এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • কোলকাতার মেস বাড়ি

    Sukdeb Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ জুন ২০২৪ | ১৭২ বার পঠিত
  • কোলকাতার মেস বাড়ি
    শুকদেব চট্টোপাধ্যায়

    ‘মেসবাড়ি’ শব্দটার সাথে আমরা সকলেই অল্পবিস্তর পরিচিত, কেউ থেকে, কেউ দেখে, আর বাকিরা পড়ে বা শুনে। জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে যাওয়া পুরনো আমলের স্যাঁতস্যাঁতে দোতলা বা তিনতলা বাড়ি, সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই খানিকটা উঠোন, তারই এক ধারে বড় একটা চৌবাচ্চার পাশে উন্মুক্ত স্নানাগার, কাঠের রেলিং দেওয়া উঁচু উঁচু সিঁড়ি, এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত তারের ওপর জামাকাপড় মেলা, ওপরে দশ বিশটা বিভিন্ন সাইজের ঘর, কড়িকাঠের ছাদ আর খড়খড়ি লাগান জানলা, ঘরের সাইজ অনুযায়ী ভেতরে দুই বা ততোধিক চৌকি পাতা সাথে জিনিসপত্র রাখার জন্য নামমাত্র কাঠের কিছু আসবাব — এটাই ছিল মেসবাড়ির সনাতন ছবি।

    ‘সংসদ’ অভিধান অনুযায়ী ‘মেস’ বলতে বোঝায়, ‘বিভিন্ন ব্যক্তি চাঁদা দিয়া যেখানে একত্রে থাকে; আহারের ও বাসের বারোয়ারী স্থান’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’এ মেসের অর্থ, ‘যে বাসায় কতগুলি লোক একসাথে থাকে ও খায় এবং যেখানে তাহাদের পাকও একসাথে হয়’।

    তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’এ জ্ঞানেন্দ্র মোহন দাস মেস বলতে বুঝিয়েছেন, ‘যে বাসায় একাধিক নিঃসম্পর্কীয় ব্যক্তি একত্রে বাস ও আহারাদি করে’।

    অর্থাৎ মেস এমনই একটা জায়গা যেখানে প্রয়োজনের তাগিদে কিছু মানুষ একত্রে বাস করে এবং খাওয়া দাওয়াও সম্মিলিত উদ্যোগে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিঃসম্পর্কীয় ওই মানুষগুলো দীর্ঘদিন পাশাপাশি থাকতে থাকতে এক গভীর আত্মিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তেন। মেস ছিল আমাদের পরিচিত সংসারের বাইরে নতুন অবয়বে অন্য আর এক ধরণের সংসার। বিচিত্রা পত্রিকার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, “সামাজিক সংসারের সুনির্দিষ্ট ছক থেকে বেরিয়ে অসামাজিক মেসের আলগা এলাকায় প্রবেশলাভের পর তার সূত্রপাতটি ভারি মিস্টি লাগল। বাঁধন আছে কিন্তু বন্ধন নেই; ছন্দ আছে কিন্তু সে ছন্দে মিল বসাবার অযথা উদ্বেগ নেই”।

    অধুনা প্রায় লুপ্ত ‘মেসবাড়ি’ ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধ পর্যন্ত কলকাতার দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল।

    সাহেবদের পছন্দের শহর কোলকাতায় ‘মেস’ শব্দটা ইংরাজি mess শব্দ থেকে এসছে বলে অনেকে মনে করেন। ইংরেজরা কোলকাতায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করার পরে নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের মত করে শহরটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তৈরি হল পাকা রাস্তা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, অফিস, আদালত। ক্রমে কোলকাতা হয়ে উঠল ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। সার্বিক প্রয়োজনে উন্নত হল যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাড়ল যানবাহন। বিশেষ করে রেল পরিষেবা শুরু হওয়ার পর রোজগারের আশায় গ্রাম এবং মফস্বল থেকে দলে দলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ শহরে আসতে শুরু করল। ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ এ ক্ষেত্রে কিছুটা অনুঘটকের কাজ করেছিল। মধ্যস্তত্ব ভোগীদের কারণে মফস্বল এবং গ্রামাঞ্চলে জমি মালিকদের আয় ক্রমশ কমতে থাকে এবং পরিস্থিতির চাপে অনেক ক্ষেত্রে তারা ভূমিহীন হয়ে যায়। রুজি রুটির প্রয়োজন তাদের বাধ্য করে শহরের দরজায় কড়া নাড়তে। ‘কপাল ফিরাইতে চল কলকেতা শহর’। এ ছাড়া বহু ছাত্র এল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করতে। এই মানুষগুলোর অধিকাংশেরই পৃথকভাবে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকার মত সামর্থ্য ছিল না। প্রয়োজন ছিল সস্তায় মাথা গোঁজার মত একটা ঠাঁই এর। এই প্রয়োজনের থেকেই কোলকাতার আনাচে কানাচে গজিয়ে উঠল ‘মেসবাড়ি’ নামক সস্তার আস্তানা। প্রাইভেসির সাথে একটু আপস করলেই সুলভে শহরবাস। শুরু হল নানা জায়গা থেকে আসা মানুষের এক অভিনব একান্নবর্তী জীবনযাপন। আবাসিকদের মধ্যে যতই চারিত্রিক অমিল থাকুক না কেন, দিনের পর দিন একই ছাদের নিচে থাকতে থাকতে নিজেদের অজান্তেই তাঁরা এক সুরে বাঁধা পড়ে যেতেন।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শহরমুখী মানুষের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে আর তার সাথে তাল রেখে বাড়তে থাকে মেসের সংখ্যা। যাতায়াতের সুবিধার জন্য রেল স্টেশন, অফিস পাড়া আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি মেসগুলো গড়ে ওঠে। তাই আমহার্স্ট স্ট্রিট, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, মির্জাপুর স্ট্রিট, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, মানিকতলা, বৌবাজার ও শেয়ালদা অঞ্চলেই মেসের আধিক্য দেখা যায়। এ ছাড়া অন্য জায়গায় যে মেস ছিল না এমনটা নয় তবে তুলনায় অনেক কম।

    মেসগুলোর অধিকাংশই ছিল পাঁচমিশেলি, ছাত্র যুবক বৃদ্ধ সকলেই একত্রে থাকত। তবে কিছু কিছু মেস কিছু কিছু প্রদেশ, জেলা বা অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ ধর্মের জন্য সংরক্ষিত থাকত। সাধারণত সেই জেলা, প্রদেশ বা ধর্মের বাইরের কোন লোক চট করে সেখানে থাকার সুযোগ পেত না। শুধুমাত্র ছাত্রদের জন্য আলাদা মেসও ছিল। এগুলিকে ছাত্রাবাস বলা হত, যদিও ছাত্রদের হস্টেলের থেকে এর জীবনধারা অনেক মুক্ত ও স্বাধীন ছিল।

    আজকের প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে যে হিন্দু হোস্টেল, তার প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৮৬ সালে। তারও আগে সম্ভবত ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি মধ্য কোলকাতার বৌবাজারে প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু হোস্টেল। এই হোস্টেল ছিল একটি ছাত্রদের মেস। এই মেসে থেকেছেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাবা ডঃ গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, স্যার রাসবিহারী ঘোষ, দেবেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ, যদুনাথ মুখোপাধ্যায়ের মত প্রথিতযশা মানুষেরা। ওই ছাত্রাবাসে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় নামে এক কর্মচারী ছাত্রদের কাছে বিক্রির জন্য কিছু বই একটি আলমারিতে রাখতেন। সেই সময় দুর্গাদাস করের লেখা ‘মেটিরিয়া মেডিকা’ বইটির ডাক্তারি ছাত্রদের কাছে ভাল চাহিদা ছিল। লেখকের পরামর্শে গুরুদাস তাঁর আলমারিতে অন্যান্য বইয়ের সাথে ‘মেটিরিয়া মেডিকা’ও রাখতে শুরু করলেন। আর আলমারির ওপর লেখা হল ‘বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরী’। কালের দিনে ওই একই লোকের একই নামে বৌবাজার স্ট্রিটে দেখা গেল এক বিরাট পুস্তক বিপণী। আরো পরে ১৯৮৫ সালে বিবেকানন্দ রোড আর বিধান সরণির সংযোগ স্থলে আত্মপ্রকাশ করল ‘গুরুদাস লাইব্রেরী’। ছাত্রবাসের ওই সামান্য কর্মচারী পরবর্তীকালে হয়েছিলেন ‘গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স’ এর প্রাণ পুরুষ এবং ভারতবর্ষ পত্রিকার অন্যতম মালিক। এই মানুষটির উদ্যোগের সুচনা হয়েছিল ওই ছাত্র মেসে। এই হোস্টেল নিয়ে সুরেশ চন্দ্র ঘোষ তাঁর ‘দাদার কথা’ বইটিতে লিখেছিন — “দাদার(রাসবিহারী ঘোষ) হস্টেল জীবন সুখেই অতিবাহিত হইয়াছিল। তিনি বলিতেন যে হোস্টেলের দিনগুলো তাঁহার যেরূপভাবে কাটিয়াছিল, তেমনটি আর জীবনে কখনও হইল না”।

    সে যুগে একবার যারা মেস জীবনের স্বাদ পেয়েছিলেন, তা তিনি ছাত্রই হোন বা চাকুরিজীবী, সেই স্বাদ তিনি কখনই ভুলতে পারেননি।

    কোলকাতার শোভারাম বসাক লেনের একটি ছোট বাড়িতে ছিল বাঁকুড়া নিবাসী কয়েকটি ছেলের মেস। যার বাসিন্দা ছিলেন প্রবাসী এবং মডার্ন রিভিউ খ্যাত সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, প্রমথ্যনাথ চট্টোপাধ্যায়, নবকৃষ্ণ রায়, পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শচিনাথ রায় প্রমুখ। (ভারত মুক্তি সাধক রামানদ চট্টোপাধ্যায় ও অর্ধ শতাব্দীর বাংলা-শান্তা দেবী)

    ভারতি পত্রিকায় শরৎচন্দ্র রাহা ‘কলিকাতার ছাত্রাবাস’ নামে ১৩০৫ বঙ্গাব্দের কার্ত্তিক সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন। “কলকাতার প্রবাস সমুদ্রের মধ্যে এই ছাত্রাবাসগুলি পাড়াগেঁয়ে ছেলেদের পক্ষে এক একটি তরণীর মত। আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ অনেক আশা ভরসা এই সকল ছাত্রাবাসে পালিত হইতেছে। কলিকাতার জনতাক্ষুব্ধ রাজপথ ও গলির মধ্যে মধ্যে এই সকল অখ্যাত দরিদ্র বাসাগুলি বঙ্গদেশের সারস্বত ধাত্রিশালা’।

    মেসের প্রত্যেক আবাসিককে পালা করে নির্দিষ্ট সময়ের (সাধারনত এক মাস) জন্য মেস পরিচালনার ভার নিতে হত। তাকে বলা হত ম্যানেজার। ম্যানেজারকে মেসের খাওয়া দাওয়া থেকে আরম্ভ করে দৈনন্দিন সব কিছুর তদারকি করতে হত। কেবল তদারকিই নয় খরচাপাতির হিসেব পত্রও রাখতে হত। মেসে একজন রান্নার ঠাকুর ও দৈনন্দিন কাজকর্ম আর ফাই ফরমাশ খাটার জন্য এক বা দুজন ঝি চাকর থাকত। আবাসিকের সংখ্যার ওপর নির্ভর করত ঝি চাকরের সংখ্যা।

    বিচিত্রা পত্রিকার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের খুড়তুতো ভাই সুরেন্দ্রনাথ ঝামাপুকুরে এক ছাত্র মেসে থাকতেন। উপেন বাবুও একসময় কিছুদিনের জন্য সেই মেসে এসে ওঠেন। তখন সুরেন বাবুর মেস ম্যানেজারির পালা চলছে। উপেন্দ্রনাথের লেখা ‘স্মৃতি কথা’য় জানতে পারি – ‘প্রাইভেট মেসের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সকল মেম্বারকে একাদিক্রমে এক এক মাস মেসে ম্যানেজার, অর্থাৎ সংসারের গৃহিণী হতে হয়। ভাঁড়ারের চাবি থাকে, অবশ্য আঁচলে নয়, তাঁর জামার পকেটে; টাকা-কড়ি থাকে তাঁরই বাক্সে; দোকান বাজার হয় তাঁরই খেয়াল এবং হুকুম অনুসারে; আর প্রত্যহ সকাল সন্ধ্যা দু’বেলা তিনিই ভাঁড়ার বার করে থাকেন। মাঝে মাঝে দরকার পড়লে চাকর-বামুনকে দু চার টাকা আগাম প্রাপ্তির জন্য হাত পাততে হয় তাঁরই নিকটে। সর্বোপরি, বাজারের টাকাকড়ির হিসাব দু-চার পয়সা যদি কম পড়ে, অথবা মবলগ দু-চার আনা আত্মসাতের বিষয়ীভূত হয়েছে বলে যদি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলে সে কথা ক্ষমা অথবা উপেক্ষা করবার একমাত্র মালিক ম্যানেজার। সুতরাং যাঁর যখন ম্যানেজারির পালা, চাকর বামুনদের ওপর তাঁর তখন প্রভাব-প্রতিপত্তি সকলের চেয়ে বেশি”।
    ম্যানেজারের দাদা হওয়ার সুবাদে মেসের ঠাকুর চাকরদের কাছে উপেন্দ্রনাথ ওই সময় একটু বেশি খাতির পেতেন।

    বাংলা সাহিত্যের অনেক প্রথিতযশা সাহিত্যিক জীবনের কিছুটা সময় (কেউ কেউ অনেকটা সময়) মেসে কাটিয়েছেন। অনেক কালজয়ী রচনা মেসেতে বসেই রচিত হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই তাঁদের অনেক লেখাতেই মেস জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে। কারো কারো গল্পের তো মূল চরিত্ররাই মেসের বাসিন্দা।

    ৭২ বনমালী নস্কর লেন দিয়ে শুরু করা যাক। স্রষ্টা বহুদিন আগে চলে গেলেও ‘ঘনাদা’ কিন্তু ওই ঠিকানার চিলেকোঠার ঘরে শিবু, শিশির, গৌর আর সুধিরকে নিয়ে আসর জমিয়ে আজও পাঠকের মনে রয়ে গেছেন। ‘টুপি’ গল্পে ঘনাদার ঠিকানাটা আমরা জানতে পারি। পূর্ববঙ্গ থেকে আসার পর বিয়ে করে ঘর সংসার পাতার আগে পর্যন্ত প্রেমেন্দ্র মিত্র বহুদিন কাটিয়েছিলেন গোবিন্দ ঘোষাল লেনের মেসবাড়িতে। দীর্ঘ মেস যাপনের অভিজ্ঞতা তাঁর রচনায় বারে বারে প্রতিভাত হয়েছে।

    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিছুকাল ২৭ নং বাদুড়বাগান লেনের একটি মেসবাড়িতে ছিলেন। রাস্তাটা সুকিয়া স্ট্রিটের বাই লেন। হয়ত ‘চুনিলাল’এর সন্ধান ওখানেই পেয়েছিলেন।

    ওই বাড়িতেই থেকেছেন কবি ও সাহিত্য সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার এবং সজনীকান্ত দাস। সজনীকান্ত অবশ্য শনিবারের চিঠির সম্পাদক হিসাবে বেশি পরিচিত। শনিবারের চিঠিতে তিনি প্রথমে লেখক এবং পরে সম্পাদক হন। মোহিতলালের অধিকাংশ লেখাই ছাপা হত শনিবারের চিঠিতে। দুই লেখকের সহাবস্থানে ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্য।

    ৬৬নং হ্যারিসন রোড। ১৯১৭ সালে তৈরি ‘প্রেসিডেন্সী বোর্ডিং হাউস’ আজ বয়সের ভারে জীর্ণ। এই মেসের দোতলায় এক সময় থাকতেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মেস বাসেরই ফসল তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ব্যোমকেশ’। স্রষ্টার মত সৃষ্টিও থাকত হ্যারিসন রোডের একটা মেসে। সাথে থাকত তার জীবনীকার অজিত আর কাজের লোক পুঁটিরাম। ‘প্রেসিডেন্সী বোর্ডিং হাউস’এ ১৯২২ সালে বাস করতে আসেন জীবনানন্দ দাস। তখন তিনি সিটি কলেজে ইংরাজির অধ্যাপক। তাঁর বহু রচনার আঁতুড় ঘর এই মেসবাড়ি। তাঁর অনেক রচনায় উঠে এসেছে মেসবাড়ির কথা।

    চোদ্দ নং হাবশী বাগানের একটা মেসেতে থাকতেন পরশুরাম। ওই মেসেরই ছোট্ট পরিসরে ‘বিরিঞ্চি বাবা’ আবির্ভূত হয়েছিলেন।

    বিভূতিভূষণের প্রসঙ্গ আসলেই মনে ভেসে ওঠে ঘাটশিলা, ইছামতি, লবটুলিয়া, নিশ্চিন্দিপুর ইত্যাদি জায়গার কথা। পাহাড়, জঙ্গল, পাড়াগাঁ, এইসব নিয়েই কেটে গেছে তাঁর গোটা জীবন, এমনটাই আমাদের ধারণা। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে শহর কলকাতারও কিছু অবদান আছে। আর সেই অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল মির্জাপুরের এক মেসবাড়িতে। ১৯৫০ সালে ঘাটশিলার রাজবাড়িতে বিভূতি বাবুকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানে সেদিন আরো অনেক গুণীজন উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে বিভূতি বাবু বলেন যে তরুণ বয়সে তিনি কলকাতার মেসে বেশ কিছুকাল কাটিয়েছিলেন। ওই মেসের বাসিন্দারা অধিকাংশই চাকুরীজীবী ছিলেন। সকলে অফিস চলে গেলে ফাঁকা মেসে আয়েস করে পড়তেন বটতলার উপন্যাসগুলো। ওই সময়কার স্মৃতি পরবর্তীকালে তাঁর লেখার অনেক উপাদান জুগিয়েছে।

    শীর্ষেন্দু, সমরেশের মত বহু খ্যাতনামা মানুষ জীবনের কিছুটা সময় মেসের ঘ্রাণ নিয়েছেন। তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির ব্যঞ্জন নিপুণ হাতে পরিবেশিত হয়েছে তাঁদের রচনায়।
    তবে মেসবাড়িকে যিনি সবথেকে আপন করে নিয়েছিলেন তিনি হলেন শিবরাম চক্রবর্তী। চোরাবাগান ও কলাবাগানের সঙ্গম স্থলে ১৩৪ নং মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের জরাজীর্ণ একটি মেসবাড়ির দোতলার একটি ঘরে কাটিয়ে দিলেন জীবনের অনেকটা সময়। বাড়ির নম্বর মনে রাখার সহজ উপায় ছড়ায় বলে দিয়েছিলেন —

    এক দুই তিন চার/ গুণে জান বার বার/
    বাদ দিন দ্বিতীয়কেই/ পেয়ে যাবেন তাহলেই।

    শ্যাওলা পথ দিয়ে সাবধানে এগিয়ে রান্নাঘরকে পাশ কাটিয়ে নড়বড়ে রেলিং এর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে মার্কাস স্কোয়ারের দিকে খোলা বারান্দার ধারে শিবরামের ঘর। চারদিকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভেজান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ত সারা দেওয়াল জুড়ে পেন্সিল আর কাঠকয়লার অজস্র আঁকিবুঁকি। চারিদিকে অজস্র নাম ঠিকানা আর ফোন নং লেখা। ওইটাই ওনার অ্যাড্রেস বুক। খাতা হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু দেওয়াল হারাবে না তাই ওখানে লেখা। নতুন নতুন ঠিকানা আসার কারণে সে লেখা নিত্যদিন বাড়তেই থাকত। ঘরের মেঝে এতটুকু খালি নেই, চারিদিকে জিনিসপত্র ছড়ান। জিনিসপত্রের মধ্যে অনেকটাই আবর্জনা। আসবাব বলতে একটা নড়বড়ে তক্তপোষ, একটা হাতল ভাঙা চেয়ার, ছোট্ট একটা টেবিল, একটা ট্রাঙ্ক আর একটা পাল্লা ভাঙা আলমারি। তক্তপোষের ওপর চাদরের নিচে পাতা থাকত জেল থেকে আনা দুটো কম্বল। কম্বলের ব্যাপারে বলতেন—আমার জীবনসঙ্গী। আমার বন্দিজীবন আর মুক্তারামের মুক্ত জীবনের যোগসূত্র। তক্তপোষেই শিবরামের শোয়া, খাওয়া, লেখা, সবই হত। ওখানেই শুয়ে শুয়ে লিখতেন। একটা খবরের কাগজ পেতে তার ওপর থালা রেখে খেতেন। অতিথিরাও এখানে এসে বসত।

    হাল হকিকত জিজ্ঞেস করলে বলতেন, “মুক্তারামে থাকা, তক্তারামে শোওয়া আর শুক্তারামে ভক্ষণ”। এটাই ছিল তাঁর ‘ক্লাস ওয়ান’, ‘মারভেলাস’, ‘ফাসকেলাস’ থাকা। যাবতীয় স্বাচ্ছন্দের থেকে মুখ ফিরিয়ে মুক্ত পুরুষের মত আহ্লাদে কাটিয়েছেন সারাটা জীবন। চক্কোত্তি মশাইয়ের মত একজন মুক্ত মানুষই পারে নিজের জীবন নিংড়ে অমন গল্পের পসরা সাজাতে।
    যেহেতু বাংলা সাহিত্যে মেসবাড়ির কথা নানা জনের কলমে নানাভাবে এসেছে, আর সিনেমা সাহিত্যের হাত ধরেই চলে, অন্তত একসময় চলত, তাই অনেক সিনেমাতে দেখা গেছে মেসবাড়ির নানান কাণ্ডকারখানা।

    প্রথমেই নাম করতে হয় ১৯৫৩ সালের ২০ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া বিজন ভট্টাচার্যের কাহিনি অবলম্বনে নির্মল দের “সাড়ে চুয়াত্তর”। “অন্নপূর্ণা বোর্ডিং হাউস”এর ম্যানেজার রজনী বাবু(তুলসী চক্রবর্তী), তাঁর স্ত্রি(মলিনা দেবী) আর বোর্ডিং এর রং বেরং এর বাসিন্দারা কয়েক প্রজন্ম ধরে দর্শক হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছেন। মেসবাড়ি নিয়ে আর একটি বিখ্যাত ছবি দিনেন গুপ্তের ‘বসন্ত বিলাপ’। ছবিটি ১৯৭৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল। মহিলা মেসের আবাসিকদের সাথে পাশের বাড়ির তরুণদের অম্লমধুর সম্পর্কের বিচিত্র সব ঘটনা দর্শকদের জুগিয়েছে অফুরন্ত হাসির খোরাক।
    এ ছাড়া সপ্তপদী, হিন্দিতে বিমল রায়ের পরিচালনায় ‘নৌকরী’, শক্তি সামন্তের ‘অমর প্রেম’’, ‘দেবদাস’, প্রভৃতি নানা ছবিতে মেসবাড়িকে আমরা নানারূপে প্রত্যক্ষ করেছি।

    খেলাধুলার জগতের সাথে মেসবাড়ির ভালরকম চেনাজানা আছে। কোলকাতায় খেলতে এসে প্রথম জীবনে খেলোয়াড়দের অনেককেই কাটাতে হয়েছে শহরের নানা মেসে।

    ১৪৪ বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট। এটা কেবলমাত্র একটা ঠিকানা নয়, কোলে মার্কেটের ওপর বাবলু কোলের এই বাড়িটির একটা আলাদা পরিচয় আছে। বহু ক্রিকেটার কোন না কোন সময় এইখানে থেকেছে। অশোক দিন্দা, ঋদ্ধিমান সাহার মত দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা খেলোয়াড়েরাও সেই তালিকায় আছে। ওইখান থেকেই একসময় তারা রাজ্য, আই পি এল এমনকি দেশের হয়েও খেলেছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিভাবান তরুণরা কলকাতায় খেলতে এলে অধিকাংশেরই ঠিকানা হয় এই মেসবাড়ি। খেলা পাগল মালিকের বদান্যতায় অনেক উঠতি ক্রিকেটারকে এখানে বিনামূল্যে থাকতে দেওয়া হয়।

    বহুদিন খেলোয়াড়দের লালন পালন করেছে ৩৭ নং রয়েড স্ট্রিটে মোহনবাগান মেস। একসময় মোহনবাগানে বাইরে থেকে খেলতে আসা সব খেলোয়াড়ই এখানে থাকত। ৭০-৮০ দশকে সুব্রত ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু, মহম্মদ হাবিব, প্রদীপ চৌধুরীদের মত বহু নামী দামী খেলোয়াড় এই মেসে থেকেছে। আড্ডা ,ইয়ার্কি, ঠাট্টা, বড় ম্যাচের আগের রাতের টেনশন, বড় ম্যাচ বা ট্রফি জেতার আনন্দ, উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ, কতকিছুর সাক্ষী দীর্ঘ স্মৃতিবিজড়িত এই মেসবাড়ি। আজ অবশ্য সবটাই অতীত। এখন হোটেল বা দামী আবাসন ছাড়া খেলোয়াড়েরা থাকতে চায় না। সামনের রাস্তায় চলা ট্রামের মত এই মেসও আর কিছুকাল পরে ইতিহাস হয়ে যাবে।

    কোলকাতার আড্ডা নিয়ে অনেক গল্প আছে। বাড়ির রক থেকে শুরু করে কফি হাউস, পার্ক, পাড়ার চায়ের দোকান, বৌঠকখানা, বই এর দোকান, একটু পরিসর আর পরিবেশ পেলেই বসে যেত আড্ডা। এ ছিল এক নেশার মত। গুলতানি, রঙ্গ রসিকতা, তর্কবিতর্কর মাঝে ইতি উতি চলত শিল্প সাহিত্য চর্চা।

    কোলকাতার আড্ডার ইতিহাসেও মেসবাড়ি বেশ কিছুটা জায়গা দখল করে আছে। ওয়েলিংটন স্কোয়ার অধুনা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের একটা কোণে ছিল ‘সাকি’ মেস। ঐ মেসের বাসিন্দা মুকুল গুহর লেখা থেকে জানতে পারি যে ওখানে আড্ডার ঝড় বইত। ঐ মেসেতে থাকতেন শিল্পী প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্র, খেলোয়াড় অজয় দাশগুপ্ত, ভাষ্যকার শরদিন্দু দত্ত প্রভৃতি। এলোমেলো ওই আড্ডার টানে ওখানে হাজিরা দিতেন প্রসূন মিত্র, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্কর ঘোষ, দেবব্রত বিশ্বাসের মত ব্যক্তিত্বরা।

    মির্জাপুরে ত্রিপুরা হিতসাধিনী হলের পাশে একটা মেসবাড়িতে জমিয়ে আড্ডা দিতেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, গোকুল নাগ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিষ্ণু দে। এই আড্ডাকে বলা হত ‘কল্লোলীয়’ আড্ডা।

    রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও মেসবাড়ির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। বিভিন্ন সময়ে বহু বিপ্লবীর আস্তানা ছিল মেসবাড়িগুলি। তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্যের ‘অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা’ (পত্রলেখা ২০১৫) বইটিতে বেশ কিছু বিপ্লবী মেসের খবর পাওয়া যায়। বাইরে থেকে এগুলো আর পাঁচটা সাধারণ মেসের মতই ছিল। পাঁচমিশেলি আবাসিকদের মাঝে পুলিশে চোখে ধুলো দিয়ে চলত স্বদেশীদের গোপন কর্মকাণ্ড। ১০৭ নং আমহার্স্ট স্ট্রিটের ছাত্রাবাসটি ছিল বিপ্লবীদের একটা বড় ঘাঁটি। খুলনা ষড়যন্ত্র মামলার রায়ে ভবানী চরণ দত্ত স্ট্রিটের একটি মেসের উল্লেখ আছে। বিপ্লবীদের আর একটি মেস ছিল ভবানীপুরের ১৯ এফ বৈঠকখানা রোডে। বিপ্লবী প্রফুল্ল দত্ত এই মেসে থাকতেন। উদ্যোগপতির পেশার আড়ালে তিনি গুপ্ত সমিতির অ্যাকশন স্কোয়াড পরিচালনা করতেন।

    সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের মেসে থাকতেন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (নিরালম্ব স্বামী)। এখানেই ছিল বিপ্লবীদের গোপন ডেরা “বান্ধব বোর্ডিং”। এই মেসে রাত কাটিয়েছেন প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলি, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, অনুকূল চক্রবর্তীর মত বিপ্লবীরা। শঙ্কর ঘোষ লেনের একটি মেসে মিলিত হয়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়(বাঘাযতীন), নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য(মানবেন্দ্র নাথ রায়),  যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, এবং অতুল কৃষ্ণ ঘোষের মত কলকাতার বিপ্লবী আর নরেন ঘোষ চৌধুরী, যোগেন বসু, মনোরঞ্জন গুপ্ত প্রমুখ বরিশালের বিপ্লবীরা । সেই অতি গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল উভয় দলের যৌথ উদ্যোগে জার্মান সরকারের সহায়তায় ভারতে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটান। ১৩ নং শঙ্কর ঘোষ লেনের মেস থেকে গেপ্তার হন শিবপুর ডাকাতি মামলায় অভিযুক্ত সত্যেন্দ্র সেন। ওই মেসেতেই থাকতেন বিপ্লবী অশ্বিনী গাঙ্গুলি, বিজয় মিত্র, মনোরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুধীর কুমার দাশগুপ্ত প্রমুখেরা। ছাপোষা মানুষদের মেসগুলো ছিল বিপ্লবীদের আত্মগোপনের আদর্শ যায়গা। রাজাবাজারে ট্রাম কোম্পানির কর্মচারীদের একটা মেসে গা ঢাকা দিয়ে ছিলেন শশাঙ্ক মোহন হাজরা। বিপ্লবী ভুপেন্দ্র নাথ দত্তের লেখা ‘বিপ্লবের পদচিহ্ন’, বারীন্দ্র কুমার ঘোষের ‘অগ্নিযুগ’, যদুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের ‘বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি’, পুলিনবিহারী দাসের ‘আমার জীবন কাহিনী’, হেমচন্দ্র কানুনগো-র ‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’, নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিপ্লবের সন্ধানে’, সতীশ পাকড়াশীর ‘অগ্নিযুগের কথা’, জিতেশ চন্দ্র লাহিড়ীর ‘নমামি’ ইত্যাদি বইগুলিতে পাওয়া যায় মেসবাড়িতে ঘটা বিপ্লব কেন্দ্রিক নানা ঘটনার সন্ধান। এ ছাড়াও সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, নরেন সেন স্কোয়ারে সাতকড়ি ব্যানার্জির মেস, শোভারাম বসাক লেনের ‘আত্মোন্নতি’ মেস, হ্যারিসন রোডে মণি চৌধুরীর মেস, ফকীর চাঁদ মিত্র স্ট্রিটের মেস, শহরের এমন বহু মেসে চলত বিপ্লবের মন্ত্রপাঠ। পরাধীন ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলন এবং সত্তরের দশকে দিন বদলের স্বপ্ন দেখা তরুনদের আন্দোলন, মেসবাড়ি সব কিছুরই নীরব সাক্ষী।

    কিছুকাল আগে ‘হেরিটেজ ওয়াক ক্যালকাটা’ নামে একটি সংস্থা মেসবাড়ি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় ‘মেসবাড়ি প্রোজেক্ট’। ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট আর্কাইভ এবং ১৯১৫ ও ১৯৩৫ সালের স্ট্রিট ডিরেক্টরি ধরে খোঁজ চালিয়ে তাঁরা দেখেন, ১৯৭০ সালের আগে খোলা মেসের মধ্যে এখনও চালু আছে ২৬টি। তাঁদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চালু থাকা মেসবাড়ির মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ১৯১১ সালে তৈরি হওয়া কলেজ স্কোয়ারের ব্যাপটিস্ট মিশন স্টুডেন্টস হল। ১৯২৯ সালে তৈরি হওয়া ক্ষেত্র কুঠিরে বর্তমানে আবাসিকের সংখ্যা ২১। ওনাদের দেওয়া তথ্যে জানা যায় অধুনা লুপ্ত পুরবী সিনেমা হলের গায়েই ছিল মহিলাদের একটি মেস। শ্রী অরুণ কুমার বোস ১৯৬৯-৭০ সালে এই মেসটি শুরু করেন। মেসটি শুরু হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁর স্ত্রী সেটির পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ৩৮ বছর চলবার পর মেসটি বন্ধ হয়ে যায়। বয়সজনিত কারণে শ্রীমতী বোসের পক্ষে ৪০ জন আবাসিকের দেখভাল করা আর সম্ভব হচ্ছিল না। মহিলাদের হোস্টেল চালাতে গেলে নানাপ্রকার সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, এক মহিলার পক্ষে সব দিক সামলে এতগুলো বছর একে টিকিয়ে রাখা সহজ কথা নয়।

    ‘হেরিটেজ ওয়াক ক্যালকাটা’ এমন কয়েকটি মেসের সন্ধান দিয়েছে যেগুলো মহিলা দ্বারা পরিচালিত পুরুষদের মেস। ৫/১এ, মধু গুপ্ত লেনের মেসটি দেখাশোনা করেন শ্রীমতী অঞ্জনা মুখার্জী। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে ৭৬ বছারের পুরনো এই মেসটির তিনিই মালকিন। চোদ্দ জন আবাসিকের সকলেই ছাপোষা মানুষ। বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে ৭০ বছরের পুরনো মেস ‘রেনবো ক্লাব’। উমা ভট্টাচার্য তাঁর শ্বশুর মশাইয়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এই মেসের মালিকানা পান। বৃদ্ধা ওই বাড়ির একদিকে থাকেন এবং এখনও সকলে তাঁকে বেশ সমীহ করে।

    কলেজ স্ট্রিটের ‘নিপেন্দ্র বোর্ডিং হাউস’ এর পত্তন হয় ১৯৫০ সালে। ‘বেনারস ট্রাস্ট’ এই জায়গাটির মালিক। লিজ হোল্ডাররা এটি পরিচালনা করেন। মূল লিজির মৃত্যুর পর থেকে ২৪ জন বোর্ডারের এই মেসটি মহিলার দ্বারা পরিচালিত হয়।

    সময় বদলে গেছে, বদলেছে পরিবেশ, পরিস্থিতি, দৃশ্যকল্প। পুরনো কোলকাতার সেইসব সাবেকি মেসগুলো আজ কালের গর্ভে নিমজ্জিত। বহুতলের আগ্রাসন প্রতিহত করার ক্ষমতা ওই জীর্ণ বাড়িগুলির নেই। কিছু সমস্যার কারণে যে কটি এখনো টিকে আছে তারাও অন্তিম প্রহর গুনছে। মানুষের মনের অন্দরেও এসেছে পরিবর্তন। পুজোগুলোতে বারোয়ারির রমরমা থাকলেও দৈনন্দিন জীবন যাপনে বারোয়ারির যায়গা ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। যৌথকে বর্জন করে মানুষ অণুতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

    এখন চালু হয়েছে ‘পিজি’ অর্থাৎ ‘পেয়িং গেস্ট’ ব্যবস্থা। এতে শুধুমাত্র ঘরটাই শেয়ার করা হয় অন্য কিছু নয়। একান্নবর্তী জীবন যাপনের কোন গল্প থাকেনা তাই ওখান থেকে কোন গল্পও তৈরি হয় না।

    তথ্যসুত্রঃ

    সেকালের মেসবাড়ি- অর্ণব নাগ
    কোলকাতার মেসবাড়ি এবং বাংলা সাহিত্য-সোমেন দে
    মেসবাড়ির পাঁচালি- কৃষ্টি কথা
    মেসবাড়ি আজ শুধু ইতিহাসের পাতায়- সাতকাহন
    ইতিহাস আগলে এখনও দাঁড়িয়ে মেসবাড়িরা- সুনীতা কোলে
    The Messbari Project
    কেমন আছে পুরনো কোলকাতার মেসবাড়িগুলো- উষসী কর।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • :|: | 174.251.163.104 | ২৫ জুন ২০২৪ ০৫:৫১533689
  • বেশ লেখা। একটু বাঘাযতীনের ফার্স্ট নেমটা ঠিক করে দেবেন, প্লিজ? https://bn.m.wikipedia.org/wiki/বাঘা_যতীন
  • অরিন | ২৫ জুন ২০২৪ ১০:০৩533693
  • কথাটা মেসবাড়ি না মেস?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন