এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • সৌদামিনীর ঘরে ফেরা - পর্ব ৫

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৪৫৩ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)


  • কপালে নরম হাতের স্পর্শে মৃগাঙ্কর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখল, খুব সুন্দর মুখের একটি মেয়ে নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। মুখে তার হাল্কা হাসি, কপালে টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর। নাকে ছোট্ট নোলক, কানে দুল, কণ্ঠে সোনার হার। ঘোমটা নেমে গেছে ঘাড়ের কাছে। দু হাত বাড়িয়ে মৃগাঙ্ক মেয়েটির মুখটা টেনে নিল খুব কাছে, তারপর তার অধরে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট। মেয়েটি অদ্ভূত শিহরণে আপ্লুত হয়েও, ছটফট করে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। কিছুটা সামলে নিয়ে লজ্জানত চোখে বিছানার পাশে বসে বলল, “আপনি এমন করবেন জানলে আমি কিন্তু এখন আসতাম না। নিচেয় মায়ের কাছে বসে থাকতাম”।

    মৃগাঙ্ক হাতের উপর ভর দিয়ে উঠে বসল, দেখতে লাগল তার স্ত্রী আশালতাকে, তার অনুভবে তখনো আশালতার অধরের শিহরণ ও স্বাদ। খুব গম্ভীর মুখ করে বলল, “তাই বুঝি? আমার কাছে আসতে তোমার একদম ভালো লাগে না, না? সেই জন্যে বাপের বাড়ি থেকে ফিরতে এত দেরি করলে? তাহলে তাই করো, নিচেয় মায়ের কাছে বসে থাকো, তারপর আবার চলে যেও বাপের বাড়িতে”।
    “ও মা, আপনার মুখে কোন কথাই দেখি আটকায় না। আমি বুঝি তাই বললাম? আমি এ বাড়ির বৌ, বাপের বাড়ি কেন যাবো? আপনি আমাকে বিয়ে করে এ বাড়িতে এনেচেন, আমি বাপের বাড়িতে থাকবো বলে”?
    “বাবা, আমাদের জন্যে যেন কত দরদ? একমাসের জন্যে যাচ্ছি বলে, সেই যে যাওয়া হল, চারমাস পরে এই ফিরলে”।
    “মোটেই চারমাস নয়। তিনমাস নদিন। আপনি তো সব জানেন, আমি বুঝি শখ করে বাপের বাড়িতে ছিলাম”?
    “বাবা মাস, দিন সব একেবারে হিসেব করে রাখা হয়েছে দেখছি”।
    “বা রে, আমার বুঝি ভালো লাগছিল থাকতে? কবে ফিরে আসব সেই দিন গুনছিলাম। আপনাদের কথা সবসময় মনে হত”।
    “আপনাদের মানে”?
    “বাবা, মা, পিসিমা। বাসন্তীদিদি, তিওয়ারিদাদা। বামুনদিদি, রাখালদাদা, পুণ্যিদিদি”।
    “অ, আর কেউ না”?
    “ও মা, আর কার কথা ভাববো”?
    “আমার কথা একটুও ভাবতে না? এদিকে আমি যে তোমার কথা ভেবে ভেবে পাগল হচ্ছিলাম!”
    “এ মা। সে কথা আবার বলতে হয় নাকি। আপনি তো আমার ইহকাল, পরকাল। আপনার চরণের দাসী হয়ে যেন আমরণ থাকতে পারি, আমাকে সেই আশীব্বাদ করুন”।
    “আচ্ছা, সে আশীর্বাদ না হয় করা যাবে, সে এখনই কিছু পালাচ্ছে না। কিন্তু তোমাকে চরণের দাসী করে আমি তো রাখবো না, আশা”।
    “ও মা, সে কি কতা। নিশ্চই আপনার চরণে আমার কিছু ঘাট হয়েচে। আপনার দুটি পায়ে পড়ি, আপনি আমার ওপর আর রাগ করে থাকবেন না”।
    “তোমাকে আমি আমার বুকের রাণি করে রাখবো, আশা”।
    “রাণিটানি আমি বুজি না। আমি তো আর আপনার মতো কালেজে অত পাস দিইনি। আমি মুক্‌খু মেয়েছেলে, আপনার চরণে থেকে আপনার সেবা করতে চাই”।

    মৃগাঙ্ক আশালতার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল, দীর্ঘদিন বিরহে থাকার পর এই মিলনের আবেগে আশালতা ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠল, কিন্তু লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, “আপনার দুটি পায়ে পড়ি, তিন সন্ধে বেলা এমন করতে নেই। মা লক্ষ্মী চঞ্চলা হন, গেরস্তর অকল্যাণ হয়। আমাকে ছেড়ে দিন, আমি নিচেয় যাই। আমি এখানে থাকলেই আপনি এসব করবেন। আপনিও নিচেয় চলুন, সবাই নিচেয় আছেন কতা বলচেন, আপনাকে সকলে ডাকচেন।”

    মৃগাঙ্ক ছেড়ে দিতে, আশালতা বিছানা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে দৌড়ে গেল দরজার দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে বলল, “আপনি আর দেরি করবেন না। নিচেয় সকলে আপনার জন্যে অপেক্ষা করচেন”।

    আশালতা চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৃগাঙ্ক, তারপর বিছানা থেকে নেমে এলোমেলো চুলটা ঠিক করে নিল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। ধুতি আর বেনিয়ান পড়া ছিল, এখন তার ওপর পড়ে নিল একটা পাঞ্জাবি। ঘর থেকে বেরোনোর সময় তার মনে হল, আশালতা কার সঙ্গে এসেছে সে জিজ্ঞাসা করেনি। খুবই অন্যায় হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে আশালতাকে দেখে তার এতই আনন্দ হয়েছিল, ভুলে গিয়েছিল কর্তব্য।

    বসার ঘরে তার বাবার সঙ্গে বসে আছেন আশালতার বাবাও। মৃগাঙ্ককে দেখে ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। মৃগাঙ্ক নিচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে উঠতেই, বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “এসো বাবা, এসো। দীর্ঘজীবি হও। তোমার বাবার কাছে, তোমাদের কাছে, আমার যে কত অপরাধ ঘটে গেল, এই ক মাসে, সে আর বলার নয়”। মৃগাঙ্ক সামনের তক্তপোষে বসে থাকা বাবাকেও প্রণাম করে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল, শুনতে লাগল আশালতার বাবার কথা।
    “মায়ের অসুখটা ভেবেছিলাম, সাধারণ ব্যাধি। শরীর থাকলেই জ্বরজারি যেমন হয়ে থাকে আর কি। তারওপর বয়েসও হয়েছে সত্তরের ওপর। মা বললেন আশা মাকে একবার দেখতে চান। বেয়াই মশাইয়ের থেকে আমি যদিও এক মাসের অনুমতি নিয়েছিলাম, তবে আমার মনে ছিল, দিন পনের কুড়ির মধ্যেই আমি নিজে এসে দিয়ে যাবো আশা মাকে। কিন্তু হয়ে গেল একদম অন্যরকম”।
    মৃগাঙ্কর বাবা বললেন, “বেয়াই মশাই, আধিব্যাধি, দৈবদুর্বিপাক না আপনার হাতে, না আমার হাতে। গোবিন্দর কৃপায় আপনার মাতৃদেবী এখন সুস্থ হয়ে উঠেছেন, এটাই সবচেয়ে আনন্দের কথা। এ নিয়ে আপনি নিজেকে আর কুণ্ঠিত করবেন না। আমাদের কাছেও বারবার বলে, আমাদের অপরাধী করবেন না। দাঁড়িয়ে রইলি কেন, খোকা, বোস না এখানে। বৌমা আমাদের যেমন ঘরের লক্ষ্মী, তেমনি আপনার কন্যা, আপনার মাতার পৌত্রী। কাজেই এ নিয়ে আপনি আর মনে খেদ রাখবেন না”।
    “এমন উদার মনের কথা আপনার পক্ষেই বলা সম্ভব বেয়াইমশাই, এ কথা আমি বাড়িতেও আলোচনা করি। তা, মৃগাঙ্ক বাবাজীবন, কাল তোমার আপিস যাওয়া আছে নাকি”?
    “আজ্ঞে, হ্যাঁ”।
    “সকালে কটায় বেরোতে হয়, বাবা”?
    “আজ্ঞে সাড়ে ছটার মধ্যে বেরোলে, সাতটা ষোলোর গাড়িটা ধরা যায়”।
    “সেই ভালো, বাবা, সেই ভালো। আমিও তোমার সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ব। আমি উল্টোদিকের গাড়ি ধরে বর্ধমান, সেখান থেকে সকালে অনেক গাড়ি পেয়ে যাবো”।
    “না না, বেয়াই মশাই, সেটি হচ্ছে না। আপনি এলেনই আজ সন্ধের মুখে। এ আপনাদের শহর নয় যে, এই রাত্রে বাজারে লোক পাঠিয়ে আপনার জন্যে কিছু আয়োজন করে ফেলব। কাল সকালে পুকুরে জাল নামাবো, দুপুরে মাছের ঝোল দিয়ে চারটি ভাত খেয়ে তবে আপনার মুক্তি। তার আগে আপনাকে ছাড়ছি না”। হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন মৃগাঙ্কর বাবা।

    আশালতার বাবা জোড়হাত করে বললেন, “অপরাধ নেবেন না বেয়াইমশাই, আপনার আতিথেয়তার কোন তুলনা নেই। কিন্তু আমাদের বংশে বিবাহিতা কন্যার ঘরে কন্যার পিতার অন্নগ্রহণ করার প্রথা নেই। আমি অবিশ্যি এসব কুপ্রথা বা সংস্কারে খুব একটা বিশ্বাসী নই। তাছাড়া, এই রাত্রে যাবোই বা কোথায়, অগত্যা রাত্রের অন্নসংস্থান আমাকে স্বীকার করতেই হবে”।
    “এরকম প্রথা আমাদের বংশেও চালু আছে। তবে তাই হোক। ময়দা তো অন্ন নয়, বেয়াইমশাই। লুচিতে নিশ্চই আপনার আপত্তি হবে না”।
    “হে হে হে হে। আপনি বড়ো বিচক্ষণ ব্যক্তি, বেয়াইমশাই”।
    “এই কে আছিস, ভিতরে বলে দে, রাত্রে বেয়াইমশাই ভাত খাবেন না, লুচি হবে”।
    “অন্দরের মা লক্ষ্মীরা আবার বিব্রত না হন, বেয়াইমশাই”।

    হাতে ধরা ট্রেতে জলখাবার নিয়ে বাসন্তীদিদি ঢুকল। তার সঙ্গে ঘোমটা দিয়ে ধীর পায়ে এল আশালতা। তার পিছনে এসে একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল পিসিমা। সবচেয়ে বড়ো সাজানো রেকাবিটি আশালতা বাসন্তীদিদির থেকে নিয়ে রাখল, নিজের বাবার সামনে। তারপরের ছোট রেকাবি দুটি দিল মৃগাঙ্কর বাবাকে ও মৃগাঙ্ককে।
    নিজের সামনে বড়ো প্লেট দেখে আশালতার বাবা বিষণ্ণ হাসি মুখে বললেন, “এই দেখুন বেয়াই মশাই। আপনিই দেখুন, বিয়ের পর মেয়ে পর হয়ে যায় কিনা। আমি বাইরের অতিথি, তাই আমাকে আগে দিল এবং বড়ো রেকাবিটাই দিল। আপনি নিজের লোক বলে, পরে দিল আর দিল ছোট প্লেট”।

    আশালতার বাবার এই কথায় মৃগাঙ্কর বাবা খুব জোরে হেসে উঠলেন হা হা করে, বললেন, “সে কথা তো একশবার বেয়াইমশাই, বৌমা এখন আমার ঘরের লক্ষ্মী, সংসারের কল্যাণ-অকল্যাণ ওকেই তো সামলাতে হবে। নিন চালু করুন”।

    “তবে যাই বলুন, বেয়াইদাদা, মেয়ে যতই পরের ঘরে যাক, নিজের সংসার হোক। নিজের বাপমাভাইয়ের জন্যেও তার বুক ফাটে। মুখ ফুটে বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু প্রাণটা কি আর কাঁদে না”? একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পিসিমা হঠাৎ বলে উঠল। আশালতার বাবা চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন পিসিমাকে, বললেন, “ও, ছোট বেয়ান? ভালো আছেন তো?”

    মৃগাঙ্কর মনে হল আশালতার বাবা পিসিমার এই কথায় খুব প্রসন্ন হলেন না। আর মৃগাঙ্কর বাবা তো বেশ বিরক্তই হলেন। পিসিমা কিন্তু থামলেন না, আবারও বললেন, “আমাদের বৌমার মতো মেয়ে হয় না। যে কটা দিন ছিল না, ঘর যেন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পরে এ কটা মাসেই বৌমা সব্বার মন এমন জয় করে নিয়েছে, যে বৌমা ছাড়া আমরা চোখে এখন অন্ধকার দেখি। পরের ঘরে এসে এমন আপন করে নেবার শিক্ষা তো আপনারাই দিয়েছেন, বেয়াইদাদা। তাই বলে ঠাকুমার শরীর খারাপ হলে সে যাবে না? ভগবান না করুন আজ যদি কিছু একটা ঘটে যেত, ওর মনে সারা জীবনের একটা আক্ষেপ থেকে যেত, ঠাকুমাকে চোখের দেখাটাও দেখতে পেলাম না। ষোলো বছর যে বাড়িতে বড়ো হয়েছে, তার বাবার কাছে, মায়ের কাছে আবদার করেছে, ভাইদের সঙ্গে দৌরাত্ম্যি করেছে, সে কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়, বেয়াই দাদা? ও সম্পর্ক যে রক্তের সম্পর্ক”।

    পিসিমা এত কথা বললেও কেউ কোন উত্তর দিলেন না। মৃগাঙ্ক অবাক হয়ে তাকিয়েছিল পিসিমার দিকে। পিসিমা এসব কথা এসময় কেন বলতে এল? কেউ কিছু বলল না দেখে পিসিমা চলে যেতে গিয়ে দরজার সামনে একটু থমকে দাঁড়াল, তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মৃগাঙ্ক দরজার বাইরে দেখতে পেল মায়ের আঁচলের প্রান্তটুকু।



    যমুনা দর্শনে যতটা হতাশ হয়েছিল, নিকুঞ্জবন দেখে ততটাই মুগ্ধ হল বিশেষ। বহু প্রাচীন এই বনস্থলীতে শ্রীকৃষ্ণ আজও নাকি নিত্য নেমে আসেন, শ্রীরাধা ও গোপিনীদের সঙ্গে সারারাত মত্ত হয়ে ওঠেন রাসলীলায়। প্রাচীন গাছবহুল এই উদ্যানের উচ্চতা কোমর, বড়ো জোর বুক সমান। কোন এক পরম যুগলের চরণরেণু স্পর্শ করার জন্যে সমস্ত গাছের মাথা যেন নত হয়ে আছে মাটির দিকে। সন্ধের আগে নিকুঞ্জবনের গেট বন্ধ করে দেওয়ার সময় বিশেষ বেরিয়ে এল। ঘুরতে লাগল শহরের পথে, মন্দিরে মন্দিরে। আলোয় উজ্জ্বল মন্দিরে মন্দিরে চলছে আরতি। অবিরত নাম গান। রাস্তার দু ধারে মোবাইলের দোকান, কম্পিউটারের দোকান, এটিএম, ব্রাণ্ডেড পোষাকের ঝকঝকে শোরুম, চিনিয়ে দেয় আধুনিক ভারতবর্ষের নাগরিক চিত্র। পাশাপাশি এই অজস্র মন্দির, তাদের সমবেত আরতির বাদ্য, মন্ত্র উচ্চারণ, নাম গান, বিশেষকে চিনিয়ে দিচ্ছিল এক সনাতন ভারতবর্ষকে। যে সনাতন ভারতবর্ষকে চেনার মন্ত্র সে পেয়েছে তার বাবার থেকে।

    অদ্ভূত এই শহরে অতীত ও বর্তমানের পাশাপাশি অধিষ্ঠানের অনুভূতি সংগ্রহ করতে করতে বিশেষ একসময় ক্লান্তি অনুভব করল তার দুই পায়ে। ঘড়িতে তখন সাড়ে আটটা বাজে। এই পরিক্রমা আজকের মতো শেষ করা উচিৎ। বাকিটুকু দেখার জন্যে কাল সারাদিন আছে। ধর্মশালায় ফেরার কথা মনে হতেই, এতক্ষণ যে ঘটনাটা ভুলে ছিল, সেই ঘটনার বিভীষিকা আবার তার মনে পড়ে গেল। এখনো কি সেই বুড়িগুলো বসে আছে ওই প্রাচীন বারান্দায়? ওই প্রাচীন দেওয়ালের প্রেক্ষাপটে? দিনের আলোতেই যে দৃশ্য তার অসহনীয় মনে হয়েছিল, রাত্রের অন্ধকারে সেই দৃশ্য আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

    সদর দরজার কাছে এসে বিশেষ একটু থমকাল। কান পেতে রইল কিছু শোনার জন্যে। শুনতে পেল না কিছু। সন্তর্পণে ঢুকে এল দরজা দিয়ে, প্যাসেজ পেরিয়ে উঠোনের সামনে এসে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল বিশেষ। নাঃ কেউ নেই। আশেপাশে, বারান্দায় কোন বুড়ি নেই। বারান্দার সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা প্লাস্টিকের তারে একটা বাল্ব আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। তার স্বল্প ক্ষমতায় আঁধার দূর হয়েছে ঠিকই কিন্তু জায়গাটা আলোকিত হয় নি।

    উঠোন থেকে বারান্দায় ওঠার সিঁড়িতে পা দিয়ে একটা আওয়াজ শুনতে পেল বিশেষ। কিছুটা গোঙানি, ভাঙা কান্নার মতো। বারান্দায় কেউ তো নেই। তাহলে বন্ধ দরজার ভেতর থেকে এই আওয়াজ এল? নাকি পুরোটাই তার মনের ভুল? না, ওই আবার শুনতে পেল, একটানা কেউ যেন কেঁদে চলেছে বিকৃত স্বরে। আওয়াজ অনুসরণ করে বিশেষ দাঁড়াল একটা বন্ধ দরজার সামনে। এই ঘর থেকেই আওয়াজ আসছে সে নিশ্চিত। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ নয়, ভেতর থেকে কি বন্ধ? বিশেষ কি দরজা ঠেলে দেখবে? কারা আছে এই ঘরে, কে কাঁদছে, কেনই বা কাঁদছে? কিন্তু এই কৌতূহলের কি দরকার আছে কোনো? কী যায় আসে, বিশেষ যদি শুনেও না শুনে চলে যায় তার ঘরে? স্নানটান সেরে, যদি হীরালালজির সঙ্গে বসে গল্প করতে বসে যায়?

    বিশেষ দরজায় হাল্কা চাপ দিতে খুলে গেল দরজাটা। ঘরের মধ্যেও কম পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে। দু হাতে ঠেলে হাট করে খুলে দিল দরজাটা। বদ্ধ ঘরের থেকে উৎকট দুর্গন্ধ তার নাকে এসে লাগল। অল্প আলোয় তার চোখে পড়ল দুপাশের দেয়াল ধরে, মেঝেয় ভাঁজ করা অন্ততঃ গোটা পনের বিছানা। একধারে একটা মাত্র বিছানায় শুয়ে কাঁদছে এক বুড়ি। জানালাহীন, বদ্ধ ঘরের মধ্যে সন্তর্পণে ঢুকল বিশেষ। দুর্গন্ধটা এবার চিনতে পারল। পচা চামড়ার মতো গন্ধ। হস্টেলে থাকতে, ঘরের কোনায় জমে ওঠা না-কাচা মোজা থেকে এরকম গন্ধ সে পেয়েছে। শুয়ে থাকা বুড়ির দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বিশেষ। বুড়ি তাকে দেখতে পেয়েছে। অল্প আলোয় বুড়ির ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি তার দিকেই। এখন আর তাই কাঁদছে না।

    বুড়ির কাছে গিয়ে, বিশেষ উবু হয়ে বসল, জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে? ও বুড়ি, কাঁদছো কেন?”
    দাঁতহীন ফোগলা মুখে ধাতব উচ্চারণে বুড়ি উত্তর দিল, “খাআআআবো। কিচু খেতে দিবি বাবা? তিনদিন কিচু খাইনি”। এইটুকু কথা বলেই বুড়ি হাঁফাতে লাগল। “কি খাবে”? বিশেষ জিজ্ঞাসা করল। বুকের পাঁজরগুলো হাপরের মতো ওঠানামা করতে করতে বুড়ি বলল, “ভাআআআত, দুটি ভাত খাবো”।

    কথা বলার পরিশ্রমে কংকালের মতো বুক থেকে কাপড়ের আঁচলটুকু সরে গেল। বিশেষ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল বুড়ির বুকের দিকে। যে স্তন্য পান করে বড়ো হয়ে ওঠে স্তন্যপায়ী মানুষ। যুগ যুগ ধরে যে স্তনের স্তব করে এসেছে বিশ্বের তাবৎ পুরুষকুল। এই সেই স্তন - কদর্য, অবাঞ্ছিত দুটি প্রত্যঙ্গের মতো!  

    বদ্ধ ঘরের দুর্গন্ধে, বিশেষ অস্বস্তি অনুভব করছিল। ঘাড়ের নিচেয় একটা হাত আর হাঁটুর নিচে অন্য হাত দিয়ে বিশেষ তুলে নিল বুড়িকে। মেদহীন, পুষ্টিহীন, অত্যন্ত হালকা কংকাল শরীরটাকে বাইরে এনে, বারান্দায় বসিয়ে দিল, দেয়ালে হেলান দিয়ে। ঘরের বাইরে নিশ্বাস নিয়ে স্বস্তি পেল, বিশেষ। বুড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল একবার, ছানি পড়া ঘোলাটে চোখে বুড়ি তাকিয়ে আছে তার দিকেই। নিচু হয়ে শাড়ির আঁচলে ঢেকে দিল বুড়ির শুকনো বুকটা। বুড়ি একই ভাবে তাকিয়ে বসে রইল, পাঁজরের দ্রুত ওঠা নামায় তার বুক ভরে উঠতে লাগল বাইরের বাতাসে।
    “বুড়ি, বসো, আমি আসছি, ভাত পাওয়া যায় কিনা, দেখি”।

    বিশেষ আবার রাস্তায় বেরিয়ে এল। আসার সময় বাঁদিকে একটা বাঙালি ভাতের হোটেল দেখেছিল, সেই দিকেই গেল। হোটেলে গিয়ে বলতে প্লাসটিকের প্যাকেটে আলাদা করে দিল ভাত, ডাল, একটা ভাজা, একটা তরকারি। দাম মিটিয়ে ফিরে আসার সময় বিশেষের মনে হল, এই বুড়িটাও দুপুরের সেই বুড়িগুলোর মতো তাকে “কাবু” করে ফেলল না তো? হয়তো সবটাই নাটক। একলা ঘরে কাঁদছিল, কেউ না কেউ শুনতে পাবেই, এই ভেবে!

    ফিরে এসে দেখল বুড়ি একই ভাবে বসে আছে। বুকের হাপরটা একটু কমে অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে শ্বাস প্রশ্বাস। প্যাকেটগুলো বারান্দার মেঝেয় যখন রাখল, বুড়ি আবার বলল, “ভাআআআত”? মুখ তুলে তাকালো বিশেষের দিকে। বুড়ির ফোগলা মুখে আনন্দের হাসি। দু চোখের দৃষ্টিও এখন অনেকটা স্বচ্ছ। প্যাকেটের মুখগুলো খুলে, মেঝেয় সাজিয়ে দিল বিশেষ, বলল, “ও বুড়ি, এই হল ভাত, এই ডাল, ভাজা আর এই তরকারি। খেয়ে নাও”। বাঁহাতে শরীরের ভর রেখে বুড়ি আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ল খাবারের ওপর। তার শরীরের ভারে থরথর করে কাঁপছে বাঁ হাতটা। ডান হাতে ভাত তুলে নিল মুঠিতে, মুখ অব্দি তুলতে পারল না। ঝরঝর করে পড়ে গেল মেঝেতে, কাপড়ে। অসহায় চোখ তুলে বুড়ি বলল, “খেতে পাআআরি না”।

    কি করবে এখন বিশেষ? খাইয়ে দেবে? উপায় কি? বুড়ির জন্যে নিয়ে আসা ভাত যদি বুড়ি খেতেই না পারে? দ্বিধা সরিয়ে ভাতের প্যাকেটের মধ্যে ঢেলে দিল কিছুটা ডাল, তার মধ্যে তরকারি, প্যাকেটের মধ্যেই মেখে নিল। তারপর ভাতের গ্রাস বানিয়ে, তুলে দিল বুড়ির মুখে। বুড়ি ফোগলা মুখে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে গিলে নিল, মুখ খালি করে আবার হাঁ করল। বিশেষ একের পর এক গ্রাস তুলে দিতে লাগল বুড়ির মুখে।

    বুড়ির ভাঙাচোরা জরাগ্রস্ত মুখের দিকে বিশেষ দেখতে লাগল। অজস্র বলিরেখার ভাঁজেও সে খুঁজে পেল শান্তির আবেশ, তৃপ্তির আনন্দ, নির্ভার ভরসা। ছানিপড়া ঘোলাটে চোখে কৃতজ্ঞতা। বিশেষের কণ্ঠে তখন দলাপাকানো এক কষ্টের অনুভূতি। তার আশৈশব স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল জীবনে, এমন অনুভবের সম্মুখীন, সে কোনদিন হয়নি।



    এক তলার বসার ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে পিসিমা সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল দোতলার ছাদে। যতদূর চোখ যায় চারদিকে অন্ধকার। খাপছাড়া দু একখানা বাড়ি, আর অজস্র গাছপালার আবছা অবয়ব। কেউ কোত্থাও নেই যেন, এই বিশ্ব চরাচরে। মাথার ওপর ঘন কালো আকাশ ভর্তি কোটি কোটি গ্রহ-তারা তাকিয়ে রয়েছে এই পৃথিবীর দিকে। সাক্ষী থাকছে সংসারের প্রতিটি ঘটনার। ...
     
     
    (চলবে...)
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৪৫৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন