• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  গপ্পো

  • রাজরক্ত (রহস্য গল্প) : ৭ম পর্ব

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | গপ্পো | ০৮ জুলাই ২০২১ | ৫৯৬ বার পঠিত
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
    (৭) ছিন্নমস্তা দেবীর কাহিনী

    “ইয়ে জো বুড়ার হ্যায় না, পুরাকাল মেঁ ইসকা নাম থা যোগেন্দ্রপুর, জনতা কী জুবান মেঁ জোগীটোলা। ইঁহা আদিবাসী লোগোঁ কা রাজ থা”।

    -- মানে যুবরাজ বীরেন্দ্রপ্রতাপ আসলে আদিবাসী রাজা?
    -- আঃ, আগে ওকে বলতে দাও না! পরে প্রশ্ন কোরো।

    ছোড়দি কুন্দ আমার কাঁধ ছেড়ে দিয়েছেন।

    -- হাঁ জী; বীচ মেঁ মত টোকিয়ে।

    ঠিক কথা; গল্পের মাঝে ফুট কাটব না।

    “হল কি, অনেক অনেক বছর আগে বর্তমান রাজপরিবারের এক পূর্বপুরুষ ওই পাহাড় পেরিয়ে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেন। ওঁর নাম ছিল মহেন্দ্রপ্রতাপ মণিপাল সিং। উনি নিজের রাজ্য থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। শোনা যায় ওঁর বিমাতার সন্তান ষড়যন্ত্র করে ওঁর সিংহাসন কেড়ে নেন। এই এলাকা ছিল আদিবাসীদের। উনি তাদের সঙ্গে দোস্তি করে ধীরে ধীরে ওদের রাজা হয়ে বসেন। নদীর ওপারে ছিল আদিবাসীদের দেবীমন্দির। দেবীর নাম বজ্রবারাহী। মহেন্দ্রপ্রতাপ মন্দিরের সংস্কার করিয়ে তাকে ভব্য রূপ দিলেন।

    এমন সময় এসে হাজির হলেন তাঁদের বংশের কুলপুরোহিত কৃষ্ণাচার্য - সাথ মেঁ উনকী দো বেটি মেখলা অউর কনখলা। ওঁরা এসেছেন সেই পাহাড় পেরিয়ে আর এনেছেন ভয়ংকর খবর। তাঁর সেই বৈমাত্রেয় ভ্রাতা উদ্যমেশ্বরণ মহীপাল সিং মহেন্দ্রপ্রতাপের বর্তমান আস্তানার খবর পেয়ে গেছেন এবং বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে যোগেন্দ্রপুর অর্থাৎ বর্তমান বুড়ার আক্রমণ করতে আসছেন। কুলপুরোহিত অনেক বুঝিয়ে তাঁকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী! ওঁর কথা হল - আগুনের আর দুশমনের শেষ রাখতে নেই। মাত্র এক সপ্তাহ সময়। তারপর এখানে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে।

    এখন কী করা?

    ওই কয়েক হাজার সৈন্যবাহিনীকে ঠেকানোর সাধ্য জোগীটোলার আদিবাসীদের কর্ম নয়। যদি মহেন্দ্রপ্রতাপ পালিয়েও যান, এই নিরীহ আদিবাসীদের প্রাণহানি এড়ানো যাবে না। তাহলে?

    আদিবাসী সর্দারদের বৈঠক ডাকা হল। তাদের সামনে কৃষ্ণাচার্য পুরো ব্যাপারটা খুলে বললেন। তখন উঠে দাঁড়াল ওদের বৈগা পুরোহিত। বলল-উপায় আছে, একমাত্র উপায়। তা’হল বজ্রবারাহী দেবীর করুণা ভিক্ষা। পরশু অমাবস্যা। সেদিন বীরাচারী মতে দেবীর পূজার্চনা করতে হবে। দেবী প্রসন্ন হলে দশ মহাবিদ্যা যোগেন্দ্রপুরকে দশদিকে পাহারা দিয়ে রক্ষা করবেন। কোন মনুষ্য শক্তির সাধ্য নেই তাঁদের প্রহরা এড়িয়ে এখানে প্রবেশ করে।”

    ইতিমধ্যে আমরা একটা নদীর কাছাকাছি এসে গেছি। আর শান্তিরাম চুপ করে গেছে। বড়দি শৈবলিনী বলে ওঠেন — কী হল, থামলে কেন?

    -- আমরা প্রায় এসে গেছি। ওই বটগাছের বাঁদিকে তাকিয়ে দেখুন।

    অন্ধকারের মধ্যে একটা লম্বাটে একটেরে বাড়ির আভাস। তার উঁচু বারান্দার দু’দিকে দুটো থামের গায়ে দুটো মশাল বাঁধা। তার আলোয় টের পাচ্ছি দেয়ালগুলো সাদা রঙের। এটায় সোলার লাইট নেই নাকি?

    শান্তিরাম বোধহয় আমার প্রশ্নটা আন্দাজ করে বলে উঠল — যুবরাজসাহেব আজকের বিশেষ পুজোর জন্যে তৈরি হচ্ছেন। এই সময় উনি কোন আধুনিক আলো পছন্দ করেন না। ঘরের ভেতরেও প্রদীপ আর টেমি জ্বলছে।

    -- বিশেষ পুজো কেন?

    -- ব্যাপারটা হল উনি এবার রাজগদিতে বসবেন। একবছর আগে ওনার পিতৃদেব গত হয়েছেন। এখন কালাশৌচ কেটে গেছে। এখানে আজ কুলদেবী্র ছিন্নমস্তার আশীর্বাদ নিয়ে বিলাসপুরে ফিরে আগামী সপ্তাহে ছোট একটি অনুষ্ঠানের পর যুবরাজ থেকে রাজা হবেন, বোম্বাগড়ের রাজা।

    আমার মাথায় টিউবলাইট জ্বলে ওঠে।

    -- যেমন ওঁর পূর্বপুরুষ মহেন্দ্রপ্রতাপ হয়েছিলেন?
    -- অনেকটা, সবটা নয়। সময় বদলে গেছে, যুগ বদলে গেছে। আজকাল ওইভাবে পুজো সম্ভব নয়। তবে দেবী আজও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হন।

    এবার ছোড়দি বলেন, ‘কই গল্পটা শেষ কর। থামিয়ে দিলে কেন’?

    -- গল্পে আর বিশেষ কিছু নেই। বিধিমতে মানে বীরাচারী তান্ত্রিক মতে পূজো হল। সাতদিনের মাথায় আক্রান্ত হল যোগেন্দ্রপুর, কিন্তু অদৃশ্য দশমহাবিদ্যার শক্তিতে আক্রমণকারী কয়েক হাজার সৈন্য কুটোর মত উড়ে গেল। মহেন্দ্রপ্রতাপ এখানকার নতুন রাজা হলেন। আদিবাসী বৈগা পুরোহিত শঙ্কর সায় রাজপুরোহিত হল। কৃষ্ণাচার্য স্বপ্নাদেশ পেলেন যে বজ্রাবারাহী দেবীর নতুন নাম হবে ছিন্নমস্তিকা বা প্রচন্ডমস্তিকা। তাঁর ছিন্নমস্তা মূর্তি আগের শ্মশানপীঠ থেকে সরিয়ে এনে রাজবাড়ির দক্ষিণ পাশে স্থাপিত করতে হবে। আর নতুন রাজধানীর নাম হবে বোম্বাগড়। মন্দির হল, তারপাশে দিঘী খোঁড়া হল, সেই দিঘীতে কার্তিক অমাবস্যার রাতে কৃষ্ণাচার্য স্বেচ্ছায় জলসমাধি নিলেন।

    শান্তিরামের মোবাইলে মেসেজ বেজে উঠলো। ও একনজর দেখে মোবাইল বন্ধ করে ফের শুরু করতে যাচ্ছিল, শৈবলিনী বাধা দিলেন।

    -- আরে পূজোর ব্যাপারটা - সেদিনের আরাধনা বা বজ্রবারাহী কেন ছিন্নমস্তা হলেন - এসব কিছুই ঠিক করে বললে না তো! আর ছিন্নমস্তা দেবীর কথা আমি বিভিন্ন বইয়ে এবং শক্তিসঙ্গম তন্ত্রে পড়েছি। কিন্তু তোমার বলার সঙ্গে সবটা মিলছে না।

    -- দিদি, আপনারা হলেন অনেক লেখাপড়া জানা। আমি গাঁওয়ার আদমী। এখানের দেবী সম্বন্ধে ছোটবেলা থেকে যা শুনেছি তাই আপনাদের বললাম। এবার পুজোর নিয়মের জায়গাটা আপনারা দেবীর পূজারীর থেকে শুনে নিন। উনি ভাল বলতে পারবেন। মন্দির প্রায় এসে গেছে। আমি চলি।

    -- সেকী? কোথায় যাচ্ছ?

    -- আমি যাচ্ছি, যুবরাজ বাহাদুরের সঙ্গে দেখা করে আসি। ওনার ওষুধপত্তর সময় মত দিতে হবে তো। বাকি সব ব্যবস্থাও দেখতে হবে। আর হ্যাঁ, আমি যদি ওনাকে রাজি করাতে পারি তাহলে আপনাদের মোবাইলে মেসেজ করব। শুধু দুই দিদি, তাই তো? যখন মেসেজ পাবেন, চুপচাপ চলে আসবেন। আপনারা মন্দিরে যান।

  • -- কোথায় মন্দির?

    -- দেখুন, বটগাছের পেছনে নদীর পাড়ে মহাশ্মশান। আগে ওখানেই আদিবাসীদের বজ্রবারাহী দেবীর মন্দির ছিল। এখন ছিন্নমস্তা দেবীজির মন্দির রাজবাড়ি ছেড়ে এগিয়ে বাঁদিকে ঘুরে গেলেই দেখতে পাবেন। চলে যান, সন্ধ্যের আরতি বোধহয় শেষ। মহাপূজার আয়োজন চলছে। এই সময় পূজারীজি বিশ্রাম করছেন। আপনাদের বাকি গল্পটা শুনিয়ে দেবেন ‘খন।

    কিন্তু সাবধান! সামনে আমবাগানের গায়ে সেই বড় পুকুর। তার ওপারে মন্দির। আপনারা রাতের বেলা পুকুরের গা ঘেঁষে যাবেন না।একটু ঘুরে আমবাগানকে বাঁহাতে রেখে এগিয়ে যাবেন।

    একটা ঘড়িয়ালের কথা বলেছিলাম না?

    একটু পরে অল্প হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম মন্দিরে। ভাগ্যিস ভারী জ্যাকেট গায়ে চড়িয়েছিলাম। নদীর ধার থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে। ছিন্নমস্তা মূর্তি পাঁচ ফুটের চেয়ে বেশি উঁচু হবে না। কিন্তু মূর্তির দিকে তাকিয়ে আমার বাক্যি হরে গেল। চোখ সরিয়ে আবার তাকাচ্ছি, শুধু ভয়ংকরী রূপ বললে কম বলা হবে, সঙ্গে দুই দিদি আছেন যে!

    দেবী মূর্তির পরণে কিছু নেই, তাঁর দুই সহচরীও তাই। আমি কখনও কাপড়জামা ছাড়া মেয়েমানুষ দেখি নি। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার তাকাচ্ছি। কারণ আমাদের সবার চোখ ওঁদের শরীর ছাড়িয়ে গলায় পৌঁছে যাচ্ছে আর শিউরে উঠে চোখ সরিয়ে নিচ্ছি।

    ছিন্নমস্তা দেবীকে দেখতে কেমন বুঝতে পারছি না। চোখের দিকে না তাকালে কী কাউকে চেনা যায়? কিন্তু ওঁর চোখ কোথায়, মাথাটাই যে নেই! ডান হাতে একটা রক্তমাখা কাতান, ধড় থেকে এক কোপে মুন্ডূ আলাদা হয়ে বাঁ হাতে ঝুলছে। তার দৃষ্টি দেখার সাহস আমার নেই। কারণ গর্দান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে ফোয়ারার মত। এমনটি কোথায় যেন দেখেছি। হ্যাঁ, একটা হলিউডি ফিল্ম - কিল বিল ওয়ান। বিলাসপুরের সত্যম টকীজে অনেক আগে দেখেছিলাম। সেখানে একটা মেয়ে কাতান নয়, সামুরাই তলোয়ার দিয়ে লোকের মুন্ডু উড়িয়ে দিত আর অমনই ফিনকি দিয়ে ফোয়ারার মত রক্ত ছুটতো। কিন্তু মেয়েটা নিজের মুন্ডূ কাটার মত বোকামি করে নি। আর এখানে? সঙ্গের দুটো কালীপূজোর প্যান্ডেলে ডাকিনী যোগিনী মত দুই সহচরী ওই রক্তধারা খেয়ে নিচ্ছে, যেন শ্মশানের শেয়াল। শাঁখের আওয়াজ আর ঘন্টাধ্বনি। আরতি শেষ হোল? এদিক ওদিক তাকাই। চাঁদোয়ার নীচে জনা কুড়ি লোক। হ্যাজাক বাতি আর দীপের আলো। ধূপধুনোর গন্ধ আর ধোঁয়া। আমার কেমন গা গোলাচ্ছে। ঘরে ফিরে যাই? খেয়েদেয়ে আবার আসবো’খন।

    কিন্তু দুই দিদি যে পূজোর জায়গাটার কাছ ঘেঁষে জাজিমের উপর বসে পড়েছে। দু’জন অল্পবয়স্ক মহিলা, মাথায় জটা পূজোর আয়োজন করছেন। আর ছোড়দি ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে বেশ গল্প জুড়ে দিয়েছে। আমি ফিরে যাবার আগে ওদের জানিয়ে দিই ভেবে কাছে গিয়ে দেখি আড্ডা জমে গেছে। উনি বলছেন দেবীর আদ্দেক শোনা কাহিনীটির বাকি অংশটুকু -

    “কিন্তু ওই পূজার নিয়ম বড় কঠিন। দেবীর সামনে মন্ত্রোচ্চারণের সময় দুই সুলক্ষণা মন্ত্রসিদ্ধা কুমারী মেয়েকে নৃত্য করতে হবে। তার একজনকে হতে হবে গৌরাঙ্গী, অপরজন শ্যামাঙ্গী। এই সব নয়, নৃত্যের সময় ওদের দুজনকে দেবীর মত নগ্নিকা হতে হবে। আর চাই রাজরক্ত। কী করে হবে এতসব। সবাই চুপ।

    হঠাৎ শোনা গেল কৃষ্ণাচার্য্যের স্বর। উপায় আমাদের সামনে। আমার দুই কন্যা মেখলা ও কনখলা শাস্ত্রজ্ঞ, সুলক্ষণা ও পবিত্র। আমি বলছি আমার আদেশে ওরা দেবীর পূজায় বীরাচারী মতে যথাবিধি নৃত্য করবে। বাহরী আক্রমণ সে দেশকো বচানা হোগা। রাজা ও দেশের লোকের মঙ্গলের জন্যে যেকোন ত্যাগস্বীকার করতে আমরা রাজি।

    শুরু হোল বিশেষ পূজা।

    আপলোগ কল্পনা কীজিয়ে -- দেবীর গাত্রবর্ণ জবাফুলের ন্যায় লাল। তিনি নগ্না এবং আলুলায়িত কুন্তলা। ষোড়শী এবং পীনোন্নত পয়োধরা, তাঁর হৃদয়ের নিকট একটি নীলপদ্ম বিদ্যমান। তিনি গলায় এক বিষাক্ত নাগহার ধারণ করেছেন। তার গলদেশে অন্যান্য অলংকারের সঙ্গে নরকরোটি বা ছিন্নমুণ্ডের মালা দোদুল্যমান। দেবীর ডান হাতে একটি খড়গ, মস্তকে মুকুট ও অন্যান্য অলংকার। দেবী রক্তে সন্তুষ্ট হন। তাই তার পূজায় রক্ত বলিদান করা হয়। সঠিক ভাবে দেবীর পূজা না করলে দেবী পূজকের মস্তক ছিন্ন করে রক্ত পান করেন।

    পূজায় দেবীকে নিজের হাতের আঙুল কেটে রক্ত বলিদান করলেন মহেন্দ্রপ্রতাপ। তখন রাত্রির দ্বিতীয় যাম। পূজার বাকি সব অংগ সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু দেবীর থেকে কোন সংকেত কোন ইশারা আসেনি।

    এবার কৃষ্ণাচার্য্যের নির্দেশে তাঁর দুই মেয়ে মেখলা ও কনখলা দেবীর সামনে পূজাস্থলে এসে নৃত্য শুরু করলেন। উপস্থিত জনতা স্তম্ভিত। কারণ দুই ভগিনীও যে বজ্রবরাহী দেবীর মতই নগ্নিকা, আলুলায়িত কুন্তলা এবং পীনোন্নত পয়োধরা। তাঁদের একজন গৌরী ও আর একজন কৃষ্ণা। দুজনের হাতেই তীক্ষ্ণধার কাতান।

    খানিকক্ষণ পরে নৃত্যের গতি বেড়ে গেল; আদিবাসীদের মাদলের বোল ও করতাল এবং ঝাঁঝের শব্দে বাতাস কেঁপে উঠল। তাঁরা চক্রাকারে ঘুরছেন, দেবীকে প্রদক্ষিণ করছেন, জনতা আশায় এবং আশংকায় উদ্বেল। যদি দেবী সন্তুষ্ট না হন?

    সময় কত? কেউ জানে না। মেখলা ও কনখলা এবার ক্লান্ত, কমছে নাচের গতি। জনতা হতাশ; একটা সমবেত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসে বাতাসে মিশে যায়। মেখলা ও কনখলা পিতা কৃষ্ণাচার্য্যের দিকে তাকায়। পিতা অল্প মাথা নেড়ে সম্মতি দেন। এবার বড় বোন মেখলা নিজের হাতের কাতান নিয়ে নিজের গলায় বসিয়ে দিলেন। কিন্তু শস্ত্রটি গলা অব্দি পৌঁছাতে পারল না। কারণ আরেক নগ্ন নারীমূর্তি দীপ্তলোচনা, আলুলায়িত কেশা এসে চেপে ধরেছে তার হাত। আর খলখল হেসে দুই বোনকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে তার সঙ্গে নাচে যোগ দেবার জন্যে। শুরু হোল এক উদ্দাম নৃত্য। তার তাল লয় সব আলাদা। নৃত্যরতা তিনজন — দেবী বজ্রবারাহী, মেখলা ও কনখলা — যেন তিন বোন। কিন্তু সহসা অন্ধকার অমাবস্যার আকাশে ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ।
    দেবী নিমেষের মধ্যে ডান হাতে ধরা খড়গে এক কোপে নিজের মাথা কেটে সেই কাটা মুন্ডু বাঁহাতে ধারণ করেছেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে আর কী আশ্চর্য! সেই রক্ত আকন্ঠ পান করে তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন দুই বোন, নাকি তারা এখন দুই সখী? এই দৃশ্য দেখে অনেকে অজ্ঞান হয়ে গেল। রক্ত ধারা থেমে গেল। নাচ কখন থেমে গেছে। মশাল নিভে আসছে।

    দেখা গেল বজ্রবারাহী দেবী এখন ছিন্নমস্তা রূপে স্থির; তাঁর সামনে দুই বোন বা দুই সহচরী যেন প্রস্তরীভূত। আর এদের পিতা কৃষ্ণাচার্য্য? তিনি আত্মগ্লানিতে দগ্ধ হয়ে সামনের দীঘিতে সলিলসমাধি নিলেন আর উঠলেন না। কিন্তু মাঝে মাঝে এক রক্তপিপাসু ঘড়িয়াল সেখান থেকে উঠে এসে শিকার ধরে। সে কী কৃষ্ণাচার্য্যের আত্মা? লোকে নানারকম কথা বলে। জনশ্রুতি-এই রাজ্যের সংকটকালে পরেও কয়েকবার এক জোড়া যুবতী ছিন্নমস্তা দেবীর বলি চড়েছে - একজন গৌরাঙ্গী ও আরেকজন শ্যামাঙ্গী। বাকিটা তো আপনারা আগেই শুনে নিয়েছেন ”।

    আমার অনেকক্ষণ ধরে অস্বস্তি লাগছিল, শিরশিরানি ভাবটা বেড়ে যাচ্ছিল। কেন? হঠাৎ বুঝতে পারলাম। দুই দিদির পিঠোপিঠি বয়েস, দুজনেরই ঘন লম্বা চুল আর বড়জন ফর্সা্‌, অন্যজনের রঙ ময়লা। এবার উঠলে হয়, খিদে পাচ্ছে।

    পুজো দেখবেন তো? আর দেড়ঘন্টা অপেক্ষা করুন। আমিও একটু বিশ্রাম করে নিই। যুবরাজ ও কুমারসাহেব ঘন্টাখানেক পরে আসবেন।

    কুমারসাহেব?

    হাঁ, বোম্বাগড়কে ছোটেকুমার আ গয়ে। পারিবারিক পূজা মেঁ দোনো ভাইকো সাথ বৈঠনা জরুরী হ্যায়।

    আমরা মন্দির চত্বর থেকে বেরিয়ে এসেছি। সোজা গেস্টহাউস যাব। সবাই কীরকম গম্ভীর হয়ে গেছে। আচ্ছা, ওই ছিন্নমস্তা দেবীর গল্পটা না শুনলে এমন কী ক্ষেতি হত? যত্তো নখরা!

    এমন সময় ছোড়দির মোবাইল জ্বলে ওঠে, সঙ্গে একটা চাপা আওয়াজ। মেসেজ এসেছে। কুন্দদি একনজর চোখ বুলিয়ে চমকে ওঠে। ভারি উত্তেজিত। হাঁফাতে হাঁফাতে বলে - ‘দিদি! বীরেন্দ্রপ্রতাপ দেখা করতে রাজি হয়েছে। এই যে মেসেজ, দেখে নে’।

    আমিও ভদ্রতা ভুলে উঁকি দিই - “কাম শার্প, যুবরাজ বীরেন্দ্রপ্রতাপ”।

    ওরা দ্রুত পায়ে রাজোয়ারার দিকে পা চালায়। আমার অস্তিত্ব ভুলে যায়। আমি কী করব? ওদের জন্যে অপেক্ষা করব, নাকি একা গেস্ট হাউসে ফিরে যাব। দেরি করলে খাবার জুটবে না যে! কিন্তু দু’জন মেয়ে, তায় বাঙালী। তারচেয়ে অপেক্ষা করি। কিন্তু কতক্ষণ? এদের যা গল্প, তায় পুরনো অভিযোগ, তার পালটা জবাব - এতে তো ভাল সময় খাবে। তবে যুবরাজকে পূজোয় বসতে হবে। কলেজ জীবনের পুরনো প্রেম নিয়ে কতক্ষণ কপচাবেন? আমি ধীরে ধীরে পুকুরের চারপাশে চক্কর লাগাতে থাকি। টর্চ জ্বালিয়ে এদিক ওদিক ফেলতে ফেলতে চলি। একটু কি অসতর্ক হয়ে পড়েছিলাম? দীঘির বাঁধানো ঘাট থেকে দূরে একটা বেশরমের ঝোপ, পাশে খানিকটা জল শুকিয়ে কাদা। তার পর একটা কাটা গাছের গুঁড়ি। একটু বেশিই কাছে চলে গেছলাম। টর্চের আলো পড়তেই হঠাৎ গুঁড়িটা হড়হড়িয়ে দীঘিতে নেমে গেল। আলোর বৃত্তের মাঝে একটা বড় কাঁটাওলা লেজের অংশ স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আমার শরীর যেন অবশ, জোর বাঁচা বেঁচেছি। এবার ঘুরপথে একটু এগিয়ে যাই, কিন্তু বেশিক্ষণ এগোতে পারিনি।

    একটা রক্তজমানো চিৎকার অন্ধকারকে খান খান করে দিল। আবার, আবার! তারপর সব চুপ। দু’সেকেন্ড।

    পকেট থেকে রিভলবার বের করে আমি দৌড়ুতে থাকি যুবরাজের আবাসের দিকে। চিৎকারটা ওদিক থেকেই আসছে, প্রথম আওয়াজটি স্পষ্টতঃ কোন নারী কন্ঠের।
    | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৮ জুলাই ২০২১ | ৫৯৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 68.184.245.97 | ০৮ জুলাই ২০২১ ২৩:৫৯495680
  • বাপ রে, ছিন্নমস্তার গল্পটা কী ক্রিপি! পুরোহিত কৃষ্ণাচার্য্য আত্মগ্লানির চোটে নিজের প্রাণ দিলেন। কিন্তু কেন এত আত্মগ্লানি? উনি তো চেয়েছিলেন যে দেবী জেগে উঠুন। উনি তো জানতেন যে ওঁর মেয়েরা কোনো না কোনো ভাবে অ্যাফেক্টেড হবে?

  • বিপ্লব রহমান | ০৯ জুলাই ২০২১ ০৪:২২495683
  • বাপরে! এরকম জায়গায় কেউ গল্প থামায়? তারপর? 


    ছিন্নমস্তার অংশটি রোমহর্ষক 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন