এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  পড়াবই  বই কথা কও

  • দুই বরেণ্য কবি ও এক দামাল রাষ্ট্রনায়ক

    সোমনাথ গুহ
    পড়াবই | বই কথা কও | ১৫ অক্টোবর ২০২৩ | ৯৭৬ বার পঠিত | রেটিং ৪.৭ (৩ জন)

  • দিনটা ছিল ২৩শে জুন, ১৯৩৪, শনিবার। মস্কোর একটা দু কামরার এজমালি ফ্ল্যাট, মলিন, অভাবগ্রস্ত। দুটি পরিবার গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকে, এক ঘর থেকে আরেক ঘরে কথা শোনা যায়। করিডরের কোলাহল কানে আসে। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার অন্যতম সেরা কবি বরিস পাস্তারনাক, তাঁর স্ত্রী ও পুত্র একটি ঘরের বাসিন্দা। তাঁদের ঘরে অতিথি আছেন, বরিস লেয়নিদোভিচের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিকোলাই ভিলমন্ত। তখন বিকেল চারটে, হঠাৎ তিনি ফোনে কিছু কথাবার্তা শুনতে পেলেনঃ

    কমরেড পাস্তারনাক, কমরেড স্তালিন আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন
    কি! অসম্ভব! আজেবাজে কথা বলো না
    আবার বলছি, কমরেড স্তালিন আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন
    ইয়ার্কি হচ্ছে……
    আচ্ছা তাহলে এই ফোন নাম্বারটা রাখুন, আপনি নিজেই তাঁকে ফোন করে নেবেন।
    পাস্তারনাকের চেহারা ততক্ষণে বিবর্ণ। ইতস্তত করে তিনি ফোন তুলে ডায়াল করলেন।
    ওপার থেকে একটা কণ্ঠস্বর। আমি স্তালিন......বন্ধু মান্দেলস্তামের ব্যাপারে আপনি কি বিচলিত?
    আমরা কখনই সেভাবে বন্ধু ছিলাম না। আমরা আলাদা, ভিন্ন মতামত পোষণ করি। আমি সবসময় আপনার সাথে কথা বলার স্বপ্ন দেখেছি……
    আমরা পুরনো বলশেভিকরা কখনো নিজেদের বন্ধুদের এভাবে অস্বীকার করিনি, আর আপনার সাথে কথা বলার আমার কোন তাগিদ নেই, স্তালিন ফোন কেটে দিলেন।

    গল্প শেষ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভিলমন্ত শুধুমাত্র পাস্তারনাকের কথা শুনেছিলেন। স্তালিনের কথাগুলো তাঁর বন্ধু তখনই নিজে তাঁকে বলেছিলেন। লাইনটা কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাস্তারনাক আবার ফোন করার চেষ্টা করেন। তিনি জানাতে চেয়েছিলেন যে মান্দেলস্তাম সত্যিই তাঁর বন্ধু নন, এমনটা নয় যে তিনি ভয় পেয়ে তাঁর সাথে বন্ধুত্ব অস্বীকার করেছেন। কিন্তু বৃথাই চেষ্টা, ফোন ডেড!

    ভিন্ন মতে পাস্তারনাক মরীয়া হয়ে পুনরায় ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল যে তিনি নিজের অবস্থান ঠিক মত ব্যাখ্যা করতে পারেননি। অনেক চেষ্টার পর পস্ক্রেবাইশেভ, যিনি প্রথম কবিকে ফোন করেছিলেন, তাঁর হিমশীতল কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

    এই নাম্বারে আর কোন দিন ফোন করবেন না, কোন দিন না। বুঝতে পারছেন আপনি? এই একটি মাত্র কথোপকথনের জন্যই এই নাম্বারটি তৈরি করা হয়েছিল, এখন আর এটির কোন অস্তিত্ব নেই।

    স্তালিন তখন ছিলেন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মোড়া প্রবল প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক, তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ পাওয়া ছিল কল্পনাতীত। কেজিবি আর্কাইভ অনুযায়ী তিন থেকে চার মিনিট কথা হয়েছিল এবং আরও আশ্চর্য এই ঘটনাটিকে গোপন রাখার কোন চেষ্টা করা হয়নি। কবি পস্ক্রেবাইশেভের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তাঁর কী করণীয়। তিনি কি এই ঘটনা সম্পর্কে বন্ধুদের থেকে পরামর্শ নিতে পারেন, নাকি তিনি চুপ থাকবেন। তিনি অবাক হয়েছিলেন যখন তাঁকে বলা হয়েছিল যে এটা গোপন রাখার কোন প্রয়োজনই নেই, তিনি স্বচ্ছন্দে, সর্বত্র এটা আলোচনা করতে পারেন। ব্যস আর কি! লোকের মুখে মুখে এই ঘটনা সারা দেশ জুড়ে রটে যায়। সবাই নিজের মতো রঙ চড়ায়, নানা বিবরণ তৈরি হয়। আলবেনিয়ার প্রখ্যাত লেখক ইসমাইল কাদার এই কথোপকথনের তেরোটি প্রামাণ্য বিবরণ খুঁজে পেয়েছেন। সেগুলিকে নিয়েই তাঁর উপন্যাস ‘আ ডিক্টেটর কলস’। আখ্যানের কেন্দ্রে তৎকালীন রাশিয়ার সেরা দুই কবি এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ চার নারী----পাস্তারনাকের স্ত্রী জিনাইদা, প্রেমিকা ওলগা ইভিন্সকায়া, মান্দেলস্তামের স্ত্রী নাদেঝদা এবং আন্না আখমাতোভা, দুজনের অভিন্নহৃদয় বন্ধু, মনমাতানো রূপ ও কাব্যের জন্য যিনি কারো কাছে ‘নেভা নদীর রাণী’, কারো কাছে ‘রাশিয়ার স্যাফো’, আবার কারো কাছে ‘সমগ্র রাশিয়ার আন্না’। আর সবার অন্তরালে অভেদ্য ক্রেমলিন দুর্গের অভ্যন্তরে মহামতি স্তালিন।

    ঘটনার সূত্রপাত এর আগের বছরের নভেম্বর মাসে। মান্দেলস্তাম একটি কবিতা রচনা করেন, যা ‘স্তালিন এপিগ্রাম’ নামে পরিচিত। এই প্রতিবেদকের অক্ষম অনুবাদে কবিতার প্রথম চারটি লাইন নিম্নরূপঃ
    আমরা আমাদের পায়ের নীচের মাটির স্পর্শ পাই না,
    দশ পা দূরে আমাদের কথা শোনা যায় না।
    কিন্তু যখনই হয় সামান্য কিছু কথা,
    ঘুরে ফিরে আসে ক্রেমলিনের পাহাড়িয়া সর্বনাশা।
    কবিতাটির প্রথম খসড়ায় তৃতীয় ও চতূর্থ লাইন দুটি ছিল মারাত্মকঃ
    শুধু শুনি ক্রেমলিনের পাহাড়িয়ার কথা,
    খুনি ও কৃষক-হত্যাকারি সর্বনাশা।

    বেপরোয়া মান্দেলস্তাম কবিতাটি তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে পড়ে শোনান। শ্রোতাদের মধ্যে একজন ছিলেন পাস্তারনাক। তিনি কড়া ভাষায় কবিকে তিরস্কার করেন এবং তাঁকে সতর্ক করেন যে তিনি যেন আর কোথাও কবিতাটি পাঠ না করেন। বলেন ওটা শিল্প নয় আত্মহত্যা! আমি এর মধ্যে জড়াতে রাজি নই। কিন্তু খবর কি আর চাপা থাকে, খুব শীঘ্রই তা যথাস্থানে পৌঁছে যায়।
    এরপরের ঘটনাক্রম আমরা নাদেঝদার ‘হোপ এগেন্সট হোপ’, যে বই সোভিয়েত রাশিয়ার পাঁচ দশকের দলিল হিসাবে গণ্য করা হয়, সেটা থেকে জেনে নিতে পারি। নাদেঝদা লিখছেন তাঁরা যখন মস্কোতে ছিলেন এম আখমাতোভাকে দেখা করতে আসার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করতেন। তাঁকে স্টেশনে আনতে যেতেন, ট্রেন দেরি হলে মস্করা করতেন, তুমি আন্না কারিনার গতিতে ভ্রমণ কর। বাচ্চা ছেলেমেয়ের মতো তাঁরা এতো বকবক করতেন যে নাদেঝদা তাঁদের ধমক দিয়ে চুপ করাতেন। কিন্তু ১৯৩৪ এর সেই দিনটিতে তাঁরা দুজনেই অস্বাভাবিক ভাবে চুপ ছিলেন। কেমন যেন একটা গুমোট ভাব! ১৩ই মে রাতে সিক্রেট পুলিশ তাঁদের ফ্ল্যাটে হানা দেয়। অস্বাভাবিক তৎপরতায়, কোন ঠেলাঠেলি না করে, তাঁরা নাদেঝদাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকের কোমড়ে, গায়ে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন তাঁদের কাছে কোন আগ্নেয়াস্ত্র আছে কি না। তাঁরা পাঁচ জন ছিলেন---তিনজন এজেন্ট, দুজন সাক্ষী। এই দুজন চেয়ারে ধপ করে বসে ঘুমিয়ে পড়ে। বয়স্ক একজন ট্রাঙ্ক থেকে যাবতীয় কাগজপত্র বার করে সেগুলো খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। নাদেঝদাকে জামাকাপড় গোছাতে দেখে তাঁরা অবাক হন। “এতো কিছু দিয়ে কী হবে? আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন না যে আপনার স্বামী এতদিন ধরে আমাদের সাথে থাকবেন? একটু কথাবার্তা বলেই ছেড়ে দেবে।” আখমাতোভার রাতের খাবারের জন্য কপর্দকশূন্য মান্দেলস্তাম সেদিন তাঁর জন্য একটা ডিম নিয়ে এসেছিলেন। কবিকে নিয়ে যাওয়ার আগে আখমাতোভার হঠাৎ মনে পড়ে সারা দিন তিনি কিছু খাননি, সঙ্গে সঙ্গে ডিমটি তিনি তাঁকে খাইয়ে দেন। ভোর হয়ে যায়। দুই নারী একাকি ফাঁকা ঘরে বসে থাকেন। কোন কথা হয়না তাঁদের মধ্যে, সকালে চা খাওয়ার কথাও তাঁরা ভুলে যান। বেলা গড়াতেই নাদেঝদা বুখারিনের (নিকোলাই বুখারিন, প্রাভদার মুখ্য সম্পাদক, বলশেভিক দলের অন্যতম নেতা) সাথে দেখা করতে যান। সেই ১৯২২ থেকে তিনি পরিবারের সহায়। তাঁর চেষ্টাতেই মান্দেলস্তামের ভাই ইভজেনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। তাঁরই বদান্যতায় ১৯২৮ সালে তাঁর কবিতার বই প্রকাশ, আর্মেনিয়া সফর, পরিবারের জন্য রেশন কার্ড, আরও বইয়ের জন্য চুক্তি ও আগাম অর্থ। আখমাতোভা এক জর্জিয়ান নেতার সাথে দেখা করেন। পাস্তারনাক খবর পেয়ে ছুটে আসেন, সমস্ত রকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। নাদেঝদা তাঁকেও বুখারিনের সাথে দেখা করার জন্য অনুরোধ করেন।

    এক মাস নয় দিন বাদে সেই বহুচর্চিত ফোন! দেশের সর্বোচ্চ নেতার সাথে ঐ কথোপকথন দুই বরেণ্য কবির জীবন যেমন নির্ধারণ করে দিয়েছিল, একই সাথে সেটির কারণে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনও প্রকাশ্যে এসে গেছিল। তাঁদের নিয়ে চর্চা আজও অব্যাহত। ২০১০ সালে মস্কোয় পৌঁছে কাদার যখন তাঁর সঙ্গিনীকে জানান যে তিনি ঐ কথোপকথন নিয়ে লেখালেখি করতে আসছেন, সেই যুবতী উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, তাই নাকি! সে তো দারুণ ব্যাপার! শহরে তখনো আখমাতোভা আর পাস্তারনাককে নিয়ে নানা খোশগল্প উড়ে বেড়ায়। লোকের মুখে মুখে তাঁদের রসালো ছিনালিপনার গল্প। পাস্তারনাক নাকি আন্নার সাথে দেখা হলেই তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিতেন, বিবাহবিচ্ছেদ করার জন্য উস্কানি দিতেন। ১৯৫৭ সালে পাস্তারনাকের বহু বিতর্কিত উপন্যাস ‘ডক্টর জিভাগো’ প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠকদের মধ্যে প্রবল কৌতূহল ইয়ুরি জিভাগোর আমৃত্যু প্রেমিকা, রহস্যময়ী লারা বাস্তব জীবনে আসলে কে? স্বাভাবিক ভাবে জিনাইদা এবং দশ বছর ধরে লেখকের প্রেয়সী ওলগা ইভিন্সকায়ার নাম ঘোরাফেরা করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তৃতীয় এক নারীর নাম ভেসে ওঠে ---- আখমাতোভা! তাঁর স্বামী নিকোলাই পুনিন ও পুত্র লেভ যখন গ্রেপ্তার হন তখন পাস্তারনাক নিজে স্তালিনকে চিঠি লেখেন যা সাহস ও সহমর্মিতার এক বিরল নিদর্শন। চিঠির প্রথম লাইন, নিজের বন্ধুর পক্ষে না দাঁড়ানর কারণে আপনি একদিন আমাকে তিরস্কার করেছিলেন।

    এই বিখ্যাত ফোনালাপ সম্পর্কে আখমাতোভার কী বক্তব্য? কবি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, নাদিয়া কেন্দ্রীয় কমিটিকে টেলিগ্রাম করে, স্তালিন বিষয়টা পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেন......তারপর তিনি পাস্তারনাককে ফোন করেন। মৃত্যুর তিন বছর পূর্বে জুলাই মাসে কবি আবার এই ঘটনা স্মরণ করছেনঃ
    আমার যদি কোন বন্ধু গ্রেপ্তার হতো আমি তো তুলকালাম করে ফেলতাম, নেতার গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
    আমি মাথা গলালে আপনি ক্ষুব্ধ হতেন
    কিন্তু সে তো আপনার বন্ধু? পাস্তারনাক এটা শুনে থতমত হয়ে যায়।
    কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা।
    তিনি তো বিরাট কবি, তাই নয় কি? অবিসংবাদী নেতা আরেক কবির মতামত জানতে চান।
    কিন্তু সেটা তো গুরুত্বপূর্ণ নয়……
    আখমাতোভা লিখছেন, বরিস এড়িয়ে যাচ্ছিল, কারণ সে ভাবছিল য়োসেফ ইয়োগশাভিলি বুঝতে চাইছেন সে মান্দেলস্তামের কবিতাটা সম্পর্কে জানে কি না।
    আমরা মান্দেলস্তামকে নিয়ে কেন কথা বলছি, যখন আমি বহু দিন ধরে আপনার সাথে আলোচনা করার জন্য উদগ্রীব?
    কি প্রসঙ্গে?
    জীবন মৃত্যু সম্পর্কে।
    স্তালিন এই কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না, তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন রেখে দেন।
    কাদারের উপন্যাসে নাদেঝদার বক্তব্যও প্রায় একই। তিনি জানান চিন্তার কোন কারণ নেই, মান্দেলস্তামের ঘটনা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে এবং তারপর কবিকে ভর্ৎসনা, কেন তিনি বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াননি, বা রাইটার্স সংগঠনকে অবহিত করেননি।

    নাদেঝদা তাঁর গ্রন্থে লিখছেন, পাস্তারনাক এই ফোনালাপ সর্বত্র বলে বেড়িয়েছিলেন, কিন্তু যাঁরা ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত তাঁদের কাছে চেপে গেছিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন খোদ কবির থেকে ঘটনাটা পুরো জানতে হবে। একদিন তিনি সরাসরি তাঁর বাসায় চলে যান। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী কথা বলার সময় পাস্তারনাক কিন্তু বেশ সপ্রতিভ ছিলেন। তিনি শুরুতেই বলেন করিডরে বাচ্চারা খেলা করছে, প্রচুর আওয়াজ, কথা ঠিকমত শোনা যাচ্ছে না। তিনি অন্য কারো সাথে যে ভাবে কথা বলেন, সেভাবেই দেশের সর্বোচ্চ নেতার সাথে কথা বলেছিলেন। স্তালিন একই ভাবে তাঁকে ভর্ৎসনা করেন।

    আমি চেষ্টা করেছি বলেই আপনি ঘটনাটা জানতে পেরেছেন, আর রাইটার্স ইউনিয়ান তো ১৯২৭ এর পর থেকে এই ধরণের ঘটনা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করে না! কবি বলেন। তারপর তিনি এমের সাথে তাঁর সম্পর্কটা ঠিক কেমন, সেটা আদৌ বন্ধুত্ব বলা যায় কি না ইত্যাদি নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেন, স্তালিন তাঁকে থামিয়ে দেন।
    তিনি এক অনন্য প্রতিভা, তাই নয় কি? জিনিয়াস!
    কিন্তু সেটা তো আলোচ্য ব্যাপার নয়!
    তাহলে কি?
    আবার সেই দেখা করতে চাওয়া, কথা বলতে চাওয়া, জন্ম-মৃত্যুর গপ্পো এবং স্তালিনের ফোন রেখে দেওয়া।

    এই মহারথীদের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে কাদারের বইয়ে আর সেরকম কিছু নেই। চারিদিকে রটে যায় যে পাস্তারনাক ভয় পেয়ে মান্দেলস্তামের পক্ষে দাঁড়াতে অস্বীকার করেন। নাদেঝদা দ্বিধাহীন ভাবে লিখছেন এটা পুরো মনগড়া কথা, এরকম কিছুই ঘটেনি। মান্দেলস্তাম নিজে স্ত্রীর থেকে পুরো বিবরণ শোনার পর বলেন, পাস্তারনাককে এতে জড়ানর কী আছে? আর রাইটার্স সংগঠন সম্পর্কে সে যা বলেছে, তা তো পুরো বাস্তব। তিনি এও বলেন, আমি জিনিয়াস কি, জিনিয়াস নই এটা তো সত্যিই কোন বিষয় নয়।

    এই ফোনালাপের আগেই মান্দেলস্তামের সাজা হ্রাস করা হয়েছিল। নেতার বিশেষ নির্দেশ ছিল, ‘বিচ্ছিন্ন করো, কিন্তু বাঁচিয়ে রাখ’। সেই অনুযায়ী শাস্তি কমিয়ে শ্রমশিবির থেকে ‘মাইনাস ১২’ করা হয়েছিল, অর্থাৎ বারোটি প্রধান শহরের বাইরে তিনি থাকতে পারবেন। ১৯৩৮ এর মার্চে নিকোলাই বুখারিন নিজেই সন্ত্রাসের আবর্তে হারিয়ে গেলেন। মাথার ওপর থেকে ছাতা সরে যাওয়ায় অননুতপ্ত মান্দেলস্তাম তখন অসহায়, প্রান্তিক শহরগুলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঐ বছরই আবার তিনি গ্রেপ্তার হন। ডিসেম্বর মাসে ভ্লাদিভস্তক শহরের এক শিবিরে হাড়কাঁপান শীতে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। বিংশ শতাব্দীর রাশিয়ার সেরা কবি হাড় জিরজিরে শরীর ও শতচ্ছিন্ন পোশাকে শয়ান, তাঁকে চিহ্নিত করার জন্য নম্বর লেখা সামান্য এক টুকরো কাপড় গায়ে সাঁটা। পাস্তারনাক, আখমাতোভা তখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। কবিকে শায়েস্তা করতে পুত্র লেভকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। কসাইদের তালিকায় পাস্তারনাকের নাম ওঠে। স্বয়ং স্তালিন সেটা কেটে বাদ দিয়ে দেন, কড়া হুকুম দেন, ঐ মেঘ-বিচরণকারীকে স্পর্শ করবে না। ১৯৫৩র মার্চ মাসে তিনি চলে যান। তাঁর মৃত্যুর ওপরেও তো অবিশ্বাস, সন্দেহ, চক্রান্তের ছায়া। কয়েক মাস বাদে লাভ্রেন্তি বেরিয়া, পলিটব্যুরোর অন্যতম নেতা, গুপ্ত বাহিনীর মুল ঘাতক, বুক বাজিয়ে নাকি বলেছিলেন, আমিই তো ওনাকে শেষ করে দিলাম, আপনাদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিলাম।

    ১৯৫৮য় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পাস্তারনাক ফের রাষ্ট্রের শত্রু। তাঁর বিরুদ্ধে নেতারা বিষোদগার করেন, রাস্তায় মিছিল বেরোয়। তাঁকে রাইটার্স ইউনিয়ান থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর ফলে অনুবাদ ছাড়া অর্থ উপার্জনের তাঁর আর কোন উপায় থাকে না। ভগ্নহৃদয়ে কবি ১৯৬০ এর ৩০শে মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কাদার লিখছেন, নোবেল পুরস্কার প্রদান করার অর্ধ-শতাব্দীর বেশি সময় গত হওয়ার পর থেকে, রুশ কবিই প্রথম যাঁর পুরষ্কারের কারণে মৃত্যু হল। বন্ধুর মৃত্যুতে আখমাতোভা লিখলেন,
    সমস্ত পুষ্প যা জন্ম হয় এই পৃথিবীতে
    প্রস্ফুটিত হয়েছিল তাঁর মৃত্যুতে।
    বাকি রইলেন দুই বান্ধবী। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার নানা পট পরিবর্তন তাঁরা প্রত্যক্ষ করলেন। মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে কবি লিখলেন, যুদ্ধ, মহামারি, সন্ত্রাস এসব তো তুচ্ছ, কিন্তু এই ভীতির কে মোকাবিলা করবে, এই আতঙ্ক যার নাম সময়ের পলায়ন। ষাটের দশকে নাদেঝদা তাঁর বহুপ্রসিদ্ধ স্মৃতিকথা লিখলেন---‘হোপ এগেন্সট হোপ’ এবং ‘হোপ এবানডন্ড’।




    বইঃ আ ডিক্টেটর কলস
    লেখকঃ ইসমাইল কাদার
    আলবেনিয়ান থেকে ইংরাজিতে অনুবাদঃ জন হজসন
    প্রকাশকঃ হার্ভিল সেকার
    মূল্যঃ ৫৩৭ (হার্ড কভার)

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • পড়াবই | ১৫ অক্টোবর ২০২৩ | ৯৭৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Soumitra | 223.191.45.82 | ১৬ অক্টোবর ২০২৩ ০০:৪২524596
  • সোমনাথের হলো টা কী?
  • Aranya | 2600:1001:b04e:cd5e:21a8:4206:5c2e:bef8 | ১৬ অক্টোবর ২০২৩ ০১:২০524597
  • ভাল লাগল 
  • একক | ১৬ অক্টোবর ২০২৩ ০৩:৪২524600
  • স্তালিন কে অত দামাল ছেলের অভিধায় ঢাকা দেওয়ার দরকার ছিলো না। শয়তান একটা। 
     
    তবে,  কবির এসীড টেস্ট হচ্চে একনায়ক।  যুগে যুগে। এ নিয়ে সন্দেহ নেই। 
  • Ahsan ullah | ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:৩১526838
  • ১৯৩৮  সালে বুখারিনকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই স্তালিনের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়েছিল। কেজিবি দানব বেরিয়াকে ক্রুশ্চেভ যথাযথ শিক্ষা দিয়েছিল। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন