এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • সিঁড়ির সাতকাহন  (৮) 

    Goutam Dutt লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ৩০ নভেম্বর ২০২২ | ১৪৪ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)

  • (৮)

    ক্রমশঃ মানুষ পাকা বাড়ি তৈরি করতে যখন শুরু করল তার পর থেকেই সেই বাড়ির আকার আর আয়তন অনুযায়ী সিঁড়ি তৈরির নকশাও পাল্টাতে থাকল। পরবর্তীকালে, শাস্ত্রীয় প্রাচীনত্বের সময়কালে, গ্রিকো-রোমান জটিল সিঁড়িগুলি নির্মিত হতে শুরু করে। প্রথমে সোজা খাড়াই সিঁড়ি থেকে সর্পিল, জিগজ্যাগ কিংবা অন্য সব নকশায় সিঁড়ি পালটাতে থাকল। খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে রোমান স্থাপত্যের বোলবোলাও থেকে সিঁড়ি সর্পিল আকার নিতে শুরু করে। অল্প জায়গাকে ব্যবহার করে এই সর্পিল সিঁড়ি বানানো হ’ত। 
     
    সত্যি কথা বলতে কি, এই সর্পিল আকারের ধারণা যখন থেকে মানুষ পেল তখন থেকেই খুব কম জায়গায় সিঁড়ি তৈরি হতে শুরু হলো। অনেক পরে মধ্যযুগীয় স্থপতিরা বিভিন্ন ধরনের গতিশীল আকারের পরীক্ষা-নিরিক্ষা শুরু করেন। কিন্তু এই পরীক্ষার সফল রুপায়ণ আসে রেনেসাঁ শিল্পী এবং স্থপতিদের হাত ধরে। 
     
     
    Château Chambord in the Loire Valley, France (1519–1547). – ফ্রান্সের লোয়ার উপত্যকায় চিটো চেম্বর্ড (1519-1515)।

    ফ্রান্সের লোয়ার উপত্যকায় চিটো চেম্বর্ড এর এই দ্বৈত হেলিক্স (বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে স্ক্রু’র মতো পেঁচানো) সিঁড়ি।
     
    মানুষ এর চরিত্রই হল উন্নতির। উন্নতি বিজ্ঞানের, উন্নতি স্থাপত্যের, উন্নতি সাহিত্যের, উন্নতি জীবনের। সেই সূত্র ধরেই ফ্রান্সের লোয়ার ভ্যালিতে তৈরি হয়েছিল এই চিটো চেম্বর্ড। হাজির হ’ল দুদিক দিয়ে ওঠা নামার সিঁড়ি যার পোষাকি নাম ‘ডাবল হেলিক্স’ সিঁড়ি। কি দরকার ছিল অযথা এমন সিঁড়ির ? ছিল মশায়েরা ছিল। তখন তো আর লিফট আসে নি অথচ ভি.আই.পি কল্‌চর নিঃসন্দেহে এসে গেছে। তাই রাজা রানী পাত্র অমাত্যদের সাথে চাকরবাকরেরা যাতে একসাথে না উঠতে পারে তার জন্য মানুষকে ভাগ করার প্রথা শুরু হ’ল। শোনা যায় এই হেলিক্স সিঁড়ির আসল ডিজাইনার নাকি লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। তিনি করলে কি হবে – ব্যবহারের প্রণালী তো শুরু করবে রাজা মন্ত্রীরা। যেমন খ্রীস্টপূর্ব চারশ অব্দে গ্রীক পণ্ডিত ডেমোসিত্রাস (Democritus) যখন প্রথম জেনেছিলেন ‘এটম’ এর অস্তিত্ব, তখন কি ভেবেছিলেন যে  ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই আমেরিকার বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার তা দিয়ে আস্ত একটা বোমা বানিয়ে একটা নিরীহ দ্বীপ ‘হিরোশিমা’কে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন সে বছরেরই ৬ আগস্ট। তৈরি করবেন মানবজাতের এক স্থায়ী কলঙ্ক !
    তবে সেই নিত্যনতুন নকশার সিঁড়িগুলো কিন্তু অবশ্যই তাদের নান্দনিক, স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে একটা দিক নির্দেশ করেছিল। আমাদের কল্পনার জগতকে উজ্জীবিত করেছিল।

    আসলে এই হেলিক্যাল (helical) সিঁড়ি যা একটা স্ক্রু-র প্যাঁচের মতো উঁচুতে উঠতে সাহায্য করে, তা বানাতে লাগে খুব অল্প জায়গা। তাই একে সর্পিল (spiral) সিড়ি, ঘূর্ণায়মান (winding) সিঁড়ি, বৃত্তাকার (circular) সিঁড়ি, উপবৃত্তাকার (elliptical) সিঁড়ি, ডিম্বাকৃতি (oval) সিঁড়ি, জ্যামিতিক (geometric) সিঁড়ি, ঘন্টাঘর (belfry) সিঁড়ি, বুরুজ (turret) সিঁড়ি ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে।

    উঁচুতে চড়া ছাড়াও এই হেলিক্যাল সিঁড়ির দরকার ছিল প্রতিরক্ষার কাজেও। ভারতের বিভিন্ন পুরোনো দুর্গে আমরা দেখতে পাই এই ধরনের লোক-ঠকানো সিঁড়ির ব্যবহার। মনে পড়ছে মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদের কাছে দৌলতাবাদ দুর্গের কথা। দুর্গের প্রহরী বা আবাসিকরাই জানতেন এই সিঁড়ির কোনটা আসল বা কোনটা নকল। অন্ধকার এই সিঁড়ি কখনো বা ভাগ হয়ে যেত এবং জানা না থাকলে ওপরে ওঠার বদলে নেমে আসতো লুকোনো প্রহরীর অস্ত্রে মৃত্যুও। সংকীর্ণ আর আধা-অন্ধকার পথেই তৈরি করা হত এই হেলিক্যাল সিঁড়িগুলো।

    ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে জানতে পারি যে, খ্রীষ্টপূর্ব ৯৭০ অব্দে সলোমনের মন্দিরের মাঝের চেম্বার পর্যন্ত একটা এমন ঘূর্ণায়মান (winding) সিঁড়ির কথা।



    রোমের ‘ট্রোজান কলাম’ (Trajan's Column) একটি রোমান যুদ্ধ বিজয়ের স্তম্ভ, যা ডেসিয়ান যুদ্ধে (Dacian) রোমান সম্রাট ট্রোজানের বিজয়কে স্মরণ করে। ১১৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই বিজয়স্তম্ভের অন্দরে রয়েছে ১৮৫ ধাপের এক সিঁড়ি যা এই স্তম্ভের চুড়োয় উঠতে সাহায্য করে।

     
     
        
    Rembrandt’s painting “Philosopher in Meditation” (1632)

    রেমব্রান্টের এই “Philosopher in Meditation” ছবিটিতে সুর্যের আলো একটা দার্শনিক চেতনার প্রতীক। সাথের সিঁড়িটি সেই চেতনাকে পৌঁছে দিতে চায় সেই জ্ঞানের দিকে, যেখানে আলোর ঝকমকানি সর্বদাই। আসলে আরোহণ এই শব্দটি মানুষের জ্ঞান আর অগ্রগতির প্রতীক অনেককালই। হয়তো বা এই ছবি থেকেই জন টেমপ্লারের মত একজন পণ্ডিত সেই ঐতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করে লিখেছিলেন সে বিখ্যাত বই -  “The Staircase:History and Theories”, ১৯৯২ তে।




    Quinta da Regaleira, Sintra, Portugal
    ‘কুইন্টা রে রেজালিরা’ বা ‘অনার সিঁড়ি’

    চোদ্দ থেকে সতেরো খ্রীষ্টাব্দ ইউরোপের রেনেসাঁ’র সময়কাল। এই সময়েই প্রাচীন গ্রীক এবং রোমান সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের ফলে শিল্পী আর স্থপতিরা মিলে তৈরি করলেন ‘কুইন্টা রে রেজালিরা’। এটি পর্তুগালের সিন্ট্রায়। একে বলা হ’ত ‘অনার সিঁড়ি’। অনেকটা নাট্যশালার মত সিঁড়ি পথে আরোহণের ছবি যেন। 

    ইনিশিয়েশান ওয়েলস ( ইনিশিয়েটিক ওয়েলস বা ইনভার্টেড টাওয়ারও বলা হয়) হলো এখানকার দুটি কূপ যা সিঁড়ির সাথে সারিবদ্ধ ভূগর্ভস্থ টাওয়ারের সাথে যুক্ত। এই কূপগুলি কখনই জলের উৎস হিসাবে কাজ করেনি। পরিবর্তে, এগুলি আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত যার মধ্যে একপ্রকার দীক্ষার আচার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পার্কের চারপাশে অবস্থিত বিভিন্ন গুহা এবং অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভ ছাড়াও উপরে বর্ণিত সুড়ঙ্গগুলি এই কূপগুলিকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত।


    ছবিটি কূপের নীচ থেকে তোলা।

    দুটি কূপের মধ্যে, বড়টিতে একটি সাতাশ-মিটার সর্পিল সিঁড়ি রয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ছোট চাতাল রয়েছে। এই চাতালগুলোর ব্যবধান, সিঁড়িতে ধাপের সংখ্যার সাথে হিসেব করেই তৈরি আর “ট্যারোট” রহস্যবাদের সাথে যুক্ত। ছোট কূপটিতে সোজা সিঁড়ি রয়েছে যা রিং-আকৃতির মেঝেগুলির একটিকে আরেকটির সাথে সংযুক্ত করে। এই কূপটিকে 'অসমাপ্ত কূপ'ও বলা হয়।
     
    #
    চলবে........ 
     
    #
    ©গৌতমদত্ত।
     
     
  • ধারাবাহিক | ৩০ নভেম্বর ২০২২ | ১৪৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    থ: ! - Bitan Polley
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল প্রতিক্রিয়া দিন