এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ইতিহাস  শনিবারবেলা

  • পূর্ব ইউরোপের ডায়েরি - রাশিয়া ২

    হীরেন সিংহরায়
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ১৬ জুলাই ২০২২ | ১১৪৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • বার্লিন দেওয়ালের পতনের পরে পূর্ব ইউরোপের দরোজা খুলে গেলো। লৌহ যবনিকা উত্তোলিত হলেও একটা অজানা অস্বস্তি থেকে গেছে মনে। তাই নয়ের দশকে সপ্তাহান্তের ছুটিতে প্রাগ বা বুদাপেস্ট যাবার কথা আমরা কেউ ভাবিনি, মস্কো সেন্ট পিটারসবুরগ আরও অনেক দূরের দ্বীপ। হেলসিঙ্কির বন্দরে এসপ্লানাদির বেঞ্চে বসে নৌকো আর জাহাজের আনাগোনা দেখছি আনমনে। পিরকো বললে লাপল্যান্ড যাবে? আমি বললাম শুধু লাপল্যান্ড কেন? সেখানে তো তিনটে দেশ এসে মেলে, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, রাশিয়া। সর্বত্র না হয় পদধূলি দিয়ে আসি!
    পিরকো - পিছনে কোলা উপসাগর


    এই বনপথে, ছায়াতে আলোতে


    গুগল, জিপিএস দেখা দেবে এক দশক বাদে। একটি ম্যাপ সম্বল করে জনমনিষ্যি-শূন্য পথে আমাদের যাত্রা। রাশিয়ান চৌকি ছাড়িয়ে সোজা রাস্তা চলে গেছে পুবদিকে। দু'পাশে ছোটখাটো হ্রদ। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রথম কিছু বাড়ি ঘর দেখা গেল। যে শহরে পৌঁছুলাম, তার রাশিয়ান নাম নিকেল, ফিনিশ নাম নিক্কেলি। নামেন পরিচয়তে। নিকেল ধাতুতে অসম্ভব সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটির ফিনিশ নাম পেতসামো, রাশিয়ানে পেচেঙ্গা।

    যদিও ফিনল্যান্ড আজ পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ বলে পরিগণিত, তার সঙ্গে হাস্যরোলের সম্পর্ক ক্ষীণ। ফিনিশ রসিকতা খুঁজতে যাওয়া ঝকমারি। আইস হকিতে সুইডেন বা রাশিয়াকে হারালে তাঁরা অবশ্যই অট্টহাস্য করেন এবং প্রচুর পরিমাণে কসকেনকরভা (ফিনিশ ভদকা) পান করে অচৈতন্য হয়ে পড়েন। তবে সেটা নিয়মিত ঘটে না। মাঝেমধ্যে অবশ্য পুরোনো রাজাদের নিয়ে তির্যক কৌতুকের পরিচয় মেলে।

    পিরকো জিজ্ঞেস করলে, জানো সুইডেন আর ফিনল্যান্ডের মধ্যে পার্থক্য কী? সুইডেন পেয়েছে এক ভাল প্রতিবেশী। আর ফিনল্যান্ড? ভদ্রতাবশত তার উত্তর দেওয়া হয় না। নীরবতাই এর জবাব। দীর্ঘদিন সুইডিশ শাসনে থেকেছে ফিনল্যান্ড। দু’শ’ বছর বাদে অনেক ক্ষত মিলিয়ে গেছে। সৌজন্যবশত দেশের পশ্চিমপ্রান্তে ফিনিশের পাশে সুইডিশ ভাষাকে স্থান দেওয়া হয়েছে রাস্তার নামের বোর্ডে। হৃদয়ে সদ্ভাবের অভাব। স্বাভাবিক।

    আর অন্য প্রতিবেশী? রাশিয়া?

    একশ’ বছর তারা ফিনল্যান্ড শাসন করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাস্ত রাশিয়া, পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন, নিজের ঘর সামলাতে ব্যস্ত হল। ১৯২০ সালে তারতু চুক্তি অনুযায়ী সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ডকে দিল স্বাধীনতা। সেই সঙ্গে একটি অঞ্চল বিনিময় – রাশিয়ান সীমান্ত বরাবর কারেলিয়া প্রদেশের খানিকটার বদলে ফিনল্যান্ড পেল পেতসামো প্রদেশ। উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত একফালি দীর্ঘ ভূখণ্ড দিয়ে সাড়ে পাঁচশ’ কিলোমিটার-ব্যাপী আর্কটিক ওশিয়ান হাইওয়ে উত্তর ফিনল্যান্ডের রোভানিয়েমিকে (যেখানে সুমেরু বৃত্ত পার হয়েছি কতকাল আগে) জুড়ে দিল একটি বন্দরের সঙ্গে, তার নাম লিনাখামারি। দক্ষিণে গালফ অফ ফিনল্যান্ড যদি কোনো কারণে অবরুদ্ধ হয়, তাদের মালপত্র লিনাখামারি থেকে জাহাজে উঠবে।



    নিকেল বা নিক্কেলি


    নিকেলের সন্ধান মিলল, যা থেকে শহরের নাম। এর পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরোনো জমিদারি দখলের বাসনায় লাল ফৌজ ফিনল্যান্ড আক্রমণ করে পয়লা রাউন্ডে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু দুসরা রাউন্ডে বিজয়ী হয়ে পেতসামো দখল করল। কারেলিয়ার অধিকৃত অঞ্চলটি ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো বাসনা ছিল না তাদের। রুশ ভল্লুক যাকে একবার জাপটে ধরে, তার মুক্তি নেই।

    পিরকোর কাছে পেতসামোর, লিনাখামারি বন্দরের নাবিকদের কাহিনি শুনেছি। আপাতত সে প্রসঙ্গ তোলা খুব একটা সমীচীন মনে হল না।

    নিকেলে সমৃদ্ধ এই শহরে আজ হাজার দশেক মানুষের বাস। সোভিয়েত স্টাইলে তৈরি ছোট ছোট দেশলাই বাক্স-র মত বাড়ি, নাক বরাবর রাস্তা, গাড়ি বলতে লাদা, সংখ্যায় সীমিত। থামলাম শহরের মধ্যস্থলে। পাশেই একটি ডেনিশ ট্যুর বাস। তার ড্রাইভার বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলেন। আমাদের গাড়ি এবং আমার সুরত দেখে বেশ কৌতূহলী হলেন। ডাচদের মতন ডেনিশরা অনায়াসে সাবলীল ইংরেজি বলেন।

    - কতদূর যাচ্ছেন?
    - মুরমানসক। আপনারা কোথায় যাবেন?
    - আমরা এই নিকেল অবদি। এত দিন বাদে সীমান্ত খুলেছে। আমাদের যাত্রীরা একবার রাশিয়া ছুঁয়ে যেতে চান, দেশে ফিরে গর্বের সঙ্গে বলবেন – এই রাশিয়া ঘুরে এলাম। মুরমানসক আমি যাইনি তবে সে অন্তত তিনশ’ কিমি হবে। শুনেছি রাস্তা ভাল।

    তিরিশটি দেশে গাড়ি চালিয়েছি। আমার অভিজ্ঞতায় পৃথিবীর পথযাত্রায় সব পথিক অপর যাত্রীকে তার ভাই-বেরাদর মনে করে নির্দ্বিধায় দুটো পরামর্শ দেয়। এই ডেনিশ ড্রাইভার এক ভারতীয়কে ছোট রাশিয়ান শহরে দেখে কিঞ্চিত অনুকম্পা বোধ করলেন।

    - রাশিয়াতে আধুনিক ইউরোপিয়ান গাড়ি দেখা যায় না। আপনি অনেকের কৌতূহল উদ্রেক করবেন। সাবধানে থাকা ভাল। আমি আমার ম্যাপ খুলে যা দেখছি, মুরমানসক যাওয়ার দুটো রাস্তা আছে। উত্তরমুখো গিয়ে পেচেঙ্গা হয়ে যেতে পারেন। সে রাস্তায় দু’-তিনটে শহর বা গ্রাম পড়বে। তাতে সময় হয়তো একটু বেশি লাগবে। আমার মতে নিকেল থেকে ডানদিকের রাস্তা নিয়ে একটু দক্ষিণ হয়ে যেতে পারেন। এ পথে কোনো গ্রাম-শহর নেই। তেল আছে তো? আপনার গাড়ি যে পরিশোধিত তেলে চলে, সেটা পাবেন কিনা জানি না। নিকেলে তো দেখলাম না।



    মুরমানসকের দুই পথ


    আভিস কোম্পানি কি সেই কারণে রাশিয়াতে গাড়ি নিয়ে যাওয়া মানা করেছে?

    জানালাম কিরকেনেস থেকে ট্যাঙ্ক ভরতি করে এনেছি। ৫০০ কিমি স্বছন্দে যাওয়া যাবে। তাঁকে একটু চিন্তিত দেখাল।
    বললেন গুড লাক। দ্বিতীয়বার গুড লাক শুনলাম। এক সকালে।

    পাঠক, এ পথে আপনারা কখনো যাননি। নিতান্ত পাগল কুকুরে না কামড়ালে যাবেনও না। অনেক বছর ইউরোপে আছি। অজানা-অচেনার সন্ধানে ইচ্ছে-অনিচ্ছেয় ইউরোপে অনেক ঘুরেছি। পথঘাট, ভাষা না জেনে পোল্যান্ডে ঢুকে পড়েছি, বেলজিয়াম থেকে বনের ভেতরে গাড়ি চালিয়ে ফ্রান্সে হাজির হয়েছি, অস্ট্রিয়ার নিরালা গ্রামে হাঁটতে হাঁটতে অকস্মাৎ নিজেকে এক জার্মান পাবে আবিষ্কার করেছি। তবে এই অভিযান অন্য সব দুঃসাহসী নির্বুদ্ধিতাকে ছাপিয়ে যায়। নিক্কেলি থেকে যে পথ গেছে পুবদিকে, তার দু’পাশে ছোটখাটো পাহাড়। নিকেলের অবশেষ। অনেকটা ইস্পাত কারখানার বর্জিত বস্তুর স্তূপের মত। দূরে সত্যিকারের পাহাড়ের রেখা। আর সর্বত্র একই মাপের পাইন আর বার্চ গাছ। কোন মহীরুহ চোখে পড়ে না। সামনে বা পিছনে রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। তিনশ’ কিলোমিটারের যাত্রায় দু’টি ট্রাককে আসতে দেখেছিলাম বিপরীত দিক থেকে। রাস্তা ভীষণ ভাল। মাঝের লাইনটি নেই, যেমন ফিনল্যান্ডেও থাকে না। এমন রাস্তায় গাড়ি চালালে মনে হয় আমরা পৃথিবীর সীমান্তে এসে পৌঁছেছি যেন। এবার কী? কোথায়? কোনো মানব-বসতি নেই। নির্মেঘ প্রসন্ন দিন। লম্বা দিনের কোনো শেষ হয় না। সেটা দেখতেও আসা।

    মাইলের পর মাইল চলে যাই। একমাত্র সঙ্গী পাইনের সেনানী – যতদূর চোখ চলে, কোনো বাড়ি নেই। যদি গাড়ি খারাপ হয়? চাকা বদলাইনি জীবনে।

    দূর থেকে দেখা মুরমানসকের প্রথম ছবিটি চমকে দেয়। অকস্মাৎ বাঁদিকে এক সাগরের (কোলা বে) আভাস। ডানদিকে নিউ ইয়র্কের মত সারি সারি বহুতল অট্টালিকা। এ কি মায়া? এখানে স্কাই স্ক্রেপার? পরে সেই সন্ধ্যায় এই রহস্য উন্মোচন করেন মুরমানসক-বাসিনী এক মহিলা। মুরমানসক শহর কোলা বে থেকে ধাপে ধাপে উঁচুতে উঠে গেছে। আগের দিনে কাঠের বাড়ি প্রায়ই আগুন লেগে পুড়ে যেত। তখন মানুষজন আর এক ধাপ ওপরে বাড়ি বানাতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লেনিনগ্রাদ ও স্টালিনগ্রাদের পর মুরমানসক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রমে ক্রমে পাকা বাড়িও হল এবং যথার্থ সোভিয়েত স্টাইলে দশতলা উঁচু কর্মী আবাস তৈরি হল। তাই আমরা দূর দেখে যা দেখলাম সেটা সেই উপসাগরের তীর থেকে ক্রমশ উঠে যাওয়া অবিছিন্ন বাড়ির সারি,যাকে প্রথম দৃষ্টিতে বহুতল অট্টালিকা বলে মনে হয়। পরবর্তীকালে আমি কোনো রাশিয়ানের সাক্ষাত পাইনি যিনি আমার এই বর্ণনার সম্যক অনুধাবন করতে পারেন বা কিছু আলোকপাত করতে পারেন। আমার বিশাল অভিযানের বাহাদুরিটা মাঠে মারা যায়।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মুরমানসক বন্দরের উপযোগিতা বোঝা গেল। সারা বছর নৌ-চলাচল করতে পারে। তখন কুল্লে আড়াই হাজার লোকের বাস। ১৯১৬ সালে সেখানে নগর পত্তন করেছিলেন জার নিকোলাস – জারের রাশিয়ায় এটি শেষ নগর পত্তন। এর আদি নাম রোমানভ না মুরমান (রোমানভ শেষ রাশিয়ান রাজবংশ। নরওয়ের প্রাচীন রাশিয়ান নাম মুরমান)।

    সীমান্তের রাশিয়ান পুলিশ বলেছিলেন – মুরমানসক সবচেয়ে উত্তরের বন্দর নয়। টেকনিকাল নক আউটে তিনি জিতবেন। মুরমানসকের এক হাজার এবং সুমেরু বৃত্তের দেড় হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে উত্তরে ডিকসন নামে একটি জনপদ আছে। এতটাই উত্তরে, যে গোটা ডিসেম্বর মাসে গোধূলির আলো অবধি নাকি দেখা যায় না। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। সেটি এই পৃথিবীর শেষ মনুষ্য আবাস। সেখানে নৌকো, ছোটো জাহাজ আসা-যাওয়া করতে পারে –অতএব বন্দর! বড় জাহাজ আসতে পারে না। মাত্তর পাঁচশ’ লোকের বাস।



    মুরমানসক


    মুরমানসক রাশিয়ার সবচেয়ে উত্তরের তুষারমুক্ত বন্দর শহর। উত্তর আটলান্টিক থেকে প্রবাহিত এক উষ্ণ ধারার কারণে এটি কখনো বরফে পুরোপুরি জমে যায় না। এর অবস্থিতি সুমেরু বৃত্তের দু’ডিগ্রী ওপরে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মুরমানসকের ভূমিকা বিশাল। জার্মানদের রাশিয়া আক্রমণের পর এই বন্দর দিয়েই মিত্র শক্তি সাহায্য পাঠাতে থাকেন। লেনিনগ্রাদ ও স্টালিনগ্রাদের মত মুরমানসক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটি হিরো সিটি বা বীর শহর নামে পরিচিত। শহরের প্রায় চুড়োয় একটি বিশাল মূর্তি আছে, তার নাম আলইশা। সেটি সেই সংগ্রামের স্মারক। নিচের কোলা উপসাগরে বরফ ভেঙে সমুদ্রপথ পরিষ্কার করার প্রথম আণবিক শক্তি চালিত জাহাজ “লেনিন” বন্দরে নোঙর করা আছে। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে অনেক বরফের দেয়াল খনন করে ১৯৮৯ সালে লেনিন এখানে বিশ্রান্তি গ্রহণ করেছে। এতটা উত্তরে এলে সারা দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন মনে হয়! সেটি হয়তো সঠিক নয়। আলইশা স্ট্যাচুর পদতলে দাঁড়িয়ে কল্পনাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলে মনে মনে হয়তো অনেক দূরে চলে যাওয়া যায় – এই তো সামনে কোলা উপসাগর, সেটি গিয়ে মিশেছে বারেনট সাগরে। সেখান থেকে একটু বাঁয়ে ঘুরলেই কানাডার সমুদ্রপথ। বছরে অন্তত পাঁচ মাস খোলা থাকে। এর নাম সুমেরু সেতু। মালবাহী জাহাজ যেতে পারে চার হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ম্যানিটোবার চার্চিল বন্দরে। আর খাড়া উত্তরে গেলে মাত্র দেড় হাজার কিলোমিটার দূরত্বে উত্তর মেরু। পা আরেকটু বাড়ালেই তো খাঁটি উত্তর বা ট্রু নর্থ!

    সুমেরু বৃত্ত ছাড়িয়ে মুরমানসক সবচেয়ে বড় শহর, প্রায় চার লক্ষ মানুষের বাস।

    আমাদের বুকিং ছিল শহরের মাঝখানে, আর্কটিক হোটেলে (২৯ বছর বাদে ছবিতে দেখছি সেটি সেই স্বরূপে দণ্ডায়মান আছে, নাম বদলে হয়েছে আজিমুত)। বিশাল উঁচু, ১৯ তলা – সে আমলে সুমেরু বৃত্তের উত্তরের উচ্চতম অট্টালিকা। চেক ইন ইংরেজি ভাষায় করা গেল। জানতে চাইলাম, পার্কিং কোথায়। উত্তর হল বাইরের চত্বরে। বলে কী? কোনো ঢাকা জায়গায় সুরক্ষিত পার্কিং গারাজ আছে? না, সে রকম কোনো ব্যবস্থা নেই। ঢাকা জায়গায় পার্কিং করতে একটু দূরে যেতে হবে। সেখানে গাড়ি সুরক্ষিত করে একটা বাস ধরে হোটেলে ফেরা যায়। পিরকো আর আমি কোনো বাক্য বিনিময় না করেই তৎক্ষণাৎ একই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম – ও পথে যাওয়া নেই।

    শহরে ঢুকেই বুঝেছি আমাদের হাল ফ্যাশনের ফোর্ড গাড়িটি যে কোনো লুঠেরার সুলভ টার্গেট। নিক্কেলির ডেনিশ বাস ড্রাইভার যেমন বলেছিলেন। একটু চিন্তা হল মনে। বিনা অনুমতিতে ফোর্ড সাহেবের গাড়ি রাশিয়া নিয়ে এসেছি, চুরি হলে বীমা কোম্পানি একটি পয়সা দেবে না। সবটাই আমাদের ঘাড়ে।

    হোটেলের বাইরে ঠিক মেন দরজার নাক বরাবর পার্ক করেছি। কুল্লে চারটে গাড়ি সেখানে। মনে হল সেখানে একটা বিদেশি ভ্যান দেখছি। তার নম্বরের পাশে এস/এফ লেখা। সে আমলে ফিনল্যান্ডের পরিচায়ক অক্ষর ছিল এস/এফ সুওমি (ফিনিশ) ও ফিনল্যান্ড (সুইডিশ, দুটো এন লেখা) এই দুই ভাষায়। পরে ফিনল্যান্ড সুওমি নামটি পরিত্যাগ করেছে। ভারতের বদলে ইন্ডিয়া! এটাও বোঝা গেল, ভ্যানটি রোভানিয়েমি থেকে এসেছে। পিরকোকে বললাম তোমাদের দ্যাশের লোক। একবার জেনে এস, তারা কোথায় গাড়ি লাগাচ্ছে। পিরকো ফিরে এলো ভগ্নদূতের মত। তারা চারজন রোভানিয়েমি দমকলের লোক, দু’দিনের জন্য বেড়াতে এসেছে। ওরা রাতের বেলা গাড়িতে শোয়। একটা বন্দুক আছে সঙ্গে ।

    এবার? সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম হোটেল লবিতে। কাঁচের দরজার ঠিক সামনে শ্বেতশুভ্র-কেশ প্রহরী বসে আছেন। বয়স্ক মানুষ। তাঁর ইংরেজি, ফিনিশ বা নরওয়েজিয়ান কোনোটাই জানার সম্ভাবনা নেই। তবে আমরা যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলি, আর রাশিয়ানরা মহান দেশপ্রেমিক জনযুদ্ধ বলেন, সেটা হয়তো দেখেছেন। অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়লাম – স্প্রেখেন জি ডয়েচ?

    তিনি জানালেন অল্প (আইন বিসচেন)।

    - আপনি কতক্ষণ আপনার আসনে থাকবেন?
    - সকাল ছ’টা অবধি।

    এবার ভাঙা ভাঙা জার্মানে, খানিক মূকাভিনয়, খানিক অঙ্গুলিচালনা করে তাঁকে যা বললাম, তার সারাংশ এই: ওই যে গাড়িটা দেখছেন, একেবারে আপনার চোখের সামনে পার্ক করা, ওটি আমার। আপনার এই আসনে বসে সারারাত ওর প্রতি লক্ষ রাখবেন। সকালবেলা গাড়িটি যদি অক্ষত অবস্থায় যথাস্থানে দেখি, আপনাকে আমি কুড়ি মার্ক দেব।

    কতটা কী বুঝলেন জানি না। বললেন ইয়া ভোল (তথাস্তু)।



    মুরমানসক - পৃথিবীর উত্তরতম রেল স্টেশন


    আজও আমি বোঝাতে অক্ষম কী ভেবে, কোন বুদ্ধিতে আমি এই প্রতিরক্ষা পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলাম। এটুকু মনে আছে, যেই সে রাশিয়ান দ্বাররক্ষী আমাকে ইয়া ভোল বললেন, সেই মুহূর্তে আমার মন থেকে সব গাড়ির ব্যাপারে সব দুশ্চিন্তা উবে গেল। নগর পরিক্রমায় গেলাম। জুলাই মাসে রাত হয় না, অন্ধকার হয় না। চলতি নাম শ্বেত রাত্রি – হোয়াইট নাইট। প্রথমে মুরমানসক রেল স্টেশন। ট্রেন ধরতে নয়, শুধু ট্রেনের টাইম টেবিল দেখতে। দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল, এ যেন কোনো সংগ্রহশালা। এই দূর উত্তর থেকে ট্রেন কোথায় কোথায় যে চলে যায়! অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখায় (আগুন নিয়ে খেলা) পড়েছিলাম স্টেশনে এলেই মন বিবাগী হয়ে যায়! মানব সভ্যতার ট্রেন যাত্রার এই শেষ ইস্টিশন। এখান থেকে ট্রেন যায় সোজা সেন্ট পিটার্সবুর্গে। হাজার কিলোমিটার রাস্তা, প্রায় ২৪ ঘণ্টা লাগে। মন কেমন উচাটন করে। যদি ওই ট্রেনের জানলায় বসে কাটিয়ে দিতে পারি একটা গোটা দিন!

    সন্ধ্যেয় শহরের পাবে চক্কর কাটা গেল, যেমন যেকোনো দেশে করা যায়। জুলাই মাসের উষ্ণ বিকেল, যেখানে রাত হয় ঘড়ির হিসেবে, আকাশের হিসেবে নয়। পাবে ইংরেজি জানা এক ভদ্রমহিলার সান্নিধ্য পেলাম। অনেক গল্প করলেন। গানবাজনা শোনা গেল – এমনকি ইংরেজিতেও, হয়তো আমাদের আনন্দবর্ধনের অভিলাষে। ভাষায় কুলোলে রাশিয়ানরা গপ্পো করতে ভালবাসে আমাদেরই মতন। মনেই হয় না, দেশ গাঁ থেকে এতদূরে এসেছি। আর সেই অন্তহীন দিন! রাত দুটোর সময় অনায়াসে হাতঘড়িতে সময় দেখা যায়। একটু আবছা হয়ে এলে ফিরলাম। চারটে নাগাদ সূর্যদেব দেখা দিলেন পুনরায়। হোটেলে ফেরার সময় গাড়িটা আছে কিনা তাও তাকিয়ে দেখিনি! একটু চোখ লেগেছে। দরজায় ঠক ঠক শব্দ। সেই প্রহরী। পরিষ্কার জার্মানে বললেন, ইহর আউটো ইসট দা (আপনার গাড়িটি আছে)।

    মানুষকে বিশ্বাস করেই জীবনটা কেটে গেল।

    নতুন রাশিয়ান ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয় হল পরের দিন। রাশিয়ান সীমান্তরক্ষী বলেছিলেন এখানে ক্রেডিট কার্ড চলে না। সেটা খাঁটি সত্যি। আমাদের হাতে ডলার নেই। আছে নরওয়েজিয়ান ক্রোনার, জার্মান ও ফিনিশ মার্ক আর বিলিতি পাউন্ড। শেষেরটা এখানে অচল। ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা বদলাতে হবে। ব্যাঙ্কের মহিলা বললেন, টাকা নেই। আমি ভাবলাম উনি হয়তো ঠিক বোঝেননি। আমি বললাম না, টাকা আমাদের কাছে আছে, আপনি সেটা রুবলে বদলে দেবেন। তিনি বললেন, আমাদের কাছে এখন আর কোন রুবল নেই। আজকের মত শেষ। কাল সকালের ট্রেনে পিটার (সেন্ট পিটার্সবুর্গ) থেকে আসবে। সারাজীবন ব্যাঙ্কিং করেছি। ব্যাঙ্কের ভাঁড়ারে টাকা নেই শুনলে আতঙ্ক হবার কথা। একেই তো রান অন দি ব্যাঙ্ক বলে! এ যে দেখি ভাঁড়ে মা ভবানী!

    আরেকটা ব্যাঙ্কে গিয়ে সেই একই প্রশ্ন করা গেল। কাউন্টারের মহিলা জানালেন, বিকেল নাগাদ ব্যাঙ্কে ক্যাশ ফুরিয়ে যায়, আবার সেই সেন্ট পিটার্সবুর্গের ট্রেনের অপেক্ষা। তবে আমাদের ভাগ্য ভাল। তাঁর ক্যাশ বাক্সোয় কিছু রুবল আছে। মার্ক মার্কা ক্রোনার তিনটেই কাউন্টারে রেখেছি – বেছে নিন মা জননী! তিনি বিনা দ্বিধায় জার্মান মার্ক হস্তগত করলেন। দুপুরে খাওয়ার খরচা মেটাবার মত রুবল পাওয়া গেল। পশ্চিমী কায়দার কোনো রেস্তোরাঁ চোখে পড়ল না। পথে কোনো দোকান নেই, কেবলই কমিউনিস্ট আমলের হলদে বাড়ি। হঠাৎ চোখে পড়ল, বাড়ির গায়ে একটু উঁচুতে লেখা আছে PECTOPAN। আমাদের স্বল্প সিরিলিক জ্ঞান থেকে জানি পি হল আমাদের আর, সি হল এস, বাকি অক্ষরগুলো রোমান আলফাবেটের সমার্থক অতএব রেসটোরান! যেটা পেলাম, তাকে দেখে মনে হয় যেন এটা কারো বাড়ির বসবার ঘর ছিল, সেটাকেই খাওয়ার জায়গা বানানো হয়েছে। এক পরিবার সেটির চালনা করছেন। খাবার বোধহয় তাঁদের নিজস্ব রান্নাঘর থেকে আসবে। বারান্দায় একটা মেনু মতন কিছু লটকানো। রাশিয়ান ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় লেখা নেই। তবে কি ভাগ্যে হাতে যে মেনুটি পেলাম, তাতে সিরিলিক ছাড়াও রোমান অক্ষরে ছাপা হয়েছে। কিছু খাদ্যদ্রব্যের জার্মান নাম পড়া গেল, আইটেম মেরে কেটে ছ’টা। রোমান অক্ষরে বরশট লেখা দেখে সেটাই চাইলাম – এই রাশিয়ান সুপ, সঙ্গে দই, ভুবন বিখ্যাত।



    মুরমানসকের রেস্টুরেন্ট PECTOPAN


    কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (কমান্ড ইকনমি) থেকে বাজারি অর্থনীতিতে উত্তরণ সহজ ছিল না। আর সেটা তখন সবেমাত্র শুরু হয়েছে রাশিয়াতে, অনতিকালের মধ্যে এই ওলটপালট অবশ্য পোল্যান্ড, চেক, রুমানিয়া ইত্যাদি নানান দেশে দেখব ।

    এর দু’বছর বাদে মস্কোতে সিটি ব্যাঙ্কের প্রথম ব্রাঞ্চ খোলা হয়। আমরা একটি কোম্পানির অধিগ্রহণের জন্য অর্থ সরবরাহ করি, আক্ষরিক অর্থে! বোতাম টিপে টেলেক্স পাঠানো নয় – সশস্ত্র প্রহরী-পরিবৃত ট্রাকে করে বিক্রেতার কাছে ক্রয়মূল্যটি অর্থাৎ থলি-ভর্তি অনেক রুবল পৌঁছে দেওয়া হয়! অনলাইন পেমেন্ট ছেড়ে দিন, চেকটাও চলে না। ১৮১২ সালে নাপোলেওঁ-র রাশিয়া অভিযানের আগের সপ্তাহে সিটি ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নিউ ইয়র্ক শহরে। আর এই সেদিন ১৯৯৬ সালে আরমার্ড ভ্যান দিয়ে ক্রেতার কাছে টাকা পাঠানোর গল্পটা সিটি ব্যাঙ্কে চাউর হয়ে যায়!

    এখানে অতি দ্রুত যোগ করি – ১৯৯৬ সালে টোকিওতে এটিএম বন্ধ হতে দেখেছি বিকেল পাঁচটায়। জাপানে চেকের ব্যবহার নগণ্য। গাড়ি কিনতে হলে এক বস্তা ইয়েন নোট নিয়ে যেতে হত। অতএব রাশিয়ান বলিয়া কোরো না হেলা।

    সবে দেড় বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের ফাইনাল হুইসল বেজেছে। পথেঘাটে কাস্তে-হাতুড়ি ও লেনিন সর্বত্র দৃশ্যমান, এমনকি পাবের সেই মহিলা বলে দিয়েছিলেন, কেজিবি-র বিরাট বাড়িটা দেখতে ভুলবেন না!



    একমাত্র লেড ফ্রি পেট্রোল স্টেশন


    রাস্তায় চলছে সেই ঐতিহাসিক রাশিয়ান গাড়ি লাদা ভোলগা, যাদের ইন্ধন অপরিষ্কার তেল (টু স্ট্রোক এঞ্জিন)। রাস্তায় সেই সব গাড়ির আধ পোড়া তেলের গন্ধ পাওয়া যায়। আমাদের গাড়ি চলে বিশুদ্ধ সিসেবিহীন (লেড ফ্রি) তেলে। এবার আরেকটা সংশয় – সেই তেল পাওয়া যাবে তো? ৩০০ কিমি ফিরতে হবে। ভাগ্যক্রমে নরওয়ের স্টাটঅয়েল কোম্পানি দ্বারা সঞ্চালিত একটি পেট্রোল পাম্প পাওয়া গেল। সবে খুলেছে। তারা সিসেবিহীন তেল বেচে। এখানে আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতা হল। যদিও পেট্রোল পাম্প একেবারে হাল ফ্যাশনের, পাম্পের নজল টেনে তেল পেলাম না। তাহলে কি আমাদের দেশের মত? সেলফ সার্ভিস নয়, ফোর কোর্ট সার্ভিস? আমাদের বিড়ম্বনা অনুধাবন করে ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এলেন বললেন, ‘ইউ পে ফার্স্ট’।

    বোঝা গেল। ঝটপট তেল ভরে নিয়ে পয়সা না দিয়ে কেউ যাতে হাওয়া হয়ে না যেতে পারে, তাই হয়তো এই ব্যবস্থা। সে আমলে রাশিয়াকে ওয়াইল্ড ইস্ট কি সেই কারণেই বলা হত?

    দু’বছর বাদে ভেনিস বিচ থেকে বেরিয়ে প্রথম গ্যাস স্টেশনে (পাঠক আমার আমেরিকান ইংরেজি জ্ঞান লক্ষ করুন) তেল ভরতে গিয়ে জানলাম, সে দেশেও পেহলে পয়সা, পিছে তেল! ক্রেতার প্রতি অবিশ্বাস একই – সে মুরমানসক হোক আর সান্টা মনিকা হোক।

    অনেক বছর আগে ফিনল্যান্ডের রোভানিয়েমিতে সুমেরু বৃত্ত পার হয়ে অসম্ভব পুলকিত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল চেনা পৃথিবী ছেড়ে কতদূরে এলাম। মুরমানসক এসে মনে হল পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে পড়েছি – উত্তর মেরু চার হাজার কিলোমিটার, নিকটবর্তী রাজধানী শহর হেলসিঙ্কি তেরোশ’, মস্কো দু’হাজার, রাশিয়ার পূর্ব প্রান্তে ভ্লাদিভস্তক দশ হাজার কিলোমিটার। বোলপুর মাত্তর ছ’হাজার! পিরকো আর আমি হেঁটে চষে ফেলেছি সারা শহর। খাঁটি সোভিয়েত স্টাইলের বাড়িঘর। পোক্ত গঠন, বর্ণহীন কংক্রিট। নতুন রাশিয়াতে আমরা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, সেটা বেশ বুঝতে পারি। মানুষজনের চোখে পিরকো তবু মিশে যেতে পারে রাশিয়ানদের সঙ্গে, কিন্তু সে যার হাতটি ধরেছে সেই মানুষটি প্রচণ্ড কৌতূহলের বস্তু!

    দু’দিন বাদে সেই একই পথ দিয়ে ফিরছি। পিরকোর খুব ইচ্ছে ছিল লিনাখামারি অবধি যাওয়া। তার গ্রামের বাড়ি পুওলাঙ্কায়, সেখানে সে ফিনিশ নাবিকদের গল্প আর গান শুনেছে। আমার সাহসে ঠিক কুলোয়নি। আমাদের ভিসায় গন্তব্য স্থল মুরমানসক লেখা আছে। পথ ভুল করে সেই আর্কটিক বন্দরে হাজির হয়েছি বললে রাশিয়ান পুলিশ বিশ্বাস করবে না, উলটে আমাদের হাওয়ালাতে পুরে দেবে। সিটি ব্যাঙ্কের ভারি বয়ে যাবে জামিন দিয়ে আমাকে উদ্ধার করতে – তাদের কাজে তো আসিনি! তবু পেচেঙ্গায় থামলাম। তাদের বিশ বছরে ফিনল্যান্ড কোনো ছাপ রেখে যায়নি। সোজা সোজা রাস্তা, ছ’তলা হলদেটে বাকসো বাড়ি সোভিয়েত ইউনিয়নের আপন স্টাইলে। জুলাই মাসের উজ্জ্বল দিনেও মানুষ হাঁটে একাকী, শিশুদের কলরব, হাসি, গান-শূন্য পথঘাট। নিজেকে মনে হয় একান্ত নির্বান্ধব।

    এবার ফেরা।

    শেঙ্গেন চুক্তি তখনও বলবৎ হয়নি। ইউরোপে সীমান্ত পার হবার সময়ে জানলা থেকে পাসপোর্ট আর জানলার কাচ নামিয়ে যাত্রীদের সুরত দেখালেই প্রহরী ছাপ মেরে দেশত্যাগের অনুমতি দিতেন। আজও ক্যালে বন্দরে সেই একই কানুন জারি। রাশিয়ান চৌকিতে গাড়ি থামানোর নির্দেশ পেলাম। দু’জন সশস্ত্র প্রহরী গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলেন। এবার সব দরোজা এবং বুট খুলে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অত্যন্ত অভ্যস্ত হাতে ছানবিন চলল। ভাবলাম বাঙলায় বলি, নিকেল খুঁজছেন নাকি?

    কোনো লুক্কায়িত ধন বা প্রাণী না পেয়ে, কিঞ্চিৎ নিরাশভাবে অঙ্গুলিহেলন করে এক প্রহরী আবার সেই মানুষ পরীক্ষার কারখানার ঢোকার আদেশ দিলেন। বললে পেত্যয় যাবে না – মনে হলো একটা টাইম মেশিনে ঢুকে পড়েছি। সেই টানা লম্বা ডেস্ক, গম্ভীর মুখে সার দিয়ে পরীক্ষক বসে। উলটো দিকের জীর্ণ সোফায় কয়েকজন বসে আছেন, তাঁদের হাতে কাল অন্তহীন, দৃষ্টি উদাসীন। মাঝখানে দুটো দিন কেটে গেছে। চিত্রপট পূর্ববৎ।

    আমাদের পরীক্ষক পাসপোর্ট দু’টি মনোযোগ সহকারে দেখলেন।

    - কোথায় গিয়েছিলেন?
    - এই, মুরমানসক
    - আর কোথাও?
    - না, মানে ভিসাতে মুরমানসক লেখা আছে তো।
    - কোথায় ছিলেন?

    পিরকোর যে কী পরিষ্কার মাথা! ব্যাগ খুলে আর্কটিক হোটেলের বিলটি টেবিলে রাখল।

    এবার তিনি আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। পাসপোর্টে ছাপ মেরে আমাদের শুভ যাত্রা কামনা করলেন। আবার আমরা আমাদের সবেধন নীলমণি রাশিয়ান শব্দটি ব্যবহার করার সুযোগ পেলাম। স্পাসিবা বলেই দ্রুত প্রস্থান।

    ভাগ্যিস লিনাখামারি যাইনি। কে জানে কোনো গোয়েন্দার কাছ থেকে নরওয়েজিয়ান রেজিস্টার্ড গাড়ির খবর চলে আসত এই পরীক্ষাগারে!

    সন্ধ্যে নাগাদ এলভেসেনের নরওয়েজিয়ান সীমান্ত পার হলাম। প্রহরী বেজোড় দু’টি মানুষকে দেখে স্মিতহাস্য সহকারে বললেন
    - কতদূর গিয়েছিলেন?
    - এই মুরমানসক। দু’দিনের জন্যে।

    কথাটা এমনভাবে বললাম যেন সেথায় আমার নিত্যি আসাযাওয়া। পাসপোর্টে ছাপ দিয়ে জানতে চাইলেন, এবার কোথায় যাব?

    - ইভালো!

    ইউরোপের এই একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে তিনটি বিভিন্ন ভাষাভাষী, তিন সময়সীমার দেশ আধঘণ্টার দূরত্বে আপোষে করমর্দন করতে পারে।

    নাইডেনে নরওয়ে সীমান্ত পেরিয়ে আপন দেশে ঢুকে পিরকো বললে, এই গোটা যাত্রাটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম। অনুমতি ছাড়াই গাড়ি নিয়ে রাশিয়া ঢুকেছি, আমাদের নিরাপত্তা, গাড়ির সুরক্ষা, এমনকি তেলের চিন্তাও করিনি!

    আমি বললাম ‘শোনোনি বিসমার্কের কথা? দুনিয়ার সকল নির্বোধ, মদ্যপ চালক আর শিশুদের ভার দৈব একাকি বহন করেন’।

    এবার লাপল্যান্ড। সেটা আরেক গল্প।


    ক্রমশ...
  • ধারাবাহিক | ১৬ জুলাই ২০২২ | ১১৪৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2401:4900:1f2a:4c38:810b:2976:e95f:c282 | ১৬ জুলাই ২০২২ ১৩:২৬509927
  • আ পিক ইনসাইড দ্য আয়রন কার্টেন! (যদিও লেখার থেকে মনে হলো হীরেনবাবু যখন গেছেন তখন আররন কার্টেন সদ্য ভেঙে পড়েছে)। আপনার অন্য লেখাগুলোর মতোই ভাল্লাগলো।  
  • যোষিতা | ১৬ জুলাই ২০২২ ১৩:৩৯509928
  • বরশট  নয় বোর্শ্
  • যোষিতা | ১৬ জুলাই ২০২২ ১৩:৪০509929
  • РЕСТОРАН রেস্তারান
  • যোষিতা | ১৬ জুলাই ২০২২ ১৪:০৭509933
  • শিশুদের কলরব, হাসি, গান-শূন্য পথঘাট। 
     
    এরকম লিখলেন কেন? 
  • হীরেন সিংহরায় | ১৬ জুলাই ২০২২ ১৬:১৫509940
  • পেতসামোর  বিকেলে সেই রকম মনে হয়েছিলো বলে। 
  • Amit | 60.242.75.121 | ১৬ জুলাই ২০২২ ১৬:৩৯509941
  • লেখার গুনে পড়তে পড়তে মনে হয় আমরাও সাথে সাথে পিরিয়ড ট্রাভেল করে এলাম। যথারীতি দারুন। 
  • Kishore Ghosal | ১৬ জুলাই ২০২২ ১৯:৫৯509943
  • অদ্ভূত ভ্রমণ কাহিনী। অনবদ্য। রহস্য গল্প পড়ার মতোই, কেমন এক টানটান উত্তেজনা অনুভব করলাম। আবার বলি, অদ্ভূত।  
  • Krishna Malik (Pal ) | ১৮ জুলাই ২০২২ ১৫:২৯510005
  • আমি আজ প্রথম পড়লাম। খুশিতে আগের পর্বগুলোও পড়ে ফেলব। 
  • হীরেন সিংহরায় | ২০ জুলাই ২০২২ ১৩:৫৮510075
  • শ্রী ডি সি কিশোর শ্রীমতি মল্লিক আপনাদের সকলকে জানাই আমার অজস্র ধন্যবাদ ।  গল্প অনেক - বস বলে যাবার মতন সময় হাতে আছে কিনা জানি না যদিও। 
  • Manoj Ray | 223.191.49.37 | ২৩ জুলাই ২০২২ ১২:৩৪510183
  • হীরেন বাবু 
    আমার নমস্কার জানবেন।
    গুরু রোজ দেখা হয়না 
    অনেকদিন পর আজ 
    আবার আপনার লেখা দিয়েই
    শুরু করলাম।
    লেখা সম্বন্ধে কিছু বলা
    বাহুল্য হবে।
    ভালো থাকবেন।
  • হীরেন সিংহরায় | ২৫ জুলাই ২০২২ ১২:১৩510300
  • শ্রী মনোজ রায়
     
    অশেষ ধন্যবাদ । আপনাদের উৎসাহে এগোচ্ছি 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন