এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আসুন আপা

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৮ জুলাই ২০২৬ | ৪৭১ বার পঠিত
  • সেদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে আমায় মধুময়দা(মধুময় পাল, বিশিষ্ট কথাকার) বললেন,“ এটা দেখো।”দেখলাম তসলিমা নাসরিনের বই দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে একটা সুন্দর মুসাবিদা করা প্রতিবাদ পত্রের খসড়া। সময়টা ২০০৩এর নভেম্বর। আমি তখন নিয়মিত কফি হাউসে যেতাম শনিবার শনিবার। আগে গিয়ে মধুময়দার সঙ্গে আড্ডা মারতাম তারপর রক্তকরবী পত্রিকার টেবিলে রবি সেন, প্রদীপ ভট্টাচার্য, শান্তি নাথ ও আরো অনেকের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরতাম রাতে। কফি হাউসে আড্ডার এক গভীর আঠা আছে যা গায়ে মাথায় লেগে থাকলে সহজে ওঠে না। আমার ক্ষেত্রে ওই আঠা বংশগত বলাও যায় কারণ এ আঠা ছিল বাবারও আর অনেকদিন আগে প্রথম বাবার সঙ্গেই কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে গিয়ে ছিলাম। সেদিন মধুদা ওই মুসাবিদাটা দেখানোর পর পরই সম্ভবত কবি সৌমিত্র গুহ সেখানে আসে শনিবারের আড্ডায়। তখন রাজ্য কর্মচারী আন্দোলনের সঙ্গে ও, কবি অজয় সেনাপতি, অনুবাদক কৌশিক রায়,অগ্রজ কবি সুভাষ সরকার ও আরো অনেকের সঙ্গে আমি বর্তমান লোকায়তিক পত্রিকার সম্পাদক সিদ্ধার্থদার নেতৃত্বে অসিপত্র নামের রাইটার্স ভিত্তিক একটা সাংস্কৃতিক গ্রূপ করতাম। সৌমিত্রকে মুসাবিদাটা দেখানোর পর তুরন্ত কাজ শুরুহয়। আমরা দুজনে কফি হাউসের টেবিলে টেবিলে গিয়ে সই সংগ্রহ করতে শুরু করি। তখন রবিদা, প্রদীপদা, শান্তিদারা রক্তকরবীর টেবিলে এসে গেছেন। তিনজনেই খসখস করে সই দিলেন আরো দিলেন জলার্ক পত্রিকার মানব চক্রবর্তী। তখন ভরা পূর্ণিমার মতো ভরা বামফ্রন্ট ঢল ঢল করছে আর সেই সরকারের সংস্কৃতিপ্রেমী অনুবাদক নাট্যকার মুখ্যমন্ত্রী তসলিমা নাসরিনের দ্বিখণ্ডিত বইটা নিষিদ্ধ করেছেন। তাই একটা অলিখিত রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল প্রতিবাদ পত্রের আসপাশে তৈরি হয়ে গেছে। নামী সব লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদকরা বেশিরভাগ ত্যানামেনা করে ফেরত দিচ্ছেন। যাঁরা সই দিলেন সেদিন তাঁরা আমাদের মতোই বেতোয়াক্কা চালচুলোহীন ক্যাঁকলাস পার্টি। ওইদিনের ঘটনাটা একটা শুরুমাত্র ছিল। তারপর আমাদের বন্ধু আইসা সংগঠনের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত নবকুমার বিশ্বাসকে বলায় কলেজ স্কোয়ারে একটা প্রতিবাদ সভা হয়। সেখানেও মধুময়দা আমার আর সৌমিত্রের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। আইসার সে সময়ের সংগঠক কবি বিলাস সরকার নিষিদ্ধ বই দ্বিখণ্ডিত থেকে পাঠ করে। তারপর ১১ই ডিসেম্বর গণসংস্কৃতি পরিষদের অমিত দাশগুপ্ত, নিত্যানন্দ ঘোষের উদ্যোগে নবান্ন, অনীক, রক্তকরবী, জলার্ক প্রভৃতি পত্রিকা আর শিবনারায়ন রায়, রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়, জিয়াদ আলি, মিহির চক্রবর্তী, রবি সেন ও আরো অনেকের আহ্বানে মহাবোধি সোসাইটি হলে একটা প্রতিবাদ সভা করে বইটার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব নেওয়া হয়। ওই সভায় মীরাতুন নাহারও ছিলেন।পরে এপিডিআর মামলা করে দ্বিখণ্ডিত বইটার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিয়ে ছেড়েছে কিন্তু কিছু মুসলমান ধর্মান্ধ লোকের চাপে পড়ে তসলিমাকে পশ্চিম বাংলা থেকে একরকম খেদিয়েই দেয় বামফ্রন্ট সরকার। এসব তো গেল কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ। এখন তসলিমা লেখা আমার কেমন লাগে সে নিয়ে কিছু বলা দরকার। উনি জামাতিদের রাজনৈতিক বিরোধিতা যেমনভাবে করেন আর মেয়েদের কথা যেভাবে বলেন তাতে আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। সে হিসেবে উনি এই উপমহাদেশে এক আদর্শস্থানীয় লেখক। ওঁর লেখার যে একটা অবরণহীন ইডিওসিনক্রেসি আছে তার সম্পর্কে শিবনারায়ন রায় বলেছিলেন“ বুনো গোলাপের গন্ধ”। ঠিকই একটা অযত্নলালিত্য যে ওঁর লেখার সৌন্দর্য সে ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সবচাইতে আপত্তির হলো ওনাকে লেখার জন্য এভাবে বাংলাদেশ থেকে চিরদিনের জন্য আর বিক্ষিপ্তলগ্নে ভারত থেকে বিতাড়ন। অনেকে তসলিমা কেন হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে কিছু বলছেন না কেন সে নিয়ে বলেন। কথাটার পেছনে কী যে যুক্তি আছে কে জানে! তসলিমা মনেপ্রাণে বাংলাদেশী হয়ে জামাতিদের বিরুদ্ধে যেভাবে বলে চলেন সেটাই কি তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের জন্য যথেষ্ট নয়! তিনি খামোখা বিদেশী রাষ্ট্র ভারতের ভেতরের ব্যাপারে সরব হয়ে এখানকার ভিসা খোয়াবেন কেন! ভারত তথা কলকাতার মায়া তসলিমা কাটাতে পারেন না যে! আর সে মায়া ভাষার মায়া। একজন নিবিষ্ট অক্ষরকর্মীর মায়া! এই ভাষা রাজনীতির বিভঙ্গেই,ভারত-বাংলাদেশ একক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের আলোকেই আমি তসলিমাকে বুঝতে চাই। বহুদিন পর তিনি কলকাতায় আসবেন শুনে আমার খুবই আনন্দ। ফেবুতে ওনাকে লিখেছি,“আসুন আপা। ”
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • . | ১৮ জুলাই ২০২৬ ২৩:০৬741839
  • আমার বইয়ের কোনও সফট লিংক নেই। কাগুজে বই।
     
    তবে এখানে খুচরো কিছু লিখেছি। চাগ্রীর গপ্পো নাম দিয়ে।
  • . | ১৮ জুলাই ২০২৬ ২৩:১১741840
  • টইটা তুলে দিয়েছি
  • তাপস দাস | ১৯ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৮741848
  • তসলিমা নাসরিনকে ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, সেটা দুর্ভাগ্যজনক। এবং সেটা স্ট্রাটেজিক্যালি (কারণ এতে তসলিমা বিনাব্যয়ে ফুটেজ পেয়ে গেছিলেন) এবং আইডিওলজিক্যালি (বামপন্থী বলে যারা নিজেদের দাবী করবে তাদের আরো অনেক বেশি সৎ নিরপেক্ষ এবং নির্ভীক হতে হবে ) ঠিক কাজ হয়নি, মুসলিম ফান্ডামেন্টালিস্টদের চাবকে সিধে করে দেওয়া উচিত ছিল বুদ্ধ সরকারের। বুদ্ধরা সেটা পারেননি।

    ওই সময়কার রাজনৈতিক ইতিহাস অতি জটিল, তসলিমার সাথে ঘটে ব্যাপারগুলো নিয়ে তাই যথেষ্ট কন্ট্রোভার্সি আছে। সেবারে কলকাতায় আসার আগেই উনি হায়দ্রাবাদে আক্রান্ত হন, সেটা রাজশেখর রেড্ডির মিনিস্ট্রি, সেখানে বামদের কোনো ভূমিকা নেই, তার ই আফটারমাথ হিসেবে কলকাতায় অশান্তি শুরু হয় বলে মনে করা হয়। কলকাতার অশান্তির ক্ষেত্রেও, যতদূর জানা যায়, মিনিস্ট্রি অফ এক্সটার্নাল এফেয়ার গভীর আশংকা প্রকাশ করেন তসলিমার নিরাপত্তা নিয়ে কারণ তিনি বিদেশী, এবং সেই কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোনো রিস্ক নিতে চায়নি, কারণ সামান্য এদিক ওদিক হলে কেন্দ্রের বিরোধী কংগ্রেস সরকার বামদের খেয়ে ফেলতো পুরো। এমনিতেই তখন নন্দীগ্রাম নিয়ে কলকাতায় ঘোরালো অবস্থা, ফলে তসলিমা খানিক বঙ্গীয় রাজনীতির চক্করে ও পড়ে গিয়েছিলেন। ইন ফ্যাক্ট ২০০৭ এর নভেম্বরে দিল্লীর USA এমব্যাসি থেকে আমেরিকায় একটি কেবল করা হয় যেখানে বলা হয়েছিল -

    Author Taslima Nasreen: pawn in political web.

    সেই সময় বিজেপি র ভূমিকা নিয়ে সেই কেবল এ লেখা ছিল :

    The BJP will ensure that will not happen by raising the issue in Parliament to batter both the CPM and Congress and to burnish their own tarnished secular credentials. The BJP has seized the high ground and will milk the controversy for all it's worth.

    নরেন্দ্র মোদী ঝাঁপিয়ে পড়ে বলেছিলেন তসলিমা কে গুজরাটে এনে রাখ হোক। কেন? ২০০২ এর গুজরাট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মোদী আর তার অনুচরদের নিয়ে তখন জোর তোলপাড় শুরু হয়েছে বিভিন্ন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে। সেইসময় ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার পলিটিক্যাল প্রচেষ্টা। বুঝ লোক যে জানো সন্ধান।

    সেই কেবল কাউকেই ছেড়ে কথা বলেনি যদিও :

    While on the defensive, the CPM believes this is an easier issue to handle in Parliament than Nandigram, and is probably quietly relieved that her case has pushed the Nandigram massacres from the front page. The Congress wants to push the issue under the rug. The BJP holds the upper hand and will milk the controversy dry.

    তসলিমাকে কলকাতা ছাড়ার কোনো সরকারি অর্ডার দেওয়া হয়েছিল কিনা সে নিয়েও কন্ট্রোভার্সি আছে। রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকার উভয়ে উভয়ের সাথে লড়ে গিয়েছিলো - রাজ্যের বক্তব্য ছিল কেন্দ্র (হোম মিনিস্ট্রি) রাজ্যকে জানিয়েছে তসলিমার নিরাপত্তা বিঘ্নিত, ফলে ওঁকে বাংলায় রেখে বুদ্ধ সরকার যেন বেশি ঝুঁকি না নেন, কেন্দ্র বলেছিলো না তারা সেটা বলেনি, তারা শুধু রেগুলার বেসিসে রাজ্য সরকারের কাছে তসলিমার নিরাপত্তা বিষয়ক খোঁজ খবর নিতো।

    কলকাতা ছেড়ে তসলিমা তারপর জয়পুর যান এক বন্ধুর সঙ্গে। তিনি নিজে অশান্তি দেখে চলে গিয়েছিলেন নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে, নাকি তাঁকে অফিসিয়ালি চলে যেতে বলা হয়েছিল - এ নিয়েও যথেষ্ট অন্ধকার আছে। তসলিমা যেহেতু বিদেশী (তখন তাঁর EU পাসপোর্ট), সেহেতু তাঁকে চলে যেতে বলা মানে সরকারের তরফ থেকে অফিসিয়াল ডাইরেক্টিভ থাকতাই হবে। সেরকম কোনো ডাইরেক্টিভ তসলিমা বা প্রেস কেউই দেখাতে পেরেছিলেন বলে আমার জানা নেই। তাঁর জয়পুর প্রসঙ্গে কেন্দ্র বক্তব্য রেখেছিলো (যতদূর মনে পড়ছে তখন কেন্দ্রের, অর্থাৎ কংগ্রেসের, মুখপাত্র ছিলেন অভিষেক মনু সিংভী - তিনিই এই ব্যাপারে যা বক্তব্য রাখার রাখতেন অফিসিয়ালি) তসলিমার জয়পুর যাওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্রকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ব্যাপারটা সত্য নয়। কারণ তসলিমা জয়পুর পৌঁছনোর পর, রাজস্থানের ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ শ্রী মেঘচাঁদ মীনা সরকারি বয়ানে জানান যে তসলিমা নিরাপদে আছেন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি বসুন্ধরা রাজের বাড়ির কাছে `শিখা' নামের একটি প্রাইভেট হোটেলে এক বন্ধুর সাথে উঠেছেন। এই সরকারি ঘোষণার পরেও, কেন্দ্র 'অন্ধকারে আছে' - মনু সিংভীর এমত বক্তব্যকে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভাবে বুদ্ধ সরকারকে হেনস্থা করার চেষ্টা হিসেবে ধরলে সেটা খুব একটা ভুল নাও হতে পারে। ২০০৭ সালে কেন্দ্র আর রাজ্যে খুব ই আকচাআকচি, কেন্দ্র চেষ্টা করছে নন্দীগ্রাম ইস্যুতে বুদ্ধ সরকারকে নাজেহাল করার।

    ঘটনাচক্রে, মমতার কাছের লোক ফিরহাদ হাকিম, AIMF এর প্রেসিডেন্ট ইদ্রিশ আলীর সাথে হাত মিলিয়ে তসলিমা কে কলকাতা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য ভেহিমেন্টলি পথে নেবেছিলেন। `মুসলিমবান্ধব' TMC র আরো বহু নেতা এই ঘটনায় যুক্ত ছিলেন। কারণ টা পরিষ্কার। তখন নন্দীগ্রামে সূত্রে বুদ্ধ সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য মমতা মরিয়া, রাজ্যে পলিটিক্যাল আনরেস্ট তৈরী করার তাই খুব ই দরকার ছিল TMC র তখন।

    এ কথা বোঝা খুব জরুরি, যে, কলকাতা থেকে 'তাড়িয়ে দেওয়া' মানে ভারত থেকে খেদিয়ে দেওয়া নয়। কোনো রাজ্য সরকারের সামান্যতম সাংবিধানিক অধিকার ই নেই কোনো বিদেশির ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিট সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সেটা একেবারে সম্পূর্ণ ভাবে কেন্দ্রের কাজ (বা দায়িত্ব)। তসলিমার তখন মাল্টিপ্ল এনট্রি X ভিসা ছিল। FRRO, অর্থাৎ দিল্লীর ফরেনার রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস X ভিসার সময়সীমা বাড়িয়ে ১০ বছর অবধি করতে পারতো তখন আবেদনকারীর পাসপোর্ট এর ক্যাটেগরি অনুযায়ী (তসলিমার তখন EU অর্থাৎ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পাসপোর্ট ছিল, যেটা ইস্যু করেছিলেন স্যুইস গভর্নমেন্ট), তবে তার জন্য সাধারণত মিনিস্ট্রি অফ হোম এফেয়ার এর অনুমোদন লাগতো। তবে ২০০৮ এর মুম্বই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পর এই X ভিসা বিষয়ক কড়াকড়ি অনেক বাড়ানো হয়।

    এগুলো রুটিন পদ্ধতি, বিদেশেও এভাবেই কাজ হয়, আমাকেও বিভিন্ন দেশে যখন থাকা এক্সটেন্ড করতে হয়েছে, এভাবেই ভিসা এক্সটেন্ড করতে হয়েছে সেইসব দেশের।

    বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে তসলিমা কে দেশ ছাড়তে বলা হয়, এবং ১৮ ই মার্চ ২০০৮ এ তসলিমা ভারত ছাড়তে বাধ্য হন কারণ তাঁর রেসিডেন্ট পারমিট মার্চ মাসে রিট্রাক্ট করে নেওয়া হয়। যদিও বলা হয় তাঁকে রেসিডেন্স পারমিট পরে আবার দেওয়া হবে, তবে একটানা নয়।

    বুদ্ধ সরকার নিশ্চয় তসলিমা কে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেনি?

    ২০০৭ এর কলকাতায় তসলিমা সংক্রান্ত ঘটনাবলী, অতএব, মোটেই একরৈখিক নয়। অত্যন্ত জটিল এক রাজনৈতিক কারেন্ট আন্ডারকারেন্ট এর ফলশ্রুতি। হোয়াটসএপ ইউনিভার্সিটি তে এই কদিন তাই যেভাবে ছড়ানো হচ্ছে বুদ্ধ তসলিমাকে তাড়িয়েছিলেন আর শুভেন্দু তাঁকে সাদরে ডেকে এনেছেন - সেটা যে কতখানি উদ্দেশ্যপ্রনোদিত প্রচার, সেটা বুঝতে যে কোনো যুক্তিবাদী মানুষের সামান্য অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

    মজার ব্যাপার হলো, ২০১৯ এ রেসিডেন্স পারমিট এর এক্সটেনশন এর জন্য আবেদন করে তসলিমাকে প্রবল ভুগতে হয়। তখন কিন্তু কেন্দ্রে মোদী সরকার।
    ২০১৯ এর ১৬ ই জুলাই সকাল আটটা পঞ্চান্ন মিনিটে তসলিমা টুইট করেন:

    I applied for the extension of my Indian residence permit. But no answer yet from the government. My permit will be expired on July 27.And i have to travel to UK to attend a rationalist conference on July 26. Hope Home Minister @AmitShah ji will grant me theresidence permit.

    এই টুইটে অমিত শাহকে ট্যাগ করা ছিলো। টুইট করার পরের দিন ফরেনার রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস থেকে তসলিমার কাছে এই মর্মে ফোন আসে যে মিনিস্ট্রি অফ হোম এফেয়ার তাঁকে মাত্র তিন মাসের ভিসা এক্সটেনশন দিয়েছে। অত্যন্ত অবাক হয়ে ১৭ ই জুলাই রাত এগারোটা আঠেরোতে তসলিমা টুইট করেন :

    Hon'ble @AmitShah ji,I sincerely thank u for extending my residence permit. But I'm surprised it's only for 3M. I apply for 5yrs but I've been getting 1yr extension.Hon'ble Rajnathji assured me I would get an extension for 50yrs.India is my only home.I'm sure u'll come to my rescue.

    এবং টাইমস অফ ইন্ডিয়া কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এর আগে, রেসিডেন্স পারমিট এর ব্যাপারে তসলিমা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন:

    I am flummoxed that the NDA government headed by Narendra Modi cancelled my one-year residence permit. The UPA government had forced me to leave India in 2008. But, even during those years they did not cancel my residence permit. They allowed me to come to Delhi to renew the permit on the condition that I left thereafter.

    এই ঘটনার সাত বছর আগে, তসলিমার কলকাতা কাণ্ডের পর, গুজরাটের ভাবনগরে এক নির্বাচনী সভায় এক ভদ্রলোক তাঁর ছাপান্ন ইঞ্চি বুক বাজিয়ে বলেছিলেন :

    If the Central government cannot look after her, send her to If the Central government cannot look after her, send her to to Gujarat. The people and government of Gujarat will look after her. I have the courage to protect her.

    ভণ্ডামি এবং মিথ্যাচারীতা যে ছাপান্ন ইঞ্চির শিরায় শিরায়, তা নতুন করে প্রমান করতে অবশ্য তসলিমা সংক্রান্ত এই ঘটনাবলীর প্রয়োজন নেই।

    ২০০৭ সালের কলকাতা তথা ভারতবর্ষের তসলিমা এপিসোড, ফলতঃ, মোটেই কোনো একরৈখিক এবং ক্যালকাটা সেনট্রিক লোক্যাল ঘটনা নয়। অত্যন্ত জটিল জাতীয় রাজনীতি এর সাথে জড়িত।

    গত কদিন ধরে যে হোয়াটসএপ বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণপন্থীদের প্রচার ছড়িয়ে পড়ছে বাম বুদ্ধ তসলিমা কে তাড়িয়েছিলেন আর বিজেপি শুভেন্দু তসলিমাকে আনলেন - সেটি যে কতখানি উদ্যেশ্যপ্রণোদিত, সেটি বুঝতে, সুতরাং, যুক্তিবাদী মানুষের এক মুহূর্ত লাগার কথা নয়।

    ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তসলিমার ভূমিকা কে আমরা কি ভাবে দেখবো?

    ২০০৭ এ, দ্বিখণ্ডিত নিয়ে সেই তুলকালামের সময়, তসলিমা, কলকাতা থেকে প্রকাশককে বলেন তাঁর আত্মজীবনীর দ্বিতীয়ভাগের কিছুটা বিতর্কিত অংশ তুলে নিতে। হিন্দুস্থান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে তিনি জানান :

    I have withdrawn some parts of my book Dwikhondito. Some said parts of the book were hurting the sentiments of the people. I hope after its withdrawal, there would be no more controversies … The decision to withdraw these parts from Dwikhondito is to prove that I never wanted to hurt the people’s sentiments. I hope now I will be able to live peacefully in India and Kolkata.

    আশ্চর্যের (বা ততটা আশ্চর্যের নয় একজন দ্বিচারীর জন্য), ওই এক ই বইয়ের ব্যাপারে আদালতে মামলা জেতার পর (যে ওই বই লিখে তিনি কোনো অন্যায় করেননি), দ্য টেলিগ্রাফ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তসলিমা জানান :

    If they had asked me to change or delete even one word as a precondition to lifting the ban, I would’ve gone to the Supreme Court. To me, changing two pages and changing one word is one and the same thing

    আত্মস্বার্থ দেখার জন্য, এবং প্রচার পাওয়ার জন্য এই দ্বিচারীতা তসলিমা বহুকাল ধরে করছেন। তসলিমা এককালে সাহসী, প্রতিবাদী চরিত্র ছিলেন, ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্রী, অবশ্যই আমার ও, ওঁর সাথে একবার এক ই ফ্লাইটে পাশাপাশি সিটে বসে লন্ডন গিয়েছিলাম বলে আমি এককালে শ্লাঘা বোধ করতাম। দুঃখের বিষয়, বর্তমানে উনি একজন নীতিজ্ঞানহীন ভন্ড। ভারতের ভিসা পাওয়ার জন্য নির্লজ্জভাবে হিন্দু মৌলবাদীদের তাঁবেদারী করেছেন, অথচ নিজেকে মুসলিম মৌলবাদী দের বিরোধিতা করে ধর্ম নিরপেক্ষ বলে প্রজেক্ট করেছেন। আমার কাছে যেহেতু মোল্লা আর বাবাজী দুটোই একইরকম শয়তানের ক্লাস, সেহেতু তসলিমা এখন দ্বিচারী। মানুষ হিসেবে ওঁকে আমি আর গুরুত্ব দি ই না।

    লেখিকা হিসেবে কোনোকালেই দিতামনা, কারণ ওঁর সাহিত্যকীর্তি এভারেজের ও নীচে, কিন্তু ওঁর সাহসীকতাকে বিপুল শ্রদ্ধা এবং সমীহ করতাম। তারপর ধীরে ধীরে উনি নিজেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভেবে সামাজিক জ্যাঠামশাই হয়ে উঠতে লাগলেন, সারমন অন দ্য মাউন্ট - কার কাকে বিয়ে করা উচিত সে ব্যাপারেও নিদান হাঁকতে শুরু করলেন (পরীমনি এপিসোড স্মর্তব্য) - সামাজিক মৌলবাদী হয়ে ওঠার তাঁর সেই শুরু। বর্তমানে উনি একেবারেই পলিটিক্যাল টেলিপাপেট। টেলিপাপেট অর্থাৎ দূরপুত্তলিকা, দূর থেকে আড়ালে যাকে পুতুলের মত কন্ট্রোল করা যায় - এই ইউনিক বাংলাটা কয়েন করেছিলেন অদ্রীশ বর্ধন তাঁর লেখা রূদ্ররোষ নামে প্রফেসর নাটবল্টু চক্রের উপন্যাসে, আটের দশকে কিশোরভারতী পূজাবার্ষিকী তে বেরিয়েছিলো সেটা|

    যে দক্ষিণপন্থীরা বিজেপি ওঁকে কলকাতায় ডেকে আনায় আপ্লুত হয়ে পোস্ট করছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এলো বলেই একজন পৃথিবীবিখ্যাত লেখিকা কলকাতায় আবার আসতে পারলেন, সেই নেটপ্রচারী দের কতজন ওঁর লেখা পড়েছেন সে ব্যাপারে আর কী ই বা বলবো - আমি তো চাই ওঁদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে তসলিমার সাহিত্যকীর্তি নিয়ে একাডেমিক তর্কে বসার, কিন্তু মুখোমুখি বসার, নেটে নয় - কারণ গুগল আর চ্যাট GPT র এই বাজারে সব মূর্খই দু মিনিটে পন্ডিত।

    আর যে সকল দক্ষিণপন্থী উদ্বাহু হয়ে ঘোষণা করছেন তসলিমাকে এনে তাঁরা মুক্ত চিন্তাকে সম্মান জানাচ্ছেন, তাঁদের সবিনয়ে হুসেনের শেষ জীবন কে মনে করিয়ে দিতে চাই। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জনজাগৃতি সমিতি (২০০২ এর অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠায় উৎসুক আল্ট্রা রাইট উইং, গৌরী লংকেশের হত্যায় যাদের বড় ভূমিকা আছে বলে মিডিয়ার একটা অংশ মনে করেন), আরএসএস এবং সমমনস্ক হিন্দু মৌলবাদীদের অত্যাচারে হুসেন কে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিতে বাধ্য হতে হয়েছিল ২০০৬ থেকে আমৃত্যু, লন্ডনে এবং দুবাইয়ে, এবং তিনি অনন্যোপায় হয়ে কাতারের সিটিজেনশিপ নিতে বাধ্য হন।

    হুসেন ছাড়া, গৌরী লঙ্কেশ, নরেন্দ্র দাভোলকর - ইত্যাদি বহু মুক্তমনার দুর্ভাগ্যজনক হত্যায় আল্ট্রা রাইট উইং হিন্দুত্ববাদীদের ভূমিকা এ বিষয়ে স্মর্তব্য।

    আর হ্যাঁ, মাত্রই কদিন আগে কবি মন্দাক্রান্তার Mandakranta Ssen, বহুবছর আগে লেখা কয়েকটি কবিতা প্রায় কবর খুঁড়ে তুলে এনে, কলকাতার হিন্দুত্ববাদী ভাইয়েরা তাঁর বিরুদ্ধে FIR করার কথা ঘোষণা করেছেন (করেও দিয়েছেন হয়তো এতদিনে) কারণ তিনি নাকি হিন্দু ধর্ম এবং দেবদেবীকে কলুষিত করে লেখালেখি করেছেন, তাঁকে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করার প্রতিজ্ঞা করেছেন।

    তসলিমার অ্যান্টি-ইসলাম লেখা মুক্তচিন্তা। কারা বলছেন? রাইট উইং হিন্দুত্ববাদীরা।

    বেশ বেশ
  • পাতা :
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন