• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  গপ্পো

  • রাজরক্ত (রহস্য গল্প) : ১৫শ পর্ব

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | গপ্পো | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৪৬৬ বার পঠিত
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
    সৌরভ (আট ঘন্টা আগে) ১০ই এপ্রিল, সোমবার বেলা দুটো

    এক ঘুম দিয়ে উঠলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, মাত্র তিন ঘন্টা ঘুমিয়েছি। ঘুমটা ভেঙেছে খিদের চোটে। কাল রাত জাগরণ, তায় পাঁচ ছ’ ঘন্টা জার্নি করে বুড়ার থেকে বিলাসপুর এসে চা খেয়ে বিছানায় ডাইভ মেরেছিলাম। কিন্তু উত্তেজনার চোটে ঘুম আসছিল না। বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে আমার চোখের সামনে এতসব ঘটনা ঘটেছে। ভাবছিলাম যে আজকের দিনটা ছুটি পাব, সারাদিন বিছানায় গড়িয়ে আর ল্যাদ খেয়ে কাটাব। কিন্তু কোসলে বুড়ো শুনলে তো? ন’টার সময় ফোন করে বলল – তোর ডিউটি মনে আছে তো? শান্তিরাম ওঁরাওয়ের তেলুগু নোটবইটার পাঠোদ্ধার হয়ে গেছে। যা ফরেনসিক অফিসে, সাইনি ম্যামের থেকে ওটা নিয়ে দু’সেট কপি করিয়ে এক কপি আমার জন্যে অফিসে সিমরনের কাছে ছেড়ে দিবি। ফের তোর সেট বগলদাবা করে ঘরে যাবি। খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নে। তারপর উঠে কিছু খেয়ে ওটা খুঁটিয়ে পড়বি, নোটস নিবি। ট্রাই টু রীড বিটউইন দ্য লাইনস্‌। আজ অফিসে আসতে হবে না। কাল আমরা অফিসে বসে ফাইনাল নোটস বানাব।

    আমার কানে খট করে লাগল শব্দটা — ‘ফাইনাল’ নোটস্‌?

    -- আচ্ছা স্যার, ‘ফাইনাল’ নোটস্‌ কেন বললেন? কেসটা কি সলভ্‌ হয়ে গেছে?

    -- ধ্যাৎ তোর মত অ্যাসিসট্যান্ট থাকতে এত তাড়াতাড়ি? আসলে পরশু দিন মিল বৈঠেঙ্গে সব দিওয়ানে, মেহফিল জমায়েঙ্গে তব না!

    পরশুদিন যত পাগল প্রেমিক সব মিলে গ্যাঞ্জাম করব, ঠেক গরম করব, তবে না?

    -- কিন্তু কোথায় স্যার?

    -- আরে পরিহার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস এর অফিসে। সবাই আসবে, রাজপরিবার, আলোয়ার থেকে বড়ী রাণীসাহিবা দেবেন্দ্রকুমারী। কারণ সেদিন ওখানে উইল নিয়ে কথা হবে। নতুন করে ভাগ-বাঁটোয়ারা হবে। রাজ্যাভিষেকের দিনক্ষণ ঠিক হবে। তাই ওদের কুলপুরোহিত ছিন্নমস্তা দেবীর পূজারী শ্যামানন্দ মহারাজও থাকবেন।

    আর ভরা মেহফিলে আমরাও হাজির হব, দেখি বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে কিনা! সেসব কথা কাল হবে। এখন আজকের কাজটা মন দিয়ে করিস।

    -- আপনি কোথাও যাচ্ছেন কি?

    -- যাব একবার, আমার ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান প্রাণলাল মেহতার কাছে, শরীরটা ঠিক জুত লাগছে না। বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে। এখন এত কাজ, জ্বর এলেই চিত্তির!

    যাই হোক, এখন আমার সামনে বিছানায় রাখা আছে ওই জিলিপি অক্ষরের ৩৭ পাতার পাশাপাশি হিন্দিতে বেয়াল্লিশ পাতার অনুবাদ। আগে কিছু খেয়ে নেব। ভাতে ভাত আর ডিমসেদ্ধ চাপিয়েছি, খেয়ে নিয়ে কোমর বেঁধে লেগে পড়ব।

    তার আগে কাল রাত্তিরে যা যা ঘটেছে সব তিনবার দেখতে যাওয়া সিনেমার মত রিওয়াইন্ড করে মনের পর্দায় আর একবার দেখে নিই ।

    হাসপাতালের মর্গের হিমশীতল কুঠুরির একটা ড্রয়ার থেকে বেরিয়ে আসা একটা হাত, কাঁধের কাছ থেকে যেন করাত দিয়ে কাটা, হাতের পাঞ্জায় খানিকটা চিবোন অংশ আর দুটো, না না আড়াইটে আঙুল — কেনি এবং বুড়ো আঙুলের গায়ে পড়া একটা বাচ্চা আঙুল। তবে হাতে একটা আঙটি ছিল না? হ্যাঁ, সেটা ছিল অনামিকায়। তাই গায়েব। তখন এতসব ভাবি নি। হাসপাতালে বাগানে একটা কদম গাছের তলায় গিয়ে বমি করেছি। বেশ, তারপর?

    জিপসিতে উঠে আমরা ফিরে এলাম, মন্দিরের কাছে। সেখান থেকে পুকুরের পাড় ও ছাগলছানা বাঁধা গাছটা দেখা যায় না, খালি আন্দাজ করা যায়। স্যার আমাকে পূজারী মহারাজের পাশে বসে অপেক্ষা করতে বলে নিজে জীপে বসে অন্ধকারে হাওয়া হয়ে গেলেন। পূজারী মহারাজ আমায় একটা কাঁসার লোটায় করে জল খাইয়ে মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন।

    কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হল? তা’প্রায় ঘন্টাখানেক। কিন্তু কুমীরশিকার যেমন ভেবেছিলাম তেমন কিছু হল না। আমি বোধহয় দেয়ালে পিঠ দিয়ে ঢুলছিলাম। রাত্রির সন্নাটা চিরে হঠাৎ ছাগলছানার ম্যা-ম্যা আর্তনাদ, আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। কানখাড়া করে আছি, তিনটে গুলির শব্দ – তেমন জোরালো নয়, একটু চাপা আওয়াজ। ইকবাল ভাই কোন হান্টিং রাইফেল নিয়ে এসেছেন কে জানে?

    তারপর একটা ঝটাপটি জলে কিছু একটা ঝপাৎ, লোকজনের হাঁকডাক। আমি নড়ি নি।

    একটু পরে কোসলে স্যার এসে হাজির। পূজারীজির দিকে অর্থপূর্ণ মাথা নেড়ে বললেন — কাম হো গয়া, অব হমলোগ লৌটেঙ্গে।

    আমাকে ইশারা করে বললেন-চল। আমরা পুকুরের পাড়ে গিয়ে দেখি এলাহি ব্যাপার। কুমীরটাকে দড়ি বেঁধে চারপাঁচ জন জোয়ান বড় কালো ডগগার কাছে নিয়ে এসেছে, এবার পেছনের ডালা খুলে যেই ওপরে তুলতে যাবে অমনই লেজট একটু নড়ে উঠল। ব্যস্‌ তিনটে জোয়ান কুমীরটাকে মাটিতে ধপ করে ফেলে লাফিয়ে সরে গেল।

    কোসলে স্যারের মুখ থেকে একটা প্রাকৃত গালি বেরিয়ে এল। ইকবাল ভাই এগিয়ে এসে ঘড়িয়ালের বডিতে হাত ছুঁইয়ে বললেন — ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ও অনেকক্ষণ আগে মারা গেছে। শরীরের পেশিতে একটু খিঁচুনি খানিকক্ষণ থাকে। চল, আমিও হাত লাগাচ্ছি।

    ঘড়িয়ালের বডি গাড়িতে উঠল, এবার আমাদের তিন গাড়ির কাফিলা রওনা দেবে। আগে আমাদের জিপসী, পেছনে দুটো কালো ডগগা। প্রথম ডগগাটায় ঘড়িয়ালের বডি, একটা তেরপল দিয়ে ঢাকা দেয়া। তার বেশির ভাগ জওয়ান গাদাগাদি করে শেষের ডগগায় বসেছে। শাহডোলের ও বুড়ারের থানেদার কোসলে স্যার ও ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদায় জানানোর আগে অনেক ধন্যবাদ দিল। ওদের একটা বড় মাথাব্যথা দুর হয়েছে। দ্বিতীয় কাজটি হল কাল দিনের বেলায় কাটা হাতটি অ্যাম্বুলেন্সে করে পুলিশ এসকর্ট দিয়ে বিলাসপুরে পাঠানো।

    কিন্তু আমাদের বোম্বাগড় বা বুড়ার থেকে প্রস্থান এত সহজে হল না। গাড়িগুলো সবে ঘ্যাড় ঘ্যাড় করে স্টার্ট নিচ্ছে, কালো ধোঁয়া ছাড়ছে- এমন সময় জনাকয়েক সঙ্গী নিয়ে হাজির হলেন কুমারসাহেব। মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে স্পষ্টই বিরক্ত। কোন ভণিতানা করে সোজা কোসলে স্যারের থেকে জানতে চাইলেন ইয়ে সব ক্যা হো রহা হ্যায়? শ্রাদ্ধের কাজ শেষ হওয়ার পর চব্বিশ ঘন্টাও পেরোয় নি, ওঁর আত্মা এখনও এখানকার মায়া পুরোপুরি কাটাতে পারেনি। এর মধ্যেই বন্দুকের আওয়াজ? রাজবাড়ির এলাকায় শিকার খেলনে কে পহলে রাজা কী অনুমতি লেনা চাহিয়ে থা কি নেহীঁ?

    কোসলে স্যার শান্তভাবে বললেন — এখানে আমরা কোন শিকার খেলতে আসি নি। থানার রিপোর্ট পেয়ে নরখাদক কুমীরকে মারতে এসেছিলাম। এরজন্য বিলাসপুরের ফরেস্ট কনজার্ভেটরের অনুমতি যথেষ্ট।

    -- বেশ, সেটাই দেখান।

    কোসলে হাসলেন।

    -- আপনি সত্যিই দেখতে চান। তাহলে কাল দিনের বেলায় অফিস খোলার পর শাহডোলের ডিস্ট্রিক্ট ফরেস্ট অফিসারের অফিসে গিয়ে কপি নেবেন। ওখানে জমা করে দিয়েছি।

    কুমারসাহেবের গলার স্বর আরও এক পর্দা চড়ল।

    -- সে আমি ঠিক দেখে নেব। কিন্তু আপনি এই ঘড়িয়ালের বডি এভাবে নিয়ে যেতে পারবেন না। ও হোল ব্রহ্মরাক্ষস, অম্ততঃ আমাদের প্রজাদের সেটাই বিশ্বাস। এখানে আমরা তার বিধিবৎ অন্তিম সৎকার করব।

    -- সরি, এ এক খুনি আসামী। এর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। এনকাউন্টারে মারা গেছে। বিলাসপুরে এর বডির পোস্ট মর্টেম হবে। রিপোর্ট তৈরি হবে। তারপরে আপনাদের বডি সুপুর্দ করা হবে। ক’টা দিন অপেক্ষা করুন।

    কিন্তু কুমারসাহেব আমাদের জীপের বনেটের সামনে থেকে নড়ছেন না; সঙ্গে আধডজন চ্যালাচামুন্ডা। উনি কী চান?

    এগিয়ে এলেন শাহডোল ডিস্ট্রিক্ট থানার অফিসার।

    -- কুমারসাহেব, আপ তো সমঝদার হ্যায়, কাহে এইসন লফড়া খাড়া কর রহেঁ হ্যাঁয়? সরকারী কাম মেঁ বাধা মত ডালিয়ে। সামনে সে হট জাইয়ে, প্লীজ!

    আমরা রওনা দিলাম।

    বুড়ার জনপদের সীমানার বাইরে পাকা রাস্তায় উঠতেই আমাদের বসের ইশারায় পুরো কাফিলা চলার গতি কমিয়ে দিল। আরও এক কিলোমিটার এগিয়ে একটা পলাশ গাছ। সেখানে এসে জিপসী দাঁড়িয়ে গেল, যদিও ইঞ্জিন বন্ধ হয়নি। বস্‌ দেখি ইতিউতি তাকাচ্ছেন যেন কিছু খুঁজছেন, আবার ঘড়ি দেখছেন এই অন্ধকারে। ব্যাপারটা কি?

    আরও মিনিট তিন, বস্ কি একটু অস্থির হচ্ছেন? গাড়ি থেকে নেমে ডানদিকের জঙ্গলের দিকে মুখ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু হঠাৎ পলাশ গাছের পাশে অন্ধকার নড়ে উঠল। গায়ে কাঁথা ও চাদরে মুখ ঢাকা দুজন এগিয়ে আসছে। একজনের হাইট একটু কম। সে অন্যজনের গায়ে প্রায় লেপ্টে রয়েছে । আমার টেনশন বাড়ছে, স্যার নির্বিকার। ওরা স্যারের কাছে এসে দাঁড়াতেই স্যার প্রথমজনকে নীচু গলায় বললেন — আপ হমারে গাড়িমেঁ আইয়ে, পিছে সৌরভকে সাথ বৈঠ জাইয়ে। দ্বিতীয় জনকে বললেন — তুম তিসরি গাড়ি মেঁ বৈঠ জাও। একজন সিপাহীকে বললেন - ইসকো তুমলোগোঁকে পিছে চাদর ওড়াকে রাখ। একদম তুমহারে আড় মেঁ।

    একে তোমাদের গাড়িতে সবার পেছনে চাদর মুড়ে বসাও। যেন পুরোপুরি তোমাদের আড়ালে থাকে।

    প্রথমজন আমার পাশে এসে চুপচাপ বসে পড়ল, অন্ধকারে চাদর মুড়ি দেয়া মুখ। জিপসি চলতে শুরু করল। এই পান্ডববর্জিত রাজ্যে রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো নয়। অন্ততঃ কুড়ি কিলোমিটার এভাবেই চলার কথা। একটু পরে ঝাঁকুনি লাগতেই পাশের সহযাত্রীটি আমার দিকে টাল খেয়ে হাত ধরলেন। কিন্তু উনি হাত ছাড়ছেন না, বরং আমার হাতে ওনার চাপ বাড়ছে। আমি হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতেই উনি আরও জোরে চেপে ধরলেন। আমি অবাক, ওনার হাত তিরতির করে কাঁপছে।

    এমন সময় গাড়ি থামাতে হোল। কারণ রাস্তা আটকে তিরধনুক, লাঠিসোঁটা নিয়ে অন্ততঃ কুড়িজন আদিবাসী মানুষ আমাদের রাস্তা আটকেছে। তাদের নেতৃত্বে রয়েছে যে লোকটা তাকে আমরা কোথাও দেখেছি বলে মনে হল না।

    কী ব্যাপার?

    উত্তেজিত গ্রামবাসীরা কোন কথা বলছে না। শুধু বাগিয়ে ধরা হাতিয়ারে ওদের মনোভাব স্পষ্ট।

    স্যার গাড়ি থেকে নামেন নি, আমাদেরও নামতে বারণ করলেন।

    কিন্তু পেছনের কুমির বওয়া কালো গাড়ি থেকে নেমে এসেছে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর, তার দুপাশে দুই বন্দুকধারী।

    রাস্তা আটকেছ কেন? কী চাও?

    আমরা আমাদের গুরু মহারাজকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছি। তোমরা বদমাশি করে ওঁকে গেরেফতার করে বিলাসপুরে নিয়ে যাচ্ছ, জেলে আটকে রাখবে?

    তুমি কে?

    আমি কলেশরাম, শাহডোলের রয়্যাল টিম্বার মিলের ম্যানেজার।

    শোন, এসব মিথ্যে কথা। আমরা কোন গুরু মহারাজকে গ্রেফতার করিনি। এবং জোর করে কাউকে নিয়ে যাচ্ছি না। এবার রাস্তা ছাড়।

    ঝুঠ! সফেদ ঝুঠ! আমরা রাজোয়ারা থেকে খবর পেয়েছি যে তোমরা আমাদের পূজ্য গুরু মহারাজকে ধরে নিয়ে যাচ্ছ, যাতে উনি দু’দিন পরে আমাদের কুমারসাহেবের অভিষেকে সামিল না হতে পারেন। তুমলোগ কুমারসাহেবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ। ভালয় ভালয় গুরুমহারাজকে ছেড়ে দাও, নইলে আমরা তোমাদের তিনটে গাড়ি জ্বালিয়ে দেব। চারপাশের সব গ্রাম খেপে আছে। ওরা শিগগিরই তোমাদের গাড়ি ঘিরে ফেলবে।

    এইবার জিপসি থেকে নামলেন কোসলে স্যার। শান্ত কিন্তু উঁচু আওয়াজে বললেন — কে তোমাদের গুরু মহারাজ?

    -- ছিন্নমস্তা মন্দিরের পূজারী শ্যামানন্দজী মহারাজ।

    আমার পাশে কম্বল নড়ে উঠেছে। আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে নেমে পড়েছে লোকটি। খুলে ফেলেছে তার মাথামুখে জড়ানো ফেট্টি।

    -- তোমরা ভুল শুনেছ, কেউ আমাকে জোর করে বন্দী করে বিলাসপুর নিয়ে যাচ্ছে না। আমার তবিয়ত কদিন ধরে ঠিক নেই। বারবার দাস্ত হয়ে দুর্বল লাগছে। রাত্রে মাঝে মাঝে জ্বর আসছে। একর বর মেহন সাহাবমন লা বিনতি করেহন কি বিলাসপুর জায়েকে সময় মহুলা সঙ্গ লে জাও, ওঁহা বড়ে ডাগদর দিখানা হ্যায়।

    এইজন্যে আমি নিজেই সাহাবদের বিনতি করেছিলাম যেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে যান। আমি বিলাসপুরে বড় ডাগদর দেখিয়ে তাড়তাড়ি সুস্থ হতে চাই।

    শোন আমার পন্থের ভগতেরা! এই দেখ, আমি শ্যামানন্দ মহারাজ তোমাদের সামনে দিব্যি দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমি না চাইলে আমাকে কেউ কোথাও নিয়ে যেতে পারে না। আরও শোন, পরশুদিন রাজ্যাভিষেক বিলাসপুরে হবে। আমি সেই পূজোয় পৌরোহিত্য করব। কারও ষড়যন্ত্র সফল হবে না। এখন তোমরা ঘরে যাও, রাস্তা ছাড় — আমি বলছি।

    বোল – ছিন্নমস্তা বজ্রবারাহী দেবী কী জয়!

    ভকতদের জয়ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে রাত্রির থমকে যাওয়া হাওয়া, গাছেরাও যেন নড়ে চড়ে বসে। কলেশরাম বাদে বাকি জনতা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে মাটিতে, মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করছে তাদের গুরু মহারাজকে। উনি বরাভয় মুদ্রায় হাত তুলে সবার উদ্দেশে আশীর্বাদ বিলোতে থাকেন। এবার কলেশরাম এসে ওনার পা ছোঁয় — কুছু দয়া দৃষ্টি রাখিহ মহারাজ। হামনলা ভুলিহ ঝন।

    দয়াদৃষ্টি রেখো গো ঠাকুর, আমাদের ভুলে যেওনা যেন!

    উনি স্মিত হেসে হাত ওর মাথায় রাখেন। তারপর গাড়িতে উঠে বসেন। এরপর আমাদের বিলাসপুর পৌঁছতে কোন অসুবিধে হয় নি।

    গাড়ি সোজা গিয়ে থামে এসপি অফিসে। তখন সকাল সাড়ে ছ’টা। শ্রীবাস্তবজি বোধহয় আগে খবর পেয়েছিলেন। তাই সাতসকালে অফিসে হাজির ছিলেন। ওনার নির্দেশে দু’জন পুলিশ একটা প্রাইভেট গাড়িতে করে শ্যামানন্দ মহারাজকে গভর্নমেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গেল।

    আমরা যে যার ডেরায় ফিরে গেলাম। ততক্ষণে রাস্তার ওপারে ফুটপাথের চায়ের দোকান খুলে গেছে। কাঁচের গেলাসে আদা দেওয়া ফুটন্ত দুধ-চা, একেবারে গায়ের ব্যথা সারিয়ে দিল। কড়াই থেকে নামছে গরম সামোসা আর তাজা কড়ক জিলিপি। এক এক প্লেট সাঁটিয়ে যেন ধড়ে প্রাণ এল। এবার টের পেলাম যে কোসলে বুড়োর পাল্লায় পড়ে কাল রাত থেকে না খেয়ে আছি। অবশ্যি ছিন্নমস্তা দেবীর মন্দিরের নকুলদানা পেটে গেছল বটে।

    এরপর বাসি জামাকাপড় কেচে স্নান করে নিলাম। হ্যাঁ, এখন ঘুম আসছে, যেন আষাঢ় মাসের পাগলা মেঘের ঢেউ। আর চোখ খোলা যাচ্ছে না। তখনই বসের ফোন, ফরেনসিক অফিসে যাও, ঘুমটুম তার পরে। এঁর কি কোন ইমান ধরম নেই?

    সে যাকগে, ফরেনসিক অফিসে গিয়ে শান্তিরাম ওঁরাও নামক নিরুদ্দেশ বা গুমশুদা আদমীর মূল ডায়েরি ও তার হিন্দি ও ইংরেজি অনুবাদের দুটো সেট নিয়ে উঠে পড়লাম। ইংরেজি অনুবাদ তো অফিসের তেলুগু মেয়েটির মানে মিস চারলুর, কিন্তু হিন্দিটা? লাজুক হেসে সাইনি বলল ওই করেছে। আমাকে এখন ঘুমুতে হবে, নইলে চোখে অন্ধকার দেখছি। তাই কফির ও একটু আড্ডার অফার এড়িয়ে গেলাম।

  • কিন্তু ভগবানের ইচ্ছে অন্যরকম। দরজায় কারও ছায়া পড়েছে। বস্‌ স্বয়ং। মাগো, কেন যে এই লোকটার কাছে চাকরি করছি?

    -- ভয় পাস না। আমি একটা ছোট্ট কাজে এসেছি। তুই চাইলে বাড়ি যেতে পারিস। কিন্তু কফি খাওয়া হয়ে গেছে? আমি বিষণ্ণ হাসি। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে!

    -- শিপ্রা, থোড়া সা মদদ চাহিয়ে। আমারও শরীরটা ভাল নেই, ডাক্তারের কাছে যাব, কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি। ভাল করে ভেবে উত্তর দিও।

    -- বোলিয়ে!

    -- তুমি সেবার আমাদের সঙ্গে বুড়ার গেছলে, রাণী ইন্দ্রকুমারীর স্টেটমেন্ট নিয়েছিলে?

    -- ইয়েস, স্যার।

    -- কতক্ষণ লেগেছিল?

    -- মেরেকেটে কুড়ি পঁচিশ মিনিট।

    -- ইন্দ্রকুমারীকে কেমন দেখেছিলে? শান্ত , উত্তেজিত বা অন্য কিছু।

    -- স্যার, শান্ত; যুবরাজ মারা যাওয়ার পর তিনদিন হয়ে গেছল না? হ্যাঁ, ক্লান্ত ছিলেন। ঠান্ডা লেগে গলাটা ধরা ধরা; কথা বলতে একটু কষ্ট হচ্ছিল। গরম জলের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন বারবার।

    কোসলে স্যার এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার সশব্দে চেয়ার টেনে বসে ঝুঁকে এলেন টেবিলের ওপারে বসা শিপ্রা সাইনির দিকে। বড় চোখ করে শিপ্রাকে জিজ্ঞেস করলেন — ওনার পোশাক মনে আছে, মানে সেদিন সাতসকালে তোমাকে বয়ান দেবার সময় কেমন পোশাক পড়েছিলেন? শাড়ি না সালোয়ার কামিজ?

    আমরা একটু অবাক। স্যার কী চাইছেন?

    -- শালোয়ার কামিজ ও দুপাট্টা।

    -- কী রঙের মনে আছে? মনে না থাকলে সোজা বলে দাও, বানিয়ে বলবে না।

    -- না স্যার, ঠিকই মনে আছে। মেরুন রঙের কামিজ, ডিজাইনার নকশা করা। সাদা সালোয়ার আর ফুলকারি দুপাট্টা।

    -- বাঃ, এবার বল গলায় যে হারটা ছিল সেটা কী রকম?

    -- মানে?

    -- মানে বিবাহিত হিন্দুনারীর গলা কখনও খালি থাকে না। তা উনি যে হার পরেছিলেন সেটা কী রকম? জড়োয়া নেকলেস? মুক্তোর মালা? নাকি একটা সোনার চেন?

    শিপ্রা এবার ভাবনায় পড়ে গেল। টেবিলের দিকে তাকাল। কিছু ভাবছে, মনে করার চেষ্টা করছে। স্যার অপেক্ষা করছেন, কিন্তু এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যেন এই উত্তরের উপর তাঁর কেসের সমাধান নির্ভর করছে।

    শিপ্রা এবার চোখ তুলল, স্যারের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল — মনে পড়েছে। ওনার ঠান্ডা লেগেছিল। গলাটা দুপাট্টায় পেঁচিয়ে ভাল করে ঢাকা ছিল। সেদিন সকালে উনি সম্ভবতঃ গলায় কোন হার পরেননি।

    সেই নোটবুকটাঃ কিছু টুকরো অংশ ২৩/০৪/৯৪

    আজ আমার নবজন্ম হোল।

    আজ থেকে আমি আর বি রামপ্রসাদ রাও নই, আমার নতুন নাম শান্তিরাম ওঁরাও পিতা সহসরাম ওঁরাও, নিবাস হেড়সপুর, জিলা সরগুজা। আজ আমায় এই নবজনমে দীক্ষা দিলেন শ্যামানন্দ মহারাজ। তাই উনি আমার পিতৃসম।

    আমি আমার আগের পরিচয় সাপের খোলসের মত ছেড়ে এসেছি। কিছু দিন লাগবে ধাতস্থ হতে। কিন্তু আমাকে হতেই হবে, অন্য কোন উপায় নেই। উনি আমার আশ্রয়দাতা, অন্নদাতা। দুটো বছর খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন। উনি আমার গুরু।

    প্রথম একবছর আমার আশ্রয়স্থল ছিল ছিন্নমস্তার মন্দির। আমি পুরোহিত মহারাজের সহায়ক। রোজ মন্দির ও তার আঙিনায় ঝাঁটপাট দেওয়া , বাগানের পরিচর্যা, কাছের কুয়ো থেকে জল নিয়ে আসা এবং মহারাজের নির্দেশ মেনে মন্দিরের ভোগ রান্না করা -- এই ছিল আমার কাজ। এখানকার লোকজন কেউ আমার পরিচয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। মহারাজ বলে দিয়েছেন – এ হল শান্তিরাম ওঁরাও, আমার শিষ্য, সরগুজা জেলা থেকে এসেছে। ব্যস্‌ সবাই একবাক্যে মেনে নিয়েছে। গুরু মহারাজ যখন বলেছেন – এর পর কারও কোন কথা চলে না। মহারাজ আমার গুরু, দ্বিতীয় গুরু।

    কিন্তু দু’বছর আগের সেই দিনটি? আমার গত জন্মের মহাপ্রস্থান? মনে করতে বড় কষ্ট হয়, লিখতে আরও। ভুলে থাকতে চাইতাম, মন থেকে মুছে ফেলতে চাইতাম, কিন্তু চাইলেই কি পারা যায় ?

    আমার প্রথম গুরু-রাইতু বিড্ডাডু গুরিল্লাগগা, বা সহজ করে বললে কৃষক সন্তানের গেরিলা অবতার। ওনার নাম কোন্ডাপল্লি সীতারামাইয়া। আমার গতজন্মের ধ্যানজ্ঞান, আমার স্বপ্নের নায়ক। যার প্রেরণায় মাত্র উনিশ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলাম। শ্রীকাকুলামের জেলা সদর পার্বতীপুরম থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে আমাদের গ্রাম। নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমি আর আমার মাসতুতো বোন মঙ্গলা। সেবার উনি এলেন। আমাদের ইউনিয়নের ছেলেদের সঙ্গে মিটিং করে ডাক দিলেন। আমি আর বাড়ি ফিরে যাইনি। যোগ দিয়েছিলাম রাইতু-কুলি-সংঘম বা কৃষক-মজদুর ঐক্য সমিতিতে। তারপর দ্রুত দলমের সেকশন কম্যান্ডার। দু’বছর পরে প্ল্যাটুনের চার্জ, ততদিনে পাহাড় জঙ্গলের টেরেনে শিকারী কুত্তাদের চোখ বাঁচিয়ে ঘোরাফেরা, এলাকার ম্যাপ তৈরি করা, বুবি ট্র্যাপ পাতা ও অ্যামবুশে দক্ষ হয়ে উঠেছি। আমার গপ্পাগুরু বা প্রধান গুরু সীতারামৈয়া আমাকে ডেকে পাঠালেন।

    আগের রাতে উত্তেজনায় ঘুমুতে পারি নি।

    পরের দিন। প্রথম দর্শনে একটু হতাশ হলাম। উনি খুব সাধারণ দেখতে। ভীড়ের মধ্যে আলাদা করা মুশকিল। জানতে চাইলেন না আমি কি কি হাতিয়ার চালাতে শিখেছি, বা ক’টা সাকসেসফুল অ্যামবুশ করেছি। বরং ওনার কৌতুহল আমি কদ্দুর পড়াশুনো করেছি, প্যাম্ফলেট ড্রাফট করতে পারি কিনা, ছোটখাটো প্রবন্ধ সহজ ভাষায় লিখতে পারি কিন, কোন নতুন গ্রামে গেলে লোকেদের কী বলে আমাদের পরিচয় দিই, সঙ্ঘম এর মিটিং পরিচালনার দায়িত্ব নিতে রাজি আছি কিনা। উনি আরও জানতে চাইলেন যে গুরিল্লা লাইফে মেয়েদের কী ধরণের দায়িত্ব দেয়া উচিত বলে আমার মনে হয়।

    তারপর আমি রাতারাতি অন্ধ্র ছেড়ে ছত্তিশগড়ে এলাম। দক্ষিণ বস্তার ও অন্ধ্রের কো-অর্ডিনেশনের দায়িত্ব পেলাম। সেখান থেকে তিনমাস পরে ছত্তিশগড়ের সরগুজা জেলার সঙ্গে ঝারখন্ডের পালামুকে ঘাঁটি করে বর্ডার কমিটি গড়ে তুললাম। দিনের পর দিন কেটে মাস, তারপরে বছর পেরিয়ে গেল। আমাদের এলাকা লাল এলাকা বলে বিখ্যাত হোল। পুলিশ বা আধা সামরিক বাহিনী বারবার ঘা খেল। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি? ওদের তুলনায় উনিশ আর বিশ। কিছু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পর কেউ আর পুলিশের মুখবির হতে চাইত না।

    সালটা বোধহয় ১৯৯১। সেবার গপ্পাগুরু নিজে এলেন আমার এলাকায়, আমার নিজস্ব শেল্টারে ছিলেন দু’দিন। বললেন — গ্রেহাউন্ডের হিংস্র বাহিনী অন্ধ্রের কয়েকটি জেলায় প্রচন্ড অত্যাচার চালাচ্ছে। আমাদের সাপোর্টারদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের পিপলস ওয়ার বা জনযুদ্ধ গ্রুপের কি অন্য গ্রুপের সঙ্গে হাত মেলানো উচিত? ধর মাওবাদী কম্যুনিস্ট সেন্টার (এমসি সি) বা পার্টি ইউনিটি গ্রুপ? তাহলে বিহার ও বাংলায় অপারেশন ছড়িয়ে দেওয়া যাবে; সাময়িক ভাবে নতুন শেল্টার তৈরি হবে।

    আমি কী বলব? উনি বললেন – মুপল্লা লক্ষণ রাও বা গণপতি চাইছে আমরা এমসিসির সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটা বড় বিপ্লবী পার্টি ও গুরিল্লা কম্যান্ড গড়ে তুলি।

    -- আপনি সহমত নন গপ্পাগুরু?

    -- উমম, আমার কী মনে হয় জান? কোথাও একটা মারাত্মক ভুল হচ্ছে। আমাদের দলের নাম জনযুদ্ধ? কিন্তু জনতা কি মোবিলাইজ হচ্ছে নাকি ওরা সরকার আর বিপ্লবীদের দুই জাঁতার মাঝখানে পিষছে?

    -- কমরেড, আপনি ওদের শ্বেত সন্ত্রাসের জবাবে লাল সন্ত্রাসে বিশ্বাস করেন না? কমরেড মাওয়ের দেখানো চিংকাং পাহাড়ের ঘাঁটি এরিয়ার রণনীতি ---

    উনি হাত তুলে আমায় থামালেন।

    -- শোন রামপ্রসাদ গাড়ু, আমার মনে হয় এখন বোধহয় গেরিলা আর্মি নয়, বরং গণসংগ্রামের সময়। যাই হোক, আরও ভাবনাচিন্তা দরকার। তুমিও ভেবে দেখ।

    উনি সেদিন ভোরে চলে গেলেন। আমার বাঁ-চোখের পাতা নাচছিল।

    তারপর একমাসও কাটল না আমার গুরিলাগগা আমার গপ্পাগুরু — যার মাথার দাম পঞ্চাশ লাখ টাকা - পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন। সমস্ত খবরের কাগজের প্রথম পাতায় খবর হোল। বাতাসে কথা ভেসে এল যে আসলে উনি সারেন্ডার করেছেন।

    লেগে গেল খেয়োখেয়ি। যারা সীতারামাইয়াকে ট্রেটর বলতে রাজি হল না তাদের শ্রেণীশত্রু ঘোষণা করা হোল। অনেকের নাম হিট লিস্টে উঠে গেল। তাদের মধ্যে আমি একজন। কারণ উনি সারেন্ডার করার আগে দু’রাত্তির আমার শেল্টারে ছিলেন, তারপর কারও সঙ্গে দেখা করেননি।

    আমার বুক ভেঙে গেল। আমাকে তাড়া করেছে নেকড়ে বাঘ ও হায়না। গ্রে-হাউন্ডস ও জনযুদ্ধের অ্যাকশন স্কোয়াড। ধরতে পারলে কেউ জ্যান্ত ছাড়বে না।

    আমার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সাথীদের বিরুদ্ধে আমায় হাতিয়ার ধরতে হল। কিন্তু কোথায় আর যাব? একটা এলাকা পেরিয়ে গেলে গ্রে-হাউন্ড নাগাল পাবে না, কিন্তু অন্যরা? ওরা তো আমার আটঘাট আনাচকানাচ সব জানে। অমরকন্টক এলাকায় কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে সাধু সেজে রইলাম, ছ’মাস। একদিন দেখলাম নাগরাজকে, আমার একসময়ের রিক্রুট। শিবমন্দিরের ভক্তদের ভীড়ে। চোখে চোখ পড়তেই সরে গেল। সেই রাতেই হাঁটা পথে পাহাড় পেরিয়ে সাতদিনের মাথায় পৌঁছে গেলাম বুড়ার, ছিন্নমস্তার দেবীর মন্দিরে। আমার সাধুর বেশ সত্ত্বেও শ্যামানন্দ মহারাজ কিছু একটা বুঝেছিলেন।

    আমি তাঁর পায়ে পড়লাম। আমায় বাঁচান, জান কা খতরা! উনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন তোকে সাধুর বেশ ছাড়তে হবে। ওরা জানে তুই সাধু সেজে আছিস, তোকে নতুন পরিচয় নিতে হবে, আমি ব্যবস্থা করব। তাই হোল আজ। কিন্তু যাত্রা সহজ হয়নি। মন্দিরের চাতালে শুয়ে কতবার দুঃস্বপ্নের ঘোরে চিৎকার করে উঠেছি। আমার গোঙানির শব্দে মহারাজের ঘুম ভেঙে গেছে। উঠে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন।

    বেটা, আমাকে সব বল, মনের ময়লা বের করে দে। সব দেবীর পায়ে বিসর্জন দে।

    বাবা, আমি পাপ করেছি। মানুষের প্রাণ নিয়েছি, ভুল হয়ে গেছে বাবা।

    ২১/০৭/১৯৯৬

    বাবার আশীর্বাদ ফলেছে। আজ আমি রাজাসাহেবের বাড়ির ড্রাইভার, ও সিকিউরিটি অফিসার। রাজাসাহেবকে বাবা কী বলেছেন আমি জানিনা, কিন্তু এমন কিছু বলেছেন যার ফলে আমি ওদের ব্যক্তিগত সিকিউরিটির দায়িত্ব পেয়েছি। আমার গান লাইসেন্স হয়েছে।

    ১০/০৫/১৯৯৭

    আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে গেছে শান্তিরাম ওঁরাও নামে। আমি এখন শাহডোলে রাজবাড়ির রয়্যাল টিম্বার মিলের ম্যানেজার। আমার কাজ হল মাল কাস্টমারদের সাপ্লাই যাতে ঠিকমত হয় সেটা দেখা এবং অন্য মজদুরদের কাজ দেখে হিসেব করে ওয়েজ দেওয়া। ছোট কুমার খুব মিশুকে, আমায় ঠিক কর্মচারি নয়, বরং বন্ধুর মত দেখেন। এখানে বড় কাঠ সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাক্ট পেলে উনি নিজে দেখাশুনো করতে আসেন।

    ০৫/০২/১৯৯৮

    ভাল লাগছে না। ছোটকুমারের অন্য রূপ দেখতে পেলাম। এই মিলে যত কাঠ আসে তার একটা ছোট অংশ ফরেস্ট বিভাগ থেকে নীলাম করে কেনা, বেশির ভাগ আসে জঙ্গলের চোরাই মাল। আর রক্তচন্দনের সাপ্লাই নিয়ে যা খেল দেখলাম যে আমি বেঁকে বসলাম, রাজাসাহেবকে গিয়ে বললাম যে আমাকে অন্য দায়িত্ব দিন, আমি কাঠের সাপ্লাইয়ের কাজে ঠিক উপযুক্ত নই। শ্যামানন্দ মহারাজকে ধরলাম। উনি চাইছিলেন না আমি ওনার থেকে দূরে যাই। শেষে রাজি হলেন। সুপারভাইজার কলেশরাম নতুন ম্যানেজার হোল। আমি ফের বিলাসপুরে ওনাদের সিকিউরিটি কাম ড্রাইভার। যুবরাজ সাহেবের শরীর খারাপ যাচ্ছে। আমাকে ওঁর পাশের ঘরে করা হল সর্বক্ষণের সঙ্গী।

    ২৭/১০/২০০০

    যুবরাজ সাহেব চমৎকার লোক। হাঁক ডাক করেন, কিন্তু নরম মনের মানুষ। ওঁর শরীরটা দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে, চুল পড়ে যাচ্ছে, দাঁত ও ভাল নয়। মাঝে মধ্যেই ঝিমুতে থাকেন। আফিঙ্গের নেশাটা সর্বনেশে। কিন্তু ছাড়তে পারছেন না।

    ১৭/১২/২০০০

    এদের কোথায় কিছু একটা স্ক্রু ঢিলে আছে। যুবরাজের তিনদিন ধরে জ্বর, একবার বললেন ছোটকে ডাক, বহুরাণীকে ডাক, আমাকে এসে দেখে যাক। কুমারসাহেব এলেন, যুবরাজ সাহেব যেই বললেন – বহুরাণী এল না? কুমারসাহেব কেমন কঠিন মুখ করে বললেন - ও আসবে না।

    সত্যিই রাণীসাহেবা একবারও আসেন না জেঠজিকে দেখতে। এত বছরে একবারও চোখে পড়ে নি। এমনকি প্রতিবছর কুলদেবী ছিন্নমস্তার কার্তিক অমাবস্যায় বার্ষিক পুজোর সময়ও নয়। শুনেছি, যুবরাজ সাহেবের স্ত্রী আলাদা থাকেন, বাপের বাড়িতে। তবে এসব নিয়ে আমাদের কথা বলা বারণ, গোড়াতেই হরিরাম কাকা আমাকে বলে দিয়েছিল।

    ১৪/০৩/২০০১

    আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে। কিছু জমানো টাকা ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে। কিছু জমা আছে গুরুজী শ্যামানন্দ মহারাজের কাছে। সব নিয়ে চলে যাব কোন গ্রামে, বোম্বাগড় রাজ্যের বাইরে। জমি কিনে চাষ করব, মুরগী হাঁস গরু রাখব। এদের চক্করে আর নয়। রাজাসাহেব চলে গেলেন। যুবরাজের দিল আওর দিমাগ, দোনোঁ খারাব হো রহা হ্যায়। আমি পাপের ভাগী হব না। ব্যস্‌ ভগবান বালাজীর ও শ্যামা মহারাজের আশীর্বাদ পেলেই সব হয়ে যাবে।

    ২৭/০৪/২০০১

    সব খতম, ইয়ে শয়তান কা চেলা বহোত খতরনাক হ্যায়। কী করে জেনে গেছে আমি চলে যেতে চাই। কাল ওর মহলে ডেকেছিল। হেসে বলল - যদি বোম্বাগড় রাজ্যের বাইরে পা’ বাড়াও তো দু’দিনের মধ্যে ধরা পড়ে যাবে বহুরাণীর গয়না নিয়ে পালাবার অভিযোগে।

    ওর চোখে বোধহয় পলক পড়ে না। ধীরে ধীরে ফিসফিসিয়ে বলল - বোম্বাগড় অনেক শান্ত অনেক নিরাপদ রাজ্য। তাইতো এখানে আশ্রয় নিতে ভিন রাজ্যের লোকজন আসে। কখনও সাধুর বেশ ধরে, কখনও সিকিউরিটি গার্ড সেজে।

    অর্থাৎ ও আমার পূর্ব জন্মের কথা সব জেনে গেছে। ওর কথা না শুনলে আমাকে ফাঁসিয়ে দেবে।

    তাহলে আমার কোন আশা নেই? বাকি জীবন এদের গোলামি করেই কাটাতে হবে?
    | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৪৬৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২৩:৫০497521
  • হুম্ম
  • :|: | 174.255.131.176 | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০২:৩২497523
  • ঠিকই, ছত্তিশগড় এলাকার জঙ্গলের কাহিনীতে মাওবাদী কার্যকলাপ না থাকলে বাস্তবের ছোঁয়া আসেনা। এইটা বেশ ফিট করেছে। এতদিন ছোটরানী গোলমেলে মনে হচ্ছিলো। যদিও সেই ধারণা পুরোপুরি ধূলিসাৎ হবার কোনও কারণ ঘটেনি তবু আবার এও মনে হচ্ছে পুরুতবেচারাকেই খুনি না বলা হয়। নাস্তিক লোকেরা পুরুতদের বেশ অপছন্দই করে থাকেন কিনা! :)
  • শঙ্খ | 103.217.234.105 | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:২৭497566
  • বেশ জমে গেছে। অপেক্ষায় ছিলুম। 
  • kk | 68.184.245.97 | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৫:৫৯497712
  • আমি তো বেশ কিছু জিনিষ আন্দাজ করছি। দেখি মেলে কিনা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন