বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ধর্মাধর্ম – পঞ্চম পর্ব  - প্রথম ভাগ 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ১৮ আগস্ট ২০২২ | ৩০৩ বার পঠিত
  • প্রাককথা
    আগের পর্বগুলিতে ৭০,০০০ বি.সি.ই থেকে মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত হোমোস্যাপিয়েন্স নামক ভারতীয় মানব প্রজাতির ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের “আনুমানিক তত্ত্ব” এবং প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহ সম্পূর্ণ হল। এবার এই সমস্ত তথ্যগুলির একত্রে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একজন ভারতীয় হোমোস্যাপিয়েন্স হিসেবে, ১৩০০ সি.ই.-তে আমরা ঠিক কোথায় এসে পৌঁচেছিলাম – সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে আমাদের আধুনিক আচরণের যৌক্তিকতা খুঁজে পেতে হয়তো সুবিধে হবে।
     
    এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৩০০ সি.ই.-র ধারণা থেকে ২০২২ সি.ই.-র আধুনিকতার আঁচ কীভাবে পাওয়া সম্ভব? তার উত্তরে বলা যায়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ধারণার দিক থেকে ১৩০০ সি.ই. এবং ২০২২ সি.ই.-র মধ্যে আকাশ-পাতাল বদল ঘটেছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আমাদের ধর্মীয় আচরণ ও ধারণায় যেটুকু বদল ঘটেছে, তার তাৎপর্য এবং গুরুত্ব যৎকিঞ্চিৎ। সে কথা এই পর্ব শেষে আশা করি বোঝা যাবে।

    বৈদিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত ব্রাহ্মণ্যধর্ম মোটামুটি কবে হয়েছিল, সে বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে, এবং কবে থেকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে মোড় নিতে শুরু করল তার ইঙ্গিতও আমরা পেয়েছি, আগের পর্বগুলিতে। এবার কী ভাবে এবং কেনই বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দুধর্মতে রূপান্তরিত হল, সে আলোচনাই কিছুটা বিস্তারে করা যাক।

    ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু শাস্ত্রের গ্রন্থসম্ভার অজস্র, তার প্রত্যেকটির আলোচনা এখানে সম্ভব নয়, এবং আমার মনে হয় তার প্রয়োজনও নেই। তবে সাধারণ ভাবে আমরা আমাদের ধর্মাচরণ ও ধর্ম বিশ্বাসের সমর্থনে ও প্রসঙ্গে যে যে শাস্ত্র, পুরাণ ও কাব্যগ্রন্থগুলির সচরাচর উল্লেখ করে থাকি, সেগুলির মধ্যেই আমার এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।

    ৫.১ ষড়দর্শন
    প্রথমেই শুরু করা যাক হিন্দু ধর্মের দর্শন তত্ত্ব নিয়ে। হিন্দু ধর্মের মূল যে যে দর্শন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে – সেই ছটি দর্শনের কথাই আমরা এই গ্রন্থে আলোচনা করব। অন্যান্য বহু দর্শন যেগুলি এই ছটি দর্শনেরই আরও সূক্ষ্মতর বা উচ্চতর মতামত কিংবা আরো অজস্র দর্শন যেগুলি বহুদিনই অপ্রচলিত, সেগুলির কোথাও কোথাও উল্লেখ আসতে পারে।
                   
    যে ছটি দর্শন ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু ধর্মতত্ত্বের মূল, সেগুলিকে একত্রে ষড়দর্শন বলা হয়। এই ছটি দর্শন হল, সাংখ্য, পাতঞ্জল, বৈশেষিক, ন্যায়, মীমাংসা ও বেদান্ত।   

    ৫.১.১ সাংখ্য দর্শন
    সাংখ্য দর্শনের স্রষ্টা কপিল মুনি। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর কোন সময়ে এই দর্শনের সৃষ্টি। যদিও এর কিছু কিছু তত্ত্বকথা ওই সময়ের আগে থেকেই চিন্তাশীল ঋষি, মুনিদের ভাবনাতে এবং আলোচনায় আসতে শুরু করেছিল। কপিলদেব সেই সকল বিক্ষিপ্ত আলোচনাগুলিকে সুসংহত সম্পূর্ণ করে একটি তত্ত্ব রচনা করলেন, তার নাম দিলেন সাংখ্য। পরবর্তী কালে যত দর্শন-তত্ত্বই রচনা হয়ে থাক না কেন, এই তত্ত্বের কাছে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঋণী। এই তত্ত্ব প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং সে সময় ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেদের সঙ্গে সাংখ্য পাঠও আবশ্যিক ছিল। এই কারণেই শ্রীমদ্ভাগবত গীতার বিভূতিযোগ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কপিলমুনিকে নিজের অংশ-অবতার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন (এই গ্রন্থের ২.৬.৪ অধ্যায় দেখুন)। শোনা যায় গৌতমবুদ্ধ ছাত্রাবস্থায় চার-বেদ ও সাংখ্যতে অসামান্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন।

    ভারতবর্ষে কপিলমুনির স্মৃতি বিজড়িত পুণ্যভূমির অভাব নেই। সেগুলির মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত গঙ্গাসাগরের কপিলমুনির মন্দির। গয়াতে ব্রহ্মযোনি পাহাড়ের গায়ে যে কপিলধারা আছে, তার পাশেও দুটি প্রাকৃতিক গুহাকে কপিলমুনির সাধন ক্ষেত্র বলা হয়। আবার নর্মদার কপিলধারা প্রপাতের পাশেই আছে কপিলেশ্বর শিবের মন্দির ও কপিলমুনির তপস্যা ক্ষেত্র[1]। অথচ কপিলাবস্তু, জনশ্রুতি অনুযায়ী যেখানে কপিলমুনির আশ্রম ছিল ও সাংখ্য তত্ত্বের চর্চা হত – হয়তো সেখানেই তাঁর কোন শিষ্যের থেকে গৌতমবুদ্ধ সাংখ্য পাঠ করেছিলেন - এই কপিলাবস্তুকে ঘিরে কপিলমুনির কোন পৌরাণিক কাহিনী পাওয়া যায় না। প্রবল বৌদ্ধ বিদ্বেষের কারণেই কী হিন্দু শাস্ত্রের এই ইচ্ছাকৃত বিস্মৃতি? কে জানে?                    
     
    সাংখ্য দর্শনের মূল তত্ত্বটি হল, পঁচিশ সংখ্যক বিষয় বা পদার্থ – যার থেকে এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। এই পঁচিশটি পদার্থ এবং বিষয়গুলি হল এরকমঃ-
    পঞ্চ মহাভূত – মৃত্তিকা, জল, বায়ু, অগ্নি এবং আকাশ। জগতের সকল জীবদেহ এই পঞ্চভূত থেকেই গড়ে উঠেছে।
    পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়– চোখ, কান, নাক, জিভ এবং ত্বক। এই পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে আমাদের চারপাশের যে জ্ঞানের প্রত্যক্ষ অনুভব হয়, তাকে তন্মাত্র বলে। সেই কারণে তন্মাত্রও পাঁচটি। 
    পঞ্চ তন্মাত্র – রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস এবং স্পর্শ। 
    পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় – হাত, পা, বাক, পায়ু এবং উপস্থ (স্ত্রী এবং পুরুষের জননাঙ্গ)। এই পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় দিয়েই আমরা সমস্ত কাজ করি, হাঁটা-চলা করি, খাই-দাই, কথা বলি, মলমূত্র পরিত্যাগ করি এবং সন্তান উৎপাদনের জন্য স্ত্রী-পুরুষে সঙ্গম করি।  
    এই কুড়িটি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে, আরও পাঁচটি বিষয় – প্রকৃতি, পুরুষ, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন।

    প্রকৃতি জড় পদার্থ এবং কিন্তু সকল কার্যের কারণ। জড় পদার্থ আবার কাজ করবে কী করে? এই সন্দেহের উত্তরে সাংখ্য বলছে, প্রকৃতি তিনটি গুণের সাহায্যে কাজ করতে পারে। সেই তিনটি গুণ হল সত্ত্ব, রজঃ, তমো। তাতেও ঠিক স্পষ্ট হল না। উদাহরণ দিলে কিছুটা সহজ হবে। কাঠ জড় পদার্থ। কিন্তু তার মধ্যে আছে দাহিকা শক্তি। কোন ভাবে কাঠে অগ্নি সংযোগ করতে পারলে, সেই কাঠই আলো দেয়, উত্তাপ দেয়। সেই আগুনে রান্না করা যায়, শীতের রাত্রে হাত সেঁকে নেওয়া যায়, জংলী পশুদের ভয় দেখানো যায়, কখনো কখনো প্রতিবেশীর ঘরে আগুনও ধরানো যায়। একই ভাবে প্রকৃতি জড় হলেও, চেতনার প্রভাবে সত্ত্ব, রজ বা তমোগুণের অধিকারী হয়ে উঠতে পারে।

    পুরুষ হল চেতনস্বরূপ, কিন্তু নির্বিকার এবং অকর্তা, অর্থাৎ কোন কার্যই করেন না। কোন কার্যের পরিণামও ভোগ করেন না। পুরুষ এবং প্রকৃতির সংযোগ হলেই, মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মনের কার্যপ্রণালী শুরু হয়ে যায়, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমো গুণের ক্রিয়াকলাপ আরম্ভ হয়ে যায়। সত্ত্বগুণে কাঠে আগুন জ্বলে ওঠে, রজঃগুণে আলো এবং উত্তাপের আনন্দ উপভোগ করে অথবা তমোগুণে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগায়। কিন্তু এই আগুন জ্বলে ওঠা, আলো ও উত্তাপের আরাম কিংবা প্রতিবেশীর ঘরের আগুন থেকে, প্রকৃতি ও পুরুষের কিছু আসে যায় না। এই তিন অবস্থা হলেই বা কী, না হলেই বা কী? তারা যেমন ছিল, তেমনই থাকবে, অবিচল, উদাসীন, নির্বিকার। এই তিন অবস্থার পরিণাম বা ফল ভোগ করবে মানুষ, যার মধ্যে মহৎ-তত্ত্ব, অহংকার এবং মন আছে।   

    মহৎ-তত্ত্ব বুদ্ধি স্বরূপ, যা দিয়ে আমরা বিচার করি, ভালো-মন্দ, শুভাশুভ, পাপ-পুণ্য, দুঃখ-সুখ। অহংকারের অর্থ আমিত্ব– যার থেকে আমার সন্তান, আমার স্বামী, আমার বংশ, আমিই ধনী, আমি পণ্ডিত এমন ধারণা আসে। মন হল মানুষের চেতনা – এই মনই মহত্তত্ত্ব এবং অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে।  

    সাংখ্য দর্শনের সব থেকে আশ্চর্য বিষয় হল এখানে কোথাও ঈশ্বর বা দেবতার অস্তিত্ব নেই। পুরোটাই বস্তুবাদী ভাবনা। প্রত্যক্ষ জড় আর জীবের, বিশেষতঃ মানুষের জীবন তত্ত্ব। এই তত্ত্বে জন্ম-মৃত্যু এবং একজন মানুষের জীবনে পাপ-পুণ্য, শুভ-অশুভ কাজ এবং তার কারণের সন্ধান করা হয়েছে। বৈদিক ধর্মের প্রাথমিক স্তরে এই তত্ত্ব দারুণ কার্যকরী এক তত্ত্ব হয়ে উঠেছিল।

    কিন্তু বৈদিক সমাজ থেকে পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ্য সমাজ প্রতিষ্ঠার সময় এই তত্ত্বে দেখা গেল বিশাল বিপত্তি। এখানে ঈশ্বর তো নেইই, এমনকি কোন দেবতাও নেই! তাহলে এত মন্ত্র-টন্ত্র বলে, এত উপচার দিয়ে দেবতাদের উদ্দেশে যে এত বড়ো বড়ো যজ্ঞের আয়োজন, তার যৌক্তিকতা কোথায়? ব্রাহ্মণেরা সময় নষ্ট করলেন না, তাঁরা তাড়াতাড়ি আরেকটি দর্শন তত্ত্ব রচনা করতে বাধ্য হলেন, পাতঞ্জল দর্শন। প্রত্যক্ষ জড় ও জীবের সঙ্গে জুড়ে দিলেন, পরোক্ষ এক বিষয় – যে বিষয় ছাড়া ব্রাহ্মণ্য তত্ত্ব দাঁড়ায় না।

    ৫.১.২ পাতঞ্জল দর্শন
    ঋষি পতঞ্জলি এই দর্শন রচনা করেছিলেন, তাই এই দর্শনের নাম পাতঞ্জল। তিনি সাংখ্য দর্শনের পুরোটাই মেনে নিলেন, অর্থাৎ পঁচিশটি বিষয়ের তত্ত্ব, তার সঙ্গে শুধু যোগ করে দিলেন ঈশ্বরতত্ত্ব। অর্থাৎ পাতঞ্জল দর্শন ছাব্বিশ বিষয়-তত্ত্বের দর্শন। সাংখ্যর পুরুষকে ঋষি পতঞ্জলি দুটি পুরুষে বিভক্ত করলেন, একজন পরমপুরুষ অন্যজন পুরুষ। অর্থাৎ পরমপুরুষ এক এবং অদ্বিতীয়, আবার তিনিই অসংখ্য রূপে বিভাজিত হয়ে পুরুষ হয়েছেন, এবং মানুষ তো বটেই, সমস্ত জীবের মধ্যেই তিনি পুরুষরূপে অবস্থান করছেন। পরবর্তী সময়ে এই পুরুষকে আত্মাও বলা হয়েছে, এবং ঈশ্বর হয়েছেন পরমাত্মা। আরো পরবর্তী হিন্দু ধর্মমতে পরমাত্মা হয়েছেন পরমব্রহ্ম, বৈষ্ণবদের কাছে তিনি ভগবান বিষ্ণু এবং শৈবদের কাছে তিনিই দেবাদিদেব শিব। কিন্তু সেকথা আসবে পরে।

    ৫.১.৩ বৈশেষিক সিদ্ধান্ত
    ঋষি কণাদ এই দর্শনের প্রবর্তক। ঋষি কণাদের আবির্ভাবকাল ২০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি কোন সময়ে। কপিল মুনি যেমন তাঁর সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি ও পুরুষকে নিত্য স্বীকার করেছেন, কণাদ নটি পদার্থকে নিত্য বলে সাব্যস্ত করেছেন, যেমন পৃথিবী বা মাটি, জল, বায়ু, তেজ, আকাশ, কাল, দিক, আত্মা ও মন। ঋষি কণাদ এগুলিকে নিত্য দ্রব্য-পদার্থ বলেছেন। এদের মধ্যে জল, বায়ু, মৃত্তিকা, তেজ - এই চার জড় পদার্থের শুধুমাত্র পরমাণুগুলিই নিত্য, কিন্তু পরমাণু-সমষ্টি নিত্য নাও হতে পারে। যেমন মাটি এবং মাটির পরমাণু নিত্যদ্রব্য হলেও, মাটি থেকে বানানো কলসি নিত্যদ্রব্য নয়।

    কণাদ বলছেন, পরমাণুই সৎ-স্বরূপ নিত্য পদার্থ, তার আর কোন কারণ নেই। আমরা চোখের সামনে যা কিছু দেখতে পাই, সবই এই জড় পদার্থ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে, গাছ-পালা, লতা, গুল্ম, ঘটিবাটি, হাতা-খুন্তি, এমনকি যাবতীয় জীবজগৎ। কিন্তু তাদের আকার বিভিন্ন বলেই আমাদের মনে হয় তারাও বিভিন্ন। কিন্তু অবিভাজ্য পরমাণু এতই ক্ষুদ্র, তাকে তো চোখে দেখা যায় না। তাহলে কী করে মাটি, জল, বায়ু ও তেজের পরমাণুকে আলাদা করে বোঝা যাবে? কী করেই বা বোঝা যাবে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য? ঋষি কণাদ এখানে বললেন, এই দ্রব্যপদার্থগুলির পরমাণুতে “বিশেষ” নামের আরেকটি পদার্থ আছে, যার থেকে পরমাণুগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি বললেন, অদৃষ্ট (অদৃশ্য) এই বিশেষ গুণময় পরমাণুদের সংযোগেই বিশ্বসংসারের সৃষ্টি হয়ে থাকে। “বিশেষ” এই পদার্থের কারণেই এই দর্শনের নাম বৈশেষিক দর্শন।

    এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, ঋষি কণাদের পরমাণু তত্ত্ব কোনভাবেই আধুনিক পদার্থ বা রসায়ন বিজ্ঞানের অণু-পরমাণুর যে ধারণা, তার সমগোত্রীয় নয়। ঋষি কণাদের পরমাণু চারটি দ্রব্য-পদার্থের অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম কণা, তার বেশী কিছু নয়। উদাহরণে বলা যায় – জলকে তিনি নিত্য দ্রব্য বলেছেন, কিন্তু আমরা জানি জল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের একটি যৌগ, অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞানের পরমাণুর সঙ্গে, ঋষি কণাদের পরমাণুর কোন সম্পর্কই থাকতে পারে না।  ঋষি কণাদের পরমাণু ধারণার স্বপক্ষে ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের দ্বাদশ খণ্ডের দুটি শ্লোকের উল্লেখ করব। পিতা আরুণি ও পুত্র শ্বেতকেতুর কথোপকথন নিয়ে এই দুটি খণ্ড রচিত।
    (পিতা) – “এই (সুবিশাল বট) বৃক্ষ থেকে একটি বট ফল আহরণ কর”।
    (পুত্র) – “এই যে, ভগবন্‌”।  (পিতা) – “ভাঙো”।
    (পুত্র) – “ভগবন্‌, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) – “এতে কি দেখছ”?
    (পুত্র) – “অণুর মতো বীজসমূহ”।  (পিতা) – “এদের একটিকে ভাঙো”।
    (পুত্র) -  “ভগবন্‌, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) – “এতে কি দেখছ”?
    (পুত্র) – “কিছুই না, ভগবন্‌”। (ছান্দোগ্য/৬/১২/১)
    (পিতা) তাঁকে বললেন, “হে সৌম্য, বীজের এই যে সূক্ষ্মাংশটি দেখতে পাচ্ছ না, সেই সূক্ষ্মাংশ থেকেই উৎপন্ন হয়ে এই মহাবট বৃক্ষটি তোমার সামনে বিদ্যমান রয়েছে। হে সৌম্য, শ্রদ্ধা অবলম্বন কর”। (ছান্দোগ্য/৬/১২/২) [অনুবাদ – লেখক]

    ঋষি কণাদ এই তত্ত্বে সিদ্ধান্ত দিলেন, অপসর্পণ ও উপসর্পণ, খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা – জীবের যাবতীয় কর্মের কারণ কোন না কোন দ্রব্যপদার্থের পরমাণু এবং তার বিশেষ দ্রব্য – যাকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। “অপসর্পণ” মানে মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে মন (আত্মা)-র বাইরে চলে যাওয়া এবং “উপসর্পণ” মানে অন্য দেহে মনের প্রবেশ। এভাবেই অগ্নির ঊর্ধমুখী শিখা, বায়ুর তির্যকগতি, মেঘ, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, উদ্ভিদের দেহে রসের সঞ্চার, জীবের জীবন ও মৃত্যু – অর্থাৎ জগতের সবকিছুই, চোখে দেখা যায় না এমন কিছু পরমাণু এবং বিশেষ দ্রব্যের নির্দিষ্ট সংযোগ।
     
    আশ্চর্যের বিষয় হল, মহর্ষি কণাদও কিন্তু তাঁর এই বৈশেষিক তত্ত্বে সরাসরি কোন ঈশ্বরের প্রস্তাব দিলেন না। এই তত্ত্বের কোথাও তিনি ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করলেন না। অতএব তাঁর তত্ত্বকেও “নাস্তিক” তত্ত্ব বলাই যায়। কিন্তু তাঁর তত্ত্বের পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা এই অদৃষ্ট-বিশেষ দ্রব্যের ব্যাখ্যাতে জীবাত্মা এবং পরমাত্মা এনে ফেলে, এই তত্ত্বকে আস্তিক তত্ত্ব বানিয়ে তুলেছিলেন।
     
    ভারতীয় দর্শন মানেই ধর্মতত্ত্ব এবং জীব, বিশেষ করে মানবের মঙ্গল সাধন। অতএব ঋষি কণাদ ধর্মের বিষয়ে বললেন, দু প্রকারের ধর্ম হয়, অভ্যুদয় এবং নিঃশ্রেয়স। অভ্যুদয় মানে সমৃদ্ধির ইষ্টসাধন এবং নিঃশ্রেয়স মানে স্বর্গলাভ এবং সংসারের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি – এক কথায় মুক্তি। মুক্তি হলে শরীরের সঙ্গে মন বা আত্মার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ঋষি কণাদ মুক্তির উপায় সম্পর্কে বললেন, আত্ম-কর্ম সম্পন্ন হলেই মুক্তি লাভ হয়। এই আত্ম-কর্ম কী?

    বৈশেষিক তত্ত্বে সাতটি পদার্থের উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব। প্রথম পদার্থ দ্রব্যের কথা আগেই বলেছি। এখন অন্য পদার্থগুলি কী, সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।
    গুণ পদার্থ চব্বিশটি – রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সংখ্যা, পরিমাণ, পৃথকত্ব, সংযোগ, বিয়োগ, পরত্ব, অপরত্ব, বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ ও প্রযত্ন। ঋষি কণাদ এই সতেরটি পদার্থর উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তী টীকাকারগণ তার সঙ্গে আরও সাতটি যোগ করেছেন, শব্দ, গুরুত্ব, দ্রবত্ব, স্নেহ, সংস্কার, পাপ ও পুণ্য।
    কর্ম পদার্থ পাঁচটি – উৎক্ষেপণ, অবক্ষেপণ, আকুঞ্চন, প্রসারণ ও গমন।
    সামান্যপদার্থ –বস্তু বা জীবের জাতিগত ধর্ম অর্থাৎ তাদের সাধারণ ধর্মকে সামান্য ধর্ম বলে । যেমন ধাতুর ধর্ম তার ধাতব বৈশিষ্ট্য, গরুর বা বাঘের ধর্ম তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
    বিশেষ পদার্থ – বিশেষ পদার্থের কথাও আগেই বলেছি।
    সমবায় পদার্থ – সম্বন্ধ-বিশেষের নাম সমবায়। যেমন ঘটের সঙ্গে মাটির সম্বন্ধ, বস্ত্রের সঙ্গে সুতোর সম্বন্ধ কিংবা কর্তার সঙ্গে কর্মের সম্বন্ধ।
    অভাব পদার্থ – অভাবের অর্থ কোন কিছুর অস্তিত্ব না থাকা।  এই অভাবও চার প্রকারের। যেমন প্রথমতঃ প্রাগভাব (প্রাক্‌+অভাব) –কোন বস্তু সৃষ্টি হওয়ার আগে যে অবস্থা থাকে, যেমন মাটি আছে কিন্তু ঘট বানানো হয়নি। অতএব ঘট এখানে প্রাগভাব পদার্থ। দ্বিতীয়তঃ ধ্বংসাভাব – কোন বস্তু নষ্ট হলে বা মৃত্যু হলে যে অভাব হয়, যেমন ঘট বানানোর পর ভেঙে গেল, ঘট এখানে ধ্বংসাভাব পদার্থ। তৃতীয়তঃ ভেদাভাব – দুই বস্তুর মধ্যে প্রভেদ বোঝা যায় – যেমন মাটি দিয়ে তৈরি ঘট এবং মাটির বাড়ির মধ্যে ভেদ-অভাব পদার্থ লক্ষ্য করা যায়, যদিও দুটিই মাটি থেকেই নির্মিত। চতুর্থতঃ অত্যন্তাভাব পদার্থ –ঘট ও বস্ত্রের মধ্যে যে অভাব সেই অভাবকে অত্যন্তাভাব পদার্থ বলা হয়েছে। দুটি বস্তুর উপাদান সম্পূর্ণ আলাদা। এই অভাব পদার্থের বিষয়টি ঋষি কণাদের তত্ত্বে ছিল না, এটিও পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা আরোপ করেছিলেন।

    এখন ঋষি কণাদ বলছেন, এই যে ছ’ প্রকার পদার্থের - দ্রব্য থেকে সমবায় – তত্ত্বজ্ঞানই হল আত্মকর্ম। এই তত্ত্বজ্ঞানের জন্যে শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসনের অনুশীলন করতে হয়। এই তত্ত্বজ্ঞান হলেই দেহ যে আত্মা নয় সেই উপলব্ধি আসে। তখন মন থেকে রাগ–দ্বেষ বিলুপ্ত হয়। রাগ-দ্বেষ দূর হয়ে গেলে ধর্মাধর্মে প্রবৃত্তি থাকে না। ধর্মাধর্মের প্রবৃত্তি না থাকলে পুনর্জন্ম হয় না। আর পুনর্জন্ম না হলেই দুঃখ থাকে না। অতএব সকল দুঃখের অবসানই মোক্ষ।
     
    ঋষি কণাদ যে সময়ে পরমাণু এবং তার সঙ্গে বিশেষ পদার্থের তত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন, সেটিকে পরবর্তী কালের ব্যাখ্যাকাররা যদি ঈশ্বরের ছাঁচে না ফেলে, ঋষি কণাদের পথেই আরও গভীরে হাঁটতেন, হয়তো তাঁরাই বিশ্বের পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নে পথিকৃৎ হতে পারতেন। কিন্তু তা হবার নয়, কারণ সর্ব বিষয়েই ঈশ্বরের উপপত্তি ভারতীয় মস্তিষ্কের “বিশেষ পদার্থ” যে!

    ৫.১.৪ ন্যায় দর্শন
    মহর্ষি গোতম এই দর্শনের প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর আরেকটি নাম অক্ষপাদ, এই কারণে এই দর্শনকে গোতম বা অক্ষপাদ-দর্শনও বলা হয়ে থাকে। ন্যায় দর্শনের জন্ম খুব সম্ভবতঃ খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে কিংবা খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে।

    মহর্ষি গোতম বৈশেষিক তত্ত্বের পরমাণুবাদকেই অনুসরণ করেছেন, একমাত্র বিশেষ পদার্থ ছাড়া স্বীকার করেছেন অন্য সব দ্রব্য পদার্থ। ন্যায় শাস্ত্রে এই তত্ত্বগুলি ছাড়া আরও ষোলটি পদার্থের অবতারণা করা হয়েছে। এই পদার্থ কিন্তু কোন বস্তু নয়, বরং বিষয় বলাই ভালো। ন্যায় দর্শন প্রকৃতপক্ষে তর্ক বা বিচার শাস্ত্র। এই শাস্ত্রে তর্ক ও বিচারের পদ্ধতি এবং তার সঙ্গে প্রমাণ, প্রমেয়, সিদ্ধান্ত ইত্যাদি ষোলটি অঙ্গকে ষোলটি পদার্থ বলা হয়েছে।

    যা দিয়ে কোন বিষয়কে নির্দিষ্ট করা যায় তাকেই প্রমাণ বলে। প্রমাণের আবার রকমফের আছে, যেমন প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ। অতএব অনুমান, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় হাইপোথিসিস (Hypothesis) বলে, সেই অনুমান ভারতীয় তত্ত্বেও গ্রাহ্য।

    পাঁচটি প্রমাণের মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রমাণের ব্যাখার প্রয়োজন নেই। অনুমান প্রমাণের ব্যাখ্যা প্রয়োজন কারণ এটি ন্যায় দর্শনের প্রধান অংশ। খুব সহজ করে বললে, অনুমান হল কার্য দেখে তার কারণ স্থির করা। যেমন একটা ঘট দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, একজন মৃৎশিল্পী মাটি দিয়ে এটিকে গড়েছেন। অথবা ধোঁয়া দেখলে বোঝা যায় তার পিছনে আগুন আছে। এই অনুমানের পাঁচটি অঙ্গ বা অবয়ব আছে – প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন। এগুলির ব্যাখ্যা দেওয়ার থেকে উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধে হবে।

    ধরা যাক প্রাচীন কালের একদল যাত্রী পাহাড়ি জঙ্গলের পথে দূরদেশে যাত্রা করছে। পথে সন্ধ্যে হয়ে আসছে, লোকালয়ের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, অথচ রাত্রিবাসের জন্যে একটা আশ্রয় তো চাই। হঠাৎ ওই যাত্রীদল দেখলেন, কিছুটা দূরের পাহাড়ের গায়ে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। এই ধোঁয়া দেখে কী কী অনুমান এবং সিদ্ধান্ত করা যায় দেখা যাক, –
    ১. ধোঁয়া যখন দেখা গেছে, তার পিছনে আগুন অবশ্যই আছে – প্রতিজ্ঞা অর্থাৎ নিশ্চিত অনুমান।
    ২. আগুন থাকলে তার ধোঁয়া থাকবেই – এটি হেতু, কারণ তখনকার দিনে কাঠ জ্বেলে আগুন ধরানো হত (এখনকার গ্যাস বা ইন্‌ডাকশনে ধোঁয়া বেরোবেই না)।
    ৩. আগুন যখন জ্বালানো হয়েছে, তখন ওখানে নিশ্চয়ই মানুষ আছে, কারণ মানুষ ছাড়া কেউ আগুন জ্বালাতে পারে না। - এটি উদাহরণ অনুমান।
    ৪. মানুষ তার রান্নাঘরে কিংবা অন্য কোন কাজের জন্যেই আগুন ধরিয়েছে – এটি উপনয় অনুমান।
    ৫. অতএব ওই পর্বতে মানুষের বসতি অথবা লোকালয় বা গ্রাম আছে, ওইদিকে গেলে রাতের আশ্রয় মিলতে পারে – এটি নিগমন অনুমান – সিদ্ধান্ত।

    উপমান হল জানা বস্তুর ধারণা থেকে অজানা বস্তুকে চিনতে পারা। যে ধাতু হিসেবে তামা, ব্রোঞ্জ চেনে, তার কাছে লোহা অজানা হলেও, সেটা যে একটি ধাতু চিনতে খুব অসুবিধে হয় না। যে গরুর পাল চেনে, সে ছাগলের পাল দেখেও বুঝতে পারে, এগুলি গৃহপালিত প্রাণী।

    শব্দ বলতে আপ্ত-কথা বোঝায়, যেমন বেদের উক্তি শব্দ, তার উদাহরণ বা উল্লেখ (reference)-ই শেষ কথা।

    এই গেল প্রমাণের কথা। এখন প্রমাণ দিয়ে যে বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান হয় তাকে প্রমেয় বলে। ন্যায় শাস্ত্রে প্রমেয় বারো প্রকারের – আত্মা, শরীর, ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের বিষয়, বুদ্ধি, মন, প্রবৃত্তি, দোষ, প্রেত্যভাব (বারবার জন্ম ও মৃত্যুর চক্র), ফল, দুঃখ ও অপবর্গ।

    অনিশ্চিত বিষয়কে নিশ্চয় করাকে সিদ্ধান্ত বলে। খুব বেশি ভেতরে না ঢুকে বলা যায়, প্রমাণ, প্রমেয় ও সিদ্ধান্তের মতো, অন্য পদার্থগুলির মধ্যে প্রধান হল, সংশয়, প্রয়োজন, দৃষ্টান্ত, বাদ, বিতণ্ডা, ছল প্রভৃতি মোট ষোলটি পদার্থ। এই ষোলটি পদার্থ বিচারের অঙ্গ এবং তর্ক-বিতর্কের উপায়।

    এই ষোলটি পদার্থ দিয়ে কিসের বিচার করা হবে? শরীর যে আত্মা নয়, তার বিচার হবে এবং নিশ্চিত সিদ্ধান্ত করে, জ্ঞাত হওয়া যাবে। শরীর যে আত্মা নয়, সেটা জানলে মানুষের মুক্তি হবে। এই ন্যায় দর্শনে প্রমেয় পদার্থের মধ্যে ঈশ্বরের প্রসঙ্গ কোথাও উল্লেখ নেই। যা প্রমাণ করা যায় না, তার অস্তিত্ব থাকে কী করে? অর্থাৎ ঋষি গোতমও ছিলেন নিরীশ্বরবাদী - নাস্তিক!

    কিন্তু তাঁর পরবর্তী নৈয়ায়িক পণ্ডিতেরা এই তত্ত্বের “আত্মা” কে দুটি ভাগে ভেঙে ফেললেন - জীবাত্মা ও পরমাত্মা। তাঁরা আরও বললেন ঈশ্বর কী প্রমাণ সাপেক্ষ কোন বিষয়? ঈশ্বর তো স্বতঃসিদ্ধ-প্রমাণ, তাঁর জন্যে আবার বিচার কিংবা তর্ক-বিতর্ক কিসের?

    পরবর্তী কালে এই বৈশেষিক এবং ন্যায় দর্শনের অজস্র টীকা এবং ব্যাখ্যা রচনা করেছেন পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন শঙ্করমিশ্র, বল্লভাচার্য, উদয়ণাচার্য, বার্তিক, বাচষ্পতি মিশ্র, কেশব মিশ্র, গোবর্ধন মিশ্র, জয়দেব মিশ্র, জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন প্রমুখ। এক সময়ে এই বঙ্গের নবদ্বীপ এবং ভট্টপল্লী (ভাটপাড়া) ছিল এই ন্যায় শাস্ত্র চর্চার অন্যতম সেরা পীঠস্থান। কয়েকশ বছর আগে পর্যন্ত সারা দেশের শিক্ষার্থীরা ন্যায়-শাস্ত্র পাঠ করতে আসতেন নবদ্বীপ এবং ভাটপাড়ায়।

    ৫.১.৫ মীমাংসা দর্শন
    মহর্ষি জৈমিনি এই দর্শনের প্রবক্তা, এবং খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন সময় এই দর্শন-তত্ত্বের সূচনা হয়। এই দর্শনকে জৈমিনি দর্শনও বলা হয়। মীমাংসা দর্শনের প্রধান কাজ, বেদের কর্ম-যোগের তাৎপর্য বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা। মীমাংসা ও বেদান্তের দর্শন-তত্ত্ব খুব ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরকও বটে। দুই তত্ত্বের এই নিবিড় সম্পর্কের স্বীকৃতিস্বরূপ বেদান্তকে উত্তর-মীমাংসা অর্থাৎ পরবর্তী ব্যাখ্যা বলা হয়, আর মীমাংসা যেহেতু বেদান্তের থেকে অনেকটাই পূর্ববর্তী তত্ত্ব, সেই কারণে একে পূর্ব-মীমাংসা বলা হয়।

    বেদের জটিল রীতি ও প্রথা প্রকরণগুলিকে, সঠিক উপলব্ধি ও অনুসরণের সুবিধার জন্যে মীমাংসা সেগুলির সরল ব্যাখ্যা ও পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। উপরন্তু, বেদের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে, মীমাংসা বিস্তারিত কিছু জ্ঞানতত্ত্বের সৃষ্টি করেছে, সেই তত্ত্বগুলি বেদান্তও প্রায় সম্পূর্ণতঃ স্বীকার করে নিয়েছে। মীমাংসা বলে, দুই ধরনের জ্ঞান আছে – প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। পরোক্ষের আবার পাঁচটি বিভাগ আছে, অনুমান, উপমান, শব্দ, অর্থপত্তি এবং অনুপলব্ধি। আমরা এর আগের দর্শন-তত্ত্বগুলির আলোচনায় প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন করব অর্থপত্তি ও অনুপলব্ধি নিয়ে।
     
    নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়া গেলেও কোন বিষয়ের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যে আনুমানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে অর্থপত্তি বলা হয়। উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে, - সারাদিন উপবাসে থেকেও কোন ব্যক্তি যদি দিন কে দিন মোটা হতে থাকেন, তাহলে অর্থপত্তি করা যায় যে, তিনি নিশ্চয়ই রাত্রে সকলের অগোচরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করেন (অথবা তিনি হাইপোথাইরয়েডিজ্‌মে ভুগছেন)।
     
    কোন বিষয়ের অকস্মাৎ অনুপস্থিতির কারণে আমাদের যে উপলব্ধি হয়, তাকে অনুপলব্ধি বলে। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়ে বিশাল গাছের উপড়ে পড়ায় আমাদের অনুপলব্ধির চেতনা আসে – এই তো কিছুক্ষণ আগেও অত্তো বড়ো সজীব গাছটা দাঁড়িয়েছিল, এখন আর নেই? এই তো গতকালই সন্ধেয় ক-বাবুর সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে আড্ডা দিলাম, তিনি আজ ভোরে মারা গেলেন?

    মীমাংসা আরও বলেছে, যদিও সঠিক জ্ঞান আমাদের জীবনের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, কিন্তু ঘটনাচক্রে, তত্ত্বের নানান ব্যখ্যায় আমাদের ভ্রান্তি আসাও সম্ভব। যেমন, যদিও দড়ি ও সাপ সম্বন্ধে আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আছে, কিন্তু আবছা আলোয় আমাদের দড়িকে সাপ বলে ভ্রম হয়ে থাকে। এর কারণ সাপ সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সর্বদাই অত্যন্ত স্পর্শকাতর থাকে। এই বিষয়টিকে মীমাংসা-দর্শন নাম দিয়েছে অখ্যাতিবাদ অর্থাৎ অলীক ভাবনার ভ্রান্তি।

    মীমাংসা যাবতীয় বিষয়ভুক্ত এই বাস্তব জগতকে স্বীকার করে। মীমাংসার মতে, পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও পঞ্চ তন্মাত্র-ময়   জীবসমূহ নিয়েই এই জগতের সৃষ্টি। এই জীবদেহের মধ্যেই অস্থায়ীভাবে আত্মা অধিষ্ঠান করেন এবং সেই আত্মাই জীবকে সৎ ও অসৎ কর্মে প্ররোচিত করেন। এর ফলস্বরূপ জীব তার নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী এই জগতের বিষয় উপভোগ করে অথবা কষ্টভোগ করে।

    জীবাত্মার সংখ্যা অসীম এবং নিত্য। কিন্তু ইহলোকের জীবদেহে আত্মা যখন আবদ্ধ থাকে, জীবের সৎ ও অসৎ কর্মের জন্যে তাদের পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হয়। আত্মার নিজস্ব কোন চেতনা নেই, কিন্তু যখনই জীবের মন, ইন্দ্রিয় এবং তন্মাত্রর সঙ্গে তার সংযোগ হয়, তখনই তার জাগরণ ঘটে। এই অবস্থা উপলব্ধি করা যায় সুষুপ্তির সময়, সে সময় জীবের সম্যক চেতনার অভাবে আত্মাও নির্বিকার থাকে।  

    যেহেতু সকল মানুষকেই জীবনধারণের জন্যে সর্বদাই কর্মে নিযুক্ত থাকতে হয়, সেহেতু বেদ সকল মানুষকেই কর্মযোগ সাধনার উপদেশ দেয়। এই কর্ম প্রধানতঃ দুই প্রকারের, নিত্য কর্ম – যেমন, জীবনধারণের জন্য উপার্জন, আহার, স্নান, নিদ্রা ইত্যাদি এবং নৈমিত্তিক কর্ম অথবা বৈদিক কর্ম, যেমন যজ্ঞ, ধ্যান, যোগ, উপাসনা ইত্যাদি।

    একজন মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিৎ মোক্ষ, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর নিরন্তর চক্র থেকে মুক্তি। এই পর্যায়ে মানব-আত্মার সকল দুঃখ ও বেদনা থেকে মুক্তি মেলে, যদিও চেতনাহীন আত্মার দুঃখ ও আনন্দের কোন অনুভূতি নেই। এই মোক্ষলাভের উপায় প্রসঙ্গে মীমাংসারও সহজ উত্তর, নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মযোগ। তবে কোন কর্মের একটিও কাম্য-কর্ম হলে চলবে না। মনোগত বাসনা বা কামনা পূরণের জন্য যে কোন কর্মই হল কাম্য-কর্ম। অতএব কাম্য-কর্মের সঙ্গে মনে আসে লোভ, মায়া, হিংসা, ঈর্ষা, প্রভৃতি রিপু। তবে অজ্ঞাতে কৃত কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত কামনায় যদি যজ্ঞ করা হয়, সেটি কাম্য-কর্ম হলেও সেই কর্মে কোন বাধা নেই।

    এই প্রসঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতায়, অর্জুনকে বলেছেন,
    “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
    মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি।।
    তোমার অধিকার শুধুমাত্র কাজ করায়, কর্মফলে তোমার অধিকার নেই। কর্মফলের প্রত্যাশায় যেমন কোন কাজ করা উচিৎ নয়, তেমনই কর্মত্যাগের মতিও যেন তোমার না হয়”। (গীতা/২/৪৭)[2]

    নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মে চিত্তশুদ্ধি হয়। বিপরীতে এই দুই কর্ম না করলে হয় প্রত্যবায়দোষ (অকর্ম বা নিষ্কর্মের ত্রুটি), তাতে মোক্ষলাভের পথ দুরূহ হয়ে ওঠে। নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠানে প্রারব্ধ কর্মফল নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। প্রারব্ধ কর্মফল হল পূর্বজন্মে কৃত যাবতীয় কর্মের ফল। অতএব এই জন্মে পূর্বজন্মের প্রারব্ধ ফল নিষ্ক্রিয় করতে পারলে এবং ইহজন্মে একটিও কাম্য-কর্ম না করলে, পরের জন্মের জন্য কোন প্রারব্ধ কর্মফল আর বকেয়া হবে না। অর্থাৎ পুনর্জন্ম হবে না, মোক্ষলাভ ঘটবে।

    মীমাংসা দর্শনে আরেকটি প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে, সেটি হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে বা নেই। যেহেতু এই বিশ্ব জগতের যাবতীয় উপাদানের (পঞ্চভূত) অস্তিত্ব রয়েছে অনাদি কাল থেকেই এবং আত্মার অদৃষ্ট বা প্রারব্ধ কর্মই সকল সৃষ্টি প্রকরণের নিয়ামক, সেক্ষেত্রে সৃষ্টি সম্পাদনে ঈশ্বরের তো কোন ভূমিকাই থাকছে না!

    এখানেই মীমাংসা দর্শন অনন্য। কারণ এই দর্শন বেদকেই ঈশ্বরের আসনে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অস্বীকার করেছে বেদের সৃষ্টিকর্তাকে। শুধু পরমেশ্বরকেই নয়, বেদে উল্লিখিত সকল দেবতাদেরও – ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ প্রমুখ – যাদের উদ্দেশ্যে বেদ নানা যজ্ঞের বিধান নির্দিষ্ট করেছিল, সেই দেবতারাও এই তত্ত্বে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন! কাজেই এমন সিদ্ধান্ত করাই যায় মীমাংসা দর্শনের এই নিরীশ্বর দৃষ্টিভঙ্গির জন্যেই, পরবর্তীকালে হিন্দু-দর্শনের মূল তত্ত্বগুলি থেকে ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই দর্শনের গুরুত্ব রয়ে গেছে, কারণ, বেদান্ত দর্শন বুঝতে পূর্ব-মীমাংসার বেদ ব্যাখ্যা ও বেদতত্ত্ব-জ্ঞান অত্যন্ত প্রয়োজন।  

    ৫.১.বেদান্ত দর্শন
    মধ্য যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সব থেকে প্রচলিত এবং আলোচিত দর্শন বেদান্ত। বেদান্তের একমাত্র ভাবনা ব্রহ্ম। ব্রহ্মের ধারণা এবং ব্রহ্ম-উপলব্ধির দর্শনই বেদান্ত। বেদান্ত দর্শন সম্পূর্ণ বেদ-নির্ভর এবং এর নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এটি বেদের অন্ত বা শেষ অর্থাৎ উপনিষদকে মূলতঃ অনুসরণ করেছে। যদিও বেদান্ত উপনিষদ ছাড়াও ব্রহ্মসূত্র এবং গীতার তত্ত্বের উপরও নির্ভরশীল।   
     
    যাঁর থেকে জগতের উৎপত্তি এবং যাঁর জন্যে জগতের স্থিতি ও লয় হয়, তিনিই ব্রহ্ম। ব্রহ্ম সত্য-স্বরূপ, জ্ঞান-স্বরূপ ও অনন্ত-স্বরূপ। তিনি অদ্বিতীয় অর্থাৎ তিনি ছাড়া অন্য কোন বিষয় থাকতে পারে না। তিনিই সত্য, বাকি আর সব অসত্য। কিন্তু তিনি সৎ[3]-স্বরূপ রয়েছেন বলেই জগতের অস্তিত্ব রয়েছে এমন ধারণাও একরকমের ভ্রম। সে কথায় পরে আসছি।

    মাটি দিয়ে যে ঘট বানানো হয়, তাতে মাটি হল উপাদান-কারণ এবং যিনি ওই ঘট বানিয়েছেন, অর্থাৎ কুম্ভকার নিমিত্ত-কারণ। সৃষ্টির আদিতে অদ্বিতীয়-স্বরূপ পরমেশ্বরই ছিলেন, আর কিছুই ছিল না। সেক্ষেত্রে তাঁকেই জগতের নিমিত্ত এবং উপাদান-কারণ বলতে হয়। মাটি যেমন পরিণত এবং পরিমার্জিত হয়ে ঘট হয়ে ওঠে, তিনি কিন্তু নিজে পরিণত অথবা বিকৃত হয়ে এই জগতের সৃষ্টি করেননি। কারণ তিনি নির্বিকার এবং অব্যয়, কারণ তিনি নিত্য অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই তাঁর পরিবর্তন সম্ভব নয়।

    অতএব মাটি যেমন ঘটের পরিণাম-উপাদান, সেরকম ব্রহ্ম এই জগতের পরিণাম-উপাদান হতে পারেন না। যদিচ আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হয়। এই বিষয়ে এই দর্শনে একটি অতি প্রচলিত উদাহরণ ব্যবহার করা হয়, অন্ধকারে দেখলে রজ্জু অর্থাৎ দড়িকে সাপ বলে মনে হয়। কিন্তু আলোতে দেখলে রজ্জু, রজ্জুই থাকে। অর্থাৎ “রজ্জুতে সর্পভ্রম”-এর মতোই, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে, ব্রহ্মে জগৎ-ভ্রম হয়ে থাকে। এই ধরনের ভ্রমাত্মক উপাদানের ধারণাকে বেদান্তের ভাষায় বিবর্ত-উপাদান বলে, অতএব ব্রহ্ম জগতের বিবর্ত-উপাদান কারণ।

    এই ভ্রমকে দূর করার জন্যে মায়া তত্ত্ব আনা হয়েছে। মায়া পরব্রহ্মের শক্তি-স্বরূপ। তিনি মায়াবচ্ছিন্ন (মায়ার প্রভাবে বিভক্ত) হলেই জগতের উৎপত্তি হয়। কিন্তু তিনি যদি নিত্য এবং মুক্ত হন, তাহলে তিনি বিভক্ত হচ্ছেন কী করে? এই সংশয় দূর করার জন্যে বৈদান্তিকেরা একটি উদাহরণ দিয়েছেন। পাতায় ভরা গাছের নিচে বসে আকাশের দিকে তাকালে, মনে হয় আকাশ যেন ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে আকাশ একটাই থাকে। তেমনি ব্রহ্ম মায়াবচ্ছিন্ন হলেও বাস্তবে অবচ্ছিন্ন হন না। এই একই অনুভবের কথা আমরা ভগবান বুদ্ধের ক্ষেত্রেও শুনেছি, বোধিবৃক্ষের নীচে বসে একটি অশ্বত্থ পাতার আড়ালে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি জীবনের অনাত্মতা ও অনিত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন (অধ্যায় ৩.২.২)।  
     
    বেদান্তের মতে ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরাকার, নির্বিকার, অবাঙ্মনসোগোচর (তাঁকে কথা বা চিন্তা দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না) ও চিন্ময়-স্বরূপ এবং বাস্তবে জীব ও পরব্রহ্মে তেমন কোন পার্থক্য নেই। অজ্ঞান জীবের যখন প্রকৃত জ্ঞানলাভ হয়, তখনই জীবও পরব্রহ্ম হয়ে যায়। জীব ও ব্রহ্মের এই অভেদ-জ্ঞানের সাধনার পথই বেদান্তের দর্শন। বেদান্তের এই পরব্রহ্ম ভাবনা বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় উপনিষদে। অতএব বেদান্ত দর্শনের প্রধান প্রমাণ উপনিষদ। উপনিষদের কয়েকটি বাক্যকে বেদান্ত “মহাবাক্য” বলে উল্লেখ করে থাকে। যেমন “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” – এই আত্মাই ব্রহ্ম, “অহং ব্রহ্মাস্মি – আমিই ব্রহ্ম, “তত্ত্বমসি” – তুমি সেই ব্রহ্ম। এই জ্ঞান অর্জন করার জন্য শম, দম, উপরতি, তিতিক্ষা ও সমাধির অভ্যাস করতে হয়। সমাধির পর, “আমিই ব্রহ্ম” এই উপলব্ধি হয় এবং চৈতন্য-স্বরূপ জীব-আত্মা পরমাত্মায় লীন হয়ে যায়। একেই “নির্বাণ, মুক্তি বা মোক্ষ” বলে।

    বেদান্তে ব্রহ্মজ্ঞানের জন্যে চারটি সাধনপথের কথা বলা হয়েছে, তাকে একত্রে সাধন চতুষ্টয় বলে, যেমন,
    ১. নিত্যানিত্য-বস্তু বিবেক – অর্থাৎ ব্রহ্মই নিত্য এবং অন্য সমুদয় বস্তু অনিত্য এই বিচার।
    ২. ইহামুত্র (ইহলোকে এবং পরলোকে) ফল-ভোগ-বিরাগ[4] অর্থাৎ ঐহিক ও পারলৌকিক সুখ-ভোগ-বিরাগ।
    ৩. শম-দমাদি সাধন-সম্পত্তি অর্থাৎ শম, দম, উপরতি (নিবৃত্তি), তিতিক্ষা (ধৈর্য), সমাধান অর্থাৎ ঈশ্বর-বিষয়ক শ্রবণাদিতে একাগ্রচিত্ততা এবং শ্রদ্ধা অর্থাৎ গুরুর উপদেশে ও বেদান্ত শাস্ত্রে অখণ্ড বিশ্বাস। শম অর্থাৎ মনকে শান্ত করা। সকল ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা, অর্থাৎ দম বা দমন করা। সকল সকাম অর্থাৎ ফলের আশায় করা কর্ম থেকে নিবৃত্ত হওয়াই উপরতি। শীত-গ্রীষ্ম এবং যাবতীয় দুঃখ-শোক সহ্য করে ধৈর্য রাখাই তিতিক্ষা।  আর আলস্য ও মনের ভ্রান্তি দূর করে একাগ্র ও নিবিষ্ট মনে পরব্রহ্মের চিন্তনই সমাধান – অর্থাৎ সমাধি।  
    ৪. মোক্ষাভিলাষ অর্থাৎ মোক্ষের জন্য তীব্র আকাঙ্খা।

    এই রকম জ্ঞানের অভ্যাস যাঁরা করতে পারেন না, তাঁদের জন্যে অন্য ব্যবস্থাও আছে। তাঁরা প্রথমে প্রণব অর্থাৎ ওঁ-কার অবলম্বন করে পরমাত্মার উপাসনা করবেন। মাণ্ডুক্য-উপনিষদে এই উপাসনার সবিস্তার বর্ণনা দেওয়া আছে। এই উপাসনার তাৎপর্য হল, জাগ্রৎ, স্বপন, সুষুপ্তি এই তিন অবস্থার অধিষ্ঠাতা ও সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ অদ্বিতীয়-স্বরূপ পরমাত্মাই প্রণবের প্রতিপাদ্য। অতএব যাঁরা ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসু কিন্তু দুর্বল অধিকারী তাঁদের পক্ষে ওঁ-কার মন্ত্রের উপাসনা করাই অবশ্য কর্তব্য। ওই উপনিষদে বলা হয়েছে, প্রণব ধনুকের মতো, আর জীবাত্মা যেন তির, প্রণব উপাসনা-রূপ ধনুক থেকে জীবাত্মার তির ছুঁড়ে পরমব্রহ্ম-রূপ লক্ষ্য ভেদ করতে হবে। তির যেমন লক্ষ্যে বিদ্ধ হয়ে থাকে, জীবাত্মাও সেরকম পরমাত্মায় অধিষ্ঠিত হয়ে যায়।

    বেদান্ত শাস্ত্র ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তুলনায় কিছুটা উদারপন্থী, যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান না করলেও ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসু ব্যক্তির ব্রহ্ম-সাধনায় পূর্ণ অধিকার ছিল। নিজের নিজের বর্ণ ও আশ্রমের ধর্মাচরণ করলে ভাল, কিন্তু না করলেও তত্ত্বজ্ঞানের ইচ্ছা হলে, যে কোন ব্যক্তি এই সাধনা করতে পারেন।
     
    সাংখ্য, বৈশেষিক এবং ন্যায় দার্শনিকদের মনে এমন সংশয় আসে, যে ঈশ্বরই যদি সকল জীব ও মানুষের সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে মানুষের এমন বিভিন্ন অবস্থা হয় কেন? কেউ দুঃখী, কেউ সুখী, কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র, কেউ চিররুগ্ন, কেউ বা স্বাস্থ্যবান। ঈশ্বর কি তবে সমদর্শী নন, তিনি কি পক্ষপাত দোষে দুষ্ট? এই সংশয় দূর করে বেদান্ত বলেছেন, ঈশ্বর নির্বিকার এবং সমদর্শী। জীব বা মানুষের অবস্থার ভেদ হয় তার নিজেরই কর্ম দোষে। পূর্ব জন্মে যে যেমন কাজ করে, পরের জন্মে সে তেমনই ফল ভোগ করে থাকে। এই প্রসঙ্গে তাঁরা ঈশ্বরকে মেঘের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁরা বলেন, মেঘ বৃষ্টি হয়ে নেমে ক্ষেত্রকে সরস করে, তার থেকে বিভিন্ন শস্য - যব, ধান, গম ইত্যাদি পুষ্ট হয়। এক্ষেত্রে মেঘ একই হলেও, যব, গম বা ধানের চরিত্র এক নয়, সেই কারণে তাদের পুষ্টি ভিন্ন, তাদের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তেমনই ঈশ্বর দেবতা, মানুষ ও অন্যান্য জীব সৃষ্টির সাধারণ কারণ, কিন্তু তাদের অবস্থা ভেদের জন্য তিনি দায়ী নন। দেবতা যে দেবতা হয়েছেন, কিংবা মানুষ যে মানুষ হয়েছে, সে সবই তাদের পূবর্জন্মের কর্মফলে। এই কারণ অসাধারণ কারণ, এর জন্যে সম্পূর্ণতঃ দায়ী দেবতা, মানুষ বা পশুরা।
     
    এই মত অগ্রাহ্য না করে, সাংখ্য দার্শনিকেরা প্রশ্ন করতে পারেন, ঈশ্বর যখন প্রথম জীব সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তো কোন জীবের পূর্বজন্ম-কৃত কর্মফলের গুণ বা দোষ থাকতে পারে না, তাহলে দেব, মানুষ এবং পশুদের বিভেদ হল কেন? এই সংশয়ের উত্তরে বৈদান্তিকেরা বলেন, ঈশ্বর যেমন অনাদি, তাঁর সৃষ্টিও অনাদি। ঈশ্বর অনাদি হতে পারেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি অনাদি হয় কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ঈশোপনিষদের শান্তি পাঠে – “ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুচ্যতে। / পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।। / ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ”।
    (সন্ধি ভাঙলে – ওঁ পূর্ণম্‌ অদঃ পূর্ণম্‌ ইদম্‌ পূর্ণাৎ পূর্ণম্‌ উচ্যতে। / পূর্ণস্য পূর্ণম্‌ আদায় পূর্ণম্‌ এব অবশিষ্যতে।। /ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।)
    অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডে নিরাকার রূপে যিনি পূর্ণ, এই জগতে সাকার রূপেও তিনি পূর্ণ, পূর্ণ থেকেই পূর্ণের সৃষ্টি, পূর্ণ থেকে পূর্ণ গ্রহণ করলেও, পূর্ণই অবশিষ্ট থাকেন। হে পরমাত্মন, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক। অর্থাৎ ব্রহ্ম এই জগতের ঊর্ধে, আবার এই জগতের সর্বত্রই তিনি ব্যাপ্ত। এই জগতের সৃষ্টি কিংবা বিনাশে তিনি কোনভাবেই প্রভাবিত হন না। [বাংলা অনুবাদ-লেখক।]

    এই পূর্ণতার সংজ্ঞা যদি অসীম (Infinity) ধরা যায়, সেক্ষেত্রে অসীম থেকে অসীম নিলেও, অবশিষ্ট অসীমই থাকেন বৈকি!

     
    চলবে...
    পঞ্চম পর্বের দ্বিতীয় ভাগ আসবে ২৪/০৮/২২ তারিখে।

    গ্রন্থ ঋণঃ
    ১. ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় – শ্রীযুক্ত অক্ষয় কুমার দত্ত।
    ২. তপোভূমি নর্মদা – প্রথম খণ্ড – শ্রী শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল
    ৩. The Six systems of Hindu Philosophy – Swami Harshananda, Ramakrishna Mission.
    ৪. The Dawn of Indian Philosophy – Swami Ghanananda – Head of the Ramkrishna Vedanta Centre, London (Chapter 18, Part III of the Cultural Heritage of India).
    ৫. ছান্দোগ্য উপনিষদ ও ঈশোপনিষদ – স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত এবং উদ্বোধন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত। গ্রন্থাংশের সরল বাংলা অনুবাদ- লেখক।  
      

    [1]  তপোভূমি নর্মদা – প্রথম খণ্ড – পৃঃ ৩৯-৪০

    [2] গীতার সরল বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ এই লেখকের “চিরসখা হে” থেকে উদ্ধৃত।

    [3] ভারতীয় দর্শনে সত্য বা সৎ বলতে truth বা honest বোঝায় না, সৎ কথার অর্থ that who exists – অতএব সৎ এবং সত্য বলতে শাশ্বত, চিরন্তন বা চিরস্থায়ী। অতএব অসৎ মানে নশ্বর, অস্থায়ী ইত্যাদি।   

    [4] ইহামুত্রফলভোগবিরাগঃ” – বেদান্তসার। 
     
  • ধারাবাহিক | ১৮ আগস্ট ২০২২ | ৩০৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Sara Man | ১৮ আগস্ট ২০২২ ২১:০২511163
  • কিশোর বাবু 
    "এই একই অনুভবের কথা আমরা ভগবান বুদ্ধের ক্ষেত্রেও শুনেছি, বোধিবৃক্ষের নীচে বসে একটি অশ্বত্থ পাতার আড়ালে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি জীবনের অনাত্মতা ও অনিত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন (অধ্যায় ৩.২.২)।" - কোন বইয়ের অধ্যায় বলছেন?
    "সামান্যপদার্থ – বস্তু বা জীবের জাতি অর্থাৎ সামান্য ধর্মকে সামান্য ধর্ম বলে।" - এই বাক্যটি নিশ্চয়ই কোন ভিন্ন পাঠ হবে। 
      
  • Kishore Ghosal | ১৮ আগস্ট ২০২২ ২১:৩৯511165
  • শারদা ম্যাম,
    বাঃ  সত্যিই বেশ মন দিয়ে পড়েছেন - অবশ্যই ভুল হয়েছে ওটা হবে "বস্তু বা জীবের জাতিগত ধর্ম অর্থাৎ তাদের সাধারণ ধর্মকে সামান্য ধর্ম বলে"। 
     
    আর অধ্যায় ৩.২.২মানে, এই "ধর্মাধর্ম" লেখাটির তৃতীয় পর্বের দ্বিতীয় ভাগের দ্বিতীয় অধ্যায়। 
     
    ভুলটা সংশোধন করে দেওয়ার  জন্যে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলাম  কিন্তু "সম্পাদনা করুন" টিপে এডিট করতে গিয়ে "বিষয়বস্তু" ফাঁকা দেখাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে আবার চেষ্টা করব। 
     
    অনেক ধন্যবাদ - এত খুঁটিয়ে পড়ার জন্যে। 
  • Sara Man | ১৯ আগস্ট ২০২২ ০৯:৩৩511176
  • আপনাকে ধন‍্যবাদ এই সিরিজটি লেখার জন‍্য।
  • Sara Man | ১৯ আগস্ট ২০২২ ১০:৪৭511178
  • কিশোর বাবু, সায়েন্স কলেজে আমাদের একজন স‍্যার বলতেন, বারো বছর পড়ালে নাকি চোখদুটো শকুনের মতো হয়ে যায়। আমার পঁচিশ বছর চলছে, তাহলেই ভাবুন, এ আমার দোষ নয়, নিয়তি। 
  • Kishore Ghosal | ১৯ আগস্ট ২০২২ ১৩:০৫511182
  • শারদা ম্যাম,
    আহা, আমার আটান্ন বছরের ছাত্রাবস্থার প্রতি আপনার পঁচিশ বছরের এমন বিদগ্ধ সংশোধনী দৃষ্টি যেন সর্বদা থাকে।   
  • Sara Man | ১৯ আগস্ট ২০২২ ১৪:২৮511183
  • হা হা, তথাস্তু, মধু বাতা ঋতায়তে, ওঁং শান্তি। 
  • kk | 2601:448:c400:9fe0:e5bf:2769:220d:2588 | ১৯ আগস্ট ২০২২ ১৯:৪০511188
  • এই সিরিজটা অসাধারণ হচ্ছে। আগে বলা হয়নি। এত ডিটেইল্ড লেখা আর এত সুন্দর প্রেজেন্টেশন! আমি ভালোভাবে মাথায় তুলে নেবার জন্য আস্তে আস্তে পড়ি। বারবার পড়ি।
  • Kishore Ghosal | ২০ আগস্ট ২০২২ ১০:১১511203
  • কেকেবাবু, আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা নেবেন।  
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে প্রতিক্রিয়া দিন