এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    আমার বই আর মফস্বলের ভোর - স্মৃতি ভদ্র | ছবি: রমিতএকটা চারকোনা টিনের বাক্স। তার ভেতরে বই, রুলটানা খাতা আর কাঠ পেন্সিল। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিন। নিরিবিলি, শান্ত আর নেহাতই আটপৌরে এক মফস্বলি শহরে শুরু হয় আমার পাঠশালার দিন। সবে শহরের গায়ে জেলা সদরের ভারিক্কি নাম ঝোলানো হলেও আচারে আচরণে সে শহর ছিল একদমই সাদামাটা। রাস্তার মোরে কিংবা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা টিনের আটচালা ঘরগুলো তখনও সাক্ষ্য দিতো এক আড়ম্বরহীন সময়ের। তবে সেসবের মাঝেও বেশকিছু বনেদি বাড়ি এখানে সেখানে ছড়িয়ে থেকে নিভৃতে বলে যেতো শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা। নদীর শহর। তাই বাড়ি থেকে বাক্স পেটরা নিয়ে বাবার চাকরির সুত্রে প্রথম যেদিন সে শহরে আসা হয় সেদিন কিন্তু স্টিমারেই করোতোয়া পার হতে হয়েছে। মন খারাপের আকাশভাঙা কান্না নিয়ে যখন বাড়ি আর ঠাকুমাকে ছেড়েছিলাম তখনও জানতাম না নদী পাড়ের সেই শহরের সঙ্গেই হয়ে যাবে আমার আজীবনের বোঝাপড়া। নদীর পাশেই নীচু এক পাড়, আমলাপাড়া। সেখানেই আমাদের মফস্বলি সময়ের শুরু। তখনও যমুনা নদীতে শহর রক্ষা বাঁধ পড়েনি। তাই বাঁধনহারা নদী ইচ্ছে হলেই চলে আসতো বাসার উঠোনে। এজন্য নদী আর জলেই আমার শৈশবের কাগজনৌকা ভেসে বেড়াতো ইছেমতন যখন তখন। তবে সেসব বাঁধাহীন দুরন্তপনা শেষে আমাকে যথারীতি ফিরতে হতো বাঁধাধরা জীবনের কাছে। দাদুর কাছে হাতেখড়ি আর পন্ডিত স্যারের কাছে শ্লেট চকে স্বরবর্ণ জীবন শুরু হলেও আক্ষরিক স্কুলজীবন শুরু হয় আমার সেই মফস্বলি সেই শহরে। গন্তব্য গৌরি আরবান প্রাথমিক বিদ্যালয়। কালিবাড়ি মন্দিরের গা ঘেঁষা ইটের ওয়ালগাঁথায় ঢেউটিনের দোচালা। ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট চোখে প্রথমদিনই দেখে নিয়েছিলাম গোল্লাছুট খেলার অবারিত মাঠ আর টলটলে এক টুকরো পুকুরকে। হাতে ধরা আমার বই, প্রাথমিক গণিত আর সামনে শিক্ষকের টেবিলে ঊষা মাসি, মঞ্জু দি, অশোকা দি, আলপনা আপা। হাজিরা খাতায় ভর্তি রোল ২৭।বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগর তুলছে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে ঘষি জ্বালছে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিক্সা। কুয়াশা কেটে কেটে আমার প্রথম স্কুলের দিকে এগিয়ে যাওয়া।আকাশী রঙের স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা কেডস। সাদা স্কার্ফ। চুলে দুই ঝুঁটি। আমার বইয়ের প্রথম ভাগ। এসেম্বলিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে ছড়িয়ে,আমি শপথ করিতেছি যে, দেশের প্রতি অনুগত থাকিবো...দফতরি ঘন্টা বাজায়। একবার। প্রথম পিরিয়ড। প্রথম শ্রেণির স্কুলবেঞ্চ। রূপা, রনি, রাজিব, সবুজ সবাই এক বেঞ্চে। অশোকা দি'র গম্ভীর মুখ। সবুজ রঙের হাজিরা খাতা। রোল কল। দাঁড়িয়ে উচ্চকন্ঠে 'উপস্থিত আপা'। ব্ল্যাকবোর্ড ডাস্টার চক। আমার বইয়ের প্রথম পাতা। আতা গাছে তোতা পাখি। রুলটানা খাতার প্রথম পাতা ভরে নিজের নামের বানান শেখা। আমার উত্তরণ। আমার বড় হওয়ার ভান করা। স্কুলের মাঠ। দাঁড়িয়াবান্ধা। ছুঁয়ে দিয়ে ভোঁ দৌঁড়। কালিবাড়ির গৌরমন্দিরে বাল্যভোগ। আর হলুদ কল্কি ফুলের ডালে একটা দুটো কাঠঠোকরা,ঠক...ঠক...ঠক...দফতরির একটানা ঘন্টা। ছুটি। মাটি জড়ানো পা কেডসে ঢোকানো। স্কুল গেটে হজমির পুরিয়া। লাল সবুজ কাঠি বরফ। আর চার আনায় পাওয়া নারকেল ছড়ানো সাদা বরফ। আজব বাকশো১৯৮৩ সাল। ছবিতে ছোট বৌমা বাড়িতে আসা নতুন এক অবাক বাকশের সঙ্গে। দত্ত স্টুডিও থেকে সেদিন সাটার টানা ক্যামেরা বাড়িতে এসেছিলো সময়কে কালো রিলে বন্দি করতে। ও হ্যাঁ, ঠাকুমার একান্ত অনুসারী আমি কাকিদের মুরুব্বীপনা করে বৌমা ডাকতাম। ফিরি এবার সেই অবাক বাকশের গল্পে। নব ঘুরালে প্রথমে সাদাকালো ঝিরঝির। এরপর উঠোনে বাঁশের মাথায় লাগানো এন্টেনার মাথা এদিক ওদিক ঘোরালে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হতো ছবি। সে ছবি হাসে, কাঁদে, গল্প বলে। আমাদের একান্ন উঠোনকে মাঝখানে রেখে চারপাশের ঘরগুলোর মধ্যে বড়ঘরই ছিল আমাদের বৈঠকখানা। তবে কেতাবিয়ানা ছিল না তাতে। ঘরের মেঝেয় নেহাতই পাটি পেতে সকাল-সন্ধ্যায় চা মুড়ি খাওয়া অথবা জরুরী কোনো আলোচনার আটপৌরে আয়োজনে সে ঘরই ছিল আমাদের অব্যর্থ গন্তব্য। একখানা কালো রঙের নকশী কাঠে খাট, খুব সাধারণ একখানা টেবিলক্লথে ঢাকা টেবিল আর মাত্র একটা চেয়ার। সেই চেয়ার অবশ্য বাড়ির যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একমাত্র দাদুর দখলে থাকতো দায়িত্বশীলতার একমাত্র বাহক হয়ে। আর ছিল একটা বারো ব্যান্ডের রেডিও। যে সন্ধ্যা থেকে কুনকুন সুরে কখনো গাইতো কখনো গুরুগম্ভীর হয়ে পড়ে যেতো সন্ধ্যা সাতটার সংবাদ। তবুও বৈঠকখানার সাধারণ সংজ্ঞা হয়ে বড়ঘরই ছিল আমাদের সকল বিনোদনের একমাত্র অনুসঙ্গ। কিন্তু সেই অবাক বাকশো আমাদের বাড়িতে আসতেই বদলে গেলো সন্ধ্যার সকল হিসেবনিকেশ। একান্ন উঠোনের পশ্চিমপাশে তখন একহারা তিনটা ইটের ঘর। সদ্য মাথা তোলা সেই ঘরগুলোর একটিতে মহাসমারোহে স্থাপিত হয়েছিলো সেই বাকশো। বিকেল হতেই বাড়ির উনুন নিভে যেতেই মা কাকিরা গা ধুয়ে মাড় দেওয়া কড়কড়ে শাড়ি পড়ে যখন কপালে সিঁদুর আঁকতে বসতো তখন মনিপিসি ঘড়ি দেখে ঠিক পাঁচটায় পৌঁছে যেতো অদ্ভুত সেই বাকশের সামনে। নব ঘুরিয়ে এন্টেনা এদিকওদিক নাড়িয়ে নানা কসরতে যখন বাকশোতে ছবি স্পষ্ট করতো তখন সেখানে নেহাতই কোনো এক গুরুগম্ভীর আলোচনা কিংবা হাটেমাঠে কৃষি নিয়ে জরুরী কোনো বাতালাপ। তবে এসবের মাঝেও মন খুশি হয়ে উঠতো যখন নিটোল মুখের অঞ্জলি মোস্তফা ঘোষণা করতো 'বি জে এন্ড দ্যা বিয়ার' উপস্থাপনার তখন বেশ গেড়েগুড়ে বসতাম আমি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার আশেপাশে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তো। মা কাকিদের কেউ কেউ সন্ধ্যার চায়ের পালা শেষ করেই এসে বসতো সেই অবাক বাকশের সামনে। তবে সপ্তাহের কোনো একদিন যখন রাত ন'টার পর সকাল-সন্ধ্যা নাটকের প্রারম্ভিক সুর বেজে উঠতো তখন বলতে গেলে সারা পাড়া হয়ে উঠতো আমাদের কুটুম। ঘর ছাড়িয়ে বারান্দা উঠোন থেকেও তখন একনিষ্ঠ নিবন্ধ অসংখ্য চোখ সেই অবাক বাক্সে। এরপর রাত পোহালেও সপ্তাহজুড়ে মা কাকিদের গল্পে থেকে যেতো সেই শিমু ভাবি কিংবা বুবলি। গল্প বদলে যাচ্ছিলো বাড়ির। বদলে যাচ্ছিলো বাড়ির সন্ধ্যা। মাটির কোলে, যদি কিছু মনে না করেন, এইসব দিনরাত্রি, ছায়াছন্দ, পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি, দ্যা বিল কসবি শো, মাটি ও মানুষ---আমরা বড়ঘরকে পেছনে ফেলে একটু একটু করে অভ্যস্ত হচ্ছিলাম সেই অবাক সাদাকালো বাকশে। মেঝেয় পাতা পাটিকে একলা করে আমাদের চায়ের আড্ডা সীমিত হয়ে আসছিলো ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই।সাদাকালো অবাক বাকশো বদলে দিচ্ছিলো আমাদের বাড়ির একান্ন সময়ের গল্প। তবে সেই অবাক বাকশের সকল আকর্ষণ উপেক্ষা করে কাঠের টেবিলে কুনকুন করে বেজে চলা রেডিও তখনও দাদুর সামনে একাই বলিষ্ঠ হয়ে বলে চলতো,সন্ধ্যা সাতটা, আপনারা শুনছেন ভয়েস অফ আমেরিকা...আশির আউনিবাউনি তাই সেই শোলোক যা আওড়াতে আওড়াতে আমরা শুধু বড়ই হই না, বদলেও যাই একান্ন উঠোনের এক্কাদোক্কা সময়কে পাশ কাটিয়ে।বালিকা বিদ্যালয় আমার ইশকুল। আমাদের বালিকা বিদ্যালয়। আমাদের আনন্দ আশ্রম। মফস্বলি শহরের বুকে এক ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন এক বিদ্যাপীঠ। ১৯৯১ সাল প্রাইমারিতে সেবারই সমাপনী পরীক্ষার চল শুরু। সে বিশাল (পড়ুন হাবেভাবে) বোর্ড পরীক্ষার বাঁধা ডিঙিয়ে রীতিমতো ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তবেই জায়গা হয়েছিলো এই বিদ্যানিকেতনে। তখন দিনপ্রতি দু'টাকায় রিক্সা ভাড়া পাওয়া যেতো। গাঢ় নীল রঙের ফ্রক আর সাদা স্কার্ফ, সাদা ফিতের কলা বেণী সঙ্গে টিফিনের চার আনা। সহজ, সরল কিন্তু মণিমাণিক্যে ভরা।সুকুমারের গলির মাথায় দাঁড়ালেই রাস্তার ওপাশে রিক্সা স্ট্যান্ড। বাবু'র মেয়ে। হাত তুলতেই প্যাডেলে পা পড়তো কারো না কারোর। এরপর ক্রাউন স্টুডিও, কড়ইতলা, রনি আইসক্রিমের ফ্যাক্টরি পেরিয়ে নীলা সিনেমা হল। ততদিনে রোজিনার গালের কালো তিলের দিন ফুরিয়ে শাবনাজের কাব্যিক চোখের দিন শুরু হয়ে গেছে। কেন জানি না সিনেমা হলে যাওয়া কোনো এক অজানা কারণে বারণ ছিল আমার তখন। তাই ম্যাটিনি শো'এর সব আহবান পুষিয়ে নিতাম নীলা হলে ঝুলিয়ে রাখা সিনেমার পোস্টার থেকেই। আর ছিল বসাক স্টোর্স। সেখান থেকে বেছে বেছে কেনা ভিউকার্ডেও মিটিয়ে নিতাম খানিক শখ। এরপর একটা মোড়। তার মাথায় ছিল ভিডিও ক্যাসেটের দোকান। নাম ভুলে গেছি তার। তবে সারাক্ষণ বেজে চলা হিন্দি গানগুলো দিব্যি মনে আছে! বলে রাখা ভালো তখন কিন্তু ৯০। তাই ৯০'র মেলোডিকে অস্বীকার করার দু:সাহস আসলে কখনই হয়নি আমার। মোড় পেরিয়ে লম্বা রাস্তা। তারপর আই এ কলেজ ( তখনও ইসলামিয়া কলেজ নামকরণ হয়নি)। এর সামনে বিশাল মাঠের এক কোণে মধ্যবয়সী কদম গাছ। জানি না কেন ফুল ভরা সেই কদম গাছ এখনো আমার স্বপ্নে চলে আসে হুটহাট। আরেকটু এগোলেই ইশকুল। তার আগে বুজে আসা একটা ছোট্ট পুকুর। বর্ষায় কচুরিপানা ফুলের সঙ্গে সখ্যতা কিন্তু আমার এখান থেকেই হয়েছে।এরপর রিক্সা থেকে নামতেই ফটক পেরিয়ে এক দৌঁড়। জানি না কেন অতটুকুন মাঠকে কী বিশাল প্রান্তর মনে হতো তখন!খ শাখার ক্লাশ নীচ তলাতেই ছিল। সীমানা প্রাচীরের বাঁধা ডিঙিয়ে অপ্রতুল আলোতেও আমরা হাসতাম, আমরা গাইতাম। নীরুপমা, সুমি (১) রনি, সালমা,মালবিকা, সুমি (২), ইভা, রুবা, ছালানা সবাই বন্ধু। নির্ভেজাল বন্ধুত্ব, এতোটাই গাঢ় যে হিন্দুধর্মের ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে থেকে যেতাম সকলের সঙ্গে। মৌলবী স্যার আসতেন, চোখে পড়তেই বকা দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন আমার ক্লাশে। মিলু দি অবশ্য হিন্দু ধর্ম ক্লাশে গান আর রেওয়াজ নিয়ে কথা বলেই সময় পাড় করতেন। খাতায় কাটাকুটি খেলা আর ইকোনো বল পেনের সব কালি ফুরিয়ে হাতে নকশা আঁকা শেষ হতেই টিফিনের ঘন্টা। আমাদের দুরন্ত সময়। কালো হজমি আর মিঠে জলের সময়। জামতলায় বসতো মাসি। চার আনায় এক প্যাকেট চানাচুর আর এক পুরিয়া হজমি। স্কুল থেকে মাথা গুনতি টিফিনে কখনো খুরমা কিংবা প্যাটিসের ভাগাভাগি শেষে আমরা বসতাম হজমি নিয়ে। আঙুল দিয়ে জিহবায় কালো হজমির গুড়ো লাগিয়ে দিয়েই ছুটতাম কলতলা। পুকুরের পাশে টিউবওয়েল চেপে অঞ্জলি ভরা জল মুখে চালান করে দিতেই হদিস পেতাম মিঠে জলের। আচ্ছা, সেই মিঠে জলের স্বাদ এখন আর পাই না কেন?এরপর দাঁড়িয়াবান্ধা, বরফ পানি সময়। ঘেমে নেয়ে যখন ক্লাশে ফিরতাম তখন খড়খড়ি তোলা জানালা পেরিয়ে আসা ইউক্যালিপটাসের গন্ধমাখা হাওয়া দিন ফুরানোর আভাস দিতো। বিকেল চারটা। ঢং ঢং ঢং ঢং....। দপ্তরীর ঘন্টায় দিনশেষের পরোয়ানা জারি হতেই আবার পরের দিনের অপেক্ষা।আমার বিদ্যালয়। আজও ফেসবুকের পাতায় ভেসে আসা ছবি দেখলে থেমে যাই। জুম করে দেখি। বারবার দেখি। খুঁজে খুঁজে বের করি এসেম্বলির জায়গা, বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীর অস্থায়ী মঞ্চ, টিনশেডের হিন্দু ধর্ম ক্লাশ, পি.টি. ক্লাশের সেই এক চিলতে মাঠ। আর খুঁজি কতগুলো চেনা মুখ কিংবা নিজেকে।১৯৯৬ থেকে ২০২৬ সাল। লম্বা সময়। ত্রিশ বছরেও পিছু ছাড়ে না এই বালিকা বিদ্যালয়ের পিছুডাক।
    গুরুচণ্ডা৯-র কবিতাপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিতকবি সুমন মান্নার কাব্যগ্রন্থ নৈঃশব্দ্যের তর্জমা থেকে আজকের পড়া হয়েছে যথাক্রমে- এসো কথা বলি, গদাইলস্করি মেঘ, পূর্বপ্রস্তুতিবিহীন, বাবা, সুখবর, টানাপোড়েন, ও নৈঃশব্দ্যের তর্জমা। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সোমনাথ রায়ের লেখা ‘পূর্বে আসো মেঘ' বই থেকে কবিতাপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সায়ন কর ভৌমিকের লেখা রাধিকা সংবাদ - স্ফটিকে পতঙ্গশরীর থেকে কবিতা পাঠে - অমিতাভ চক্রবর্তী। ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    আলোকপাঠ - মানফ্রেড রোমেলের রসিকতা সঙ্কলন - হীরেন সিংহরায় | ছবি: রমিতমানফ্রেড রোমেলের রসিকতা সঙ্কলন সম্পাদনা উলরিখ ফ্রাংক-প্লানিতস এঙ্গেলহর্ন প্রকাশন স্টুটগার্ট১৯৯৯ এই এপ্রিল মাসে মিউনিকে কার্লস প্লাতসের একটি বইয়ের দোকানে চোখে পড়ল মানফ্রেড রোমেলের রসিকতা সঙ্কলন। সেটি আমার আজকের আলোক পাঠ। এরউইন রোমেলের কাহিনী মোটামুটি সর্বজন বিদিত; তিনি নাৎসি আমলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একমাত্র মানুষ যার নামে জার্মানিতে প্রায় তিরিশটা রাস্তা, স্কোয়ার, আর্মি ব্যারাক নামাঙ্কিত হয়েছে। তাঁর শেষ আবাসের বর্তমান ঠিকানা এরউইন রোমেল স্টাইগে ১৩। তবে তস্য পুত্র মানফ্রেডের নামটা হয়তো আমাদের কাছ তেমন পরিচিত নয়; তবে বইটির কথা বলতে গেলে প্রথমেই তাঁর পিতার সঙ্গে শেষ দেখার কাহিনী থেকে শুরু করতে হয়। প্রাক কথন পিতা পুত্র: শেষ ছ’টি ঘণ্টা হ্যারলিঙ্গেন, অক্টোবর ১৪, ১৯৪৪, সকাল ছ’টা হারলিঙ্গেন  স্টেশনকুয়াশা মোড়া সকালে ট্রেন থেকে নামল সামরিক ইউনিফর্ম পরিহিত এক কিশোর। গত সন্ধ্যায় তার বাবা ফোন করেছেন, মানফ্রেড যেন রিডলিঙ্গেনে তার বিমান বহরের সহায়কের কাজ থেকে দু দিনের ছুটি নিয়ে অতি অবশ্য আজ হ্যারলিঙ্গেনে তার বাবার কাছে আসে। তিন মাস আগে ফ্রান্সে তাঁর গাড়ির ওপরে ফাইটার বিমানের আক্রমণে তিনি ঘাড়ে ও কাঁধে চোট পেয়েছেন, বাঁ চোখের দৃষ্টি হয়েছে ক্ষীণ। কর্ম জীবনে প্রথম লম্বা ছুটি নিয়ে আগস্ট মাস থেকে রয়েছেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে। ডাক্তারদের চিকিৎসা এবং স্ত্রীর শুশ্রূষায় তিনি ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠছেন, চোখের জ্যোতি খানিকটা ফিরে এসেছে।এত কম সময়ের নোটিসে মানফ্রেডের ছুটি পাওয়া শক্ত হয়নি। তার বাবার নাম ফিল্ড মার্শাল এরউইন রোমেল।মাত্র তিন বছর আগে উত্তর আফ্রিকায় ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লিবিয়া, মিশরে তাঁর ঝটিকা আক্রমণ এবং যুদ্ধ চাতুরীর জন্য মরুভূমির শৃগাল – ডেজার্ট ফক্স - নামে খ্যাত হয়েছিলেন; তোবরুকের বিজয় গাথা রূপকথার পর্যায়ে পৌঁছেছে। মিশরের এল আলামেনে আফ্রিকা কর্পসের পরাজয়ের পরে জার্মানির জয়রথ থেমে গেছে, রোমেলের তারকা নিম্নগামী; স্তালিনগ্রাদে সিক্সথ আর্মি সহ ফিল্ড মার্শাল ফন পাউলুসের আত্মসমর্পণ, সিসিলিতে মিত্রশক্তির আক্রমণ এবং জুন মাসে মিত্র সেনার নর্ম্যান্ডি তটে অবতরণের পর এরউইন রোমেল ক্রমশ হিটলারের রণনীতির ওপরে আস্থা হারাচ্ছেন; এই যুদ্ধে পরাজয়কে আসন্ন মনে করেছেন। গত বছরে ভিয়েনার নয়স্টাড থেকে পারিবারিক বাসস্থান সরিয়ে এনেছেন উলমের কাছে হ্যারলিঙ্গেনে, যেটি তাঁর জন্মস্থান হাইডেনহাইম থেকে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। তাঁর বাড়িটিকে ফিল্ড মার্শালের মর্যাদা মাফিক সাজানো গোছানোর ভার নিয়েছে উলমের পৌরসভা। রোমেল ভাবেন পূর্ব ফ্রন্ট, নর্ম্যান্ডি, ইতালি থেকে বহুদূরের এই ছোট্ট জনপদে তাঁর স্ত্রী লুসিয়া মারিয়া ও একমাত্র সন্তান মানফ্রেডের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত।ম্যানফ্রেড, লুসিয়া ও এরউইন রোমেলনর্ম্যান্ডি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজের হেড কোয়ার্টারে যাবার পথে সাঁ ফয় দে মন্টগোমেরিতে যেদিন তাঁর স্টাফ কারের ওপরে ব্রিটিশ সুপারমেরিন স্পিটফায়ার গুলি চালায়, তার ঠিক তিন দিন বাদে কাউন্ট ফন স্টাউফেনবের্গের নেতৃত্বে পূর্ব প্রাশিয়ার রাস্টেনবের্গে (নেকড়ের আস্তানা, ভলফশান্তসে) হিটলার হত্যার ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে এরউইন রোমেল যে জড়িত ছিলেন এমন গুজবের পক্ষে কোন প্রমাণ সাবুদ কখনো মেলেনি। ১৯৪৩ সাল থেকেই তিনি প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে হিটলারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিক যে কি ঘটছে সেটা না বুঝে বা না জেনেই যে হিটলার লড়াইয়ের ছক কষেন, তিনি তার ঘোর বিরোধী! বিশে জুলাই হিটলারের ওপরে হামলার পরে তিনি এও বলেছিলেন, স্টাউফেনবের্গ কাঁচা কাজ করেছেন, আমাদের যে কোন সেনা এটা সহজে সারতে পারতো। আগস্ট মাসে তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, ‘নর্ম্যান্ডিতে যে ধ্বংস লীলা ও প্রাণহানি দেখলাম, তাতে আমার মনে হয় না এ যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কোন অর্থ আছে। যে ভাবে হোক, শেষ হলেই ভালো।’ হ্যারলিঙ্গেন ট্রেন স্টেশন থেকে তার বাড়ি ভিপিঙ্গার স্টাইগে ১৩ মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। ভিলার দুয়োরে দাঁড়িয়ে ছিলেন পিতা, ছেলে আসতেই তাকে দোতলায় নিয়ে গেলেন; সেখানে পিতা পুত্রকে ব্রেকফাস্ট, ফ্রুইষটুক পরিবেশন করলেন মা লুসিয়া মারিয়া, এরউইন রোমেলের ‘লুতসি’। খাওয়া শেষে বললেন, চলো মানফ্রেড, বাগানে একবার হেঁটে আসি। এই পরিক্রমায় তিনি ছেলেকে বললেন, জানি না স্টেশন থেকে আসার পথে তুমি লক্ষ করেছো কি না, আমাদের ছোট গ্রাম গেস্টাপোয় ভরে গেছে, এই বাড়ির ওপরে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। মানফ্রেড বলল, হ্যাঁ, স্টেশন থেকে আসার পথে দেখলাম আমাদের বাড়ির গেটের সামনে, একটু দূরে কয়েকটা সামরিক গাড়ি পার্ক করা আছে, তার ভেতরে বন্দুকধারী অসামরিক পোশাকের মানুষ বসে। কিন্তু কেন? রোমেল বললেন, ‘ফুয়েরার মনে করেন আমি ভালকিয়েরির (২০শে জুলাই ১৯৪৪ হিটলার হত্যা প্ল্যান) সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, আমার চিফ অফ স্টাফ হান্স স্পাইডেল বলেছেন আমি সক্রিয় ভাবে যোগ না দিলেও দূর থেকে সমর্থন করেছি, আরেক ষড়যন্ত্রকারী জেনারেল স্টুলপনাগেল তাঁর মৃত্যুকালীন এক অসংলগ্ন বিবৃতিতে আমার নাম জড়িয়েছিলেন। অনেক বিষয়ে যে ফুয়েরার ও আমি একমত নই, কখনো ছিলাম না তা তিনি জানেন, সবাই জানেন। কিন্তু তাঁকে মেরে ফেলাটা আমি সমর্থন করতে পারি না, যদিও কোনো মহল আমার ভূমিকা সম্পর্কে অন্য মত পোষণ করেন। আজ বার্লিন থেকে ফুয়েরারের বার্তাসহ দু জন আসবেন, জেনারেল বুর্গডর্ফ ও জেনারেল মাইজেল। আমার আরোগ্যের পরে হয়তো বদলির আদেশ হবে, হয়তো পূর্ব ফ্রন্টে যেতে হবে, অথবা অন্য কোন আদেশ। তোমাকে জানাব কী ঘটতে যাচ্ছে। ভিপিংগার স্টাইগে ১৩ ১৯৪৪/ ডানদিকে এরউইন রোমেল স্টাইগে ১৩ ২০২৬ ঠিক এগারোটায় সামরিক ইউনিফর্মে সজ্জিত ভেরমাখটের সেই দুই জেনারেল এলেন। রোমেল তাঁদের নিয়ে লাইব্রেরি ঘরে বসে পঁয়তাল্লিশ মিনিট কথা বলার পরে আবার দোতলায় উঠে ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘মানফ্রেড, ফুয়েরারের মতে আমি বিশ্বাসঘাতকতার (হোখফেরাত) অপরাধে অপরাধী। আমার সামনে দুটো শর্ত রাখা হয়েছে, স্বেচ্ছায় মৃত্যু মেনে নিলে আমাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত করা হবে, তোমার মা আজীবন পেনশন পাবেন। অন্যথায় জনতার আদালতে আমার বিচার হবে। তুমি জানো গত তিন মাসে বিচারক রোলান্ড ফ্রাইসারের আদালতে কোন সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়াই কতজন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, পিয়ানোর তারে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। আমি প্রথম পথ বেছে নিচ্ছি। এবার চলো তোমার মাকে গিয়ে জানাই পনেরো মিনিট বাদে আমার মৃত্যু হবে।’ বেলা একটা। রোমেল তাঁর সবচেয়ে গর্বের আফ্রিকা কর্পসের ইউনিফর্ম, টুপি পরে হাতে ফিল্ড মার্শালের ব্যাটন নিয়ে ভিলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পুত্র মানফ্রেড ও লুসিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিলেন; তাঁর দীর্ঘদিনের সহকারী অ্যাডজুটেনট আলডিনগারকে বললেন, আপনার কাছ থেকেও বিদায় নিতে হবে (ইখ মুস আউখ ফন ইনেন আবশিড নেমেন) জেনারেল বুর্গডরফ ও জেনারেল মাইজেলকে ‘হাইল হিটলার’ বলে স্টাফ কারে (হরখ ৮৫৩) উঠে বসলেন এরউইন রোমেল, দু’পাশে দুই জেনারেল। মানফ্রেড ও লুসিয়া ছাড়া একমাত্র দীর্ঘদিনের একান্ত অনুগত সাথি আলডিনগার জানতেন রোমেল আর কখনো ফিরবেন না। এরউইন রোমেলের শেষ ছবিহ্যারমান আলডিনগার রোমেলকে বলেছিলেন, আরেকটা পথ আছে, চলুন আপনি আমি বন্দুক উঁচিয়ে এই গ্রাম থেকে বেরিয়ে যাই। কে আটকাবে আপনাকে? রোমেল রাজি হন নি। পরের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাওয়া যায় না। গ্রাম ছাড়িয়ে কোন নির্জন রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করানো হয়েছিল যেখানে হিটলারের পাঠানো সায়ানাইড ক্যাপসুল মুখে দিয়ে এরউইন রোমেল স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণ করেন। জেনারেলদের সঙ্গে গাড়িতে ওঠার পনেরো মিনিট বাদে রোমেলের ভিলায় ফোন বাজলে হ্যারমান আলডিনগার সেটি ধরলেন। নিকটবর্তী শহর উলমের ভাগনার ফিল্ড হাসপাতাল থেকে এক ডাক্তার একান্ত দুঃখ ও সমবেদনার সঙ্গে জানাচ্ছেন বার্লিন যাওয়ার পথে আকস্মিক ব্রেন হেমারেজের কারণে মারা গেছেন ফিল্ড মার্শাল ইওহানেস এরউইন অয়গেন রোমেল।এক মাস বাদে তাঁর তিপ্পান্ন বছর বয়েস পূর্ণ হতো। সেদিন শনিবার, সময় দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিট। * চার দিন বাদে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সহিত স্বস্তিকায় মোড়া কফিন উলমে সমাধিস্থ করা হল। জেনারাল ফন রুনডস্টেড পড়লেন হিটলারের মর্মস্পর্শী বিদায় বার্তা।একদিন মানফ্রেড রোমেল মানফ্রেড রোমেলঅন্য অনেকের মতন দেশে থাকতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উত্তর আফ্রিকা ফ্রন্টে এরউইন রোমেলের খ্যাতি এবং হিটলারের আদেশে তাঁর স্বেচ্ছা মৃত্যুর কাহিনী আমার জানা ছিল; প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে জার্মানি এসে আবিষ্কার করলাম আরেক রোমেলকে, মানফ্রেড রোমেল।যদিও কোন দেশ প্রতিযোগিতায় নামেনি, কিন্তু সাতের দশকে ইউরোপের সবচেয়ে বোরিং টিভির গোল্ড মেডাল প্রাপ্য ছিল জার্মান (এবং ডাচ) টেলিভিশনের। দুটি মাত্র ন্যাশনাল চ্যানেল, সন্ধ্যে ছটায় শুরু, সাতটায় পনেরো মিনিটের বিজ্ঞাপন, এগারোটায় স্ক্রিন অন্ধকার। সেখানে খবর, খবরের আলোচনা শুরু হয় রাত আটটায় প্রাইম টাইমে! হন্যে হয়ে নিজের মুখের ভাষাটি পালিশ, মেরামত করার জন্য সেগুলোই শুনি, খানিক বুঝতে পারলে ভীষণ খুশি হই। একদিন সেখানে হের নোভোতনির বনার রুনডেতে (রাজনৈতিক আলোচনা) দেখা দিলেন জার্মানির পঞ্চম বৃহৎ জনপদ স্টুটগার্ট শহরের মেয়র, মানফ্রেড রোমেল। একটা শিহরন জাগল -এই সেই মানুষ যিনি পনেরো বছর বয়েসে তাঁর পিতাকে সরাসরি মৃত্যু মুখে যেতে দেখেছেন, তাঁর বাবা বলেছেন পনেরো মিনিট বাদে জানবে আমি মৃত? সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী ব্রেন হেমারেজ। এক বছর বাদে ফরাসি কারাগারে বন্দি পুত্র মানফ্রেড রোমেল প্রথম সত্যি কথাটা দুনিয়াকে জানালেন। মহাগুরু নিপাতের দুর্ভাগ্য আমাদের অনেকেরই হয়েছে কিন্তু তা বলে এই ভাবে? এই বোঝা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটে? সব কথা বুঝতে পারলাম তা নয় তবে প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেলো। গড়পড়তা জার্মান রাজনীতিকদের বক্তিমে বা ইন্টারভিউ অসম্ভব ক্লান্তিকর, কিন্তু মানফ্রেড রোমেলের মুখে খেলা করে একটা চাপা কৌতুক। তিনি যে শুধু হাসিমুখে পলিটিকালি ইনকারেক্ট কথা বলেন তাই নয়, সেটি বলেন তাঁর অননুকরণীয় শোয়বিশ অ্যাকসেন্টে! গোয়েথে ইনসটিটিউটে জার্মান শিক্ষার ক্লাসে কানে হেডফোন লাগিয়ে দেশের নানান আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে পরিচয় করানো হতো আমাদের। মেসেজ ছিল - এগুলি চিনে রাখুন, অনুকরণ করবেন না! আমার গুরু মুজতবা আলী সায়েব বলেছেন চিড়িয়াখানায় বাঘ সিংহ দেখার পরে খাটাশটাকেও দেখে নেওয়া ভালো, কোন বাড়তি খরচা যখন নেই। এই পর্যায়ে সহজবোধ্য নয় কিন্তু শ্রুতিমধুর এবং আন্তরিক মনে হয়েছে বায়ারিশ (ব্যাভেরিয়ান) এবং শোয়েবিশ (শোয়েবিয়ান) উচ্চারণ, যা শোনা যায় যথাক্রমে মিউনিকে, স্টুটগার্টে, আমার কর্মক্ষেত্র ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ, ডুসেলডর্ফে নয়। লোকাল টান থাকলেও সকলে একটা স্ট্যান্ডার্ড জার্মান বলার চেষ্টা করে থাকেন, বিশেষ করে বিদেশির সঙ্গে। মানফ্রেড রোমেল পার্টি লাইন মাফিক হানোভার গোয়েটিঙ্গেনের হোখ ডয়েচ নয় গর্বের সঙ্গে জাতীয় স্তরে শোয়েবিশ বলেন। বুকের পাটা আছে বটে! খানিক খোঁজ খবর করে জানলাম পিতার মৃত্যুর পরে মানফ্রেড লুফতওয়াফের সহকারীর চাকরিতে ফিরে যান। কিন্তু কয়েক মাস বাদে, ১৯৪৫ সালের শুরুতে জার্মান বিমান বহরের অবস্থা সঙ্গিন, তাঁর কাজ গেল। ইতিমধ্যে ফরাসি বাহিনী স্টুটগার্ট পৌঁছেছে, মানফ্রেড তাঁদের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এরউইন রোমেল যে ব্রেন হেমারেজে মারা যাননি হিটলারের চাপে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই কাহিনীটি চাউর করেন তাঁর একটি সাক্ষ্যে। পরে লুসিয়া মারিয়া সেটি সমর্থন করে বিবৃতি দেন। ফরাসি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে, একটু দেরিতে, আঠারো বছর বয়েসে স্কুলের গণ্ডি পেরুলেন। টুইবিঙ্গেনে আইন পাশ করে বাদেন ভুরতেমবুরগ রাজ্যের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন, কালে অর্থ সচিব এবং পরে ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক দলের টিকিটে রাজনীতিতে প্রবেশ। বারো বছর তিনি সমস্ত জার্মান শহরের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৭৪ সালে স্টুটগার্টের মেয়র নির্বাচিত হন, পরপর তিনবার ক্রমশ বিপুল হতে বিপুলতর ভোটে সেই পদে পুনঃনির্বাচিত হয়েছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়া, সাইলেশিয়া হতে ছিন্নমূল জার্মানদের পুনর্বাসনে তাঁর ভূমিকা বিশাল, শুধু তাই নয়, পরবর্তীকালে তিনি একই ভাবে তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের আশ্রয় দেবার চেষ্টা করেছেন। স্পষ্ট বক্তা,জনপ্রিয় এবং জনদরদী মানফ্রেড রোমেলকে স্টুটগার্ট মনে রেখেছে অনেক কারণে।আমি যখন জার্মানি যাই, বাদের-মাইনহোফ গ্রুপ অথবা রোটে আরমে ফ্রাকতশিওন (রেড আর্মি ব্রিগেড) নামের একটি বামপন্থী জার্মান টেররিষ্ট দল সারা দেশে রীতিমত ত্রাসের সঞ্চার করেছে। মনে আছে ড্রেসনার ব্যাঙ্কে অফিসে ঢোকার সময়ে কি কঠোর খানা তল্লাসি হতো! স্টুটগার্ট-স্টামহাইম জেলে সেই দলের নেতারা দলবদ্ধ আত্মহত্যা করেন। এঁদের রীতি মাফিক সমাধিস্থ করার বিরুদ্ধে প্রবল নাগরিক প্রতিবাদ শোনা গেল- আশঙ্কা, সেটি কিছু মানুষের কাছে শহিদ বেদী হয়ে উঠতে পারে! সেই আপত্তি সত্ত্বেও (এমনকি নিজের দলেরও) মেয়র মানফ্রেড রোমেল তাঁদের যথাযথ অন্ত্যেষ্টি এবং সমাধির ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেছিলেন সমস্ত শত্রুতা কোন এক বিন্দুতে গিয়ে শেষ হয়, আমি মনে করি মৃত্যুই সেই বিন্দু। সেই একই স্পিরিটে যুদ্ধের শেষে পুরনো বিবাদ ভুলে গিয়ে মানফ্রেড রোমেল আজীবনের বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন যুদ্ধকালীন জার্মানির দুই প্রাক্তন শত্রুর সন্তানের সঙ্গে। ১৯৫৮ সালে আমেরিকান সপ্তম বাহিনীর কমান্ডার পদে স্টুটগার্টে এলেন ডাকসাইটে আমেরিকান জেনারেল জর্জ প্যাটনের ছেলে জর্জ স্মিথ প্যাটন। মানফ্রেড রোমেল তখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে উঠতি তারকা, নিজে গিয়ে আলাপ করেন প্যাটনের সঙ্গে, আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করেন দুজনেরই জন্মদিন ২৪শে ডিসেম্বর (মানফ্রেড পাঁচ বছরের বড়ো), কয়েক বছর একত্রে পালন করেছেন দিনটি! যুদ্ধোত্তর জার্মানিতে বিজয়ী দখলদারি আমেরিকান বাহিনীর সঙ্গে জার্মানির হৃদ্যতা বর্ধনে এই বন্ধুত্বের অবদান অপরিসীম। আরেক চমক অপেক্ষা করছিল। ১৯৭৯ সালে স্টুটগার্টের মেয়র মানফ্রেড রোমেল ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে লন্ডন গেছেন, এক রিসেপশনে তাঁর হোস্ট একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি সেকেন্ড ভাইকাউন্ট লর্ড মন্টগোমেরি অফ আলামেন। মানফ্রেড রোমেল তৎক্ষণাৎ বলেন, মি লর্ড, জানি কোনো মরুভূমিতে একদিন দুই ফিল্ড মার্শাল, আমার ও আপনার বাবার মধ্যে লড়াই হয়েছিল, আপনার বাবা জিতেছিলেন কিন্তু সেটা আমাদের বন্ধুত্বের পথে বাধা হতে পারে না! লর্ড মন্টগোমেরি হাত বাড়িয়ে বলেন, লর্ড নয়, আমি ডেভিড। পরে দুজনে জানলেন তাঁদের জন্মের বছর এক, ১৯২৮, ডেভিড চার মাসের বড়ো। এই দুজনের নিবিড় প্রীতির বন্ধন আমৃত্যু স্থায়ী হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জন্য দায়ী আসামি নাম্বার ওয়ান জার্মানিকে সভ্য সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে মানফ্রেড রোমেলের অবদান বিপুল। প্রসঙ্গত, কয়েক বছর আগে কাইরো থেকে আলেকজান্দ্রিয়া যাওয়ার পথে চোখে পড়েছে এল আলামেনের রোড সাইন, মনে হয়েছে এখানেই তো মরুভূমির শৃগাল মুখোমুখি হয়েছিলেন ফিল্ড মার্শাল মন্টগোমেরির সঙ্গে! সেই যুদ্ধ বিজয়ের সম্মানে তাঁকে লর্ড আলামেন উপাধি দেওয়া হয়। চার্চিল বলেছিলেন, এল আলামেনের আগে আমরা কোন যুদ্ধ জিতি নি, এল আলামেনের পরে কোন যুদ্ধ হারিনি। ব্রিটিশ সরকার রোমেলকে ও বি ই (অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার) সম্মানে বিভূষিত করেছেন, আমেরিকার মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি পেয়েছেন ডক্টরেট, জার্মান- আমেরিকান বন্ডিং পুরস্কার, আপন দেশে পেয়েছেন জার্মানির উচ্চতম সম্মান, বুন্দেসফেরদিনস্টঅরডেন। শেষদিন পর্যন্ত মানফ্রেড রোমেল যে পদকের জন্য বিশেষ গর্বিত ছিলেন সেটি হল শোয়েবিয়ান ডায়ালেক্টের প্রতি আজীবন সেবার সম্মানে প্রদত্ত ফ্রিডরিখ ফোগট মেডাল। জার্মান জনজীবনে কৌতুকের যে একান্ত অভাব এমন কথা তাঁদের বন্ধু এবং শত্রু সমস্বরে বলে থাকেন। তাঁরা হাসতে জানেন না, অথবা পারেন না; এ বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও জার্মান বৈঠক খানা, কফির আসরে, ট্রেনে বাসে, পার্লামেন্টের ভেতরে হাসির অভাব নিয়ে দ্বিমত দেখা যায় না। সম্ভবত মার্ক টোয়েন বলেছিলেন জার্মানরা হাসতে জানেন না সেটি অতিকথন মাত্র; প্রতি বছর কারনেভালের সময়, (ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে) তাঁরা প্রচুর পান আনন্দ উল্লাস অট্টহাস্য করেন এবং বাকি এগারো মাস এই উচ্ছ্বাস মুলতুবি রাখেন! বক্তাদের প্রতি এই বইটির ভূমিকায় মানফ্রেড রোমেল এই অভিযোগ মাথা পেতে মেনে নিয়েছেন। তিনি তাবৎ জার্মান বক্তিয়ার খিলজিকে উৎসাহিত করেছেন, আপনারা একটু হাস্যরস মিশিয়ে বলতে শিখুন, নীরস বক্তিমে না করে কৌতুককে তার সম্যক স্থান দিন। জ্ঞান অর্জন করার জন্য কোন জার্মান আপনাদের বক্তৃতা শুনতে আসে না, আপনি যা বলেন বা বলবেন তার সারাংশ তাঁরা অবগত আছেন। এছাড়া আপনারা তাই বলেন যা শ্রোতারা শুনতে চায়, তাতে না আছে কোন নতুনত্ব না আছে বাহাদুরি। আপনার বাগাড়ম্বরের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এই অনাগ্রহী মানুষদের জাগিয়ে রাখা। বেশির ভাগ সময়েই দেখা যায় মিনিট দশেকের পর শ্রোতা হাই তোলেন, কখনো হাত ঘড়ি ঝাঁকিয়ে দেখেন সেটা ঠিক চলছে কিনা, হলের আলোর সংখ্যা গুনতে আরম্ভ করেন অথবা ভুল জায়গায় হাততালি দিয়ে আশা করেন এবার বক্তা থামবেন। লক্ষ করবেন আপনারা যতো বকে যাচ্ছেন, শ্রোতারা তত ক্রুদ্ধ হতে থাকেন, এ ব্যাটা থামবে কতক্ষণে? তাঁদের অস্বস্তি, ক্রোধ নিরসনের দায়িত্ব আপনারই। মনে রাখুন বাইবেলে (সাম ১২৭:২) ঈশ্বর জানিয়েছেন, তিনি যাঁদের ভালবাসেন তাঁদেরই নিদ্রা উপহার দিয়ে থাকেন। মিনিটে মিনিটে শ্রোতার চেহারা -   মানফ্রেড রোমেলের আঁকা স্কেচতাহলে এঁদের জাগিয়ে রাখার উপায় কি?কৌতুক, হিউমর! এই বইতে তিনি কোন মহান জ্ঞান নয়, মাত্র কিছু টিপস দিতে চান যেগুলির জুতসই ব্যবহারে বক্তা শ্রোতাদের ঘুমিয়ে পড়া থেকে নিরস্ত করতে পারেন এবং দৈনন্দিন জীবনে তার সম্যক প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। মনে আছে ইংল্যান্ডে আসার কিছু পরে বায়ারিশে ফেরআইনসব্যাঙ্কের লন্ডন অফিসে এক রিসেপশনে মিউনিকের জনৈক ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ; তিনি বছর খানেক হল এ দেশে এসেছেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি এই যে এক বছর লন্ডনে কাটালেন, কোন জিনিসটা সবচেয়ে মনে রাখার মতন? ভেসনা গ্রাপিচ উত্তরে বলেছিলেন, এ দেশে লোকে কারণে বা অকারণে প্রচুর হাসেন! চার দশকে যে ইংলিশ হিউমরকে প্রায় পাওনা বলে ধরে নিয়েছি, টেকেন ফর গ্রান্টেড, জার্মান জনজীবনে তা সুলভ নয়। মানফ্রেড রোমেল সেটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে দ্বিধা বোধ করেননি। ইংল্যান্ডে টাং ইন চিক হিউমর কথাটা খুব চালু, তার বাংলা কি হতে পারে জানি না, তবে জার্মানিতে সেটি অমিল। প্রথমেই বলে রাখি, মানফ্রেড রোমেলের হাস্যরস কখনো অত্যন্ত শুষ্ক, কখনো ছুরির মত ধারালো। যে কোন পরিস্থিতিতেই অবহেলায় অফ দি কাফ মন্তব্য করেন, সে কৌতুক আপনার পছন্দ হোক বা নাই হোক; কোন পপুলারিটি পোলের ধার ধারেন না। মানফ্রেড একটু তোতলা ছিলেন, মাঝে মাঝে কথা জড়িয়ে যেতো, কিন্তু এই আপাত দুর্বলতাকে তিনি তাঁর ব্র্যান্ডে পরিণত করেন – ‘আমার নাম মানফ্রেড রোমেল, আমি তোতলা এবং কখনো ফিস ফিস করে কথা বলে থাকি’ এমন একটা প্রস্তাবনার পরে শ্রোতার প্রতিরোধ ভেঙ্গে যেতে বাধ্য! তাঁর অর্থ দফতরে সোমবারের মিটিং – একজন খুব ভয়ে ভয়ে জানালেন দু নম্বর ওয়ার্ডের ক্যাশিয়ারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানফ্রেড অবলীলাক্রমে বললেন, ভল্টের ভেতরটা একবার খুঁজে দেখেছেন? হয়তো সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিরালায় বসে মানফ্রেড রোমেল কোন রসিকতার সঙ্কলন লিখেছেন বলে জানা যায় না। তাঁর কৌতুকের ছটা বিকশিত হয়েছে, কোন না কোন প্রসঙ্গে; বিভিন্ন গল্প গুজবে, সাক্ষাৎকারে, বক্তৃতায়, ব্যক্তিগত আলাপচারিতে এই বইটির সম্পাদক সেগুলি একত্র করেছেন। ধরুন মদ্য পান করে স্টেজে নেমে অভিনেতা প্রম্পটারকে জিজ্ঞেস করছেন, এটা কোন নাটক? প্রসঙ্গ - এমন অনেক সরকারি বক্তা আছেন যারা বিষয় বস্তুকে সম্পূর্ণ ভুলে মেরে দিয়ে স্টেজে বাকতাল্লা করেন। আমলাদের বুদ্ধিমত্তা? ধরুন নির্মীয়মাণ বাড়ির ভারা খোলা মাত্র গোটা স্ট্রাকচার হুড়মুড় করে পড়ে গেল। অবিচলিত আর্কিটেক্ট বললেন, বাড়ির ভেতরে যখন দেওয়াল রং হবে তখনই ভারা খোলা উচিত ছিল। কিংবা গৃহকর্তা বাড়ির কাজ দেখতে এসে বললেন, একি উলটো পালটা কাজ হচ্ছে? এঞ্জিনিয়ার বললেন, আমাদের সাইট প্ল্যানটা বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল সার। মানফ্রেড রোমেলের শোয়েবিশ অ্যাকসেন্ট এবং অননুকরণীয় বাকভঙ্গিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ কম্ম নয়। একদিন কোন সুযোগ্য জার্মান বেত্তা লেখক বাঙালির আসরে সমাদরে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করবেন, এ আশা রাখি। আপাতত আমার টুটা ফুটা জার্মান জ্ঞানের সম্বলে অনুদিত কিছু মণি মুক্তা পাঠকের কাছে পেশ করার লোভ সম্বরণ করা গেল না। এক। হাইডেলবের্গ।নেকার নদীর তীরে বিকেল বেলা একজন বয়স্ক মানুষ পায়চারি করছেন। এক ডুবন্ত মানুষের আর্তনাদ। - বাঁচান, ডুবে যাচ্ছি। নদীর ধারে দাঁড়ানো ভদ্রলোক জানতে চাইলেন: - আপনার নাম কি?- ক্রাউটলে। বাঁচান। - কোথায় থাকেন?- বাদে স্ত্রাসে। একটু হাত বাড়াবেন? - বাদে স্ত্রাসে কতো নম্বর?- চার।- ধন্যবাদ। অনেক দিন ঐ পাড়ায় ফ্ল্যাট ভাড়া খুঁজছি।দুই। নেকার নদীর তীর তীব্র আর্তনাদ শোনা গেল ‘জলে পড়ে গেছি, সাঁতার জানি না’তীর থেকে উত্তর - সাঁতার আমিও জানি না। কিন্তু তাই বলে আপনার মতন লোক ডেকে সেটা জানাই না। তিন। রাজধানী বন। ট্রেন স্টেশন।ব্যস্ত সমস্ত উপ মন্ত্রী ট্যাক্সিতে উঠেছেন - কোথায় যাবেন?- যেখানে হোক। সকলেই তো আমাকে চায়। চার। সুইমিং ক্লাবের ডিনার প্রেসিডেন্টের ভাষণ - সব শেষে বলি, যদিও এ বছর কোন প্রতিযোগিতায় আমাদের কেউ কোন মেডাল পায়নি, চ্যাম্পিয়নও কেউ হয় নি কিন্তু আনন্দের কথা এই যে কেউ জলে ডুবেও যায়নি। পাঁচ। হান্টিং ক্লাব দুই বিষণ্ণ শিকারি ফিরেছেন। মুখ গম্ভীর। একজনের স্ত্রী বললেন, এতো মন খারাপের কি আছে, তোমার রুকস্যাক বেশ ভারি দেখছি। উত্তর – চুপ, ওটা আমার কুকুর।ছয়। ডাক্তারখানা - আপনি আমার বউকে বলেছিলেন এই ওষুধটা খেলে সেরে যাবে। সে মারা গেছে গতকাল। - কতদিন যাবত তিনি এই ওষুধটা খাচ্ছিলেন?- পনেরো দিন। - আমি যে বলেছিলাম এক মাস ধরে খেতে?সাত। ইন্টারভিউ - নাম? - আলফ্রেড ফায়ারআবেনড (ফায়ারআবেনড - আক্ষরিক অর্থে দিনের ছুটি, কাজ শেষ)- কাজে রাখতে পারবো না। কেউ ফোন করলেই আপনি বলবেন ফায়ারআবেনড। লোকে ভাববে অফিস ছুটি হয়ে গেছে। পুনশ্চ: অন্য অনেক দেশের মতন জার্মানিতেও টেলিফোন এটিকেট হলো ফোন তুলেই আপন পদবী ঘোষণা করা। আমার ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রবাসের কালে হারডি-স্লোমান ব্যাঙ্কে সত্যি একজন ছিলেন যার পদবী ফায়ারআবেনড! আট। ভবিষ্যৎ - আপনি আমায় ভালো চেনেন, বলুন তো আমার কী হওয়া উচিত, কবি না শিল্পী?- কবি। - কেন আপনি কি আমার কবিতা পড়েছেন?- না, আমি আপনার আঁকা ছবি দেখেছি নয়। স্তালিন -এটা কি সত্যি স্তালিন তাঁকে নিয়ে কথিত সব জোক জমিয়ে রাখতেন?-হ্যাঁ, তার সঙ্গে ঐ জোক যারা ছড়াতেন তাদেরও। দশ। পোস্ট অফিস - আপনার ভাই কি করে?- পোস্ট অফিসে সারাদিন খামের ওপরে স্ট্যাম্প মারে। - খুব একঘেয়ে কাজ নয়?- কেন, রোজই তো তারিখ বদলে যায়। এগারো। গ্রিনজিং, ভিয়েনা ইওহান স্ট্রাউসের ওয়ালতসের আসর বসেছে,একের পর এক বাজে ব্লু ডানিউব, গেশিখটে আউস ভিনার ভালড, কাইজার ওয়ালতস। সামনে সারিতে স্বয়ং স্ট্রাউস বসে শুনছেন। অভিভূত স্ট্রাউস প্রোগ্রাম শেষে কন্ডাক্টরকে ধন্যবাদ জানাতে নিজে গেলেন ব্যাক স্টেজে। কন্ডাক্টর হের স্ট্রাউস, আপনি তো ওয়ালতসের নোট লিখেই খালাস। সেটা বাজানো যে কি শক্ত কাজ যদি জানতেন। বারো। অর্থনীতি - মিনিস্টার, ডলার ডুবে যাচ্ছে - ডুবুক, মানুষ বাঁচলেই হল। তেরো। পশ্চিম বার্লিন, দুই জার্মানির পুনর্মিলনের পরে আলদির (সস্তার সুপার স্টোর) সামনে বিরাট লম্বা লাইন। উত্তেজিত পূর্ব বার্লিনার - এ যে দেখি কমিউনিস্ট জার্মানির র‍্যাশনের দোকানের মতন লাইন পড়েছে পেছন থেকে পশ্চিম বার্লিনার - এখানে আপনাকে কেউ দাঁড়াতে বলেনি। চৌদ্দ। দোকানের সামনে দুজনে কথা হচ্ছে - আমি তিন মাস অন্তর তেল বদলাই। - কোন গাড়ি চালান যে তিন মাসে একবার তেল বদলাতে হয়?- আলু ভাজার দোকান চালাই। (পমেস ফ্রিতেস / ফরাসি ফ্রিতেরি) পনেরো। ট্রেন মহিলা - ট্রেনটা কি ছেড়ে দিয়েছে? টিকিট কলেকটর - আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি কি ভাবছেন দু’পাশের বাড়িগুলি টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?ষোলো। ট্রেন হন্ত দন্ত ধাবিত যাত্রী - উলমের ট্রেনটা কি ধরতে পারি?- যদি দৌড় লাগান; পাঁচ মিনিট আগে সেটা ছেড়ে গেছে। সতেরো। ট্রেন - ফরতসহাইম যাবার পরের ট্রেন কখন?- পাঁচ মিনিট বাদে ইন্টার সিটি, পনেরো মিনিট বাদে এক্সপ্রেস, আধ ঘণ্টা বাদে ধীরগতি প্যাসেঞ্জার ট্রেন। শেষেরটাই ধরে নিন। - কেন?- কারণ একমাত্র সেটা এখানে থামে। আঠারো। পথে মদ্যপ মাতাল হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছেন - আহা, হাড় ভাঙেনি তো?- না, সেটা ভাঙবে পরের আছাড়ে। উনিশ। মদ্যপ অভিনেতা মঞ্চে নেমে অভিনেতা কথা খুঁজে পাচ্ছেন না, পাশ থেকে প্রম্পটার খেই ধরানোর দুর্বার চেষ্টা করে চলেছেন। অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে অভিনেতা বললেন, কানের কাছে ডায়ালগ শোনালেই হবে? এটা কোন নাটক সেটা বলবেন তো? কুড়ি। নাটক শেষে হ্যামলেট নাটকের অসম্ভব বাজে অভিনয় দেখে দর্শক ক্ষিপ্ত, হাতের কাছে যা পাচ্ছেন তাই ছুঁড়ছেন মঞ্চের দিকে। হ্যামলেট চরিত্রাভিনেতা – জানি এ নাটকে খুন খারাবির শেষ নেই, নয় জন মরলেন। এতে আমার কি দোষ কী বলুন তো? এই বাজে গপ্প কি আমি লিখেছি? একুশ। চুল কাটার সেলুনে হান্স - পোপের দর্শন পেতে রোমে যাবো।নাপিত - কেন অনর্থক পয়সা নষ্ট করবেন? আমি হলে কখনো যেতাম না। পোপ এতোটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন যে তাঁকে প্রায় দেখাই যায় না।তবু হান্স গিয়েছে রোমে। নাপিত - পোপকে দেখতে পেলেন? অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকে না? ঠিক বলেছিলাম না?হান্স - মোটেও না। আমি পোপের একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। নাপিত - তা তিনি কী বললেন?হান্স - তিনি আমার মাথায় হাত দিলেন; বললেন ঈশ্বরের করুণা বর্ষিত হোক তোমার ওপরে, কিন্তু বলো দেখি এতো খারাপ চুল কাটাতে কার কাছে যাও? বাইশ। চুল কাটার সেলুনে কমিউনিস্ট পোল্যান্ড, আটের দশক। প্রেসিডেন্ট ইয়ারুইয়েলস্কির কঠোর রেজিমের বিরদ্ধে অগ্নিগর্ভ পোল্যান্ডের পথে ঘাটে তুমুল বিক্ষোভ। পরিস্থিতির বিবরণ সাক্ষাতে জানানোর জন্য প্রত্যেক মাসে রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের ডাক পড়ে মস্কোতে। এই সুযোগে তিনি আরবাত পাড়ার একটি সেলুনে যান চুল কাটাতে। নাপিত দিমিত্রি জানতে চায় পোল্যান্ডে কী ঘটছে। মানুষজন যে সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়ছেন সে খবর দিলেন রাষ্ট্রদূত। নাপিত বললে আমরা ভাবতেও পারি না কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে এমন লড়াই সম্ভব হতে পারে, মাথার চুল দাঁড়িয়ে যায়। পরের মাসে রাষ্ট্রদূত আবার এসেছেন চুল কাটাতে। নাপিত আবার বলে, পোল্যান্ডের খবর বলুন, সবাই শুনুক। রাষ্ট্রদূত বললেন নতুন কিছু নয়, ঐ একই রকম। নাপিত বললে, আপনি একটু উঁচু গলায় বলুন না, সবাই শুনুক, চুল কাটতে আমার সুবিধে হবে। তেইশ। চুল কাটার সেলুনে রালফ দাড়ি কামাবেন। নাপিত - আপনি আগে কি কখনো আমার দোকানে দাড়ি কামিয়েছেন?রালফ - না, তবে আমার গালের যে কাটা দাগটা দেখেছেন সেটা গত যুদ্ধের। চব্বিশ। অটোবান মদ্যপান করে লোথার গাড়ি চালাচ্ছে উলটো মুখে। গাড়ির রেডিওতে শোনা গেল – সাবধান স্টুটগার্ট- কিরখহাইম অটোবানে একজন উলটো মুখে গাড়ি চালাচ্ছেন। লোথার – একজন? অগুনতি ড্রাইভার!পঁচিশ। লেভেল ক্রসিং গেট নামানো। এক বাইক আরোহী লাইন পার হতে যাচ্ছে। প্রহরী - একটু অপেক্ষা করুন, ট্রেনটা পার হয়ে যাক।বাইক আরোহী - আমার কিছু হলে আপনার কী?প্রহরী - আমাকে হাত নোংরা করতে হবে যে। ছাব্বিশ। বক্তা ও বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তা বিড় বিড় করছেন, কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। সামনের সারি থেকে - কী এত ভাবছেন? যে টুকু জানেন, তাই বলে ফেলুন, এক মিনিটের বেশি লাগবে না।বক্তা - না, বরং আপনি ও আমি দুজনে যা জানি সেটাই বলি, তাতে তিরিশ সেকেন্ডও লাগবে না। সাতাশ। বক্তা ও বক্তৃতা অত্যন্ত নিচু কণ্ঠে বক্তা বলে চলেছেন। পেছনের সারি থেকে একজন একটু জোরে বলুন, কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। সামনের সারি থেকে একজন - আমি তো সব কথাই বুঝতে পারছি। তবে যদি চান আপনার সঙ্গে সিট বদল করে নিতে আমার কোন আপত্তি নেই। সবশেষে গ্র্যান্ড কাউন্সিল, বার্ন, সুইজারল্যান্ড - আমি এই বলে শেষ করতে চাই যে আমার আরও অনেক কিছু বলার ছিল। তবে যদি জানতাম সেটা কী! *সূত্র স্টুটগার্টের ফরাসি মিত্রশক্তির কাছে মানফ্রেড রোমেলের সাক্ষ্য, ২৭শে এপ্রিল ১৯৪৫ Manfred Rommels gesammelte Witze Zusammengestellt und herausgegeben von Ulrich Frank-PlanitzEngelhorn Bücherei Stuttgart 1999পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৮ শব্দ সংখ্যা ১৩,০০০ পুনশ্চ আর দুটো কথা এরউইন রোমেলের মৃত্যুতে চার জন জেনারেলের ভূমিকা জেনারেল হান্স স্পাইডেল (১৮৯৭-১৯৮৪) - রোমেলের চিফ অফ স্টাফ, বিশে জুলাই হিটলার হত্যা প্লটের চক্রী, ধরা পরার পরে জবাবদিহিতে তিনি রোমেলের নাম জড়ান। নিজে গেস্টাপোর হাত থেকে পালাতে সক্ষম হন, পরে পশ্চিম জার্মান সেনা বাহিনীতে বিশাল পদ প্রাপ্তি। জেনারেল স্টুলপনাগেল (১৮৮৬- ১৯৪৪) - বিশে জুলাইয়ের প্ল্যানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত; এক জবানবন্দিতে তথ্য প্রমাণ ছাড়াই রোমেলের নাম উল্লেখ করেন। ফাঁসিতে চড়েন। জেনারেল মাইজেল (১৮৯৬-১৯৭৮) - যুদ্ধের পরে আমেরিকানদের হাতে ধরা পড়েন। কট্টর নাৎসি সহযোগী হওয়ার অপরাধে মাত্র দু বছরের সাজা হয়। তিনি স্বীকার করেন হিটলারের প্লট জানতেন, কিন্তু নিজের হাতে রোমেলকে সায়ানাইড দেননি। নির্জন জায়গায় গাড়ি থামিয়ে বুর্গডরফ তাঁকে ও ড্রাইভারকে নেমে যেতে বলেন, পাঁচ মিনিট বাদে এসে তিনি দেখেন রোমেল মৃত। জেনারেল বুর্গডরফ (১৮৯৫-১৯৪৫) - মাইজেলের বিবৃতিকে যিনি চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন সেই জেনারাল বুর্গডরফ বার্লিনের আত্মসমর্পণের দিন(২ মে ১৯৪৫) হিটলার বাঙ্কারে আত্মহত্যা করেন।  
  • হরিদাস পালেরা...
    পরিকাঠামো এগিয়েছে, সমাজ এখনও পিছিয়ে (NFHS-6: পশ্চিমবঙ্গের রিপোর্ট কার্ড) - যদুবাবু | স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক NFHS-6, অর্থাৎ, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের ফ্যাক্ট-শীট প্রকাশ করেছেন বেশ কিছুদিন আগে। এই বছরের সার্ভেতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বদল হয়েছে। মোট ইন্ডিকেটরের সংখ্যাই কমেছে, NFHS-5-এর ১৩১টি থেকে NFHS-6-এ দাঁড়িয়েছে ১০১টিতে। বেশ কিছু ইণ্ডিকেটর (সূচক) বাদ পড়েছে, যেমন অ্যানিমিয়া সংক্রান্ত তথ্য, যা ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ও শিশুদের মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সার্ভেতে এবারই প্রথম অ্যানিমিয়া সংক্রান্ত গোটা সেকশনটাই বাদ পড়ল। সরকারি সূত্রে প্রকাশ, মেথডোলজি অর্থাৎ পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে ঐ তথ্যটি প্রকাশ করার কিছু সমস্যা আছে। আগের পর্বগুলোয় ক্যাপিলারি অর্থাৎ আঙুলের ডগা থেকে রক্ত নিয়ে হিমোগ্লোবিন মাপা হতো, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল নির্ভুলতার দিক থেকে। সরকারের বক্তব্য, ভবিষ্যতে ভিনাস ব্লাড স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে ICMR-এর Diet and Biomarkers Survey-র (এখন যার নাম SAMPADA = Survey for Assessment of Markers of Population Health, Activity, Diet and Anthropometry) মাধ্যমে অ্যানিমিয়ার তথ্য প্রকাশিত হবে, যা অনেক বেশি নির্ভুল বলে গণ্য করা হয়।অ্যানিমিয়া একাই নয়। শিশুমৃত্যুর হার (IMR, NMR ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার), ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং HIV সংক্রান্ত সচেতনতার সূচকও NFHS-6-এর ফ্যাক্টশিট থেকে বাদ পড়েছে। উজ্জ্বলা যোজনার অধীনে পরিষ্কার রান্নার গ্যাসের ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্যও এবার অনুপস্থিত, এইটি এর আগে NFHS-5-এ প্রকল্পের দাবি ও বাস্তব পরিস্থিতির ফারাক প্রকাশ্যে এনেছিল। সরকারি ব্যাখ্যা, এই সূচকগুলো এখন অন্য নির্দিষ্ট সার্ভে বা প্রশাসনিক ডেটাবেসের মাধ্যমে নজরে রাখা হচ্ছে, যেমন শিশুমৃত্যুর হারের জন্য Sample Registration System। সমালোচকদের একটি অংশের বক্তব্য, SRS জাতীয় ও রাজ্যস্তরের হিসাব দিলেও, NFHS যেভাবে জেলাস্তরে এবং সামাজিক-আর্থিক বিভাজনে তথ্য দিত, তা এখন অধরা থেকে যাচ্ছে। সরকারি সূত্র অবশ্য এই ব্যাখ্যাও দিয়েছে যে নতুন কিছু সূচকও এই পর্বে যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে আছে জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক গঠন, প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের ব্যবহার, টিকাকরণের হার এবং ডায়ারিয়ার তীব্রতা সংক্রান্ত তথ্য। এই বাদ পড়াগুলোকে দুটো আলাদা ভাবে দেখা যায়। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি তথ্যের মান (ডেটা কোয়ালিটি) বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া (প্রতিটি সূচককে তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসে সরিয়ে দেওয়া), এবং ফ্যাক্টশিট তথ্য প্রকাশের প্রথম স্তর মাত্র, পূর্ণ জাতীয় রিপোর্ট পরে প্রকাশিত হবে। অন্য একটি ব্যাখ্যায়, কিছু সাংবাদিক ও বিশ্লেষক এই বাদ পড়াগুলোকে একটি পুরনো প্যাটার্নের অংশ বলে মনে করছেন, বিশেষত যেহেতু ঠিক যে দুটি বিষয়ে (অ্যানিমিয়া ও উজ্জ্বলা) আগের সরকারের দাবির সাথে NFHS-5-এর তথ্যের অসঙ্গতি প্রকাশ্যে এসেছিল, সেগুলোই এবার অনুপস্থিত। এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি একটি বিতর্কিত অবস্থান, প্রমাণিত সত্য নয়, কিন্তু আলোচনায় উল্লেখযোগ্য। সত্যি যাই হোক, ফলাফল একই: বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যে সূচক নিয়ে এই মূহুর্তে হাতে কোনো সাম্প্রতিক তথ্য নেই।এই প্রসঙ্গে একটু পুরনো ইতিহাসও মনে করাও জরুরি। The Federal-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সার্ভে পরিচালনাকারী সংস্থা IIPS-এর ডিরেক্টর কে এস জেমসকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি অ্যানিমিয়ার তথ্য "রিভাইজ" করার জন্য চাপের সামনে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিলেন বলে অভিযোগ; এই ঘটনার এক মাস পরেই ওঁকে সরানো হয়। (এই নিয়ে গুরুতেই সেই সময় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, “হয়েছে ব্যথা, কেটে ফ্যালো মাথা”!)আপাতত, এই সার্ভের অনেকগুলি সূচক থেকে বাছাই করে শুধু স্বাস্থ্য, এবং নারী এবং শিশুকল্যাণের কয়েকটি সূচকের জন্য পশ্চিমবঙ্গ আর গোটা দেশের সার্বিক গড়ের তুলনা করবো। একশো-একটা ইন্ডিকেটর থেকে বেছে গোটা দশেক বের করা কঠিন কাজ, এবং কিছু একদেশদর্শিতা থেকেই যাবে। তার আগে খুব ছোট্ট করে বলতে গেলে, রাজ্য জনকল্যাণমূলক পরিকাঠামো গড়ে তোলায় যতটা দক্ষ হয়ে উঠেছে, সামাজিক পরিবর্তনে ততটাই ধীরে এগিয়েছে। একদিকে যেমন স্বাস্থ্যবিমা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অ্যান্টিনেটাল কেয়ার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, অন্যদিকে চাইল্ড ম্যারেজ, মহিলাদের শিক্ষার নিম্ন হার এবং এনসিডির বর্ধনশীল বোঝা একই গতিতে এগোয়নি। দুটো ধারা পাশাপাশি রাখলে যা বোঝা যায়, তা হলো: কল্যাণ প্রকল্প পৌঁছে দেওয়ার কাঠামো যত দ্রুত তৈরি হয়েছে, সামাজিক পরিবর্তন (অথবা প্রগতি) তার সাথে তাল রাখতে পারেনি।কোথায় এগিয়ে?প্রথমত, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও সার্ভিসের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ ধারাবাহিকভাবে জাতীয় গড়ের চেয়ে এগিয়ে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যবধান অনেক বেশি। প্রায় সর্বজনীন অ্যান্টিনেটাল কেয়ার, ইন্সটিটিউশনাল ডেলিভারির হার-ও বেশি। স্বাস্থ্যবিমার কভারেজ জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৩০ পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ, বিগত দশকে রাজ্য সরকার পাবলিক হেলথ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিমার কভারেজের হার আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার মতো। ৮৮.২ শতাংশ পরিবার কভারেজের তুলনায় জাতীয় হার ৬০.২ শতাংশ। পুরো এন-এফ-এইচ-এস সার্ভে দেখলে এইটি পশ্চিমবঙ্গ ও গোটা দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানগুলোর একটি, এবং সম্ভবত এর অন্যতম কারণ রাজ্যের নিজস্ব স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প। নতুন সরকারের আমলে এই কভারেজের মাত্রা বজায় রাখে কি না, সেটি পরের NFHS পর্বেই স্পষ্ট হবে। এই একটি সংখ্যার উপর রাজ্যের আপেক্ষিক সুবিধা কতটা নির্ভরশীল, তা মাথায় রেখে বিষয়টি নজরে রাখা জরুরি।শিশুদের ক্ষেত্রেও কাগজে-কলমে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে স্টানটিং কমে হয়েছে ২২.৪ শতাংশ, যা জাতীয় ২৯.৩ শতাংশের চেয়ে যথেষ্ট কম, এবং রাজ্যের নিজের NFHS-5-এর ৩৩.৮ শতাংশ থেকেও বড় উন্নতি। আন্ডারওয়েটের হারেও একই রকম, যদিও কিছুটা কম, উন্নতি দেখা যায়। কিন্তু ওয়েস্টিং-এর হার খুব বেশি বদলায়নি। মনে রাখা উচিত, ওয়েস্টিং শিশু পুষ্টির তিনটি সূচকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাদ্য-সংবেদনশীল, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ ক্রনিক নয়, বরং অ্যাকিউট অর্থাত তীক্ষ্ণ অভাবের প্রতিফলন। NFHS-5-এ পশ্চিমবঙ্গের ওয়েস্টিং হার ছিল ২০.৩ শতাংশ, NFHS-6-এও ঠিক ২০.৩ শতাংশ, দশমিকের ঘর পর্যন্ত অপরিবর্তিত, ওদিকে স্টানটিং ও আন্ডারওয়েট দুটোই উন্নতি দেখিয়েছে। এটা কেন সেটা ভাববার বিষয়। গার্হস্থ্য হিংসার দিকে তাকালে, রাজ্যের অবস্থা বাকি দেশের থেকে সামান্যই ভালো। ১৮-৪৯ বছর বয়সসীমায় এভার-ম্যারেড মহিলাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ১৯% মহিলা গার্হস্থ্য হিংসার (স্পাউজাল ভায়োলেন্স) অভিজ্ঞতা আছে, দেশের সার্বিক গড় এখানে ২২.৩%। NFHS-5-এর তুলনায় একটু হলেও উন্নতি, কারণ রাজ্যের হার তখন ছিল ২৬.৯%, জাতীয় গড় ২৯.২%। তবে "সামান্য ভালো" বলার আরেকটি কারণ আছে: গার্হস্থ্য হিংসার ক্ষেত্রে আন্ডার-রিপোর্টিং একটি সুপরিচিত সমস্যা (শুধুমাত্র যাঁরা রিপোর্ট করেছেন তাঁদের তথ্য পাওয়া যায়), তাই বাস্তব ছবিটা সম্ভবত এই সংখ্যার চেয়ে কিছুটা খারাপ হতে পারে রাজ্যে এবং দেশে দুটোতেই। নারী ক্ষমতায়নের অন্য একটি সূচক কতজন মহিলার নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে। রাজ্যের ক্ষেত্রে NFHS-5 থেকে NFHS-6-এর মধ্যে এইটি ৭৬.৫% থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৫.৩%। এটা বেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, বলতে বাধা নেই। গোটা দেশের সার্বিক গড়ের-ও এই এক-ই সময়ে উন্নতি হয়েছে, ৭৮.৬% থেকে ৮৯%। সহজ পাটিগণিত বলে দেবে, এই সূচকে বৃদ্ধির হার রাজ্যে অনেকগুণ বেশি। কোথায় পিছিয়ে?কিন্তু এই কয়েকটি আপাত উন্নতির বাইরে তাকালে বোঝা যায় কোথায় রাজ্য পিছিয়ে - সমাজ কোথায় তাল মেলাতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহ (চাইল্ড ম্যারেজের) হার ৩৬.৪ শতাংশ, সার্ভের তথ্য অনুযায়ী ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে এই অংশের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে, যা জাতীয় হার ২০.১ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। লক্ষণীয়, NFHS-4 (২০১৫-১৬) থেকে NFHS-5 পর্যন্ত এই হার একই জায়গায় থমকে ছিল, ৪১.৬ শতাংশ; সাম্প্রতিক সার্ভেতে একটু উন্নতি হয়েছে, প্রায় ৫% কমে বাল্যবিবাহের হার ৩৬.৪ শতাংশে নেমেছে। বাল্যবিবাহের সরাসরি পরিণতি টিনেজ প্রেগন্যান্সি: পশ্চিমবঙ্গের ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মহিলাদের ১৬.৬ শতাংশ সমীক্ষার সময় ইতিমধ্যে মা হয়েছেন বা গর্ভবতী ছিলেন, যেখানে জাতীয় হার ৬.৭ শতাংশ। এই সংখ্যাটিও বিগত দশকের, NFHS-4, NFHS-5, ও NFHS-6 তিনটি সার্ভের সময়কালে কার্যত অপরিবর্তিত, NFHS-4-এ ১৮.৩ শতাংশ থেকে নেমে এখন ১৬.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, রাজ্যে বাল্যবিবাহের হার সামান্য কমলেও টিনেজ প্রেগন্যান্সি সমান হারে কমেনি। লেখার শেষে সারণীতে তিনটে সার্ভের জন্যই, এই দুটো সূচকের মান দিলাম। সেটা দেখলে ট্রেণ্ডটা একটু স্পষ্ট হতে পারে। মহিলাদের শিক্ষার হারও একই গল্প, একটু অন্যভাবে। পশ্চিমবঙ্গ নিজেকে শিক্ষায় অগ্রণী রাজ্য বলে মনে করলেও, মাত্র ৪০.০ শতাংশ মহিলা ১০ বা তার বেশি বছর শিক্ষাগ্রহণ সম্পূর্ণ করেছেন, যেখানে জাতীয় হার ৪৬.৪ শতাংশ। মহিলাদের ইন্টারনেট ব্যবহারও জাতীয় গড়ের চেয়ে কম, ৫৯.৩ শতাংশ বনাম ৬৪.৩ শতাংশ, যদিও NFHS-5-এর তুলনায় দুটো সূচকেই যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। স্কুলে কখনও না যাওয়া মহিলাদের অনুপাতে (২১.৮%) পশ্চিমবঙ্গ বরং জাতীয় গড়ের (২৬.৩%) চেয়ে ভালো অবস্থানে, যদিও কেরালার (৩.৪%) ধারেকাছেও নেই।এই সূচকগুলোর কোনোটাই চটজলদি বদলানো শক্ত, সমাজকল্যাণ প্রকল্পের কিছু সদর্থক প্রভাব থাকে না তা নয়, তবুও অন্যান্য বাধাবিপত্তি অথবা বিপর্যয় থাকে। কোভিড-১৯-এর পরবর্তী স্কুলছুটের ব্যাপক হার বা লার্নিং গ্যাপ এক্ষেত্রে কতটা দরকারি সেটাও ভাববার বিষয়। এই যেমন নিচের ছবিতে সবকটি রাজ্যের জন্য এই দুটো একসাথে প্লট করেছি। এর থেকে একটা হাল্কা ট্রেণ্ড দেখা যাচ্ছে, যে চাইল্ড ম্যারেজ আর স্কুলছুটের হারের আন্তঃসম্পর্ক আছে (r = 0.51), একটা বাড়লে আরেকটাও বাড়বে। লক্ষণীয়, যে এই প্লটেও পশ্চিমবঙ্গ আর ত্রিপুরা, লাইনের বেশ কিছুটা উপরে, দুটো রাজ্যই কিছুটা 'আউটলায়ার'। এ-ও ভাববার ব্যাপার। চাইল্ড ম্যারেজের নেপথ্যে অজস্র আর্থসামাজিক কারণ থাকে, যেমন দারিদ্র্য, পণপ্রথার চাপ, এবং কিশোরী মেয়েদের জন্য নিরাপদ বিকল্পের অভাবের ধারণা। এমন পরিস্থিতি বছরের পর বছর ধরে সুসংহত সামাজিক বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই বদলানো সম্ভব এমন আশা করা অন্যায় নয়, যদি না সেইসব প্রকল্প বহু প্রান্তিক মানুষকে নথিপত্রের অভাব বা অন্য কারণে বাদ দিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের ৯৫ শতাংশ মহিলার কাছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেও, এক-তৃতীয়াংশের বেশি ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়, এই দ্বন্দ্বই হয়তো আগামী দিনের অন্যতম দরকারি প্রশ্ন হবে।তবে, সমস্যার শেষ এইখানেই নয়। বোঝার উপর শাকের আঁটির মত এই অসম্পূর্ণ পরিবর্তনের উপর চেপে বসেছে এন-সি-ডি অর্থাৎ নন-কমিউনিকেবল ডিজ়িজ়ের সমস্যা, যা ইতিমধ্যে বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের মধ্যে হাই ব্লাড শুগারের হার বেশি (রাজ্যের ২২.৭ শতাংশ বনাম দেশের ১৭.৮ শতাংশ), হাইপারটেনশনও বেশি (২৪.৩ শতাংশ বনাম ১৯.৪ শতাংশ), এবং ওভারওয়েট বা ওবেসিটির হারও জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি (৩৪.৬ শতাংশ বনাম ৩০.৭ শতাংশ)। এই শতাংশগুলো দুশ্চিন্তার ব্যাপার, কারণ, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লে, ওজন বাড়লে, ডায়াবিটিস, কিডনির অসুখ, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ় ইত্যাদিও অবশ্যম্ভাবী।একই সঙ্গে, ঠিক এর উল্টো দিকে, স্বাভাবিকের নিচে BMI-যুক্ত পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের অংশ ১৫.১ শতাংশ, জাতীয় ১৯.৭ শতাংশের চেয়ে সামান্য কম। এই দুটো তথ্য একসাথে রাখলে যে প্যাটার্নটি স্পষ্ট হয়, তাকে পাবলিক হেলথ গবেষকরা বলেন অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা: এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা অপুষ্টি (ম্যালনিউট্রিশন) থেকে অতিপুষ্টির (ওভারনিউট্রিশন) দিকে সরে যাচ্ছে, প্রথম সমস্যাটি সম্পূর্ণভাবে সমাধান না করেই। এই ‘সরে যাওয়ার হার’ দেখলে পশ্চিমবঙ্গ দেশের সার্বিক গড়ের চেয়ে এগিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। এর কারণ হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, নগরায়ন, এবং রাজ্যের ভাত-নির্ভর খাদ্য-ভিত্তিক কল্যাণ প্রকল্পগুলোর রাজনৈতিক অর্থনীতি (মিড-ডে-মিল থেকে মা ক্যান্টিন)। মিড-ডে মিলের নতুন মেন্যু নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই অপুষ্টি-অতিপুষ্টির ব্যাপারটাও হয়তো আলাদা পর্যালোচনার দাবি রাখে।এনসিডির এই প্রবণতার পাশাপাশি আরও একটি সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ১১.২ শতাংশ, যা জাতীয় ৮.৪ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। এর পাশাপাশি পুরুষদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি, ৪৬.২ শতাংশ, জাতীয় ৩৬.৩ শতাংশের তুলনায়। এনসিডির রিস্ক বা ঝুঁকি যেখানে নারী ও পুরুষ দুই ক্ষেত্রেই বাড়ছে, তামাক ব্যবহারের ধরণ কিছুটা বুঝতে সাহায্য করে সেই ঝুঁকি কার কতটা।লেখার শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই পর্বের তথ্যের কিছু বড় ফাঁক রয়ে গেছে, যার অন্যতম অ্যানিমিয়ার অনুপস্থিতি। প্রজননক্ষম বয়সের মহিলাদের মধ্যে অ্যানিমিয়া ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী পাবলিক হেলথ সমস্যাগুলোর একটি। রক্তাল্পতা মাতৃস্বাস্থ্যের ফলাফল খারাপ করে, শিশু অপুষ্টিকে আরও গুরুতর করে তোলে, এবং খাদ্য-ভিত্তিক কল্যাণ প্রকল্পের গঠন দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়। এই ফাঁক পূরণ না হওয়া পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গের পুষ্টিগত স্বাস্থ্যের যে কোনো মূল্যায়ন, কিছুটা হলেও অসম্পূর্ণ থেকে যাবেই।আগেই লিখেছি, এই সার্ভের মোট সূচকের সংখ্যা ১০১। আমরা তার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি দেখেছি, মূলত নারী ও শিশুকল্যাণ বিষয়ক। আরও অনেক বাদ রয়ে গেলো, সেইগুলোও আশা করি পরের কোনো কিস্তিতে দেখা হবে, বা অন্য কেউ দেখবেন। এন-এফ-এইচ-এসের এই কটি সূচকের তথ্য-উপাত্ত থেকে যা দাঁড়ায় তা হ’ল এই যে, পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো সত্যিই শক্তিশালী (ছিল), কিন্তু বহু প্রজন্মের সঞ্চিত সামাজিক ও জনতাত্ত্বিক সমস্যা তার উপর চেপে বসে আছে, যা শুধু পরিকাঠামো দিয়ে সমাধান করা কঠিন। স্বাস্থ্যবিমা বা ব্যাংকিংয়ের দিক থেকে রাজ্যের ফল প্রশংসার্হ। অন্যদিকে, চাইল্ড ম্যারেজের ব্যবধান কমানো যায় নি, এবং পুষ্টির পরিবর্তন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই হাজির হয়েছে ব্লাড-শুগার, ওবেসিটির মত এনসিডির বোঝা। এই দিকগুলিতে বিগত দশকে রাজ্যের রিপোর্ট কার্ড ততোটা ভালো নয়। নিঃসন্দেহে এই কাজগুলি অনেক বেশি কঠিন, এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক বিনিয়োগের এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছার ফলে কাঁটা হয়তো সামান্য সরতে পারে। আশা করা যায়, এখন থেকে যত্নশীল হলে, আগামী এক দশকে বোঝা যাবে রাজ্য এই ফাঁকগুলো আসলেই কমাচ্ছে, নাকি অবনতিশীল জাতীয় পরিস্থিতির বিপরীতে কেবল স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে, না আরও অন্ধকারের দিকে যাত্রাই তার ভবিতব্য? সূত্রঃ সমস্ত পরিসংখ্যান সরাসরি ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক, ভারত সরকার প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের কি ইন্ডিকেটরস ফ্যাক্টশিট থেকে নেওয়া: NFHS-6 (২০২৩-২৪) এবং NFHS-5 (২০১৯-২১)। আলাদাভাবে উল্লেখ করা না থাকলে সমস্ত পরিসংখ্যান ১৫-৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের জন্য রাজ্য ও জাতীয় সামগ্রিক হার (শহর ও গ্রাম মিলিয়ে)। ১৮২ পাতার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট-টি পাবেন এই লিঙ্কে - https://www.nfhsiips.in/nfhsuser/assets/National%20Family%20Health%20Survey%20(NFHS-6)%202023-2024%20Fact%20Sheets.pdf আমি বিশ্লেষণ করার সুবিধের জন্য পিডিএফ থেকে ক্লডের সাহায্যে এক্সেল স্প্রেডশিট করে, নিজেও যথাসম্ভব যাচাই করে নিয়েছি। তবুও কোথাও ভুল বা অসঙ্গতি থেকে গেলে শুধরে নেব। আর কেউ আরও বিশদে বিশ্লেষণ করতে চাইলে, এইখানে ডেটা, কিছু প্লট, R কোড, GeoJSON ফাইল ইত্যাদি পাবেন https://github.com/DattaHub/NFHS-6-analysis সূচক NFHS-4 (২০১৫-১৬)পশ্চিমবঙ্গ NFHS-4 (২০১৫-১৬)ভারত NFHS-5পশ্চিমবঙ্গ NFHS-5ভারত NFHS-6পশ্চিমবঙ্গ NFHS-6ভারত চাইল্ড ম্যারেজ ৪১.৬% ২৬.৮% ৪১.৬%¹ ২৩.৩% ৩৬.৪% ২০.১% টিনেজ প্রেগন্যান্সি ১৮.৩% ৭.৯% ১৬.৪% ৬.৮% ১৬.৬% ৬.৭% ¹এই হার NFHS-4 থেকে NFHS-5 পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে অপরিবর্তিত ছিল, যদিও জাতীয় হার এই সময়ে কমতে থাকে।
    এক বিপন্ন প্রজন্ম ও আমাদের ভবিষ্যৎ - Somnath mukhopadhyay | এক বিপন্ন প্রজন্ম ও আমাদের ভবিষ্যৎ। আমার বাড়ির সামনের রাস্তা বেয়ে প্রতিদিন নানান বয়সের শিশু থেকে কিশোর কিশোরী ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে যায়। সবার সঙ্গে না হলেও এদের জনাকয়েকের সঙ্গে টুকটাক কথার সূত্রে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অবশ্য সে সম্পর্ক খুব যে গভীর, সে কথা বলবোনা। পথ চলতি সম্পর্কের সেতু কবে আর দীর্ঘস্থায়ী হয়? টানা গরমের পর্ব মিটিয়ে স্কুলগুলোতে আবার ছেলেপিলেরা যাতায়াত শুরু করেছে দেখে মনটা বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সুতো ছেঁড়া ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে যায়। বছরের নানা সময়ে ওদের আসা যাওয়া দেখতে দেখতে কখন যেন পথচলতি ওদের রোদ জল শীতের আমেজ মাখা আনন্দ আর কষ্টের শরিক হয়ে যাই। গরমের কারণে বেলার স্কুল সকালে উঠে আসে, বর্ষার ভেজা দিনগুলো জল থৈ থৈ হয়ে উঠতেই অনেকের বাড়ি থেকে বেরনো হয়না, বন্যার আঁচ পেতেই স্কুলবাড়ি ভরে ওঠে জলভাসি মানুষজনের ভিড়ে, শীতের দাপট খুব বেশি হলে প্রয়োজনীয় শীত পোশাকের অভাবে কুঁকড়ে থাকে নবীন শরীরগুলো। এভাবেই এক আশ্চর্য লড়াই করে বেড়ে ওঠে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চারাগাছেরা। খুব সম্প্রতি ইউনিসেফের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে পরিবর্তিত জলবায়ু নিয়ে এই দেশের শিশুদের কিছু বাস্তব সমস্যার কথা। তারা সবাই যে পাঠশালায় যায় হয়তো এমন নয়, ( গেলে তার থেকে আনন্দের কিছু হতোইনা ) – এদের মধ্যে কেউ কেউ মাঠে ঘাটে খেলে বেড়ায়, মা বাবার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে, গজিয়ে ওঠা দোকানে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে উদয়াস্ত ঘাম ঝরিয়ে কাজ করে। এরা সবাই পরিবর্তিত বাতাবরণের শিকার – স্বেচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়েই। এদের নিরাপত্তার ঝুঁকি ক্রমশই বাড়ছে। সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা গেছে – ১. এই মুহূর্তে আমাদের দেশের ৯৭% শিশু অন্যূন দুটি আবহাওয়া সংক্রান্ত বিপর্যয় বা সংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। ২. দেশের ১৫৮ মিলিয়ন সংখ্যক শিশু তাপদাহ ও খরা পরিস্থিতির ফলে চরম ভুক্তভোগী। ৩. ভারতের ২৩৪ মিলিয়নেরও বেশি সংখ্যক শিশু কমপক্ষে তিনটি চরম জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবহিক বিপর্যয়ের সামনে পড়তে বাধ্য হচ্ছে যার ফলে বাড়ছে তাদের শারীরিক সুস্থতার সমস্যা, দেখা দিচ্ছে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি, পঠনপাঠন ও নিরাপত্তার সংকট। ৪. ইউনিসেফের পক্ষ থেকে অতি সত্বর শিশুদের সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের সম্ভাব্য বিপর্যয় সম্পর্কে সচেতন করার সাথে সাথে তাদের সামাজিক প্রয়োজন ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।সমীক্ষার বিস্তারিত আলোচনায় বলা হয়েছে যে ভারতের প্রায় প্রতিটি শিশুই কমপক্ষে একটি আবহিক বিপর্যয়ের দ্বারা পীড়িত, অন্যদিকে ৯৭% শিশুকে একাধিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। গত ১৬ জুন ২০২৬ প্রকাশিত এই রিপোর্টৈ পরিসংখ্যান তুলে বলা হয়েছে যে দেশের ৪১১.৬২ মিলিয়ন শিশু কমপক্ষে দুটি আবহাওয়া সংক্রান্ত অথবা বিপর্যয় সংশ্লিষ্ট বিপন্নতার শিকার হয়। এরমধ্যে রয়েছে প্রবল দাবদাহ, তীব্র খরা পরিস্থিতি, নদী ও সামুদ্রিক বন্যা, ক্রান্তীয় ঝড়, তাপপ্রবাহ, দাবানল, ধুলিঝড় ও বালি ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ।তালিকা যেন শেষ হতে চায় না। ভারতের মতো একটি সুবিশাল দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্নতার কারণে এক একটি অঞ্চল এক এক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বছরের নানা সময়ে। সেই অনুযায়ী বাড়তে থাকে বিপন্নতার বহর।দেশের ২৩৪ মিলিয়ন শিশু বা দেশের মোট শিশু জনসংখ্যার ৫৫% ন্যূনতম তিনটি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে বাধ্য হয়। এরফলে তাদের সর্বতোমুখী বিকাশের প্রক্রিয়া বারবার ব্যাহত হয়ে থাকে যা পরিপূর্ণ বিকাশকে বিলম্বিত তথা বিঘ্নিত করে। ইউনিসেফের মতে তথাকথিত বিপর্যয়ের মধ্যে সবথেকে জোরালো ভূমিকা নেয় বৃষ্টিহীন শুখা পরিস্থিতি এবং প্রবল তাপদাহ। পরিসংখ্যান বলছে যে এই দুয়ের প্রভাবে ১৫৮. ৮ মিলিয়ন শিশু বর্ণনাতীত কষ্টের মুখে পড়েছে। এদের মধ্যে ৮৪.১ মিলিয়ন শিশু খরা, তাপপ্রবাহের সঙ্গে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত হতে বাধ্য হয়। এছাড়া ৩৮. ৫ মিলিয়ন শিশুকে রীতিমতো খরা, তাপপ্রবাহ ও প্রবল বন্যার সঙ্গে যুঝতে হয়েছে কেবলমাত্র প্রাণ টুকুকে টিকিয়ে রাখতে। লড়াই এখানেই শেষ হয়ে যায়না। ওলটপালট হয়ে যাওয়া সবকিছুকে একটু স্বাভাবিক করে তুলতে না তুলতেই নতুন বিপর্যয়ের মুখে পড়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কি করুণ অথচ অনিবার্য পরিণতি! মৌসুমী বায়ুর খামখেয়ালিপনার কারণে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ুর চরিত্রে বদল এসেছে বিগত কয়েক বছরে। খরার দাপট প্রথাগত এলাকার পরিধিকে অতিক্রম করে হাত বাড়িয়েই চলেছে অন্যতর পরিসরে। বৃষ্টিপাতের স্বল্পতার ফলে দাবদাহের দাপট বাড়লে তা শিশুদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ভারতের ৪১০.২ মিলিয়ন শিশু,যা মোট শিশু জনসংখ্যার ৯৬%, আজ ভয়ঙ্কর খরা আর গরমের দাপট সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। এই দাপটের শিকার দেশের গ্রামীণ এলাকায় বসবাসরত শিশুরা। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হ‌ওয়ায় খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তারা, পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টির অভাব কমিয়ে দিচ্ছে তাদের পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবার সম্ভাবনাকে। জীবনের চেনা ছন্দটাকেই পাল্টে দিতে চলেছে এই অকল্পনীয় তাপীয় পরিবেশ। সমীক্ষা সূত্রে জানা গিয়েছে প্রায় ১৫৫.৭ মিলিয়ন শিশু প্রবল ঘূর্ণিঝড় প্রবণ অঞ্চলে বসবাস করে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সারা পৃথিবীতেই ঝড়ের তীব্রতা বেড়ে চলেছে। বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জীবনের মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে স্কুলের পঠনপাঠন, স্বাস্থ্য পরিষেবা। বলা হয়ে থাকে যে বিপদ নাকি কখনো একা আসেনা। একের পর এক বিপর্যয়ের অভিঘাতে জীবনে সুস্থিত হবার সম্ভাবনা অঙ্কুরিত হবার আগেই নষ্ট হয়ে যায়।ভারতের প্রতি ৫ জন পিছু ১জন তাপপ্রবাহের দ্বারা প্রভাবিত হয় অর্থাৎ ৮৯. ৩ মিলিয়ন শিশু তাপ দগ্ধ হচ্ছে যা তাদের শরীরের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে প্রায় নিয়মিতভাবে বর্ষার জলে উপচে পড়া নদীর বন্যায় বানভাসি হতে হয় ৬৬.৯ মিলিয়ন শিশুকে যা মোট শিশু জনসংখ্যার ১৬%। একের পর এক প্রাকৃতিক ঘটনায় বিঘ্নিত হয় শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি। প্রকৃতির রাজ্যের যা স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা তা অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে বিপর্যয়ের চেহারা নেয়, আর তখনই, বিপন্নতার হাহাকার ধ্বনিত হয় চারিদিকে। ইউনিসেফের মতে এই ক্রমিক প্রাকৃতিক ঘটনায় শিশুরা ৬ ধরনের পরিষেবা ব্যবস্থা থেকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয় – স্বাস্থ্যসেবা বিকাশের জন্য অপরিহার্য পুষ্টি, পরিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা। মাথায় রাখতে হবে যে শৈশবকাল হলো দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুবিকাশের পক্ষে সবথেকে উপযুক্ত সময়। এই সময় শিশুর বিকাশ ব্যাহত হলে মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াই পথভ্রষ্টতার শিকার হয়। এমনটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। এখানেই বিপর্যয়ের খতিয়ান শেষ হয়ে গেল এমন নয়। আমাদের কৃতকর্মের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আজ বিষিয়ে গিয়ে প্রাণহর হয়ে উঠেছে। পরিশুদ্ধ জলের জোগান আজ আর সুনিশ্চিত নয়। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন ধরনের vector borne disease এর প্রকোপ বাড়ছে, বাড়ছে ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস ঘটিত শারীরিক সমস্যার দাপট। এই সব অচেনা অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য শিশুদের মধ্যে কম, সুতরাং আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা শিশুদের মধ্যে অনেক বেশি। বলাবাহুল্য এসব‌ই সমস্যা বাড়িয়েছে। এই সময়ের ভারতবর্ষের মহানগরগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয়তার সীমার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। এমন পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। দেশের ৯৯% শিশু অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে শ্বাসকষ্টসহ নানান রকম জটিলতায় ভুগতে হচ্ছে তাদের। এই মুহূর্তে ভারতের ভারতের air pollution risk score এর মান ১০ এর মধ্যে ৯.৯৪। বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের দেশের শিশুরা বিশেষ করে বৃহত্তর গ্রাম সমাজের শিশুরা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিপালিত হচ্ছে। শৈশব অনিশ্চিত হলে ভাবী জীবনের অনেকটাই ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। প্রহেলিকাময় হয়ে ওঠে দেশের ভবিষ্যৎ।ইউনিসেফের তরফে বাস্তব পরিস্থিতির সাপেক্ষে ভারতের বর্তমান স্থিতির বিষয়ে যে সূচক মানের কথা বলা হয়েছে তাতে করে বলা যায় যে আমাদের দেশের ভাবী প্রজন্ম খুব ভালো অবস্থানে নেই। ভারতের শিশুদের ফুড পভার্টি স্কোর ৬.৩১, নিউট্রিশন রিস্ক স্কোর ৬.৪১ এবং স্টার্টিং স্কোর ৬.৫১।পরিস্থিতি মোটেই নিরাপদ নয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।আর এরফলে আমাদের শিশুরা প্রয়োজনীয় পরিমাণে খাবার খেতে পায়না যাতে করে বাড়ন্ত বয়সের খাদ্যের চাহিদা মেটে।খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে পুষ্টিকর খাবার মেলেনা, আর পুষ্টির অভাবে শরীরের বৃদ্ধি যথাযথ না হ‌ওয়ায় তারা বয়সের তুলনায় অনেক বেঁটে খাটো হয়ে থাকে। এও এক দুষ্ট চক্র যা একের অভাবে অন্যতর অভাব বা অপূর্ণতার হেতু হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এসবের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের দেশের ভাবী নাগরিকদের ভবিষ্যৎ। দেশের শ্রীবৃদ্ধি। আলোচনার এমন অংশে পৌঁছে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে যে কীভাবে আমরা আমাদের দেশের শিশুদের এক নিরাপদ, সুস্থিত পরিবেশ পরিকাঠামোর মধ্যে বিকশিত হবার সুযোগ করে দিতে পারবো? পরিস্থিতি এতোটাই সংকটময় যে চটজলদি কোনো সমাধান সূত্র বের করে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়। তবে হাল ছাড়লে চলবে না। আমাদের সকলকে এই বৈশ্বিক সমস্যার বাস্তবতার বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে, খুঁজতে হবে এর থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাব্যতা বিষয়ে। মাত্র কয়েক বছর আগে আমরা এক মহামারীর বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এলাম। ওই বিচ্ছিন্ন সময়ে আমাদের শিশুদের শিক্ষা দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই কয়েক বছরে শিক্ষা অবকাঠামোর সামান্য কিছু পরিবর্তন হলেও তার সিন্ধুতে বিন্দুসম। বলতে দ্বিধা নেই যে আমরা এক বৈষম্যমূলক সমাজে বাস করি। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের শিশুরাও জীবনের একেবারে সূচনা পর্ব থেকেই এই বৈষম্যের বাতাবরণের মধ্যে প্রতিপালিত হচ্ছে। যতদিন না এই অবস্থাকে আমরা বদলাতে পারবো ততদিন পর্যন্ত আমাদের শিশুরা এটাকে বিধিলিপি বলে মনে করেই অসম্ভব কিছু হয়ে ওঠার কষ্টকর প্রয়াস করে যাবে। আরও ক্ষতি হয়ে যাবার আগে এই অবস্থা থেকে আমাদের শিশুদের উদ্ধার করতে উদ্যোগী হতে হবে। মনে রাখতে হবে – এই প্রজন্মের শিশুরাই আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের সোনালী ভবিষ্যৎ।
    ভাগবত পুরাণ - ১/৭ - Kishore Ghosal | আপনি তাঁদের আশ্রয় এবং জীবিকা নিয়ে চিন্তিত হবেন না। কারণ, ভগবান সমস্ত জীবের জীবিকার সংস্থান করেই রেখেছেন। ছোট ছোট মাছ, বড়ো মাছের খাদ্য। তৃণ, শষ্প মৃগাদি ও গবাদির খাদ্য। মৃগাদি অন্যন্য প্রাণীও মানুষের খাদ্য। মহারাজ, এইভাবে সমস্ত জীবই একে অপরের জীবিকার স্বাভাবিক উপায়। যত ভোক্তা জীব আছে, ভগবান সকলেরই আত্মা। আবার যত ভোগ্য আছে, তাদেরও আত্মা একই ভগবান। এই জগতের কোন কিছুই ভগবানের থেকে আলাদা নয়। "ভাগবত পুরাণ" প্রথম স্কন্ধ - পর্ব ৭ ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭ 
  • জনতার খেরোর খাতা...
    শিকারছলনা  - শ্রীমল্লার | সাহস এবং আগুন পাশাপাশি—বানিয়েছিল অসীম তাড়না। দূরে গিয়েও আবার কাছে আসি, তখন তুমি আমায় চেনো না...  প্রতীক এবং সহজ সোজাসুজি—ছাড়িয়েছিল দিগন্তের মন। এখন আমি ততটুকুই বুঝি, যতটা আজ বোঝার রাখি মন...   দূরে গিয়েও আবার কাছে আসি, তখন তুমি আমায় চেনো না... আমার মুখে কবিসুলভ হাসি, তোমার ঠোঁটে শিকারছলনা!
    Claustrophobia  - শ্রীমল্লার | আয় শত্রু যায় শত্রুখায় দস্যু বিদ্যুৎআয় সৃষ্টি যায় বৃষ্টিচাই নিম্নে চারখুঁতধ্যাৎ তন্বী থাক আর্তিহাতবন্যা মারকুটতুই চাইলে সব পারতিশোকশিল্প তোর দূত
    ইকোয়াডর বনাম জার্মানি ২০২৬ ফুটবল এর জয়  - biswajyoti das | আজ একটা বিশেষ দিন, আজ ফুটবল আবার প্রমান করে দিলো যে সে গরিব বর্ধীনসু সবাইকে এক চোখে দেখে | ২৬ এ জুন ২০২৬ -- ব্রাসেলস সময় ১২ :৫৪ | রুয়ে দে কর্নেল বোর্গ 152এ১৯৫০ বিশ্বকাপ এর ফাইনাল এর আগে উরুগুয়ে এর অধিনায়ক "ওব্দুলিও ভারেলা " বলেছিলেন "মাঠে আমরা এগারোজন থাকবো আর ওরা এগারো জন এর বেশি কিছু না "...আজও ইকুয়েডরদের এগারো প্লেয়ার ছিলো, জার্মানি র ছিল এগারো প্লেয়ার, ফুটবল আজ উচ্চ -নিচ কিছুই দেখেনি, গরিব -বড়োলোক এর ধার ধরেনি |. জার্মানি বিস্বাৰ্থনীতি তে কতটা শক্তিশালী সেটাও দেখেনি দেখেছে শুধু প্রতিভা , জেদ, জেতার অদম্য ইচ্ছা | মানুষ আজ বিস্ময় এ দেখল ফুটবল এ সব ই সম্ভব, দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে, পেরু আর কোলোম্বিয়া র প্রতিবেশী দেশ যেখানে অবিরত গৃহযুদ্ধ চলছে, স্বৈরাচারী সামরিক শাসন চলছে সেই দেশ ডয়চেসল্যান্ড(germany) হেরে গেলো |খেলা শেষে ফলাফল, ইকুয়েডর ২ - জার্মানি ১ লেরয় সানে- ২মিনিটে জার্মানি কে এগিয়ে দেয় .নিলসন অ্যাঙ্গুলো - ৯ মিনাতে গোলশোধ তারপর সব্বাই কে আশ্চর্য্য চকিত করে দিয়ে গনজালো প্লাটা র গোল ৭৭ মিনিটে | খেলার শেষে ইকুয়েডর এর সমর্থকদের অশ্রুসিক্ত উল্লাস "সেবাস্তিয়ান বেক্কাসিস" কে নিয়ে তার পরিবারের উল্লাস, তার স্ত্রী র আলিঙ্গন এবং চুম্বন ||আর আমি অবাক দর্শক, ফুটবল এর ভেলকি দেখে অতীব আনন্দিত ....
  • ভাট...
    commentalbert banerjee | Ranjan Roy | ২৭ জুন ২০২৬ ১১:১৯
    //যখন ছোট বড়োর কথা বা দুর্বল সবলের কথা মনে চলে।// মেনে ​যতই মেনে নিক মনে ঠিক চলে। তারপর করে দাঁত নখ লুকিয়ে রেখে অপেক্ষা প্রতিশোধের অপেক্ষা। এতে শুধু মানবিকতার যা ব্যাহতহয় তা হলো ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর অধিকার।
    commentalbert banerjee | ওড়িশা
    পুরী, গঞ্জাম, কটক, বালেশ্বর ইত্যাদি জেলায় অভিযোগ উঠেছে খাবারের মান নিয়ে।
    ঝাড়খণ্ডে প্রধান অভিযোগগুলো
    1. খাবারের মান খারাপ
      • ভাত ও ডালে পোকা পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ।
      • সবজি অর্ধসেদ্ধ বা পচা অবস্থায় দেওয়া।
      • খাবারের স্বাদ খুব খারাপ — বাচ্চারা খেতে চায় না।
    2. স্বাস্থ্যগত সমস্যা
      • খাবার খেয়ে বাচ্চাদের পেটব্যথা, বমি, ডায়রিয়া হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
      • কয়েকটি স্কুলে একসাথে অনেক শিশু[বেশিরভাগ আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়] অসুস্থ হয়ে পড়ায় স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত করেছে।পুষ্টির অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
    উল্লেখযোগ্য জেলা:
    রাঁচি, ধানবাদ, জামতাড়া, গিরিডি, পূর্ব সিংভূম (জামশেদপুর)
    সরকারি পদক্ষেপ:
    কিছু ব্লকে ইসকনের চুক্তি পর্যালোচনা করা হয়েছে।স্থানীয় প্রশাসন ও অভিভাবক সংগঠনগুলো ইসকনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে।কয়েকটি জায়গায় অন্য সংস্থাকে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
    commentRanjan Roy | *মেনে
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত