এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • সিঁড়ির সাতকাহন (৪)

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ১৪ অক্টোবর ২০২২ | ২৬৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)

  • (৪)

    গ্রিক শব্দ ‘মেসোপটেমিয়া’র অর্থ ‘দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি’। মেসোপটেমিয়ার পূর্বদিকে টাইগ্রিস বা দজলা নদী, এবং পশ্চিমে ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী। মেসোপটেমিয়ার অনেকগুলো সভ্যতার মধ্যে সুমেরীয় সভ্যতা সবচেয়ে প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে এর জন্ম। মেসোপটেমিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী ছিল উর। যে শহরের প্রাণকেন্দ্রে ছিল জিগুরাত নামের এক স্থাপত্য। বয়সের ভারে যা আজ ন্যুব্জ। ক্ষয়ে পড়া এই স্থাপত্যটি মিশরের গিজার পিরামিডের থেকেও পুরনো।



    ইরাকের কুখ্যাত কারাগার আবু ঘ্রাইবের কাছে মরুভূমি জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে জিগুরাতের ভেঙে পড়া অংশ। ইরাকের পাশাপাশি ইরানেও এর অংশবিশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও পিরামিডের মতো একটি সমতলের উপর গড়ে ওঠেনি এটি। বরং সিঁড়িওয়ালা কয়েকটি তলের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে জিগুরাত। পিরামিডের মতো এর ভিতরে কক্ষ নেই। বরং সিঁড়ি বেয়ে একেবারে উপরে উঠলে পাওয়া যাবে মন্দিরের মতো একটি অংশ।

    মিশরে প্রথম পিরামিড গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৭৮০ শতকের কাছাকাছি সময়। তার প্রায় ৬৮০ বছর পর নির্মাণ শুরু হয়েছিল জিগুরাতের। তবে গিজার পিরামিডের থেকে এটি পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব ২৬ শতকের গোড়ায় প্রায় ২৭ বছর ধরে গড়ে উঠেছিল গিজার পিরামিড।

    মাদালেনা রুমর নামে আমেরিকার কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘‘জিগুরাত হল পবিত্র ভবন। প্রথমে এটি ছিল, একটি সিঁড়ির উপরে গড়ে ওঠা এক কক্ষবিশিষ্ট মন্দির। তবে সময়ের সঙ্গে এই সমতলের উপরে অনেকগুলি মন্দির গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়তে থাকে। আরও জটিল আকার নিতে থাকে এই স্থাপত্য। এক সময় এটি বহুতলে পরিণত হয়।’’

    কালের নিয়মে জিগুরাতের বহু অংশ হারিয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে একেবারে উপরের মন্দিরটি। তবে জিগুরাতের নীচের অংশটি আজও অক্ষত। জিগুরাতের আসল চেহারা কেমন ছিল, তা জানতে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি হেরোদোতাসের মতো ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে বাইবেলের লিখিত অংশের উদাহরণও নেওয়া হয়েছে।



    এতে থাকতো তিনটি সিঁড়ি। একটি মাঝখানে, ২৮ মিটার দীর্ঘ ৯৩টি ধাপ এবং এর প্রস্থ প্রায় ২.৭০ থেকে ৩ মিটার।  উচ্চতা ১২ মিটার। দুপাশের অন্য দুটি সিঁড়ির উচ্চতা ১২ মিটার, দৈর্ঘ্য ২৯.৫০ মিটার, প্রতিটি সিঁড়িতেই ছিল ১০০টি ধাপ। এই তিনখানা সিঁড়ি একটা জায়গায় মিলিত হয়ে বাড়ির দ্বিতীয় তলে উঠে যেত। চারদিকের দেয়ালগুলো সোজা (vertical) থাকলেও অদ্ভুতভাবে সেটা দেখাতো অবতল (concave) যেন।   

    ‘আ জিগুরাত অ্যান্ড দ্য মুন’ নামে গবেষণাপত্রের লেখিকা তথা প্রত্নতত্ত্ববিদ আমেলিয়া স্পারভিনা বলেন, ‘‘সমতলের উপর শিখরের মতো আকৃতি ছিল জিগরাতের। রোদে শুকোনো ইটের সারির উপরে যা গড়ে উঠেছে। সেগুলি আবার আগুনে পোড়ানো ইটের সারিতে ঢাকা ছিল। প্রায়শই এর বহিরঙ্গে নানা রং চাপানো হত।’’

    জিগুরাতের অংশবিশেষ পরীক্ষার পর প্রত্নতত্ত্ববিদদের দাবি, দুই সারি বিশালাকার মাটির সিঁড়ির স্তরের উপরে একটি মন্দিরকে ধরে রাখত এই স্থাপত্য। জিগুরাতের সমতলকে ধরে রাখতে ৭২০,০০০টি কাদা-মাটির ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। এক-একটির ওজন ছিল ১৫ কেজি।



    দক্ষিণ-মধ্য মেসোপটেমিয়ার সুমেরিয়ান সভ্যতায় বর্ণিত চাঁদ এবং সূর্যের সময়চক্রের ছায়া দেখতে পাওয়া যায় জিগুরাতের স্থাপত্যে। এর চারটি কোণের প্রতিটি একটি কম্পাসের মতো এক-একটি দিককে চিহ্নিত করে। জিগুরাতের উপরের স্তরে একটি বিশাল আকারের সিঁড়ি রয়েছে যেটি পূর্ব দিকে মুখ করে তৈরি করা হয়েছে।

    খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মরুভূমির রুক্ষতায় জিগুরাতের ক্ষয় শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৫৫৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলোনিয়ার সম্রাট নাবোনিদাসের আমলে জিগুরাতের সংস্কারকাজ শুরু হয়। তবে সে সময় তিনটির বদলে সাতটি সিঁড়ির সারি গড়েন সম্রাট নাবোনিদাস।



    জিগুরাতের অংশবিশেষ যে এখনও তুলনামূলক ভাবে অক্ষত রয়েছে, তার পিছনে সুমেরীয় কারিগরদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাও যথেষ্ট কৃতিত্ব দাবি করে। এর স্থাপত্যের অংশবিশেষ আজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি মূলত তিনটি কারণে।

    যাইহোক, সিঁড়িটির প্রকৃত উৎপত্তির তারিখ আরও অনেক আগের।
     

     

     
    “জেরিকো’র টাওয়ার” (Tower of Jericho) হচ্ছে একটা সাড়ে আট মিটার (২৮ ফুট) লম্বা একটা পাথরের কাঠামো যা ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাক-মৃৎপাত্র নিওলিথিক যুগে নির্মিত হয়েছিল। এটাকে বিশ্বের প্রথম পাথরের বাড়ি বলা হয়ে থাকে। এই স্থাপত্যের মধ্যেই একটা বাইশ ধাপ বিশিষ্ট অভ্যন্তরীন সিঁড়ি রয়েছে। এই সিঁড়ির ধাপগুলি হল প্রথম পরিচিত সিঁড়ি যা চুনাপাথরের সমতলবিশিষ্ট ব্লক দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। পাথরের এই কাজ দেখে অনুমান করা হয় যে মিস্ত্রি এটা তৈরি করেছিলেন তাঁর নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিনের পাথরের গাঁথনির অভিজ্ঞতা ছিল।

    https://blog.stannah-stairlifts.com/wp-content/uploads/sites/12/2018/12/History-of-stairs-1024x683.jpg

    আমরা তো সিঁড়ি দেখে থাকি যে কোনো বাড়ি অথবা পুরোনো বাড়িতেও।  কিন্তু প্রকৃতি নিজের মধ্যেও এক নিখুঁত ঐকতান সৃষ্টি করে রেখেছে। যে কোনো জিনিস আবিষ্কারের আগে অব্দি আমরা সাধারণভাবে কল্পনা করতে পারিই না সেই জিনিসটি তৈরির কলাকৌশল। কুঠার আবিষ্কারের আগে কি কাঠ কাটা হতো না ? নিশ্চই হতো এবং তা হতো অবশ্যই পাথরের সাহায্যে। তেমন করেই পাথরের ওপরে পাথর চাপিয়ে যে মানুষটি প্রথম উঁচুতে উঠল নিচু থেকে সেও তো একজন আবিষ্কারক। সেই তো সিঁড়ির ধারণার প্রথম ইঞ্জিনিয়ার। কোন সভ্যতার কোনো একটি দিনে সেই মানুষটির আবিষ্কারের কথা লেখা নেই কোনো সংগ্রহশালার তাকে।

    এই ‘আবিষ্কারক’ প্রসঙ্গে মনে পড়ল পথের পাঁচালী বইটির একটা অংশ। আমাদের সময় উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা টেক্সট বইয়ে সেই অংশটুকু পড়তেই হতো যা এখনো গেঁথে আছে মনে। শোনাই আপনাদের --

    “তুমি চলিয়া যাইতেছ…তুমি কিছুই জানো না, পথের ধারে তোমার চোখে কি পড়িতে পারে, তোমার ডাগর নবীন চোখ বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধায় চারিদিককে গিলিতে গিলিতে চলিয়াছে–নিজের আনন্দের এ হিসাবে তুমিও একজন দেশ-আবিষ্কারক। অচেনার আনন্দকে পাইতে হইলে পৃথিবী ঘুরিয়া বেড়াইতে হইবে, তাহার মানে নাই। আমি যেখানে আর কখনও যাই নাই, আজ নতুন পা দিলাম, যে নদীর জলে নতুন স্নান করিলাম, যে গ্রামের হাওয়ায় শরীর জুড়াইল, আমার আগে সেখানে কেহ আসিয়াছিল। কিনা, তাহাতে আমার কি আসে যায়? আমার অনুভূতিতে তাহা যে অনাবিষ্কৃত দেশ। আমি আজ সর্বপ্রথম মন, বুদ্ধি, হৃদয় দিয়া উহার নবীনতাকে আস্বাদ করিলাম যে।“
     
    চলবে.........
     
    ©গৌতমদত্ত।
     
  • ধারাবাহিক | ১৪ অক্টোবর ২০২২ | ২৬৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ১৪ অক্টোবর ২০২২ ২২:৫৩512850
  • অসাধারণ । 
     
    মাঝে মাঝে ভেবেছি ইতালির ভুবন বিখ্যাত অপেরা হাউসের নাম সিঁড়ি কেন ? লা স্কালা ? 
     
     
    মেসোপটেমিয়ার উর শহর আব্রাহামের জন্মভূমি । বাগদাদ থেকে বাসরা অভিমুখে যে ট্রেনটি সন্ধে নাগাদ ছাড়ে, মাঝ রাতে উর পার হয়। 
     
    মায়াদের সিঁড়ির গল্প শোনার আশায় উৎসুক হয়ে আছি। 
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন