এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  ইতিহাস  শনিবারবেলা

  • পূর্ব ইউরোপের ডায়েরি – কাজাখস্তান ৬

    হীরেন সিংহরায়
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৫৯৪ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)

  • ভাঙল মিলনমেলা
    সেপ্টেম্বর ২৪-২৬, ২০০৮

    - আলমাতিতে আপনাকে স্বাগত জানাই। কখন এলেন?
    - কাল রাতে লুফতহানসা তার প্রথা ভেঙে কিঞ্চিৎ বিলম্বে অবতরণ করেছে। তাই হোটেল পৌঁছুতে মাঝরাত্তির।
    - আপনাকে এবারের অ্যাজেন্ডার* সঙ্গে অগ্রিম পরিচিত করানোর জন্যে একটা লেফাফা পাঠিয়েছিলাম আপনার হোটেলের ঘরে। সেটা পেয়েছেন? 
    - পেয়েছি, তবে খুলিনি এখনও। সকালের কফিটা খেয়ে নিই!
    - অবশ্যই। তবে কফির সঙ্গেই দেখে নিন।
    হোটেলের ঘরের টেবিলে আমার নাম লেখা একটি সুদৃশ্য খাম ছিল, সেটা দেখেছি। রাত দুপুরে সেটা খোলার কোনো ইচ্ছে হয়নি—ঘুমুতে পারলে বাঁচি। এখন অর্ধউন্মীলিত চোখে হোটেলের বিশাল বলরুমে হাজিরা খাতায় নাম লেখানোর পরে ছোট গোল টেবিলের পাশে সবে কফির পেয়ালা হাতে ধরেছি। ব্যাঙ্ক তুরান আলেমের চেয়ারম্যান রোমান সলদোচেনকো নিঃশব্দে পাশে এসে বাক্যালাপ শুরু করেছেন। এখন লেফাফাটি না খুললেই নয়।

    রোমান মধ্যম আকৃতির, খানিকটা রুপোলী চুলে মাথা ভরা। নামেই বোঝা যায় তিনি কাজাখ নন। অসম্ভব করিতকর্মা লোক। এই নিয়ে তৃতীয়বার বিটিএ ইন্টার ব্যাঙ্ক কনফেরেন্সে এলাম। সব সময় দেখেছি তিনি এখন এখানে, তো তখন ওখানে। চর্কির মত ঘুরছেন। মাঝেসাঝে সন্দেহ হত—তাঁর কোনো বডি ডাবল আছে কিনা। এবারে আকাশবাণী হল: 
    - আজকের, মানে উদ্বোধনী দিবসের প্যানেলে আপনি আছেন।
    আমার আর লেফাফাটি খোলার প্রয়োজন হল না। রোমান ঝটিতি তাঁর আপন ফোল্ডার খুলে দেখালেন। আমি সেটিতে দৃষ্টিপাত করে চমকে উঠলাম। অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে যথারীতি প্রধান মন্ত্রী কারিম মাসিমোভ উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন। তারপরে একটি প্যানেল আলোচনা। তার বিষয়বস্তু:


    বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট – অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর তার প্রতিক্রিয়া
    প্যানেলে আছেন আনওয়ার সাইদেনভ (গভর্নর, ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক অফ কাজাখস্তান), বোলাট ঝামিশেভ (অর্থমন্ত্রী, কাজাখস্তান), বাখিত সুলতানভ (অর্থনীতি মন্ত্রী, কাজাখস্তান), মুখতার আবলিয়াজভ (বোর্ড চেয়ারম্যান, বিটিএ ব্যাঙ্ক) এবং
    হীরেন সিংহরায়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্ক 
    পরিচালনায়/অ্যাংকর:
    তাতিয়ানা পারামোনোভা, রাশিয়ান ব্যাঙ্কিং কাউন্সিলে রাশিয়ান রাষ্ট্রপতির প্রতিভূ



    হাত থেকে কফির কাপ প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
    আমার বিভ্রান্তি লক্ষ করে রোমান বললেন, দেখুন এখানে কাজাখ সরকারের সকল গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকবেন। দুনিয়ার ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় যে টালমাটাল চলছে—সে ব্যাপারে তাঁরা অবহিত আছেন, কিন্তু এই প্যানেলে বসে আপনি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির পক্ষ থেকে আপন বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবেন। 
    উদ্দেশ্য শুভ তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু কিছু প্রশ্ন আছে।

    আগের সপ্তাহে লেমান ব্রাদারস ব্যাঙ্ক দেউলে হয়ে তাদের দরোজা বন্ধ করেছে। বেয়ার স্ট্যারন, মেরিল লিঞ্চ বিক্রি হয়েছে, সিটি ব্যাঙ্কের শেয়ার এক ডলারে পাওয়া যায়। পশ্চিমী ব্যাঙ্কারদের আপন হাতে রচিত আর্থিক সর্বনাশের রাগের আলাপ চলছে মাত্র। জোড়-ঝালা-গৎ বাজানো বাকি। ইন্টার ব্যাঙ্ক লোনের বাজারে নানান বিপদের ছায়া। কোনো ব্যাঙ্ক আর অন্য ব্যাঙ্ককে বিশ্বাস করতে চায় না। প্রত্যেকের আলমারিতে অজস্র কঙ্কাল। সিটি ব্যাঙ্ক থেকে গোল্ডম্যান, রয়্যাল ব্যাঙ্ক অফ স্কটল্যান্ড থেকে ডয়েচে ব্যাঙ্ক সবাই ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে আপন সরকারের দ্বারে উপস্থিত হল বলে। সুখের দিনে লক্ষ কোটি টাকা বোনাস দেবার সময়ে তাঁরা ধরণীকে সরা জ্ঞান করতেন।
    এঁরা কেউ আমাকে আলমাতির এই সভায় তাঁদের দূত হিসেবে পাঠাননি।

    দ্বিতীয়ত, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান মারভিন ডেভিস, সিইও পিটার স্যান্ডস, নিদেন পক্ষে ফাইনান্স ডিরেক্টর রিচারড মেডিঙ্গস এই মহামঞ্চে অর্থমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নরের পাশে বসবার অধিকারী, প্রবীণত্বের পরখে আমার মতো সামান্য কর্মচারী নয়। অধিকন্তু, এই স্তরে কোনো নীতিগত মন্তব্য করার অধিকার আমার নেই। সে কাজটা করেন আমাদের ব্যাঙ্কের অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান জেরারড লায়নস (পরে লন্ডনের মেয়র বরিস জনসনের পরামর্শদাতা এবং এক সময়ে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য গভর্নর রূপে পরিগণিত)। এই প্যানেলের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তুতি নিতে পারতাম। জেরার্ড, ফুলহ্যাম ফুটবল ক্লাবের উন্মাদ ফ্যান, একত্রে খেলা দেখেছি, আমার একান্ত বন্ধুজন। কিন্তু তাকে যে ফোন করব—সে উপায় নেই। লন্ডনে এখন রাত দুটো বাজে; পশ্চিম লন্ডনের সুখশয্যায় তিনি শায়িত আছেন। শঙ্কার কারণ ব্যক্ত করলাম।
    রোমান নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে।

    - দুনিয়ার ব্যাঙ্কিং এখন একটা কঠিন সময়ের মুখোমুখী। সাব প্রাইমের সঙ্কট সর্বজনবিদিত, যার ফলে অর্থ সরবরাহ আগের মত নেই। সেটা আপনি আমি জানি। এটা কেন, কীভাবে ঘটল—তা নিয়ে নানান বিতণ্ডা হতেই পারে—সেটা বৃহত্তর এলাকা যেখানে ব্যাঙ্কের সিইও-রা নানান মতামত দিতে পারেন। কিন্তু আজকের মতো কঠিন সময়ে আমাদের সেমিনারে সে রকম কোনো নীতিগত আলোচনা নয়—আপনি আমি যারা দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত, তাঁরা নিশ্চয় জানতে চাইব এই ব্যাপারে কাজাখস্তানের নিয়ামক বা নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক আর সরকার কতটা বোঝেন? তাঁদের কী ভূমিকা? খবরের কাগজ খুললেই তাঁরা পড়েন সারা ব্যাঙ্কিং দুনিয়া সাত হাত জলের তলায়। এই সুযোগ যাবতীয় ব্যাঙ্কের পক্ষটি পেশ করার। এমন ডামাডোলের বাজারেও আপনাদের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্ক একেবারে অক্ষত দেহে দাঁড়িয়ে আছে—সরকারের দুয়ারে অর্থ ভিক্ষা করতে যাননি। নৈতিক দিক থেকে সে ব্যাঙ্কের স্থান অনেক উঁচুতে। তাই এই প্যানেলে আপনাকে একমাত্র ব্যাঙ্কার হিসেবে উপস্থাপিত করছি। কফির পরে স্টেজে উঠে আসুন। 

    ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করা হল শেষ ইচ্ছা কী?
    আমার একমাত্র উত্তর – বাড়ি যাব!



    সভাগৃহে


    চারিদিকে তাকিয়ে অভ্যাগতদের চেনার চেষ্টা করলাম। এবার একটা সার্বজনিক অর্থনৈতিক সন্ত্রাসের ছায়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিটিএ ব্যাঙ্কের বাৎসরিক সমারোহ। আমন্ত্রিত ইউরোপীয় ব্যাঙ্ক বিশারদদের সংখ্যা অনেক এসেছেন স্বল্প। আপন গৃহে অগ্নি নির্বাপণের জন্য স্থানীয় দমকলের, মতান্তরে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এবং সরকারি অর্থ দপ্তরের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। কয়েকটি ইউরোপীয় ব্যাঙ্ক পাঠিয়েছে তাদের রাশিয়ান বা কাজাখ অফিসের লোক, যেমন ডয়েচে ব্যাঙ্কের বাতুবে অজচান, এবিএনের মারিয়া লুকানোভা। অবশ্য পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার ব্যাঙ্কগুলি হাজির। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্ক বাড়ি ঘর নিয়ে বন্ড বানানোর জুয়োটা খেলেনি, তাই আমাদের খাতির বেশ আলাদা। সিটি, গোল্ডম্যান, কমেরতস বা রয়্যাল ব্যাঙ্ক অফ স্কটল্যান্ডের মতো ভিক্ষের কৌটো নিয়ে সরকারের দুয়োরে আমরা হাজির হইনি। শার্টের কলার উল্টে চলতে পারি।

    পশ্চিমের ব্যাঙ্ক থেকে আমরা যে ক-জন এসেছি, তাদের সবার মাথায় একটা বড় চিন্তা। সামনের কয়েক মাসের মধ্যে একাধিক কাজাখ ব্যাঙ্কের গোষ্ঠীবদ্ধ ঋণ শোধ দেবার সময় উপস্থিত। সাধারণত ঋণ শোধ হয়ে গেলে সাত দিনের মধ্যে ব্যাঙ্কেরা মিলে আবার নতুন মেয়াদে ঋণ দিয়ে থাকেন, ধারের খাতা বন্ধ হয় না। শুধু কয়েকদিনের বিরতি মাত্র, যাকে আমরা ক্লিন আপ পিরিয়ড বলি। এখন লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্টের বাজারে সেই ঋণগুলির পুনরাবৃত্তি করার সম্বল বা বাসনা দুইই অনুপস্থিত। তাই প্রশ্ন—এরা শোধ দেবে তো? বিভিন্ন ব্যাঙ্কের ভেতরে যতই খেয়োখেয়ি থাক, বিপদের আভাস পেলেই সেই গুষ্ঠির গণ্ডিতে ঢুকে পড়ি। আমরা সবাই ভাই ভাই।

    বিগত তিরিশ বছরে নানান দেশের নানান ব্যাঙ্কিং প্যানেলে বহু জ্ঞানীগুণীর সঙ্গে একাসনে বসে ঘণ্টাখানেক বাক্যালাপ করে পাঁচজনের সঙ্গে আমিও ফিরিতে হাততালি কুড়িয়েছি। এইসব প্যানেল আমারই মত অন্যান্য ব্যাঙ্কের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিঙের ফিরিওলা, কর্পোরেট প্রধান, সরকারি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাঝারি প্রবক্তা, খবরের কাগজের প্রতিনিধি (যাঁরা প্রশ্ন করেন কেতাবি, উত্তরের অর্থ অর্ধেক বোঝেন কিনা সন্দেহ) এমনি সব মানুষদের নিয়ে তৈরি হয়। নির্ধারিত অনুষ্ঠানের আগেই আমরা কনফারেন্স কল (জুম কল আসতে দেরি আছে) করে ঠিক করে নিই প্রশ্নাবলী কী হবে, কে কী বলবে। শ্রোতারা ভাবেন – চার-পাঁচ জন নারী পুরুষ একত্র বসে কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা বা বিষয়ের ওপরে কোনো গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দ্বারা মহতী সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন। দেশে এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার সুযোগ বিশেষ জোটেনি তবে অজস্র বিদেশি অভিজ্ঞতা থেকে নির্ভয়ে বলতে পারি – এগুলো একেবারে গট আপ গেম! এই রকম গ্রুপ বৈঠকে চমৎকার সব আলোচনা হয়। বিভিন্ন বক্তা—ধরি মাছ, না ছুঁই পানি গোছের ভাষণ দেন। বিতর্কমূলক আলোচনায় কেউ ঢুকতে চান না। চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। প্যানেলে উপস্থিতি তাঁদের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত নয়। এতে মাইনে বাড়ে না। বোনাস তো নয়ই। ব্যাঙ্কের খরচায় বেড়ানো হয়। কাগজে, ব্লুমবেরগ, রয়টারে দু-কলম লেখা হলে ব্যাঙ্কের একটু পাবলিসিটি হয়। এই যা লাভ।



    কাজাখ নাট্যশালায় আসামী


    প্যানেলের বাক্যবাগীশদের চার লাইনের জীবনকাহিনী অ্যাংকরেরা অগ্রিম জেনে তার সঙ্গে দু-চারটে পারসোনাল মন্তব্য যোগ করে দেন। ওই অ্যাঙ্করের ভূমিকা থাকলে আমি সবার সম্বন্ধে কিছু মনোরঞ্জক তথ্য জোগাড় করে স্টেজে উঠে অচানক ছাড়ি! নাইরোবিতে আমার প্যানেলে সেবার এক ব্যাঙ্কার ছিলেন – তাঁর আবাস কোথায় জিজ্ঞেস করতে জানালেন তিনি সর্বদা প্লেনে ওড়েন এবং হোটেলে রাত কাটান। সভায় তাঁর পরিচিতি দিতে গিয়ে বলেছিলাম – এডওয়ার্ডের কোনো ঘর নেই, সে গৃহহীন (হোমলেস)।

    প্রধান মন্ত্রী তাঁর ভাষণে বললেন, কাজাখি ব্যাঙ্কের অর্থের অকুলান হয়নি। রাষ্ট্রপতির নির্দেশ অনুযায়ী সকল ব্যাঙ্ক গৃহ নির্মাণ ও ছোটো মাঝারি বানিজ্য সংস্থাকে প্রভূত ঋণ দিয়েছে ও দেবে। তিনি আশা করেন, মূল্যায়ন সংস্থা বা রেটিং এজেন্সিগুলি কাজাখস্তানের অর্থনীতিকে সঠিকভাবে বুঝে তাদের সিদ্ধান্ত নেবেন।

    পরিচালিকা তাতিয়ানা পারামোনোভার সঙ্গে পরিচয় হল স্টেজে ওঠার পরে – তিনি সরাসরি ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ পুতিনের দ্বারা নির্বাচিত কর্মাধিকারী—তিনি যে এক আলাদা সম্ভ্রমের দাবিদার, সেটা দ্রুত বোঝা গেল। তাঁর আলাপনের সূচনায় কাজাখস্তানের অর্থমন্ত্রী অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নরকে জনসমক্ষে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাকে বাহুল্য বিবেচনা করে কেবলমাত্র নামগুলো বললেন। আমার পরিচিতি তিনি দিলেন এক লাইনে – ‘ইনি ব্যাঙ্কার, আন্তর্জাতিক ঋণ-সংস্থান ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত’।

    তাতিয়ানা সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী ব্যাঙ্কিং সমস্যাটি তুললেন।
    মুখতার ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে জানালেন—তিনি বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে চিন্তিত, তবে কাজাখ ব্যাঙ্কিং বা বিটিএ ব্যাঙ্ক নিয়ে নন। তিনি মনে করেন, এই সময় আমাদের নতুন সুযোগের সন্ধান করতে হবে। যেখানে আপাতদৃষ্টিতে যখন কোনো সমস্যা চোখে পড়ে, মনে রাখতে হবে সেখানেই নিহিত আছে সুযোগ। ব্যাঙ্কের ব্যবসা, তার বিজনেস মডেল, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সবই সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশি ব্যাঙ্কের এ নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নর বোলাত তাতিয়ামার প্রশ্নের উত্তরে জানালেন—তিনি হালে কাজাখি মুদ্রা টেঙের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কে আবশ্যিক জমার পরিমাণ (রিজার্ভ রেশিও) কমিয়ে দেশের ব্যাঙ্কগুলির হাতে বেশি মাত্রায় নগদ অর্থ পৌঁছে দিয়েছেন। অর্থনীতি মন্ত্রী বাখিত বললেন দেশের কোষাগারে (কাজাখে কাজিনা, তুর্কী হাজিনা বা আমাদের খাজানা!) সঞ্চিত বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয়ের হারে তিনি সন্তুষ্ট।

    প্যানেল আলোচনার নিয়ম—একটা প্রশ্ন তুলে সেটার ওপর একে একে সবার কাছে উত্তর খোঁজা। মিনিট পনেরোর মধ্যেই বুঝলাম, এটি আমার এতাবৎ পরিচিত কোনো আমড়াগাছির আসর নয়, সরাসরি প্রশ্নোত্তরের পর্ব।

    সুধী, সে সময় কাজাখি ব্যাঙ্কগুলিকে আমাদের মত অনেক ইউরোপীয় আমেরিকান ব্যাঙ্কের দেওয়া ঋণের পরিমাণ বিশাল। ডলার ধার দেবার সময় এ দেশের ওপরে আমাদের আস্থার অভাব ছিল না। কাজাখের তেল তামা ইত্যাদি মূল্যবান খনিজ পদার্থের অফুরান ভাঁড়ার। জনসংখ্যা স্বল্প। স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর, মুডি বা ফিচ জাতীয় খ্যাতনামা মূল্য নির্ণায়ক (রেটিং) সংস্থা কাজাখকে নিয়মিত উঁচু স্থানে রাখেন। অনেক বিলিয়ন তো দেয়া হয়ে গেছে, এবার একটা প্রশ্ন আমাদের খোঁচা দিচ্ছে। টাকাগুলো যাচ্ছে কোথায়? কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলে মূল্যবান ধাতু ও খনিজ তেল উৎপাদনের ব্যবসার মালিকানা এবং অর্থায়ন পুরোপুরি বিদেশি ব্যাঙ্কের হাতে। কাজাখি ব্যাঙ্করা টাকা ঢালছে কোথায়? মর্টগেজের ব্যবসা বাড়ছে জানি। দেশে উড়ছে টাকা। বিগত পাঁচ বছরে দেশের অর্থনীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, গড়ে ১০% প্রতি বছর। কিন্তু বাড়িঘরের দাম স্থিতিশীল হচ্ছে শুনে ভাবনা আরও বাড়ে।

    তাতিয়ানার দৃষ্টি ও প্রশ্নবাণ আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হল। দুনিয়ার ব্যাঙ্কিং পরিস্থিতি। ঋণের সরবরাহ ও সুদের হার।
    সকল ব্যাঙ্কিং সেমিনার ও কনফারেন্সে আমার প্রথম বচন হল ডিসক্লেমার – আমি এখানে যাহা বলিব, তাহা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। ইহা আমার কর্মদাতা বা আমার জান-মালের মালিকের নহে। যদি আপিসের কেউ খোঁচা দেয় বা কোনো সংবাদ সংস্থা পেছনে লাগে, তার জন্য একটা কৈফিয়ত দেওয়া রইল। প্রথমে সেই রকম একটা বাণী দিলাম।

    সুদের হার মস্ত বিতর্কিত বিষয়। ইউরোপীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার পাঠশালায় জেনেছি লাইবর (যে হারে লন্ডনের ব্যাঙ্কেরা এক অপরকে টাকা ধার দেয়) হল বেদবাক্য। অথচ হালে লাইবর নিয়ে নানা দুর্নীতির ঘটনা জানা গেছে। আমার মতে লাইবর নামক মানদণ্ডটি মৃতপ্রায়। কী হারে সুদ নির্ধারিত হবে—সেটি কোনো কমিটি নয়, ব্যাঙ্কের আপন কোষাধ্যক্ষ ঠিক করবে। লাইবর বলে যাকে আমরা এতকাল জেনে এসেছি, তার পবিত্রতা সম্বন্ধে সংশয় সূচিত হয়েছে। সেটি এখন ইতিহাস।

    শ্রোতাদের মধ্যে একটু গুঞ্জন—আমরা যে সবাই লাইবরের স্বপ্ন রাজ্যে এতকাল বাস করেছি – সবার উপরে লাইবর সত্য; এবার ক্রমশ জানা যাচ্ছে কয়েকটি ব্যাঙ্ক মিলে সকাল সকাল সেটি সাজিয়ে ফেলেন – কোশ্চেন পেপার লিক করার মতন।

    ঋণের পরিমাণ? সরাসরি জানালাম—বিদেশী ব্যাঙ্কের কাছে কাজাখ ব্যাঙ্কের ঋণের পরিমাণ নিয়ে বহু ঋণদাতা চিন্তিত। অনেক অর্থ ফেরত দেবার সময় আসছে। সাধারণত এগুলি স্বল্প সময়ের জন্য ফেরত দেওয়া হয়। তারপরে নতুন করে আরেকটি ঋণপত্র স্বাক্ষরিত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে গেছে। দশ দিন আগে লেম্যান ব্রাদারসের দোকান বন্ধ হয়েছে—সেটা আপামর জনসাধারণের জানা। তার প্রকোপ কাজাখ ব্যাঙ্কের ওপরে পড়তে পারে।

    এ দেশের বড় বড় মহারথীদের মাঝে (একপাশে গভর্নর, অন্য পাশে অর্থমন্ত্রী) বসার প্রাথমিক ভীতি ততক্ষণে কেটে গেছে। নানান অনুষ্ঠানে বিতর্কমূলক কথাবার্তা বলি, সেটা আমার বস ফিলিপ ভালোই জানে। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার ব্যাঙ্ককে দায়বদ্ধ করছি, চাকরি যাবে না।

    তাতিয়ানার আরও সিধে সওয়াল। আগামী ঋণগুলির যদি পুনরাবৃত্তি না হয়, তাহলে কাজাখি ব্যাঙ্ক গুলির অর্থভাণ্ডার কীভাবে সুরক্ষিত হবে?
    এই মওকা পেয়েছি। হিন্দুস্তানিকি জোশ ভি দেখ লিজিয়ে।

    বললাম, গভর্নর আপন মুদ্রা টেঙের ওপর জমার হার কমিয়েছেন, বিদেশি মুদ্রার আবশ্যিক জমার পরিমাণ কমানোর কথা ভেবে দেখবেন কি? দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যৎ কাজাখি ব্যাঙ্ক ঋণ ফেরত পাবার গ্যারান্টি কি তিনি দেবেন? এতাবৎ আমরা ব্যাঙ্কগুলিকে ঋণ দিয়েছি কোনো সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ছাড়া। আজকের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে কুড়ি বা তিরিশটি ব্যাঙ্ক গোষ্ঠীবদ্ধভাবে যখন নতুন ঋণ দেবে, তখন সেটি ফেরত পাবার কোনো প্রতিশ্রুতি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক কি দেবেন? অন্য অর্থে, কাজাখ সরকার কি তাঁদের ব্যাঙ্কের পাশে দাঁড়াবেন? ব্যাঙ্ক ধার শোধ দিতে অপারগ হলে আমরা কি কটোরা নিয়ে অর্থ দপ্তরের দরোজায় দাঁড়াতে পারি? অর্থনীতি মন্ত্রী এইমাত্র জানালেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রভূত বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয়। তিনি কি সেটি কাজাখি ব্যাঙ্কগুলিকে অন্তত সাময়িক ভাবে দিয়ে সাহায্য করবেন? যতদিন না বাজারে আবার সরবরাহ শুরু হচ্ছে?

    তাতিয়ানা কামানের মুখটা ঘোরালেন তাঁদের দিকে। গভর্নর অর্থনীতি মন্ত্রী সবাই এই ‘হমে সোচনা হ্যায়, দেখনা হ্যায়’ মার্কা জবাব দিলেন। মুখতার আমার নিশানাটি বুঝে সমবেত ব্যাঙ্কিং মণ্ডলীকে অভয় আশ্বাস দিলেন – কাজাখ ব্যাঙ্কিং ও বিশেষ করে বিটিএ ব্যাঙ্ক শক্ত খুঁটিতে দাঁড়িয়ে আছে। কাজাখ ব্যাঙ্ক পরিচালনা পদ্ধতি এবং তাদের আর্থিক সঙ্গতি নিয়ে কারো নিদ্রাহীন রাত্রি কাটানোর কোনো সঙ্গত কারণ তিনি দেখেন না।
    অলমিতি বিস্তরেন।

    স্টেজে সমবেত মহামান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে করমর্দন করে সভাগৃহে আপন আসনের দিকে যাব। এক ভদ্রমহিলা আমার প্রায় মুখোমুখি। তার পিছনে ক্যামেরা কাঁধে এক বলশালী পুরুষ। সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দিতে যাব, তিনি আমাকে পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন, “আমি কাজাখ টিভি থেকে এসেছি। আপনি যখন স্টেজে ছিলেন, আমার টিভি ক্যামেরা এসে পৌঁছায়নি। আপনার ইন্টারভিউ নিতে চাই। তাতিয়ানা আপনাকে যা প্রশ্ন করেছে, আমি সেগুলোই করব”।
    ইতিমধ্যে যা বলেছি, তার জেরেই আমাকে না হাজতে পাঠায়।
    বললাম, “আমি কাজাখ বলি না”। তিনি হাল ছাড়বেন না। মুরগিটি সবে পাকড়েছেন।
    - জানি। আমরা সাব টাইটেল করে দেব।

    হোটেলের একটি মিটিং রুমে নিয়ে গেলেন। আশ্চর্য তাঁর স্মৃতিশক্তি। তাতিয়ানার প্রত্যেকটি প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। আমি সাধ্যমত একই উত্তর দিলাম। দুঃখের বিষয়—কাজাখ টেলিভিশনে আমার প্রথম ও শেষ আবির্ভাবের কোনো সবুত আমার কাছে নেই! ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালের কাজাখ টেলিভিশনের সান্ধ্য অনুষ্ঠানে এক উভ্রান্ত বাঙালিকে যারা দেখেছিলেন, তাঁদের জন্য করুণা বোধ করি।

    সমাগত ব্যাঙ্কারদের কয়েকজন বললেন, ‘এ কথাগুলো এদের জানানো উচিত ছিল’। ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ সুইজারল্যান্ডের রিচারড লাডিঙটন সতর্ক বাণী দিলেন – তার ভারতীয় অর্থ – বচকে রহিয়েগা!
    পরের দু-দিন এই বিশাল সমাবেশে আলোচনা, নৃত্য গীত, নাটিকা এবং পানের আসর চলল প্রতি বছরের মতন – কোনো অশান্তির, কোনো আশঙ্কার ছায়ামাত্র নেই। রাত্রিদিন বহে গেল আমোদে প্রমোদে।




    এ শুধু গানের দিন


    বাইরে তখন ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে আগুন জ্বলছে।

    ২০০১ সালে যখন সিটি ব্যাঙ্ক ছাড়ি, একটা শেয়ারের দাম ছিল ৫৬ ডলার, সেটা এখন ৯৭ সেন্ট আমেরিকায় ২৭টি ব্যাঙ্ক দেউলে হয়েছে। ২৬শে সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন মিউচুয়াল (যার সম্পদ বা অ্যাসেট একদা ছিল ৩৩০ বিলিয়ন ডলার) নিজেকে দেউলে ঘোষণা করল। আমার একটি মর্টগেজ ছিল সে ব্যাঙ্কে, তবে এতে আমার কোনো সুরাহা হয়নি। আরও একটি কারণে ওয়াশিংটন মিউচুয়ালের পরমগতি প্রাপ্তি মনে রাখি – ১৯৮৪ সালে আমার প্রথম আমেরিকান ব্যাঙ্ক কনটিনেন্টাল ইলিনয়ের দেউলে হবার রেকর্ডটি তাঁরা ভেঙে দিলেন। সে অবধি কনটিনেন্টাল ছিল সবচেয়ে বৃহৎ সর্বস্বান্ত ব্যাঙ্ক!

    ফ্রাঙ্কফুর্ট গামী লুফতহানসার প্লেন ওড়ার সময়ে প্রকাণ্ড থালার মতন আলমাতির আলোকিত রূপটি দেখে নিলাম শেষ বারের মতন।
    এর পরে এই বাৎসরিক সমাবেশ আর অনুষ্ঠিত হয়নি।



    খাদ্য কিছু পেয়ালা হাতে

    শেষ গানেরই রেশ



    পরিশিষ্ট

    এক
    বিটিএ

    ২০০৬ সালে ব্যাঙ্ক তুরান আলেম (বিটিএ) কাজাখস্তানের তথা পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নের সকল দেশের মধ্যে বৃহত্তম ও শ্রেষ্ঠ ব্যাঙ্ক বলে পরিগণিত হয়েছিল। ব্যাঙ্কের অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪০ কোটি ডলার। বৃদ্ধির হার ১০% এর বেশি। ২০০৭ সালে সেই বৃদ্ধির হার সমান। সেটা এসেছে বাড়ি ঘরের ঋণ থেকে।
    ২০০৮ সালের শেষ দিকে বিটিএ নিজেকে ১৬ বিলিয়ন বা ১৬০০ কোটি ডলারের বিদেশী ব্যাঙ্কের লোন ফেরৎ দিতে অপারগ ঘোষণা করে।

    দুই
    সেদিনের সাথিরা

    বোর্ড চেয়ারম্যান মুখতার আবলিয়াজভ এবং তাঁর সাগরেদরা (আরতুর প্রফিমভ, ইগর কননকো, আনাতলি এরেশেনকো, আলেকসান্দার উদোভেনকো, তাতিয়ানা পারাসকেভিচ) ২০০ কোটি ডলার তহবিল তছরুপের দায়ে অভিযুক্ত এবং তৎক্ষণাৎ পলাতক। পাওনার পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলার। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের একাধিক আদালতে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হবার আদেশের বিরুদ্ধে মুখতার লড়াই করে যাচ্ছেন। এখনো অধরা (২০২২) — রাশিয়ান আদালতে তাঁদের অনুপস্থিতিতে পনেরো বছরের কারাদণ্ড ঘোষিত হয়েছে।
    প্রাক্তন সি ই ও রোমান সলদোচেনকো একাধিক জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত। অন্তত ৬ কোটি ডলার পাওনা। তিনি দেশত্যাগী। এখনও।
    কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের আধিকারিক আনভার গালিমুল্লাভিচ সাইদেনভ ২০০৯ সালে কাজ থেকে ছুটি পেলেন। কারণ অজ্ঞাত।
    অর্থমন্ত্রী বোলাত ঝামিশেভ তিন বছর বাদে স্থানীয় উন্নয়ন মন্ত্রী হলেন। সেই পদটি উঠে গেলে কাজাখ উন্নয়ন ব্যাঙ্কের সিইও হলেন।
    কাজাখ সরকার বিটিএ-র অধিগ্রহণ করলেন ২০০৯ সালে। যেমন ইংল্যান্ড আমেরিকায় জার্মানিতে অনেক ব্যাঙ্ক সরকারি খাজানার সহায়তায় প্রাণ ধারণ করছিল। ২০১২ সালে ব্যাঙ্ক নিজেকে পুনর্বার দেউলিয়া ঘোষণা করে।
    অর্থনীতি মন্ত্রীর দপ্তর বিটিএ-র শেয়ার মালিকানা নিলেন রাজকোষের বা খাজানার অর্থে যেটি আমি ২০০৮ সালে ভিক্ষা করেছিলাম সকল ব্যাঙ্কের হয়ে! পরে অর্থনীতি মন্ত্রী বাখিত সুলতানভ সহ-প্রধানমন্ত্রী পদে উন্নীত হন।

    তিন
    দেশ ও ব্যাঙ্ক

    পাঁচ বছর বাদে সরকার বিটিএ বিক্রি করলেন। বেসরকারি ব্যাঙ্ক কাজকমারতস তার ক্রেতা। সঙ্কট মেটে না। সরকার সেখানেও প্রভূত অর্থ সাহায্য করে চলেছেন।
    ২০০৭ সালের পর কাজাখ অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ১০% থেকে কমে ১.২% হল, পরবর্তী বছর গুলিতে গড়ে ৪%।

    চার
    রেশমি পথ আজ লৌহবর্ত্ম

    চিনের সীমান্ত থেকে কাজাখস্তানের মধ্যে দিয়ে আট লেনের হাইওয়ে এসে পৌঁছেছে ইউরোপ অবধি। ফ্রান্সের ক্যালে থেকে গাড়ি চালিয়ে সাতটি দেশ অতিক্রম করে আলমাতি যাওয়া যায়। ৫৩৭০ কিমি রাস্তা!
    আরেকটি নতুন শহর তৈরি হয়েছে – নুর ঝোলি। চিন থেকে মালবাহী ট্রেন আসে। দু-দেশের রেল গেজ আলাদা। তিন ঘণ্টা লাগে চিনের ওয়াগন গুলোকে কাজাখি গেজের ট্রেনে তুলতে। তারপরে সে ট্রেন চলে যায় কাজাখ, রাশিয়া, বেলারুশ, পোল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম ফ্রান্স - বার্লিন, প্যারিস। আঠারো দিন লাগে। জাহাজে লাগত তার প্রায় তিন গুণ।
    এককালে আমরা সিল্ক রুট বা রেশমি পথের গল্প শুনেছি। চিনের মহার্ঘ রেশম কাজাখস্তানের পথে যেতো ইউরোপে। ঘোড়ার পিঠে। আজ আপনার আইফোন বা হেডফোন চিন থেকে আসে। কাজাখস্তান হয়ে, ট্রেনে চড়ে!
    চক্রবৎ পরিবর্তন্তে।

    পুনশ্চ
    ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অ্যাজেনডা
    BTA Interbank Conference





    1st Day - Wednesday, September 24, 2008
    08:00 - 09:00Registration
    09:00 - 09:05 Welcome speech from conference organizers:
    Mukhtar Ablyazov, Chairman of the Board of Directors, BTA Bank 
    09:05 - 11:00 Panel Discussion I - (Ballroom)
    Interactive discussion
    Topic: «World financial crisis: consequences for emerging markets»

    1. Karim Massimov, Prime minister of the Republic of Kazakhstan
    2. Mukhtar Ablyazov, Chairman of the Board of Directors, BTA Bank
    3. Anvar Saidenov, Chairman, National Bank of the Republic of Kazakhstan 
    4. Bolat Zhamishev, Minister of Finance of the Republic of Kazakhstan
    5. Bakhyt Sultanov, Minister of Economics and Budget Planning of the Republic of Kazakhstan
    6. Hiren Singharay, Managing Director, Head of Syndications Europe Africa and South Asia, Standard Chartered Bank
     Interviewer: Tatyana Paramonova, Representative of the President
    of the Russian Federation at the National Banking Council 



    অথ কাজাখ পর্ব সমাপ্ত 

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৫৯৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Amit | 193.116.254.165 | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৩:০৮516598
  • যথারীতি অসাধারণ হিরেন দা। দুএকটা জেনারেল ​​​​​​​প্রশ্ন। 
     
    ২০০৮ এর ক্রাইসিস স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড কিভাবে এতটা এভোয়েড করলো ? ওনাদের কি ওভারঅল ডোমেস্টিক মর্টগেজ এক্সপোজার কম ছিল ? নাকি অনেক বেশি রিস্ক এনালাইসিস করে লোন দিতো ? বা অন্যান্য সেক্টরে বেশি লোন দিতো ? একই ভাবে ইন্ডিয়া বা কিছু দেশ কিভাবে এই ক্রাইসিস টা কিছুটা হলেও এড়াতে পারলো ? ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কগুলোর রিস্ক পোর্টফোলিও কি স্ট্যানচার্ট এর 
    সিমিলার ছিল ওই সময় ?  নাকি তখন সরকারের দেওয়া ইনসেনটিভ বেশি এফেক্টিভ ছিল ? এখন কি সিমিলার না অনেকটা আলাদা ? (জাস্ট এই আদানি ক্রাইসিস টা কোনদিকে যেতে পারে ভাবছি। )
     
    আর একটা জেনারেল প্রশ্ন। যদি এভাবে কোনো ব্যাঙ্ক উঠে যায় আর সরকার বা কেউ টেক ওভার না করে , সেক্ষেত্রে যাদের মর্টগেজ ছিল সেখানে তাদের কি হয় ?
     
  • হীরেন সিংহরায় | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:৩২516620
  • অমিত

    সবে বইমেলা কাটিয়ে দেশ থেকে ফিরলাম। তাই উত্তর দিতে বিলম্ব হল ।

    প্রথমে একটু ইতিহাস – নয়ের দশকের শেষে পশ্চিমি দুনিয়ার বাণিজ্যে ( এমনকি ল্যাটিন আমেরিকাতেও )  প্রভূত লোকসানের পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড প্রায় দেউলে হয়ে যায়।  তখন বিচার  বিবেচনা করে সাব্যস্ত  হয় আমরা পশ্চিম নয় পুবের পানে মনঃসংযোগ করব – এ এন জেড ইত্যাদি পূর্বের ব্যাঙ্ক কেনা হয় । ফলে ইউ কের সকল শাখা বন্ধ , ইউরোপীয় শাখা গুলি জার্মান ব্যাঙ্ক ওয়েস্ট এল বি কে বেচে দেওয়া হয় । দু দশক কেটে গেছে।  আজও গোটা ইউরোপে আমাদের একটিও রিটেল শাখা নেই অতএব মর্টগেজ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে নি ব্যাঙ্কের সবচেয়ে সফল বাণিজ্য হংকং এবং ভারত প্রসঙ্গত বলতে পারি ঠিক একই সময়ে হংকং সাংহাই ব্যাঙ্ক সিদ্ধান্ত নেয় পুব ছেড়ে পশ্চিমে বাণিজ্য বিস্তার করার যার ফল শুভ হয় নি মেক্সিকোতে ড্রাগ ফাইনান্স অতি সামান্য ব্যাপার। অর্থনীতি পড়ার সুবাদে বলতে পারি ২০০৭-২০১০ এর কঠিন কালে ভারতীয় সরকারি ব্যাঙ্কগুলির ওপরে তার কোন ছায়া পড়ে নি।  সে সময়ের এস বি অধ্যক্ষ ওম প্রকাশ ভাট আমার ব্যাচের ছেলে এবং নিতান্ত বন্ধুজন- এঁরা কেউ ওয়াল স্ট্রিটের বিষাক্ত দ্রব্য কেনেন নি যে কথা ব্যক্তিগত মালিকানার ভারতীয় ব্যাঙ্ক সম্বন্ধে বলা যায় না ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে আমি সে সময় শ্রদ্ধার চোখে দেখেছি। আদানির গল্প অন্য ।  লিখব।
    ব্যাঙ্ক উঠে গেলে তার দেনদারদের কি হয় সেটা বিভিন্ন দেশের ব্যাঙ্করাপটসি আইনের ওপরে নির্ভর করে ওয়াশিংটন মিউচুয়াল ব্যাঙ্ক দেউলে হলে পরে আমি এই রকম আশা করেছিলাম যে আমার মর্টগেজ আর শোধ করতে হবে না ! বৃথা আশা!

     
  • Kishore Ghosal | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:১১516646
  • তত্ত্বকথার সবটা যে বুঝলাম তা নয় তবু কিছুটা আঁচ পেলাম। আর সারা বিশ্বেই কী চলছে সেটা কিন্তু বেশ বুঝলাম।  
     
    অপূর্ব সাবলীল লেখা। 
  • Debanjan Banerjee | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২০:০৫516679
  • হিরেনবাবু 
     
                   খুব ভালো লাগছে বইমেলাতে আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে | আবার কবে আসবেন কোলকাতাতে ?
     
    আপনার এই লেখাটিও যথারীতি ভীষণ সুন্দর হয়েছে | আপনি এই লেখার শেষদিকে খুব সুন্দর করে কাজাখস্তানে চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নিয়ে লিখেছেন | এই চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নিয়ে আপনি একটু বিশদ করে লিখবেন প্লিজ | আমার এটা নিয়ে খুবই আগ্রহও জানার |
     
     
  • হীরেন সিংহরায় | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২১:৩৩516682
  • দেবাঞ্জন  
     
    আমারও খুব ভাল লাগল।  আমরা বরানগরের লোক তো ! ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড একটা আলাদা উপাখ্যান - এখানে তার স্থান ঠিক করা গেলো না বলে দুঃখিত । পূর্ব ইউরোপে এখনও বারোটা দেশের গল্প বাকি ! হরিদাস পালে এক সময়ে লিখব । 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন