• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  গপ্পো

  • রাজরক্ত (রহস্য গল্প) : ৫ম পর্ব

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | গপ্পো | ০২ জুলাই ২০২১ | ৬৬৫ বার পঠিত
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
    (৫) ‘নামে কিবা আসে যায়’? ২৭/০৩/ ২০০২ বেলা ১০টা

    হ্যাঃ, এই নাকি যুবরাজ। সঙ্গে গতকাল পরিচয় হওয়া রাজবাড়ির ড্রাইভার শান্তিরাম না থাকলে বুশশার্ট ও প্যান্ট পরা বছর চল্লিশের ভদ্রলোকটিকে যুবরাজ বলে ভাবতে কষ্ট হত। প্ল্যাটফর্মে বেশ ভীড়, তবে ফার্স্টক্লাস কোচের সামনে তেমন কিছু না। কালো কোট গায়ে কন্ডাকটরের সঙ্গে শান্তিরাম টিকিট দেখিয়ে কিছু কথা বলছিল। তারপর দেখি ঢোলা খাকি ইউনিফর্ম পরা কোচ অ্যাটেন্ড্যান্ট এসে দুটো স্যুটকেস-একটা বড়, একটা ছোট - শান্তিরামের কাছ থেকে নিয়ে কোচে তুলে দিল। এবার শান্তিরাম দুটো টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ওপরে গিয়ে রেখে এল। উনি এবার একটা স্টিলের কৌটো থেকে পান বের করে গালে পুরে কৌটোটা শান্তিরামের হাতে চালান করে দিলেন। আমি আমার ব্যাকপাক নিয়ে সিগ্রেট খেতে খেতে একটু দুর থেকে দেখছিলাম, মানে একটা কোচ এগিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সিগন্যাল সবুজ হোল, গার্ডের পতাকা নাড়া এখান থেকে চোখে পড়ছে। আমি মাপা পায়ে আরেকটা কোচ এগিয়ে গিয়ে উঠে পড়লাম।

    ভাবলাম, ট্রেন পরের স্টেশন উসলাপুর পেরিয়ে গেলে আমি ভেতর দিয়ে ফার্স্টক্লাসে পৌঁছে যাব, কারণ তার পরের স্টেশন ঘুটকুতে শান্তিরাম নেমে যাবে। তার আগে আমাদের পরিচয় হয়ে যাওয়া দরকার। যতটুকু দেখেছি যুবরাজ যৌবনের শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া একজন সাধারণ সুদর্শন ভদ্রলোক, তার বেশি কিছু নয়। আসলে আমি কি মাথায় পাগড়ি কোমরে তলোয়ার, গুরুগোবিন্দ সিংহের মত টিকলো নাক টানা চোখের কাউকে আশা করেছিলাম? সাত কিলোমিটার দূরের স্টেশন দেখতে দেখতে এসে গেল। আমি যথারীতি ফার্স্ট ক্লাস কোচের জি কেবিনে গিয়ে নক করলাম।

    দরজা খুলে শান্তিরাম ভেতরে নিয়ে গেল। উনি জানলার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলান। এই কেবিনে একটাই লোয়ার বার্থ, আমি অনেকটা দূরে দরজার দিকে ঘেঁষে বসে পড়লাম। শান্তিরাম দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল – "সাড়ে বারোটা নাগাদ আপনাদের লাঞ্চ; বড় ক্যারিয়ারটায় ওনার, ছোটোটায় আপনার। আমি ডিস্পোজেবল প্লেট বের করে দিচ্ছি, আপনি সময়মত সাজিয়ে দিয়ে ওপরে উঠে নিজের খাবার খেয়ে নেবেন। ওনার খাবার জানলার কাছে ট্রের ওপর রাখলেই হবে। আর এপাশে জলের ফ্লাস্ক। আপনার তো নিজের ফ্লাস্ক আছে দেখছি। খাবার পরে ওঁকে একটা ওষুধ খেতে হয়। সেটা আমি আপনাকে দিচ্ছি, ওকে খাইয়ে দেবেন। উনি যদি শুতে চান তাহলে আপনি ওপরে উঠে যাবেন। কেবিনের দরজা যেন লক করা থাকে। আর আপনি ঘুমোবেন না। তিনটে নাগাদ বুড়ার স্টেশন এসে যাবে। আপনি আগেই স্যুটকেসগুলো কোচ অ্যাটেন্ডান্টকে দিয়ে গেটের কাছে নিয়ে যাবেন, মাত্র দু’মিনিটের স্টপ। যুবরাজ বাহাদুরকে আপনি একটু ধরে ধরে নিয়ে যাবেন, প্ল্যাটফর্ম একটু নীচু। সাবধানে নামাবেন। সেখানে রাজওয়াড়ার লোকজন এসে যাবে। ব্যস্‌ আপনার দায়িত্ব শেষ। আমাদের গেস্ট হাউসে পৌঁছে এই নাম্বারে ছোট কুমারকে ফোন করে দেবেন"।
    এসব বলে ও একটা চিরকুট আর যুবরাজের টিকিট আমার হাতে ধরিয়ে দিল। তাতে দশ ডিজিটের একটা ফোন নাম্বার।

    পরের স্টেশন আসছে। ও কেবিন থেকে বেরোতে যাবে, এমন সময় কালো কোট পরা সেই কন্ডাক্টর ঢুকলেন। হাতে একটা লিস্টি ও ডট পেন। যুবরাজ সাহেবের দিকে বেশ সম্ভ্রমের সঙ্গে তাকিয়ে বললেন - কুমার বীরেন্দ্রপ্রতাপ সিং? আমি ইয়েস বলে আমাদের দু’জনের টিকিট চেক করতে দিলাম। যুবরাজ জানলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ভ্রূ কুঁচকে কন্ডাক্টরকে দেখছেন।

    ট্রেন ঘুটকু স্টেশনে থেমে গেছে। শান্তিরাম আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে গেটের দিকে দৌড়ল। বাঙালি কন্ডাক্টর বললেন — আপনি বিশ্বাস? যুবরাজ সায়েবের সেক্রেটারি? আমি হ্যাঁ বা না কিছুই না বলে শুধু দাঁত বের করলাম।

    কন্ডাক্টর বেরিয়ে যাচ্ছেন এমন সময় যুবরাজ বললেন - শুনিয়ে জরা।

    ভদ্রলোকের বুকে পাতলা তক্তি লাগানো - পি কে মজুমদার। উনি ফিরলেন - বোলিয়ে।

    - আপকে লিস্ট মে মেরা নাম ক্যা লিখা হ্যায়?

    একবার চোখ বুলিয়ে মজুমদার বললেন — বীরেন্দ্রপ্রতাপ সিং।

    -- গলত; মেরা নাম বীরেন্দ্রপাল হ্যায়, কুঁয়র বীরেন্দ্রপাল সিং; সুধার লীজিয়ে।

    - ম্যায় নহীঁ সুধার সকতা।

    -- নহীঁ সকতা কা ক্যা মতলব? গলতী কিয়ে তো সুধারোগে নহীঁ?

    - লেকিন ইয়ে লিস্ট কম্পিউটার সে বনা হ্যায়, ম্যায়নে কুছ নহী কিয়া।

    যুবরাজের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। উনি এবার ঠেট বোলিতে যা বললেন তার সার হলঃ

    ভুল তো রেলওয়ে করেছে, অতএব রেলের লোকই ঠিক করবে। এবং উনি ভুল নামে যাত্রা করবেন না। কনডাক্টর না মানলে উনি চেন টেনে ট্রেন থামিয়ে দেবেন। কনডাক্টর অসহায় ভাবে আমার দিকে তাকাল।

    আমি বললাম - ছোড়িয়ে না কুমার সাহাব। জানে দীজিয়ে। চেকিং তো হো গয়া।

    গর্জে উঠলেন যুবরাজ সাহাব - ‘কুমারসাহাব নহীঁ, যুবরাজসাহাব বোল। ও ছোটে কা নাম হ্যায়। ম্যায় হুঁ বীরেন্দ্রপাল। বোম্বাগড়ের এস্টেটের যুবরাজ। আমি কী করব না করব তুমি ঠিক করে দেবে? তুমি কে হে? অপনা অওকাত মত ভুলো!’

    আমার মটকা গরম হয়ে গেল। লম্বা করে শ্বাস নিলাম, এক থেকে দশ গুনলাম। তারপর বললাম, ‘ঠিকই বলেছেন যুবরাজসাহেব, আমি নাম ঠিক করিয়ে আসছি’। বলে কন্ডাক্টর মজুমদারকে ওনার সীটের দিকে নিয়ে যাচ্ছি তো যুবরাজ বললেন - ‘বেশি চালাকি কোর না। নাম কাটিয়ে ঠিক করে আমাকে দেখিয়ে যাবে’।

    এবার মজুমদারের ফর্সা মুখ লাল হবার জোগাড়। বিপদ বুঝে আমি ফিসফিসিয়ে মজুমদারকে বললাম - আপনার ট্রিপ্লিকেট লিস্টের কোন একটাতে ‘প্রতাপ’ কেটে ‘লাল-বাল-পাল’ যা বলছে করে দিন না, পরে আবার কেটে দেবেন। দেখছেন তো, একটু ছিটেল লোক।

    ঝামেলা মিটে গেল। যুবরাজ সাহেব শিশুর মত খুশি হয়ে উঠলেন। ‘তুমি তো বেশ কাজের ছেলে হে! বোস, বোস, একটু গল্প করি। বুঝলে, নামই হোল আসল। একটু নাম কামানোর জন্য মানুষ কী না করে? শেক্সপিয়র বলেছেন বটে নামে কিবা আসে যায়! ‘রোমিও-জুলিয়েট’ পড়েছ তো’?

    ঘন্টা পড়েছি, নামটা জানি - ওই গল্পটা বাংলায় পড়েছি। তবু বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ি। এই বোম্বাগড় কত শেক্সপিয়র পড়েছে আমার জানা আছে।

    ‘কিন্তু উনিই আবার ওথেলোর মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন - হি হু স্টিলস মাই পার্স, স্টিলস ট্র্যাশ; বাট হু স্টিলস মাই গুড নেম, স্টিলস অল! দেখছ তো, টাকাপয়সা সম্পত্তি এসব কিছুই নয়। আসল হোল নাম। সকাল সন্ধ্যে আমরা ভগবানের নামকীর্তন করি কিনা’?

    উরিত্তারা! এতো শেক্সপিয়র সত্যিই পড়েছে মনে হচ্ছে! এখানে বেশি খাপ খোলা ঠিক নয়। আমার দৌড় ল্যাম্বের শর্টকাটে বলা নাটকের গল্পের বই পর্য্যন্ত।

    গল্প জমে গেল। জানতে পারলাম ওঁরা আসলে ছত্তিশগড়ের ন’ন, রেওয়া অঞ্চলের। বুড়ার পড়ে শাহডোল জেলায়, ওখান থেকে রেওয়া অঞ্চল শুরু। আমি রেওয়া থেকে কোলকাতা ও ভিলাইয়ের চিড়িয়াখানায় আসা সাদা বাঘের কথা তুলি, উনি স্মিত হেসে সায় দেন। বলেন বুড়ারের এস্টেট ওর দাদীমার, মানে ঠাকুমার। ওনাদের বংশে কোন ছেলে নেই, তাই শ্বশুরবাড়ির প্রপার্টি আমার ঠাকুর্দা পেয়েছেন। ওঁর বাবা অনেক বাঘ শিকার করেছেন, ওদিকের জঙ্গলে অনেক চিতাবাঘ ও হায়েনা ছিল। যদি আরও দু’একদিন থাকি, তাহলে ওঁর তাউজি বা জ্যেঠুর বাড়ি শাহডোলে নিয়ে যাবেন। এবার উনি ছিন্নমস্তা দেবীর মাহাত্ম্য বলতে লাগলেন। আমিও আমার ছোটবেলায় ঠাকুমার থেকে শোনা দশমহাবিদ্যার স্তোত্র জানি বলে ফেললাম। বললাম, এটা বাংলায় গান করা হয়। উনি মহা উত্তেজিত, গেয়ে শোনাতে হবে। যত বলি, আমি গাইতে পারি না, তত ওনার চোখ লাল হতে থাকে, কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে যায়।

    বিপদ বুঝে আমি গাইতে শুরু করি, কিন্তু আমার যে নার্ভাস হয়ে কিছুই মনে পড়ছেনা। সোজা ছিন্নমস্তা থেকেই শুরু করে দিই — এই খ্যাপা বাংলা থোড়ি বুঝবে?

    ‘ষষ্ঠে ছিন্নমস্তারূপ ধারণ করিলে,
    নিজমুন্ড ছিন্ন করি করেতে ধরিলে’

    মরেছে, এরপরে?

    ‘সপ্তমে মা ধূমাবতী, অষ্টমে বগলা,
    নবমে মাতঙ্গীরূপ, দশমে কমলা’

    উনি আবার ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছেন। কিছু একটা গন্ডগোল করেছি বুঝতে পেরেছেন কি? এমন্ সময় চোখে পড়ল খোঙসরা স্টেশনে গাড়ি ঢুকছে।এখানকার মাটির ভাঁড়ের চা বিখ্যাত। আমি লাফিয়ে উঠি, যুবরাজ সাহেব, অনুমতি দিন আপনার জন্যে চা’ নিয়ে আসি। জি কেবিন থেকে গেট বেশ কাছে। আমি চটপট ফুটন্ত দু’ভাঁড় চা নিয়ে কেবিনে ফিরে আসছি, এমন সময় এক মহিলার ধাক্কায় আমার হাতের গরম চা’ ছলকে আমার প্যান্টে পড়ল। কিন্তু যা হোল তাতে আমার অ্যাড্রেনালিন বেড়ে গেল। আমাকে ঠেলে সরিয়ে কেবিনে ঢুকে পড়েছেন দুই মহিলা। বয়সে এরা যুবরাজের ছেয়ে একটু ছোট হবেন। সোজা ওনার কাছে গিয়ে ডাকছেন - যুবরাজ সাহেব! ও বীরেন্দ্রপ্রতাপজি! চিনতে পারছেন? আমাদের চিনেছেন? আমরা শৈবলিনী ও কুন্দনন্দিনী। চিনতে পারছেন না?

    সেরেছে! আমার ডিউটি যুবরাজ সাহেবের কাছে কাউকে ঘেঁষতে না দেয়া। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম দুশমন ব্যাটা পুরুষ হবে, নইলে কুমারসাহেব আমাকে লাইসেন্সড পিস্তলের কথা বলবেন কেন? এরা দেখছি নারী, তায় আবার যুবরাজের সঙ্গে বাংলায় কথা বলছে! যুবরাজ শেক্সপিয়রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও গুলে খেয়েছেন নাকি?

    কিন্তু আমাকে আশ্বস্ত করে উনি বলে ওঠেন - আপনারা কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না। হম বাঙলা সমঝতে নহীঁ, হিন্দি মেঁ বোলিয়ে।

    - শান্তিনিকেতনে পাঁচবছর পড়ে এখন বলছ বাঙলা বোঝ না? তাহলে বাংলায় নেমন্তন্ন করেছিলে কেন?

    ক্রুদ্ধ যুবরাজ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন - হোয়াট ডিড দে সে বিশ্বাস?

    দুই মহিলা চমকে আমার দিকে তাকালেন। আপনি বাঙালি? ইনি আপনার কে হন? কোনরকমে বলি যে আমি ওনার সেক্রেটারি।

  • ওদের দু’জোড়া চোখে আগুন ঝলসাচ্ছে। ওরা বলেন যে এই চিঠিটা দেখুন। দশবছর আগে শান্তিনিকেতনে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করে এখানে এসে যুবরাজ হয়ে এখন বলছে আমাদের চেনেনা! তাহলে ন্যাকামি করে এই চিঠি কেন? আবার গায়ে পড়ে অপমান কেন?

    আমি দু’পক্ষের সুবিধের কথা ভেবে ইংরেজিতে অনুবাদ করি। যুবরাজ দু’দিকে মাথা নেড়ে বলেন।

    “অনারেবল লেডিজ, ইয়ু আর আন্ডার সাম ডিল্যুশন। আই হ্যাভ নেভার বীন টু বেংগল অর শান্তিনিকেতন। মাই আলমা মাটার ইজ রাজকুমার কলেজ অফ রায়পুর। দ্য কলেজ এস্টাব্লিশড ফর চিল্ড্রেন অফ রয়্যাল ফ্যামিলিজ ওনলি। দেয়ার আই স্টাডিড ইংলিশ লিটারেচার, নট কেমিস্ট্রি । কীটস, শেলি, বায়রন, ম্যাথু আর্নল্ড; নো এফিমিনেট টেগোর, সরি’!

    আমি দুই যুযুধান পক্ষের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াই। বলি, দিদি, কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে।

    ওঁরা বিনা বাক্যবয়ে আমার দিকে বাংলায় ছাপা একটি চিঠি এগিয়ে দেন। আমি চোখ বুলিয়ে যুবরাজকে বলি - ভাল জট পেকেছে। এই চিঠিতে স্পষ্ট করে যুবরাজের নাম দিয়ে ছিন্নমস্তা পূজোয় এঁদের ডাকা হয়েছে আর এঁদের দু’দিনের থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা আপনার গেস্টহাউসে হবে সে’রকম বলা আছে।

    উনি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, "ঠিক আছে, আমার এস্টেটের তরফ থেকে যখন ডাকা হয়েছে এঁরা চলুন, পূজো দেখুন, সব ব্যবস্থা আমার ম্যানেজার করে দেবে। কিন্তু আমাকে যেন বিরক্ত না করেন, সরি"।

    আমি হাতজোড় করি, বলি আপনারা এবার যান। বুড়ারে দেখা হবে।ওঁরা আমাকে বললেন - ফুর্সৎ পেলে আগে আমাদের বি’ কেবিনে আসতে পারেন। আমরা এই কোচেই আছি।

    একটা চা’ ওদের ধাক্কায় পড়ে গেছল। বাকিটা যুবরাজকে দিলে উনি বল্লেন - আমি কফি খাই। এটা তুমি খেয়ে ফেল’।

    এরপর আর বলার মত কিছু ঘটেনি। একটু পরে পেন্ড্রা রোড ষ্টেশন এলে আমরা খেতে বসলাম। অবশ্যই আমি উপরে, উনি নীচে। তারপর শান্তিরামের দেওয়া কৌটো থেকে ওনাকে ওঁর ওষূধের কালো বড়ি এবং জলের গেলাস এগিয়ে দিই। এবার কেবিনের দরজা লক করে আমি আপার বার্থে চড়ে একটা কর্নেল রঞ্জিতের জাসুসি বা ডিটেকটিভ উপন্যাস খুলে বসি।

    যুবরাজের বোধহয় দুপুরে একটু ঝিমোনর অভ্যেস আছে। গায়ে একটা চাদর টেনে শুয়ে পড়েছেন, চোখের পাতা বোঁজা।

    তার আগে ওনাকে সঙ্গে করে বাথরুম নিয়ে গেছি। (শালা! এর পরে মুখে সুঁ-সুঁ শব্দ করে ওনাকে ছোটবাচ্চার মত বাকিটাও করাতে হবে নাকি!)

    তবে সাবধানের মার নেই। তাই কেবিনের দরজা টেনে দিয়েছিলাম এবং অ্যাটেন্ডেন্টকে দেখতে বলে গেছলাম। ওকে একশ’ টাকা দিই নি। একটা দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে দুজনে মিলে খোলা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সিগ্রেট ফুঁকে নিলাম। জব সাঁইয়া ভয়ে কোতোয়াল তো ডর হ্যায় কিসকা? কনডাক্টর মজুমদারকে আগেই দুটো সিগ্রেট গছিয়ে এসেছি।

    এসে গেল বুড়ার স্টেশন। দশ মিনিট লেট। নির্দেশ মত মালপত্তর অ্যাটেন্ড্যান্টের সাহায্যে নামিয়েছি, আর নিজে যুবরাজকে তুলোয় শোয়ানোর মত যত্ন করে প্ল্যাটফর্মে নামিয়েছি কি দেখি দুই দিদি অন্য গেট দিয়ে নেমে ইতিউতি চাইছেন।

    তিনজন লোক এগিয়ে আমার থেকে যুবরাজ সাহেবের স্যুটকেস ইত্যাদি নিয়ে নিল। আমি একটু ইতঃস্তত করছি এমন সময় হাজির ড্রাইভার শান্তিরাম - আমাদের মুশকিল আসান। আমি অবাক।

    ‘ভাই, তুম কহাঁ সে? তুমি তো বিলাসপুরের কাছের ঘুটকু স্টেশনে নেমে গেছলে না’? শান্তিরাম হাসে, তারপর খোলসা করে যে ও নেমে গিয়ে তিনটে কোচ পরের স্লীপারে উঠে এক ঘুম মেরে দিয়েছে। ওই টিকিট আগে থেকে কাটা ছিল, যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে ও যুবরাজের সঙ্গে যাচ্ছে।

    ও চার্জ নিতেই সব সহজ হয়ে গেল। যুবরাজ যাবেন একটা মারুতি জিপসী্তে, চালাবে শান্তিরাম। আমি ও দুই বাঙালি দিদি যাব টাঙায় চড়ে, সঙ্গে স্টেশনে আসা তিনজনের একজন, গেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার।

    সুন্দর জায়গা বুড়ার। নীলপাহাড়ের সারি আর সবুজে সবুজ। টাঙা এসে থামল গেস্ট হাউসে, যেন শোলে সিনেমার ঠাকুরের হাভেলি। কিন্তু গেস্টহাউসটি সরকারি বাংলোর স্টাইলে তৈরি। দুটো রুম, একটা সিংগল বেড, আরেকটা ডাবল বেড। দুটো রুমের মাঝখানে ডাইনিং হলে দুদিক দিয়েই ঢোকা যায়। পেছনের বারান্দা থেকে নেমে খানিকটা খোলা যায়গা, তারপর কেয়ারটেকারের রান্নাঘর এবং থাকার ঘর। আঙিনার একপাশে একগাদা কাঠ ডাঁই করে রাখা, বুঝলাম সব জঙ্গল থেকে কেটে আনা। বড় রুমটায় দুই দিদি আর ছোটটায় আমি। আসবাবপত্র মেহগনি কাঠের, দামি নেটের মশারি। তবে বাথরুমে গ্লেজেড টাইলস, এবং ভালো কমোড।কিন্তু জলের লাইন নেই। পেছনে টালির ঘরে কেয়ারটেকার সপরিবারে থাকে। ওরাই রান্না করে দেবে এবং সকাল সন্ধ্যে চার চার বালতি জল প্রত্যেক বাথরুমে দিয়ে দেবে।

    ঘরদোর সকালে পরিস্কার করা হয়েছে।ওরা জানতে চাইল চান করব কিনা? আমি ভাবলাম অবেলায় হাতমুখ ধুয়ে কাজ চালিয়ে নিই। আরও বলল যে সকালে চানের জন্যে গরম জল করে দেবে। বিকেল পাঁচটায় চা-জলখাবার এবং রাত আটটায় রাত্তিরের খাবার। তারপর ন’টা নাগাদ ওরা শুয়ে পড়ে। আমরা যদি ছিন্নমস্তার মন্দিরে পুজো দেখতে যাই তবে যেন রুমে তালা লাগিয়ে চাবি নিয়ে যাই।

    আমি হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় লম্বা হয়ে গোয়েন্দা উপন্যাসে মন দিলাম। দেখতে দেখতে চোখ বুঁজে এল, সেই সাত সকালে উঠেছিলাম বটে!

    গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গিয়ে দেখছি কোসলে স্যার। আমার সঙ্গে বাঙলায় কথা বলছেন। আমাকে ধাঁধা জিজ্ঞেস করছেন, তাও বাংলায়!

    - দেখ বিশ্বাস, যদি এই ধাঁধাটা সল্ভ করতে পারিস তো তুই মাঝারি মাপের ডিটেকটিভ, কর্নেল রঞ্জিতের উপন্যাসের সোনিয়ার মত।

    আমি ভ্যাবাচ্যাকা খাই। স্যার শুরু করেনঃ

    “শাড়ি কে পিছে নারী হ্যায় কি নারী কে পিছে শাড়ি হ্যায়?
    শাড়ি হ্যায় কি নারী হ্যায়, ইয়া নারী হ্যায় কি শাড়ি হ্যায়”?

    ‘শাড়ির আড়ালে নারী, নাকি নারীর আড়ালে শাড়ি?
    একি শাড়ি নয়কো নারী? নাকি নারী নয়কো শাড়ি’?

    সস্‌লা; এসব ভাবতে ভাবতে আমার পেকে যাবে যে দাড়ি!

    চুপ করে থাকি।

    --কীরে পারলি নাতো? কোন স্কুলে পড়েছিলি?
    --উমম্‌ এতো কোন অলংকারের উদাহরণ - বিপ্রতীপ না কি যেন? ক্লাস টেনে হিন্দি সাহিত্যের ক্লাসে পান্ডে স্যার বলেছিলেন। এসব আবার ধাঁধা কী করে হয়?

    আমার তো লাল সূতো নীল সূতো বেরিয়ে গেছে।

    -তুই মানা রিফিউজি ক্যাম্পে বাংলা স্কুলে পড়েছিস বুঝতে পারছি। তাহলে এই দুটো বাংলা ধাঁধা বল দেখি।

    আর যদি এগুলো সল্ভ করতে পারিস তাহলে তুই তোদের কে যেন আছে না – আরে বাঙালি ডিটেকটিভ, কী মিটার যেন? ট্যাক্সির মিটার না।

    --আরেঃ পি সি মিটার, মানে ফেলুদা!
    --গুড, এবার ধাঁধা দুটোর উত্তর বলঃ আঃ ফচকেমি করিস না।

    ‘চাঁদ চাঁদনি চন্দ্রধর, চন্দ্রকান্ত নাকেশ্বর’! আর এটাও বলতে হবেঃ হরির উপরে তায় হরি বসেছিল, হরিকে দেখিয়া হরি হরিতে লুকাইল’।

    মরেচে! এইসব বেয়াড়া ধাঁধাঁটাধা আমার কম্ম নয়। তবু চেষ্টা করতে হবে। যদি পেরে যাই তো স্যারকে বলব আমার মাইনেটা একটু বাড়িয়ে দিতে। গত বছরে সিমরনের বেড়েছে, আমার কোন ইনক্রিমেন্ট হয়নি।

    কিন্তু দরজায় কে খটখট করছে? ধেত্তেরি! একটু দাঁড়াতে পারে না? আগে পরের ধাঁধাঁটা সল্ভ করি। হরির উপরে হরি? কোথায় যেন পড়েছিলাম। কিন্তু দরজার খটখট এখন দুম দুম আওয়াজ।

    আমার চোখ খুলে গেছে। ঘরে অন্ধকার নেমেছে। আমি বালিশের তলা থেকে রিভলবার করে পকেটে গুঁজে নিই। তারপর দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি-হু ইজ দেয়ার? কৌন হ্যায়?
    | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০২ জুলাই ২০২১ | ৬৬৫ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন