মহামতি ভীষ্ম এমন কি সাধারণ পুরললনাদেরও ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের বিমুগ্ধ মনোভাবের নিখুঁত চিত্রবৎ বর্ণনাগুলি, ভাগবত-পুরাণের অপূর্ব সাহিত্যগুণের পরিচয় দেয়। আজকের নীরস, উদ্ধত এবং অতীব স্থূল প্রোপাগাণ্ডার তুলনায়, সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ সেকালের এমন ঈশ্বরমহিমা-প্রচার মনোহরণ করে বৈকি - সে আমি ভক্ত হই বা না হই - সে আমি আস্তিক বা নাস্তিক হই, কিচ্ছু এসে যায় না তাতে। ... ...
কিঞ্চিৎ কথার মারপ্যাঁচ রয়ে গেল যেন - ভগবান বললেন, কাল বা মৃত্যু অমোঘ ও অনিবার্য। এই মৃত্যুকে কোন ভাবেই নিবারণ করা যায় না। একথা সত্যি। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিবারণ করতে পারলে, যুদ্ধক্ষেত্রে এতগুলি মানুষের অকালমৃত্যু অনিবার্য নাও হতে পারত। অবশ্য একথাও সত্যি, পাণ্ডব এবং ভগবান কৃষ্ণের যথোচিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, দুর্যোধনাদি কৌরবপক্ষকে যুদ্ধ থেকে নিরস্ত করা যায়নি। হয়তো দুর্যোধনের অন্যায্য অহংকারই ছিল কাল-নির্দিষ্ট - তাঁদের সকলের এবং অন্যান্যদেরও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ... ...
পরমশত্রুর শিশুপুত্রদেরও হত্যা করে, তাদের নির্বংশ করাটা ভারতের যুদ্ধনীতি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীযুগে বিধর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধকালে এই নীতির কারণে সনাতনী যোদ্ধাদের বারবার মাশুল গুনতে হয়েছে। ... ...
সেকালে ভর্তৃহীনা নারীর প্রতিভাবান পুত্রদের সমাজবরেণ্য হতে কোন বাধা ছিল না, এখানে দেবর্ষি নারদের কথা শুনলাম, উপনিষদের ঋষি সত্যকামের কথা শুনেছি রবীন্দ্রনাথের কবিতায় - "জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে"। নারদ অবশ্য এখানে তাঁর মায়ের নামটি প্রকাশ করলেন না - "বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দাসী" বলেই মায়ের পরিচয় পর্বটি সেরে ফেললেন। ... ...
মহর্ষি ভৃগুর চোখে চোখ রেখে বললেন, “এই আয়োজন ও অনুষ্ঠানের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, মহর্ষিঠাকুর। এমন রাজসিক আয়োজন মহারাজ অঙ্গের প্রাসাদের উপযুক্ত। কিন্তু মহর্ষিঠাকুর, আমি জানি পৃথু ও অর্চ্চি কোন অবতার নয়, ওরা আমার পুত্র বেণের মানসপুত্রও নয়। এ সমস্তই আপনার বানিয়ে তোলা, সাজানো ঘটনা”। মহর্ষি ভৃগু কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ... ...
বাঃ, অতি বিচক্ষণ ও উত্তম বিবেচনা, মহামুনি কশ্যপ। আপনাকে আরেকবার প্রণাম। আমার অনুচরেরা গরুর গাড়িতে সোনার মুদ্রা আর নানান উপহার দিয়ে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে আপনার আশ্রমে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আর কাল সকালে, আপনার আশ্রমে পৌঁছে যাবে পাঁচশ’ সবৎসা তরুণী গাভী। তারপর আমার অনুচরেরা কাল সকালে আপনাকে কৃষিজমিও দেখিয়ে দেবে, সেখান থেকে পছন্দমতো, যতটা খুশি আপনি নিয়ে নেবেন। ও হ্যাঁ, ভালো কথা, এই দানেও যদি আপনি সন্তুষ্ট না হয়ে থাকেন, কোন সংকোচ করবেন না, মহামুনি। ... ...
বেদজ্ঞ ঋষি শৌণক, এই (ভাগবত) পুরাণ কথক সূত্রধর অর্থাৎ সূতকে বলছেন, "আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী"। অর্থাৎ সূত্রধর যেহেতু অব্রাহ্মণ - তিনি সব শাস্ত্রে পারদর্শী হতে পারেন - কিন্তু বেদের বিদ্যায় তিনি 'লবডংকা'। ঋষি শৌণকের এই আত্মশ্লাঘা ও শ্লেষটুকু বেশ লক্ষ্যণীয় বিষয় সন্দেহ নেই। ... ...
অবশেষে শাস্ত্রবচনটি এইভাবেই রচিত হয়েছিল - "...প্রজাপিতা মহারাজ অঙ্গের পুত্র অরাতিমর্দন মহারাজ বেণের মানসপুত্র শ্রী পৃথু ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার এবং মানসকন্যা শ্রীমতী অর্চ্চি সনাতনী কমলার অংশ রূপে প্রবোধিণী একাদশীর পুণ্য তিথিতে ধরণীতে আবির্ভূত হইয়াছেন"। ... ...
বেদ কল্পবৃক্ষ, শ্রীমৎভাগবত সেই বৃক্ষের ফল। শুকপাখির চঞ্চু থেকে যেমন মধুর ফল খসে পড়ে, তেমনই এই সুধাময় শ্রীমৎভাগবত ফল মহাযোগী শ্রীশুকদেবের মুখ থেকে জগতে আবির্ভূত হয়েছে। আম ইত্যাদি ফলের খোসা ও বীজ ফেলে দিয়ে ফলের রস আস্বাদন করতে হয়, কিন্তু এই ফলের কোন অংশই পরিত্যাগ করার যোগ্য নয়, এই ফলের সমগ্র অংশই রসস্বরূপ। হে রসজ্ঞ, ভাবুকগণ, আপনারা এই গ্রন্থের সুধারস পান করতে থাকুন। ... ...
মহর্ষি বললেন, “সেই চিহ্ন দুই তিন মাস স্থায়ী হলেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। রাজা হিসাবে পৃথু একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, কেউ তাঁর শরীরের চিহ্ন পরীক্ষা করতে আসবে না, বৎস”! ... ...