ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ধর্মাধর্ম - দ্বিতীয় পর্ব - দ্বিতীয় ভাগ

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ২৯ এপ্রিল ২০২২ | ৩৬১ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • দ্বিতীয় পর্ব - ১২,০০০ থেকে ৬০০ বি.সি.ই  (দ্বিতীয় ভাগ)
     
    ২.২.১ সামাজিক শ্রেণী বিন্যাস

    এমন নয় যে গ্রামের সক্কলেই নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং উপকরণের সুবিধে ভোগ করতে পেরেছিল। আজও যেমন হয় না। এরোপ্লেনের ভাড়া অনেক কম হয়ে গেছে বলে, ট্রেন কিছু ফাঁকা হয়ে যায়নি। মোটরবাইক বা স্কুটার সহজলভ্য হওয়ায় সাইকেল উঠে যায়নি। চারচাকা তুলনামূলক সস্তা হয়ে গেলেও বাস তুলে দেওয়া যায়নি। আজও আমাদের দেশে এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা টেলিভিসন, মোবাইল-ফোন, কম্পিউটার কী জানেন না, ব্যবহার তো দূরের কথা। সেসময়ও পরিস্থিতি একই রকম ছিল।

    যারা লোকবল ব্যবহার করে প্রচুর জমি জায়গা আয়ত্ত্ব করতে পেরেছিল, তারা তাদের উদ্বৃত্ত ফসলের বদলে আমদানি করতে লাগল একের পর এক প্রযুক্তি। তারা বলদের কাঁধে জোয়াল চাপিয়ে চাষ করতে লাগল বছরের প্রায় দশমাস। উদ্বৃত্ত ফসল আরও অনেক উদ্বৃত্ত হতে লাগল। উদ্বৃত্ত ফসলের বদলে ভরে তুলল তাদের খামার - গরু, বলদ, ছাগল, ভেড়ায়। আজকাল তারাও শিখে ফেলেছে এঁড়ে বাছুরকে কীভাবে বলদ করে তোলা যায়। অতএব বলদও হয়ে উঠতে লাগল উদ্বৃত্ত সম্পদ। গাভীর দুধ পরিবারের শিশু এবং বৃদ্ধদের যেমন পুষ্টি যোগাতে লাগল, তেমনই উদ্বৃত্ত দুধ থেকে ঘি, মাখন, দই, ছানা বানাতে শিখে গেল। অর্থাৎ দুধও এখন উদ্বৃত্ত সম্পদ। এখন তাদের গ্রামেও উৎপন্ন হয় তিল এবং সরষে, বলদ আর কাঠের ঘানিতে তেল বানানোর পদ্ধতি শিখতেও দেরি হল না। প্রথম থেকেই যারা সম্পন্ন হতে পেরেছিল, তারা অতি দ্রুত আরও সম্পদের অধিকারী হয়ে উঠল, এবং তারাই হয়ে উঠল সমাজের উচ্চশ্রেণী। উৎসবে, পুজাপার্বণে তাদেরই আধিপত্য। তাদের পরিবারের মহিলা-পুরুষ, ছেলে-মেয়েরা উজ্জ্বল পট্টবস্ত্র, অলংকার এবং তৈলসিক্ত চুলে ও ত্বকে হয়ে উঠতে লাগল সভ্য, ভদ্র, উচ্চকুলশীলসম্পন্ন। সমাজে তারাই হয়ে উঠল অভিজাত সম্প্রদায়।

    অন্যদিকে যারা প্রথম দিকে কিছুটা দুর্বল ছিল, জমির ফসল আর এদিক সেদিক থেকে যাদের অন্নসংস্থান হয়ে যেত কোন মতে, উদ্বৃত্ত সম্পদের অভাবে তারা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারল না। তার ওপর দৈবদুর্বিপাক তো ছিলই। সব বছর সমান সুবৃষ্টি হবে এমন তো কথা নেই, কোনবার অনাবৃষ্টি, কোনবার অতিবৃষ্টি। কোন কোন বার আসত পঙ্গপালের দল। ফসল হত যৎসামান্য। সারা বছরের অন্নসংস্থান করাই দুরূহ হয়ে উঠত। অনাহার এবং স্বল্পাহারে জীবনধারণ করতে পারলেও স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়তে লাগল। শীর্ণ শরীরের দুর্বল সামর্থ্যে সামান্য জমিটুকু সুবর্ষার বছরেও হয়তো সঠিক চাষ দেওয়া যেত না। তবুও বেঁচে থাকতেই হবে, বেঁচে থাকতেই হয়। তারা এবং তাদের ছেলেপুলেরা নিজেদের একফসলি জমির ভরসা ছাড়াও ধনী মানুষের জমিতে চাষ করতে শুরু করল। জমির মালিকানা, শস্যবীজ, জোড়া বলদের লাঙল, ব্রোঞ্জের সরঞ্জাম, সবই ধনী মালিকের, তাদের শুধু শ্রম। শ্রমের বদলে তারা পেত উৎপন্ন শস্যের কিছু অংশ। তারা ক্ষেতমজুর। আর ছিল পশুপালন -  ধনী মালিকের খামার ভরা পশুদের প্রত্যেকদিন সকালে চারণক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া এবং বিকেলে তাদের ফিরিয়ে আনা, তারা হল রাখাল[1]

    অভিজাত শ্রেণীর মানুষদের সাধারণ জনগণের মতো মাটির ঘর আর খড়ের চালে থাকা শোভা পায় না। ঝড়বৃষ্টিতে কুঁড়ে ঘর তছনছ হয়ে যায়, তাছাড়া সম্পদ বাড়লেই বেড়ে যায় নিরাপত্তাহীনতা। অতএব ধনী ব্যক্তির উপযুক্ত বাসগৃহ বানানো প্রয়োজন। বাণিজ্য করতে আসা মানুষেরা বহু গ্রাম দেখেছে, দেখেছ বহু জনপদ, অভিজাত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের খাতিরও বেশি। তারাই সন্ধান দিল অভিজাত বাড়ি কীভাবে বানানো যায়। কাদা মাটি দিয়ে বানানো ছোট ছোট ইঁট রোদ্দুরে শুকিয়ে নিলে, খুব শক্ত হয়ে ওঠে। সেই ইঁটে দেয়াল তুললে ঝড়-ঝঞ্ঝাতে ভয় থাকে না। মোটা মোটা কাঠের কাঠামো বিছিয়ে তার ওপর খড়ের আঁটি মোটা স্তরে বিছিয়ে দেওয়া যায়। অথবা কাঠের আরো ঘন কাঠামোর ওপর পোড়া মাটির টালি বিছিয়ে তার ওপর চুন আর সুরকির ঢালাই। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে বিপদের ভয় নেই বললেই চলে। তার ওপর দেখতেও হয়ে ওঠে ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন। এমন সব বাড়ি বানিয়ে তুলতে প্রয়োজন অসংখ্য শ্রমিক! এই শ্রমিক হল তারা, যারা ভূমিহীন, অন্ন সংস্থানের মতো পর্যাপ্ত জমি না থাকায়, খাদ্যের বিনিময়ে যারা শ্রম দিতে বাধ্য হয়।

    অর্থাৎ এতদিনের মোটামুটি সমমর্যাদার মানুষের সমাজে জন্ম নিতে লাগল অসম-মর্যাদার বিভিন্ন মানুষের  শ্রেণী। সমাজের নিম্নস্তরে চলে গেল ভূমিহীন শ্রমিক মানুষ এবং রাখাল। তাদের ওপরে রইল কৃষক মানুষের শ্রেণী এবং নানান পেশাদার শ্রমজীবি। যেমন কুম্ভকার – যারা মাটির তৈজসপত্র বানায়, সূত্রধর – যারা কাঠের জিনিষপত্র বানায়, কর্মকার – যারা ধাতুর জিনিষপত্র বানায়, এমনই নানাবিধ পেশার শ্রমজীবি। এই শ্রেণীর উপরে এল বণিক শ্রেণী, যারা বাণিজ্য করে। আর সবার ওপরে রইল অভিজাত শ্রেণী, যারা কোনোই শ্রম করে না।  কিন্তু নিজেদের উদ্বৃত্ত সম্পদের বিনিময়ে অন্য মানুষের শ্রম ব্যবহার করে, তারা আরও বেশি সম্পদের অধিকারী হতে থাকল। তার অধিগত সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী, তার ব্যক্তিত্ব এবং প্রতাপ বাড়তে লাগল। সে এক বা একাধিক সমাজের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করল।

    কৃষিভিত্তিক এই গ্রাম সমাজের বাইরেও কিছু শ্রেণী রয়ে গেল। তারা হল অরণ্য বাসী, আরণ্যক শ্রেণী। এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার সে সময়ের সমস্ত মানুষই যে শিকারী-সংগ্রাহী জীবন ছেড়ে দিয়ে কৃষিসমাজে চলে এসেছিল তা কিন্তু নয়। এই উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অরণ্য অঞ্চলে বেশ কিছু মানুষগোষ্ঠী রয়ে গেল আগের মতোই, একই পেশা, একই ধরনের পারিবারিক আচরণ এবং বিশ্বাস নিয়ে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাদের অধিকাংশই এই আগ্রাসী কৃষি সমাজকে খুব ভাল চোখে দেখেনি। কারণ এই আগ্রাসী কৃষিসমাজ সর্বদাই নদী তীরবর্তী অগভীর অরণ্য গ্রাস করে কৃষি জমি বানিয়েছে এবং তাদের ঠেলে দিয়েছে, বিপজ্জনক গভীরতর অরণ্যের দিকে। যেখানে জীবনধারণ করা শুধু বিপজ্জনকই নয়, অনেক বেশি দুরূহ।
     
    অতএব এই তথাকথিত সভ্য হয়ে ওঠা মানুষগোষ্ঠীদের ওপর আরণ্যক গোষ্ঠীদের একাংশ বিদ্বিষ্ট হয়ে উঠল। তাদের সেই বিদ্বেষ প্রায়ই হয়ে উঠল হিংস্র অতর্কিত আক্রমণ। সভ্য মানুষদের বসতি এবং গ্রামে তারা প্রায়শঃ হানা দিত শস্যের লোভে এবং গৃহপালিত পশুর লোভে। সে আক্রমণে হতাহত হত অনেক গ্রামবাসী। কারণ কয়েক হাজার বছরের মধ্যে গ্রামবাসীরা, শিকারী-সংগ্রাহী মানুষদের তুলনায় হয়ে উঠেছিল অনেক শ্লথ, দুর্বল এবং লড়াইতে অদক্ষ। যার ফলে গ্রামের কৃষিনির্ভর মানুষদের মনেও এই অরণ্যবাসী মানুষদের সম্পর্কে গড়ে উঠল আতঙ্ক। কয়েক হাজার বছর আগেকার সমগোত্রীয় অরণ্যবাসী শিকারী-সংগ্রাহী মানুষরাই এখন সভ্য সমাজের চোখে হয়ে উঠল ভয়ংকর রাক্ষস কিংবা দৈত্য-দানব শ্রেণী।

    আবার অরণ্যে থেকে যাওয়া সকল শিকারী-সংগ্রাহী মানুষই কৃষি সমাজের ওপর বিদ্বিষ্ট এবং হিংস্র হয়ে উঠেছিল তাও নয়। কিছু কিছু দল নিজেদের শিকারী-সংগ্রাহী বৃত্তিকে না ছাড়লেও, তারা বাইরে থেকে কৃষি সমাজের সুবিধেগুলোও কিছু কিছু উপভোগ করত। যার ফলে তাদের সঙ্গে কৃষিসমাজের কিছুটা দূরত্ব থাকলেও একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে উঠেছিল, এবং সাংঘাতিক বিদ্বেষ ছিল না। এই শিকারী-সংগ্রাহী মানুষেরা জঙ্গলের বিশেষ কিছু শিকার এবং সংগ্রহ নিয়ে আসত, কাছাকাছি কৃষিসমাজের গ্রামগুলিতে। যেমন তারা শিকার করে আনত হরিণ, বুনো শুয়োর, সংগ্রহ করে আনত মধু, বুনো কন্দ, ওষধি লতাপাতা। তার বদলে তারা নিয়ে যেত গম, যব বা ধান, কিংবা ব্রোঞ্জের অস্ত্র-শস্ত্র, সরঞ্জাম। কৃষিজীবি মানুষদেরও পোষ্য প্রাণীর একঘেয়ে মাংসের থেকে হরিণ কিংবা বুনো শুয়োরের মাংসে মুখ বদল হত, গ্রামে বসেই পেয়ে যেত মধু কিংবা ওষধি লতাপাতার সংগ্রহ। কৃষি সমাজের সভ্য মানুষেরা একদা সমগোত্রীয় এই শিকারী-সংগ্রাহী মানুষদের নাম দিল কিরাত, ব্যাধ, শবর, নিষাদ, ইত্যাদি।

    ২.২.২ নিবিড় বাণিজ্য

    সমাজের অভিজাত শ্রেণীরই একাংশ আবার অনেকে বণিকও হয়ে উঠল, অথবা অন্যভাবে বললে বণিক সমাজের অনেকে অভিজাত হয়ে উঠল। তারা গ্রাম ছেড়ে সুবিধেজনক জায়গায় বসতি-স্থাপন করতে লাগল। এই বসতি-স্থাপন যে কোন জঙ্গল সাফ করে গ্রাম বা কৃষিক্ষেত্র বানিয়ে তোলার মতো সহজ সরল নয়। এর অবস্থান নির্দিষ্ট হত কৌশলগত দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনার থেকে।

    বাণিজ্যের নিবিড় আন্তর্জাল (network) গড়ে তুলতে প্রধান যে কয়েকটি বিষয়ে নজর দিতে হয়, সেগুলি হলঃ
    ক) যোগাযোগঃ দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান উপায় ছিল সড়কপথ।  নদীমাতৃক এই উপমহাদেশে নদী এবং শাখানদীগুলিও ছিল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সত্যি বলতে নদীবহুল অঞ্চলে যাওয়া-আসার পক্ষে নদীপথই ছিল সীমিত ব্যয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ ও নিরাপদ উপায়। তার ওপর আমাদের দেশের বিস্তৃত সমুদ্রতট ধরে অন্তর্দেশীয় এবং এমনকি বহির্বিশ্বের সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে উঠছিল। অতএব এই তিনটি উপায়ের সম্যক সমন্বয়েই বাণিজ্যের নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্তর্জাল গড়ে ওঠা সম্ভব।
     
    খ) পরিবহণঃ স্থলপথে পরিবহন বলদের গাড়ি, গাধা এবং উটের পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল, অতএব সব ধরনের পথই সারা বছর ধরে পরিবহণযোগ্য রাখাটা জরুরি। নদীপথে নদীর নাব্যতা অনুযায়ী ভেলা বা নৌকা এবং সমুদ্রপথে যাওয়ার মতো বড়ো নৌকা এবং নৌবহর।
     
    গ) নিরাপত্তাঃ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাঁচামাল আমদানি এবং তৈরি সামগ্রী রপ্তানির সময়, যাতে লুঠপাট না হয়, তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখাও অত্যন্ত জরুরি। পথশ্রমে পরিশ্রান্ত বণিকদের এবং পশুদের বিশ্রামের জন্যে পথের ধারে নির্দিষ্ট দূরত্বে নিরাপদ আশ্রয় এবং খাদ্যের যোগাড় রাখাও ছিল অত্যাবশ্যক। অতএব প্রধান সড়কপথের ধারে ধারে গড়ে উঠতে লাগল – চটি, পান্থশালা।   
     
    ঘ) বাণিজ্য কেন্দ্রঃ যে কোন বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তুলতেও দরকার নিবিড় বিচক্ষণতা, যেমন,
    ১) সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করা কাঁচামাল সুরক্ষিত সঞ্চয় করে রাখার মতো উপযুক্ত জায়গা (ware house)। প্রত্যেকটি কাঁচামালের গুণগত মান পরীক্ষা, তার পরিমাণের হিসেব এবং সেই হিসেব অনুযায়ী আঞ্চলিক বণিকদের প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া।
     
    ২) যারা কাঁচামাল থেকে নানান প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করবে, বিভিন্ন পেশার সেই কর্মীদের কাজ করার নির্দিষ্ট জায়গা।

    ৩) তৈরি হতে থাকা প্রত্যেকটি সামগ্রীর গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করার জন্য থাকতে হবে দক্ষ পরিদর্শক।
     
    ৪) তৈরি হয়ে যাওয়া সামগ্রীর কোনটি কোথায় যাবে - দেশের অভ্যন্তরে অথবা বিদেশে - নির্দিষ্ট করে সুরক্ষিত রাখা এবং প্রাপ্য আদায়ের পর আঞ্চলিক বণিকদের হাতে সেগুলি হস্তান্তর করা।
     
    ৫) বিদেশে যাওয়ার সামগ্রীগুলি নির্দিষ্ট পরিবহণে বন্দরে পৌঁছে দেওয়া।
     
    ৬) এই সমগ্র ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্যে থাকতে হবে প্রচুর করণিক এবং উচ্চপর্যায়ের পরিচালকবৃন্দ।
     
    ৭) বাণিজ্য কেন্দ্রে কর্মরত সকল স্তরের মানুষের থাকা, খাওয়া এবং অন্যান্য সুবিধের জন্যে রাখতে হবে সমস্ত ধরনের সুব্যবস্থা।
     
    ৮) দূর দেশ থেকে আসা এবং বিদেশী বণিকদের এবং তাদের পশুদের থাকার জন্যে পর্যাপ্ত আয়োজন।
     
    ৯) সবার উপরে দরকার প্রত্যেকটি স্তরের মানুষের পর্যাপ্ত খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করা, তা নাহলে পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়বে।
     
    ১০) নিয়মিত খাদ্য সরবরাহের জন্যে, বাণিজ্য কেন্দ্রের আশেপাশে নদীর দুপাড়ের বিস্তীর্ণ জমিকে চাষযোগ্য করে তুলতে হবে। সেখানে দক্ষ কৃষকদের দেওয়া হবে উন্নতমানের বীজ, বলদ এবং লাঙল। নানা ধরনের শস্য এবং সব্জি উৎপন্ন করে তারা নিয়মিত সরবরাহ করবে বাণিজ্য কেন্দ্রের নিয়ামককে। তার বদলে তারাও পাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যশস্য। বাণিজ্য কেন্দ্রের নিয়ামকই ব্যবস্থা করে দেবে চাষের জন্যে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত জলের সরবরাহ এবং সেচ ব্যবস্থা।
     
    ১১) বাণিজ্য কেন্দ্রের পাশে পশুপালন ক্ষেত্রও বানিয়ে তুলতে হবে, সেখানে নানান ধরনের পশু - গরু, ছাগল, ভেড়া পালন করা হবে। সেখান থেকে বাণিজ্যকেন্দ্রের অধিবাসীদের জন্যে আসবে দুধ, ঘী, মাখন এবং প্রয়োজন মতো মাংস।

    ১২) সব শেষে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিপুল সংখ্যক দক্ষ এবং অদক্ষ শ্রমজীবি মানুষ সংগ্রহ, যারা বাণিজ্য কেন্দ্রের সম্পূর্ণ পরিকাঠামো এবং পরিষেবা পরিকল্পনা মতো গড়ে তুলতে পারবে।

    আজকের যুগে এমন ব্যাপ্ত এবং নিখুঁত বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলা তেমন কিছু বড়ো ব্যাপার নয়, সত্যি কথা বলতে পৃথিবীর যে কোন দেশের বাণিজ্যিক মহানগর এবং নগরগুলি উপরের নিয়মেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, আজ থেকে প্রায় সাত হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই উপমহাদেশেরই এক প্রান্তে এমনই সফল বাণিজ্যের এক নিখুঁত পরিকাঠামো গড়ে তোলার সূচনা করেছিল। সে আলোচনায় একটু পরেই আসছি। আর সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, এই পর্যায়ে মানুষের সামাজিক জীবন যাপনের পরিস্থিতির দিকে সংক্ষেপে চোখ রাখা যাক।   
     
    ২.২.৩ কৃষি সমাজে জীবনযাত্রার মান

    ভুলকা পরিবার এবং বিশ্‌ভাইয়ের যে কল্পনা দিয়ে এই পর্বের শুরু করেছিলাম, তার সময়কাল আজ থেকে মোটামুটি চোদ্দ হাজার বছরের শুরুতে। যখন অধিকাংশ মানুষের সমাজই পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে কৃষিকাজে এবং পশুপালনে যুক্ত হয়ে গেছে। এবং এই অধ্যায় শেষ করছি আজ থেকে মোটামুটি ন’হাজার বছরের শেষে।
    আলোচ্য এই পাঁচ হাজার বছরে মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে যে যে উন্নতি এবং অবনতি ঘটল, তা এই রকমঃ -
     
    ১) শিকারী-সংগ্রাহী মানুষের সম্পদ যত সামান্যই হোক, পরিবারের কোন সদস্যেরই তাতে ব্যক্তিগত অধিকার ছিল না, সে সম্পদ ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক। এক পরিবারের মেয়ে অন্য পরিবারে বধূ হয়ে আসাতে পারিবারিক বাঁধন আলগা হতে শুরু হল। এখন পরিবারের সম্পদে ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্ন এবং বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। কারণ একই পরিবারভুক্ত ভাইরা এবং পুত্রেরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পরিবারের কর্তা। অর্থাৎ এখন যে কোন পরিবারই অনেকগুলি ছোট ছোট পরিবারের সমষ্টি। তাদের সকলেই পিতার সম্পদের অধিকারী।  এই সম্পদের অধিকার ও বণ্টন থেকেই জ্ঞাতি শত্রুতার উদ্ভব হতে লাগল। এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন আমাদের আজও হতে হয়। এই ভাঙনের জন্যে ঠিক কে কতটা দায়ি, সে বিতর্কের প্রসঙ্গ আমাদের এখানে আলোচ্য নয়। দায়ি যেই হোক, আমি শুধু পারিবারিক অশান্তি আর দুশ্চিন্তার বিষয়টির দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছি। পরিবারের সামগ্রিক বিপদ-আপদ, প্রাকৃতিক এবং আশেপাশের আরণ্যক প্রতিকূলতার সঙ্গে নতুন এক শত্রুশ্রেণী গড়ে উঠল, যার নাম জ্ঞাতিশত্রু – একই পরিবারের রক্ত সম্পর্কিত ভাইদের মধ্যে বিবাদ। অর্থাৎ নিবিড় পারিবারিক বন্ধন ভেঙে, এখন মানুষের মনে পারিবারিক অন্তর্কলহের দুশ্চিন্তা এনে দিল।

    ২) পরিবারে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের যে সমমর্যাদা এবং সমদক্ষতার অবস্থান ছিল, সেখান থেকে অনেকটাই সরে গিয়ে, কৃষিসমাজের পরিবারগুলি পুরুষপ্রধান - পিতৃতান্ত্রিক হয়ে উঠল। মেয়েরা এখন জন্ম থেকেই পরের ঘরে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হতে থাকল। অতএব আগের মতো দক্ষ শিকারী, অরণ্যচারী হওয়ার থেকে মেয়েরা এখন রূপচর্চা করে, কোমল ও পেলব অবলা নারী হয়ে উঠতে শুরু করল। তাদের সঠিক বরে এবং ঘরে বিয়ে দেওয়াটাই হয়ে উঠল পরিবারের অন্যতম দুশ্চিন্তার বিষয়।
     
    ৩) পরিবারে নারীদের ভূমিকার আমূল পরিবর্তনে, তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বহুপ্রসবিনী হয়ে উঠতে হল। তার মধ্যেও যে নারী যত বেশী পুত্র-প্রসবিনী, তার মর্যাদা বাড়তে থাকল। কারণ পুত্রেরা পরিবারেই থাকবে এবং পিতার কৃষিকাজে অচিরেই সহায় হবে। অতএব পুত্রসন্তানকে “Asset” এবং কন্যাসন্তানকে “Liability”- ভাবার সূচনা হল।
      
    বিশেষজ্ঞরা বলেন, নারীদের বহুপ্রসবিনী হওয়ার আরও একটি কারণ, মাতৃস্তন্যের বিকল্প হিসেবে গৃহপালিত গরুর দুধের ব্যাপক ব্যবহার। শিকারী-সংগ্রাহী পরিবারের শিশুদের মাতৃস্তন্য ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না।  বিজ্ঞানীরা বলেন, সকল স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যেই দেখা যায়, সন্তান যতদিন মাতৃস্তন্যে নির্ভরশীল থাকে, প্রাকৃতিক নিয়মেই মায়েদের পরবর্তী সন্তান নেওয়ার আগ্রহ কম থাকে। কিন্তু গরুর দুধের ব্যাপক প্রচলন শুরু হওয়াতে মানুষের সন্তান যখন অতি শৈশবেই মাতৃস্তন্য ছেড়ে গরুর দুধে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে লাগল, মায়েদের পরবর্তী সন্তান গ্রহণের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাও দূর হয়ে গেল।

    বহু প্রসবের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠল বহুপ্রসবিনী মাতা এবং সদ্যজাত শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি। এও আরেক দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে উঠল বৈকি!
     
    ৪) শিকারী-সংগ্রাহীদের জীবনযাপন আপাতদৃষ্টিতে কঠোর এবং সর্বদাই বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত জীবন বলে মনে হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, তার ঠিক উল্টো। কৃষিজ ফসলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মানুষ প্রায়ই চরম বিপদগ্রস্ত হত, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, নদীতে বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এবং পঙ্গপাল[2]-এর মতো কিছু পতঙ্গের আক্রমণে। খরা বা বন্যার কবলে কৃষিজীবিদের চরম দুর্দশা আজকের মতো অত্যাধুনিক যুগেও অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয় (আধুনিক শহরের শিক্ষিত স্বচ্ছল সমাজ এ বিষয়ে সচেতন হন, যখন খরা বা বন্যার কারণে শেয়ার সূচকের পতন ঘটে)। তাছাড়াও ছিল বন্যপশুদের হঠাৎ আক্রমণ, যেমন হাতির পাল (আজও তারা নেমে আসে দলমার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে), কিংবা নীলগাইয়ের দল (২০১৬ সালে বিহারের বেশ কিছু গ্রামে নীলগাইকে ভার্মিন (vermin) ঘোষণা করে প্রায় ২৫০ নীলগাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল)।  এবং আরও ছিল বিদ্বেষী কোন শিকারী-সংগ্রাহী দলের অতর্কিত আক্রমণ, যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।
     
    উদ্বৃত্ত-সম্পদশালী অভিজাত মানুষেরা এ ধরনের ধাক্কা সামলে নিতে পারলেও, সাধারণ মানুষের পক্ষে এইরকম ধাক্কা প্রায়শঃ মর্মান্তিক হয়ে উঠত। অতএব সাধারণভাবে দুশ্চিন্তা বাড়ল অনাহারের, দুর্ভিক্ষের।
     
    ৫) দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি হল কৃষিসমাজের আরেকটি বিশেষত্ব, সে কথা আগেই বলেছি। তারই সঙ্গে মানুষের বসতির সঙ্গেই থাকত বহু ধরনের গৃহপালিত পশু - কুকুর, গরু, বলদ, ছাগল, ভেড়া, গাধা, উট। অল্প জায়গার মধ্যে অপরিচ্ছন্ন ভাবে পশুদের সঙ্গে একত্রে বসবাসের ফলে, পশুবাহিত সংক্রমণের বিপদ প্রায়ই লেগে থাকত। তার ওপর কৃষি ক্ষেত্রের জমে থাকা জলের মশা জাতীয় নানান কীট পতঙ্গের সংস্রবে দীর্ঘক্ষণ থাকার ফলেও নানান অসুখ-বিসুখের সম্ভাবনা বেড়ে গিয়েছিল। যার ফলে, বিশেষজ্ঞরা বলেন, ম্যালেরিয়া, প্লেগ, কলেরা, বসন্তের মতো মহামারিতে প্রচুর মানুষ মারা যেত।
     
    আমাদের অত্যাধুনিক সভ্য সমাজেও বিশ্বজুড়ে সংক্রমণ কী ভয়ানক আকার নিতে পারে তার সদ্য উদাহরণ কোভিড১৯ কোরোনা ভাইরাস। আদিম শিকারী-সংগ্রাহীদের এই সংক্রমণের মাত্রা ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম বা নগণ্য। আর মহামারি বলতে খুব জোর কোন একটি দলের পঞ্চাশ-ষাট জন সদস্যের মৃত্যু। কারণ তাদের প্রত্যেকটি দলই বিচ্ছিন্ন থাকতো – তাদের স্বাভাবিক সামাজিক দূরত্ব এতটাই ছিল যে, এক দল থেকে অন্য দলে সংক্রমণ হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। অতএব কৃষি নির্ভর সমাজের অজানা-অচেনা নানান অসুখ ও মহামারির দুশ্চিন্তা বাড়ল।
     
    ৬) শিকারী-সংগ্রাহী পরিবারের সদস্যদের শারীরিক এবং সকল কাজ করার দক্ষতা ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। কৃষি সমাজের মানুষেরা শারীরিক দক্ষতায় (physical fitness) দুর্বল কিন্তু বিশেষ বিশেষ কাজে দক্ষ হতে থাকল। যেমন কৃষক শুধুমাত্র কৃষিকাজে দক্ষ, কুম্ভকার মাটির পাত্র গড়ায়, কর্মকার ধাতব কাজে, অভিজাত মানুষ, অন্য মানুষকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ায় দক্ষ হয়ে উঠল। একজন শিকারী-সংগ্রাহী মানুষ আর একজন কর্মকারের বাহুবল (পাঞ্জার শক্তি) একই হতে পারে। কিন্তু দুজনের লড়াইতে, শিকারী-সংগ্রাহী মানুষ অনায়াসে জিতে যেত পারত ক্ষিপ্রতায় এবং লড়াই করার দক্ষতায়। সক্ষম এবং সবল শরীর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে, শারীরিক দুর্বলতা বাড়িয়ে তোলে মানসিক দৌর্বল্য, বাড়িয়ে তোলে দুশ্চিন্তা।
     
    ৭) বিশেষজ্ঞরা বলেন, পুষ্টির ব্যাপারেও কৃষিজীবিরা অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। তার কারণ তাদের একমাত্র প্রধান খাদ্য হয়ে উঠেছিল গম, যব, ধান অথবা ভুট্টা। সাধারণ মানুষ দিনের মধ্যে তিন থেকে চারবার একই শস্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। আজও আমাদের সাধারণ মানুষ বছরের প্রত্যেকটি দিন, সারাদিনে যে তিনবার খাদ্য গ্রহণ করে, অঞ্চলভেদে সেগুলি হল প্রধানতঃ মুড়ি-ভাত-ভাত অথবা রুটি-ভাত-রুটি অথবা ইডলি-ভাত-ভাত এবং তার সঙ্গে থাকে সামান্য কিছু সব্জি। (এখানে পিৎজা, পাস্তা, বিরিয়নি, হেলথড্রিংক্স-বিলাসী স্বচ্ছল নাগরিকদের কথা বললাম না। কারণ সে যুগেও অভিজাত স্বচ্ছল পারিবারিক আহারে নানান ফলমূল, মধু, আখরোট-বাদাম থাকত।) সাধারণ মানুষের নিয়মিত এই খাদ্যের অভ্যাসে অনেকগুলি জরুরি ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের অভাব ঘটতে থাকে।

    অন্য দিকে শিকারী-সংগ্রাহীদের খাদ্যের অভ্যাস ছিল অনিশ্চিত এবং বিচিত্র। নানান ফলমূল, মাশরুম, কন্দ, বিচিত্র পশুমাংস এবং বুনো শাক-সব্জি-শস্য ছিল তাদের খাদ্য তালিকায়। এই খাদ্যে পুষ্টির সঙ্গে জরুরি ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের প্রয়োজন অনেকটাই মিটে যেত। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ত।

    উপরন্তু পর পর কয়েক বছরের অনাবৃষ্টিতে যদি শস্যের উৎপাদন যথেষ্ট না হত, সেক্ষেত্রে বিকল্প কোন খাদ্যের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষি নির্ভর মানুষদের অনাহারে বা স্বল্পাহারে থাকতে হত। তাদের পক্ষে গ্রামের স্থায়ী ঘরবাড়ি, পশুখামার ছেড়ে অন্যত্র সরে যাওয়ার বিকল্প পথও খোলা থাকত না। কিন্তু শিকারী-সংগ্রাহী মানুষরা এমন পরিস্থিতিতে – কোন অঞ্চলে খাদ্যাভাব ঘটলে, নির্দ্বিধায় বেরিয়ে পড়ত নতুন তৃণভূমি, নতুন এলাকার সন্ধানে। অতএব পূর্ণ কৃষি নির্ভরতা সাধারণ মানুষের জীবনে খাদ্যের নিরাপত্তা যতটা দিল, তার থেকেও বেশি এনে দিল খাদ্যের অনিশ্চয়তার দুশ্চিন্তা।  
      
    ৮) গৃহপালিত পশুদের কথা আগেই বলেছি।  আগেই বলেছি সমাজে মানুষের শ্রেণী বিন্যাসের কথাও। কিন্তু এই সময় থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী বহুদিন, হাতে গোনা কিছু অভিজাত মানুষ এক শ্রেণীর সাধারণ মানুষকেও গৃহপালিত পশুর মতোই ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। এই পশুর মতো মানুষেরাই সভ্য এবং অভিজাত মানুষের জন্যে বানিয়ে তুলেছিল তাদের গর্বের পিরামিড এবং রোম সাম্রাজ্যের অতুলনীয় সব প্রাসাদ। বিভিন্ন অঞ্চলের তথাকথিত অসভ্য শিকারী-সংগ্রাহী মানুষদের পরাস্ত এবং বন্দী করে গরু, ছাগল, ভেড়ার মতো সংগ্রহ করত বণিকরাই। তাদের বিক্রি করে দেওয়া হত সভ্য সমাজের পশু হাটে। স্বাধীন ও সমমর্যাদার শিকারী-সংগ্রাহী মানুষেরা সেই সময় হয়ে উঠল ক্রীতদাস (slave)। ন্যূনতম খাদ্য, পায়ের শিকল এবং চাবুকের বিনিময়ে তারা গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছিল আমাদের প্রাচীন যত সভ্যতার প্রতীক।
     
    ভারতীয় উপমহাদেশে এই কদর্য ক্রীতদাস প্রথার প্রত্যক্ষ নিদর্শনের অভাব থাকলেও, একটু অন্যভাবে – যাদের চুক্তি শ্রমিক (bonded labour) বলা যায় -  এই প্রথা বহুল প্রচলিত ছিল। কিছু দিন আগেও প্রপিতামহের ঋণ শোধ করার জন্যে সপরিবার-নাতিকে মহাজনের জমিতে বেগার খাটার ঘটনা আকছার শোনা যেত।

    ৯) প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আরণ্য বিপদ-আপদের দুশ্চিন্তা এবং আতঙ্কের জন্যে, শিকারী-সংগ্রাহী মানুষেরা পশুপতিদেব, দেবীমা এবং নানান আত্মার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু সেই নির্ভরতায় অসহায়তা ছিল অনেকটাই কাল্পনিক। সে কথা আগেই বলেছি। কখনো কখনো ঝড়ে বা হাতির দলের আক্রমণে তাদের পর্যুদস্ত হতে হত, দলের কিছু লোক মারাও যেত। তার পরেও দলের বেঁচে যাওয়া মানুষরা দেবতা-দেবী অথবা আত্মাকে তাদের প্রাণরক্ষার জন্যে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, স্বাভাবিক জীবনে আবার সহজেই ফিরে যেতে পারত। যেভাবে আমরা আজও যে কোন মৃত্যুর শোক-দুঃখ এবং বিচ্ছেদকে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় চট করে ফিরে আসি।
     
    কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, সমাজের অধিকাংশ মানুষ - কৃষক থেকে সাধারণ শ্রমিক এতটাই অসহায় অবস্থায় ছিল, আজকের যুগে তা কল্পনা করাও অসম্ভব। এই অসহায় অবস্থা থেকে কবে, কীভাবে তারা মুক্তি পাবে তারও কোন দিশা তাদের সামনে থাকত না। এই বছর কৃষকরা হয়তো খরায় সর্বস্বান্ত হল, কিন্তু পরের বছর কী হবে? সুবর্ষা, বন্যা, নাকি আবারও খরা? অতএব তারা আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছিল, ভাগ্যের ওপর, অর্থাৎ পশুপতিদেব এবং দেবীমার ওপর। অতএব দ্রুত বাড়তে লাগল পূজা-পার্বণ, ব্রত, মানত, নতুন নতুন প্রথা, আচার, আচরণ, এমনকি নিত্য নতুন দেব-দেবীও!

    ২.২.৪ এই সময় কালের প্রত্ন নিদর্শন
     
    এতদিন পর্যন্ত আমি আদিম মানুষের জীবনযাত্রার পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করেছি পুরোটাই কল্পনায়। কিন্তু এই সময়কালে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে খুঁজে পাওয়া বেশ কিছু প্রত্ন নিদর্শন, আমার এই কাল্পনিক পুনর্নির্মাণকে অনেকটাই সমর্থন করবে। সেরকমই কিছু প্রত্ন নিদর্শনের কথা এখানে আমি উল্লেখ করব-

    প্রথমদিকে আদিম মানুষদের আবাস ছিল পাহাড়ের গুহায়, অথবা পাথর সাজিয়ে কিংবা কাঠকুটো আর বড়োবড়ো পাতা দিয়ে বানিয়ে তোলা অস্থায়ী আস্তানায়।

    পাহাড়ের গুহায় বেশ কিছু মানব ও মানুষের গোষ্ঠীর বসবাসের নিদর্শন পাওয়া গেছে, মধ্যপ্রদেশের ভিমবেটকা, উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের সাঙ্ঘাউ, অন্ধ্রের কুর্নুলে। পাহাড়ের গুহার আস্তানা থেকে তাদের সম্বন্ধে জানা যতটা সহজ, অস্থায়ী আস্তানার ক্ষেত্রে ততটা সহজ নয়। কারণ আজ বেশ কয়েক হাজার বছর পরে তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করার কোন প্রত্যক্ষ সূত্র নেই। বিশেষজ্ঞরা অস্থায়ী আস্তানার হদিশ সেখানেই আন্দাজ করেন, যে যে বিশেষ এলাকায় একত্রে অনেক ধরনের জীবাশ্ম উদ্ধার করা গেছে। যেমন একসঙ্গে প্রচুর পশুহাড়, বেশ কিছু পাথরের যন্ত্রপাতি ও অস্ত্রের জীবাশ্ম। একই জায়গায় নানান ধরনের পশুহাড়ের প্রচুর জীবাশ্ম থেকে আন্দাজ করা যায়, এগুলি ওই মানব প্রজাতির শিকার ও খাদ্যের অবশেষ। এই পশুদের মধ্যে হরিণ, বুনো ছাগল, ভেড়া, শুয়োর, গবাদি পশু এমন কি বন্য বেড়াল জাতীয় প্রাণীর হাড়ও পাওয়া গেছে। এই ধরনের আবাসগুলি হত, কোন নদী বা বড়ো জলাশয়ের কাছাকাছি এবং ঝোপঝাড়ওয়ালা অগভীর জঙ্গলে। অতএব ওই সময়ে মানুষের জীবনধারণের একমাত্র উপায় ছিল শিকার - সংগ্রহ এবং পরিভ্রমণ। এক জায়গা থেকে অন্য কোন অনুকূল জায়গায় ঘুরে বেড়ানো।
     
    মধ্য প্রদেশের ভীমবেটকা গুহাগুলির অনন্য বিশেষত্বের কথা একটু বিস্তারিত বলা প্রয়োজন। ভূপাল শহর থেকে ৪৫ কি.মি. দূরে রাইসেন জেলার সাতটি পাহাড়ে প্রায় ৭৫০টি গুহার সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় দশ কি.মি.-র মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এই গুহাগুলিতে লক্ষাধিক বছর ধরে মানুষের নিরন্তর বসবাসের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। কয়েকটি গুহায় এক লক্ষ বছর আগেও যাদের বসবাস ছিল, তারা নিশ্চয়ই ইরেক্টাস অথবা অন্য কোন মানব প্রজাতি, হোমোস্যাপিয়েন্স নয়। এর পরে দশ হাজার বছর আগে পর্যন্ত এই গুহাগুলি বিভিন্ন সময় এবং পর্যায়ে মানুষের আবাস ছিল। যার ফলে একই জায়গায় মানব ও মানুষে[3]র সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পর্যায়গুলি খুব স্পষ্ট চিনে নেওয়া যায়। এই গুহাগুলিতে পাওয়া বিভিন্ন সময়ের পাথরের সামগ্রী, অস্ত্রশস্ত্র এবং গুহাচিত্র থেকে বিভিন্ন যুগের – প্যালিওলিথিক, মেসোলিথিক এবং নিওলিথিক - মানুষদের সম্পর্কে অনেক তথ্য নিশ্চিত করা যায়।

    আদিম প্রস্তর বা প্যালিওলিথিক যুগের বিভিন্ন পর্যায় এবং নব্য প্রস্তর যুগের মূল পার্থক্য হল পাথরের অস্ত্র ও সামগ্রীর গুণগত পার্থক্য। আদিম যুগের মানুষেরা নদীর ধারে কিংবা পাহাড়ি জঙ্গলে পড়ে থাকা নুড়ি পাথরকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত। সেই পাথরকে ভেঙে ধারালো করে তোলা হল পরবর্তী পর্যায়। তারপর অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষ কোন পাথরকে, যেমন ফ্লিন্ট বা কোয়ার্জ, চিহ্নিত করে, তাকে বিশেষ স্তরে ভেঙে আরো ধারালো অস্ত্র তৈরি হল পরবর্তী পর্যায়। নব্যপ্রস্তর যুগে এল আরো ছোট ছোট অস্ত্র, যাকে মাইক্রোলিথ (microlith) বলা হয়, যার সাইজ ৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে এবং তীক্ষ্ণ ধারালো ফলক। এগুলি নানান কাজে ব্যবহার হত, পশুর চামড়া ছাড়ানো বা মাংসের ফালি কেটে নেওয়ার ছুরি, শস্য কাটার কাস্তে, হাতির দাঁত বা পশুর হাড় থেকে পুঁতি এবং গয়না বানানোর কাজে। কিছু তিনকোণা ধারালো ফলক পাওয়া গেছে, যেগুলি কাঠির ডগায় বেঁধে তির হিসেবে ধনুক থেকে ছোঁড়া হত, এবং বর্শার ফলক তো ছিলই। তির-ধনুকের ব্যবহারে দূর থেকে শিকার করতে যেমন সুবিধে হয়েছিল, তেমনি বেড়েছিল শিকারীর নিরাপত্তা।

    নব্যপ্রস্তর বা মেসোলিথিকযুগে পাথর-প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তনে মানুষের নুড়ি পাথরের জন্যে শুধু নদীর ধারে বা পাহাড়ের কাছাকাছি থাকার দরকার হত না, বরং যে অঞ্চলে বেশি ফ্লিন্ট বা কোয়ার্জ পাথর পাওয়া যেত সেই সব অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে লাগল। নব্য প্রস্তর যুগের শেষ থেকেই শিকারী-সংগ্রাহী মানুষেরা চাষ-আবাদ এবং পশুপালনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছিল, তার সঙ্গে শুরু করেছিল আগুনে পুড়িয়ে মাটির নানান রকম পাত্র বানাতে।
     
    প্যালিওলিথিক এবং মেসোলিথিক পর্যায়ের নিদর্শন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্রই পাওয়া গেছে। সুদূর উত্তর-পশ্চিমের সোয়াৎ নদীর অববাহিকা, পটোয়ার উপত্যকা থেকে মধ্যপ্রদেশের আদমগড়, গুজরাটের লঙ্ঘনাজ, রাজস্থানের সরাই নাহার রাই, উত্তরপ্রদেশের মহাদহ এবং বিহারে। একথাও মনে রাখা দরকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি বলেই, কোন অঞ্চলে যে মানুষের বসবাস ছিল না এমন ধারণা করার কোন অর্থ হয় না। কারণ যে যুগ যত আদিম তার নিদর্শন পাওয়া ততই কঠিন। নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিপর্যয়, যেমন প্রবল বন্যা, ভূমিকম্প, নদীর গতিপথ পরিবর্তন আদিম মানুষের দুর্বল পদচিহ্নগুলি মুছে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
     
    নিওলিথিক যুগের মানুষ শিকারী-সংগ্রাহী জীবন থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে কৃষি এবং পশুপালনে আগ্রহী হয়ে উঠতে লাগল। ভারতীয় উপমহাদেশে এই যুগের প্রত্ন-নিদর্শনের বিস্তার ব্যাপক। উত্তর পশ্চিমের সোয়াথ উপত্যকা, তার কিছুটা দক্ষিণে সরাই খোলা, বালুচিস্তানের মেহেরগড়, কাশ্মীর উপত্যকা, বিহারের চিরাণ্ড, উত্তর প্রদেশের বেলান উপত্যকায় চোপানি মাণ্ডো এবং কোলদিহা আরও পূর্বে পশ্চিমবঙ্গের অজয় নদীর অববাহিকায় পাণ্ডু রাজার ঢিপি, আসামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় দাওজালি হাদিং এবং সরুতারু। দক্ষিণে রায়চুর দোয়াব, গোদাবরী এবং কৃষ্ণার অববাহিকায় উটনুর, পিকলিহাল, মাসকি, টেক্কালাকোটা, ব্রহ্মগিরি, হাল্লুর, পাইয়ামপল্লি, এবং টি. নরসিপুর। এর মধ্যে অনেকগুলিতে মানুষ ঐতিহাসিক যুগেও বসবাস করত। এখনও পর্যন্ত এতগুলি এলাকায় নিওলিথিক মানুষের বসতি যখন আবিষ্কার করা গেছে, তখন ধরে নেওয়া যায় এর আশেপাশের এলাকাতে তাদের পূর্বসূরি যুগের মানুষদেরও আবাসও ছিল। একমাত্র ভিমবেটকায় বাস করা মানুষরাই বিভিন্ন সময়ে ভারতের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল এমন হতেই পারে না।
     
    অতএব যুক্তিসঙ্গত ভাবেই কল্পনা করে নেওয়া যায়, ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্রই আদিমকাল থেকেই মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করত। প্রযুক্তিগত প্রগতি সকলের এক হতে পারে না, হয়ওনি। অতএব পরবর্তী পরিস্থিতিতে মানুষ যখন বৃহত্তর যৌথ সমাজ গড়ে গ্রাম ও বৃহত্তর জনপদ তৈরি করতে শুরু করল, তাদের উন্নতি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করলেন, বিশ্‌ভাই এবং তাঁর হাত ধরে বণিকসম্প্রদায়। এক অঞ্চলের উদ্বৃত্ত সামগ্রীর বদলে অন্য অঞ্চলের উদ্বৃত্ত সামগ্রী সংগ্রহ (procurement) এবং বিতরণ (distribution)-এর যে প্রক্রিয়া অর্থাৎ বাণিজ্যই এই ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ মানুষকে বৃহত্তর সমাজ গড়তে সাহায্য করল। বণিকদের মাধ্যমেই বহুদূরের অচেনা-অজানা সমাজের বিচিত্র প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়তে পারল অন্যান্য সমাজেও।  

    বিশ্‌ভাই বহুদিন বিগত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মহিমাগাথা বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ এবং বণিকরা মনে রেখেছে। বিশ্‌ভাই এখন বিশ্‌দেব। এই জগতকে সৃষ্টি করেছেন পশুপতিদেব, তিনি রুষ্ট হলে বিনাশও করতে পারেন। আর বিশ্‌দেব মানুষকে প্রতিপালন করেন, তাদের সমৃদ্ধ করেন।

    নিওলিথিকের পরবর্তী চ্যালকোলিথিক যুগ বলতে বোঝায় যে যুগে মানুষ ধাতু আবিষ্কার করে ধাতব সামগ্রীর ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। ধাতু বলতে এখানে তামা, টিন এবং উভয় ধাতুর সংকর ব্রোঞ্জ। এই যুগকে অনেক ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ যুগও বলে থাকেন। পাথর আর কাঠের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মানুষের প্রগতির গতি আমূল বদলে গেল ধাতব স্পর্শে। প্রায় কুড়ি লক্ষ বছর ধরে শম্বুক গতিতে চলা কাঠ, বাঁশ আর পাথর-প্রযুক্তির ধারা, সামান্য কয়েক শ’ বা বড়ো জোর হাজার খানেক বছরের মধ্যে উঠে পড়ল দ্রুতগামী রথে। সে প্রসঙ্গ আসছে পরবর্তী অধ্যায়ে।

    ২.২.৫ প্রাগৈতিহাসিক পর্ব এবং ঐতিহাসিক পর্ব

    পরবর্তী অধ্যায়ে যাওয়ার আগে, এইখানে বলে রাখি, এই ৭০ হাজার বিসিই থেকে ১২ হাজার বিসিই পর্যন্ত সময়কালের পুরোটাই প্রাগৈতিহাসিক পর্ব। অর্থাৎ ওই সময়ের প্রত্ন নিদর্শনের (ভিমভেটকা গুহার নিদর্শন ছাড়া) অস্তিত্ব ভারতীয় উপমহাদেশে অত্যন্ত নগণ্য। এই নিদর্শন থেকে ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয় বলেই, আমি কল্পনার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি।

    আমরা এখন যে সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, সেটা ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষের সভ্যতার এক সন্ধিক্ষণ। এই সময়ের দেড় দু হাজার বছর পরেই তারা শুরু করবে বিস্ময়কর নগর সভ্যতার এক চূড়ান্ত নিদর্শন। যার প্রত্ন নিদর্শন দেখে আমরা অভিভূত হবো।

    আমরা পরের অধ্যায়েই দেখব, সুনিয়ন্ত্রিত বিপুল এক জনসমাজের নিবিড় পরিকল্পনাতেই এই নগর সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব। সে সমাজ গড়ার সূচনা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর আগে কোন এক সময়ে। দুটি বিচ্ছিন্ন দলের সংযুক্তির ফলে যে সমাজ গঠনের সূত্রপাত, তার পিছনে “বিবাহ” নামক সামাজিক প্রথা ছাড়া আর কোনভাবেই সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। এই সামাজিক প্রথা সৃষ্টির পিছনে নিশ্চয়ই ছিল গভীর চিন্তা-ভাবনা, দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক এবং দূরদৃষ্টি। এই চিন্তা-ভাবনার পিছনে অবশ্যই ছিল মানুষের জিন ও মস্তিষ্কের অনন্যতা। আগুনকে রান্নার কাজে ব্যবহারের ফলস্বরূপ যার বিকাশ ঘটেছিল। তা নাহলে শিম্পাঞ্জি বা হাতিদের পারিবারিক দলগুলিও এতদিনে সমাজ-টমাজ গড়ে আমাদের সভ্যতার সঙ্গে টক্কর দিতে পারত। অতএব আমার কল্পনার ঘটনাগুলি যে ঘটেছিল, এ কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।

    তবে এখন আর কল্পনার প্রয়োজন নেই, কারণ আমরা যে পর্যায়ে চলে এসেছি, সে সময়ের প্রত্ননিদর্শনের খুব অভাব নেই। বরং বেশ কিছু স্থানে প্রত্ননিদর্শনের হদিশ জেনেও আমরা প্রত্ন-খনন করতে পারিনি, আর্থিক এবং রাষ্ট্র পরিচালকদের সদিচ্ছার অভাবে। অতএব এখন থেকে ইতিহাস চলবে তার ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে।                   
       
    ২.২.৬ গ্রাম থেকে জনপদ

    অখণ্ড ভারতের বালুচিস্তানের কোয়েতা অঞ্চলের মেহেরগড়ে নিওলিথিক যুগের বেশ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে বেশ বড় একটি জনপদের প্রত্নতাত্ত্বিক হদিশ পাওয়া গেছে। এই জায়গাটির গুরুত্ব এই কারণে যে, পরবর্তী কয়েক হাজার বছরে মানুষের কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে নাগরিক সমাজে উত্তরণের পর্যায়গুলি এখানে সুস্পষ্ট ধরা পড়ে।

    মেহেরগড় জনপদের শুরু মোটামুটি ৭০০০ বিসিই অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ন হাজার বছর আগে। মেহেরগড়ের মানুষরা প্রধানতঃ গম আর যবের চাষ করত। গরুবাছুর, ছাগল, ভেড়ার মতো কিছু পশুপালন করত। রোদে পোড়া ইঁটের বাড়িতে বাস করত এবং অধিকাংশ বাড়িতে রান্নার উনুন ছিল। কিছু কিছু কাঠামোকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা শস্যভাণ্ডারের নিদর্শন বলে মনে করেন। মাটির নিচে বেশ কিছু সমাধি পাওয়া গেছে, সে সমাধিতে কিছু কিছু উৎসর্গ সামগ্রীও পাওয়া গেছে, যেমন লাপিস ও টারকোয়েজ[4]-এর পুঁতির মালা এবং ছোটছোট কিছু মাটির মূর্তি।

    মেহেরগড়ের কিছুটা উত্তর-পশ্চিমে মোটামুটি একই সময়ে শুরু হয়ে মোটামুটি সাত হাজার বছর আগেকার আরও কিছু জনপদের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেমন কিলে গুল মহম্মদ, রানা ঘুণ্ডাই, শেরি খান তারাকাই, গুমলা এবং রেহমান ঢেরি। এই জনপদগুলিতেও কৃষি এবং পশুচারণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই জনপদগুলির অবস্থান, পশ্চিমদিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করার যে সুপ্রাচীন স্থলপথ তার আশেপাশেই এবং সিন্ধু নদের অববাহিকার খুবই কাছে। সিন্ধু নদের অববাহিকায় আরও দুটি জনপদের নিদর্শন মিলেছে কোট দিজি আর আমরিতে। এই সবকটি জনপদকেই প্রাক-হরপ্পা সংস্কৃতির বাহক বলা চলে।

    কোট দিজি থেকে মাটির পাত্রের যে নমুনা মিলেছে, তাতে রঙ দিয়ে আঁকা অশ্বত্থের পাতা, কিংবা মাছ বা মাছের আঁশের নকশা – হরপ্পা থেকে পাওয়া মাটির পাত্রের সঙ্গে তাদের মিল চোখে পড়ার মতো। কোট দিজির মতোই নকশাদার মাটির পাত্র পাওয়া গেছে রাজস্থানের সোথি এবং কালিবাংগান এলাকা থেকে। আরো পূর্বে হরিয়ানার কুনাল এবং বানাওয়ালি থেকেও একই রকমের নকশাকাটা মাটির পাত্র পাওয়া গেছে। আবার দক্ষিণে গুজরাটের ধোলাভিরাতেও, প্রাক-হরপ্পা জনপদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

    আরাবল্লি পাহাড় আজও খনিজ তামার উৎস। তামা এবং তার সংকর ধাতুর উৎপাদনে ওই সময় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিল গানেশ্বর। সংকর ধাতু উৎপাদনে হরপ্পা সংস্কৃতির ছিল একাধিপত্য, অতএব আরাবল্লির পাহাড়ি এলাকা থেকেই সেখানে তামা ও অন্যান্য ধাতু সরবরাহ হত। ইতিমধ্যে এসে গেছে সোনা ও রূপো। রূপো আসত আরাবল্লী থেকে আর রাজস্থান ও গুজরাটের পাহাড়ি হিরণ্যগর্ভ অঞ্চল থেকে সোনা আসত তার লোভনীয় ঔজ্জ্বল্য নিয়ে। 

    সিন্ধু ছাড়াও হাকরা নদীর অববাহিকায় আধুনিক বাহাওয়ালপুর এবং চোলিস্তানের কাছে দুটি জনপদের সঙ্গে রাজস্থান ও পাঞ্জাবের বেশ কয়েকটি জনপদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই সময় হাকরা যথেষ্ট শক্তিশালী নদী থাকলেও পরের দিকে শুকিয়ে গিয়েছিল এবং গতিপথ পালটে পাঞ্জাবের ঘাঘর নদী হয়ে উঠেছিল।
     
    অতএব সিন্ধু-হাকরা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা জনপদগুলির মধ্যে যে নিবিড় সংযোগ গড়ে উঠেছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে যাওয়া-আসার জন্যে জলপথে  নদী এবং শাখানদীগুলি সহায়ক ছিল। আর ছিল সেই স্থলপথ – যে স্থলপথ দিয়েই সমস্ত মানব প্রজাতি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এবং পরবর্তীকালে হোমো স্যাপিয়েন্সরাও ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছে। আরও পরবর্তী কালে ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্থান স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত, সোয়াৎ উপত্যকা হয়ে ওই স্থলপথই ছিল পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে আসা এবং যাওয়ার একমাত্র স্থল পথ। এই জনপদগুলির আন্তর্বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং মৈত্রী-সম্পর্ক, কয়েক শ বছরের মধ্যে হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদরো-র মতো সুপরিকল্পিত নাগরিক সভ্যতা গড়ে ওঠার সহায়ক হয়েছিল। এর পিছনে পিতা পশুপতি বা পশুপতিদেব, মিত্তিকা বা দেবীমা এবং বিশ্‌ভাই বা বিশ্‌দেবের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

    চলবে...
    (০৬/০৫/২০২২ তারিখে আসবে দ্বিতীয় পর্বের তৃতীয় অধ্যায়।)

    গ্রন্থ ঋণঃ
    ১) The penguin history of Early India – Romila Thapar
    ২) Sapiens - A brief history of humankind – Yuval Noah Harari
    ৩) https://www.harappa.com

    [1] এই ট্র্যাডিশন আজও চলছে। শহর ও শহরতলির আওতা ছাড়িয়ে একটু দূরের গ্রামে ঢুকলে আজও এমন দৃশ্য ভারতবর্ষের সর্বত্র চোখে পড়বে। দশ-বারো হাজার বছরে ভারতের গ্রামীণ সমাজে আহামরি তেমন পরিবর্তন ঘটে ওঠেনি। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুতের আলো কিংবা প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনা এই ধরনের মানুষদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তায় তেমন আলোকপাত করতে পারেনি। তবে একথাও সত্যি, স্বাধীন ভারতে এই শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে দু-একজন করিতকর্মা মানুষ বছর পাঁচেক কোন শাসক দলের সোনারকাঠির ছোঁয়া পেলে, কাঞ্চনপ্রভায় সমাজের চোখ ঝলসে দিয়ে থাকেন।  

    [2] পঙ্গপাল এক ধরনের ঘাসফড়িং। সাধারণতঃ এরা একা একাই থাকে এবং সে সময় এরা আদৌ বিপজ্জনক নয়। কিন্তু কোন কোন সময়, বিশেষতঃ দীর্ঘ খরার পর প্রচুর বৃষ্টির ফলে, শস্যক্ষেত্র যখন দ্রুত সবুজ হয়ে উঠতে থাকে, তখন এদের মস্তিষ্কে সিরোটিন নামে একটি হরমোনের ক্ষরণ হঠাৎ বেড়ে যায়। যার ফলে এই পতঙ্গের অসম্ভব দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটে এবং স্বাভাবিক চরিত্র বদলে এরা দলবদ্ধ হয়ে ওঠে। তখন দলবদ্ধ কোটি কোটি পতঙ্গের ঝাঁক মেঘের মতো উড়তে শুরু করে এবং যাযাবরের মতো স্থান পরিবর্তন করতে থাকে। সেই সময় এদের ওড়ার পথে যত শস্যক্ষেত্র পড়ে সেগুলিকে আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস করে দিয়ে যায়। সুপ্রাচীন কাল থেকে ভয়ংকর এই পতঙ্গের উল্লেখ বিশ্বের প্রায় সব প্রাচীন সভ্যতাতেই পাওয়া যায়। এই পতঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে।
              

    [3] আরেকবার মনে করিয়ে দিই, হোমোস্যাপিয়েন্স প্রজাতিকে আমি “মানুষ” বলে বর্ণনা করছি, এবং তাদের আগেকার প্রজাতিগুলিকে একত্রে “মানব” প্রজাতি বলছি।

    [4] লাপিস ও টারকোয়েজ – লাপিস লাজুলি (Lapis Lazuli) বা সংক্ষেপে লাপিস হল গভীর নীলরঙের খনিজ পাথর আর টারকোয়েজ (Turquoise) হল নীলচে-সবুজ রঙের খনিজ পাথর – তামা বা অ্যালুমিনিয়ম ঘটিত ফসফেট যৌগ। এই দুই পাথরই সুন্দর রঙের জন্যে দামি পাথর হিসেবে অলংকারে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

     
  • | রেটিং ৪.৫ (২ জন) | বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৯ এপ্রিল ২০২২ | ৩৬১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ৩০ এপ্রিল ২০২২ ১৩:১১507031

  • [1] এই ট্র্যাডিশন আজও চলছে।
     
    সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে ব্রিটেনের এনক্লজার বা ঘিরে ফেলো আইনের বলে চারণদের গতি প্রকৃতি সীমায়িত হলো তিরিশ বছর আগে অনেক রোমানিয়ান গ্রামে গেট থাকতো সন্ধেয় সেই দ্বার রুদ্ধ হওয়া নাগাদ ফিরে আসা বাধ্যতা মূলক এবং বিলম্ব দণ্ডনীয় ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেত প্রভুরা ঘিরে ফেলোআইনের উলটোটা করলেন - চাষি ও রাখাল যেন  থাকে চোখে চোখে । কত কথা যে বলার । থামি। আপনি আমার শনিবারের সকালের বিশ্রামে বাগড়া দিচ্ছেন । 
  • Sara Man | ৩০ এপ্রিল ২০২২ ২১:১৩507039
  • কিশোর বাবু, আপনার মনোগ্রাহী লেখাটি পড়ছি। আচ্ছা, আপনি যে যুগের কথা বলছেন, সে যুগে মানুষের ভাব প্রকাশের ভাষা কেমন, সেটা যদি বলেন। সম্প্রতি রিসার্চগেট ওয়েবসাইটে একটি আলোচনা পড়লাম, যে আঁকতে শেখা আর লিখতে শেখার মধ‍্যে নাকি তিরিশ হাজার বছরের পার্থক্য। তাই এই বিষয়ে জানতে আগ্রহী।   
  • Kishore Ghosal | ০১ মে ২০২২ ০০:৩৯507044
  • ম্যাডাম, একদম ঠিকই পড়েছেন।  বিশ্বের প্রথম লিপির নিদর্শন মেসোপটেমিয়ার সুমের সভ্যতায় (মোটামুটি ৩৫০০ বিসিই), মিশরের হিয়েরোগ্লিফ প্রায় সমসাময়িক (মোটামুটি ৩২০০ বিসিই)। ভারতের  প্রথম লিপির নিদর্শন মেলে  সিন্ধু সভ্যতায়  মোটামুটি ২৬০০ বিসিই-তে, দুর্ভাগ্যবশতঃ  আজও তার পাঠোদ্ধার করা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই সবকটি লিপিই কিন্তু চিত্রলিপি (pictograph)। অন্যদিকে  বিশেষজ্ঞরা বলেন বিশ্বের  প্রাচীনতম গুহাচিত্রটি আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে আঁকা হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার মারোস জেলার একটি গুহায়। আমাদের দেশের ভীমভেটকার গুহাচিত্রের মধ্যে প্রাচীনতমগুলি আজ থেকে প্রায় তিরিশ হাজার বছর আগেকার।    
     
    আমাদের পরবর্তী ও আধুনিক লিপি নিয়েও আলোচনা আসবে, ম্যাডাম, পরের পর্বগুলিতে। 
     
    আর সে যুগের অর্থাৎ প্রাক-আর্য যুগের মানুষের ভাষা কেমন ছিল, সে কথা জানা আজ আর সম্ভব নয়। আর্যদের শক্তিশালী এবং সুনিয়ন্ত্রিত ভাষার দাপটে সে ভাষা বহুদিন অবলুপ্ত। আমাদের স্কুলে পড়া  ব্যাকরণ বইতে  প্রাক-আর্য যুগের কিছু কিছু দেশী বা দেশজ শব্দ  - যেগুলি আজ আমরা ভুলে যেতে পারলে বেঁচে যাই - বাংলা ভাষায় এখনো কোনমতে টিকে আছে। যেমন,  মুড়ি, ঝ্যাঁটা, মাঠ, ঘাট,  খোঁপা, খাঁচা, খড়, কুটো, এমন আরো অনেক। শুধু বাংলাতে নয়, ভারতের সমস্ত আঞ্চলিক ভাষাতেই এমন বহু প্রাক-আর্য শব্দ আজও প্রচলিত আছে। কিন্তু  সে যুগের মানুষেরা ঠিক কোন শব্দ বিন্যাসে বাক্য গঠন করে মনের ভাব প্রকাশ করত, সে কথা আজ আর বলা সম্ভব নয়। 
      
    ধৈর্য নিয়ে পড়ার জন্যে অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই।   
  • Kishore Ghosal | ০১ মে ২০২২ ০০:৫৮507045
  • @ স্যার, 
    আপনার কয়েকটি লেখা পড়তে শুরু করে, ইওরোপ ও রাশিয়ার ইতিহাসে আপনার জ্ঞানের গভীরতা দেখে রীতিমতো থমকে গিয়েছি। যদিচ, আপনার লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে, আপনি ব্যাংকার - ইতিহাস আপনার বিষয় নয়। 
     
    আপনার  বিশ্রামে শুধু ব্যাগড়া দিচ্ছি না, বরং আপনার মনের মধ্যে জমে থাকা বক্তব্যগুলি আমাদের শোনানোর জন্যে  উস্কানি দিচ্ছি।  লিখুন, আমরা ঋদ্ধ হই।   
     
  • Sara Man | ১৩ মে ২০২২ ০১:০০507557
  • লিংকে গিয়ে লেখাটি পড়লাম কিশোর বাবু। আর একটি প্রশ্ন আছে। হয়তো আপনার খুব বোকার মতোই মনে হবে, তবু। চিত্র লিপি ও চিত্র সংকেত আজকের দিনের লেখা আর আঁকা দুইয়েরই পূর্বজ। তবে চিত্র লিপি ও চিত্র সংকেতকে আমরা কী হিসেবে ধরব? লেখা নাকি আঁকা? মানে লেখা না আঁকা, কোনটাকে আগে ধরব? 
  • Kishore Ghosal | ১৩ মে ২০২২ ০১:১৯507558
  • ম্যাডাম, অবশ্যই আঁকা আগে - তারপরে  চিত্রলিপি,  তারপর বর্ণ বা অক্ষরলিপি।  
  • Sara Man | ১৩ মে ২০২২ ০৮:৩৭507566
  • ঠিক আছে ধন‍্যবাদ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন