সবেমাত্র কোনো ভারতীয়ের লেখা প্রথম ইংরেজি উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম। বঙ্কিমচন্দ্রের Rajmohan's Wife।
এই বইটি ক্ষীণবপু। এবং একাধিকবার ইতিহাসে, ক্যুইজের প্রস্তুতিতে এই বইয়ের নাম শুনে একটা হালকা ইচ্ছা ছিল বইটা কখনো পড়ার।
বন্ধুর বাড়ির তাকে বইটি দেখে তৎক্ষণাৎ ঋণগ্রহণ করলাম এবং কয়েকদিন পরে পড়া শুরু করলাম। বইটা পড়ে খুবই ভালো লাগল, এবং তাতেই আমি অবাক হলাম। এই বইটা কৌতূহলবশত পড়তে শুরু করেছিলাম, এবং এটা যে ভালো লাগবে, সেই প্রত্যাশাও ছিল না। কিন্তু শেষ অবধি পড়ার পরিকল্পনা ছিল।
বইটা অত্যন্ত সুখপাঠ্য। উপন্যাসের কাহিনীবিন্যাসও ভালো। টানটান উত্তেজনার ব্যাপারটাও আছে।
এইটা বইটা পড়ে ভালো লাগায় আমার ভলতেয়ারের কাঁদিদের কথা মনে পড়ে গেল। সেই বইটাও নিতান্তই ঐতিহাসিক একটা বই পড়ার ইচ্ছা থেকে পড়া, এবং পড়ে অত্যন্ত ভালো লেগেছিল, প্রত্যাশার উর্ধে। আমার ব্লগে
সেই বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া আছে।
ঘর সাজানোর সময় যেমন কিছু জিনিস কম কাজে লাগবে জেনেও কেনা হয়, ঘরের সজ্জায় একটু বৈচিত্র আনার জন্য, তেমনই মনের মণিকোঠায় বৈচিত্র আনার জন্যই মূলত এই বই পড়া। কাঁদিদও সেভাবে পড়া। 'উপভোগ' করব, সেই চিন্তা মাথায় ছিলও না। কিন্তু বেশ ভালো ভাবে উপভোগ করেছি।
বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্ত বাংলা ফিকশন আমার পড়া। প্রবন্ধ বেশ কিছু পড়া। প্রহসনও। বঙ্কিমচন্দ্রের ইংরেজি পড়ে তাই আমার মনে হচ্ছিল, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি বঙ্কিমবাবু এইখানটা বাংলায় লিখলে ঠিক কোন শব্দটা চয়ন করতেন! এক লাইন করে পড়ছিলাম আর বাংলায় ঠিক কীভাবে বঙ্কিমচন্দ্র লিখতেন সেটাকে মাথার মধ্যে সাজাচ্ছিলাম। এভাবে বইটা পড়ার অভিজ্ঞতা ছিল চমৎকার।
যে সময়ে লিখেছেন এই বই, সেই সময়ে দেশের শিক্ষিত, অশিক্ষিত কোনো মানুষই 'উপন্যাস' ফর্মটার সাথে পরিচিত ছিলেন না। তাই এই কাজ বেশ সাহসিক।
বিভিন্ন সংস্কৃত কাব্যের রূপক, বাংলা কথ্য প্রবাদ ও শব্দবন্ধকে সরাসরি উনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। ভিক্টোরিয় ইংরেজি উপন্যাসের ছাপও আছে উপন্যাসে।
তবে এই উপন্যাসটি পড়ে আমার মনে হয়, তাঁর বাংলা উপন্যাসগুলির পাশে এটি মোটেও ম্লান হবে না।
বঙ্কিমচর্চাকারীদের মধ্যে এই উপন্যাসটি অনেকাংশেই অবহেলিত। ইতিহাস, সাহিত্যের ইতিহাস, ক্যুইজের ১ লাইনের প্রশ্নের বাইরে এই বইটি ততটা আলোচনায় আসেনি। যোগ্য মর্যাদা পায়নি। কিন্তু গল্প এতই ভালো, শুধু গল্পের জন্যই এই উপন্যাস পড়া যায়। অন্য মাহাত্ম্যের কথা বাদ দিলেও।
চরিত্রগুলি বেশ জীবন্ত। তবে ক্ষীণবপু হওয়ার কারণে খুব বেশি 'স্টাডি' এই উপন্যাসে নেই। নারীচরিত্রগুলি বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের মতই অবলা নয়। তাদের নিজস্ব মতামত, কর্তব্যবোধ, এবং সর্বোপরি 'agency' জিনিসটা রয়েছে। তারা নিজেদের গতিপথ নির্ধারণ করছে অটল ভাবে। কিন্তু কেউই দেশকালের গন্ডি পার হতে পারেনি। দেবী চৌধুরানীর যে সৌভাগ্য হয়েছিল, মাতঙ্গিনীর তা হয়নি।
নারীরূপ বর্ণনায় ভারতীয় কাব্যস্রষ্টাদের মত জাঁকজমক এই উপন্যাসে অনুপস্থিত থাকলেও, বঙ্কিম তাঁর কৌলীন্য ও 'বংশ'পরিচয় দিয়েছেন সফল ভাবে।
বঙ্কিমচন্দ্র দেশ ও ধর্মের শিকড়ের মাহাত্ম্যকে চিরকাল তুলে ধরেছেন, কিন্তু এই উপন্যাসের নায়ক মাধব ঘোষ ইংরেজি শিক্ষিত কলকাতায় পড়া নব্য বাবু, যে অবসরে ইংরেজি বই পড়ে, আর খলনায়ক বরং ইংরেজি শিক্ষায় বঞ্চিত। ঘরের আসবাব, ছবি, ইত্যাদির বর্ণনা পড়ে অনেকের ধাঁধা লাগতে পারে, কিন্তু খলনায়ক মাথুর এখানে দেশ বা ঐতিহ্যের প্রতিভূ একেবারেই নয়, বরং তার বিকৃত, ব্যবহারিক শিকড়হীনতারই একজন নিদর্শন। মাথুর একজন দেববর্জিত মানুষ।
বঙ্কিমবাবু সুরসিক। তা তাঁর একনিষ্ঠ পাঠকমাত্রেই জানেন। রূপকের মাধ্যমে second order thinking, সূক্ষ হাস্যরস, এসব তাঁর প্রবন্ধেরও বৈশিষ্ট। কয়েকদিন আগেই তাঁর "মনুষ্য ফল" নামের প্রবন্ধ পড়ছিলাম। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।
এই উপন্যাসেরও আনাচে কানাচে আছে হাস্যরস। কখনো কখনো তা কয়েকটা মাত্র শব্দে। যেমন মাথুর ঘোষের বাড়ি "Genuine specimen of mofussil magnificence", আবার একই সাথে, "mofussil want of cleanliness"।
বা সারাইয়ের অভাবে ধোঁকা মাথুরের বাড়ি সম্পর্কে তিনি বলেছেন:
Not unfrequently a young shoot of a bur or a less noble vegetable had struck its roots in the crevices between the layers of brick, realizing, rather on a humble scale, the Persian monarch's dream of a Hanging Garden.
আমি আমার মনে এভাবে অনুবাদ করলাম:
ইহা নেহাত বিরল ছিল না, যখন একটি বটবৃক্ষের নবীন পল্লব অথবা কিঞ্চিৎ কম কুলীন কোনো সব্জির নবীন শাখা তাহার হর্ম্ম্যের ইষ্টকস্তরের ভিতর প্রবেশ করিয়া পারস্যাধীশের ঝুলন্ত উদ্যানের দিবাস্বপ্ন নিতান্ত ক্ষুদ্র আকারে ফলবান করিত।
বঙ্কিমবাবু সুরসিক।
তিনি এই উপন্যাস, কারও কারও মতে একটু তাড়াতাড়িই শেষ করেন। এবং পেঙ্গুইনের নোটলেখকের মতে, তিনি একটি প্রকল্পকে দ্রুত শেষ করার জন্য মাতঙ্গিনীকে অকালমৃত্যু দিয়েছেন, এবং মাধব, চম্পকের মত চরিত্রকে একবাক্যে মৃত বা মারা যাবে এই দুই দলে ভাগ করে দিয়ে নাকি দায় সেরেছেন, আর তাতে নাকি উপন্যাসের গল্পটা বলাই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। আমি সেই মতে একেবারেই বিশ্বাসী নয়।
বঙ্কিমচন্দ্র 'ধর্মতত্ত্ব' লিখেছেন, যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ভগবদগীতার অনুবাদ করেছেন। এহেন মানুষের পক্ষে, জমিয়ে একদল লোকের গল্প বলার পরে, শেষে 'কেউ মারা গেছে, কেউ মারা যাবে' বলে দিলে, গল্প বলা মোটেও গুরুত্বহীন হয়ে যায় না।
আর হ্যাঁ, বঙ্কিমের ইংরেজি কি কঠিন? একেবারেই নয়। ঝরঝরে লেখা। বঙ্কিমের বাংলার কঠিন হওয়ার যে দুর্নাম, সেটা তাঁর ইংরেজি লেখার উপর কেউ অর্পণ করতে পারবে না। কেউ যদি ইংরেজিতে শার্লক হোমস পড়তে পারে, তাহলে, Rajmohan's Wife ও পড়তে পারবে।
সব আগ্রহী পাঠককে এই বই পড়ার আমন্ত্রণ জানাই। এই বইটা ফেরত দিতে হবে সেই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে এই লেখা শেষ করি!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।