এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • সৌদামিনীর ঘরে ফেরা - পর্ব ৬

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৫০৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)


  • এক তলার বসার ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে পিসিমা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল দোতলার ছাদে। যতদূর চোখ যায় চারদিকে অন্ধকার। খাপছাড়া দু একখানা বাড়ি, আর অজস্র গাছপালার আবছা অবয়ব। কেউ কোত্থাও নেই যেন, এই বিশ্ব চরাচরে। মাথার ওপর ঘন কালো আকাশ ভর্তি কোটি কোটি গ্রহ-তারা তাকিয়ে রয়েছে এই পৃথিবীর দিকে। সাক্ষী থাকছে সংসারের প্রতিটি ঘটনার। পিসিমা শুনেছে নটি মাত্র গ্রহ নাকি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। ওই আকাশের অজস্র আলোক বিন্দুর মধ্যে কোন নটি গ্রহ তার জীবনকেও প্রভাবিত করে চলেছে অহরহ! পিসিমা এও শুনেছে জন্মাবার আগে বিধাতা পুরুষ নাকি প্রতিটি জাতকের কপালে লিখে দেন তার ভাগ্যলিপি। সেই লিখন অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের জীবন বইতে থাকে বিভিন্ন খাতে। মানুষের জীবনে সেই লিখনের বাইরে অন্য কিছু আর ঘটতে পারে না।

    তাই যদি হয়, পিসিমার কপালে এমন লিপি কেন লিখে দিলেন ঈশ্বর? কেন তারই জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলছে শনি, রাহু, কেতু, মঙ্গল অথবা বৃহষ্পতি? এই বিশাল বিশ্বের মধ্যে সে কতটুকু? এই সংসারে তার মতো মানুষের কতটুকুই বা ঋণ আর কতটুকুই বা অবদান? তার জন্যে বরাদ্দ সেই সামান্য প্রাপ্যটুকুই যদি সংসার তাকে দিত, মহাভারত কতখানি অশুদ্ধ হয়ে উঠত? ঊণিশ বছরের এক তরুণীকে কনের সাজে সাজিয়ে কেন তিনি তার মনে এঁকে তুলেছিলেন হাজার স্বপ্নের ছবি। তার শরীরের ভিতর কেন তিনি দিয়েছিলেন, একটি স্বপ্ন দেখার মন? একটি নারী পূর্ণতা পায় তার স্বামী, পুত্র, শ্বশুরের পরিবারে। মুখের কাছে এনে দিয়েও কেন তিনি কেড়ে নিলেন, এমন নিষ্ঠুর ভাবে? ছাদের আলসেতে পিঠ দিয়ে পিসিমা বসে পড়ল ছাদের মেঝেয়, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে চেষ্টা করল নিজের হাহাকার কান্না রুদ্ধ করতে।

    এই বাপের বাড়িতে আজন্ম ঊণিশ বছর সে বড়ো হয়ে উঠেছে। তার জন্যে এ বাড়িতে কোন অমঙ্গল হয়েছে, এমন তো সে কোনদিন দেখেনি। কেউ বলেওনি তাকে। বাবার মৃত্যু হয়েছে ছেষট্টি বছর বয়েসে তার যখন ন বছর বয়েস। সে মৃত্যুর জন্যে সে নিশ্চয়ই দায়ি হতে পারে না। বাবার মৃত্যুর পর বড়ো দাদা তাকে বুকে করে বড়ো করে তুলেছে। সেও বুকে করে বড়ো আদরে বড়ো করেছে দাদার একমাত্র ছেলে খোকাকে। কই, কোনদিন তো কারো অকল্যাণ কিছু হয়নি।

    বিয়ের তিনদিনের মাথায় বউভাতের পরদিন, তার সেই ক্ষণস্থায়ী স্বামী গিয়েছিল গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে তাসের আসরে আড্ডা দিতে। সেখান থেকে ফিরতে অনেকটাই রাত হয়েছিল। ফেরার সময় তাড়াতাড়ি হবে বলে, সে আসছিল চৌধুরিদের পোড়ো জমির ভেতর দিয়ে। ওই পোড়ো জমি আর পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ি নিয়ে অনেক কথাই গ্রামে শোনা যায়। সে পথ দিনের বেলাতেই লোকে এড়িয়ে চলে, অনেকটা ঘুরে হলেও সাধারণ মানুষ সদর পথেই যাওয়া আসে করে। ওই পোড়ো পথে রাতের অন্ধকারে কে তাকে আসতে বলেছিল? তার ভাগ্য? পথের মধ্যে কে বিছিয়ে রেখেছিল বিষধর সাপ, তার নিয়তি? সেই সাপের ঘাড়ে পা দিয়ে কে তার স্বামীকে মরণ ছোবল খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল, তার কপালের লিখন? এই সব, এই সমস্ত ঘটনার জন্যে দায়ী সে?

    সেই লোকটা, যে তার মাত্র তিনদিনের স্বামী, যার সঙ্গে তার সম্যক পরিচয় ফুলশয্যার রাতের ঘন্টা তিনেক, তার ভাগ্যে কী লেখা ছিল? তার বিধিলিপিতে এই অকাল মৃত্যুর কথা লেখা ছিল না? তার ভাগ্যের গ্রহচক্রে সুস্থ নীরোগ দীর্ঘ পরমায়ুর নির্দেশ ছিল বুঝি?  স্ত্রী পুত্র, নাতি পুতি নিয়ে সুখের জীবন কাটানোর আদেশ ছিল তার ভাগ্যে? তার মানে শুধুমাত্র তার সঙ্গে বিয়ের সংযোগেই আচমকা বদলে গেল তার স্বামীর নিয়তি? কিন্তু লোকে যে বলে নিয়তি বদলায় না, বদলানো যায় না। একজন সালংকরা, সুসজ্জিতা, তরুণী ও কল্যাণীয়া নববধূ বদলে দিল সেই মানুষটার জীবন? এনে দিল অপঘাত মৃত্যু? সে হয়ে গেল, রাক্ষসী, পিশাচ, ডাইনী। তিনদিনের মধ্যে মাত্র তিন ঘন্টার সম্যক পরিচয়, তার জীবন থেকে মুছে দিল সমস্ত রঙ, সমস্ত শখ, আহ্লাদ, স্বপ্ন, আশা। সেটা বুঝি মৃত্যু নয়? শুধু টিকে থাকাটাই জীবন? জীবন থেকে বেঁচে থাকার সমস্ত আনন্দ হারিয়ে ফেলাটা নিষ্প্রাণতা নয়?

    বাঁধন তৈরি হওয়ার আগেই তাকে ছেড়ে আসতে হল শ্বশুরঘর। ফিরে এলো সেই বাপের বাড়িতেই। মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিল সুখের থেকে স্বস্তি ভালো। এই তো আমার বাড়ি, আমার গ্রাম, আমার দাদা, আমার বৌদিমণি, আমার ভাইপো, এই সব নিয়েই তো তার সংসার। কিছুদিনের জন্যে সেজেগুজে সে বেড়াতে গিয়েছিল বৈ তো নয়, আবার ফিরে এসেছে তার নিজের স্থানটিতে।

    কিন্তু না, তা হল না, খুব অল্প দিনের মধ্যেই সে টের পেল তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। যে বাঁধনের জোর নিয়ে সে আশ্বস্ত ছিল, সে বাঁধনের জোড় ছিঁড়ে গেছে। সে এখন অকল্যাণী, রাঁড় বিধবা। তার ছায়াতেও সংসারের অমঙ্গল নেমে আসে। গ্রামের যে বান্ধবীদের বাড়িতে তার সময়ে অসময়ে ছিল অবাধ যাতায়াত, সেই বান্ধবীদের সকলের একে একে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের দিন তাদের একজনের বাড়িতেও তার প্রবেশের অনুমতি ছিল না। সে বান্ধবীরা বিয়ের এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাপের বাড়ি এসেছিল পোয়াতি হয়ে। তাদের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে, একজন বান্ধবীর মা আড়াল থেকে তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল, “এ বেদবা মাগী কেন মরতে আসে রে, আমাদের বাড়ি? নিজের ভাতারটাকে খেয়ে, এবার আমাদের বাড়ি এয়েছে। কিচু একটা অকল্লেণ ঘটিয়ে তবে ছাড়বে। রাঁড় মাগি, পুজোআচ্চা, সন্দে-আন্নিক নিয়ে থাকলেই পারে, তা না, লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কুদিষ্টি দেওয়া...”।

    এ বাড়িতেও সেবার খোকার পৈতে হল। ব্রহ্মচারী হয়ে খোকাকে তিন দিন তিন রাত্রি ঘরে থাকতে হল। সে সময় শূদ্রদের মুখ দেখার নিয়ম নেই। পিসিমাকেও মুখ দেখানোর নিয়ম ছিল না, পিসিমা যে বিধবা! এ বাড়ির প্রতিটি পুজো অর্চনায়, মঙ্গল অনুষ্ঠানে পিসিমাকে সর্বদাই আড়ালে থাকতে হয়। এই তো সেদিন কত ধুমধাম, আড়ম্বর করে খোকার বিয়ে হল। কত আত্মীয়-স্বজন, কুটুম পাড়া-প্রতিবেশী, কত হৈ হুল্লোড়। সাজ-গোজ, আমোদ আহ্লাদ। কত আয়োজন, রান্নাবান্নার ভিয়েন, যোগাড়-যন্ত্র। এ সব কিছু থেকেই তাকে সযত্নে আড়াল করে রাখা হয়েছে। একবারের জন্যেও এই আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে, কেউ তাকে আবাহন করেনি। অসাবধানে গিয়ে পড়লে, কেউ না কেউ মনে করিয়ে দিয়েছে, “তুই এখানে, কেন বাছা? এসবের মধ্যে তোকে আর থাকতে নেই, রে। তুই শোকেদুক্‌খে পোড়া মানুষ, যা নিজের ঘরে গিয়ে ভগবানের পায়ে নিজেকে সঁপে দে, মা। পরজন্মে এমন জেবন যেন আর না আসে, তারই তপিস্যি কর...”।

    পিসিমা পাগলের মতো ছাদের আলসেতে নিজের মাথা ঠুকতে লাগল। কান্না ভাঙা গলায় বলতে লাগল, “হে ভগবান, কি করেছি আমি? কেন, কেন আমাকে এই শাস্তি পেতে হবে, সারা জীবন? কী দোষ আমার? যে জন্মের কথা একবিন্দু মনে নেই, সেই আগের জন্মের কোন্‌ পাপের শাস্তি আমাকেই কেন বইতে হবে? হে করুণাময়, আমায় রক্ষা করো, রক্ষা করো, হে পতিতপাবন, আমায় শান্তি দাও। আমায় মৃত্যু দাও, হে ঈশ্বর।”

    মৃগাঙ্কর মা, এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন, অন্ধকারে ছাদের সিঁড়ির মুখে। কিছু বলেননি, শুধু দেখছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, কপালপোড়া মেয়েটা ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে, কোন অঘটন না ঘটিয়ে বসে। বাড়িতে কুটুম এসেছে। তারপরে আছে পাড়া প্রতিবেশী। সকলে তাঁকেই দুষবে, বলবে বৌদির বাক্যের জ্বালায় মেয়েটা ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ জুড়োল।

    অভাগী এই মেয়েটার জন্যে তাঁর দুঃখ হয়, মায়া হয়। বিয়ের সময় এ বাড়িতে যখন তিনি বউ হয়ে আসেন, বয়সে তাঁর থেকে ছ বছরের ছোট এই মেয়ে তাঁর ছোট বোনের মতো সর্বদা পায়ে পায়ে ঘুরত। সে সব দিনগুলির কথা ভাবলে আজও তাঁর চোখে জল ভরে আসে। ভাল ঘর, ভাল বর দেখে, এই মেয়েকে নিজে হাতে সাজিয়ে, তিনিই পাঠিয়েছিলেন স্বামীর ঘর করতে। পোড়াকপালীর সে সুখ সইল না, পাঁচদিনের মাথায় সব খুইয়ে ফিরে এল বাপের ঘরে। এ মেয়েকে নিয়ে এখন তাঁর হয়েছে যতো জ্বালা। তাঁর ছোট্ট সুন্দর সাজানো এই সংসারে কবে কখন কোথায় এই মেয়ের বিষ নিঃশ্বাস পড়ে কে জানে।

    নিঃশব্দ অথচ দ্রুত পায়ে, মৃগাঙ্কর মা পিসিমার কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসলেন। তার মাথায় হাত রাখলেন। পিসিমা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, তারপর মৃগাঙ্কর মায়ের বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে হু হু করে ভেঙে পড়ল কান্নায়, “আমাকে একটু বিষ এনে দিতে পারো, বৌদিমণি, একটু বিষ? কি হবে আমার বেঁচে থেকে, আমায় শান্তি দাও বৌদিমণি, আমায় একটু শান্তি দাও”।

    “তিন সন্ধ্যেবেলা এমন কাঁদতে নেই, ঠাকুরঝি। এমন কথাও বলতে হয় না। ছিঃ। সংসারের অকল্যাণ হয়। ওঠো, শান্ত হও। অবুঝ হয়ো না। তোমার কষ্ট কি আমাদের কষ্ট নয়? আমি কি বুঝি না ঠাকুরঝি, তোমার বুকের জ্বালা? নাকি, তোমার দাদা বোঝেন না? কোনদিন কোনভাবে আমরা তোমাকে অছেদ্দা করেছি, ঠাকুরঝি? কি করবে বলো, ভাগ্যের কাছে আমরা সবাই অসহায়। চলো, নিচেয় চলো, ঠাকুরঝি। আমরাও চাই, তুমি শান্তি পাও। ভগবানের আশীর্বাদ পাও। এই জীবনের সমস্ত দুঃখ দুর্দশার হিসেব, এই জন্মেই শেষ করে, পরের জন্মে যাতে সুখী হতে পারো, ভগবান তোমাকে সেই আশীর্বাদ নিশ্চই করবেন। আমি বলছি, ঠাকুরঝি, তিনিই অগতির গতি, করুণাসিন্ধু। তিনিই দীনসহায়, মানুষের চিরদিনের বন্ধু। তিনিই সর্বক্ষণ থাকবেন তোমার পাশটিতে। এখন চলো, নিচেয় চলো”।

    মৃগাঙ্কর মা পিসিমাকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলেন সিঁড়ির দিকে। এই ঘটনার একমাত্র সাক্ষী রইল নির্জন অন্ধকার আর মাথার উপর তারায় ভরা আকাশ।

    ১০

    বুড়িকে আবার তার বিছানায় বসিয়ে রেখে, বিশেষ ঘরে এল। চটপট জামা কাপড় ছেড়ে তোয়ালে নিয়ে ঢুকে গেল বাথরুমে। পারিবারিক বা এ ধরনের সামাজিক সেবা-টেবার কাজ তাকে কোনদিন করতে হয়নি, করার ইচ্ছেও হয়নি। এ কাজগুলো, এতদিন সে জেনেছে, সে নয়, অন্য কেউ – কোন তৃতীয় ব্যক্তি করবে। সামাজিক সেবাকর্ম সর্বদাই রাষ্ট্রের করা উচিৎ, অথবা কোন এনজিওর। তার বন্ধুবান্ধব – পরিচিতজন - সকলেই তাই মনে করে। কেউ সেবা করছে বা করেছে জানলে, ফেসবুকে, হোয়াটস্‌আপে, এক্স-হ্যাণ্ডেলে শেয়ার করেছে, লাইক করেছে। কমেন্ট করেছে “soooo gr8!”, “Congts,” “well dn”, “keep it up”। তার সোসাল মিডিয়ায় নানা ধরনের “Social Cause” ঢুকে পড়ে। পলক ফেলতেই সেই সকল “Cause” শেয়ার করে দেয় তার পরিচিতদের নানান গ্রুপে। কত যে পিটিশন সে অ্যাক্‌সেপ্ট করেছে। গুয়াতেমালায় বিড়ালের হাঁপানি বাড়ছে, “সেভ ক্যাট”। মালাউইর জঙ্গলে ভোঁদড়রা খাবার মতো যথেষ্ট মাছ পাচ্ছে না, অতএব “সেভ ওটার”। একটা ক্লিক করলেই সাপোর্ট ফর Cause। কোন অনুভূতি, দায় কিংবা মাথাব্যথা নেই। এসি ঘরের আরামে বসে, বিশ্ব জুড়ে কত লোক যে ক্লিক-ক্লিক করে লড়ে যাচ্ছে, অচেনা দেশের, অচেনা মানুষ ও প্রাণীদের জন্যে। অস্পষ্ট কারণের জন্যে, ভাবা যায় না!

    বিশেষও তাদের দলেই ছিল। আজকের এই ঘটনাটা তার চোখের সামনে থেকে সেই পর্দাটা সরিয়ে নিয়েছে। দারিদ্র্য, খিদে আর বঞ্চনা কোন পর্যায়ে যেতে পারে, এই বুড়িকে না দেখলে তার বিশ্বাস হত না। তার চেয়েও সে আশ্চর্য হল, একটা ক্লিক করে সে যা মজা পেত, তার চেয়ে আজ অনেক বেশী আনন্দ সে অনুভব করল। দুর্গন্ধময় ঘর, নোংরা অসুস্থ বুড়ি, তাকে কোলে নেওয়া, খাওয়ানো। এরকম পরিস্থিতি তার সামনে কোনদিনই আসে নি। এই অভিজ্ঞতা তাকে খুব তৃপ্তি দিল। বাস্তবিক আজ, ফর আ গুড কজ, সে কিছু একটা করতে পেরেছে!

    ফ্রেস হয়ে বিশেষ হীরালালজির ঘরে যখন গেল, হীরালালজি টিভিতে সিরিয়াল দেখছিলেন।
    বিশেষকে দেখে বললেন, “আ বেটা, আ। তোর জন্যেই ইন্তেজার করছিলাম। ইধ্যার ব্যায়ঠোগে, ইয়া ছাদ মে? সিরিয়াল মে দিলচস্পি হ্যায় কেয়া?”
    “সিরিয়ালমে কোই দিলচস্পি হ্যায় নেহি”। বিশেষ হেসে উত্তর দিল।
    “তব ছাদ মে, চল। রামু ছাদ মে দো কুর্সিয়া লাগা দে”।

    হীরালালজি আর বিশেষ ছাদে গিয়ে বসল সামনাসামনি দুটি চেয়ারে। চোখে পড়ল বৃন্দাবন শহরের আলোয় ভরা অজস্র মন্দিরের চূড়া। আর অজস্র তারার চুমকি দেওয়া, শামিয়ানার মতো মাথার ওপর বিছানো, বিশাল কালো আকাশ। চেয়ারে বসার পর হীরালালজি বললেন, “আজ তু একদম কামাল কর দিয়া, শুনা। এক বুড়ি কা বহোত সেবা কিয়া, খানা খিলায়া। বহোত আচ্ছা, বেটা। মেরা তো শুনতেহি দিল ভর গয়া”।
    একটু লজ্জা পেয়ে বিশেষ বলল, “অ্যায়সা কুছ নেহি, আংকল, বুড়ি রো রহি থি। বাস, কুছ মদত করনে কি কোশিশ কিয়া”।
    “এ লোক বহোত দুখী হ্যায়, বেটা। এক দো দিনমে, ইসকি ক্যায়সে কেয়া শুধার পাওগে? এদের দুঃখ কষ্টের সীমা নেই”।
    “আংকল, এরা কোথা থেকে এসেছে? সবাই দেখলাম বাঙালী। কতদিন থাকবে, এদের বাড়ির লোক এই অবস্থায় এদের ছাড়ল কি করে, সেটাই ভাবছি”।

    “বাড়ির লোক তো এদের কবেই ছেড়ে দিয়েছে। তুই জানিস না, জানার কথাও না। বৃন্দাবনে এমন বিধবা কয়েক হাজার আছে, কেউ বলে আট হাজার, কেউ বলে দশ হাজার। এদের সবাইকেই তাদের সমাজ-সংসার থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, ছেড়ে গিয়েছে ভগবানের আশ্রয়ে। এরা এখানেই আছে, এখানেই থাকবে, এখানেই মরবে। মুক্তি পাবে গোবিন্দের চরণে। এরকমই তো বিশ্বাস এদের”।
    “এদের অধিকাংশই দেখলাম বাঙালি। এদের সংসার থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে , বলছেন। কিন্তু কেন”?

    “ছোড় দে, বেটা। ওসব জেনে কি করবি? দু দিনের জন্যে এসেছিস, বৃন্দাবন দেখে নে। বৃন্দাবনের অনেক রূপ। আজ কী কী দেখলি বল।  কোথায় কোথায় গেলি, কেমন লাগল, সেই কথা বল”।
    হীরালালজি এই বুড়িগুলোর কথা এড়িয়ে যেতে চাইছেন, বিশেষ সেটা বুঝতে পারল। কিন্তু তার মনে কৌতূহল না মেটা পর্যন্ত সে ছেড়ে দেবে না। এই বুড়িগুলোর হদিস তাকে জানতেই হবে।

    সে বলল, “কেশীঘাট, যমুনা, সেবা কুঞ্জ, তারপরে অনেক মন্দির দেখলাম। যমুনা দেখে খুব বোর হয়েছি। বাট সেবাকুঞ্জ ইজ টু ইন্টারেস্টিং”।
    “ঠিক বলেছিস। যমুনার যে বর্ণনা আমরা নানান বৈষ্ণব সাহিত্যে পাই, তার ধারেকাছে নেই। সেকালে নিশ্চয়ই ছিল, এখন আর নেই। নদীর জল কমে গেছে, এদিকে মথুরা, দিল্লীর অজস্র কল কারাখানার ওয়েস্ট। যমুনা শেষ হয়ে গেছে। সেই যমুনা ভক্তদের কল্পনা ছাড়া আর কোথাও থাকবে না। তুই কি কালই চলে যাবি?
    “হ্যাঁ। বিকেলের দিকে। তার আগে সকালে একবার বসবো ওই বুড়ির সঙ্গে, আমাকে জানতে হবে, নিজেদের সংসার ছেড়ে কেন ওরা এখানে!”

    “বেটা, তু সমঝনে কো কোশিশ কর। ওরা নিজের মতো আছে, থাকতে দে না। তু দো দিনকা মেহমান, কী করবি সব জেনে সব বুঝে?”
    “আংকলজি, বুরা মত মানিয়ে। একবার যখন এদের সন্ধান পেয়েই গেছি, আমি জানবোই। আপনি না বললে, অন্য কেউ বলবে”। হীরালালজি বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বিশেষের দিকে।
    তাঁর চোখে প্রশ্রয়ের হাসি, বললেন, “তুই একদম বাপের মতো হয়েছিস, বেটা। ঠিক হ্যায়। তোর যখন এতই কৌতূহল, আমি বলছি। লেকিন, তোর খারাপ লাগলে, আমার খুব খারাপ লাগবে। দু দিনের জন্যে আমার কাছে এসেছিস, তোর বাবা তোকে পাঠিয়েছে আমার কাছে। তোকে এসব কথা বলেছি জানলে, তোর বাবা আমার উপর গুস্‌সা করবে”।

    বিশেষ কিছু বলল না, আগ্রহ নিয়ে হীরালালজির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হীরালালজি আবার বিশেষের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, তারপর বললেন, “এ বুড়িরা কোথা থেকে এসেছে, কবে এসেছে আমি জানি না। কেউই বোধহয় জানে না। এমনকি ওরা নিজেরাও হয়তো মনে করতে চাইবে না। ওদের জীবন থেকে বছর, মাস, সপ্তাহ বহুদিন অর্থহীন হয়ে গেছে। ওদের হিসেব এখন প্রত্যেকটি দিনের। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে ওদের চিন্তা, যে ছাদের নীচে ওরা আশ্রয় পেয়েছে, সেটা আজ সারাদিন থাকবে তো? যে মন্দিরে ওরা নাম কীর্তন করতে যায়, সেখানে আজও কীর্তন করতে দেবে তো? কীর্তন শেষে দু হাতা খিচুড়ি মিলবে কি? গতকালের চিন্তা ওরা করে না, কারণ প্রয়োজন নেই। আগামীকালটা ৬ধোঁয়াটে, চিন্তা করে লাভ নেই”।
    “এরা খিচুড়ির বিনিময়ে নাম কীর্তন করে? ব্যাপারটা কি রকম”?
    “বেটা, এ আমাদের সনাতন ধর্মের এক আশ্চর্য জটিল প্রক্রিয়া। ধর কোন এক বড়ো বেওসাদার বেওসায় প্রচুর লাভ করেছে। লাভের ছোট একটা অংশ দিয়ে সে ভগবানের মন্দির বানাল। ভগবানকে কৃতজ্ঞতা জানালে, বেওসাতে আরো তরক্কি হবে, এই আশায়। লেকিন নয়া মন্দির, ছোটা মন্দির, দর্শনার্থী কম। আরতির সময় নাম কীর্তন করবে কে? পেশাদার কীর্তনিয়া রাখার অনেক খরচ। তখন তারা এই বিধবাদের জড়ো করে। পঁচিশ তিরিশ জন বিধবা, রোজ চার হাতা খিচুড়ির লোভে, নাম কীর্তন করে। সেই কীর্তনের টানে আরতির সময় বেশ ভিড়ও জমে ওঠে। তাতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ে, প্রণামী বাড়ে দানপেটিতে। কম খরচে পুণ্য অর্জন। কিছু অর্থ উপার্জন, যা দিয়ে মন্দিরের মেন্টিন্যান্সও চলে যেতে পারে। আর কী ভাবে সম্ভব”?
    “বাঃ, বেশ অদ্ভূত পরিপূরক ব্যবস্থা”।
    “পরিপূরক কেন বলছিস, বেটা”?
    “পার্ফেক্ট ডিম্যান্ড এণ্ড সাপ্লাই সিস্টেম, ইউ গিভ মি পুণ্য, আই’ল গিভ ইউ খিচুড়ি”।
    “একদম। কোই হেডেক ভি নেহি হ্যায়। তুমি কোথায় থাকবে, কিভাবে থাকবে, আমার দেখার দরকার নেই। তুমি না করলে, আরো অনেকে আছে। অন্য কেউ আসবে, কোই ফিকর নেহি। এরা এই শহরের নানান বস্তিতে থাকে, এক একটা ঝুপড়িতে পঁচিশ-তিরিশ জন। বছর চারেক আগে, এরকম একটা বস্তি ভেঙে হোটেল উঠল, বেঘর হয়ে গেল বেশ কিছু বিধবা।
    আজকাল শহরে অনেক হোটেল হয়েছে, ধরমশালায় লোকে থাকতেও চায় না। আমার এই ধর্মশালায়, বেশ কিছু ঘর খালিই পড়ে থাকে সারা বছর। সোচা, ইসি মওকে মে, আমারও কিছু পুণ্য অর্জন হোক। তাই ওদের থাকার জন্যে, দুটো ঘর একটা বাথরুম আমি ছেড়ে দিয়েছি। সেই থেকেই জনা তিরিশেক বিধবা আমার এই ধর্মশালায় আছে। রোজ সকালে ওরা বেড়িয়ে যায়, পথে পথে ভিক্ষা করে। আরতির সময় হলে, মন্দিরে পৌঁছে যায়, কীর্তন করে, খিচুড়ি খেয়ে দুপুরে ফিরে আসে। বিকেলে আবার বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যার আরতি সেরে, খিচুড়ি খেয়ে রাত করে ফেরে। এই ওদের দৈনন্দিন রুটিন”।
    “এই অসম্ভব অপমানজনক উঞ্ছবৃত্তি ওরা নিয়েছে কেন, আংকল, পুণ্যের আশায়”?
    “বেটা, অ্যায়সা কভি হো সকতা হ্যায় ভলা? কোই ভি অওরত আপনি সংসার, আপনি সমাজ ছোড়না চাহতি হ্যায়, ইয়ে ম্যায় তো কভি ভি মাননেওয়ালা নেহি হুঁ”।
    “তাহলে? কিসের জন্যে এরা এসেছে”?
    “এরা কেউ নিজের ইচ্ছায় আসে নি, বেটা। ওদের সংসারই ওদেরকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এরা সংসার ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। খবর নিলে দেখবি, এরা সকলেই অল্প বয়সের বিধবা, অধিকাংশই নিঃসন্তান। তোদের বিদ্যাসাগরজী বিধবাদের আবার বিয়ের জন্যে যতই কোশিশ করে যান না কেন, আমাদের হিন্দু সমাজে, এই সেদিনও বিধবাদের দুসরা বিহা কোই সোচ ভি নেহি শকতে থে। আজকাল থোরা বহোত চালু হুয়া হোগা। ও ভি শহর মে। সংসারে ভাইয়ের বিধবা বউ, কিংবা বাপের ঘরে ফিরে আসা বিধবা মেয়ে বা বোন, কতটা বিপজ্জনক, তুই কি বুঝবি, বেটা? সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা দিতে হবে। পড়োশিরা সর্বদা তোর পিছনে কানাকানি করবে, তোর নিন্দে করবে। বলবে, বিধবা বউটাকে কিংবা বিধবা বোনটাকে ঝিয়ের মতো খাটায়। দুবেলা ঠিকমতো খেতে দেয় না।

    আর একটা কথা কী জানিস বেটা? প্রকৃতি বিধবা – বিপত্নীক বোঝে না। সে তার যৌবনের নিয়ম মেনে এক যুবকের শরীরেও যেমন আগুন জ্বালায় তেমনি এক যুবতীর অঙ্গেও উত্তাপ সঞ্চার করে। আমাদের সামাজিক সংস্কার দিয়ে প্রকৃতির সেই নিয়মকে আমরা রোধ করব, এমন সাধ্য কোথায়? পুরুষরা স্ত্রীর মৃত্যুর পর অচিরেই আবার বিয়ে করে ফেলে। সমাজ অনুমোদন দেয়। এমনকি পত্নী বর্তমান থাকতেও কত পুরুষ নিষিদ্ধ পল্লীতে যায় বিবিধ রমণীর রসাস্বাদন করতে। তখন সমাজ চোখে দেখতে পায় না, কানে শুনতে পায় না - নিশ্চিন্তে নিদ্রা যায়।

    কিন্তু যুবতী বিধবাদের ক্ষেত্রে সমাজ নিদ্রাহীন, সদা জাগ্রত - সঙ্কীর্ণ, অনুদার, নিষ্ঠুর। সতীদাহপ্রথাকে আমাদের সমাজ এককালে গৌরবের আসন দিয়েছিল। সেই প্রথাকে বন্ধ করতে গিয়ে তোদের রাজা রামমোহনকে কম যন্ত্রণা দিয়েছিল, অন্ধ হিন্দু সমাজ?  সেই প্রথা যখন বন্ধ হল, আমরাই বিধবাদের বোঝালাম – বৈধব্যও একরমের তপস্যা। সমস্ত ধরনের কামনা বাসনা রুদ্ধ করে, এই জীবনটা যদি নানান ব্রত-উপবাসে আর কঠোর সংযমে পার করে দেওয়া যায় – পরজন্মে মিলবেই স্বামী-সন্তানসহ সর্ব-সুখের এক জীবন।

    কিন্তু এত কিছু বাধা-নিষেধের পরেও, প্রকৃতির নিয়মে বিধবা মেয়েটি যদি সংযম হারায়? যদি তার পা পিছলে যায়? যদি অসামাজিক কোন সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে ওঠে? তাহলে কোথায় থাকবে সে পরিবারের সামাজিক সম্মান আর বোলবোলাও!”

    কথা বলতে বলতে হীরালাললজি একটু আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলেন, একটু বিরতির পর দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে আবার বললেন, “আমাদের ছোটবেলায় এমন অনেক দেখেছি, জানিস বেটা? পত্নী মারা গেছে, সেই শোকে স্বামী ঘর ছেড়ে দিল। এক সাল, দু সাল, তার কোন খবর নেই। কোথায় গেছে, কী করছে কেউ জানে না। আবার হঠাৎ একদিন সে গ্রামে ফিরে এল। তার স্বজন, পড়শিরা একদম হামলে পড়ল তার ওপর - “বাউরা বনকে কাঁহা চলে গয়ে থে”? দু-চারদিন পরেই স্বজনরা তাকে চেপে ধরে, বলে – “বিতে হুয়ে বাতে সব ভুল যা, ইয়ার, ফির শাদি কর – ফিরসে ঘর বসা লে”। তা সে স্বামী লোকটির জন্যে জলদি মেয়েও জোগাড় হয়ে যায়, বিয়েও হয়ে যায়। পুরুষমানুষ কখনও কুলটা হয় না, বেশ্যা হয় না। তার জন্যে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের সিমপ্যাথির এতটুকুও কমি কোথাও দেখতে পাবি না।
    “কিন্তু ঘটনাটা যদি উলটো হয়? স্বামীর মৃত্যুতে শোকেদুঃখে মেয়েটা যদি ঘর ছেড়ে দেয়? বছর দুয়েক পর যদি সে গ্রামে ফিরে আসে? তার বাবা-মা-ভাই-বোন তাকে ঘরেই ঢুকতে দেবে না। পড়শিরা তাকে গাল দিয়ে ঝ্যাঁটা মেরে পাড়ার বাইরে বের করে দেবে। সবাই – হ্যাঁ সব্বাই নিশ্চিত হয়ে যাবে, সে মেয়েটা কুলটা বন গয়ি”।                

     “এ সবের থেকে ভালো কাশিতে কিংবা বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দাও। চোখের আড়ালে থাক। ভগবানের নাম নিক। মাসে মাসে পঞ্চাশ-একশ টাকা মাসোহারা পাঠিয়ে দিলেই, দায়িত্ব খালাস। বাঁচলে বাঁচল, বিপথে গেলে গেল, মরলে মরল। মরলে বলা যাবে ভগবান উঠা লিয়া, মুক্তি মিল গয়ি। তোদের বাংলায় একটা কথা আছে না? “বেড়াল পার করা?” এই বিধবারাও সেই অবাঞ্ছিত বিল্লি, বেটা”।

    হীরালালজি থামলেন। বিশেষের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর বললেন, “বেটা, একদম চুপ হয়ে গেলি? বলেছিলাম না, সব সচ শুনতে নেই। জীবনের এবং সমাজের এমন অনেক কিছু অজানা থাকাই ভালো। মন খারাপ হয়ে গেল তো? ভুল যা এ সব বাতেঁ। তোরা আজকাল “মেমরি” থেকে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই “ডিলিট” করে দিস না? এটাকেও সেরকম ডিলিট করে দে। শান্তি না পাস, স্বস্তি পাবি। চল এখন নিচেয় যাই, অনেক রাত হল, খেয়ে নিই”।

    হীরালালজি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বিশেষের পিঠে হাত রাখলেন, বিশেষ মুখ তুলে তাকাল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল, বলল “চলিয়ে”।

    ১১

    হাতের সব কাজ সেরে মৃগাঙ্কর মা, তাঁর শোবার ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিতে দিতে বললেন, “কি গো, তুমি এখনো ঘুমোও নি”?
    “না। তোমার এতো দেরি হল”?
    “তোমার সংসারের কাজ কিছু কম নাকি? তারপরে তোমার বেয়াইমশাই কাল ভোরে বেরোবেন। সেই সব যোগাড় যন্ত্র করতেই দেরি হল”।

    মৃগাঙ্কর বাবার মুখে মুচকি হাসি, তিনি বললেন, “অ। সবই আমার। আমার সংসার। আমার বেয়াইমশাই। তোমার কিছুই নয়, তাই না মিনু”?
    মৃগাঙ্কর মায়ের নাম মৃণালিনী। তাঁর স্বামী শশাঙ্ক আদর করে ডাকেন মিনু। মৃণালিনী ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বললেন, “তুমি তো এই সংসারের কত্তা। আমি তোমার শ্রীচরণের দাসী। তোমার সংসারে আমি এসেছি তোমার আর তোমার সংসারের সেবা করার নিমিত্তে”।
     
     
    (চলবে...)

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৫০৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পলিটিশিয়ান | 2603:8001:b102:14fa:4e40:12a0:9807:cd8 | ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ ২০:৩০527106
  • এসব আপনি নিজের চোখে দেখেছেন?
  • Kishore Ghosal | ২২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:১০527108
  • @ পলিটিশিয়ান - "এসব" বলতে আপনি কার বা কাদের কথা বলেছেন? ঠিক বুঝলাম না।  
  • পলিটিশিয়ান | 2603:8001:b102:14fa:87e:98b8:9e3e:4bd7 | ২২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৫:২৭527109
  • আপনার গল্পের চরিত্রদের কথা বলছি। এই মেসে থাকা বিরহী যক্ষ, বহু বছর পরেও বন্ধুপুত্রকে এমন কাছে টেনে নেওয়া ধর্মশালার মালিক, বৃন্দাবনে বেড়াল পার করে দেওয়া বিধবারা এদের কথা বলছি।
  • Kuntala | ২২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৯:১৯527114
  • বৃন্দাবনের বিধবাদের কথা, অন্যান্য নারীচরিত্র গুলো, সবই আমাদের কমবেশি পরিচিত। কিশোর বাবু সুন্দর গুছিয়ে উপস্থাপন করেছেন। ভালো লাগছে।
  • Kishore Ghosal | ২২ ডিসেম্বর ২০২৩ ২২:০৮527118
  • @ পলিটিশিয়ান  - প্রশ্ন খুব কঠিন -  বুদ্ধদেব  থেকে সম্রাট অশোক কিংবা বিক্রমাদিত্য থেকে ঔরংজেব  কাউকেই চোখে দেখিনি। 
    তবে বৃন্দাবনে বিধবাদের দেখেছি - বহু কষ্টে তিনজন বিধবার সঙ্গে আলাপ করেছি - তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনই  বিগত জীবনের স্মৃতি বর্ণনা করেছিলেন - তিনি বর্ধমানের কন্যা - তবে বহু অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তাঁর গ্রামের নাম এবং দাদার নাম বলেননি।  
     
    @কুন্তলাদি - অনেক কৃতজ্ঞতা নেবেন। আমাদের খুব কাছের এবং প্রিয়  সাদা-কালো চরিত্রগুলিই আমি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছি। 
  • পলিটিশিয়ান | 2603:8001:b102:14fa:7020:8a5d:37d8:621c | ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ০০:১৬527119
  • কিশোরবাবু, আমার প্রশ্নটা আসলে বিস্ময়ের প্রকাশ ছিল। আমার নিজের এরকম মানবজমিন সরেজমিনে দেখার অভিজ্ঞতা নেই। তাই আপনি এত দেখেছেন বলে বিস্ময়।
  • Kishore Ghosal | ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:৩২527128
  • @ পলিটিশিয়ান - আপনার ছদ্মনাম "পলিটিশিয়ান" - তদ্ধর্ম অনুযায়ী প্রশংসা করলেন না  অপ্রশংস রইলেন বুঝলাম না। 
     
    তবে এটুকু বলতে পারি - 
    আমার  পিতৃপক্ষ এবং মাতৃপক্ষ  উভয়েই বর্ধমানের গ্রামবাসী ছিলেন। পিতৃদেব কলকাতার মেসেই থাকতেন - সপ্তাহান্তে কিংবা পক্ষান্তে বাড়ি যেতেন। যদিও আমার মাত্র এক বছর বয়সে - বাবা আমাদের নিয়ে কলকাতায় বাসা নিয়েছিলেন। সদ্য মেস ছেড়ে আসা বাবার অনেক বন্ধু- সহমেসবাসীরা আমাদের পারিবারিক বন্ধুও ছিলেন। অতএব বালক বয়েসে  বাবার মুখে নানান গল্প শুনে এবং কোন কোন ছুটির দিন বাবার হাত ধরে মেসে যাওয়া আসা থেকে মেসের জীবন যাপন দেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছিল।  সে অভিজ্ঞতায় সাড়ে চুয়াত্তরের রসরাজ তুলসীবাবুর মতো মেসম্যানেজার, কিংবা সাম্যময় ব্যানার্জি,  নবদ্বীপ হালদার, জহর রায়ের মতো রসিকপ্রবর বোর্ডার দেখিনি, ধনঞ্জয়বাবুর মতো সঙ্গীতজ্ঞ বোর্ডার তো নয়ই।  
    আমার অভিজ্ঞতা আটপৌরে - ছাপোষা করণিক মেস বোর্ডারদের নিয়ে। কিন্তু মেস জীবন নিয়ে লিখলেই - "অ সাড়ে চুয়াত্তর থেকে...তাই না?" গোছের মন্তব্য শুনতে হয়।
     
    অতঃপর কর্মসূত্রে  আমাকে ভারতের বহু জায়গায় ঘুরতে হয়েছে - ঘোরা বলতে ঠিক টুরিস্ট  নয় - বরং প্রতি জায়গাতেই কম করে দেড় দু বছর - কোন কোন জায়গায় চার-পাঁচ বছরও থাকতে হয়েছে। সেই সূত্রে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে আলাপ - পরিচয় হয়েছে ।  সে রকমই আজ থেকে বছর পনের আগে এক সময় বৃন্দাবনের কাছাকাছি বেশ কিছুদিন থাকতে হয়েছিল - সেই  প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা - এবং অবশ্যই কিছু কল্পনা জুড়ে এই গল্প। 
     
       
     
        
  • পলিটিশিয়ান | 2603:8001:b102:14fa:2e01:5a2b:c3ba:ce07 | ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৭:২৪527131
  • প্রশংসাই করলাম কিশোরবাবু। বুঝিয়ে উঠতে না পারাটা আমার কলমের অক্ষমতা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন