এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ধর্মাধর্ম - চতুর্থ পর্ব - পঞ্চম  ভাগ 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ২৮ জুলাই ২০২২ | ৫৫৯ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • চতুর্থ পর্ব - থেকে ১৩০০ সিই – পঞ্চম ভাগ

    ৪.৫.১ গুহামন্দির
    গুহামন্দির নির্মাণ শুরু করেছিলেন সম্রাট অশোক, সে কথা আগেই বলেছি। এই গুহামন্দিরগুলি গয়ার কাছে বরাবর পাহাড়ে তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন আজীবিক সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের জন্য। এই গুহাগুলির নির্মাণে কাঠের কাঠামোর অনুকরণ করা হয়েছিল, অর্থাৎ কাঠের স্তম্ভ-কড়ি-বরগার আদলেই পাথরের দেওয়াল ও ছাদ খোদাই করা হয়েছিল। যদিও গুহাগুলির মসৃণ দেয়ালের পালিশ ছিল দেখবার মতো। বোঝা যায় একই দক্ষ শিল্পীরা সম্রাট অশোকের স্তম্ভগুলিরও পালিশ করেছিলেন। এর পরে সাতবাহন রাজাদের সময় দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অনেকগুলি গুহামন্দির নির্মিত হয়েছিল। তার মধ্যে সবথেকে প্রাচীন পুণার কাছে ভাজা গুহা। এই গুহাগুলির একটির শেষ প্রান্তে পাথর কেটে স্তূপের আকার দেওয়া হয়েছিল এবং এই স্তূপটি ঘিরে পিছনে ছিল, প্রদক্ষিণ পথ। এই গুহাগুলির দেওয়াল খোদাই করে অষ্টভুজ স্তম্ভ বানানো হয়েছিল এবং মন্দিরের ছাদ ছিল কিছুটা উত্তলাকারের (vaulted), তাতেও কাঠের বড়োবড়ো বরগার মতো করে পাথর খোদাই করা হয়েছিল। এরপরে সম্ভবতঃ খ্রীষ্টাব্দর শুরুতে কারলি গুহা বানানো হয়েছিল। এই গুহার চৈত্যটি অনেক বেশি অলংকৃত এবং গুহাগুলিও সুসজ্জিত। গুহার সামনে পাথর কেটে সুন্দর বারান্দা, সামনের দেওয়ালে জানালা এবং তিনটি প্রবেশ দ্বারে যুগলমূর্তির চমৎকার রিলিফ তৈরি করা হয়েছিল।

    তবে সব থেকে বিখ্যাত হল মহারাষ্ট্রের অজন্তার গুহামন্দিরগুলি। মোট সাতাশটি গুহা অশ্বক্ষুরাকৃতি পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে বানানো হয়েছিল। এই গুহাগুলির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল বি.সি.ই দ্বিতীয় শতাব্দীতে এবং শেষদিকের গুলি মোটামুটি সপ্তম শতাব্দী সি.ই.-তে। অদ্ভুত সুন্দর ভাস্কর্য এবং গুহার দেওয়ালে আঁকা চিত্রগুলি সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। যদিও দেওয়াল-চিত্রগুলি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে আসছে। এই গুহামন্দিরগুলি সবই বৌদ্ধ ধর্মীয়।

    অজন্তা থেকে প্রায় আটচল্লিশ কি.মি. দূরের ইলোরার গুহামন্দিরগুলি আরও বেশি সুন্দর। এখানে প্রায় চৌঁত্রিশটি গুহামন্দির রয়েছে, যাদের নির্মাণকাল পঞ্চম থেকে অষ্টম শতাব্দী সি.ই.-তে। এই গুহাগুলি সবই হিন্দুধর্মীয় এবং হিন্দু দেবদেবীদের প্রচুর মূর্তি খোদিত আছে। এই মূর্তিগুলির ভাস্কর্যও অনবদ্য। তবে এগুলির মধ্যে সবথেকে আশ্চর্য এবং সুন্দর গুহামন্দির হল কৈলাসনাথ মন্দির। এই মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, দক্ষিণের রাষ্ট্রকূট সম্রাট প্রথম কৃষ্ণ, যাঁর রাজত্বকাল ৭৫৬ থেকে ৭৭৩ সি.ই.। এতদিনের গুহামন্দিরগুলি  ছিল পাহাড়ের গা থেকে পাথর কাটা শুরু করে, পাথর কেটে পাহাড়ের ভেতরের দিকে বড়োবড়ো গুহা নির্মাণ। কিন্তু ছোট সম্পূর্ণ একটি পাহাড়কেই ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত কেটে মন্দিরের আদলে বানিয়ে তোলা হয়েছে কৈলাস মন্দির। এই মন্দিরের গায়ের অজস্র প্যানেলে পুরাণ, রামায়ণ এবং মহাভারতের নানান কাহিনীর অজস্র রিলিফ নিখুঁত সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণ ভাবে আমরা যে কোন মন্দির নির্মাণ শুরু করি ভিত থেকে, শেষ করি মন্দিরের চূড়ায়। এক্ষেত্রে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে, সম্পূর্ণ বিপরীত পদ্ধতিতে, অর্থাৎ চূড়া থেকে শুরু করে শেষে হয়েছে মন্দিরের ভিত। এই বিপরীত নির্মাণের পরিমিতি এবং প্রাক-পরিকল্পনা ভাস্কর কিংবা ভাস্করদের চূড়ান্ত দক্ষতার পরিচয়। উপরন্তু মন্দিরের গায়ে খোদাই করেছেন, অজস্র নিখুঁত রিলিফ প্যানেল। অনন্য এই নির্মাণ এর আগে এবং পরে ভারতবর্ষে তো বটেই, বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে বলে শোনা যায় না। তবে পাথর কেটে মন্দির বানানোর কাজ আরও হয়েছে, যেমন সপ্তম শতাব্দী সি.ই.-তে চেন্নাই থেকে আশি কিলোমিটার দূরের মামল্লপুরমে।

    ভারতে গুহামন্দিরের শেষ নিদর্শন মুম্বাই থেকে সামান্য দূরের এলিফ্যান্টা দ্বীপের গুহাগুলি। এই গুহাগুলির হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি, বিশেষ করে ত্রিমূর্তি – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের মূর্তিগুলি বিখ্যাত। এই গুহামন্দিরগুলি অনেকে বলেন পঞ্চম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে বানানো আবার অনেকে বলেন, পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি এগুলির নির্মাণ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

    ৪.৫.২ মন্দির
    গুপ্তযুগের আগেকার কোন মন্দিরের প্রত্ন-নিদর্শন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এর থেকে এমন প্রমাণ হয় না, যে তার আগে ভারতীয়দের মনে মন্দির নির্মাণের কোন ধারণা ছিল না। বরং এমন অনুমান করা যায়, ইঁট-কাঠ-মাটি দিয়ে বানানো মন্দিরগুলি আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি।

    সবথেকে প্রাচীন মন্দিরের প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে, তক্ষশিলা শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে, জায়গাটির আধুনিক নাম জনদিয়াল। মন্দিরটির নির্মাণে স্পষ্ট গ্রীক প্রভাব দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, এটি জরথ্রুস্টিয়ান মন্দির। গ্রীক প্রভাবে নির্মিত মন্দিরের আরও একটি নিদর্শন পাওয়া গেছে, কাশ্মীরের মার্তণ্ড বা সূর্য মন্দিরে। খ্রিষ্টিয় অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরের বাস্তু-পরিকল্পনা পরবর্তী কালের ভারতীয় মন্দিরের সঙ্গে সম্পূর্ণ মেলে না।  সেই কারণেই অনুমান করা হয় এগুলির নির্মাণ হয়েছিল গ্রীস বা পারস্য এবং ভারতীয় রীতির মিশ্র অনুসরণে। গুপ্তযুগের বেশ কয়েকটি মন্দিরের প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম হল ঝাঁসি থেকে সামান্য দূরের দেওগড় মন্দির, সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর নির্মাণ। এই মন্দির পাথর দিয়ে বানানো, এবং দেওয়ালে পাথরের জোড়গুলি মজবুত করার জন্যে লোহার রড ব্যবহৃত হয়েছিল। এর শীর্ষে পাথরের ছোট্ট একটি টাওয়ার আছে।

    গুপ্তযুগে হিন্দু মন্দিরের যে স্থাপত্য নিয়ম প্রচলিত হয়েছিল, সেই নিয়ম আজও বর্তমান। জমি থেকে বেশ কিছুটা উঁচু যে ভিতের ওপর সমগ্র মন্দিরটি নির্মিত হত, তাকে বলা হত “বিমান”। এই বিমানের মধ্যে সব থেকে ছোট অন্ধকার প্রকোষ্ঠটিকে বলা হয় “গর্ভগৃহ”। এই গর্ভগৃহেই প্রধান দেবতার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। গর্ভগৃহকে ঘিরে বৃত্তাকার যে অলিন্দ বানানো হত, তার নাম “প্রদক্ষিণ”। এই পথে ভক্তরা প্রধান দেবতাকে প্রদক্ষিণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিমানের ওপরে গর্ভগৃহের সামনে বানানো হত প্রশস্ত হলঘর, যার নাম “মণ্ডপ”। এই মণ্ডপ থেকে সমবেত ভক্তরা বিগ্রহ দর্শন করতেন, পূজা এবং প্রার্থনা নিবেদন করতেন। মণ্ডপে যাওয়ার আগে আরও একটি হলঘর বানানো হত, যার নাম “অর্ধমণ্ডপ”। জমি থেকে প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে বিমানে উঠে – ভক্তরা যাতে তাঁদের বিক্ষিপ্ত চঞ্চল মনকে দেবতার প্রতি স্থির-নিবিষ্ট করতে পারেন, সেই উদ্দেশেই এই অর্ধমণ্ডপ বানানো হত। গর্ভগৃহ ও প্রদক্ষিণ, মণ্ডপ এবং অর্ধমণ্ডপের ছাদ গুলিকে “শিখর” বলা হত। প্রত্যেকটি শিখরের উচ্চতা আলাদা হত। স্বাভাবিক ভাবেই গর্ভগৃহের শিখর সব থেকে উঁচু এবং সবথেকে অলংকৃত হত। এই শিখরের গঠন বৃত্তাকার থেকে চতুর্ভুজ কিংবা বহুভুজ হত এবং আকার হত পিরিমিডিয় বা নিচে থেকে শীর্ষের দিকে ক্রমশঃ সরু (tapering)। পরবর্তীকালে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরের গঠন ও আকার অনেক বিশদ এবং বিস্তৃত হলেও মূল কাঠামোতে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। ভারতবর্ষের মন্দির স্থাপত্যের দুটি ঘরানা পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছে, তার একটি দাক্ষিণাত্য এবং অন্যটি উড়িষ্যা বা কলিঙ্গ ঘরানা। স্থাপত্য এবং নির্মাণ প্রকৌশল নিয়ে অনেকগুলি “শিল্পশাস্ত্র” এবং “বাস্তুশাস্ত্র”-এর গ্রন্থও এসময়ে রচিত হয়েছিল।

    খ্রীষ্টিয় সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতের মন্দির স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য শিল্পের সুবর্ণ যুগ বলা যায়। দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্যে পহ্লব, চোল, রাষ্ট্রকূট ও চালুক্য রাজবংশের অবদান অবিস্মরণীয়। এই পর্যায়ের নির্মিত মন্দিরগুলি অনেক বেশি ব্যাপ্ত এবং বিস্তৃত। প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ ভারতে মন্দির স্থাপত্যের আলাদা ঘরানার সূত্রপাত করেছিলেন পহ্লব রাজ নরসিংহবর্মণ (৬৪২-৬৮৮ খ্রীষ্টাব্দ), তাঁর সমুদ্র সৈকতে বানানো মামল্লপুরমের মন্দির থেকে। পরবর্তী কালে গোপুরম (প্রবেশদ্বার), বিমান, গর্ভগৃহ, অলিন্দ, নাটমন্দির, মণ্ডপ, মহামণ্ডপ নিয়ে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলি বিশাল এবং বিস্তৃত আকার নিয়েছিল। এর সঙ্গে মন্দিরের প্রাঙ্গণে আরও যুক্ত হয়েছিল বাঁধানো সরোবর, ফুলের বাগান, কোষাগার, যাত্রীনিবাস, ভাণ্ডারগৃহ ইত্যাদি। এই সব কিছু সুরক্ষিত রাখতে নির্মাণ করা হত বিশাল পাথরের প্রাচীর। মূল মন্দিরের শিখরের উচ্চতা এবং অলংকরণও হয়ে উঠেছিল বিশদ। সমগ্র দক্ষিণ ভারত জুড়েই এমন আশ্চর্য এবং অপরূপ বহু মন্দির আজও সগৌরবে বিরাজমান।

    সেই তুলনায় উত্তরভারতের অধিকাংশ প্রধান শহরের মন্দিরগুলির আজ আর কোন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। যেগুলি আছে সেগুলি পরবর্তীকালে পুনর্নির্মিত। এমনকি বিখ্যাত বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দিরও মাত্র কয়েকশ বছর আগে পুনর্নির্মিত। উত্তর ভারতের কয়েকটি অঞ্চলে বেশ কিছু মন্দির আজও স্বমহিমায় টিকে আছে যেমন উড়িষ্যা, বুন্দেলখণ্ড এবং গুজরাটের মন্দিরগুলি। উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর, কোণার্ক এবং পুরীর অনবদ্য শৈলীর মন্দিরগুলির নির্মাণ কাল অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে। বুন্দেলখণ্ডের প্রধান দর্শনীয় স্থাপত্যগুলির নির্মাণকাল দশম এবং একাদশ শতাব্দীতে। এর মধ্যেই আছে বিশ্ববিখ্যাত খাজুরাহোর মন্দিরগুলি। এই মন্দিরগুলির গঠন কলিঙ্গ ঘরানার থেকে অনেকটাই আলাদা এবং উত্তরভারতের মন্দির স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অনুসারী। গুজরাটের সোলাংকি রাজবংশ একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অনেকগুলি জৈন এবং হিন্দু মন্দির স্থাপনা করেছিলেন। তার মধ্যে অনেকগুলির স্থাপত্য এবং অলংকরণে অনবদ্য শৈলীর প্রকাশ ঘটেছে, যেমন মাউন্ট আবুর জৈন মন্দির। এর অপরূপ সৌন্দর্য আজও মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে।

    ৪.৫.৩ ভাস্কর্য
    মৌর্য আমলে পাথর খোদাই করে ভাস্কর্য নির্মাণের শুরু এবং সাঁচি, ভারহুত, সারনাথ এবং আরও কিছু অঞ্চলে তার নিদর্শন পাওয়া গেছে এবং তার কিছু কিছু বর্ণনা আগেই দিয়েছি। ভারতীয় ভাস্কর্যের নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছিল কুষাণ যুগে, গান্ধার শিল্পের হাত ধরে এবং ভারতে এই গান্ধার শিল্পের কেন্দ্র ছিল মথুরায়। যদিও মথুরার ভাস্কর্য শিল্পের শুরু হয়তো খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতেই। এই সময়ে তাঁরা জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায়, পাথরের ফলকে দিগম্বর তীর্থংকরের ধ্যানস্থ মূর্তি খোদাই করেছিলেন। তাছাড়া মথুরা স্তূপের রেলিংয়ের গায়ে প্রচুর যক্ষীমূর্তিও খোদাই করেছিলেন। এই যক্ষীদের অতিরঞ্জিত পয়োধর ও নিতম্ব এবং ক্ষীণতম কটি, এই শিল্পের অন্যতম বিশেষত্ব। এই যক্ষীমূর্তিগুলির নৃত্যের ভঙ্গিমা এবং তাদের অঙ্গের বিভিন্ন অলংকারের সূক্ষ্মতা নিঃসন্দেহে শিল্পীদের দক্ষতাকেই প্রকাশ করে।

    কুষাণ যুগে, বিশেষ করে সম্রাট কণিষ্ক, মথুরা ঘরাণার এই ভাস্করদের প্রভূত পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। মথুরার কাছেই মাট নামক একটি গ্রামে, যেখানে হয়তো সম্রাট কণিষ্কের শৈত্যাবাস ছিল, সেখানে একটি ছোট ধর্মস্থানে (chapel) বেশ কয়েকজন কুষাণ রাজা এবং রাজকুমারদের মূর্তিখোদাই করা হয়েছিল। এখানেই সম্রাট কণিষ্কের মুণ্ডহীন একটি পূর্ণ মূর্তিও পাওয়া গেছে। যেখানে সম্রাট কণিষ্ক মধ্য-এশিয়ার প্রচলিত ভারি পোষাক, বুটজুতো পরে দাঁড়িয়ে আছেন, এক হাতে তাঁর তলোয়ার আর অন্য হাতে ঢাল।

    বৌদ্ধধর্মের হীনযানী মতে এতদিন কোথাও বুদ্ধদেবের মূর্তি চিত্রিত হয়নি, তাঁর পরিবর্তে নানান প্রতীক ব্যবহার করা হত, যেমন ধর্মচক্র, অশ্বত্থ গাছ, সিংহ ইত্যাদি। কণিষ্কের আমলে বৌদ্ধধর্মের মহাযানী শাখার উদ্ভব হওয়াতে, মহাযানী বৌদ্ধরা গান্ধার এবং মথুরার মূর্তিগুলি এবং তীর্থংকরের ধ্যানস্থ মূর্তি দেখেই যে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি বানানোয় উৎসাহী হয়েছিলেন সেকথা অনুমান করাই যায়। অতএব কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন হয়ে গেলেও মহাযানী মতের বিপুল পৃষ্ঠপোষকতায়, বুদ্ধদেব, বোধিসত্ত্বের মূর্তি এবং তাঁর জাতকের নানান কাহিনী নিয়ে অজস্র চিত্র ফুটে উঠতে লাগল পাথরের ফলকে। শুধু উত্তরভারতেই নয়, দক্ষিণভারতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। যার ফলে সাতবাহন আমলের নির্মাণ (খ্রীষ্টিয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দী) অমরাবতী স্তূপের প্রস্তর ফলকে বুদ্ধদেব এবং জাতকের নানান কাহিনী এবং বেশকিছু পূর্ণ অবয়ব বুদ্ধমূর্তিও দেখতে পাওয়া যায়। যার নিদর্শন সাঁচি বা ভারহুত স্তূপে নেই। অমরাবতী স্তূপের প্রভাবে পরবর্তী কালে সিংহল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতেও, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী অনুরূপ মূর্তির প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল।
     
    তবে ভারতীয় শিল্পের উৎকর্ষ দেখা গেল চতুর্থ থেকে পঞ্চম শতাব্দীতে, যে সময়ে সারনাথ স্তূপের শেষ পুনর্নিমার্ণের কাজ হয়েছিল। সারনাথে বুদ্ধদেবের মূর্তিটিই হয়তো প্রথম, যার মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক সত্ত্বা ভাষা পেয়েছে কঠিন পাথরের মূর্তিতে। ধ্যানস্থ ভঙ্গীতে ভগবান বুদ্ধ বসে আছেন। তাঁর পেলব অবয়বে কোথাও পেশিশক্তির প্রকাশ ঘটেনি। প্রশান্ত মুখে মৃদু হাসির আভাস, দুই চোখ অর্ধ নিমীলিত, তাঁর হাতের চাঁপার কলির মতো নিখুঁত সুন্দর আঙুলে ধর্মচক্র মুদ্রা। তাঁর মাথার পিছনে অলংকৃত জ্যোতির্বলয়। দুপাশে দুই আকাশচারী উপদেবতা যেন তাঁর কথা শুনছেন। সার্থক এই মূর্তিটিই যেন নির্দিষ্ট করে দিল, পরবর্তী ভারতীয় সমস্ত শিল্পের, সে চিত্র হোক বা ভাস্কর্যের, মানদণ্ড।

    ভারতীয় শিল্পের রূপরেখা ও তার বিধিবিধানকে ষড়ঙ্গ বলা হয়, সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

    ৪.৫.৪ ভারতীয় শিল্পের ষড়ঙ্গ
    শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “ভারতশিল্পে ষড়ঙ্গ” নিবন্ধে মূলতঃ চিত্র নিয়ে বললেও, ভাস্কর্য সম্পর্কেও এই তত্ত্ব সমান কার্যকরী, সেকথা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝবেন।

    আচার্য বলেছেন, আলেখ্যর ছয়টি অঙ্গ – যেমন রূপভেদ, প্রমাণ, ভাব, লাবণ্য-যোজনা, সাদৃশ্য আর বর্ণিকাভঙ্গ।

    রূপভেদ–এই জগতে আমরা যা কিছু দেখি, তার থেকে একটি বা কয়েকটি বিষয় বেছে নিয়ে শিল্পী ছবি আঁকেন। সেই বিষয়ের বিশেষ ব্যক্তি, প্রাণী, গাছপালা অথবা বস্তুর বাহ্যিক রূপ সম্পর্কে শিল্পীর স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিৎ। অর্থাৎ চিত্রটি পুরুষ কিংবা নারীর, অল্প অথবা বেশি বয়সী, কোন দেশের, কোন শ্রেণির ইত্যাদি সকল বিষয়েই শিল্পীর স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। উপরন্তু হরিণের চিত্র দেখে কোন সাধারণ দর্শক যদি সেটিকে শিং-না-গজানো ভেড়া বলে মনে করেন, তাহলে বুঝতে হবে, শিল্পীর রূপভেদ সম্পর্কে ধারণা অপ্রতুল।

    প্রমাণ –রূপভেদের পরেই অথবা একই সঙ্গে এসে পড়ে প্রমাণ অর্থাৎ সামঞ্জস্যপূর্ণ আকার। যেমন নর ও বানরের অবয়বের কিছু সাদৃশ্য আছে আবার বেশ কিছু বৈসাদৃশ্য আছে। বানরের শরীরে লেজ না দিলেই বানর নর হয়ে যায় না, কিংবা নরের শরীরে প্রচুর লোম, বানরোচিত মুখাবয়ব, একটি লেজ অথবা চারটি হাত এঁকে দিলেই নর বানর হয়ে যায় না। এই দুইয়ের মধ্যে আছে সূক্ষ্ম মাপ-জোক, অঙ্গ-সংস্থান এবং বিশেষ ভঙ্গিমা – সেটাই প্রমাণ। প্রাচীন শিল্পসাধকরা শিল্পমূর্তিকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন, যেমন নর, ক্রূর, আসুর, বালা এবং কুমার। এই পাঁচশ্রেণীর মূর্তির জন্যে তাঁরা বিভিন্ন শ্রেণীর তাল ও মান নির্দেশ করেছেন। এই তাল ও মান হল – সামঞ্জস্য এবং মাপ-জোক অথবা এক কথায় বলা চলে প্রোপোরশনস (proportions)। যেমন নরমূর্তি হবে দশতাল; ক্রূরমূর্তি দ্বাদশতাল; আসুরমূর্তি ষোড়শতাল; বালামূর্তি পঞ্চতাল এবং কুমারমূর্তি ষট্‌তাল। শিল্পীর নিজ মুষ্টির এক-চতুর্থাংশকে বলে এক আঙুল। এরকম দ্বাদশ আঙুল বা তিন মুষ্টিতে হয় এক তাল।

    শিল্পাচার্য আরও বলেছেন, রাম, কৃষ্ণ, নৃসিংহ, ইন্দ্র, অর্জুন প্রভৃতির মূর্তি নরমূর্তি অর্থাৎ দশ তাল। চণ্ডী, ভৈরব, বরাহ প্রভৃতি দ্বাদশ তালের ক্রূরমূর্তি। হিরণ্যকশিপু, রাবণ, কুম্ভকর্ণ, মহিষাসুর প্রভৃতি ষোড়শ তালের আসুরমূর্তি। বটকৃষ্ণ বা গোপাল প্রভৃতি পঞ্চতালের বালামূর্তি এবং বামন, কৃষ্ণসখা প্রভৃতির ষট্‌ তালের কুমারমূর্তি। শুধু তাই নয়, দেহের বিভিন্ন অংশ, হাত-পায়ের মাপ কোন মূর্তিতে কত হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে, নর ও নারী মূর্তির প্রভেদ সহ। এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এত নিয়ম-কানুন, নির্দিষ্ট মাপ-জোক দিয়ে, বৈচিত্রময় মূর্তি কী করে আসবে - সবই তো একঘেয়ে এক ছাঁচের বানানো মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। মোটামুটি একই প্রোপোরশনে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানব শরীর জন্ম নিচ্ছে, অথচ তাদের প্রত্যেকেরই চেহারায় নিজস্ব ব্যক্তিত্ব রয়েছে।

    ভাব - চিত্রের বহিরঙ্গ বিষয়ে রূপভেদ এবং প্রমাণের কথা হল, এবার আসবে অন্তরঙ্গ রূপ অর্থাৎ ভাব। ভাবের কিছুটা আমরা বুঝতে পারি ভঙ্গী দেখে, কিছুটা আমরা অনুভব করি হৃদয়ে। একটি মেয়ে ছবিতে গালে হাত দিয়ে বসে কিছু ভাবছে, অথবা এক যুবক কোমরের তলোয়ারের মুঠ শক্ত হাতে চেপে ধরেছে, এই ছবির ভাব খুবই সরল বুঝতে খুব অসুবিধে হয় না। কিন্তু ভাবের রাজ্য সর্বদা এতটা সহজ নাও হতে পারে, যেমন ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি বা ছবি। আসলে এই ভাবরাজ্যেই শিল্পী এবং দর্শকের অন্তরের আত্মীয়তা। শিল্পী কখনই তাঁর শিল্পে ভাবের পূর্ণপ্রকাশ করেন না, তাতে ভাবের মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায়। শিল্পী কিছুটা ইঙ্গিত এবং আভাস দিয়ে থেমে যান, সে আভাস ধরা পড়তে হবে দর্শকদের মনে। দর্শক যখন কল্পনায় ভাবের নাও ভাসিয়ে মুগ্ধ হতে থাকবেন, তখনই শিল্পীর ভাবনা সার্থক, সার্থক দর্শকের শিল্পী সত্ত্বা।
     
    লাবণ্য-যোজন –লাবণ্য শব্দের উৎপত্তি লবণ থেকে, অতএব লাবণ্য-যোজনা অর্থ লবণ যোগ করা। শ্রীযুক্ত নারায়ণ সান্যাল মহাশয় আমাদের মতো সাধারণ লোকের পক্ষে বোঝার সুবিধের জন্যে লিখেছেন, মাছের তরকারি রান্নার সময়, মাছ, আলু, পটল এই সব উপাদান বিচারকে যদি আমরা “রূপভেদ” বলি, আর উপাদানের পরিমাণের অনুপাতে নানান মশলা প্রয়োগ যদি হয় “প্রমাণ”, তাহলে সেই তরকারিতে সঠিক লবণ প্রয়োগই হচ্ছে, লাবণ্য-যোজনা। সঠিক পরিমাণে, সঠিক সময়ে লবণ না দিলে যত উৎকৃষ্ট মশলাই দেওয়া হোক, তরকারির স্বাদ আসে না। সঠিক সময়েও, কারণ, তরকারি নামানোর শেষ মূহুর্তে লবণ দিলে তরকারির উপাদানগুলি সুচারু লাবণ্যময় হয়ে ওঠে না, আলুর ভেতরে কিংবা মাছের অন্তরে লবণ ঢুকবে না।

    এই স্থূল উপমার পরে, শ্রী রূপ গোস্বামীপাদের শ্লোক থেকে আরেকটি উপমা দিলে লাবণ্য-যোজনার সঠিক তাৎপর্য বোঝা যাবে। একটি মুক্তোকে তার আকার, আয়তন, রঙ সবই ছবি এঁকে বোঝানো যায়। কিন্তু মুক্তার সর্বাঙ্গে যে তরলিত ঢলঢল আভা সেটির তো কোন রূপভেদ বা প্রমাণ দেওয়া যায় না। কিন্তু যে শিল্পী তাঁর চিত্রে মুক্তোর এই আভাটিকে প্রকাশ করতে পারেন, তিনি তাঁর চিত্রে লাবণ্য-যোজনা করেন।

    সাদৃশ্য– সাদৃশ্য মানে সদৃশ ভাব অর্থাৎ উপমা। কাব্যে এবং সাহিত্যে উপমার প্রয়োগ আমরা সকলেই জানি, যেমন চন্দ্রবদন। এক্ষেত্রে চাঁদের মতো গোল মুখের কথা আমরা ভাবি না, কিন্তু তার শান্ত ঔজ্জ্বল্যের কথা বুঝতে পারি। করকমল বলতে পদ্মের মতো পবিত্র পেলবতার কথা বুঝি। বীরের বর্ণনায় সিংহ-কটি অর্থাৎ সিংহের মতো কোমর বলতে, তার হিংস্রতা নয়, শরীরের নমনীয় ক্ষিপ্রতার কথা বুঝি। এই সাদৃশ্য দিয়েই শিল্পী তাঁর চিত্রের বা মূর্তির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে থাকেন।

    বর্ণিকা-ভঙ্গ – ষড়ঙ্গের শেষ কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বর্ণিকা-ভঙ্গ। এটি হচ্ছে তুলি ও রঙের প্রয়োগ। যে শিল্পীর বর্ণিকা-ভঙ্গে দক্ষতা নেই, তার অন্য পাঁচটি অঙ্গে দক্ষতা থাকা-না-থাকা সমান। এর আগের পাঁচটি অঙ্গ তত্ত্ব কথা দিয়ে বোঝা সম্ভব, কিন্তু এই অঙ্গটি শিল্পীর নিজস্ব প্রতিভা ছাড়া আয়ত্ব করা সম্ভব নয়। এই বিষয়ে শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ ...তুলিটি ঠিক কতটুকু (রঙে) ভিজাইব, তাহার আগায় কতটা রঙ তুলিয়া লইব ও ঝাড়িয়া ফেলিব এবং সেই রঙ সমেত ভিজা তুলিটি কতটুকু চাপিয়া অথবা কতখানি না চাপিয়া কাগজের উপর বুলাইয়া দিব – ইহারই সম্বন্ধে প্রমা লাভ করা হইতেছে ষড়ঙ্গের বর্ণিকা-ভঙ্গ নামে শেষশিক্ষা বা চরম শিক্ষা”।

    এরপর সারনাথ, অজন্তা, ইলোরা, কোনার্ক, খাজুরাহোর মতো বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানে যখনই বেড়াতে যাবেন, ভারতীয় শিল্প-ভাস্কর্যের এই ষড়ঙ্গ তত্ত্বগুলি আশা করি মনে পড়বে।   

    ৪.৫.৫ সাহিত্য - কাব্য
    সাহিত্যে এবং মনীষায় এ যুগের অন্যতম নক্ষত্র অবশ্যই মহাকবি কালিদাস। তাঁর সময় অনুমান করা হয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এবং প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্ব কালে। তাঁর কাব্যগুলি সমসাময়িক সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন। যদিও তাঁর সম্বন্ধে বেশি কিছু জানা যায় না, কিন্তু তাঁর লেখা থেকে অনুমান করা যায়, তিনি দুঃখীর সমব্যথী, শিশু ও নারী মনস্তত্বে অভিজ্ঞ, ফুল, গাছপালা, পশুপাখিপ্রেমী এবং রাজসভার আড়ম্বরে অভ্যস্ত হলেও, সুখী এবং প্রশান্ত মানুষ ছিলেন। তিনি তিনটি নাটক লিখেছিলেন, “মালবিকাগ্নিমিত্র”, “বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌”; দুটি দীর্ঘ কাব্য, “কুমারসম্ভব” ও “রঘুবংশম্‌” এবং দুটি ছোট কাব্য “মেঘদূত” ও “ঋতুসংহার”। এছাড়াও তাঁর অনেকগুলি রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

    কালিদাস ছাড়াও মোটামুটি সমকালে অথবা সামান্য পরবর্তী কালে অনেকেই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, কিন্তু কেউই মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেননি। যেমন কুমারদাসের, “সীতাহরণ” কিংবা ভারবির “কিরাতার্জুনীয়”। সপ্তম শতাব্দীতে শ্রীরামের জীবন নিয়ে লেখা ভট্টির “ভট্টিকাব্য”। এই সময়েই আরেক কবি মাঘ রচনা করেছিলেন, “শিশুপালবধ”। মাঘ তাঁর কাব্যে অক্ষর, শব্দ এবং ছন্দ নিয়ে বেশ কিছু অদ্ভূত এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন, যেমন একটি মাত্র ব্যঞ্জন-ধ্বনি “দ” ব্যবহার করে এই শ্লোকটি,
            “দাদদোদুদ্দ-দুদ্‌-দাদী / দাদাদোদুদো-দী-দ-দোঃ।
            দুদ্‌-দাদম্‌ দাদাদেদুদ্দে / দদ-আদদ-দদো দ-দঃ”।।
    বেশ কিছু অপ্রচলিত এবং অস্পষ্ট-অর্থ-শব্দ নিয়ে এই শ্লোকটির অর্থ হতে পারে,
    “(যিনি) দান-দাতা, অরিদের (যিনি) দুঃখদাতা,
    (যিনি) পুণ্যদাতা, যাঁর বাহু দুঃখদাতার বিনাশ করেন,
    (যিনি) দানবদলনকারী, ধনাঢ্য এবং দরিদ্রকে যিনি সমদান দেন,
    অরিদলনে (তিনিই) উদ্যত করলেন তাঁর অস্ত্র”[1] । (ইংরিজি থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)

    এমন অদ্ভূত অদ্ভূত এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য সেকালে এবং পরবর্তী কালেও অনেকেই রচনা করেছিলেন। হয়তো তাঁদের অনেকেরই মনে হয়েছিল, মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়, অতএব তাঁরা চমকদার কিছু লিখে, মানুষের মনে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সমকালে তাঁরা নিশ্চয়ই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে এই ধরনের কাব্যগুলি দুর্বোধ্য এবং বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।

    এরকম আরও কিছু এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য পাওয়া যায়, যাকে “দ্বৈয়াশ্রয়-কাব্য” বলা হত। বিভিন্ন দ্ব্যর্থবোধক শব্দ এবং পংক্তি নিয়ে এই কাব্যগুলিতে একই সঙ্গে দুটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দ্বাদশ শতাব্দীর সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”। এই কাব্যটি একই সঙ্গে অযোধ্যার শ্রীরামচন্দ্র এবং বঙ্গের পাল রাজা রামপালের জীবনীর ওপর লেখা, কবি সন্ধ্যাকর রামপালের সভাকবি ছিলেন।

    সপ্তম শতাব্দীর কোন সময়ে আরেক জন কবি ছিলেন ভর্তৃহরি। তিনি কোন কাব্য রচনা করেননি, কিন্তু চার পংক্তির ছোট ছোট প্রায় তিনশ কবিতা রচনা করেছিলেন। এই কবিতাগুলি, পার্থিব জ্ঞান, ত্যাগ, প্রেম, আদিরস ইত্যাদি নানান বিচিত্র বিষয়ের ওপর এবং অধিকাংশ কবিতাই বেশ রসোত্তীর্ণ। যেমন,
    “(হয়তো)       কুমীরের গ্রাস হতে পারো ছিনিয়ে আনতে মণি,
                            সাগর পার হতে পারো সাঁতরে ঢেউয়ের সার,
                       মালা করে চুলে জড়াতেও পারো কাল-ফণী, 
    (কিন্তু)                  ঘোঁচাতে কী পারো মূর্খের অন্ধ-সংস্কার!
    অথবা,
    (হয়তো)         বালুপিষে তেল পেতে পারো বহু ক্লেশে,
                                 মরীচিকা হতে জল পেতে পারো তৃষ্ণার
                          শশকের শিং যদিও বা দেখ কোনো দূরদেশে
    (কিন্তু)                     ঘোঁচাতে কী পারো মূর্খের অন্ধ-সংস্কার![2]
    (ইংরিজি থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)

    হয়তো ভর্তৃহরির সমসাময়িক আরেকজন কবির একই রকমের চার পংক্তির কবিতাগুচ্ছ পাওয়া যায় তাঁর নাম অমরু। তাঁর অধিকাংশ কবিতার বিষয় প্রেম, আবেগ এবং তীব্র কামনা। একাদশ কিংবা দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরি কবি বিলহনের লেখা “চৌরপঞ্চাশিকা”ও উল্লেখযোগ্য কাব্য। এক চোর এবং রাজকুমারীর গোপন প্রেম নিয়ে পঞ্চাশ স্তবকে লেখা এই কবিতাগুলির আবেগ ও অনুভূতি যথেষ্ট কাব্যময়। তবে দ্বাদশ শতাব্দীতে জয়দেবের লেখা সংস্কৃত কাব্য “গীতগোবিন্দ” বাংলায় এবং বিশেষ করে বাংলার বৈষ্ণব মহলে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। মূলতঃ রাধা ও কৃষ্ণের ভালোবাসার আবেগ-ঘন অনুভূতি এই কাব্যের বিষয়।  

    কাব্য এবং কবিতা ছাড়াও বর্ণনাভিত্তিক জনপ্রিয় গল্প-সংগ্রহ লিখেছিলেন সোমদত্ত, তাঁর বইয়ের নাম “কথাসরিৎসাগর”- সম্ভবতঃ একাদশ শতাব্দীর কোন সময়ের রচনা। দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরের কলহন রচনা করেছিলেন “রাজতরঙ্গিণী”- এই গ্রন্থটি কোন কাব্য গ্রন্থ নয়, বরং বলা চলে ঐতিহাসিক উপাখ্যান। কাশ্মীরের প্রাচীন রাজবংশের প্রচলিত কাহিনী এবং সমসাময়িক রাজাদের স্তুতি নিয়ে এই গ্রন্থটি রচিত। কাশ্মীরের সমসাময়িক রাজাদের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং রাজাদেরও অনেক তথ্য উল্লেখ করেছেন। অতএব কাব্য হিসেবে এই গ্রন্থের গুরুত্ব না থাকলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। রাজা হর্ষবর্ধনের জীবনচরিত নিয়ে লেখা, তাঁর বন্ধু ও কবি বাণভট্টের কথা আগেই বলেছি, তাঁর গ্রন্থের নাম “হর্ষচরিত”। এর পরে চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের (১০৭৫-১১২৫ সি.ই.) জীবন নিয়ে লেখা বিলহনের “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত” উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বাংলার কবি সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”-এর কথা আগেই বলেছি। সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত সাহিত্যের গ্রন্থটির নাম “হাম্মীর-মহাকাব্য”। এটির রচনাকার এক জৈন সন্ন্যাসী, নাম ন্যায়চন্দ্র সূরি। এই গ্রন্থটি খুব পরিচিত না হলেও, এর কাব্যগুণ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। চাহমান রাজা হাম্মীরের জীবনী নিয়ে লেখা এই গ্রন্থটি, ১৩০১ সালে আলাউদ্দিন খিলজির হাতে রণস্তম্ভপুরার  (আধুনিক রণথম্ভোর) যুদ্ধে হাম্মীরের পরাজয় এবং নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাকে কবি অত্যন্ত মহিমময় করে তুলেছিলেন।

    ৪.৫.৬ সাহিত্য – নাটক
    সংস্কৃত সাহিত্যে নাটকের শুরু কবে থেকে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যায় না। তবে কথোপকথনের বহুল প্রচলন উপনিষদগুলিতে পাওয়া যায়। যেমন কঠোপনিষদ, কেনোপনিষদ, বৃহদারণ্যকোপনিষদ ইত্যাদি। এই কথোপকথন অবশ্য কোন নাটক গড়ে তোলেনি, ধর্ম এবং বিশেষ করে ব্রহ্মজ্ঞানের চর্চায় গুরু-শিষ্যের আলাপ অথবা উন্মুক্ত সভার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিতর্কের সংলাপ। যেমন কঠোপনিষদে যমদেবের সঙ্গে নচিকেতার সংলাপ, কিংবা বৃহদারণ্যকে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে অন্যান্য পণ্ডিতদের তর্ক-বিতর্ক।

    বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংস্কৃতে নাটকের ধারণা এসেছে গ্রীক সংস্কৃতি থেকে। তাঁদের যুক্তি হল সংস্কৃত নাটকে মঞ্চের সামনে এবং পিছনে যে পর্দার ব্যবহার হয়, সংস্কৃতে তাকে “যবনিকা” বলে, এই যবনিকা শব্দটি এসেছে “যবন” থেকে। সংস্কৃতে “যবন” শব্দ গ্রীক অর্থে ব্যবহৃত হত। এই যুক্তি অবশ্যই তর্কসাপেক্ষ। কারণ সংস্কৃতে নাটকের ধারণা যদি সম্পূর্ণতঃ গ্রীক প্রভাবেই এসে থাকে, সেক্ষেত্রে যবনিকা ছাড়াও আরও অনেক শব্দ পাওয়া যেত, যার উৎস হত গ্রীক। সেরকম কোন উদাহরণ প্রাচীনতম নাটকেও পাওয়া যায় না। বরং আমার ধারণা, প্রাচীন কাল থেকেই ভারতে নাটকীয় ভাবে গল্প বলার – যাকে পালাগান বা যাত্রা বলা যায় - প্রচলন ছিল। প্রাচীন ভারতের এই ধরনের লোকশিল্প বা যাত্রার অভিনয় সর্বদাই মুক্তমঞ্চে অভিনীত হত, অর্থাৎ দর্শকরা মঞ্চের চারদিকে বসে যাত্রা দেখতে পারতেন, একদিকে কুশীলবদের যাওয়া আসার জন্যে ছোট একটি পথ ছেড়ে দিয়ে। গ্রীক প্রভাবে সেই মুক্তমঞ্চ পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলা হল এবং দর্শক শুধুমাত্র সামনে থেকেই অভিনয় দেখতে পারতেন। মঞ্চ ব্যবহারের এই দুই ধরণ অনুযায়ী অভিনেতাদের অভিনয়ের ধরণও বদলে যেতে বাধ্য - সেকথা অভিনেতারা অবশ্যই স্বীকার করে নেবেন। কারণ মুক্তমঞ্চের অভিনেতাদের চারদিকের দর্শকের কথা মাথায় রেখে ঘুরেফিরে-হেঁটেচলে অভিনয় করতে হত, সেখানে পর্দাঘেরা মঞ্চে তাঁদের অভিনয় করতে হয় একমুখী দর্শকদের কথা মাথায় রেখে। অতএব মুক্তমঞ্চে পর্দার ব্যবহারের এই গ্রীক প্রভাবকেই সংস্কৃত নাটক “যবনিকা” নাম দিয়ে স্বীকার করে নিয়েছিল।

    যাই হোক বিতর্ক এড়িয়ে আমরা এবার সংস্কৃত নাটকের দিকে চোখ ফেরাই। সংস্কৃত নাটকের প্রথম যে নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার রচয়িতা অশ্বঘোষ, যাঁর কথা আগেই বলেছি। যদিও তাঁর লেখা পূর্ণ নাটক একটিও পাওয়া যায়নি, কিছু কিছু অংশ পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ার মরু অঞ্চলে। যাঁর লেখা প্রাচীনতম পূর্ণাঙ্গ নাটক আমাদের কাল অব্দি এসে পৌঁচেছে, তাঁর নাম, ভাস। ভাসের সময় কাল সঠিক জানা যায় না, তবে বিশেষজ্ঞরা তাঁকে কালিদাসের নিশ্চিত পূর্বসূরী বলে সিদ্ধান্ত করেছেন। তাঁর লেখা তেরটি নাটকের মধ্যে দুটি মহানাটকের নাম, “স্বপ্নবাসবদত্ত” এবং “প্রতিজ্ঞাযৌগণধরায়ন”। এ ছাড়া তিনি অনেকগুলি ছোট নাটকও লিখেছিলেন।

    কিন্তু গুপ্তযুগের কালিদাস একদিকে যেমন মহাকবি ছিলেন, তেমনই ছিলেন মহানাট্যকার। কালিদাসের মাত্র তিনটি নাটক আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যেমন “মালবিকাগ্নিমিত্র”, “বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌”। প্রথমটি শুঙ্গ রাজত্ব-কালে রাজপ্রাসাদের হারেমের অন্তঃপুর-চক্রান্ত নিয়ে লেখা। দ্বিতীয়টি পৌরাণিক রাজা পুরুরবা ও ঊর্বশীর প্রেমের কাহিনী নিয়ে। তৃতীয়টি পৌরাণিক রাজা দুষ্মন্ত এবং মুনি কণ্বর পালিতা কন্যা শকুন্তলার কাহিনী। এই তিনটি নাটকের মধ্যে “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌” ভারত তো বটেই বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম। কাহিনী বিন্যাস, নাটকীয় ঘটনার মোড়, নানান চরিত্র গড়ে তাদের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা এবং তাদের মানসিক দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংশয় তুলে ধরায়, মহাকবি কালিদাস নাটকটিকে উৎকর্ষতার চরম সীমায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

    কালিদাসের প্রায় সমসাময়িক নাট্যকার শূদ্রক, তাঁর লেখা মাত্র একখানি নাটকই পাওয়া যায়, যার নাম “মৃচ্ছকটিক” (মৃৎ+শকটিক- মাটির খেলনাগাড়ি)। এই নাটকের বাস্তবমুখী গল্প, জটিল মনস্তত্ব এবং নাটকীয়তার জন্যে এই নাটক আজও বহুল জনপ্রিয়। সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর নাট্যকার বিশাখদত্তর দুটি রাজনৈতিক নাটক পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি “মুদ্রারাক্ষস”। এই নাটকের গল্পের বিষয়, শেষ নন্দরাজা ধননন্দকে উৎখাত করে, চাণক্যের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে বসানোর কূট পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র। প্রসঙ্গতঃ ধননন্দের প্রধান অমাত্যের নাম ছিল “রাক্ষস”। আরেকটি নাটক হল “দেবীচন্দ্রগুপ্ত”। এই নাটকের বিষয় বড়ো ভাই রামগুপ্তকে সরিয়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনে বসার ঘটনা, যে ঘটনার কথা আগেই বলেছি।

    রাজা হর্ষবর্ধনের (অথবা তাঁর নামে উৎসর্গ করা) লেখা তিনটি নাটক পাওয়া যায়, “রত্নাবলী”, “প্রিয়দর্শিকা” এবং “নাগানন্দ”। প্রথম দুটির নায়িকা অন্তঃপুর-নারী, তাঁদের নামেই নাটকের নাম এবং বিষয় অন্তঃপুরিকাদের নানান মজাদার ঘটনা। তৃতীয় নাটকটির নায়ক রাজকুমার জীমূতবাহন, গল্পের বিষয় নিজের জীবন দিয়ে আর্তের উদ্ধার। রাজা হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক আরেক রাজা, পল্লবরাজ মহেন্দ্র বিক্রমবর্মণ একখানি একাঙ্ক নাটক লিখেছিলেন, যার নাম “মত্তবিলাস”। নাটকটি প্রহসনধর্মী এবং তীব্র বিদ্রূপাত্মক। এক শৈব সন্ন্যাসী মদ্যপানে মত্ত হয়ে, তাঁর ভিক্ষাপাত্রটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই ভিক্ষাপাত্রটি ছিল একটি “কপাল” (অর্থাৎ নরখুলির উপরাংশ)। নেশাভঙ্গের পর, তাঁর এই কপালটি চুরি করার জন্যে তিনি দোষী সাব্যস্ত করলেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে। এই নিয়ে বহু বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ল গ্রামের উভয় পক্ষীয় মহিলা এবং পুরুষরাও। অবশেষে দেখা গেল কপালটি মুখে নিয়ে একটি কুকুর পালিয়েছিল। এই নাটকটির সাহিত্যগুণ যাই হোক সমসাময়িক সমাজের একটি স্পষ্ট খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছে।

    কালিদাসের পরেই বিখ্যাত সংস্কৃত নাট্যকারের নাম, ভবভূতি। বিদর্ভের ভবভূতির সময়কাল মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে, তিনি কনৌজের রাজা যশোবর্মনের সভাকবি ছিলেন। তাঁর তিনটি নাটক পাওয়া যায়, “মালতী-মাধব”, “মহাবীরচরিত” এবং “উত্তর-রামচরিত”। প্রথম নাটকটির বিষয় নায়ক ও নায়িকার প্রেম। পরের দুটি নাটকেরই নায়ক শ্রীরামচন্দ্র।

    ৪.৫.৭ সাহিত্য - গদ্য
    ভারতীয় ভাষায় এবং সংস্কৃতে কাব্য কিংবা নাটকের তুলনায় গদ্য রচনা খুবই কম। প্রথম সংস্কৃত গদ্য রচনা কিছু পাওয়া যায় উপনিষদে, ব্রাহ্মণে। তাছাড়া পালি ভাষায় গদ্য গ্রন্থ “জাতক” – ভগবান বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনীগুলি। ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীতে তিনজন লেখক কিছু গদ্য রচনা করেছিলেন, তাঁরা হলেন, দণ্ডিন, সুবন্ধু এবং বাণ। এঁদের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য এবং সার্থক লেখক দণ্ডিন, তাঁর গ্রন্থের নাম “দশকুমারচরিত”। এই গ্রন্থের দশটি গল্প দশজন রাজকুমারের ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে। দশজন রাজকুমারের দেশভ্রমণের বর্ণনা থেকে উঠে এসেছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা– তার মধ্যে আছে বণিক, চোর, বারবনিতা, রাজকুমারী, কৃষক এবং বন্য উপজাতি। এই অভিজ্ঞতা কখনো মজার, কখনো ভয়ংকর, কখনো অনৈতিক কিন্তু মোটামুটি বাস্তব। সমাজের নিম্ন স্তরের এমন সাবলীল এবং প্রায় বাস্তব চিত্র, সংস্কৃত সাহিত্যে আর পাওয়া যায় না।

    ৪.৫.৮ বিজ্ঞান

    ৪.৫.৮.১ মহাকাশ ও পৃথিবী
    বৈদিক বিশ্ব ছিল খুবই সহজ সরল, উপরে স্বর্গ, নিচেয় এই পৃথ্বী, আর এই দুইয়ের মাঝে আছে অন্তরীক্ষ বা বায়ু। স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররা ঘুরে বেড়ায় এবং অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়ায় যত পাখি, মেঘ এবং উপদেবতারা। বৈদিক সাহিত্যের ঋষিরা সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। তাঁরা সরল কিন্তু গভীর মননশীল প্রজ্ঞার দর্শন নিয়েই বড়ো প্রশান্তির জীবন যাপন করতেন।

    কিন্তু পরবর্তী কালে, বৈদিক দর্শন থেকে অনেকটাই সরে আসা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা যখন বৌদ্ধ, জৈন এবং সুপ্রাচীন অনার্য ধর্মীয় শাখাগুলির কাছে যথেষ্ট শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন, তখন বৈদিক প্রজ্ঞার সীমায় বন্দী না থেকে, তাঁরা সুপ্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে জটিল সব তত্ত্ব ও কাহিনী রচনা শুরু করলেন। এই কাহিনী রচনার শুরু খ্রীষ্টপূর্ব মোটামুটি দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন এক সময় থেকে।

    প্রথমতঃ তাঁরা এই মহাবিশ্বকে কল্পনা করলেন ব্রহ্মাণ্ড – যার স্থূল অর্থ ব্রহ্মের অণ্ড। এই ব্রহ্মাণ্ড একুশটি অঞ্চল বা বিভাগে বিভক্ত। উপর থেকে ধরলে পৃথিবী বা মর্ত্যের স্থান সপ্তম। পৃথিবীর উপরের ছয়টি স্তরে আছে ঊর্ধলোক। পৃথিবীকে বলা হয় ভূলোক এবং এর উর্ধের ছ’টি লোক হল, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জন, তপঃ এবং সত্য বা ব্রহ্মলোক। এগুলিকে স্বর্গও বলা হয়। বিভিন্ন স্বর্গের সুখের মাত্রা আলাদা এবং মর্ত্যলোকের পুণ্যসঞ্চয়ের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন স্বর্গলাভ হয়ে থাকে। ভূলোক এবং ছটি স্বর্গলোকের কথা অবিশ্যি বেদেও উল্লেখ আছে।  পৃথিবীর নিচের সাতটি স্তরে আছে সপ্ত পাতাল, যেমন, অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। পাতালের পরেও আছে সাতটি স্তর, সেগুলি নরক, যেমন তমিস্রা, অন্ধতমিস্রা, রৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, শূকরমুখ, অন্ধকূপ। পুণ্য সঞ্চয়ের মতো পাপ সঞ্চয়েরও মাত্রা আছে, সেই মাত্রা অনুসারে, মৃত্যুর পর মৃদু থেকে ভয়ংকর কষ্টদায়ক নরকে যেতে হত।

    সে যাই হোক, স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ও নরকের ধারণা যে বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা কল্পনা করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সমসাময়িক প্রচলিত ধর্মগুলির থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করা। তাঁরা সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হলেন, পুণ্য ও পাপ এবং তার ফলে প্রাপ্য পুরষ্কার ও তিরষ্কারের ধারণা। তাঁদের উচ্চারিত প্রত্যয়ী মন্ত্রের ব্যাখ্যায়, কথকতায়, ধর্মকথায় কল্পনার জগতের দুয়ার খুলে গেছিল সাধারণ মানুষের মনে। তাঁরা আশ্চর্য হয়েছিলেন, অভিভূত হয়েছিলেন, এবং বিশ্বস্ত হয়েছিলেন। আমাদের ছোটবেলাতেও গ্রামের বাড়িতে দেখেছি, বাঁধানো ফ্রেমে আঁকা নরকভোগের রঙিন চিত্রপট। সেখানে যমদূতেরা চোরদের হাত কাটে, পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকাদের লোহার কাঁটাওয়ালা স্তম্ভ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে হয়, ফুটন্ত তেলে পাপীদের ভাজতে ভাজতে (deep fry) যমদূতরা মাথায় ড্যাঙস মারে, ইত্যাদি। এভাবেই সাধারণ মানুষ যখনই বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে লাগল, বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের প্রশান্ত অধরে ফুটে উঠল সাফল্যের মৃদু হাসি এবং তাঁরা আরও নিবিড় কল্পকাহিনী রচনায় মগ্ন হতে লাগলেন – সেই সব কাহিনীই পুরাণ।

    এই তত্ত্বও কিছু বছরের মধ্যে অনেকটাই বদলে গেল, খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষ দিক থেকে খ্রীষ্টাব্দ প্রথম দুই শতাব্দীতে। তখন এই বিশ্ব-পৃথিবী হয়ে উঠল মোটামুটি সমতল বিশাল থালা বা রেকাবির মতো। যার কেন্দ্রে আছে মেরুপর্বত, যাকে ঘিরে ঘুরে চলেছে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ এবং সকল নক্ষত্র। দশদিকে আছে দশ দিকপাল।  এই মেরুপর্বতকে ঘিরে আছে জম্বুদ্বীপ। তার চারদিকে ঘিরে রয়েছে লবণ-সমুদ্র। দক্ষিণের এই দ্বীপ-মহাদেশের নাম জম্বুদ্বীপ। জম্বু মানে জাম গাছ, এই অঞ্চলে জামগাছের প্রাচুর্যের জন্যেই এই দ্বীপের নাম জম্বুদ্বীপ। লবণ সমুদ্রকে ঘিরে রয়েছে যে স্থলভূমি তার নাম প্লক্ষদ্বীপ। সেই দ্বীপের নাম প্লক্ষ নামের এক স্বর্ণময় বৃক্ষের নামে। প্লক্ষদ্বীপকে ঘিরে আছে ইক্ষুরস(ঝোলা-গুড়)-সমুদ্র। এই সমুদ্রকে ঘিরে আছে শাল্মলদ্বীপ – এই নাম ওই দ্বীপে একটি শাল্মলী গাছ থাকার কারণে। শাল্মলীদ্বীপকে ঘিরে আছে সুরা-সমুদ্রের বলয়। এভাবেই একের পর এক দ্বীপ ও সমুদ্র আছে যথাক্রমে কুশদ্বীপ -ঘৃতসমুদ্র, ক্রৌঞ্চদ্বীপ-ক্ষীরসমুদ্র, শাকদ্বীপ-দধিমণ্ডসমুদ্র, পুষ্করদ্বীপ-শুদ্ধোদকসমুদ্র। শুদ্ধোদক সমুদ্রের পরে আছে লোকালোক (লোক+অলোক) পর্বত। যতদূর পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় তার নাম লোক, তার বাইরের দেশগুলি সূর্যালোক বঞ্চিত – তাদের নাম অলোক। (শ্রীমদ্ভাগবত/৫ম স্কন্ধ/ অধ্যায় ২০)             

    বিশ্ব-তত্ত্বের শেষ দুটি ধারণা পুরাণ থেকে নেওয়া হয়েছে, যে পুরাণগুলি, বিশেষজ্ঞরা বলেন, মোটামুটি খ্রীষ্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে লেখা শুরু হয়েছিল এবং সর্বশেষ পুরাণ লেখা হয়েছে, খ্রীষ্টিয় প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি কোন সময়ে। অতএব সহজেই অনুমান করা যায় পুরাণের এই তত্ত্বগুলি মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এর কয়েকশ বছর আগে থেকেই। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, আমরা দেখেছি, মৌর্য যুগের আগে থেকেই বৈদেশিক বাণিজ্য সূত্রে পারস্য, মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রীসের মতো দেশগুলির সঙ্গে ভারতের নিবিড় পরিচয় স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিচয় না থাকলে বীর আলেকজাণ্ডার ভারতজয়ের স্বপ্ন কেন দেখেছিলেন?  মৌর্যযুগ থেকে এই বৈদেশিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং খ্রীষ্টপূর্ব শেষ দুটি শতাব্দী থেকে এদেশে রাজত্ব বিস্তার করেছেন, গ্রীক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব প্রভৃতি জাতি। তা সত্ত্বেও, ব্রাহ্মণ্য এবং হিন্দু পণ্ডিতেরা বিশ্বতত্ত্বের এমন ধারণা করলেন কেন, সেকথা ভগবান ছাড়া আর কে বলতে পারবেন?

    পৌরাণিক গ্রন্থে বিশ্বতত্ত্বের ধারণা যাই হোক, এর পাশাপাশি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশ্ব ও মহাকাশের ধারণা ছিল বিস্ময়কর – এবং সে ধারণার শুরু হয়েছিল বৈদিক এমনকি প্রাক-বৈদিক যুগেও।  

    ৪.৫.৮.২ গণিত
    ভারতীয় অংক, বিশেষ করে জ্যামিতি, পরিমিতি, কৌণিক মাপ, সূক্ষ্ম থেকে স্থূল ওজন পরিমাপের নিদর্শন সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলিতে আমরা দেখেছি। অতএব যজ্ঞবেদী নির্মাণের থেকে ভারতীয় জ্যামিতি ও পরিমিতির সূচনা এমন ধারণা যে আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, তার সঙ্গে আমি অন্ততঃ কোন ভাবেই সহমত হতে পারি না। বরং আর্যরা বৈদিক যজ্ঞবেদী নির্মাণের নানান মাপ-জোক শিখেছে অনার্য মানুষদের থেকেই।

    কিন্তু এরপর এই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কিছু জানা না গেলেও, যখন থেকে লিপি বা লিখিত তথ্য পাওয়া গেছে, সে সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা ও সাফল্য চমকপ্রদ। লিখিত তথ্য থেকে জানা যায় মোটামুটি খ্রীষ্টাব্দ তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যামিতি ও পরিমিতিতে প্রভূত উন্নতি করে ফেলেছিলেন এবং আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন নিরপেক্ষ সংখ্যা (Abstract Number) এবং বীজগণিত।

    নিরপেক্ষ সংখ্যা হল বিশেষ একধরনের লিপি, যা দিয়ে শুধু মাত্র সংখ্যাই বোঝানো যায়। যেমন, ৩, ৪, ৯ – এগুলি নিরপেক্ষ সংখ্যা, কিন্তু যখনই ৩ দিন, ৪ কি.মি. বা ৯ জন বলা হবে তখন সেগুলি নানান বিষয়ের নির্দিষ্ট পরিমাপ বোঝাবে। এই নিরপেক্ষ সংখ্যা আবিষ্কার, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অনন্য সৃষ্টি, যার ওপরে আধুনিক বিজ্ঞানের সকল শাখাই
    দাঁড়িয়ে আছে। উপরন্তু, এই নিরপেক্ষ সংখ্যার বৈশিষ্ট্য হল দশটি মাত্র লিপি - ১ থেকে ৯ এবং ০ দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম সংখ্যা অতি সহজে এবং সংক্ষেপে লিখে ফেলা যায়। এই সংখ্যার জাদু ধরা পড়বে একটি উদাহরণ দিলে, ১২৩৪ সংখ্যাটি সমসাময়িক রোমান ভাষায় লিখতে গেলে, MCCXXXIV দাঁড়াবে। ১২৩৪ সংখ্যাটিকে যদি আমরা ভাঙি – তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় – ১০০০+২০০+৩০+৪, এই অনুযায়ী  M(১০০০), CC(২০০), XXX(৩০), IV(৪)। এভাবেই আমরা তিরিশ কোটি সংখ্যাটি, অংকের নিয়মে লিখে ফেলতে পারি, ৩ x ১০। কিন্তু রোমান ভাষায় তিরিশ কোটি লেখার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রইলাম।    
     
    এই লিপির মধ্যে ০ (শূণ্য) সংখ্যাটির গুরুত্ব সীমাহীন, সীমাহীন সংখ্যা লিখতে। এই লিপির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় গুজরাটের ৫৯৫ সি.ই.-র একটি শিলালিপি থেকে, অতএব অনুমান করা যায় এর শিলালিপি লেখার অনেক আগে থেকেই শূণ্য সংখ্যার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই শিলালিপির প্রায় সমসময়ে, এই সংখ্যার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সিরিয়া এবং সুদূর ভিয়েতনামে! এইসংখ্যা-লিপির আবিষ্কার কে করেছিলেন সঠিক জানা যায় না, খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতাব্দীর একটি পাণ্ডুলিপিতেও – “বকশালী পাণ্ডুলিপি” -এই সংখ্যা-লিপির ব্যবহার দেখা গেছে। ৪৯৯ সি.ই.তে লেখা বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট, তাঁর গ্রন্থে এই সংখ্যালিপি ব্যবহার করেছিলেন। অতএব বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট সংখ্যা বা শূণ্যের আবিষ্কর্তা নন, তাঁর আগেই এগুলির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।

    গণিতবিদ আর্যভট্টের বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে অবদান অবিশ্বাস্য। জ্যামিতিতে, ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল – ভূমির অর্ধেক এবং লম্ব উচ্চতার গুণফল, বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে – পাই (π)-এর দশমিকের পর চার সংখ্যা পর্যন্ত অভ্রান্ত মান নির্ণয় – ৩.১৪১৬। প্রসঙ্গতঃ  তিনি প্রথম সংখ্যার দশমিক হিসেব আবিষ্কার করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রচলিত চান্দ্র-বছরের জটিল হিসাবের পরিবর্তে তিনি সৌর-বছরের প্রচলনের প্রস্তাব দেন এবং তাঁর সৌর বছরের হিসেব আধুনিক হিসেবের তুলনায় প্রায় নিখুঁত – ৩৬৫.৩৫৮৬৮০৫ দিন! তিনিই বিশ্বে প্রথম পৃথিবীকে একটি গোলক কল্পনা করেছিলেন এবং মত দিয়েছিলেন পৃথিবী তার নিজের অক্ষে ঘোরে। তিনিই প্রথম সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, পৃথিবীর ছায়া পড়ে চাঁদে গ্রহণ হয় এবং চাঁদ সামনে চলে আসে বলে সূর্যগ্রহণ হয়। তার আগে পর্যন্ত পৌরাণিক ধারণা ছিল রাহু নামের এক রাক্ষসের অমর মুণ্ড চাঁদকে এবং সূর্যকে গ্রাস করে। ইংরেজদের হাত ধরে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের স্পর্শ না আসা পর্যন্ত ভারতীয় পণ্ডিত বা অশিক্ষিত সমাজের এই বিশ্বাসকে আর্যভট্ট এতটুকুও প্রভাবিত করতে পারেননি। বরং তাঁর অনেকগুলি সিদ্ধান্ত প্রচলিত ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মনঃপূত না হওয়াতে, সম্ভবতঃ তাঁর পরবর্তী গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত সেগুলিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন।

    আর্যভট্টের সামান্য পরে বরাহমিহির জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) সঙ্গে জ্যোতিষচর্চা (Astrology) এবং রাশিফল বা কোষ্ঠী বিচারকেও যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট জীবিত থাকলে নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদ করতেন। কারণ জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতিষচর্চার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না, এমনকি বিপরীত কথা বলে। বরাহমিহিরের “পঞ্চসিদ্ধান্তিকা” গ্রন্থে সমসময়ের জ্যোতির্বিদ্যার পাঁচটি ঘরানার সংকলন এবং আলোচনা করেছিলেন। তার মধ্যে দুটি সিদ্ধান্তের কথা আগেই বলেছি, “রোমক” এবং “পৌলিশ” সিদ্ধান্ত।
     
    এই সময়ে আরবের প্রজ্ঞাবান মানুষদের সঙ্গে ভারতের বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আরবের পণ্ডিত মহলে ভারতের আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিতের খুবই সমাদর ছিল। একসময় বাগদাদ সম্রাটের (খলিফা) রাজসভায় অনেক ভারতীয় পণ্ডিত আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁরা বসবাস করতেন। এই বাগদাদ আরবী পণ্ডিতদের মাধ্যমেই পরবর্তী কালে, ভারতীয় গণিত ইউরোপের বিদ্বান সমাজে পৌঁছেছিল।

    ৪.৫.৯ ধর্ম
    এই সময়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নতুন ধর্মের ধর্মশাস্ত্রগুলি নতুন করে রচনা করা হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাবনা, নতুন আদর্শ এবং দর্শনে। এই হিন্দুধর্মের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবেই বৌদ্ধধর্মও অনেকটা হীনবল হয়ে উঠল। ভারত থেকে হীনযানী মত প্রায় দুষ্প্রাপ্য হতে বসল, মহাযানী মতও দুর্বল হয়ে গেল, কারণ মহাযানী শাখা ভেঙে উদ্ভব হল নতুন শাখা বজ্রযানী মত। বিপুল এই পরিবর্তনের কথা সবিস্তারে আসবে পরবর্তী ও অন্তিম পর্বে। তার আগে দেখা নেওয়া যাক হর্ষ পরবর্তী ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

    চলবে...
    (চতুর্থ পর্বের ষষ্ঠ ভাগ আসবে ০২/০৮/২২ তারিখে।)

    গ্রন্থ ঋণঃ
    ১. History of Ancient India – Rama Shankar Thripathi.
    ২. Penguin History of Early India – Dr. Romila Thapar.
    ৩. The Wonder that was India – A. L. Basham.
    ৪. অপরূপা অজন্তা – শ্রী নারায়ণ সান্যাল।
    ৫. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ – বাংলায় গদ্য অনুবাদ – তারাকান্ত কাব্যতীর্থ ভট্টাচার্য।

    [1] The Wonder that was India – A. L. Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।

    [2]  উপরের গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।
     
  • ধারাবাহিক | ২৮ জুলাই ২০২২ | ৫৫৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরূপ | 116.206.158.206 | ২৮ জুলাই ২০২২ ০৭:১২510442
  • খুব পরিশ্রমসাধ্য কাজ। মনোরম লেখা।
  • Sara Man | ২৮ জুলাই ২০২২ ০৮:১৬510444
  • কিশোর বাবু, ভারতীয় গণিত, জ‍্যামিতি আর পরিমিতি জ্ঞান যদি যথেষ্ট উন্নত হয়েছিল, তবে ভারতীয়রা কি মানচিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছিল? আমাদের geographical thought এর সিলেবাসের বইতে গ্রীক স্কুল, রোমান স্কুল, আরব স্কুল লেখা থাকে। এবিষয়ে ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞানের কথা কিছু লেখা থাকেনা। থাকলেও খুব ভাসা ভাসা। প্রাসঙ্গিক তথ‍্য থাকেনা। সিলেবাসেও আলাদা উল্লেখ থাকেনা। পরীক্ষায় কোনদিন প্রশ্নও আসেনা। যে জাতি চিত্রকলা আর মাপজোক দুটোই জানে, অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তারা এদিকটা অবহেলা করবে কেন? এটা আমার খুব জানার ইচ্ছে। 
  • হীরেন সিংহরায় | ২৮ জুলাই ২০২২ ১৪:৩৭510468
  • কিশোর 
     
    বাল্যকাল থেকে যে সব কাহিনী শুনে এসেছি তাদের  বিষয় ও কালমাফিক  সাজিয়ে আপনি আমাদের জাতিকে চিরন্তন কৃতঙ্গতাপাশে আবদ্ধ করলেন। কালিদাস ভবভূতি ভর্তৃহরি এই সব নাম তো শুনেছি কিন্তু তাঁদের কালানুযায়ী বা বিষয় অনুযায়ী চিনি নি ভর্তৃহরি মনে হয় জাপানি হাইকুর পিতৃ পুরুষ !
     
    সড়ঙ্গ -কিচ্ছুই জানতাম না .
     
     আর প্রশংসা করে বিড়ম্বনা বাড়াবো না ! দু একটি কথা যোগ করতে চাই . 
     
    রককাট বা রকহিউন :  স্টাইলের হিসেবে ( মানে একটা পাথরকে ওপর থেকে কেটে ) কৈলাস মন্দিরের সঙ্গে মেলে ইথিওপিয়ার লালিবেলার এগারোটি গির্জা। শিল্পের দিকে দিয়ে কৈলাস মন্দিরের সঙ্গে তার কোন তুলনা হয় না অবশ্য আলাদা করে ছবি পাঠালাম ..
     
    গথিক :  গথিক আর্চ প্রথম দেখা গেছে   খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে এই কারণেই পুরোনো গির্জার ভেতরে এতো অন্ধকার ( কোন গভীরতর অর্থে বলছি না !) তাই তক্ষশীলায় গথিক আর্চ পাওয়া সম্ভব নয়। 
     
    শূন্য :হিব্রু বাইবেলের একটা লাইন তুলে ধরার বাসনা প্রবল হয়ে উঠলো - ঈশ্বর জোবকে বলছেন " কোথায় ছিলে তুমি যখন আমি পৃথিবী বানাচ্ছিলাম ?  জানো যদি বলো "। ( বুক অফ জোব ৩৮:৪ ) । এর সঠিক উত্তর শূন্য কিন্তু বেচারি জোব শূন্য চেনে না ! মায়ারা নাকি একটা চোখের ছবি দিয়ে শূন্য বোঝাতো ব্যাবিলনে দুটো দাঁড়ি দিয়ে তবে আজকে আমাদের জানা শূন্য একান্ত ভারতীয় আবিষ্কার । 
     
    এতদিনে পুরাণের কেসটা বুঝলাম, কেন এই গালগপ্প ! 
     
    বরানগরের স্কুলে ইতিহাসের শিক্ষক সত্যপ্রিয় সার আমাদের  প্রথম যবনিকা সম্বন্ধে অবহিত করেন- এটি সম্পূর্ণ গ্রীক অবদান আমাদের দেশে আজও যাত্রায় চারিদিকে মানুষ বসেন গ্রীকদের এ ব্যবস্থা ছিল না । আরেকটি জিনিস আমরা গ্রীকদের কাছ থেকে পেয়েছি- কালানুজায়ী ইতিহাস লেখা । 
     
    ফাইল করে রাখছি যদিও বইয়ের আশায় রইলাম। 
     
     
     
     
  • Kishore Ghosal | ২৮ জুলাই ২০২২ ১৫:৫৩510478
  • @ অরূপ, অনেক ধন্যবাদ, দীর্ঘদিন সঙ্গে থাকার জন্যে।
     
    @ শারদা ম্যাডাম, প্রশ্নটা মোক্ষম তুলেছেন। সে যুগে ভারতীয়দের মানচিত্র রচনার কোন নিদর্শনের কথা  এখনও পর্যন্ত পাইনি। অথচ এটাও ঠিক, ভারতীয়রা স্থলপথে এবং সমুদ্রপথে পশ্চিমের এবং পূর্বের সমসাময়িক প্রায় সকল দেশেই তাদের চরণচিহ্ন রেখেছিল।  
  • Kishore Ghosal | ২৮ জুলাই ২০২২ ১৬:১৯510481
  • @ হীরেনস্যার, ভুলটা আমারই - সে সময় গথিক স্থাপত্যর জন্মই হয়নি। শুধরে নিয়েছি। ভুলটি লক্ষ্য করে জানিয়েছেন, অনেক অনেক ধন্যবাদ, স্যার।    
  • guru | 103.170.182.185 | ৩০ জুলাই ২০২২ ২২:২১510584
  • কিশোরবাবু , আপনার লেখাটি অত্যন্ত সাবলীল ভাবে ভারতীয় ইতিহাসের এক কখনো না দেখা ছবি ফুটিয়ে তুলেছে | লিখতে থাকুন | অনেক শুভেচ্ছা রইলো |
     
    ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে প্রকৃত ইতিহাস পাওয়াটাই খুব দুরহ সেখানে আপনার মতন কাজ ভীষণ দরকার এখন আমাদের |
     
    আচ্ছা একটি প্রশ্ন চীনা বৌদ্ধ পর্যটক ফা হিয়েন এর প্রকৃত নামটি কি Fāxiàn (ফা - সিয়েন )? মান্দারিন এ Fāxiàn শব্দটি আছে যার অর্থ বাংলা করলে হয় discoverer বা অনুসন্ধানকারী | আমার মনে হয় আসলে নামটি ফা - সিয়েন |  আপনি কি বলেন ?
  • Kishore Ghosal | ৩১ জুলাই ২০২২ ১৪:৪১510613
  • guruবাবু, হতেই পারে। চীনা নাম আমাদের কাছে সর্বদাই অচেনা। এ বিষয়ে আমার কোন ধারণাই নেই, আমি প্রচলিত উচ্চারণই ব্যবহার করেছি। ছোটবেলায় হুয়েন সাং পড়েছিলাম, পরে জেনেছিলাম ওটা নাকি জুয়ান জাং। বাল্যে স্কুলের দেওয়ালে দেওয়ালে মাও- সে-তুং দেখতাম, তিনি এখন হয়ে গেছেন মাও-জে-দং। 
     
    অবিশ্যি একথা শুধু চীনা-ভাষা নয়, সব বিদেশী ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই শব্দ আর তাদের উচ্চারণগুলি আমরা শিখেছিলাম ভায়া ইংরিজি। যার ফলে, চে গুয়েভারা - চে গেভারা, রেনেসাঁস - রেনেসাঁ, রেস্টুরেন্ট-রেস্তোরাঁ, গ্যেটে - গয়টে, দান্তে-দতোঁ, বন ভয়েজ - বঁ ভয়া ইত্যাদি নানান বিভ্রান্তি আমাদের মাথায় ঘুরতে থাকে। চেনা মানুষ বা বিষয় যেমন অচেনা হয়ে যায়, তেমনি নিজের অজ্ঞানতায় লজ্জা পেতে থাকি। 
  • হীরেন সিংহরায় | ৩১ জুলাই ২০২২ ১৫:২৯510615
  • কিশোর 
     
    যথার্থ বলেছেন !  আমি মাও -সে-তুং পিকিং জেনে দেশ ছেড়েছি । এখন শুনি মাও- জে -দং , বেজিং !  ফোনেটিক ভাষায় নাম চিনেছি    ইংরেজের নির্দেশে । কলোন হ্যামবারগ ফ্র্যাঙ্কফারট ব্রান্সউইক বললে  জার্মানিতে কেউ চিনবে না । রোমা নাপোলি ফিরেনজে যে প্রকৃত উচ্চারণ কে বোঝাবে ।  সামান্য কিছু ব্যতিক্রম চোখে পড়ে - ইহুদি ,  মিশর ( হিব্রু ), 
  • Sumit Roy | ৩১ জুলাই ২০২২ ১৬:২৬510621
  • @Sara Man 
     
    ভূমি, এর বৈশিষ্ট্য, এর অধিবাসী ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে জিওগ্রাফি, আর জিওগ্রাফিকাল এরিয়াকে রিপ্রেজেন্ট করার কাজ করে কার্টোফ্রাফি, মানচিত্র অঙ্কনের ব্যাপারটা কার্টোফ্রাফিতে পড়ে। প্রাচীন ভারতের জিওগ্রাফি ও কার্টোগ্রাফি সম্পর্কে যা জানা যায় তা লিখছি -

    ভারতীয় ধর্মগ্রন্থগুলোর একটি বিশাল অংশে জিওগ্রাফিকাল স্টাডিকে কাভার করে। বেদ ও পুরাণে নদী ও পর্বতমালার বিশদ বিবরণ রয়েছে। রিলিজিয়াস স্কলার ডায়ানা একের মতে, ভারতে ভূগোলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হ'ল হিন্দু পুরাণের সাথে এর আন্তঃসম্পর্ক। তিনি বলেন, "ভারতে যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, এমন একটি ল্যান্ডস্কেপ পাওয়া যাবে যেখানে পাহাড়, নদী, বন এবং গ্রামগুলি ভারতীয় সংস্কৃতির গল্প এবং দেবতাদের সাথে বিস্তৃতভাবে যুক্ত। এই বিশাল দেশের প্রতিটি জায়গায় তার গল্প রয়েছে; এবং বিপরীতভাবে, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী এবং কিংবদন্তীর প্রতিটি গল্পের নিজস্ব স্থান রয়েছে।" যাই হোক, প্রাচীন ভারতের ভূগোলবিদরা পৃথিবীর উৎপত্তি সম্পর্কে তত্ত্বগুলি উপস্থাপন করেছিলেন। তারা তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে, পৃথিবী বায়বীয় পদার্থের ঘনত্বের দ্বারা গঠিত হয়েছিল এবং পৃথিবীর ভূত্বক শক্ত পাথর (শিলা), কাদামাটি (ভূমি) এবং বালি (অশ্ম) দ্বারা গঠিত। ভূমিকম্প ব্যাখ্যা করার জন্যেও তত্ত্বের প্রবর্তন করা হয়েছিল, এবং অনুমান করা হয়েছিল যে পৃথিবী, বায়ু এবং জল একত্রিত হয়ে ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। কৌটিল্য (চাণক্য নামেও পরিচিত) এর অর্থশাস্ত্রে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সম্পর্কে ভৌগোলিক ও পরিসংখ্যানগত তথ্য রয়েছে। পুরাণের রচয়িতারা পরিচিত পৃথিবীকে সাতটি মহাদেশে বিভক্ত করেছিলেন, যেগুলোকে দ্বীপ বলা হয়। এগুলো হলো - জম্বুদ্বীপ, শাল্মলীদ্বীপ, কুশদ্বীপ, প্লক্ষদ্বীপ, শাকদ্বীপ, ক্রৌঞ্চদ্বীপ ও পুষ্করদ্বীপ। প্রতিটি দ্বীপের জলবায়ু এবং ভূগোলেরও বিশদ বিবরণ প্রদান করা হয়েছিল। বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে (৩০০ থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংকলিত) ভৌত ও মানব ভূগোলের উপর ছয়টি অধ্যায় রয়েছে। মানুষ এবং স্থানগুলির অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য, এবং বিভিন্ন ঋতু এই অধ্যায়গুলির বিষয়। বরাহমিহিরার বৃহত-সংহিতা গ্রহের গতিবিধি, বৃষ্টিপাত, মেঘ এবং জলের গঠনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দান করে। গণিতবিদ-জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট তার গ্রন্থ 'আর্যভায্য'-তে পৃথিবীর পরিধি সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট অনুমান দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট সঠিকভাবে পৃথিবীর পরিধি ২৪,৮৩৫ মাইল হিসাবে গণনা করেছিলেন, যা ২৪,৯০২ মাইলের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে মাত্র ০.২% ছোট ছিল।

    এবারে প্রাচীন ভারতের কার্টোগ্রাফি বা মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যায় যাওয়া যাক। জোসেফ ই. শোয়ার্জবার্গ (২০০৮) বেশ কয়েকটি খননকৃত জরিপযন্ত্র এবং পরিমাপের রডের উপর ভিত্তি করে প্রস্তাব করেন যে, ব্রোঞ্জ যুগের সিন্ধু সভ্যতার (আ. ২৫০০-১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) লোকেরা মানচিত্রাঙ্কনের সাথে সম্পর্কিত টেকনিকগুলো সম্পর্কে জেনে থাকতে পারে এবং বড় আকারের নির্মাণমূলক পরিকল্পনা, মহাজাগতিক অঙ্কন এবং কার্টোগ্রাফিক উপাদানের ব্যবহার সম্পর্কে ভারতীয়রা বৈদিক যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দ) থেকেই নিয়মিতভাবে পরিচিত ছিল। তিনি বলেন, "হাজার হাজার প্রস্তর যুগের ভারতীয় গুহাচিত্রের মধ্যে অসংখ্য পরিমাণে না হলেও, বেশ কয়েকটি মানচিত্রের মতো গ্রাফিতি দেখা যায়, এবং অন্তত একটি জটিল মেসোলিথিক ডায়াগ্রাম পাওয়া যায় যা মহাবিশ্ব বা কসমসের প্রতিনিধিত্ব করে বলে মনে করা হয়।" সুসান গোল (১৯৯০) প্রারম্ভিক ভারতের কার্টোগ্রাফিক ঐতিহ্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, "সিন্ধুর কাছে মোজেনজদারো এবং সৌরাষ্ট্র উপকূলের কাছে লোথালের দূরত্ব অনেক ছিল যেগুলোকে খ্রিস্টপূর্ব ২য় সহস্রাব্দে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও শহর দুটিকে নির্মাণ করা হয়েছিল একই রকম প্ল্যানের ওপর একই সাইজের পোড়ানো ইট দিয়ে, যা নির্দেশ করে, শহর নির্মাণের জন্য প্ল্যানিং ও ম্যানেজমেন্টে একিউরেসি কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। ৮ম শতাব্দীতে মহারাষ্ট্রের ইলোরার কৈলাস মন্দিরটি ১০০ ফুট পর্যন্ত পর্বতে খোদাই করা হয়েছিল। এখানে যে স্তম্ভযুক্ত হলগুলোর সাথে জটিল ভাস্কর্যগুলি দেখা যায়, সেই কাজগুলো সঠিক মানচিত্র ব্যবহারের পরও নির্মাণ করা কঠিন। তাই যদি এসব ক্ষেত্রে কোন মানচিত্র পাওয়া না গেলেও এটা ভাবা যাবে না যে ভারতীয়রা কার্টোগ্রাফিক পদ্ধতি বা মানচিত্রাঙ্কন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা রাখত না।"

    হেলেনিস্টিক যুগের আগে নেটিভ ইন্ডিয়ান কার্টোগ্রাফিক ঐতিহ্যগুলি অবিকশিত অবস্থায় ছিল বলে মনে করা হয়। ভারতে মানচিত্রের প্রাথমিক রূপগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল কিংবদন্তী চিত্রকলা; রামায়ণের মত ভারতীয় মহাকাব্যে বর্ণিত স্থানগুলির মানচিত্র। এই কাজগুলিতে কিংবদন্তী স্থানগুলির বর্ণনা ছিল এবং প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট স্থানের পৌরাণিক বাসিন্দাদের প্রকৃতিও বর্ণনা করা হয়েছিল। প্রারম্ভিক ভারতীয় মানচিত্রাঙ্কনে স্কেল সম্পর্কে ধারণা তেমন ছিলনা, মানচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলিকে অন্য অংশগুলোর তুলনায় বড় দেখানো হয়েছিল (গোল ১৯৯০)। ভারতীয় কার্টোগ্রাফিক ঐতিহ্যগুলি পোল স্টারের অবস্থান এবং ব্যবহারের উপায়ও দেখিয়েছিল। এই চার্টগুলি নেভিগেশনের উদ্দেশ্যে সাধারণ যুগের শুরুতে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। ভারতের অন্যান্য প্রাথমিক মানচিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে উদয়গিরি প্রাচীর ভাস্কর্য - যা ৪০০ খ্রিস্টাব্দে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে তৈরি করা হয়েছিল, যা গঙ্গা ও যমুনার মিলনকে প্রদর্শন করে। ৮ম শতাব্দীর কবি ও নাট্যকার ভবভূতি, উত্তররামচরিতের প্রথম অধ্যায়ে ভৌগোলিক অঞ্চলকে নির্দেশ করে এমন চিত্রকর্মের বর্ণনা দিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীতে, ২০০ টিরও বেশি মধ্যযুগীয় ভারতীয় মানচিত্রকে মানচিত্রের ইতিহাসের আলোচনায় স্টাডি করা হয়েছিল। গবেষণায় তাম্রফলকের পাঠ্য শিলালিপি নিয়েও কাজ করা হয়েছিল, যেগুলোতে ভারতের ব্রাহ্মণ পুরোহিতদেরকে তাদের পৃষ্ঠপোষকদের দ্বারা প্রদত্ত ভূমির সীমানা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। বর্ণনাগুলি ভাল ভৌগলিক জ্ঞানকে নির্দেশ করে এবং একটি ক্ষেত্রে প্রদত্ত ভূমির ৭৫ টিরও বেশি বিবরণ পাওয়া গেছে। তাং রাজবংশের চীনা রেকর্ডগুলোতে প্রতিবেশী ভারতীয় অঞ্চলের একটি মানচিত্র পাওয়া যায় যা রাজা ওয়াং হিউয়েন-ৎসেকে উপহার দিয়েছিলেন।

    তথ্যসূত্র

    জিওগ্রাফি নিয়ে -

    Anu Kapur (2002). Indian Geography: Voice of Concern. Concept Publishing Company.
    Diana L. Eck (2012). India: A Sacred Geography. Random House Digital, Inc.
    Lalita Rana (2008). Geographical thought. Concept Publishing Company.

    কার্টোগ্রাফি নিয়ে -

    Sircar, D.C.C. (1990), Studies in the Geography of Ancient and Medieval India, Motilal Banarsidass Publishers, ISBN 81-208-0690-5.
    Gole, Susan (2008). "Size as a measure of importance in Indian cartography". Imago Mundi. 42 (1): 99–105. doi:10.1080/03085699008592695. JSTOR 1151051.
    Schwartzberg, Joseph E. (2008), "Maps and Mapmaking in India", Encyclopaedia of the History of Science, Technology, and Medicine in Non-Western Cultures (2nd edition) edited by Helaine Selin, pp. 1301–1303, Springer, ISBN 978-1-4020-4559-2.
  • Sumit Roy | ৩১ জুলাই ২০২২ ১৭:১০510622
  • @guru
     
    আপনি যেটা লিখেছেন সেটা হলো ফা-শিয়েনের Hanyu Pinyin নামক স্ট্যান্ডার্ড মান্দারিন অক্ষরে নাম - Fǎxiǎn. একে কিভাবে উচ্চারণ করতে হয় তা জানতে হলে আগে হানিউ পিনিয়েন অক্ষরের IPA উচ্চারণ জানতে হবে। শুরু করা যাক -

    f - আইপিএ-তে /f/ - Voiceless labiodental fricative অর্থাৎ ইংরেজি f অক্ষরের উচ্চারণ

    ǎ - আইপিএ-তে /à/ মানে tone 3-তে উচ্চারণ করা /a/ - Open central unrounded vowel, অনেকটা বাংলা ও সংস্কৃত "আ" উচ্চারণ হলেও পার্থক্য আছে। কারণ বাংলারটা নিয়ার-ওপেন সেন্ট্রাল বা নিয়ার-লো সেন্ট্রাল যেখানে চাইনিজেরটা পুরোপুরি ওপেন সেন্ট্রাল, সংস্কৃতেরটা ওপেন ফ্রন্ট কিন্তু চাইনিজেরটা ওপেন সেন্ট্রাল, মানে জিভটা পুরোপুরি সামনে না গিয়ে মাঝামাঝি থাকবে। চাইনিজ ভাষায় স্বরবর্ণ উচ্চারণের জন্য বিভিন্ন টোন আছে, à দিয়ে বোঝানো হয় একে ৩ নং টোনে উচ্চারণ করতে হবে, এর দূরকম উচ্চারণ হয় - এক হলো. মাঝামাঝি নিম্ন টোনে, আর দুই হলো, প্রথমে গভীর টোন থাকবে, তারপর একটু উচুতে উঠবে। নিচের লিংকে গিয়ে অডিওটা শুনলে স্পষ্ট হবে -
    https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/2/22/Mandarin_Chinese-third_tone-%E6%8A%8A-pronunciation.wav

    x - আইপিএ-তে /ɕ/ - Voiceless alveolo-palatal fricative, অর্থাৎ সংস্কৃত তালব্য শ, খেয়াল রাখতে হবে সংস্কৃত তালব্য শ ও বাংলা তালব্য শ এক নয়, বাংলা তালব্য শ হলো ভয়েসলেস পোস্ট-অ্যালভিওলার ফ্রিকেটিভ কিন্তু এটা অ্যালভেলো-প্যালেটাল। মানে বাংলার শ-তে জিভ একটু সামনের দিকে থাকে, আর সংস্কৃত ও চীনা শ-তে পেছনের দিকে।

    i - আইপিএ-তে /i/ - Close front unrounded vowel - মানে ইংরেজি i, বাংলা-সংস্কৃত 'ই'

    n - আইপিএ-তে /n/ - voiced alveolar nasal - মানে ইংরেজি n, বাংলা-সংস্কৃত 'ন'

    সব মিলে বলতে পারি উচ্চারণটা হবে বাংলা 'ফা শিয়ান' এর মত, তবে এখানে আ উচ্চারণ করতে হবে মুখটা পুরোপুরি খুলে জিভ মাঝামাঝি রেখে, শ উচ্চারণ করতে হবে সংস্কৃত শ এর মত, আর টোন হবে মাঝামাঝি গভীর বা বেশি গভীর থেকে মাঝামাঝিতে উত্তোলন।
  • guru | 103.151.156.156 | ৩১ জুলাই ২০২২ ২০:১৫510625
  • @হীরেনবাবু ও @কিশোরবাবু 
     
    আপনারা ঠিক বলেছেন সত্যি আমরা ইংরেজির চোখেই চীনা নাম গুলি ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত |
     
    @সুমিতবাবু অনেক অনেক ধন্যবাদ | আচ্ছা একটা প্রশ্ন আছে মাও এর নামটি চীনা উচ্চারণে মাও সে থুঙ না মাও স তুং হবে ? বেজিং তো চীনা উচ্চারণে পেইচিং হওয়া উচিত বলে আমার মনে হয় | আপনার মতামতের অপেক্ষাতে রইলাম |ভুল বললে সংশোধন করে দেবেন |
     
    @কিশোরবাবু 
     
    আমার দুটি প্রশ্ন আছে |
     
    ১। বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম আস্তে আস্তে কিভাবে হিন্দু ধর্ম হলো সেটি আপনি খুব ভালো ভাবেই ফুটিয়ে তুলছেন | কিন্তু এই ফেনোমেনন টিকে কি হিন্দু ধর্ম বলে এই ভাবে কোনো ইউনিফর্ম জেনেরিক সংজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে ? আসলে বর্তমান পরিসরে হিন্দু ধর্ম বলতেই আমরা যেটি বুঝি সেটি কি আপনি যেটি বোঝাতে চাইছেন সেটি এক ? আমার যদি খুব ভুল না হয় দেবদত্ত পট্টনায়ক বলেছেন যে বর্তমানে প্রচলিত হিন্দুইজম শব্দটি রাজা রামমোহন রায় প্রথম ঊনবিংশ শতকে চালু করেছিলেন | তাহলে রাজা রাম মোহন রায় এর হিন্দুইজম ও আপনার হিন্দুধর্ম এই দুটি কি একই বস্তু ? একটু বিস্তারিত ভাবে বললে ভালো হতো | ভুল বললে সংশোধন করে দেবেন |
     
    ২ | ভারতীয় সভ্যতা বলতে আসলে আমরা কি এই উপমহাদেশ সভ্যতাকে একটি রাজনৈতিক সংজ্ঞা দিচ্ছিনা ? উপমহাদেশের যে বিভিন্ন যুগের ইতিহাস আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন সেগুলির বৈচিত্র্যকে কি সত্যি সত্যি শুধুমাত্র ভারতীয় সভ্যতা নামক একটি জেনেরিক টার্ম দিয়ে বোঝানো যেতে পারে ? নাকি এই বৈচিত্র্যময় সভ্যতাগুলিকে তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক সংজ্ঞাতে বোঝানো যেতে পারে ?
  • Sumit Roy | ৩১ জুলাই ২০২২ ২৩:০৬510632
  • @গুরু 
     
    1. Hanyu Pinyin - Máo Zédōng

    áo - আইপিএ-তে /ǎʊ/, যেখানে /ʊ/ - Near-close near-back rounded vowel. উল্লেখ্য, ও - Close-mid back rounded vowel, উ - Close back rounded vowel, সুতরাং চাইনিজ আও এর ও উচ্চারণের সময় ঠোঁট ও আর উ এর মাঝামাঝি খুলবে, বাকি সবই প্রায় একই কেবল জিভটা হালকা সামনে আসবে। আর এখানে আ এর টোন হবে ২য় টোন, অর্থাৎ মিড রেইজিং মানে স্বর মধ্য থেকে উপরের দিকে উঠবে।
    z - আইপিএ-তে /ts/ - Voiceless alveolar affricate - বাংলায় "ৎস" এর মত শোনায়
    é - আইপিএ-তে /ɤ/ - Close-mid back unrounded vowel. উল্লেখ্য বাংলা এ - Close-mid front unrounded vowel, বাংলা এ এর সাথে এই চাইনিজ এ এর পার্থক্য হলো এই এ উচ্চারণের সময় জিভ বাংলা ও উচ্চারণ করার মত পেছন দিকে চলে যাবে, তাতে এই এ-তে কিছুটা ও ভাব চলে আসে। এর টোন হলো ২য় টোন, মানে মিড রেইজ হবে।
    d - আইপিএ-তে /t/ - Voiceless dental and alveolar plosives - বাংলা 'ত'
    ōng - আইপিএ-তে /ʊŋ/, যেখানে /ŋ/ - Voiced velar nasal, বাংলা 'ঙ', এটি টোন নং ১, মানে হাই লেভেল টোন বা উচ্চ স্বরে উচ্চারণ করতে হবে।

    আইপিএ-তে পূর্ণ উচ্চারণ হবে - [mǎʊ tsɤ̌.tʊ́ŋ], বাংলায় উচ্চারণটা অনেকটা "মাও ৎসে তোং" শোনাবে যেখানে ও এর উচ্চারণ হবে ও এবং উ এর মাঝামাঝি, আর এ এর উচ্চারণ হবে ও এর মত জিভ পেছনে দিয়ে। এখানে উচ্চারণটা শুনতে পারেন -
    https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/f/fe/Zh-Mao_Zedong.ogg

    2. Hanyu Pinyin - Běijīng

    B - আইপিএ-তে /p/ - Voiceless bilabial plosive, বাংলা 'প'।
    e নিয়ে বলা হয়ে গেছে, টোন নং ৩, সেটা নিয়েও বলা হয়ে গেছে।
    j - আইপিএ-তে /tɕ/ - Voiceless alveolo-palatal affricate - এটা সংস্কৃত চ, তবে বাংলা চ থেকে একটু ভিন্ন, বাংলা চ /tʃ/ - Voiceless postalveolar affricate, মানে সংস্কৃত বা মান্দারিন চ এর ক্ষেত্রে জিভ একটি পেছনে যাবে।
    i - আইপিএ-তে /i/ - Close front unrounded vowel, বাংলা ই, টোন নাম্বার ১
    ng - আইপিএ-তে /ŋ/ - বলা হয়ে গেছে।

    সব মিলে উচ্চারণ হবে পেইচিং এর মত।

    একটি ব্রাহ্মণ্য নীতিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ছিল যা মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন রীতি-নীতি নির্ধারণ করে দিত, যেমন অন্নপ্রাসন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ ইত্যাদিতে বৈদিক মন্ত্রপাঠ, বৈদিক যজ্ঞ। যেসব পূজায় বৈদিক মন্ত্রপাঠ, বৈদিক যজ্ঞাদি হতো না সেগুলোকে ব্রাহ্মণ্যের বাইরের সংস্কৃতি বলা যায়, যা অনেক ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুসারীরাও পালন করত, কিন্তু তারা অবশ্যই কোন না কোন ব্রাহ্মণ্য রীতির পূজা করত। এভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা যায়, যাকে সেসময় কোন নাম দেয়া না হলেও (রাজিব খান বলেছেন নাম প্রয়োজনীয় না, এটাই সত্য মনে হয়) বর্তমানে সেই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্মকে ব্রাহ্মণ্যধর্ম, সনাতন ধর্ম, হিন্দুধর্ম প্রভৃতি নামকরণ করা যায়। ভারতীয় সভ্যতা বলা ঠিক হয়না, কারণ আর্কিওলজিতে সভ্যতার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে যার সাথে ব্যাপারটা মেলে না, আবার সংস্কৃতিও যায়না, ঐতিহ্য বলা যায় হয়তো। এর মধ্য ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য ছাড়াও বিভিন্ন রকম ঐতিহ্য পড়ে যায়, যেগুলোর আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান ছিল যেমন বৌদ্ধ, জৈন, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ছিল না, যেমন আদিম উর্বরাশক্তিভিত্তিক জাদুবিদ্যা, যার নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান না থাকায় ক্রমশ বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের সাথে মিশে যায়। 
  • Sara Man | ৩১ জুলাই ২০২২ ২৩:৪৫510636
  • সুমিত বাবু, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, মেঘদূত এমন অজস্র সাহিত‍্যে এমন একটি দৃশ‍্যকল্প ফুটে ওঠে, যাকে অধুনা আমরা বলি Land cover and land use। নৌচালনা করতে গেলেও অবশ‍্যম্ভাবী যে নাবিকদের কাছে চার্ট থাকত। আমার  বক্তব্য ছিল, যে এমন একটি চিত্র, যাকে মানচিত্র বলে চেনা যাবে, জায়গাগুলো আজকেও আইডেনটিফাই করা যাবে, তেমন নেই। অমন চিত্র কিন্তু রোমানদের আছে। কিশোর বাবুকে তাই জিজ্ঞেস করলাম, কোন খোঁজ পেয়েছেন কিনা। সারা দেশে এত শিলালিপি, কিন্তু মানচিত্র খোদাই কোথায়? এটাই অদ্ভুত। ভারতীয় মেধার সঙ্গে খাপ খায়না। আমার মনে হয়, শ্রুতি সংস্কৃতি, স্মৃতি শক্তির ওপরে অতিরিক্ত নির্ভরতা, বা নিরাপত্তা জনিত কারণ - কিছু তো থেকে থাকবে, যার জন্য রাজারা নকশা গোপন রেখেছেন, প্রকাশ করেননি। 
  • Sumit Roy | ০১ আগস্ট ২০২২ ০০:১৩510637
  • @Sara Man 

    ৭ম শতকে কামরূপরাজ ভাষ্করবর্মা যেহেতু শুয়েন ৎসাঙকে একটি মানচিত্র দিয়েছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে, তাই মানচিত্র যে তৈরি হতো তা স্বীকার করতেই হবে। তবে আমাদের হাতে কেবল পুরাণে উল্লিখিত কল্পনামিশ্রিত মানচিত্রগুলোই আসে - সেটাই দুঃখ। রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের জন্য অবশ্যই দাপ্তরিকভাবে রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি করা হতো। রাজাদের কীর্তির মত এগুলোর স্থায়িত্বের দরকার ছিলনা বলে হয়তো ইনস্ক্রিপশনগুলোর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়নি। সেসময় ভারতে কার্টোগ্রাফি কতটা উন্নত ছিল তা নিয়েও সন্দেহ থাকতে পারে, কিন্তু কার্টোগ্রাফি উন্নত না হলে ভারত যেভাবে নৌপথে বাণিজ্য করত সেটাও সম্ভব হতোনা। 
  • Kishore Ghosal | ১৫ আগস্ট ২০২২ ০০:১৬510997
  • @ গুরুবাবু, আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে একটু দেরি হল, তার কারণ আপনি বেশ কিছু নতুন ভাবনা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। 
     
    ১) আমি যতদূর জানি, ভারতবর্ষ সারা বিশ্বে অনন্য এক দেশ, যার অনেকগুলি নাম। যাকে আমরা ভারত বলি, মুসলিম দেশগুলি হিন্দুস্তান বলে এবং সায়েব-সুবোরা ইণ্ডিয়া বলে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আরবিরা আমাদের সিন্দ বা সিন্ধু নদীকে হিন্দ বলত, আর তার এপার- ওপারের লোক হিসেবে অখণ্ড ভারতবাসীর নাম দিয়েছিল হিন্দ, হিন্দোস্তান। যার থেকে আমরা নিজেদের হিন্দু বানিয়ে ফেলেছি, এবং আমাদের সামাজিক এবং ধর্মীয় প্রথাকে হিন্দু-ধর্ম বলেও কোন এক সময় মেনে নিয়েছি। আবার সায়েবরা সিন্ধুকে বলতে ইন্দাস, অতএব আরবিদের প্রভাবে তাঁরা আমাদের ইণ্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান বানিয়ে তুললেন। 
    ভারতপথিক রামমোহন রায় যেহেতু আমাদের দেশে প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংরিজিতে (শুধু ইংরিজি নয়, তিনি  সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু, তিব্বতী ভাষাতেও ভীষণ পণ্ডিত ছিলেন।) লেখালেখি শুরু করেছিলেন, অতএব হিন্দুর সঙ্গে ইজ্‌ম্‌ যোগ করে শব্দটি প্রয়োগ করেছিলেন। তাতে Hinduism শব্দটি সারা বিশ্বের কাছে সহজেই গ্রহণীয় হয়েছিল।  তবে সে সময় হিন্দুধর্ম (নাকি প্রথা বলবেন?) -এর প্রতি তাঁর তীব্র বিতৃষ্ণা ছিল, তার অজস্র কুপ্রথা এবং কুসংস্কারের জন্যে। যার জন্যেই তিনি উপনিষদ ভিত্তিক ব্রাহ্মধর্মের সূত্রপাত করেছিলেন এবং তাঁর প্রভাবেই  সতীদাহ প্রথা রদের আইন পাস হয়েছিল।  তাঁর এই কাজের জন্যে এবং উপনিষদ ভিত্তিক নতুন ধর্মের জন্যে তিনি সমাজচ্যুত হয়েছিলেন, এবং সে যুগের সমাজপিতারা তাঁকে হত্যা করারও চেষ্টা করেছিলেন বলে শোনা যায়।
     
    ২) ভারতীয় সভ্যতা বলতে আপনি কেন এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক সভ্যতার কথা বললেন, সেটা ঠিক বুঝলাম না, স্যার। আমি ব্যক্তিগত ভাবে, আমাদের ভারতীয়ত্বকে - সত্যি বলতে আমাদের হিন্দু ধর্মের থেকেও - অনেক বেশি প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করেছি। না কোন বই পড়ে নয় - কর্মসূত্রের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়।  কোঝিকোড় থেকে কুল্লু, সৌরাষ্ট্র থেকে শিলচর - সর্বত্রই হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিশ্চিয়ান মানুষদের মধ্যে আশ্চর্য এক সাংস্কৃতিক যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছি। সেটিকে কোন ধর্ম দিয়েই ব্যাখ্যা করতে পারিনি - সেই সংস্কৃতি একান্তই ভারতীয়। অখণ্ড এই সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে  বিচ্ছিন্ন করা হয় ধর্ম দিয়ে, ভাষা দিয়ে, রাজনৈতিক দল দিয়ে।
     
    আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আমার মনে নতুন কিছু ভাবনার উদ্রেক ঘটানোর জন্যে। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন