এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ইতিহাস  শনিবারবেলা

  • পূর্ব ইউরোপের ডায়েরি – রাশিয়া ৭

    হীরেন সিংহরায়
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৭৬৯ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (৪ জন)
  • ১৭ আগস্ট মুদ্রা (বিদেশি) ভান্ডার শূন্য


    খেলা ভাঙার খেলা (১)


    আগস্ট ১৯৯৮



    ১৯৯১ সালের ছাব্বিশে ডিসেম্বর কাস্তে-হাতুড়ি সজ্জিত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতাকা নেমে গেল ক্রেমলিনের চুড়ো থেকে। দেশটাই যখন নেই, প্রেসিডেন্টের কী প্রয়োজন? বাকস্বাধীনতা (গ্লাসনস্ত) এবং সংস্কারের (পেরেস্ত্রইকা) উদ্গাতা মিখাইল গর্বাচভের ছুটি। রাশিয়া নামক দেশটার কর্ণধার হলেন বরিস ইয়েলতসিন।

    এবার ইউরোপ-আমেরিকা-এশিয়ার ব্যাঙ্কগুলিসহ তাবৎ লগ্নিকারকদের মোচ্ছব লেগে গেল। অকস্মাৎ তাঁরা একটি নতুন ঠিকানা খুঁজে পেলেন। তার নাম রাশিয়া। মস্কোগামী প্লেনে জায়গা পাওয়া যায় না। হোটেলের ঘর ভাড়া ইউরোপের শীর্ষে। ৩০০ ডলারের নিচে কোনো ঘর মেলে না। নিউ ইয়র্ক তার অর্ধেক। ফ্রাঙ্কফুর্টে আরও কম। আমরা সবাই এই উন্মাদনার পক্ষিরাজে সওয়ার। শুধু রাশিয়া কেন, সিটি ব্যাঙ্কের হয়ে ইতোমধ্যে আমরা পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক, রোমানিয়ায় ব্যাবসা শুরু করেছি। সেসব দেশে একের পর এক প্রতিষ্ঠানকে দুনিয়ার বাজারে আনছি তখন। এককালের কমিউনিস্ট ইউরোপের ভোল বদল হল। তাদের সঙ্গে কাজ কারবারের গোপন রহস্য আয়ত্ত করে ফেলেছি – এমনি ভাব করে লন্ডন-প্যারিসের বাজারে সিটি ব্যাঙ্ক শার্টের কলার উলটে হাঁটে তখন। রাশিয়ার তুলনায় সেসব দেশ অবশ্য অতি নগণ্য, ঋণের পরিমাণ নস্যি। রাশিয়ার ময়দান (আদতে ফারসি, এ শব্দটি ইউক্রেনিয়ান ও রুমানিয়ানেও আছে!) বিশাল, সেখানে মুনাফার সম্ভাবনা অসীম।

    গাজপ্রমের অসাধারণ প্রথম সাফল্যের পরে আমরা আবার তাদের বাজারে নিয়ে এলাম। পুনর্বার ইউরোপীয় আমেরিকান ব্যাঙ্কেরা তাঁদের সমানভাবে ঋণদান করে সম্বর্ধনা জানালেন। গাজপ্রমের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিদেশি ঋণের বাজারে এল অনেক নবগঠিত রাশিয়ান ব্যাঙ্ক। তাদের ইতিহাস খুব বেশি হলে তিন বছরের।

    বাল্যকাল থেকে আমাদের দেশে যে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা চিনেছি, সেখানে ব্যাঙ্কের প্রায় সকল প্রকার বাণিজ্যিক ব্যাবসার অধিকার ছিল। বিদেশি মুদ্রার কারবার অবশ্যই যথাযথ সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে। পূর্ব ইউরোপীয় কম্যুনিস্ট অর্থনীতিতে সেটির চেহারা সম্পূর্ণ অন্যরকম। প্রত্যেক দেশে আন্তর্জাতিক ব্যাবসায়ের জন্যে আলাদা সরকারি ব্যাঙ্ক – যেমন পোল্যান্ডে হ্যান্ডলোভে, রাশিয়াতে ভনেশইকোনোম, রুমানিয়াতে ব্যানকোরেকস, চেকে সিএসওবি, হাঙ্গেরিতে হাঙ্গেরিয়ান ফরেন ট্রেড ব্যাঙ্ক, ইত্যাদি। আমদানি-রপ্তানি সহ বিদেশি মুদ্রাজনিত কারবার এই ব্যাঙ্কগুলির হাতে ছিল। আমরা কেবল এদের চিনতাম। দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাঙ্কিং ছিল অন্যরকম। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের শাখা সারা দেশে ছড়ানো, অনেকটা আমাদের দেশের পোস্ট-অফিস, ব্যাঙ্কের মত। সেখানে টাকা জমা দেওয়া যেত, তোলা যেত। যে ধরনের চেকবই ব্যবহার করে আমি আপনার দেনা চুকোতে পারি, সেটির অস্তিত্ব ছিল না (অগ্রিম টাকা জমা দিয়ে আপনি একটি চেক, যাকে আমরা ব্যাঙ্ক ড্রাফট বলে চিনি, পেতে পারতেন; সেটার কথা হচ্ছে না)। আপনার থাকতো একটি পাশবই। সেখানে টাকা জমা বা ওঠানোর সংখ্যাটি লেখা হত। আমার শ্বশুরবাড়ির দেশ রোমানিয়াতে তাই দেখেছি (এটি ভারতে প্রচলিত ছিল বহুদিন – পাঁচের দশকে ঝরিয়াতে বাবার পাসবুক ছিল, জার্মানিতে এর অস্তিত্ব দেখেছি আটের দশক পর্যন্ত)। মর্টগেজ, ক্রেডিট কার্ড, ওভারড্রাফট নামক পশ্চিমী ব্যারাম পূর্বকে স্পর্শ করেনি। ব্যাঙ্ক মানে টাকা রাখার বা তোলার আখড়া।

    অকস্মাৎ এক সুপ্রভাতে পশ্চিমী স্টাইলের ব্যাঙ্কিং শুরু হল মস্কো, লেনিনগ্রাদে। সেই ব্যাবসায় সাহায্য করার জন্য আমরা দ্বিগুণ উৎসাহে পথে নেমে পড়লাম। আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণ যারা দেবেন, তাঁরা গ্রহীতার বিগত পাঁচ বছরের ইতিহাস ও আগামী অন্তত তিন বছরের ভবিষ্যৎ জানতে চাইবেন। আমরা নির্ভয়ে সম্ভাব্য নিবেশকদের জানাতাম, অতীত নিয়ে প্রশ্ন করা বাতুলতা মাত্র। রাশিয়ান ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা পশ্চিমী ব্যাঙ্কের কায়দায় চলেনি। কম্যুনিস্ট আমলে ব্যাঙ্কিং কোনো বাজারি দোকান নয়, কেবলমাত্র শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থে পরিচালিত এক কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে লাভ, লোকসান, বাজেট আলোচনার স্থান নেই। অর্থনীতি ছিল ক্যাশ ভিত্তিক – নগদ টাকা এবং নিতান্ত স্বল্প মেয়াদি জমা নির্ধারণ করতো বাজারের ক্রয় ক্ষমতা (আমরা যাকে এম ওয়ান বলি)। ধরুন আজ সকালবেলা কলকাতার হাটে, দোকানে, শপিং মলে যা কেনাবেচা হবে, তার কিছুটা নগদে, অনেকটা কার্ডে – অর্থাৎ ক্যাশের চেয়ে বেশি (এম টু)। দেশের অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ – মানি সাপ্লাই – শুধু নগদে মাপা হয় না। যোগ হয় চেক, হুন্ডি, মেয়াদি জমা ইত্যাদি। প্রতি স্তরে সেই সরবরাহের পরিমাণ বেড়ে যায়। এম ফোর অবধি হিসেব হয়। তবে এখানে অত কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। কমিউনিস্ট অর্থনীতিতে দেশের সামগ্রিক অর্থ সরবরাহ আর নগদের পরিমাণ ছিল প্রায় সমান।

    এখন নতুন ব্যাঙ্ক, নতুন বাণিজ্য। কাগজে নতুন গল্প বা নামতা লেখা হবে। আমাদের গল্প ভবিষ্যতের। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এত বড়ো দেশ রাশিয়া – তার মাটি খুঁড়লে মেলে তেল, গ্যাস, সোনা, হীরে। বিশাল জনসংখ্যা। এই সব মানুষেরা এবার নিজের ইচ্ছেমত টাকা জমা করবেন তাঁদের পছন্দমত কোনো ব্যাঙ্কে, কেন্দ্র নির্দেশিত প্রতিষ্ঠানে নয়। ব্যয় করবেন আপন ইচ্ছেমত কেবল রুবলে নয়, সাধ্যে কুললে ডলার, মার্কে। সরকারি দোকানে পাওয়া যাচ্ছে বলেই লাল রঙের জামা কিনবেন না, বিভিন্ন দোকানে ঘুরে নীল, সবুজ রঙের জামাও দেখবেন। হয়তো টি-শার্ট খুঁজবেন। পয়সা কম পড়লে ব্যাঙ্কের কাছে টাকা ধার করবেন। ট্যাঁকে বেশি পয়সা থাকলে জমা করবেন, বন্ড বা ঋণপত্র কিনবেন। নবলদ্ধ ব্যক্তি-স্বাধীনতা শুধু বহুদলীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার রাজনৈতিক অধিকার নয়। ইচ্ছেমতন খরচা করার স্বাধীনতা তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িত।

    ১৯৯৭ সালে রাশিয়ান সবের ব্যাঙ্ককে আমরা আন্তর্জাতিক ঋণের বাজারে নিয়ে যাই। জমা টাকার পরিমাণ দিয়ে মাপলে পৃথিবীর যাবতীয় সেভিংস ব্যাঙ্কের প্রায় শীর্ষে সে ব্যাঙ্ক। সারা দেশের মোট জমার ৮৫% ছিল এই ব্যাঙ্কের কোষাগারে। রাশিয়ানরা টাকা বাঁচাতেন। নিতান্ত সঞ্চয়ী বলেই নয়, তাঁদের টাকা খরচা করার বিশেষ রাস্তা ছিল না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা – বিনামূল্যে প্রাপ্য। মার্সিডিজ গাড়ি বা বিদেশভ্রমণ কল্পনার বাইরে। সরকারি দোকানে ভদকা মেলে নিতান্ত ন্যায্য মূল্যে।

    এই ব্যাঙ্কের জন্য এক বিরাট পরিমাণের ঋণ আমরা সংগ্রহ করি আর তার সুদের হার ছিল লাইবরের (যে হারে লন্ডনের ব্যাঙ্কেরা এক অপরকে ধার দেন – পর্ব ৬ পশ্য) ওপরে ০.৭৫%, মোটের ওপর ৬%। মেয়াদ দু’বছর।



    সবের ব্যাংক হেড অফিস


    এককালে ওয়েস্টওয়ার্ড হো শুনেছি। এখন ইস্টওয়ার্ড গো! গো ফাস্ট। রান বিফোর দি গোল্ড রানস আউট!

    আমরা কীসের বিশ্বাসে পথ হেঁটেছিলাম সেদিন? দুটো মানুষের দুটো হাত, দুটো পা, একটা মাথা থাকলেই তারা একভাবে চিন্তা করে না, একই দিকে হাঁটে না। ম্যানহাটানের পার্ক এভেনিউতে লেখা যে সংবিধানকে শিরোধার্য করে কাজ করেছি, সেই একই দেশে, একই শহরে একটা রাস্তার পরে ম্যাডিসন এভেনিউতে চেজ ম্যানহাটানের পাঠ্যপুস্তক অন্যরকমের। সান ফান্সিসকোর মন্টগোমেরি স্ট্রিটের ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা যে আমলে বিশ্বজোড়া ব্রাঞ্চ অথবা ফাঁদ পেতেছিল, কোনো আমেরিকান ব্যাঙ্ক তার অনুসরণ করেনি। নয়ের দশকে সিটিব্যাঙ্ক যখন একশ’ দেশে দোকান খুলেছে, ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা প্রায় গুটিয়ে ফেলেছে তার দুনিয়াদারি। ফরাসি ব্যাঙ্কিংয়ের বিরাট অংশ তখন সরকারি মালিকানায়। আপন দেশের বাইরে নর্ডিক, জার্মান বা অস্ট্রিয়ান ব্যাঙ্কের শাখা নিতান্ত সীমিত ছিল, আজও আছে। কোন মূর্খ বলে, ব্রিটিশ আর জার্মান ব্যাঙ্কিং একই কায়দায় চলে? জার্মান ব্যাঙ্ক সেভিংসে টাকা জমা নিতে পারে, আপনাকে বাড়ি কেনার জন্য ধার দিতে পারে, তেমনি বিএমডব্লিউ-র শেয়ার কেনাবেচা করতে পারে নিজের খাতায়, কারণ তারা ইউনিভার্সাল ব্যাঙ্ক। এই সেদিন অবধি শেয়ার কেনাবেচা বা খাঁটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিংয়ের জন্য ব্রিটেন-আমেরিকায় আলাদা লাইসেন্স লাগত। সে কাজ যারা করত, ব্রিটেনে তাদের নাম মার্চেন্ট ব্যাঙ্ক – এঁদের বাণিজ্য পদ্ধতি ঝুঁকিবহুল বলে জনগণের ডিপোজিট নেওয়ার অধিকারী ছিলেন না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা অন্যান্য মার্চেন্টদের বাণিজ্যবিস্তারে ঋণ সরবরাহ করতেন – তাই লোকমুখে এদের নাম হয়ে যায় মার্চেন্ট ব্যাঙ্ক। ১৯৩৬ সাল থেকে পরের সত্তর বছর আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কেরা এই পথেই হেঁটেছে। সে সব ব্যাঙ্কে জমা রাখা টাকার ওপরে কোনো সরকারি সুরক্ষা বা ডিপোজিট ইন্সিউরেন্স পাওয়া যেত না।

    আমরা ইউরোপ-আমেরিকায় অনেকবার দেখেছি, এখনও দেখে যাচ্ছি – মুনাফা আয় এবং লোকসান করার কোনো বাঁধাধরা পথ নেই। আমরা নিত্যিনতুন যেমন সোনার খনির সন্ধানে হাতুড়ি পিটিয়েছি, তেমনি জ্ঞানে-অজ্ঞানে নিজের তৈরি খাদে ডুবেছি। লোকসানের পথ আকীর্ণ হয়ে আছে বহু প্রলোভনে। কোনো পূর্ব-পশ্চিম নেই। এর পিছনে খেলা করে মানুষের লাগামছেঁড়া লোভ। কখনো নিছক মূর্খতা। কোনটা যে কখন প্রখর হয়ে ওঠে, তা বোঝা শক্ত।

    রাশিয়াতে তখন নানান রকমের খেলা চলছে। কেবল মাত্র ভাউচার বা টিকিট কেনাবেচা করে সরকারি কোম্পানিগুলির মালিকানা বদলে গেল। দুর্নীতির দখিন দুয়ারটি খোলা পেয়ে অনেক ধুরন্ধর বাগালেন এক অভাবনীয় সম্পত্তি। এঁরা অলিগার্ক নামে সম্মানিত হলেন – মুষ্টিমেয় মানুষ অন্যায়ভাবে অগাধ সম্পদের অধিকারী হলেন। কেজিবি বা এফএসবি-র সঙ্গে যাঁদের মাখামাখি যত বেশি, তাঁরা তত বড়লোক। ভালো হোক, মন্দ হোক – সত্তর বছরের পরীক্ষিত, প্রমাণিত কেন্দ্রীয় অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত।

    যেখান থেকে খাজনা আদায় করে বাকি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বিশ্ববাসীকে মস্কো এতদিন তার ফুটুনি দেখিয়েছে, সেই চোদ্দটি পরগনা আলাদা হয়ে গিয়ে চালু করেছে আপন মুদ্রাব্যবস্থা ও সংবিধান, উড়িয়েছে নিজের পতাকা। মস্কো, লেনিনগ্রাদ, কাজান, ভ্লাদিভস্তক অর্থের অভাবে ধুঁকছে তখন। রাশিয়ান সরকার ঘোষণা করলেন, ব্যাঙ্ক যদি সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থ ঋণ দিতে রাজি থাকে, সুরক্ষা হিসেবে সরকার বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার সে ব্যাঙ্কের কাছে জমা রাখবে। একটি নিলামের মাধ্যমে এটির দর স্থির হবে। যে ব্যাঙ্ক বেশি দাম দিতে রাজি, সে ব্যাঙ্ক পাবে এই বন্ধকি শেয়ার সামগ্রী। সরকার যথাসময়ে ঋণ পরিশোধে অপারগ হলে ব্যাঙ্ক সেই শেয়ারের মালিক হবে। মানুষ বাড়িঘর বন্ধক দিয়ে ধার নেয়, এ ব্যাবসা আমাদের চিরচেনা। এক সরকার তার জাতীয় সম্পদ বাঁধা দিয়ে পুলিশ, সৈন্যবাহিনী পুষবে, কলের জল সরবরাহ এবং রাস্তা মেরামত করবে – এই জাতীয় বিচিত্র আদানপ্রদানের প্রকল্প আমাদের অজানা ছিল। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, মাফিয়াগিরির আরেকটা রাস্তা খুলে গেল। এই পথ দিয়ে নানান ব্যাঙ্ক – আসলে তাদের মালিকরা – অনেক তেল, গ্যাস ও ধাতু সংস্থার মালিক হলেন নামমাত্র মূল্যের বিনিময়ে। আমরা জানি, এই নিলাম প্রথাটিও একটি বৃহৎ ধাপ্পা ছিল।

    চেলসি ফুটবল ক্লাবের শেষ মালিক এই হঠাৎ-নবাবদের অন্যতম প্রতিভূ।

    এবার ব্যাঙ্কগুলি আরেকটি উপার্জনের পথ খুঁজে পেলেন। সরকারকে স্বল্প মেয়াদে ধার দেওয়া। যাকে আমরা সরকারি বন্ড বা ট্রেজারি পেপার বলে জানি। রাশিয়াতে এর নাম জিকেও (লোকমুখে গেকো) বা স্বল্পমেয়াদী সরকারি প্রতিশ্রুতিপত্র। প্রাক্তন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রাউ মেরকেল বলেছিলেন, ‘আমি ঘরণী, আমি আয়ব্যয়ের হিসেব মিলিয়ে চলি। আমার দেশের জন্যেও তাই করি’। বাস্তবে দুনিয়ার সব দেশের সরকার তার আয় (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর) আর ব্যয়ের ঘাটতি পূরণ করেন আম জনতা, ব্যাঙ্ক, ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড সকলের কাছ থেকে আপন দেশীয় মুদ্রায় ধার করে। তার মেয়াদ ১৮০ দিন, ৩৬০ দিন, কখনো দু’ বছর – আমেরিকায় সেটা দশ বছরও সম্ভব। দেনাদার আপন দেশের সরকার। সে তো আর কখনো “ফেল “ করতে পারে না। ১৯৯৬/৯৭ সালে রাশিয়ানদের তুরুপের তাস গ্যাস, খনিজ তেল রপ্তানি। তার বাজারদর কমতির দিকে। অতএব রাজস্বে ঘাটতি বাড়ছে। ধারের পরিমাণও বাড়ছে। বাঘ রক্তের স্বাদ পেল। বাজারে দাবি – ধার দেবো, তবে সুদের হার বাড়াতে হবে। চড়তে লাগল সুদের হার। এক সময় সরকারি ঋণপত্রের সুদ বেড়ে ৮৫% হল, মানে ধরুন, এক বছরে টাকা প্রায় ডবল। বিনা ঝুঁকিতে। কোথায় লাগে সঞ্চয়িতা, সারদা?

    সরকারি ঋণপত্র কেনাবেচা করে রাশিয়ান ব্যাঙ্কগুলিকে মালামাল হতে দেখে, রাশিয়া বা মস্কো ম্যাপেও যারা ভালো করে কখনো দেখেননি – এমন সব পশ্চিমি গণ্যমান্য বিখ্যাত অর্থ-প্রতিষ্ঠানগুলির টনক, ঈর্ষা ও লোভ একই সঙ্গে জেগে উঠল। মেরিল গোল্ডম্যান, সলোমন লেমান-সহ ওয়াল স্ট্রিটের সকলের একমাত্র লক্ষ – রাশিয়া। সবাই এই লাভজনক ব্যাবসায়ের ময়দানে নামতে চায়।

    পূর্ব আজি খুলিয়াছে দ্বার
    সেথা হতে সবে আনে উপহার

    এখানে একটি ছোট্ট সমস্যা দেখা দিল। রাশিয়ান সরকার ধার নেবে নিজের দেশের মুদ্রায়, রুবলে। তারা বিদেশি মুদ্রায় টাকা ফেরত দেবার ঝুঁকি নিতে চাইবে কেন? সরকারের আয় রুবলে, ব্যয় রুবলে। অতএব ধারও রুবলে। ব্যাঙ্কার্স ট্রাস্ট, ক্রেদি সুইস ইত্যাকার মহৎ প্রতিষ্ঠান বললে, কুছ পরোয়া নেহি। আমরা ডলার দিয়ে রুবল কিনব। সেই রুবল ধার দেবো রাশিয়ান সরকারকে। তারা যখন ফেরত দেবে, সেটা দিয়ে ডলার কিনে আমার আমেরিকান নিবেশককে টাকা ফেরত দেবো। মনে রাখতে হবে, এঁরা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক। এঁরা নিজের নয়, অপরের পয়সা বিনিয়োগ করেন ও মাঝের দইটুকু নেপোর মতন মারেন। তবে লোভ বেড়ে গেলে নিজের পয়সাও লাগান। এই সব আমেরিকান ও ইউরোপীয় ব্যাঙ্কের দামী স্যুট, মহার্ঘ্য ড্রেস পরা এমবিএ পাশ করা বিক্রেতারা বেরিয়ে পড়লেন গেকো (জি কে ও) নামক ঋণপত্রটি লোকের হাতে ধরিয়ে দিতে।

    সত্যঘটনা অবলম্বনে লিখিত একটি সংক্ষিপ্ত চিত্রনাট্য:
    জেএফকে থেকে মিলওয়াকি-গামী সকালের প্রথম হাওয়াই জাহাজ ধরেছেন ব্যাঙ্কার্স ট্রাস্টের চার্লি। নেমেই ট্যাক্সি চড়ে হাজির হলেন ৭৮৬ নর্থ ওয়াটার স্ট্রিটের মিলওয়াকি পৌরসভার কর্মীদের পেনশন ফান্ড ম্যানেজার বিলের অফিসে। বিলকে তিনি মাঝেমধ্যে আমেরিকার অন্যান্য শহরের পৌরদপ্তরের মিউনিসিপাল বন্ড বা ঋণপত্র বেচেন।

    কফি ও আমড়াগাছি শেষ।

    চার্লি: বিল, আজ আমি একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রস্তাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছি! এক বছরে টাকা ডবল! শিকাগো শহরের পাঁচ বছরের বন্ডে কত আর সুদ পাও? পাঁচ পারসেন্ট মেরেকেটে?
    বিল: শিকাগো আর কত দেবে? নিউ ইয়র্কের মতোই তারাও তো প্রায় দেউলে! ব্যাঙ্ক-নোটে জর্জ ওয়াশিংটনের ছবির মতন সেনেট ও সরকার পেছনে না থাকলে তাদের কে ধার দিত? তা তোমার প্রস্তাবটি কী? আগে কহ আর (টেল মি মোর)।
    চার্লি: জানো নিশ্চয়, রাশিয়াতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়েছে। আর লাল ঝান্ডা ওড়ে না। তারা বাজারি অর্থনীতিতে নেমে পড়েছে আমাদের মতন। রাশিয়ান সরকার নিজের খরচা মেটানোর জন্য বাজার থেকে টাকা ধার করে স্বল্প মেয়াদে। সরকারি ঝুঁকি। এই যেমন আমেরিকান ট্রেজারি করে থাকে, অত্যন্ত কম সুদে। সেটা ডলারের দেনা। তবে এখানে তুমি ধার দেবে রুবলে।
    বিল (চিন্তিত): আমার কাছে ডলার আছে। ওই রুবল না রাবেল – সেটা তো নেই।
    চার্লি: আঃ! সে জন্যে তো আমি আছি। তোমার ডলার বদলে রুবল কিনবো। এক বছর বাদে তোমার ডবল হয়ে যাওয়া রুবলকে ডলারে ফেরত দেব। লাভ শুভ।
    বিল (হৃষ্ট): চার্লি, আমি আছি! কাউন্ট মি ইন!
    চার্লি: তাহলে কত লিখব? হাউ মাচ ডু আই কাউনট ইউ ইন ফর?
    বিল: এ মিল।
    চার্লি: ইটস এ ডিল। লেট আস হ্যাভ লাঞ্চ।

    লন্ডন, প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্ট, নিউ ইয়র্কের অনেক মহতী সভাস্থলে ভাষণের সূচনায় আগাম ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি – আমি ঝোপঝাড়ের পিছন থেকে আসা মানুষ (আই অ্যাম এ ম্যান ফ্রম দি ব্যাক অফ দি বুশ)। পঠিত জ্ঞানগম্যি কম। যেটুকু জানি বলে মনে করি, সেটি একান্ত অভিজ্ঞতা-প্রসূত। বয়ানে কোনো গলতি হলে শ্রোতা যেন নিজগুণে ক্ষমা করেন। তাই চার্লির ব্যাঙ্কিং-বিদ্যার সমালোচনা করার আমি কে?

    একটা প্রশ্ন মনে এসেছিল।

    এখানে নিবেশক কি দু’টি ঝুঁকি নিচ্ছেন না? রাশিয়ান সরকারের অর্থ ফেরত দেবার সামর্থ্য (ক্রেডিট রিস্ক) আর রুবল/ডলারের দরের ওঠানামা (এক্সচেঞ্জ রিস্ক)। ইতোমধ্যে, ১৯৯৭ সালে, পূর্ব এশিয়াতে – বিশেষ করে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াতে ঠিক এই নাটক কি দেখিনি? থাই ‘বাট’ আর ইন্দোনেশিয়ান ‘রুপিয়া’-র দাম ডলারের হিসেবে অনেকটা নিচে নেমে গিয়ে সুদ-লোভী নিবেশকদের নাঙ্গা করে দিয়েছে।

    ১৯৯৪ সালে রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলতসিন বলেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে একটিও অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ সুসম্পন্ন হয়নি। ব্যাঙ্কাররা অস্বস্তিজনক মন্তব্যকে উপেক্ষা করতে অভ্যস্ত। এ কথাটা তখন কেউ শোনেননি। নেহাত ভদকার ঘোরে হয়তো বলেছেন ভেবে নিজগুণে খ্যামাঘেন্না করেছেন।

    ১৯৯৭/৯৮ সালে ব্যাঙ্ক অফ রাশিয়া (আমাদের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক) ডলার আর রুবলের বিনিময় মূল্যের একটি মান বেঁধে দিয়েছিল। এক ডলারের দাম ৫ আর ৭ রুবলের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে। যদি রুবলের দাম কমে, বাজার থেকে ডলার কিনে ব্যাঙ্ক অফ রাশিয়া রুবলকে চাঙ্গা করবে। আর যদি রুবল শক্তিশালী হয়ে এক ডলারের বদলে ৫ নয়, ৪ রুবলের দিকে চলে যায়, বাজারে ডলার বিক্রি করে ব্যাঙ্ক রুবলের ভাও আবার পাঁচে নিয়ে আসবে। এর কেতাবি নাম ভাসমান গাঁটছড়া (ফ্লোটিং পেগ) বা ম্যানেজড পেগ। এই ভাবে রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক রুবলের মূল্যরক্ষার শপথ নিলো। কাগজ-কলমে এই পদ্ধতি আগ মার্কা শুদ্ধ। কিন্তু এটির শক্তি নির্ধারিত হয় যেকোনো দেশের ডলারের ভাঁড়ারে সঞ্চিত ধন (ডলার) এবং দেয় সুদের হার অনুযায়ী। মাত্র ছ’ বছর আগে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড এইরূপ পদ্ধতি অনুসরণ করে পাউন্ডের দাম ধরে রাখতে সম্যক ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁদের প্রতিরক্ষা প্রয়াস একদিনেই বিধ্বস্ত হয় – কালো বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯২। এই জুয়োয় দান দিয়ে জর্জ সোরোস একদিনে এক বিলিয়ন ডলার লাভ করেন।

    বিদেশি মুদ্রার বিনিময় মূল্য ম্যানেজ করতে গেলে যে প্রভূত ডলারের সম্বল থাকা প্রয়োজন, সেটি ক্রমশ ক্ষীয়মান। খনিজ তেলের, ধাতুর দাম কম, উৎপাদনের গতি দুর্বল। দেড় বছরে রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ২৭০ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন রুবলের দরকে থিতু করতে।



    ব্যাংক রসিয়া


    সরকারের প্রয়োজন আরও অর্থ। প্রতিদিন তাঁদের ঋণপত্রের উপর দেয় সুদের হার বাড়াচ্ছেন। জুলাই মাসের শেষে সেটি গিয়ে দাঁড়াল ১০০% এবং ১৩ই আগস্ট ১৫০%। সরকারকে টাকা ধার দিলে দেড় গুণ ফেরত! কোনো ভারতীয় চিট ফান্ড এত ভালো সুদ দিতে পারেনি কখনো। তার কারণ খুব সহজ।

    দেওয়া যায় না।

    আমরা ডলার-সেন্টের কারবারি। মস্কোর ক্রেমলিন নামক জাহাজের কাণ্ডারির খবর রাখাটা ঠিক আমাদের জব ডেসক্রিপশনে পড়ে না। কিন্তু রাশিয়ায় ঘটনার ঘনঘটা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে বসেদের সামনে দু’ মিনিট কথা বলার মত জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। বলা যায় না, করিডোরে হঠাৎ কেউ বললেন, খুব তো রাশিয়ায় ডিল করছ, সেখানে কী হচ্ছে জানো? তার খবর রাখো? অগত্যা ফাইনাসিয়াল টাইমসের প্রথম পাতা এবং দ্বিতীয় সেকশনের দু’ পাতা একবার দেখে নিই। অন্তত দুটো লাইন যাতে বলতে পারি।

    আমাদের নিজেদের ডেস্কে ব্লুমবের্গ/রয়টার তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

    ২৯শে জুলাই ১৯৯৮ রাষ্ট্রপতি ইয়েলতসিন একটি ঘোষণা করলেন – রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা দফতরের (পুরনো কেজিবি) অধ্যক্ষ নিকোলাই কোভালিওভকে বরখাস্ত করে যাকে আনলেন, তাঁর নাম ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ পুতিন। এ দুটো নাম আমাদের কাছে অচেনা, অজানা। তবে ড্রেসনার ব্যাঙ্কের কার্ল হান্স শ্লুয়ে আমাকে ফোন করে জানায়, আমি যেন এবার থেকে তাকে হেলাফেলা না করি – সেন্ট পিটার্সবুর্গে পুতিনের সঙ্গে কার্লের একদা ওঠাবসা ছিল!

    এক ডলারে ছ’ রুবল মেলে তখন। অঢেল।

    সোমবার ১৭ই আগস্ট বিশ্বের ব্যাঙ্কিং ও অর্থনীতির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন।

    সকাল ন’টায় মস্কোর বাজার খুলল। দুনিয়ার সব ঠিকঠাক, ঈশ্বর তাঁর সিংহাসনে। উইক-এন্ডের খোঁয়ারি কাটিয়ে লন্ডন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, প্যারিসের ব্যাঙ্কিং-বীরবৃন্দ তখন প্রাতরাশে ব্যস্ত। নিউ ইয়র্কের ব্যাঙ্কিং-বোদ্ধারা সুগভীর নিদ্রায়। অফিস পৌঁছেই ব্লুমবের্গ এবং রয়টার সংবাদমাধ্যমে রাশিয়ান সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বাক্ষরিত একটি সংক্ষিপ্ত এত্তেলা পাওয়া গেল:

    “এতদ্বারা সর্বজনকে অবহিত করা যাইতেছে, যে,
    (১) ডলার/রুবল বিনিময় মান ৬-৯.৫ পর্যন্ত হইতে পারে,
    (২) সরকারের বাকি বকেয়া ঋণ পরিশোধ বন্ধ এবং সে বিষয়ে কোনো আলোচনা আপাতত মুলতুবি,
    (৩) পরবর্তী তিন মাসে বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন স্থগিত (মরেটোরিয়াম)”

    বিদেশি মুদ্রায় গৃহীত ঋণ যথাসময়ে ফেরত দিতে অপারগ হয়েছে বহু দেশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানি, আফ্রিকার অনেক দেশ, দক্ষিণ আমেরিকায় মেক্সিকো থেকে আর্জেন্টিনা অবধি বিস্তৃত ভূখণ্ডের (কলোম্বিয়া ব্যতিরেকে) সব দেশ তাই করেছে, কোনো না কোনো সময়।

    আপন দেশে আপন মুদ্রায় গৃহীত দেনা শোধের অন্যথা করার রাশিয়ান দৃষ্টান্ত একটি বিরল ঘটনা।

    রাশিয়ান সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতা – ইতিহাসের মাপকাঠিতে সবচেয়ে বড়ো পরিমাণের। এই সেই দশ বছর আগের সুপার পাওয়ার, যাদের অঙ্গুলিহেলনে অর্ধেক পৃথিবী কম্পিত হত।

    সাতদিনের মধ্যে রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ডলার আর রুবলের বিনিময়-মান বাঁধার আশায় জলাঞ্জলি দিলেন। ডলারের দাম বেড়ে ১০ রুবল এবং ১৫ দিনের মধ্যে ২১ রুবল হল।



    ক্রেমলিন


    রাশিয়ার এমন দুঃসময়েও কিন্তু গাজপ্রমকে দেওয়া ঋণ নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা রইল না। তিন বছর আগের চুক্তিপত্র মোতাবেক, এটি শোধ হতে থাকল তাদের খদ্দেরদের দেয় ডলার থেকে। রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কাছে সে ডলার থেকে গেল অধরা। অতএব গাজ দে ফ্রন্স বা রুর গাস সে ডলার সরাসরি পাঠায় আমাদের নিউ ইয়র্কের খাতায়। ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালের দু’টি ঋণের পাই-পয়সা উশুল হয়েছিল। আমাদের লন্ডনের উকিলরা অনেকদিন নিজেদের পিঠ নিজেরা চাপড়েছেন – কেমন আটঘাট বেঁধে দিয়েছিলাম দেখলেন?

    বাড়তি বকশিসের আশায়! ইতনা খিদমত কিয়া হ্যায়!

    মিলওয়াকি পৌরসভা-কর্মচারীদের পেনশন ফান্ড ম্যানেজার বিল, এক মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে রাশিয়ান ঋণপত্র কিনে কতটা লাভ করেছিলেন, অঙ্ক কষে দেখতে পারেন।

    কারো সর্বনাশ।

    বিলকে রাশিয়ান সরকারের ঋণপত্র বেচে চার্লি পয়সা করেছেন দু’ ভাবে – রাশিয়ান গেকোর স্প্রেড বা কেনাবেচার দামের তফাৎ অনুযায়ী আর বিলকে ডলারের বিনিময়ে রুবল বেচার কমিশনের ওপরে। প্রাপ্ত বোনাসটি আপন ব্যাঙ্কের খাতায় জমা পড়েছে। রাশিয়ান সরকারি কোষাগার দেউলে হয়ে মিলওয়াকি পৌরসভা কর্মীদের পেনশন ফান্ডের টাকা ডুবলে সেটা বিলের সমস্যা। তবে আরেকটি জুতসই ডিল না পাওয়া অবধি চার্লি মিলওয়াকি-মুখো হবেন না। আপাতত অন্য কোথাও। বকরার কি অভাব আছে?

    কারো পৌষ মাস।


    ক্রমশ...
  • ধারাবাহিক | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৭৬৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Asish kumar Sinharay | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:৫৯512264
  • দারুণ লাগল। 
  • | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৪:৩০512265
  • খুব ইন্টারেস্টিং। 
  • dc | 2401:4900:1cd1:8aff:30e2:e0fd:abd0:1669 | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৫:৩৪512267
  • এই সিরিজটা পড়তে ভালো লাগে বিশেষ করে এই কারনে যে নব্বুই এর শুরুতে সোভিয়েত এম্পায়ার কোল্যাপ্স ও সেই সময়কার আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল মেকানিজম নিয়ে নানান কিছু জানতে পারি। কোল্ড ওয়ার পরবর্তী কয়েক বছর ভীষন ইন্টারেস্টিং একটা সময়ে, সেই সময়ের ফিন্যান্সিয়াল পারস্পেকটিভ জানতে পারাটাও কম নয়। 
     
    "রাশিয়ান সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতা – ইতিহাসের মাপকাঠিতে সবচেয়ে বড়ো পরিমাণের। এই সেই দশ বছর আগের সুপার পাওয়ার, যাদের অঙ্গুলিহেলনে অর্ধেক পৃথিবী কম্পিত হত"
     
    সময়ের সাথে সাথে কতো সুপারপাওয়ার, কতো এম্পায়ার ধসে পড়েছে। 
  • Ranjan Roy | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০:৫৬512280
  • Ditto 
  • Tapan Kumar SenGupta | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১১:৩৩512286
  • কত অজানারে জানিলাম!
  • Manoj Ray | 202.8.114.222 | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২০:৪৪512393
  • অনবদ্য হচ্ছে স্যার।
    পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে
    হরিদাসের গুপ্তকথা পড়ছি।
    কুর্নিশ রইলো।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন