ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ধর্মাধর্ম - প্রথমপর্ব / ১ম ভাগ 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ৬২৭ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • প্রাককথা  

    ধর্ম ব্যপারটা ভীষণ গোলমেলে। এর মর্ম হৃদয়ে উপলব্ধি করাটা তার থেকেও ভজকট। প্রাণী জগতে একমাত্র মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণীরই ধর্ম নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই, অতএব নেই ধর্ম নিয়ে কোন আকচাআকচি। তারা একটাই ধর্ম অন্ধভাবে বিশ্বাস করে কিংবা বলা ভালো অনুসরণ করে, সেটা হল জীব ধর্ম, যাকে প্রাকৃতিক ধর্মও বলা হয়ে থাকে।
    আমাদের শাস্ত্রে এই জীব ধর্মকে খুবই হীন চোখে দেখা হয়েছে, এই ধর্ম নাকি শিশ্নোদর কেন্দ্রিক। জন্ম থেকেই প্রতিটি জীবের থাকে উদরের চিন্তা – অর্থাৎ জীবন ধারণের জন্যে খাদ্য সংগ্রহ করা। শৈশবে, কিছুদিন থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত, মায়ের তত্ত্বাবধানে থেকে নিজের খাদ্য নিজে জোটানোর সাধ্য বা দক্ষতা এসে গেলেই – সাধারণ জীব স্বাধীন জীবন যাপন করে। যৌবনে পৌঁছে তাদের দ্বিতীয় কর্তব্য সঙ্গী/সঙ্গিনী খুঁজে পরবর্তী প্রজন্মের সৃষ্টি করা। স্বাভাবিক ভাবে প্রতিটি জীবের যত দিন বা যত বছর আয়ু, তার পুরো সময়টাই প্রাকৃতিক এই নিয়মে বাঁধা। আদিম অবস্থায় মানুষও এই নিয়মের বাইরে ছিল না।
     
    কিন্তু কোন এক সময় থেকে মানুষ তার জীবনে এমন কিছু পরিবর্তন আনতে সফল হয়েছিল, যার ফলস্বরূপ তাদের নিজস্ব একটা ধর্ম গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়ল। এই পরিবর্তন কখনো এসেছে হঠাৎ করে। কখনো এসেছে অতি ধীর গতিতে, বহু সহস্র বছরের চর্চা আর গবেষণায়। অর্থাৎ মানুষ যখন থেকে তথাকথিত সভ্য হতে শুরু করল। সভ্যতার স্থূল অর্থ আমরা সবাই জানি – শহর, গাড়ি, ট্রেন, রকেট, স্যাটেলাইট, টিভি, মোবাইল। কিন্তু সভ্যতার সূক্ষ্ম অর্থ হওয়া উচিৎ, প্রকৃতির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে নিজের স্বার্থ মতো উচ্ছন্নে দেওয়া এবং নিংড়ে নেওয়া। (অবিশ্যি যাই বলি না কেন, আপনি আমি সভ্য না হলে, এ লেখা লিখতই বা কে – পড়তেনই বা কে?) অতএব সভ্য মানুষ প্রাকৃতিক ধর্ম ও জীব ধর্মকে নস্যাৎ করে, নতুন ধর্ম গড়ে তুলল। তবে আমরা যতই সভ্যতার মোড়কে নিজেদের ঢেকে ঢুকে রাখি না কেন, দীর্ঘদিন একদানা খাবার পেটে না পড়লে। অথবা সভ্যতার মোড়কে সমাজের অধিকাংশ নারী-পুরুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হলে… সভ্যতা মাটি হতে বেশি দেরি হত না। অতএব শিশ্নোদর নামক আমাদের জীবধর্মটাও রয়ে গেল, একটু আড়ালে!
     
    ধর্ম শব্দের ব্যুৎপত্তিগত দুটি অর্থ মহাভারতে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হল, ধন পূর্বক ঋ ধাতুতে মক প্রত্যয় দিলে ধর্ম হয়। এই অর্থে ধরলে ধর্ম মানে যা থেকে ধন লাভ ঘটে। এই ধন পার্থিব টাকা-পয়সা, জমি-জায়গা হতে পারে, আবার অপার্থিব আধ্যাত্মিক চৈতন্যও হতে পারে। আবার ধৃঞ্‌ ধাতুর সঙ্গে মন্‌ প্রত্যয় যুক্ত হয়েও ধর্ম শব্দ নিষ্পত্তি হয়। ধৃঞ্‌ ধাতুর অর্থ ধারণ করা, অর্থাৎ যা সকলকে ধরে রাখে। ধর্ম শব্দের অর্থ যে ভাবেই ধরা হোক না, ধর্ম হল, এমন একটা বিষয়, যা দিয়ে সামাজিক মানুষ, নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী জীবিকা অর্জন করে সমাজের অন্য সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে। সমাজে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে গেলেই ধর্ম বিষয়টা ব্যাপ্ত হয়ে ওঠে। যেমন একই মানুষকে তার পারিবারিক বা কুলধর্ম, সমাজধর্ম, বর্ণাশ্রমধর্ম, লৌকিক ধর্ম এবং রাজধর্মও পালন করতে হয়। রাজধর্মের দুটো দিক আছে, যিনি রাজা তাঁকে যেমন রাজ্য শাসন করতে অনেক নিয়ম-প্রথা মেনে চলতে হয়, তেমনি তাঁর প্রজাদেরও রাজার (সে রাজা গ্রামের জমিদার হোক বা গণতন্ত্রে নির্বাচিত শাসক দলই হোক) গড়ে দেওয়া নিয়ম-কানুন মানতে হয়, সেটাকেই প্রজাধর্ম[1] বলা যায়।
    তার মানে ধর্ম আর religion সমার্থক নয় । ধর্ম বলতেই আমরা যে বিশ্বের নানান ধর্ম, অথবা আমাদের হিন্দু ধর্মের মধ্যেও যে প্রচলিত নানান ধর্মীয় বিভাজন, সেই রকম ধর্মের কথা মহাভারত রচয়িতা বললেন না। তিনি বললেন, সমাজ গড়তে কিছু কিছু নিয়ম, বিধি-বিধান সকলকেই মানতে হয়, সেই নিয়মই হল ধর্ম – এককথায় সামাজিক বিধি। অতএব মহাভারতের সংজ্ঞা অনুযায়ী, আমরা সিদ্ধান্ত করতেই পারি - ধর্মের সূত্রপাত হয়েছিল বহু বহু বছর আগে, যখন থেকে মানুষ সমাজ গড়তে শুরু করেছে।
    এইবারেই প্রশ্ন আসবে সমাজ গড়ার শুরু কবে, কোথায়? সমাজের আগে মানুষ কীভাবে বসবাস করত? সমাজ গড়ার ধারণা কী দেশজ? অর্থাৎ ভারতীয় অনার্যদের সৃষ্টি? নাকি বহিরাগত আর্যরা এই ধারণা আমাদের দেশে আমদানি করেছিল? তারা কী আমাদের দেশের ম্লেচ্ছ, পাষণ্ড – দাস অনার্যদের সমাজ গড়তে শিখিয়ে ধন্য করে দিয়েছিল? যেভাবে ব্রিটিশরা আমাদের সুশিক্ষিত করার ব্রত নিয়েছিল? কিংবা যেভাবে আমরা আজও উদ্ধার করে চলেছি আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জন সমাজকে - তাঁদের ইচ্ছেমতো নাম দিয়ে, যেমন হরিজন, দলিত, পিছড়ে বর্গ, জনজাতি, আদিবাসি, SC, ST, OBC ইত্যাদি?
    এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সেই সব দিনে, যখন পূর্ব আফ্রিকা থেকে ছিটকে আসা হোমো স্যাপিয়েন্স নামক প্রজাতির অজস্র গোষ্ঠী, আস্তানা গেড়েছিল আমাদের এই উপমহাদেশে।
     
    মনে হবে ধান ভানতে শিবের গীত কেন?  ধর্ম – বা সমাজবিধি কবে শুরু হয়েছিল সে কথা বোঝার জন্যে আমাদের অত আগে যেতে হবে কেন?
     
    যেতে হবে তার কারণ, আমাদের দুর্ভাগ্য এক সিন্ধু সভ্যতা ছাড়া প্রাক-আর্য যুগের প্রত্ন অবশেষ আমাদের কাল পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি। লিখিত কোন বিবরণ বা নিদর্শনও পাওয়া যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে যে লিপির প্রচুর নিদর্শন আমরা পেয়েছি, তার পাঠোদ্ধার আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। অতএব আমাদের হাতে আছে প্রত্ন খননে পাওয়া কিছু হোমো স্যপিয়েন্সের কংকাল, হাড়গোড়, তাদের ব্যবহার করা কিছু পাথরের অস্ত্র বা উপকরণ সামগ্রী। কয়েকটি গুহায় পাওয়া গেছে তাদের আঁকা গুহা চিত্র, আঁকিবুঁকি। আগুন জ্বালানোর জন্য গুহার দেওয়ালের কালি, অথবা কাঠকয়লার অবশেষ।
     
    জন বিস্ফোরণের জন্য পূর্ব আফ্রিকা থেকে ছিটকে বেড়িয়ে আসা যাযাবর হোমো স্যপিয়েন্সরা, এই উপমহাদেশে এসে, প্রকৃতি ও নানান প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে নিজেদের উত্তরণ ঘটাল। কোন পরিস্থিতিতে পরিবারভিত্তিক বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলি অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে সমাজ গড় তোলার কথা চিন্তা করল? কোন এক সময়ে সেই সমাজ ব্যবস্থাই গড়ে তুলল হরপ্পা-সিন্ধু সভ্যতার মতো বিস্ময়কর ও ব্যাপ্ত নাগর সভ্যতা? তারপর কেনই বা তারা সেই সমস্ত শহর ছেড়ে গেল?  যার ফলে সুদীর্ঘ দিন এই উন্নত সভ্যতা চলে গিয়েছিল আমাদের বিস্মৃতির অন্তরালে?
    এই সঙ্গে আরও একটা কথা মনে আসে। ধর্ম মানে যদি সমাজবিধিই হয় তাহলে তাকে আমরা আজ Religion-এর সমার্থক ভাবতে শুরু করলাম, কবে এবং কেন?
     
      ইতিহাস নিয়েই যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের কাছে এ সবই মায়ের কাছে মাসির গল্প বলার মতো। তবে আমার মতো ফাঁকিবাজ, যাঁরা স্কুল জীবনে ইতিহাসে মন দিইনি - (তাছাড়াও স্কুল লেভেলে যেভাবে শুধুমাত্র রাজাদের ইতিহাস পড়ানো হয়, তাতে রাজপরিবারের বাইরের অজস্র সাধারণ মানুষের সম্পর্কে কোন ধারণাই জন্মায় না।) - আমার এই লেখাটা একটু ধৈর্য নিয়ে যদি পড়েন, আমাদের এই উপমহাদেশের জনসমাজ, সমাজ বিধি ও তার সঙ্গে ধর্মের মিশে যাওয়ার রূপটা আশা করি তুলে ধরতে পারবো।
     
    এই দীর্ঘ লেখাটির জন্যে যাঁদের অমূল্য গ্রন্থের কাছে আমি ঋণী ও কৃতজ্ঞ, তাঁদের প্রত্যেককে জানাই আমার বিনীত শ্রদ্ধা। তাঁদের সকলের নামই স্মরণ করবো নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে। ভুলভ্রান্তি যদি কিছু হয়ে থাকে সে একান্তই আমার – তার জন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

    প্রথম অধ্যায়
    (৭০,০০০ বিসিই থেকে ১২,০০০ বিসিই)

    ১.১ বিভিন্ন মানব প্রজাতির পরিচয়

     আদিম যুগ থেকে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারাকে ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানীরা কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। সেই পর্যায়গুলি নিয়ে খুব সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করলে, মানব সভ্যতার ক্রমোন্নতি এবং অনুমানভিত্তিক হলেও, তার নির্ভরযোগ্য ইতিহাস রচনার পরিপ্রেক্ষিত অনুধাবনে সুবিধে হবে।
    ঐতিহাসিকেরা ইতিহাসকে মূলতঃ দু’ভাগে ভাগ করেছেন। প্রাক্‌-ঐতিহাসিক (Prehistoric) আর ঐতিহাসিক (Historic)। যে সময় থেকে লিপির – সে যে কোন ধরনের লিপিই হোক না কেন – ব্যবহার শুরু হয়েছে সেই সময়কালকে ঐতিহাসিক সময় বলা হয়। কারণ সেই সময় থেকে লিখিত নথির – সে পুঁথি, শিলালিপি, গুহালিপি, প্রস্তরলিপি, মুদ্রা যাই হোক না কেন – ওপর নির্ভর করে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস গড়ে তোলা যায়। এর আগে যা কিছু, সবই প্রাক্‌-ঐতিহাসিক। বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত প্রযুক্তির প্রত্ন নিদর্শন থেকে যে প্রাক্‌-ইতিহাসের ধারণা তৈরি করা যায়, তাকে অনেক ইতিহাসবিদ্‌ প্রাক্‌-ঐতিহাসিক প্রযুক্তি (Prehistoric technology) বলে থাকেন।
     
    এই পর্যায়ের ইতিহাসকে পণ্ডিতেরা আরও চারটি ভাগে ভাগ করেছেন, যেমন আদিম প্রস্তর যুগ বা প্যালিওলিথিক, মধ্য প্রস্তর যুগ বা মেসোলিথিক, নব্য প্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক এবং চ্যালকোলিথিক। প্যালিওলিথিক যুগকে আবার তিনভাগে বিভক্ত করা হয়, নিম্ন, মধ্য এবং উচ্চ প্যালিওলিথিক। লিথিক শব্দটি এসেছে গ্রীক “লিথোস” শব্দ থেকে, যার মানে পাথর। গ্রীক শব্দ “প্যাল্যায়োইস” থেকে এসেছে প্যালিও, যার মানে প্রাচীন বা আদিম। গ্রীকশব্দ “মেসোস” থেকে মেসো, যার অর্থ মধ্য। গ্রীক “কালকোস” শব্দ থেকে এসেছে চ্যালকো, যার মানে তামা। আরও বিস্তারিত আলোচনার শুরুতেই বলে রাখা ভাল, এই যুগগুলিকে বাঁধা-ধরা সময়ের হিসেবে নির্দিষ্ট করা যায় না। কারণ বিশ্বের সব দেশে একই সময়ে সব মানব প্রজাতি একই সঙ্গে একই রকম প্রযুক্তিগত উন্নতি করতে পারেনি। কোথাও কোন কোন প্রজাতি দ্রুত উন্নতি করছিল, আবার কোন কোন প্রজাতি খুবই ধীর, কেউ আবার স্থবির। ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তৃত এবং বিচিত্র পরিবেশেও বিভিন্ন অঞ্চলে প্রযুক্তিগত প্রগতির হার ছিল বিভিন্ন।
    এবার পৃথিবীতে আবির্ভূত বিভিন্ন মানব প্রজাতির সঙ্গে একটু পরিচয় করে নেওয়া যাকঃ-

    নাম – হোমো স্যাপিয়েন্স।
    সম্ভাব্য আবির্ভাব কাল – আজ থেকে প্রায় দু লক্ষ বছর আগে।
    সম্ভাব্য বিলুপ্তিকাল – ভবিষ্যতে হয়তো কোন পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধে।  
    বিশেষত্ব – সীমাহীন বিশেষত্ব, তার সামান্য কিছুটা বোঝার জন্যেই এই লেখা।
    সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – সত্তর হাজার বছর আগে পূর্ব আফ্রিকা থেকে রওনা হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল মোটামুটি ষোল হাজার বছর আগে। এই প্রজাতির পায়ের ছাপ আছে চাঁদে। চাঁদে আর মঙ্গলে আছে এদের প্রযুক্তির নিদর্শন।   

    নাম – হোমো নিয়াণ্ডারথালেন্সিস (নিয়াণ্ডারথাল্‌স্‌)
    সম্ভাব্য আবির্ভাব কাল – আজ থেকে প্রায় চার লক্ষ বছর আগে।  
    সম্ভাব্য বিলুপ্তিকাল – আজ থেকে ৩০ হাজার বছর আগে।
    বিশেষত্ব – পাথরের অস্ত্র, উপকরণ, আগুনের সীমিত ব্যবহার এবং দুই পায়ে হাঁটা। গুহা এবং অস্থায়ী আবাসে আশ্রয়।
    সংক্ষিপ্ত ইতিহাস -  ইওরোপ ও পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল প্রায় ২ লক্ষ বছর আগে।

    নাম - হোমোইরেক্টাস
    সম্ভাব্য আবির্ভাব কাল – আজ থেকে প্রায় কুড়ি লক্ষ বছর আগে।
    সম্ভাব্য বিলুপ্তিকাল – আজ থেকে প্রায় বারো হাজার বছর আগে।
    বিশেষত্ব – পাথরের অস্ত্র, উপকরণ, আগুনের সীমিত ব্যবহার এবং দুই পায়ে হাঁটা।
    সংক্ষিপ্ত ইতিহাস - প্রথম মানব প্রজাতি যারা সমগ্র আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।

    নাম – হোমো হ্যাবিলিস
    সম্ভাব্য আবির্ভাব কাল – আজ থেকে প্রায় একুশ লক্ষ বছর আগে।
    সম্ভাব্য বিলুপ্তিকাল – আজ থেকে প্রায় পনের লক্ষ বছর আগে।
    বিশেষত্ব – পাথরের উপকরণ ব্যবহার।
    সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ১৯৫৫ সালে তাঞ্জানিয়ার ওল্‌ডুভাউ গিরিবর্ত্মে এই মানব প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে।  

    নাম – অস্ট্র্যালোপিথেকাস
    সম্ভাব্য আবির্ভাব কাল – আজ থেকে প্রায় বিয়াল্লিশ লক্ষ বছর আগে।
    সম্ভাব্য বিলুপ্তিকাল – আজ থেকে প্রায় ১৯ লক্ষ বছর আগে।
    বিশেষত্ব – পাথরের ব্যবহার।
    সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – পূর্ব এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই মানব প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে।  
    [প্রসঙ্গতঃ শিম্পাঞ্জি, গোরিলা, ওরাংওটাংরাও পাথরের ব্যবহার জানে। পাথরে ঠুকে শক্ত খোলের ফল (nut) ভেঙে শাঁস খায়। উই বা পিঁপড়ের ঢিবির ছিদ্রে গাছের সরু ডাল সন্তর্পণে ঢুকিয়ে লার্ভা টেনে বের করে, তার স্বাদে মুখ বদলায়। কাজেই অস্ট্র্যালোপিথেকাস এবং হোমো হ্যাবিলিস মানব প্রজাতি হিসেবে তেমন কোন কৃতিত্ব করে দেখাতে পারেনি।]
       
    আমরা অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্সরা বহুকাল ধরেই নিজেদের অন্য সমস্ত প্রাণীদের থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে পছন্দ করে এসেছি। আমরা যেন পরিবারের মায়া বিধুর এক অনাথ, ভাই-ভাতিজাহীন এবং সব থেকে বড়ো কথা পিতৃ-মাতৃহীন। ওপরের সারণি থেকে বোঝা যায়, বাস্তব তেমনটা নয়। শুনতে ভালো লাগুক কিংবা না লাগুক, আমরা হাল্লা-গোল্লা করা বিশাল এক পরিবারের সদস্য, যার নাম মহাকপি (Great ape)। বেঁচেবর্তে থাকা আমাদের আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে আছে, শিম্পাঞ্জী, গরিলা এবং ওরাংওটাং। এদের মধ্যে শিম্পাঞ্জীই আমাদের নিকটতম। মাত্র ৬০ লক্ষ বছর আগে, এক মহিলা মহাকপির দুই কন্যাসন্তান হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন সকল শিম্পাঞ্জীদের বৃদ্ধা প্রপিতামহী, আর অন্যজন আমাদের আপন বুড়োঠাম্মি! বিজ্ঞানীরা আমাদের এই প্রবৃদ্ধা-ঠাকুমা প্রজাতির নাম রেখেছেন, অস্ট্র্যালোপিথেকাস।   
    বিজ্ঞানীদের মতে, মোটামুটি পঁচিশ লক্ষ বছর আগে, পূর্ব আফ্রিকার জঙ্গলে অস্ট্র্যালোপিথেকাস (এই শব্দটির অর্থ ‘দক্ষিণের মহাকপি’) নামক কোন এক প্রজাতির মহাকপি বিবর্তিত হয়ে মানব প্রজাতির উদ্ভব। এই প্রসঙ্গে আগেই বলে রাখি, দুটি ল্যাটিন শব্দ মিলে - হোমো অর্থাৎ মানব এবং স্যাপিয়েন্স অর্থাৎ বুদ্ধিমান – হোমো স্যাপিয়েন্স নামটি আমাদের মত বুদ্ধিমান মানব প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম। এর পর থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স বলতে “মানুষ” শব্দটাই বেশি ব্যবহার করব। অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে বলব “মানব”। তার কারণ প্রচলিত প্রবাদ ‘মান আর হুঁশ নিয়েই মানুষ’। মান মানে অস্মিতা এবং হুঁশ মানে যদি হুঁশিয়ারি ধরা যায়, তাহলে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের এই দুই বিষয়ের বাড়াবাড়ির সীমা-পরিসীমা নেই।
    মোটামুটি কুড়ি লক্ষ বছর আগে মানবের প্রথম দল পূর্ব আফ্রিকার দেশ-ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া শুরু করেছিল। তারপর কয়েক লক্ষ বছরের মধ্যে তারা ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তর আফ্রিকা, ইওরোপ এবং এশিয়া মহাদেশে। ব্যাপ্ত এই ভূখণ্ডের বিচিত্র পরিবেশ এবং আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিতে মানবের বেশ কিছু প্রজাতি, নতুন মানব প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়েছিল। যেমন ইওরোপ এবং পশ্চিম-এশিয়ার মানবেরা হয়ে উঠেছিল হোমো নিয়াণ্ডারথাল - নিয়াণ্ডারথাল উপত্যকার মানব। এদের চেহারা মানুষদের তুলনায় বেশ বড়সড়ো এবং মজবুত পেশিবহুল। এশিয়ার পূর্বদিকের মানবেরা হয়ে উঠল হোমো ইরেক্টাস - খাড়া মানব। বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে এই প্রজাতির মানবের অস্তিত্ব ছিল প্রায় কুড়ি লক্ষ বছর – এই রেকর্ড অন্য কোন মানব প্রজাতির নেই। আমাদের মত বুদ্ধিমান মানুষদের পক্ষেও অত বছর টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
    এ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে এক মানব প্রজাতির নিদর্শন পাওয়া গেছে, যার নাম হোমো সোলোএন্সি, সোলো উপত্যকার মানব। ইন্দোনেশিয়ার অন্য আরেকটি দ্বীপ ফ্লোরেসে ছিল হোমো ফ্লোরেসিয়েন নামের এক বামন মানব প্রজাতি। পণ্ডিতেরা বলেন, তুষার যুগে, সমুদ্রের জলস্তর যখন খুব নিচু হয়ে গিয়েছিল, সে সময় মানবের কিছু দল সমুদ্রপারের ওই দ্বীপে বসবাস শুরু করেছিল। তুষার যুগের শেষে সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে যাওয়াতে, ওখানকার মানবরা আটকা পড়ে যায় এবং মূল ভূখণ্ডে আর ফিরতে পারেনি। ছোট্ট দ্বীপের সীমিত খাদ্য-সংস্থানে, বিবর্তিত হয়ে তারা সবাই বামন হয়ে গিয়েছিল। সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহায় আরেক প্রজাতির মানবের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের নাম, হোমো ডেনিসোভা।
    যে সময় ইওরোপ ও এশিয়াবাসী মানব জাতির বিবর্তন ঘটে চলেছে নিরন্তর, সে সময় পূর্ব আফ্রিকার মাতৃক্রোড়ও খালি ছিল না। সেখানে আরো যে কয়েকটি নতুন মানব প্রজাতির নিদর্শন পাওয়া গেছে, তাদের নাম, হোমো রুডল্‌ফেন্সি - রুডল্‌ফ্‌ হ্রদের মানব, হোমো এরগাস্টার – কাজের মানব এবং ঘটনা চক্রে, আরও এক মানব প্রজাতি - হোমো স্যাপিয়েন্স – বুদ্ধিমান মানব, মানুষ। এই প্রজাতিগুলির মধ্যে কেউ ছিল বিশাল চেহারার নিষ্ঠুর মাংসাশী, কেউ ছিল ছোটখাটো দুর্বল, নিরীহ, শাকাহারী। স্যাপিয়েন্সরা ছিল একদম আমাদের মতোই, মাঝারি গড়ন আর সর্বভুক।
    আমাদের মধ্যে এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে, পৃথিবীতে এক এক সময়ে এক এক মানব প্রজাতির আবির্ভাব হয়েছে। অনেকটা যেন বংশতালিকার সরলরৈখিক অবতরণ – যেমন এরগাস্টার থেকে ইরেক্টাস, ইরেক্টাস থেকে নিয়াণ্ডারথাল এবং নিয়াণ্ডারথাল থেকে স্যাপিয়েন্স। আধুনিক বিজ্ঞানীরা এই ধারণা স্বীকার করেন না। তাঁরা বলেন একই সঙ্গে এবং একই সময়ে তিন-চার প্রজাতির মানবের অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল এবং সেটাই স্বাভাবিক। যেমন অন্য পশু পাখিদেরও ক্ষেত্রে আজও রয়েছে। তাহলে অন্য প্রজাতির মানবেরা হারিয়ে গেল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আসবে পরবর্তী পর্বে।
    ঠিক কবে এবং কোথায় প্রাথমিক কোন মানবজাতির থেকে মানুষের উদ্ভব হয়েছিল, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরাও নিশ্চিত নন। তবে তাঁরা সময়টা অনুমান করেন মোটামুটি দেড় লক্ষ বছর আগে এবং স্থানটি হল পূর্ব আফ্রিকা। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে, পূর্ব আফ্রিকার মানুষেরা তাদের জন্মস্থান ছেড়ে বেরোতে শুরু করেছিল এবং কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই তারা আরবের উপদ্বীপ পার হয়ে ইওরোপ ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। মানুষ যখন ওই সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল, তাদের সঙ্গে প্রাচীন মানবজাতির যে বারবার সাক্ষাৎ ঘটেছিল, তার প্রচুর নিদর্শন বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পেরেছেন। সেই নিদর্শন থেকে এই প্রজাতিগুলির মধ্যে সদ্ভাবের লক্ষণ নেই বললেই চলে, যা ছিল তা হল মারাত্মক সংঘর্ষের।
    ওপরের সারণি থেকে আদিম প্রস্তরযুগ বা নিম্ন প্যালিওলিথিক যুগের সূচনা মোটামুটি একুশ লক্ষ বছর  বা তারও কিছু আগে। সেই সময়ে হোমো হ্যাবিলিস প্রজাতির মানব প্রথম পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। এই প্রজাতির মানব আফ্রিকা মহাদেশের বাইরে কোনদিন পা রাখেনি, অতএব তাদের কোন প্রভাব, ভারতীয় উপমহাদেশে নেই।
     
    হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির মানব পূর্ব আফ্রিকা ছেড়ে এশিয়ার প্রায় সর্বত্র এবং এই ভারতীয় উপমহাদেশেরও চারদিকেই ছড়িয়ে পড়েছিল। অতএব তাদের হাত ধরেই আমাদের দেশে প্রযুক্তির সূত্রপাত। কিন্তু তারা এই উপমহাদেশে বেশ কয়েক লক্ষ বছর বসবাস করলেও, তাদের অস্তিত্ব মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছিল টোবা মহাউদ্গীরণে।
     
    আজ থেকে মোটামুটি তিয়াত্তর হাজার বছর আগে উত্তর সুমাত্রায় টোবা আগ্নেগিরির ভয়ংকর উদ্গীরণ হয়েছিল এবং আকাশে ২৫০০ থেকে ৩০০০ ঘন কিলোমিটার[2] আগ্নেয়-ভস্ম ছিটকেছিল সেই অগ্ন্যুৎপাতে। আগ্নেয়গিরির এই ছাইয়ের নমুনা পাওয়া গেছে প্রায় সমগ্র ভারতীয় উপদ্বীপে, বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং আরব সাগরেও।  ভয়ংকর আগ্নেয় ভস্মে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল এই উপমহাদেশের আকাশ। এবং বাতাসে ভেসে থাকা গন্ধক-কণায় সূর্য রশ্মি প্রতিফলিত হয়ে, এই অঞ্চলে এনে দিয়েছিল টানা ছয় বছরের প্রবল শৈত্য। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলেন, ওই সময় স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা হঠাৎ ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস নেমে গিয়েছিল। এর আগেই বলেছি, শেষ তুষার যুগ শুরু হয়েছিল প্রায় পঁচাত্তর হাজার বছর আগে, তার সঙ্গে এই হঠাৎ শৈত্য, পরিবেশে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। তার ওপর আকাশে ভেসে থাকা এই আগ্নেয় ভস্ম যখন মাটিতে নেমে এল, মাটিতে গন্ধকের মাত্রা বেড়ে গেল মারাত্মক পরিমাণে। যার ফলে উদ্ভিদ এবং গাছপালায় তার প্রভাব পড়েছিল সাংঘাতিক। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সে সময়ে মধ্য এবং উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার অরণ্য প্রায় তৃণশূণ্য হয়ে পড়েছিল, যার ফলে মারা পড়েছিল অজস্র পশু ও প্রাণী। তাদের মধ্যে হয়তো ইরেক্টাসও অন্যতম ছিল। যদিচ অনেক বিশেষজ্ঞ এই তত্ত্বকে প্রায় গুরুত্বই দেন না।
     
    তাঁরা বলেন, উত্তরপ্রদেশে শোন উপত্যকার ঢাবা অঞ্চলে এবং দক্ষিণ ভারতের জ্বালাপুরমে মাটির নিচে টোবার আগ্নেয়-ভস্মের পুরু স্তর পাওয়া গেছে ঠিকই, তবে তার ঠিক নিচে এবং ওপরের স্তরে পাওয়া গেছে একই ধরনের পাথরের অস্ত্রের জীবাশ্ম। তার থেকে তাঁরা অনুমান করছেন, ওই অঞ্চলের মানবগোষ্ঠী ওই  বিপর্যয়কে ভালোভাবেই সামলে নিয়েছিল এবং তাদের জীবনধারণে তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। এমন তো হতে পারে আগ্নেয়-ভস্মের নিচেয় চাপা পড়া পাথরের অস্ত্রগুলি ছিল ইরেক্টাস মানব গোষ্ঠীর এবং ওপরেরগুলি ছিল মানুষের, যারা এই বিপর্যয়ের কয়েক হাজার বছর পরেই ওই সব অঞ্চলে ঢুকতে শুরু করেছিল।
     
    সে যাই হোক ওই সময়ে তারা যদি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না হয়েও থাকে, ওই মহা দুর্যোগের কয়েক হাজার বছর পরেই যখন হোমো স্যাপিয়েন্সরা এই উপমহাদেশে ঢুকতে শুরু করল, তাদের স্রোতের সামনেও ইরেক্টাস  প্রজাতির মানব আরও দীর্ঘদিন তাদের দুর্বল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। বিজ্ঞানীদের মতে আজ থেকে প্রায় বারো হাজার বছর আগে ইরেক্টাস প্রজাতির মানব পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছিল। অতএব আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে ইরেক্টাস প্রজাতির মানবদের পাশাপাশি ছিল।
     
    এই উপমহাদেশে হোমো ইরেক্টাস মানবের প্রভাব তেমন আর কিছুই নেই এবং মানব সভ্যতার ইতিহাস বলতে হোমো স্যাপিয়েন্সদের ইতিহাস ছাড়া অন্য কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না।  তবে এখানে আরও একটা বিষয় উল্লেখ করা উচিৎ যে, এই উপমহাদেশে প্রায় আট লক্ষ বছর আগেকার প্রস্তর সামগ্রীর জীবাশ্ম পাওয়া গেলেও, ইরেক্টাস প্রজাতির মানব কঙ্কালের নির্ভর যোগ্য জীবাশ্ম তেমনভাবে পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা খুঁজে চলেছেন, পাওয়া গেলে মানব সভ্যতার ইতিহাস একটু বদলে যেতে পারে।

    ১.২  প্রযুক্তির সূচনা – আগুনের নিয়ন্ত্রণ

    উপরের সারণিতে আমরা দেখতে পাই, হোমো ইরেক্টাস মানবেরা বিবর্তনের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিল – দুই পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়ানো। বিজ্ঞানীরা এই কারণেই এই প্রজাতির মানবদের নাম দিয়েছেন ইরেক্টাস। এর ফলে তাদের দুটি হাত নানান ধরনের কাজ করার জন্যে মুক্ত হয়ে গেল। তাছাড়া তাদের মাথা, চোখ এবং কান আগের তুলনায় জমি থেকে অনেকটা উঁচুতে উঠে যাওয়ায়, দেখা শোনার সুবিধে হয়ে গেল বিস্তর। অনেকটা দূর থেকে বিপদ -আপদ টের পাওয়া এবং খাদ্য এবং শিকারের সন্ধান করারও বেশ কিছুটা সহজ হয়ে গেল। তবে এসবই হল প্রাকৃতিক বিবর্তনের প্রগতি, এতে আর তাদের কৃতিত্ব কোথায়?
     
    এই মানবদের বড়ো কৃতিত্ব হল আগুনের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার। আদিম মানুষেরা কিন্তু আগুন আবিষ্কার করেনি। ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত কিংবা ভূমিকম্পের মতো তারা প্রকৃতিতে আগুন জ্বলতে দেখেছে বারবার। অবাক আতঙ্কে তারা যেমন লক্ষ্য করেছে তাণ্ডব ঝড়ে ভেঙে পড়া বিশাল বিশাল গাছ। প্রবল বর্ষণে ভেসে যেতে দেখেছে, বড়ো বড়ো শিলাখণ্ড। বজ্রপাতের তীব্র ঝলকে ঝলসে কঙ্কাল হয়ে যেতে দেখেছে আকাশছোঁয়া সজীব গাছের সবুজ পাতা-ডালপালা। ভূমিকম্পের প্রবল মাথা নাড়াতে ধূলিসাৎ হয়েছে কতো পাহাড়, কতো নদী পাল্টে ফেলেছে তার গতিপথ। তেমনি অরণ্যে দেখেছে, উজ্জ্বল কমলা রঙের শিখায় আগুন জ্বলতে। দাবানলের সে আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে অজস্র গাছপালা, লতাপাতা, ঝোপঝাড়।
     
    তারা দেখেছে আগুনের নিদারুণ আতঙ্কে পশুর দল দৌড়ে পালায়। হিংস্র বাঘের সঙ্গেই দৌড়ে পালায় নিরীহ হরিণের দল, শেয়ালের দলের পাশে পাশে দৌড়ে চলে খরগোশের দল। সব পশুই কী আর পালাতে পারে? আগুনের গ্রাসে দগ্ধ হয়ে মরে বহু পশু। তারা আগুনের মধ্যে দগ্ধ হতে থাকা পশুদের মরণ চিৎকার শুনেছে বিস্তর। তারা দূর থেকে লক্ষ্য করেছে জঙ্গলের মাথা ছাড়িয়ে উঠতে থাকা ঘন মেঘের মতো ধোঁয়ার স্তূপ। অনুভব করেছে সেই আগুনের তীব্র উত্তাপ আর হল্কা। দেখেছে আগুনের রক্তিম আভায় কী রকম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রাতের ঘন কালো আকাশ। তারা চিনেছে গাছপালা, জীবজন্তু পোড়ার তীব্র গন্ধ। এক কথায় তাদের অরণ্য-জীবনের অভিজ্ঞতায় তারা আগুনকে চিনেছে ভয়ংকর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে।
     
    অন্যান্য পশুদের তুলনায় এই মানব প্রজাতিগুলির বিশেষত্ব হল, তারা অরণ্যে আগুন বা দাবানল দেখে অন্যান্য পশুদের মতো বারবার আতঙ্কিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় কয়েকটি জিনিষ বুঝতেও পেরেছিল, এখানেই যাবতীয় পশুদের তুলনায় মানব প্রজাতি অনন্য, যেমন,
    ১. আগুনের আলোতে অন্ধকার দূর করা যায়।
    ২. আগুনকে ছোট-বড়ো সব পশুই ভয় পায়, সে হিংস্র বাঘ, সিংহ হোক কিংবা বিশাল চেহারার ম্যামথ, হাতি, গণ্ডারই হোক।
    ৩. আগুনের উত্তাপ শীতের কনকনে বাতাসকেও উষ্ণ আরামপ্রদ করে তুলতে পারে।      
     
    ভয়ংকর এই আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করে, নানান নিত্য কাজে মানব প্রজাতি আগুনকে কী ভাবে ব্যবহার করতে শিখেছিল সে কথাই এখন বলব। তার আগে সেই আদিম কালের আরণ্যক সমাজে জঙ্গলের সাঙ্ঘাতিক সব পশুদের মধ্যে মানবের গুরুত্ব কতখানি ছিল, সেটার সামান্য আভাস নেওয়া যাক।   

    ১.২.১ আদিম অরণ্যে অসহায় আমরা
    ধরা যাক কোনভাবে আমরা একটা টাইম-মেশিন[i] পেয়ে গেছি, এবং সেটা ব্যবহার করে পৌঁছে গিয়েছি প্রায় পনের-ষোলো লক্ষ বছর আগেকার এশিয়া, ইউরোপ বা আফ্রিকা মহাদেশের কোন এক অরণ্যে। সেখানে আমরা একদল হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির সন্ধান পেয়েছি। আগেই বলেছি তারা দুই পায়ে খাড়া হয়ে হাঁটাচলা করতে শুরু করেছিল। তার ফলে তাদের মুক্ত দুই হাত তারা অন্য নানান কাজে ব্যবহার করতে শিখছিল। তাছাড়া মাথা তুলে সটান দাঁড়াবার জন্যে, আগের থেকে অনেক দূরের দৃশ্য দেখে তারা বিপদ আপদের আঁচ করতে পারছিল অথবা খাদ্যের সন্ধান করতেও সুবিধে হচ্ছিল।
     
    তাই বলে এমন ধারণা করা যায় না যে ইরেক্টাস মানবরা খুব ভালো শিকার-টিকার করতে পারত। বরং বনে জঙ্গলে তারা রীতিমতো ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাত। সত্যি বলতে সেই আদিম জঙ্গলে তারা তুচ্ছ এক প্রাণী হিসেবেই গণ্য হত। তাদের না ছিল বাঘ-সিংহের মতো ধারালো নখ-দাঁত এবং ক্ষিপ্র শক্তি। জঙ্গলের মধ্যে দ্রুত ছুটে চলা নীলগাই, হরিণ, বুনো শুয়োর, বাইসন, বুনো মোষদের তাড়া করে ঘায়েল করার মতো দক্ষতাও তাদের তখনো তৈরি হয়নি। হাতি, গণ্ডারের কথা তো ছেড়েই দিলাম। চেহারার দিক থেকে তারা আমাদের থেকে অনেকটাই বড়সড়ো এবং দারুণ শক্তিধর হত। আমাদের মতো দু দশটা জোয়ান ছোকরাকে হয়ত অক্লেশে কাবু করে ফেলতে পারত। কিন্তু সেই শক্তি আর দক্ষতা দিয়ে অরণ্যে টিকে থাকা ভয়ংকর এক চ্যালেঞ্জ ছিল নিঃসন্দেহে। এমনকি ছোটখাটো চেহারার বাঁদর কিংবা হনুমানের দল যেভাবে গাছের ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে গাছের পাকা পাকা ফলগুলি নিমেষে নিঃশেষ করে ফেলতে পারত, ইরেক্টাসদের সাধ্য কী, তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা?
     
    অতএব অন্য পশু বা প্রাণী যা কোনদিন করেনি, সেই পথেই ইরেক্টাসদের হাঁটতে হল। দুই হাতে তারা তুলে নিল অস্ত্র – যেমন শক্ত পোক্ত গাছের ডাল, বাঁশের লাঠি, মরা পশুর লম্বা হাড় এবং পাথরের টুকরো, নুড়ি এই সব। দল বেঁধে খাদ্যের সন্ধানে যাওয়ার সময় এগুলোই তারা ব্যবহার করত। এই অস্ত্র-শস্ত্র সম্ভারে আর যাই হোক খরগোশ, হরিণছানা, বড়ো ইঁদুরের মতো প্রাণী কিংবা ময়ুরের মতো পাখি, জলাশয়ের মাছ ছাড়া আর কীই বা শিকার করা সম্ভব। কাজেই তাদের প্রধান খাদ্য ছিল মাটি থেকে খুঁড়ে বের করা নানান কন্দ, ফলমূল, কিছু কিছু বুনো শস্য, যেদিন যেমন জোটে। এই পর্যায়ে মানব প্রজাতির কপাল ভালো থাকলে মাঝে মাঝেই জুটত পশু হাড়ের ভেতরকার সুস্বাদু মজ্জা। কী ভাবে? বলছি।
     
    ধরা যাক বাঘ বা সিংহ বেশ প্রমাণ সাইজের একটা বাইসন শিকার করেছে। তারা নিজেদের উপার্জিত শিকারের মাংস যখন পেট ভরে খেতে থাকত, কিছুটা দূরে অপেক্ষা করত দুর্বলতর শ্বাপদের দল। যখনই বাঘ বা সিংহের শরীরে ক্ষুধাতৃপ্তি এবং ক্লান্তির লক্ষণ দেখা যেত, গোল হয়ে এগিয়ে আসত হায়না, শেয়াল, অথবা বুনো কুকুরের দল। বাঘ বা সিংহ তখন আর ওদের সঙ্গে লড়াইয়ের মেজাজে থাকত না, তারা তাদের শিকার ছেড়ে দূরে নিরিবিলি আশ্রয়ে গিয়ে তৃপ্তির ঘুম লাগাতে। এরপর হায়না এবং শেয়ালের দলেরা মৃত পশুর অবশিষ্ট মাংস খেয়ে যখন মোটামুটি তৃপ্ত, তখন গাছের মগডাল থেকে নেমে আসত শকুনের ঝাঁক। তাদের ডানার ঝাপটা, চঞ্চু আর নখের ভয়ে শেয়ালেরাও ঝামেলা না বাড়িয়ে কেটে পড়ত অকুস্থল থেকে। শকুনেরা লেগে পড়ত মৃত পশুর কংকালে লেগে থাকা অবশেষ মাংসে পেট ভরাতে।
     
    এতক্ষণ যাদের উপস্থিতি একবারের জন্যেও টের পাওয়া যায়নি, কিন্তু যারা নিরাপদ দূরত্বে ঝোপঝাড়ের আড়ালে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল, তারা এবার উঠে দাঁড়াল। এরাই আমাদের ইরেক্টাস মানব প্রজাতির একটি দল। চারদিকে সতর্ক চোখ রেখে, অতি সন্তর্পণে হাতের লাঠি বাগিয়ে তারা এগোতে লাগল শকুনের ঝাঁকের আড়ালে থাকা পশুর কংকালটার দিকে। কাছাকাছি এসে লাঠির আঘাতে আর পাথরের টুকরো ছুঁড়ে তারা শকুনের দলকে উড়িয়ে যখন কংকালের কাছে বসল, দেখা গেল হাড় ছাড়া সেই মৃত পশুর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তখন মাঝারি সাইজের পাথর দিয়ে ঠুকে ঠুকে তারা পশুর মোটা হাড়, খুলি, শিরদাঁড়া ফাটিয়ে বের করে খেতে লাগল মজ্জা, ঘিলু আর সুষুম্না। অন্য পশুদের শক্ত দাঁত আর চোয়াল যা ভাঙতে পারেনি, তাদের তুলনায় অনেকটাই দুর্বল ইরেক্টাস মানব যৎসামান্য কিছু পাথরের উপকরণ ব্যবহার করে, এভাবেই সংগ্রহ করে ফেলত, তাদের বেঁচে থাকার উপযোগী সুস্বাদু প্রাণীজ প্রোটিনের ছিটেফোঁটা!
    সেসময় আরণ্যক সমাজে মানব প্রজাতির অস্তিত্ব এরকমই তাৎপর্যহীন ছিল। তখন কে আর জানত কয়েক লক্ষ বছর পর, সভ্য, সংবেদনশীল এবং বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সরাই আজকের আরণ্যকদের আয়ু নির্দিষ্ট করে দেবে? কয়েক হাজার প্রাণী প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটিয়ে, হোমো সাপিয়েন্সদের করুণার অভয়ারণ্যে সংরক্ষিত হবে বেশ কিছু বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী – যাদের মধ্যে থাকবে একদা অরণ্যে দাপটে বিরাজ করা বাঘ, সিংহ এবং অসাধারণ শক্তিধর প্রাণী হাতি ও গণ্ডার!

    ১..২ বিজ্ঞানের স্ফুলিঙ্গ
    তবে অবরে সবরে ইরেক্টাসদের কপাল অবিশ্যি খুলেও যেত। যেমন হয়েছিল সেদিন। সকাল সকাল অরণ্যে খাদ্য সন্ধানে[ii] গিয়ে হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল দলছুট একলা এক বুনো শুয়োর[iii]। ঝোপঝাড়ের আড়ালে বড়ো এক পাথরে পিঠ দিয়ে সেটা শুয়ে আছে। পশুটার লক্ষণ দেখে দলের বয়স্ক এবং অভিজ্ঞরা বুঝে গেল এর আয়ু বেশিক্ষণ নেই। পশুটার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, হয়তো তার নিজেরই দলের যুবক বরাহের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াইতে মারাত্মক জখম হয়েছে। সে এখন অত্যন্ত দুর্বল - মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ভাগ্য ভাল এখনও কোন হায়না বা শৃগাল এর সন্ধান পায়নি, রক্তের গন্ধে তারা যে কোন মূহুর্তে চলে আসতে পারে, আর তাহলেই এমন সুযোগ ফেলে পালাতে হবে ইরেক্টাসদের।
    ইরেক্টাসদের দল একহাতে লাঠি বা বাঁশ নিয়ে চটপট ঘিরে ধরল শুয়োরটাকে। অন্য হাতে মাটিতে পড়ে থাকা পাথরের টুকরো তুলে দাঁড়িয়ে রইল। সকলেই উত্তেজনায় টানটান, অপেক্ষা করতে লাগল সর্দারের সংকেতের। এবং সংকেত আসতেই সকলে একসঙ্গে ছুঁড়তে শুরু করল পাথরের টুকরো। চার-পাঁচজন সতর্ক ভঙ্গিতে আরও এগিয়ে গেল পশুটার দিকে, তারপর পশুটার পিঠে মাথায় লাঠির বাড়ি লাগাতে শুরু করল দমাদ্দম। দুর্বল পশুটা এবার ভয় পেল, তার ঘোলাটে চোখে এখন যুগপৎ রাগ এবং ভয়। কোনরকমে সে উঠে দাঁড়াল, তারপর পাথরের টুকরোর আঘাতে অতিষ্ঠ হয়ে দৌড় লাগাল ইরেক্টাসদের ব্যূহ ভেদ করে। প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও ইরেক্টাসের দল তাড়া করে গেল দুর্বল শুয়োরটার পিছনে, পিছনে রয়ে গেল মাত্র দুজন।
    শুয়োরটা পালানোর সময় তার দাঁতের আঘাতে জখম করে দিয়েছে একজন ইরেক্টাসকে, সে মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগল, তার উরুর ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে দরদর করে। তার এই অবস্থা দেখে তরুণ এক ইরেক্টাস, ওখানেই রয়ে গেল। আশেপাশের ঝোপঝাড় থেকে লতাপাতা, এনে চটপট প্রলেপ বানিয়ে ঢেকে দিল আহতের ক্ষত। রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হতে আহত মানবটি আচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়েই রইল ঘাসে। তরুণ বসে রইল আহতের পাশে, সে এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত। তার দলের লোকেরা শুয়োরটাকে মেরে নিশ্চয়ই তাড়তাড়ি ফিরবে, ততক্ষণ আহত লোকটিকে নিয়ে তাকে ওখানেই অপেক্ষা করতে হবে।
    হঠাৎই তার নাকে এসে লাগল শুকনো পাতা-ডালাপালা পোড়ার গন্ধ। এ গন্ধ সে চেনে, অরণ্যে আগুন লাগলে দূর থেকে এই গন্ধেই তারা টের পায়। আতঙ্কে সে উঠে দাঁড়াল, কোনদিকে কোথায় আগুন লেগেছে? তার দল কে জানে অরণ্যের কতদূরে ঢুকে পড়েছে, সে এখন কী করবে? আহত লোকটিকে নিয়ে সে কোন দিকে যাবে? অসহায় ভয়ে চারপাশে খুঁজতে খুঁজতে, সে দেখতে পেল, বুনো শুয়োরটা যে বড়ো পাথরে পিঠ দিয়ে শুয়েছিল, তার সামনের ঝোপঝাড়গুলিতে আগুন ধরেছে, বড়সড়ো নয়, ধিকিধিকি জ্বলছে, তারই হাল্কা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে।
    তার মনে হল, এই আগুন বাড়তে বাড়তে তাদের হয়তো গ্রাস করবে। প্রচণ্ড আতঙ্কে সে চিৎকার করে উঠল, তারপর উন্মাদের মতো, পাথর ছুঁড়তে লাগল জ্বলতে থাকা ঝোপগুলোর দিকে। রাগে চিৎকার করতে করতে বেশ অনেকক্ষণ পাথর ছোঁড়ার পর, সে হঠাৎই লক্ষ্য করল আগুন আর জ্বলছে না, ধোঁয়াও বন্ধ হয়েছে। ভারি অবাক হল, আগুন কী নিভে গেল? আগুন কী নেভানো যায়? ঠিক বিশ্বাস হল না যেন। সন্তর্পণে ঝোপের কাছে এগিয়ে গিয়ে সে দেখল, তার ছোঁড়া পাথরের স্তূপের মধ্যে আগুন সত্যিই নিভে গেছে।
    একটু নিশ্চিন্ত হয়ে সে নিচু হয়ে কয়েকটা পাথরের টুকরো হাতে নিয়ে চিন্তা করতে লাগল, জখম পশুটা যখন এই বড় পাথরটার নিচে শুয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই আগুন ছিল না। যদি থাকত, শুয়োরটা নিশ্চয়ই এখানে নিরাপদ আশ্রয় ভাবত না। তাহলে তারপরে আগুন কী করে জ্বলল? ভাবতে ভাবতে দু হাতের দুটো পাথরে একটু ঘষাঘষি করতেই সে ভয়ে আঁতকে উঠে ফেলে দিল পাথর দুটো। কী ভয়ংকর, এই পাথরগুলোতেই যে আগুন রয়েছে!  অদ্ভূত দুই পাথরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল তরুণ ইরেক্টাস। তারপর নিচু হয়ে বসে সেই পাথরদুটো আবার তুলে নিল হাতে। তারা নদীর ধারে যে নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে, এই পাথরগুলো তেমন নয়। পাথরের গা অনেকটাই মসৃণ, রংটাও বেশ কিছুটা আলাদা। খুব সন্তর্পণে পাথরদুটো আবার ঘষতেই ফস করে আবার স্ফুলিঙ্গ দেখতে পেল। এবার অতটা ভয় লাগল না, বার বার ঘষতে ঘষতে বেশ বড়ো বড়ো ফুলকির ছিটে বেরোতে লাগল পাথর থেকে। মাটি থেকে তুলে এই পাথরগুলোই যখন তারা পশুটার দিকে ছুঁড়ছিল, কিছু কিছু পাথর কি অন্য পাথরে লেগে ফুলকি ছিটকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে শুকনো ঘাস পাতায়?
     
    হঠাৎ কিছু মনে হতে তরুণ ইরেক্টাস মাটিতে বেশ কিছু শুকনো ঘাস-কুটোকাটা-পাতা যোগাড় করে একটা স্তূপ বানাল। তারপর পাথর দুটো ঘষে শুকনো পাতার খুব কাছাকাছি ফুলকি সৃষ্টি করতে লাগল। এই ফুলকি থেকে কী শুকনো পাতা-কাঠ-কুটোয় আগুন ধরানো সম্ভব? সেটাই সে আবিষ্কার করতে চাইছিল। অনেকক্ষণ ধরে ঘষে ঘষে যখন সে অধৈর্য হয়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল, আগুন এভাবে জ্বলে না, জ্বলতে পারে না। “ধুস এই পণ্ডশ্রম করে আর লাভ নেই” এমনই বিরক্তিতে পাথর দুটো শেষবারের মতো জোরে ঘষতেই তার জোরালো ফুলকিতে শুকনো পাতায় আগুন ধরে গেল। ভয় পেয়ে সে প্রায় উলটে পড়ে যাচ্ছিল আর কি, কিন্তু একটু লক্ষ্য করে দেখল ভয় পাওয়ার মতো তেমন কিছু ঘটেনি। জ্বলতে থাকা শুকনো পাতার ওপর কিছু কাঠকুটো শুকনো ঘাস ধরতে সেগুলোতেও আগুন ধরে গেল। তার মানে সে ছোট্ট একটা আগুন তৈরি করতে পেরেছে, আগুনটা কিছুক্ষণ জ্বলতে দিয়ে, সে এবার পাথর দিয়ে কিছুটা মাটি চাপা দিয়ে দিতে সে আগুন নিভেও গেল সহজেই।
    সেই তরুণ ইরেক্টাস বেশ মজা পেল। এতদিন সে বড়োদের মুখে শুনেছে, দু একবার নিজের চোখেও দূর থেকে দেখেছে অরণ্যের মধ্যে আগুনের তাণ্ডবলীলা। সেই আগুনই খুব ছোট্ট হয়ে, তার হাতে কী বশ মানল? সে পিছন ফিরে দেখল তার আহত সঙ্গী এখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে ঘাসের ওপর শুয়ে। সে ঘাসের ওপর বসে বারবার দুই পাথর ঘষে রপ্ত করতে লাগল আগুন জ্বালানো আর নেভানোর খেলা।
     
    শেষ দুপুরে তার দলের মানবেরা যখন প্রবল হইচই করতে করতে বড়ো আর মোটা গাছের ডালের সঙ্গে লতার দড়ি দিয়ে বাঁধা বিশাল শুয়োরটাকে বয়ে আনল, ততক্ষণে সে দক্ষ হয়ে উঠেছে আগুন জ্বালানো ও নেভানোর প্রক্রিয়ায়। আর দেরি না করে বড়ো পাতায় মুড়িয়ে লতার বাঁধনে বেঁধে সে বেশ কিছু পাথর কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। তারপর দু তিনজন মিলে আহত সঙ্গীকে নিয়ে তারা সব্বাই রওনা হল তাদের রাতের আশ্রয়ের দিকে। আজ তাদের বড়ো আনন্দের দিন। মহাভোজের আনন্দে তাদের আর যেন তর সইছিল না, তারা প্রচণ্ড উৎসাহে চিৎকার করতে করতে দৌড়তে লাগল। এই চিৎকার শুধু আনন্দের নয়, প্রবল এই চিৎকারে দূরে থাকবে পিছু নেওয়া শ্বাপদের দলও!
    শিকার করা পশুকে নিয়ে বাসায় যখন তারা ফিরল, তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছিল। গহন অরণ্যের কোনে কোনে জমে উঠছিল রহস্যময় রাতের আঁধার। বয়স্ক পুরুষ ও মহিলারা যারা বাসাতেই থাকেন শিশু এবং বাচ্চাদের সামলাতে, তাঁরাও আজ আনন্দিত। এতবড়ো জন্তু শিকার হয়েছে, গোটা দলকে অন্ততঃ দু-তিনদিন খাদ্যের চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু তাঁরা উদ্বিগ্ন, এখনই অন্ধকার নেমে আসবে, তখন রক্ত মাংসের গন্ধে চলে আসবে হিংস্র শ্বাপদের দল। তাঁরা সকলকে তাড়া দিলেন “তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, ছালটাল ছাড়িয়ে বাচ্চাদের আগে খাইয়ে ওদের ঘুম পাড়াতে হবে, তারপর বড়োরা খাবে... আজ রাত জাগতে হবে সবাইকে, পাহারা দিতে হবে...তাড়াতাড়ি...”।
     
    সেই তরুণ ছেলেটি, তার নাম দেওয়া যাক অগ্নি, হাসল, মাকে বলল, “অত চিন্তা করো না, মা। আমি ব্যবস্থা করছি। কোন বজ্জাত জন্তুর ক্ষমতা হবে না এদিকে আসার”। “তুই আবার কী করবি”, ছেলের ছেলেমানুষি কথায় মা বিরক্তই হলেন। কিন্তু সকলেই যখন মৃত পশুকে সাফ করে খাবার উপযুক্ত করে তুলতে ব্যস্ত তখন বাসার চারদিকে জ্বলে উঠল বেশ কয়েকটি অগ্নিকুণ্ড। সেই আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। প্রথমে সকলে বেশ ভয় পেলেও একটু পরে সকলেই ভরসা পেল অগ্নির কথায় এবং কৃতিত্বে। সেদিনের গভীর রাত পর্যন্ত মহাভোজটা জমে উঠল আনন্দ-উত্তেজনায়।
     
    কিছুটা দূর থেকে বন্য পশুদের চাপা গর্জন শোনা যাচ্ছিল, ওরাও আজ আশ্চর্য ও ভীত। দুপেয়ে এই মানবগুলো আগুন জ্বালিয়ে ফেলল কেমন করে? ওদের ডাক শুনতে শুনতে অগ্নির মা, ছেলের মাথার চুলগুলি এলোমেলো করে দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “জানোয়ারগুলোকে আজ খুব জব্দ করেছিস, অগ্নি। এমন রোজ পারবি তো?” অগ্নি শুয়োরের এক টুকরো মাংস চিবোতে চিবোতে বলল, “পারবো মা”।
     
    এভাবেই মানব জীবনে কিছুটা স্বস্তি আর নিরাপত্তা এনে দিয়েছিল আগুনের ব্যবহার। কিন্তু এই যুগান্তকারী ঘটনার কোন ইতিহাস নেই।
          

    [1]এই শব্দটি বাস্তবে আছে কিনা জানি না, তবে আগেকার রাজা বা আধুনিক রাষ্ট্রের প্রজাদের অর্থাৎ আমাদের, বেশ কিছু নিয়ম বা বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয় অথবা মেনে চলা উচিৎ, সেগুলিকেই আমি “প্রজাধর্ম” বলতে চেয়েছি।  

    [2] ১মি চওড়া ১মি লম্বা এবং ১মি গভীর একটি বক্সের ঘনফল হল ১ঘন মিটার। এক্ষেত্রে ৩০০০ ঘন কিমি মানে ৪৪৭২ কিমি দীর্ঘ এবং ৪৪৭২ কিমি চওড়া জায়গাকে ১৫০ মিমি (ছয় ইঞ্চি) পুরু ছাই দিয়ে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। সুমাত্রা থেকে মুম্বাইয়ের উড়ান দূরত্ব প্রায় ৩৮০০ কিমি। 

    [i] দি টাইম মেসিন, ১৮৯৫ সালে এইচ জি ওয়েলসের লেখা বিখ্যাত একটি কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস। 

    [ii] জঙ্গলে আদিম মানুষের জীবনধারণের পেশা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা এই মানুষদের নাম দিয়েছেন hunter–gatherer বা hunter–forager। এই পর্যায়ে সংগ্রহ করাটাই ছিল আদিম মানবদের জীবনধারণের প্রধান উপায়। এই সংগ্রহ বলতে ফল-মূল-কন্দ-শাক-পাতা যেমন থাকত, তেমনি থাকত পাথরের টুকরো, গাছের শক্ত ডাল, বাঁশ, এমনকি বড়ো বড়ো জন্তুদের পায়ের হাড়, দাঁত, নখ এমন নানান জিনিষ। এগুলি তারা ধীরে ধীরে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শিখছিল, মৃত পশুদের দাঁত বা নখ ব্যবহার করত ছুরি হিসেবে, মাংস বা ফলের শক্ত খোসা কাটতে।        

    [iii] উল্লিখিত কাল্পনিক ঘটনায় আমি একটি বুনো শুয়োরের কথা বলেছি, এটি বুনো গোরুও হতে পারে, বাইসন হতে পারে, নীলগাই হতে পারে। আসলে যে সময়ের কথা বলেছি তখন ধর্মভিত্তিক খাদ্যাখাদ্য বিচার – গরু শুয়োর, ভেজ-ননভেজ – করে বিলাসিতার কোন অবকাশ ছিল না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই ছিল চরম বিলাসিতা।

    চলবে...

    গ্রন্থঋণঃ

    1. The Penguin History of Early India – Romila Thapar.
    2. Sapiens – A Brief History of Humankind – Yuval Noah Harari.
    ৩. মহাভারতের সমাজ – শ্রী সুখময় শর্মা (ভট্টাচার্য)  
           
     
  • | রেটিং ৪ (২ জন) | বিভাগ : ধারাবাহিক | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ৬২৭ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ভয়।  - Sobuj Chatterjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্যালারাম | ১৩ মার্চ ২০২২ ১০:০১504860
  • প্রশ্নটা বরাবরই মাথায় এসেছে, আজ আবার একবার উঠলো যখন, করেই ফেলি -
    যখনই কেউ এই কথাটা উদাহরণ সহযোগে বোঝান, যে 'ধর্ম' মানে ঠিক Religion নয়, সমাজবিধি/নিয়মকানুন, আমার প্রশ্ন জাগে, তাহলে মশয়, একই লেখায় যেখানে Religion এর কথা আসছে, তার বাংলা করে অন্য কোন পরিভাষা ব্যবহার কেন হবে না? আজ অবধি 'ধর্ম' ছাড়া Religion এর অন্য কোন বাংলা কেন হল না? যদি হয়ে থাকে, তবে তার যথোপযুক্ত ব্যবহার করা কি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব নয়, এই বিভাজনের জগতে?
    আপনার লেখা থেকেই উদাহরণ তুলি,
    "তার মানে ধর্ম আর religion সমার্থক নয় । ধর্ম বলতেই আমরা যে বিশ্বের নানান ধর্ম, অথবা আমাদের হিন্দু ধর্মের মধ্যেও যে প্রচলিত নানান ধর্মীয় বিভাজন, সেই রকম ধর্মের কথা মহাভারত রচয়িতা বললেন না। তিনি বললেন, সমাজ গড়তে কিছু কিছু নিয়ম, বিধি-বিধান সকলকেই মানতে হয়, সেই নিয়মই হল ধর্ম – এককথায় সামাজিক বিধি।"
    যে বাক্যে বলছেন ধর্ম = Religion নয়, সেখানেই 'হিন্দুধর্ম'ও বলা হচ্ছে। 
    এত কথা বলার কারণ, এই কনফিউশনটা কিছু ধান্দাবাজ ধর্মব্যবসায়ীকে ইচ্ছেমত হেটস্পিচ দিয়ে তারপর "ওখানে ধর্ম মানে আমি religion বোঝাইনি"র আড়াল নিতে সাহায্য করে। ঈশ্বরবিশ্বাস-সম্পৃক্ত যে সংজ্ঞা 'ধর্ম' শব্দটির সঙ্গে যুক্ত, তার সঙ্গে দর্শন, সমাজ- সব গুলিয়ে, তারপর সেই ঘোলাজলে মাছ ধরতে এই গতমাসেও দেখলাম।
     
    বেশি বকে ফেললাম। মাফ করবেন। বাকি লেখা পড়ে পরে মন্তব্য করবো।
  • Kishore Ghosal | ১৩ মার্চ ২০২২ ১১:০১504862
  • আপনি অত্যন্ত মোক্ষম একটি প্রশ্ন তুলেছেন। 'হিন্দুধর্ম'-এর  জায়গায় "হিন্দু-বিশ্বাস" বা "হিন্দু-প্রথা" বা "হিন্দু-ধারণা"  এমন কিছু শব্দ সৃষ্টি করাই যায়। কিন্তু  Religion এর বাংলা অর্থ "ধর্ম" আমাদের মস্তিষ্কে এমনই বসে গেছে, তাকে টেনে সরানো খুবই কঠিন। তবে এই দ্বিধায় জড়িয়ে আছি, আমাদের মতো ইংরিজি শিক্ষিত মানুষেরা। ভারতবর্ষের ইংরিজি না জানা অধিকাংশ মানুষ কিন্তু ধর্ম বলতে সামাজিক নিয়মকেই বোঝেন, তাতে ছুৎ-অচ্ছ্যুৎ, ছোটজাত-উঁচুজাত যেমন থাকে, তেমনই থাকে দেব পূজার অধিকার ও অনধিকার চর্চা।        
  • Kuntala Lahiri-Dutt | ০৪ জুন ২০২২ ০৪:৪২508471
  • সবই তো ভালো লাগল, খালি ওই যুবক টির আগুন জ্বালানোর কাহিনীটুকু ছাড়া। আমার মনে হয় কোনো যুবতী মা আগুনের জ্বালিয়েছিল।
  • Kishore Ghosal | ০৪ জুন ২০২২ ১০:৫৭508476
  • কুন্তলা ম্যাডাম, হতেই পারে, আমি তো কল্পনা করেছি মাত্র। 
     
    অনেকদিন আগে, শস্য আবিষ্কার নিয়ে এমনই একটি কাল্পনিক গল্প লিখেছিলাম ছোটদের পত্রিকায়, সেখানে শস্য আবিষ্কার করেছিল একটি তরুণী। 
     
    সে গল্পটি এখানে দিইনি, অকারণ মেদ বৃদ্ধির ভয়ে। 
     
    পড়ে মন্তব্য করার জন্যে, ধন্যবাদ।     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন