয়ের বাজারে খাঁটি মাসিদোনিয়ান কফি


    খুড়ো মাসি পিসি


    “চিচা,চিচা”

    পাথরে বাঁধানো পথের পাশের কাফেতে বসেছি এমন সময় আমাদের পেছন থেকে একটি শিশু কণ্ঠে শুনলাম সেই ডাক। একবার নয় দু বার নয়, থেকে থেকেই শুনি সেই ডাক। চেয়ার ঘুরিয়ে সেদিকে তাকানো নেহাত অভদ্রতা জানি তবু একবার ঘাড় ঘোরাতে ক্ষতি কি? তাকাতেই চোখে পড়লো একটি বছর পাঁচেকের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দিকে চেয়ে, সঙ্গে, সম্ভবত বাবা মা, তাকে বসানোর চেষ্টা করছেন। সে একবার বসে আবার উঠে দাঁড়ায় – কোনো অনির্দিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যে ডাকে, “চিচা!”

    কমারশিয়ালনা ব্যাঙ্কের আন্দ্রেস আমাকে নিয়ে এসেছেন স্কপয়ের পুরনো শহরের বাজারে। দু নম্বরি মাল গছিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন - স্কপয়ের পুরনো শহর আসলে একটি ধাপ্পা, এর বয়েস মেরে কেটে তিরিশ বছর। ১৯৬৩ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে অন্য অনেক বাড়ি ঘর দোরের সঙ্গে তুরস্কের অটোমান সুলতানদের বানানো অন্তত ছশো বছরের পুরনো বাজারটিও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। প্রাচীন ম্যাপের ছবি দেখে এর পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। আন্দ্রেসকে আশ্বস্ত করে বলেছি ওয়ারশ শহরের স্তারে মিয়াসতো (প্রাচীন শহর ) থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টের রোয়েমারে অবধি এই কায়দার নকলি হলিউডি সেট ইউরোপে দেখার বিলক্ষণ অভ্যেস আছে আমার! তবে পুরনো স্টাইলের চেয়ার মোড়ায় ভরানো এমন ফিল্মি সেটে বসলেই একটা আমেজ এসে যায়, জলসাঘরে ছবি বিশ্বাসের স্টাইলে গড়গড়ার ধোঁয়া টানতে ইচ্ছে করে। এখানে সে ব্যবস্থাও রয়েছে দেখি!

    ছেলেটির ‘চিচা’ রবে আশে পাশের জনতা বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করছে না। পিতা মাতা তাকে বসানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু ছেলেটি অদম্য। বিদেশি সুলভ কৌতূহলে আন্দ্রেসকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটি ডাকছে কাকে? চিচা কি কারো নাম? আন্দ্রেস হেসে বললে, না, চিচা হলো আঙ্কল। ছেলেটি কোনো কারণে তার আঙ্কলের অপেক্ষায় অধৈর্য হয়ে পড়েছে, হয়তো তিনি কোন উপহার আনবেন!

    বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে হলো চিচা মানে কি আমাদের চাচা? জিজ্ঞেস করলাম, চিচা মানে কি কোন বিশেষ আঙ্কল?

    আন্দ্রেস বললে আপনারা তো বাবার ভাই মায়ের ভাই সকলকে আঙ্কল বলেন। মাসিদোনিয়াতে বাবার ভাই আর মায়ের ভাইয়ের আলাদা পরিচয় আছে, বাবার ভাই চিচকো বা চিচা, মায়ের ভাই ভুইকো।

    বলে কি? তার মানে চিচা হলো চাচা বা কাকা আর ভুইকো হলো মামা!

    ইউরোপে এসে থেকে ইন্দো ইউরোপীয় জার্মানিক ভাষা ও তার শাগরেদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, স্প্যানিশ রোমানিয়ানের কল্যাণে রোমানস গুষ্ঠির সঙ্গেও আলাপ হলো। এদের কোন বুলিতেই “আমার পিসির ননদের ভাইঝির নাত জামাইয়ের ভাগ্নির” অনুবাদ হয় না, হতে পারে না; আঙ্কল, আন্টি, কাজিন - এই অবধি সম্পর্কের ব্যাখ্যান। মেটারনাল আঙ্কল কথাটা দেশে থাকতে শুনেছি, ইংল্যান্ডে শুনি নি। দাদু দিদার সমতুল্য ন্যান বা নানা প্রচলিত আছে কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। বোন বা ভাই সকলেই কাজিন। পুত্র ইন্দ্রনীলকে ছোট থেকে কানে ধরে পাঁচ বছরের বড়ো ঐন্দ্রিলাকে ‘দিদি’, আমার দাদাদের ‘জেঠু’, বৌদিদের ‘জেঠিমা’ বলতে শেখানো গেছে (আমার ভাই বা দিদি নেই, তাই কাকা পিসির প্রশ্ন ওঠে না)। প্রতিবাদে ইন্দ্রনীল জানিয়েছে, তার সঙ্গী সাথীরা তাদের বোনেদের নাম ধরে ডাকে, তার ক্ষেত্রে কেন অন্যথা হবে। সে কেন দিদি বলবে? তার বিয়ের পরে কিছুতেই বোঝাতে পারি নি যে ‘তোমার শ্বশুর’ না বলে আমি তাঁকে আমার ‘বেয়াই’ বলতে পারি। আমার আধা রোমানিয়ান কন্যা মায়া ভারতীয় সম্পর্কের রোড ম্যাপ চিনে উঠতে পারে নি - আমার শ্যালিকা ক্রিস্টিনা তার ‘মাতুশা’ (একটু আদরের ডাক) অথবা ‘তানতি’, তার বর সেরবান ‘উঙ্ক’ (আঙ্কল)। শুধু ‘মাতুশা’ বলে সে কখনো ডাকে না, সে ডাক সর্বদা ‘মাতুশা ক্রিস্টিনা’। তার মায়ের খুড়ো খুড়িকে সে বলে ‘উঙ্ক লুডোভিক’ বা ‘তানতি জিওরজি’ – অর্থাৎ লুডোভিক বা জিওরজি তার মায়ের খুড়ো খুড়ি, মায়ারও। ইংরেজিতে সর্বদা শুনি আঙ্কল অমুক বা আন্টি তমুক শুধু আঙ্কল বা আন্টি নয়। মায়া যখন ক্রিস্টিনাকে নাম ধরে ডাকে এখনও আমার কানে লাগে! পিসি, মাসি, খুড়ো, জ্যাঠার যে কনসেপ্ট জেনে শুনে বড়ো হয়েছি সেটি ইউরোপিয়ানদের সম্পূর্ণ অজানা ধরে নিয়েছি।

    আজ স্কপয়ের রাস্তায় একটি শিশুর কণ্ঠে চিচা শুনে চমকে গেলাম।

    বাংলায় পারিবারিক লিঙ্কেজ জানতে উইকিপিডিয়া দেখতে হয় না। আমাদের মা-মাসিরা কি অবলীলাক্রমে সেগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, হ্যাঁরে একে চিনিস? তোর মামার নাতনির মাসতুতো ভাই! অতএব এই বিষয়ে আমার গভীর আভিধানিক প্রজ্ঞা দেখানোর সুযোগ ছাড়া গেলো না।

    - আন্দ্রেস, আমি ইউরোপিয়ান নই! আমার দেশে পারিবারিক তালিকায় কে, কার সঙ্গে কিভাবে সম্পর্কিত সে ব্যাপারে অনেক বেশি তথ্য দেওয়া থাকে। এই আপনাদের চিচা আমাদের কাকা, মানে বাবার ছোটো ভাই, বড়ো ভাই হলে তার আলাদা ডাক আছে, আপনার ভুইকো আমাদের মামা।

    - আমি ধরে নিয়েছিলাম আপনি অন্য ইউরোপিয়ানদের মতন আঙ্কল কাজিনেই আটকে আছেন, তবে আমাদের পুরো লিস্টটা শুনলে হয়তো আপনার মাথা ঝিমঝিম করবে।

    - নির্ভয়ে জানাতে পারেন। আমাদের তালিকা আপনাদের সঙ্গে তুলনা করে নেবো। হাতে সময় আছে।

    - মাসিদোনিয়ানরা গ্রিস, বুলগারিয়া, আলবানিয়া সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে (ডিসপার্সড) বাস করেছেন, ফলে আমাদের ভাষায় বুলগারিয়ানের ছাপ আছে, কট্টর মানুষরা দাবি করেন মাসিদোনিয়ান স্বতন্ত্র নয়, বুলগারিয়ানের একটা ডায়ালেকট মাত্র! অনেক সময়ে বুলগারিয়ান শব্দ ব্যবহার করে আত্মীয় স্বজনের বিশদ পরিচয় দিয়ে থাকি যেমন বাবার বোনের স্বামী ‘কালেকো’ (পিসেমশায়), মায়ের বোনের স্বামী ‘সভাকো’ (মেসো মশায়), মায়ের ভাইয়ের স্ত্রী ‘ভুইনা’ (মামিমা), বাবার ভাই, চিচার স্ত্রী ‘স্ত্রিঙ্কা’ (কাকিমা)।

    (ব্র্যাকেট গুলো আমার)!

    ননদের নাতজামাইয়ের ভাইঝির ঠাকুরপো অবধি পৌঁছুনোর ফরমুলা আন্দ্রেসকে শোনাবো ভেবেছিলাম কিন্তু তার আগেই তিনি অনেকটা গভীরে ঢুকে গেছেন, মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করছেন এগুলো আমি ঠিক বুঝতে পারছি কিনা। তাকে আশ্বস্ত করার জন্য ওয়েটারের কাছ থেকে একটা কাগজ নিয়েছি, কলম পকেটেই থাকে! তিনি একটা সম্পর্কের ব্যাখ্যা করেন, লেখেন, তার পাশে আমি আমাদের পরিশব্দ লিখি। তিনি অবশ্যই এর কোন অর্থ উদ্ধার করতে পারবেন না কিন্তু আজকের এই কাফেতে যে জ্ঞানচর্চা, এক্সারসাইজ চলল, সেই জিনিওলজির খানিকটা পাঠককে শোনানোর লোভ সংবরণ করতে পারছি না!

    বুলগারিয়ান/মাসিদোনিয়ানে পাবেন:

    জালভা (ননদ), বালদুজা (শ্যালিকা), দেভের (দেওর), শুরে (শ্যালক), শুরেনাইকা (শালাজ), এতারভা (দেওরের বউ বা জা, ছোট জা বড়ো জার বিভেদ নেই); এমনকি শ্বশুর এবং শাশুড়ি দুই প্রকারের – বরের বাবা ‘সভেকার’, বরের মা ‘সভেরকাভা’, বউয়ের বাবা ‘তাস্ত’, বউয়ের মা ‘তাসতা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। দাদুকে এঁরা ‘দাদো’ বলেন জেনে সাতিশয় আনন্দ হলো।





    বাজারের মাঝে কাফে


    পাশের টেবিলের সেই বালকের ‘চিচা চিচা’ রব থেমে গেছে – ইতিমধ্যে একটি রঙচঙে মোড়ক হাতে এক দীর্ঘদেহী যুবক আবির্ভূত হয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়েছেন। তাহলে ইনি তার চাচা বা চিচা! টেবিলের চতুর্থ চেয়ারটি টেনে নিয়ে তিনি বসলে পর আন্দ্রেস দ্রুত একটি রানিং কমেন্টারি দিলেন - আজ সেই বালকের জন্মদিন। কাকার উপহারের জন্য সে খুব উদগ্রীব হয়ে ছিল, এবার সেটি হাতে পেয়ে শান্ত হয়েছে।

    আমার কৌতূহলের শেষ নেই। পেছনে না তাকিয়ে আন্দ্রেসকে বললাম, বয়েসের বিচারে উপহার হয়তো ব্যাটম্যানের মুখোশ বা নিনজা টারটল দেওয়া হয় ধরে নিতে পারি। তবে ওই শিশুর বয়েসে, আমরা দুটো টাকাও পেতাম!

    আন্দ্রেসের কাছে জানা গেলো কার্টুন চরিত্র বা খেলার সরঞ্জাম শুধু নয়, ছেলে হোক, মেয়ে হোক, মাসিদোনিয়ায় সোনা দেবার রেওয়াজ সবচেয়ে বেশি চালু - সে দুল, আংটি, হার, বালা, মকর মুখো চেন যাই হোক না কেন! আন্দ্রেসের মতে এই সব উপহারের পেছনে গভীর অর্থনৈতিক যুক্তি নিহিত আছে – শিশু জন্মালে, হাঁটতে শিখলে, স্কুলে ভর্তি হলে, পরীক্ষা পাশে – যে কোন উপলক্ষে - একটু একটু করে সোনার ছেলে বা সোনার বরণী কন্যার সঞ্চয় গড়ে তোলা হয়। দুর্দিনে কাজে লাগবে।

    এই যুক্তি আগেও কোথাও শুনেছি !

    মিলাবে মিলিবে

    ইওসেপ ব্রজ টিটো বলেছিলেন আমি এমন এক দেশের নেতা যেখানে দুরকমের হরফ, তিনটে ভাষা, চারটে ধর্ম, পাঁচটা জাতি, ছটা রিপাবলিক আর ঘিরে আছে সাতটা প্রতিবেশী, তার ভেতরে আছে আটটা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।

    আমাদের ভারতবর্ষের মিনি সংস্করণ।

    ক্রোয়াট, স্লভেন, সার্ব, মনটি নেগ্রিন, মাসিদোনিয়ানদের নিয়ে মার্শাল টিটো জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়লেন – পাঁচটা যদি জাতি তাহলে ছটা রিপাবলিক কেন ? মন্টে নিগ্রো এবং সার্বিয়া দুটি রিপাবলিকে সারবিয়ানদের বাস অতএব এক জাতি, দুই প্রদেশ। আর বসনিয়াতে অঙ্কটা ঠিক মেলানো গেলো না; সেখানে মুসলিম বসনিয়াক সংখ্যাগুরু কিন্তু সার্ব, ক্রোয়াট মিলিয়ে ৪০% লোকের বাস। সেখানে সেই অশান্তি মাথা চাড়া দেবে একদিন যা আমরা বসনিয়া পর্বে দেখেছি।

    পাঁচশ বছরের অটোমান রাজত্বে মাসিদোনিয়া কোন রাজ্য (সঞ্জক) ছিল না, ভারদার নদী বয়ে গেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে, সেই নদী অথবা প্রধান শহর উস্কুপ (আজকের স্কপয়ে) এর নামেই তার নাম। ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনসের (এন আর সি) প্রশ্ন ওঠে নি, কোনো রাজদপ্তরে পাসপোর্ট জন্মকুণ্ডলীর কাগজ দেখিয়ে প্রমাণ করতে হয় নি, তাঁরা কেউ ঘুসপেতিয়া নন। মাসিদোনিয়ানরা কোন স্বতন্ত্র জনজাতি নয়, আজকের বুলগারিয়া গ্রিস আলবানিয়া সর্বত্র মিলে মিশে বাস করেছেন – তাঁরা সংখ্যালঘু কিন্তু সুলতানের কাছে সবাই প্রজা। পাশাপাশি দেখা গেছে আরোমানিয়ানভাষীদের, যারা রোমানিয়ান বুলগারিয়ান মিশিয়ে বিচিত্র জবানে কথা বলেন। সবটাই তুর্কি রাজত্ব; আসা যাওয়ার কোন বাধা নেই, ভিসা লাগে না, পুলিশের কাছে হাজিরা দিতে হয় না। মাসিদোনিয়ান, বুলগারিয়ান, আরোমানিয়ান ধর্মে অর্থোডক্স, হাতের লেখা করেছেন সিরিলিক হরফে (যার প্রণেতা বুলগেরিয়ান সন্ত কিরিল); তুর্কি, গ্রিক, আলবানিয়ান, আরোমানিয়ান পাড়াপড়শির সঙ্গে গল্প গুজব করতে করতে আপন অজান্তে বহু শব্দ আত্মসাৎ করেছেন মাসিদোনিয়ানরা। টিটো যখন তাঁদের আপন নামের রিপাবলিক এবং পতাকা দিলেন, প্রাথমিক প্রশ্ন উঠলো – মাসিদোনিয়ান কারা? যারা এই সীমান্ত নির্দেশিত রিপাবলিকে বাস করেন তারাই, নাকি এক নতুন রিপাবলিক হবে সকল মাসিদোনিয়ান ভাষাভাষীদের নিয়ে যারা আলবানিয়া গ্রিস বুলগারিয়াতে এখন বাস করেন? সেই সব অঞ্চল মাসিদোনিয়ার অংশ হবে? যেমন ১৯৩৮ সালে নাৎসিরা বললেন, চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনলানডে যে জার্মান জনতা বাস করেন তাঁরা এবার জার্মান রাইখের অন্তর্ভুক্ত হবেন (এঁরা কোনদিন কোন জার্মান রাইখের নয়, এঁরা ছিলেন অস্ট্রিয়ান হাবসবুরগ সাম্রাজ্যের প্রজা) লোটা কম্বল নিয়ে জার্মানিতে আসতে হবে না, যেখানে বাস করছেন সেটাই হবে তৃতীয় রাইখের অংশ (হাইম ইনস রাইখ) মানে জার্মানি তার সীমান্তরেখা আরও পুব দিকে ঠেলে দেবে। মিউনিকের সালিশি সভায় ইংরেজ চেম্বারলেন, ফরাসি দালাদিয়ে পূর্ণ সম্মতি জানিয়ে বললেন, বাঃ, তবে তাই হোক। চেকোস্লোভাকিয়ার কোন প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না, যেমন ১৮৮৫ সালে বিসমার্ক যখন আফ্রিকা মহাদেশ নামক কেকটি কেটে কুটে সাতটি দেশের পাতে দিচ্ছিলেন সেখানেও কোন আফ্রিকানের হাজিরা দেওয়ার অনুমতি ছিল না।

    চেকরা বলেছিলেন, আমাদের কথা হলো আমাদের বাদ দিয়ে (ও নাস বেজ নাস)?

    সেই শঙ্কা পড়শি দেশগুলোর ছিল – টিটোর ইয়ুগোস্লাভিয়া তত্কালের গ্রিস, আলবানিয়া, বুলগারিয়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। গায়ের জোরে হয়তো তিনি কিছু অংশ খাবলে নিতে পারতেন কিন্তু চেম্বারলেন বা দালাদিয়ের মতন কোন শান্তিপ্রিয় মহাত্মা এখানে দেখা দিয়ে বলেননি, যা নেবার নিয়ে নাও, লড়াই ঝগড়া করো না, বেলগ্রেড হতে এনে দেবো আমাদের সময়কালের শান্তি ( পিস ফর আওয়ার টাইম)*!

    ইয়ুগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে যাওয়ার পরে (আমি যে সময়ে মাসিদোনিয়া যাই) হাওয়া গরম হয়ে উঠেছে। একে তো মাসিদোনিয়া নামের ওপরে গ্রিসের পাকাপাকি অধিকার, আলেকজান্দারের সঙ্গে জড়িত। সেটি বেদখল হতে দেওয়া যায় না। অধিকন্তু তাদের দেশে মাসিদোনিয়ান নামের কোন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই গ্রিস স্বীকার করে না – তারা বলে এঁরা স্লাভনিক গ্রিক! তাঁরা গ্রিসেই থাকুন, নতুন করে কাগজ চাইছি না। বুলগারিয়া সেই একই শঙ্কায় দোদুল - মাসিদোনিয়ানভাষীরা কি দেশত্যাগ করবেন না মাসিদোনিয়া এই দেশের অংশ কব্জা করবে? সুদেতেনলান্ডের মতন? আরেক প্রতিবেশী দেশ আলবানিয়ায় বাস করেন কিছু মাসিদোনিয়ান, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি আলবানিয়ান, জনসংখ্যার তিরিশ শতাংশ, মাসিদোনিয়ার নাগরিক। এঁরা যদি এ দেশেই খালিস্তান দাবি করেন? সে সময়ে ইয়ুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধ তুঙ্গে, চলছে সারায়েভোর অবরোধ (এপ্রিল ১৯৯২ - ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬, ইউরোপীয় ইতিহাসে দীর্ঘতম), ক্রোয়েশিয়া বনাম সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়ান ও বসনিয়াক বনাম সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়ান বনাম বসনিয়াক – প্রায় ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা।

    পুরনো পাথরের সেতু কামেনমস্তের আলো জ্বলে উঠেছে, দূরে কোথাও জিপসিদের বিয়ের বাজনা বাজে। অনেকটা উঁচুতে জেগে থাকে শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গ। কোথাও কি ঘনিয়ে আসছে যুদ্ধের ছায়া? সে প্রসঙ্গ কেউ তুলতে চান না, সেই উদ্বেগ থেকে যায় মনের ভেতরে।





    “কালে অ্যান্ড ভারদার”


    প্রায় বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সাদা কালো ছবিওলা একটি কার্ড উপহার দিয়ে আন্দ্রেস বললেন, এই নদী আর এই দুর্গ হয়তো আমার দেশের সবচেয়ে স্মরণীয় প্রতীক – এর চেহারা বদলায় নি কয়েকশ বছরে!

    ছবিতে লেখা “কালে অ্যান্ড ভারদার”। ভারদার তো নদীর নাম, কালে কি?

    আন্দ্রেস বললেন, দুর্গের মাসিদোনিয়ান নাম।

    ‘কালে’ মানে আমাদের কেল্লা? সরাসরি তুর্কি থেকে এসেছে?





    কেল্লা ও নদীর পুরোনো ছবি


    ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চিচা এবং কালের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এই স্কপয়ে, মাসিদোনিয়াকে বেশ চেনা মনে হলো!

    পুনশ্চ:

    সিটিব্যাঙ্কের বাণিজ্যিক ম্যাপে মাসিদোনিয়ার স্থান হয় নি, সরকারি খরচায় আসা যাওয়া বন্ধ হলেও ব্যক্তিগত ভ্রমণে বাধা ছিল না। আজ এতো বছর বাদে ভেবে অবাক হতে হয়, ইয়ুগোস্লাভিয়ার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মাঝে অটোমান রাজত্বের সঞ্জক, মার্শাল টিটোর এঁকে দেওয়া ম্যাপ মেনে নিয়ে কুড়ি লক্ষ মানুষের এই ছোটো ল্যান্ডলকড দেশ মাসিদোনিয়াতে স্বাধীনতা এলো বিনা রক্তপাতে। গ্রিস, বুলগারিয়ার মাসিদোনিয়ানরা রয়ে গেলেন সেই সব দেশে – কোন মানুষের স্থানান্তর হয় নি। অর্থোডক্স, ক্যাথলিক, মুসলিম, কিছু সারবিয়ান, আরোমানিয়ান, অনেক আলবানিয়ান নিয়ে মাসিদোনিয়া গড়ে তুলেছে এক সহনশীল সমাজ, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলবানিয়ান ভাষা পেয়েছে সমান মর্যাদা, তুর্কি পেয়েছে তৃতীয় ভাষার সম্মান। অর্থোডক্স ক্যাথলিক গির্জার পাশে পুরনো সিনাগগ, অজস্র মসজিদ নিয়ে মানিয়ে গুছিয়ে আছে মাসিদোনিয়া।

    ১৯৯৫ সালে আমাদের সাক্ষাৎকারের সময়ে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের গভর্নর জানিয়েছিলেন তাঁদের মুদ্রা দেনারকে মার্কের সঙ্গে বেঁধে তাকে স্থিরতা দিয়েছেন। এখন সেটি ইউরোর সঙ্গে ওঠা নামা করে; দেনার আজ কনভারটিবল মুদ্রা, অবাধে কেনা বেচা করা যায়। স্বাধীনতার সময়ে মাসিদোনিয়ার মাথা পিছু আয় ছিল ভারতের নিচে, আজ আমাদের তিন গুণ। তিরিশ বছরে জাতীয় আয় বেড়েছে পাঁচগুণ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে দরখাস্ত জমা দেওয়া আছে – প্রবেশাধিকার শুধু সময়ের ব্যাপার।

    * “It is peace for our time” - নেভিল চেম্বারলেন, জার্মানি থেকে ফিরে, ক্রয়ডন এয়ারপোর্ট, সেপ্টেম্বর ৩০, ১৯৩৮





    খবরের কাগজের উদ্ধৃতি


    ঠিক এগারো মাস বাদে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ।





    ক্রমশ...




    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ১৬ মার্চ ২০২৪ | ৩২০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন