এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • চাঁপাফুলের গন্ধে

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ জানুয়ারি ২০২৪ | ১৩৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • শালকিবুড়ি ম্যাজিক জানে। কবিতার থেকে ভালো করে আর কেউ সেটা জানেনা। আজ অবধি কবিতার দিকে কেউ কখনও তাকায়নি। বিয়ের আগে  যখন ফরসা সুজাতা, চাপাফরসা কাকলি, ঘষাফরসা সুমিতারা কোলেকাঁখে দুটো একটা বাচ্চা নিয়ে সেই বারো-তেরো-চোদ্দো থেকেই ঘুরছে, তখনো কবিতাকে কেউ চিঠি দেয়নি, কেউ ওর ওড়না ধরে টানেনি, কেউ ইস্কুলের পেছনের রাস্তায় নিয়ে যেতে চায়নি। তার ওষুধ জানত কেবল শালকি বুড়ি। কিন্তু তখন শালকিবুড়ির কথা কবিতার মনে আসেনি।

    বিয়েতেও সুশান্ত তার দিকে তাকায়নি। না, চৌধুরীরা গায়ের রং দেখে কাউকে কালো বলে গঞ্জনা দেবে এরকম সহবত তাদের নয়। কেবলমাত্র অদ্ভুত দৃষ্টিতে কবিতার দিকে তাকিয়ে ছিল আত্মীয়রা। মেজকাকি বলেছিলেন, “কিসে আর কিসে, সোনা আর সিসে।” মাসশাশুড়ি বললেন, “তা দিদি তোর এই কালোবৌয়ের গায়ে গয়নাগুলো খুলেছে ভালো। আগের জনের  তো সোনার অঙ্গে সোনার কাঁকন মোটে দেখা যেতনা কিনা। সে যেন ছিল ঠিক চাঁপা ফুলটি।”  
    যাবার আগে আড়ালে আবডালে তারা কালোবৌ নামটা চালু করে দিয়ে গেল। এসবের ওষুধও শালকিবুড়ির জান ছিল। aতখনও শালকিবুড়ির কথা মনে আসেনি কবিতার। 

    বিয়ের পরেও মাস গড়িয়ে বছর। চৌধুরী বাড়ির ছেলে যে কালোবৌকে মোটেই দেখতে পায় না। বছর গড়িয়ে দু-বছর। অদৃশ্য যেন। একসময় কালোবৌয়ের কেমন যেন নিজেকেই ছায়া ছায়া মনে হতে থাকে। অদৃশ্য যেন। ছায়াশরীরে মাংস গজানোর অব্যর্থ ওষুধও শালকিবুড়ির জানা। কিন্তু তখনও তার  কথা ভাবেনি কবিতা।  

    ঠিক ওই সময়েই একদিন বাপের বাড়িতে ঘষাফরসা সুমিতার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল কবিতার। “অনেকদিন এদিগে আসিনি। শাউড়ি ঠ্যাং ভেঙে শয্যা নেছিল বছরখানেক। তা তকন থেকেই সব এই আমার ঘাড়ে।’’ হেসে হেসে বলে সুমিতা। তারপর এদিক ওদিক দেখে বলে, “সেবা করিনি তা নয়। শাউড়ির মেয়ে তো পথও মাড়াল না। গু, মুত সবই আমি। তবে মুতটা পুরো কোনদিনই ফেলতুম না বুজলি, খানিকটা মাগির খাবার জলেই মিশিয়ে দিতুম।” হি হি হি হি করে হাসতে থাকে সুমিতা কিন্তু, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে কবিতার সোনার মটর দানা হারের দিকে।       
    হাসি থামিয়ে খানিকটা দম নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “কিন্তু তুই কেন দু-বছরে একটাও নামালি না বলতো? মাকাল ফল নাকি রে? বন্দুকে গুলি নেই?”
    কবিতা কিছু বলেনা। যাবার আগে চোখ মটকে সুমিতা বলে, “ঠাকুরের দোর-টোর ধর না, ঠিক বাচ্চা আসবে। সব রোগেরই চিকিচ্ছে আছে।”
    চিকিৎসার কথায় শালকি বুড়ির কথা মনে পড়ে কালোবৌয়ের। দিদমা বলেছিল শালকি বুড়ির কাছে সব রোগের চিকিচ্ছে আছে।

     একা একা শালকিবুড়ির কাছে যায় কবিতা। শাউড়িকে বলেই। সব শুনে শালকিবুড়ি বলে, "ওষুধ আচে আমার কাছে। আশেপাশে যখন সব চকচকে তখুন চোক ধাঁধিয়ে যায়। কিন্তু, চারিদিক যখন আঁধারে ছেয়ে যায় তখুন মানষে হারানিধি খুঁজে পায়। সব ওষুধ আচে আমার কাচে। কিন্তু সেই ওষুধ তুই দিবি কিনা ভেবে দেখ।” শনের মত চুল বাতাসে ওড়ে শালকিবুড়ির। 
    ওষুধ নিয়ে আসে কালোবৌ। গলার মটর মালাটা খুলে দিয়ে আসে বুড়িকে। বুড়ির চোখ চকচক করে, বলে, “ওষুধ একটু তিতকুটে, তেতো তরকারির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। বিটা হলে মিষ্টি খাইয়ে যাস নাতিন।” 

    এরপর থেকেই মাঝেমাঝেই সুশান্ত সিঁড়ির ধাপ গুলিয়ে ফেলতে থাকে সুশান্ত। চশমা হয় সুশান্তর। ভারি চশমায় সুশান্তর লম্বাটে মুখটা আরও সুন্দর লাগে কবিতার কাছে।
    ক্রমশ কেবল সিঁড়ি নয়, পায়ের তলার মাটি টালুমালু হতে থাকে, কাগজের লেখা হিজিবিজি হয়ে যায়। সুশান্ত হাওয়ায় হাত বাড়ায়। এবার সুশান্তর কাউকে একটা প্রয়োজন হয়।  কালোবৌ ধারে কাছেই থাকে, এগিয়ে এসে সুশান্তর হাতটা ধরে।
    কালোবৌ কখনো নিমপাতা ভাজে বেগুন দিয়ে, পাঁচফোড়ন দিয়ে সবুজ করলা ঝিরিঝিরি করে তরকারি বানায়। কখনো আবার পলতাপাতা তুলে এনে বড়া ভাজে। তেতো কষাটে স্বাদ হয়। 
    চৌধুরী বাড়ির ছেলের চোখের জ্যোতি কমে আসে। সুশান্তর একটি হাত দরকার হয়। 
    কালোবৌ এগিয়ে আসে। স্বামীর হাত ধরে। 

    সবই ওষুধের গুণ। শালকিবুড়ি ম্যাজিক জানে। কবিতার থেকে ভালো করে আর কেউ সেটা জানেনা।

    ............................................
    এই অসম্ভব মায়াবাস্তবতায় ভরা গল্পটা লিখেছেন অরুন্ধতী। তার খানিকটা নিজের ভাষায়ই লিখলাম। পুরোটা থাকছে গুরুচণ্ডা৯র প্রকাশিতব্য বইয়ে, যার নাম চাঁপাফুলের গন্ধে। কেন বইয়ের এই নাম, গপ্পোটা পুরোটা পড়লেই টের পাওয়া যাবে। অবশ্য গল্প একটা না, অনেকগুলো। তারই একটা নমুনা হিসেবে একটুখানি তুলে দিলাম। 

    বইটি প্রকাশিত হচ্ছে এই বইমেলায়। নতুন গদ্য, নতুনদের গদ্য, নতুনরকম গদ্য আমরা ছাপি, সবাই জানেন। এটা নতুন এবং নতুনরকম, বলাবাহুল্য। পড়েই সেটা বোঝা যাচ্ছে। কারো ভালো লাগলে পড়বেন। অথবা নেড়েচেড়ে দেখবেন। আর কেউ উৎসাহী হয়ে, বংলা সিনেমার বদলে বাংলা বইয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে, দত্তক নিতে চাইলে জানাবেন। এই ঠিকানায়।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন