বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ধর্মাধর্ম - চতুর্থ পর্ব -  চতুর্থ ভাগ 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ২২ জুলাই ২০২২ | ২৯০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • চতুর্থ পর্ব - থেকে ১৩০০ সি.ই – চতুর্থ ভাগ

    ৪..১ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত– বিক্রমাদিত্য (৩৭৫ – ৪১৫ সি.ই.)
    তাঁর পিতামহের থেকে আলাদা পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে সাধারণতঃ বিক্রমাদিত্য বলা হত। তিনি সমুদ্রগুপ্ত ও দত্তাদেবীর পুত্র। সিংহাসনে আরোহণের পর বিক্রমাদিত্যকে সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে তেমন কিছু করতে হয়নি, কারণ তাঁর পিতা সমুদ্রগুপ্ত শক্ত হাতেই সাম্রাজ্যের সীমানা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে শুধুমাত্র পশ্চিমের বাকাতক এবং কিছু শক ক্ষত্রপ, সাম্রাজ্যের বিরক্তি উৎপাদন করছিল। বিক্রমাদিত্য বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে, বাকাতকদের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধন গড়ে তুললেন। তিনি রাণি কুবেরনাগার (নাগ রাজকুমারী) গর্ভজাতা কন্যা প্রভাবতীর সঙ্গে বাকাতক রাজা দ্বিতীয় রুদ্রসেনের বিবাহ দিয়েছিলেন। এই মৈত্রী বন্ধনের পর তাঁর সামনে শক ছাড়া আর কেউ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রইল না।

    দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নিজেই তাঁর বিপুল সৈন্যবাহিনী নিয়ে শকরাজ্য জয়ের অভিযান করেছিলেন। এই অভিযানের সময় এবং ঠিক কবে তিনি শকরাজ্য জয় করেছিলেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে পশ্চিম-ক্ষত্রপ রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহর শেষ মুদ্রাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল ৩৮৮ সি.ই.তে এবং প্রায় একই সময়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ওই অঞ্চলে তাঁর রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। অতএব ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন ওই সময়ের কাছাকাছি সময়েই পশ্চিমের শকরাজ্য দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত অধিকার করেছিলেন। শকরাজ্য জয়ের ব্যাপারে অন্যরকম এক ঘটনার আভাস দিয়েছেন বাণ, তাঁর “হর্ষচরিত” গ্রন্থে।  দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নাকি এবারেও মহিলা পরিচারিকার ছদ্মবেশে প্রমোদসভায় গিয়ে শকরাজাকে হত্যা করেছিলেন। অতএব কবি বাণের “হর্ষচরিত”, ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে কতটা বিশ্বাসযোগ্য সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

    দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের হাতে শক রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহের পরাজয়ের ফলে, গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হল, মালব যার রাজধানী উজ্জয়িনী এবং গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র। এই রাজ্যগুলি জয়ে, তাঁর সব থেকে লাভ হল, পশ্চিমের সম্পন্ন সমুদ্রবন্দরগুলি – ভৃগুকচ্ছ, সোপারা, কল্যাণ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অতএব পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবাধ বাণিজ্যের দরজাগুলি খুলে গেল। এমনকি এই অন্তর্ভুক্তিতে বণিক সম্প্রদায়েরও প্রভূত লাভ হল, তাদের একই দ্রব্যের জন্যে বিভিন্ন রাজ্যের সীমানায় বারবার আমদানি-রপ্তানি শুল্ক দেওয়ার ঝামেলা দূর হয়ে গেল। এই রাজ্য জয়ের ফলে আরও একটি লাভ হল উজ্জয়িনী শহরের অধিকার। উজ্জয়িনী তখনকার সময়ে ভারতের অন্যতম বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। পশ্চিম থেকে পূর্বে অথবা উত্তর থেকে দক্ষিণের বাণিজ্যপথের কেন্দ্র ছিল এই শহর। অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই শহর গুপ্তসাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে উঠল এবং প্রকৃত অর্থে পরবর্তী সময়ে উজ্জয়িনী, পাটলিপুত্রর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

    এই প্রসঙ্গে আরেকটি প্রত্ন-নিদর্শনের উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দিল্লির কুতব মিনারের কাছে একটি লৌহস্তম্ভ আছে, তার গায়ের লিপিতে “চন্দ্র” নামে কোন এক রাজার রাজ্য জয়ের বিবরণ আছে। সেখানে লেখা আছে রাজা “চন্দ্র” যে যে শত্রুরাজ্য অধিকার করেছিলেন, সেগুলি হল “বঙ্গ”, “তাঁর পরাক্রমের সৌরভে সুরভিত হয়েছিল দক্ষিণের সমুদ্র”, সিন্ধু অববাহিকার “সপ্ত(ব)দ্বীপের বাহ্লিক (কুষাণ)”। এই রাজা যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরা একমত নন, যদি একই হন, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শক, বঙ্গ এবং কুষাণদের জয় করে সমুদ্রগুপ্তের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের বিস্তার অনেকটাই বাড়াতে পেরেছিলেন।

    ৪.৪.১.১ ফা-হিয়েনের বিবরণ (৪০৫-৪১১ সি.ই.)
    দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের মধ্যেই বিখ্যাত চৈনিক বৌদ্ধ-সন্ন্যাসী, ফা-হিয়েন এদেশে তীর্থযাত্রায় এসেছিলেন। ফা হিয়েন চীন থেকে ভারতে এসেছিলেন স্থলপথে – ভয়ংকর গোবি মরুভূমি পার হয়ে, খোটান, পামিরের দুর্গম পাহাড়ি পথে, সোয়াৎ উপত্যকা এবং গান্ধার হয়ে। ভারতবর্ষ ও নেপালের সবগুলি প্রধান বৌদ্ধ তীর্থে - মথুরা, সংকাশ্য[1], কনৌজ, শ্রাবস্তী, কপিলাবস্তু, কুশিনগর, বৈশালি, পাটলিপুত্র, কাশি ইত্যাদি – তিনি ভ্রমণ করেছিলেন। এরপর তিনি তাম্রলিপ্তি বন্দর থেকে সমুদ্রপথে সিংহল যান এবং সেখান থেকে জাভা হয়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন।

    ফা-হিয়েন বৌদ্ধ পুঁথি পাঠ এবং সংগ্রহে এতই নিবিষ্ট ছিলেন যে, তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে, যাঁর সাম্রাজ্যে তিনি প্রায় ছ’বছর নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ালেন, সেই সম্রাট বা রাজার নামও উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা তাঁর আগের গুপ্তরাজাদের কেউই বৌদ্ধ ছিলেন না বলেই কি তিনি সম্রাটের নামোচ্চারণেও আগ্রহী হননি? তবে তাঁর লেখা থেকে বিভিন্ন শহর, তার অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ফা-হিয়েন রাজধানী পাটলিপুত্রে ছিলেন তিন বছর, এখানে তিনি সংস্কৃত শিখেছিলেন। পাটলিপুত্রে “মনোরম ও সৌম্য” দুটি বৌদ্ধ বিহার তিনি দেখেছিলেন, তাদের একটি হীনযানী এবং অন্যটি মহাযানী। দুটিতেই ছ’শ থেকে সাতশ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বসবাস করত। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে আসত শিক্ষালাভের জন্যে। সম্রাট অশোকের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল এই স্থাপত্য অসাধারণ কোন শিল্পী মানবের নির্মাণ। মগধের সমসাময়িক সম্পদ এবং সমৃদ্ধি দেখেও তিনি অভিভূত হয়েছিলেন, সেখানকার অধিবাসীদের প্রশংসায় তিনি লিখেছেন, “এখানকার অধিবাসীরা পরোপকার এবং ধার্মিকতার জন্যে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে থাকে”! আরও লিখেছেন শহরের বণিকসম্প্রদায় চমৎকার একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে দরিদ্র এবং দুঃস্থ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সেবা দান করা হত।

    ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে সামাজিক পরিস্থিতির কিছু কিছু চিত্র পাওয়া যায়। যেমন মধ্যদেশের শহরগুলির বাসিন্দারা অধিকাংশই নিরামিষাশী এবং অহিংস মতে বিশ্বাসী, শহরের বাজারে তিনি কোন কসাইখানা বা মদের দোকান দেখেননি, নগরবাসী শূকর বা মুরগী পুষত না, পেঁয়াজ-রসুন খেত না, মদ্যপান করত না। তবে চণ্ডালরা শিকার করত এবং মাংসের ব্যবসা করত। তারা শহরের বাইরে বাস করত এবং যখনই তারা শহরে ঢুকত, কাঠের ঘণ্টা বাজিয়ে সকলকে সতর্ক করে দেওয়া হত – কেউ যেন তাদের ছুঁয়ে না ফেলে! এই বিবরণ হয়তো আংশিক সত্য, কারণ তিনি নিজে বিদেশী এবং বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী– অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বৌদ্ধবিহারেই থাকতেন এবং তাঁর এদেশীয় সঙ্গী-সাথিরাও সকলেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন, অতএব তাঁর কাছে বৌদ্ধ আচরণগুলিই স্পষ্ট ধরা দিয়েছে। তবে অস্পৃশ্য চণ্ডালের বিবরণের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

    ৪.৪.২ গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক পরিকাঠামো
    রাজা চন্দ্রগুপ্ত (২য়) মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ এবং সহায়তায় সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। এই মন্ত্রীপরিষদ নাগরিক এবং সামরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এবং এই মন্ত্রীপরিষদের অনেককেই যুদ্ধক্ষেত্রেও উপস্থিত থাকতে হত। সমগ্র সাম্রাজ্যকে প্রশাসনিক সুবিধের জন্যে অনেকগুলি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল, যাদের “দেশ” বা “ভুক্তি” বলা হত। এই ভুক্তির প্রশাসকদের বলা হত উপরিক মহারাজা বা গোপ্তা। সাধারণতঃ, এই প্রশাসনের প্রধান হতেন রাজপুত্র বা রাজবংশের লোকরা। প্রত্যেকটি ভুক্তিকে অনেকগুলি জেলায় ভাগ করা হত, যাদের বলা হত “বিষয়”। বিষয়গুলির প্রশাসকদের মধ্যে থাকতেন, কুমারামাত্য (রাজকুমারদের মন্ত্রী), মহাদণ্ডনায়ক (প্রধান বিচারক), বিনয়স্থিতিস্থাপক (পৌরনিগম?), মহা-প্রতিহার (গৃহমন্ত্রক), ভতাশ্বপতি (সেনানায়ক?), দণ্ডপাশাধিকরণ (পুলিশ প্রধান) ইত্যাদি। প্রতিটি “বিষয়”-এর প্রধানকে “বিষয়পতি” বলা হত এবং তাঁর দায়িত্ব ছিল মহারাজা বা গোপ্তার কাছে জবাবদিহি করা। বিষয়পতি যেখানে থাকতেন তাকে “অধিস্থান” বলা হত, এবং তাঁর কার্যালয়ের নাম ছিল “অধিকরণ”। বিষয়পতিকে সহায়তা করতেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, তাঁদের মধ্যে বণিকসমবায় বা গিল্ড (Guild)-এর প্রধান বা ব্যাংকার (“নগর-শ্রেষ্ঠীন্‌”), প্রধান ব্যবসায়ীরা (“সার্থবাহ”), প্রধান শিল্পী (“প্রথম কুলিক”) এবং প্রধান হিসাবরক্ষক (“প্রথম কায়স্থ”)। আরও এক গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকের নাম পাওয়া যায় “পুস্তপাল”- যাঁর দায়িত্ব ছিল যাবতীয় জমি-জায়গার নথিপত্র তৈরি করা এবং সুরক্ষিত রাখা। প্রশাসনের নিম্নতম একক ছিল গ্রাম, গ্রামের প্রধানকে বলা হত “গ্রামিক”। তিনি গ্রামের বৃদ্ধ (“গ্রামবৃদ্ধ”) এবং অভিজ্ঞ মানুষদের নিয়ে গড়া “পঞ্চমণ্ডলী” বা “পঞ্চায়েত”-এর মতামত নিয়ে গ্রামের প্রশাসন পরিচালনা করতেন।

    ৪.৪.৩ গুপ্তবংশের অন্যান্য রাজা
    দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত (৪১৫–৪৫৫ সি.ই.)। তাঁর উপাধি ছিল মহেন্দ্রাদিত্য। কুমারগুপ্ত ছিলেন চন্দ্রগুপ্তের দ্বিতীয় রানি ধ্রুবদেবীর পুত্র। তিনি দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। অতএব ধরে নেওয়া যায় তাঁর সময় বড়োসড়ো যুদ্ধ-বিগ্রহ তেমন কিছু ঘটেনি, যদিও তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে অর্থাৎ পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই, মধ্য এশিয়ায় ঘনিয়ে উঠল গুপ্তসাম্রাজ্যের বিপদের মেঘ।

    হুন নামে এক যাযাবর গোষ্ঠী মধ্য এশিয়ার ব্যাকট্রিয়া অধিকার করে ফেলল। এই হুনদের দুটি গোষ্ঠীর কথা ইতিহাসে শোনা যায়, শ্বেতহুন এবং পীতহুন। শ্বেতহুনদের আক্রমণে রোম শহর এবং সাম্রাজ্যের পতন এবং ধ্বংস হয়েছিল। এই শ্বেতহুনদের নেতা বা রাজা ছিল অ্যাটিলা। অন্যদিকে পীতহুনরা ভয়ংকর বন্যার মতো এগিয়ে আসতে লাগল উত্তরপশ্চিম ভারতের গিরিপথে। এই হুনজাতি ছিল দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার এবং যোদ্ধা, তাদের নৃশংসতার কথা বিশ্বের ইতিহাস মনে রেখেছে।
     
    কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর স্কন্দগুপ্ত রাজা হলেন ৪৫৫ সি.ই.-তে এবং রাজা হয়েই তাঁকে হুনদের সম্মুখীন হতে হল। প্রথমদিকে স্কন্দগুপ্ত হুনদের আক্রমণ শক্ত হাতেই প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু হুনদের ঘনঘন এবং বারবার আক্রমণে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন, তাঁর রাজত্বের অধিকাংশ সময়ই কাটতে লাগল সীমান্ত অঞ্চলে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হুণদের সামলাতে। রাজধানীতে তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে, দুর্বল হতে লাগল গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসন, বেড়ে উঠতে লাগল রাজধানী এবং+ রাজপ্রাসাদের ষড়যন্ত্র। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ল, যার প্রমাণ পাওয়া যায় এই সময়ের তাঁদের মুদ্রার অবনতি দেখে। ৪৬৭ সি.ই. পর্যন্ত তিনি হুনদের ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন, কিন্তু ওই সময় তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন শুরু হল দ্রুতগতিতে। স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী গুপ্তরাজাদের কথা তেমন স্পষ্টভাবে জানা যায় না। তবে পঞ্চম শতাব্দীর শেষ দিকে হুনদের ভয়ংকর আক্রমণে গুপ্তরাজাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল এবং হুনরা ঢুকে পড়ল উত্তরভারতে। এর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই গুপ্তসাম্রাজ্য মুছে গিয়ে, দেশজুড়ে গড়ে উঠল ছোট ছোট রাজ্য।
     
    প্রথম যে হুন রাজার নাম ভারতের ইতিহাসে পাওয়া যায় তাঁর নাম তোরমান, তাঁর রাজ্য ছিল পশ্চিমে পারস্য থেকে খোটান এবং তাঁর রাজধানী ছিল আফগানিস্তানের বামিয়ানে। এই তোরমান উত্তরভারতে এবং মধ্য ভারতের এরান (মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার প্রাচীন শহর) পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছিলেন। তোরমানের পুত্র মিহিরকুলও (৫২০ সি.ই.) হুনদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। সমসাময়িক এক চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, মিহিরকুল ছিলেন অভদ্র এবং বদমেজাজী। তিনি মূর্তিপূজা বিরোধী এবং তীব্র বৌদ্ধ বিরোধী ছিলেন। তিনি অনেক বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করেছিলেন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যা করেছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক কলহন তাঁর “রাজতরঙ্গিণী” গ্রন্থে লিখেছেন, লোভী ব্রাহ্মণরা নাকি হুনদের থেকে প্রচুর জমি দান হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।
     
    যাই হোক, মধ্য ভারতের সমসাময়িক শিলালেখ থেকে জানা যায় পরবর্তী গুপ্ত রাজারা কিন্তু তখনও হুনদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে, আবার আক্রমণের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের আক্রমণে মিহিরকুল পরাস্ত হন এবং ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলের অধিকার ছেড়ে, কাশ্মীরের ছোট এক রাজ্যে স্থিতু হয়েছিলেন, এবং সেখানেই ৫৪২ সি.ই.-তে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই হুনদের দাপট অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত হুনদের নতুন নতুন গোষ্ঠী ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে একটানা অশান্তির সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। এই সময়েই হুণদের ব্যাকট্রিয়া থেকে উৎখাত করল তুর্কি এবং পারস্যের সাসানিয়ানরা। পরবর্তী কালে তুর্কিরা পারস্যও জয় করে নিল। এর ফলে উত্তরভারত হুনদের থেকে পরিত্রাণ পেল ঠিকই, কিন্তু আক্রমণের নতুন মেঘ আবার ঘনিয়ে উঠতে লাগল উত্তর-পশ্চিম আকাশে। এর কয়েকশ বছর পর থেকে ভারত টের পাবে, তুর্কিদের প্রবল আক্রমণের ক্রমাগত ধাক্কা।  

    ৪.৪.৪ গুপ্ত রাজাদের ধর্ম
    গুপ্তবংশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম চন্দ্রগুপ্তর মুদ্রায় সিংহবাহিনী দেবী মূর্তির চিত্র মুদ্রিত ছিল। হতে পারে তিনি হয়তো লিচ্ছবি-রাণি কুমারদেবীর প্রভাবে সিংবাহিনীদেবীর ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। অতএব মাতৃকা দেবী হিসেবে “সিংহবাহিনী দেবী” ততদিনে পূজিত হচ্ছেন। সমুদ্রগুপ্ত নিজেকে “পরমভাগবত” বলে উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন “পরমভাগবত”। তবে গুপ্তরাজাদের কেউই পরধর্মে বিদ্বেষী ছিলেন না। শিলালিপিগুলি থেকে জানা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের দুই উচ্চপর্যায়ের আধিকারিক সাব-বীরসেনা শৈব ছিলেন এবং আম্রকারদাব ছিলেন বৌদ্ধ। রাজা কুমারগুপ্ত ছিলেন কার্তিকেয়র উপাসক। অনুমান করা যায় এই কারণেই তাঁর প্রিয় পুত্রেরও নাম রেখেছিলেন স্কন্দ, কার্তিকেয়র আরেকটি নাম। তাঁর রাজত্বকালে তিনি বেশ কিছু বুদ্ধ, পার্শ্বনাথ, সূর্য, শিব, বিষ্ণু এবং কার্তিকেয়র মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। অতএব তিনিও গুপ্ত পরম্পরা অনুযায়ী ধর্ম-সহিষ্ণু ছিলেন। অর্থাৎ সমসাময়িক সব কটি ধর্মীয় বিশ্বাসকেই তিনি যথাযথ সম্মান দিয়েছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী সম্রাট স্কন্দগুপ্ত বৈষ্ণব ছিলেন।

    ৪.৪.৫ গুপ্ত পরবর্তী পর্যায় ও হর্ষবর্ধন
    গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সপ্তম শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত উত্তর ভারতে চারটি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব ছিল। তাঁরা হলেন, মগধের গুপ্ত (অনেক ঐতিহাসিক এই গুপ্তদের গুপ্তবংশেরই উত্তরসূরি বলেন, অনেকে বলেন এঁরা আলাদা বংশ), কনৌজের মৌখরি, থানেশ্বরের পূষ্যভূতি এবং বল্লভির মৈত্রক। পূষ্যভূতি বংশের থানেশ্বর ছিল দিল্লির উত্তরে, এখনকার হরিয়ানা অঞ্চলে। মৌখরি বংশের সঙ্গে পূষ্যভূতিদের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল এবং দুই বংশের বৈবাহিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। যার ফলে মৌখরি বংশের শেষ রাজার মৃত্যুর পর মৌখরিদের রাজ্য কনৌজ পূষ্যভূতিদের অধিকারে চলে এসেছিল। অন্যদিকে মৈত্রকরা ছিলেন সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের গুপ্তরাজাদের প্রশাসনিক প্রধান। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর তাঁরা স্বাধীন হয়ে ওই অঞ্চলেই নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল বল্লভিতে (আধুনিক ভাবনগর শহরের কাছাকাছি)। একসময় এই বল্লভি নগর বাণিজ্য এবং শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই চারটি রাজ্য ছাড়াও উড়িষ্যা, আসাম এবং আরো অনেক অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্যও গড়ে উঠেছিল। এই সব রাজ্যগুলির মধ্যে একমাত্র মৈত্রক বংশই দীর্ঘদিন রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি আরব উপজাতিদের আক্রমণের ফলে, বল্লভি রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করেছিল।

    পূষ্যভূতি বংশের প্রথম শক্তিশালী রাজার নাম পাওয়া যায় প্রভাকরবর্ধন। বাণভট্টের হর্ষচরিতে, তাঁর বীরত্বের অতিরঞ্জিত বর্ণনা পাওয়া গেলেও, তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন, তাঁর ছেলে হর্ষবর্ধন। সাধারণতঃ তিনি হর্ষ নামেই ইতিহাসে সমধিক পরিচিত।

    ৪.৪.৬ সম্রাট হর্ষবর্ধন
    হর্ষের রাজত্বকালের শুরু ৬০৬ সি.ই.-তে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কবি বাণভট্ট “হর্ষ-চরিত” নামে তাঁর জীবনী রচনা করেছিলেন। ভারতের ইতিহাসে কোন রাজার জীবনী নিয়ে লেখা এই গ্রন্থই প্রথম। এর পরের রাজাদের মধ্যে এরকম জীবন-চরিত রচনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল বললেও কম বলা হয়। কিন্তু তাদের তুলনায়, ঐতিহাসিক অতিরঞ্জন থাকলেও, কাব্য গুণে “হর্ষচরিত” সবার উপরে।

    হর্ষ একচল্লিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং এই পর্যায়ে তিনি অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্য জয় করে নিজের সাম্রাজ্য বাড়াতে পেরেছিলেন। যেমন, জলন্ধর (পাঞ্জাব), কাশ্মীর, নেপাল এবং বল্লভি রাজ্যেরও কিছুটা। পূর্বদিকে বঙ্গের রাজা শশাঙ্ক তাঁর চিরশত্রু ছিল এবং দক্ষিণেও তিনি তেমন সুবিধে করতে পারেননি। দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমে চালুক্যবংশীয় দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন এবং এর পর দক্ষিণ জয়ের চেষ্টা তিনি ছেড়েই দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর রাজধানী থানেশ্বর থেকে সরিয়ে কনৌজে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর কারণ হয়তো অনেকগুলি, প্রথমতঃ উত্তর-পশ্চিমের উপজাতিগোষ্ঠীগুলির বারবার আক্রমণ এড়ানো। দ্বিতীয়তঃ কনৌজ থানেশ্বরের তুলনায় কৃষি উৎপাদনে অনেক বেশি উর্বর। এবং হয়তো সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল - কনৌজ থেকে তাঁর সাম্রাজ্যের চারদিকেই স্থলপথে এবং জলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনেক প্রাচীন এবং উন্নত।
     
    যুদ্ধ-বিগ্রহ না থাকলে হর্ষ তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন এবং প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসনিক বিষয় এবং কর আদায়ের ব্যাপারেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তিনি অনেকসময় সরাসরি সাধারণ প্রজাদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদের অভিযোগ মন দিয়ে শুনতেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিতেন, কখনো কখনো তিনি দুঃস্থ প্রজাদের দানও করতেন। শোনা যায় পাঁচ বছর অন্তর তিনি একটি ধর্ম-উৎসবের আয়োজন করতেন, এবং সেখানে অজস্র দান করতেন। তাঁর রাজত্বকালে (৬৪৩ সি.ই.-তে) কনৌজ শহরে একটি বৌদ্ধ সম্মেলনের তিনিই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।   

    এত ব্যস্ততার মধ্যেও শোনা যায় তিনি নাকি তিনটি নাটকের রচয়িতা। তার মধ্যে দুটি নাটক প্রথাগত মিলনান্ত নাটক এবং একটি বুদ্ধের তত্ত্ব নিয়ে চিন্তামূলক নাটক। যদিও এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে, তাঁরা বলেন এই নাটকগুলি হয়তো তাঁর লেখা নয়, তাঁর নামে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর কোন ভক্ত নাট্যকার। যাই হোক, এর থেকে এটুকু স্পষ্ট ধারণা করা যায়, তিনি সাহিত্য এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং উৎসাহীও ছিলেন।

    হর্ষের রাজত্বের অনেক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়, বাণভট্ট রচিত “হর্ষচরিত” থেকে। হর্ষচরিতে বেশ কিছুটা কাব্যিক অতিরঞ্জন থাকলেও, সমসাময়িক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার হদিশ পাওয়া যায়। হর্ষচরিতের থেকেও সমসাময়িক ঘটনার নিখুঁত বিবরণ পাওয়া যায় বিখ্যাত এক চৈনিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকে। তিনি হলেন হুয়েনসাং বা জুয়ানজুয়াং। হুয়েনসাং অত্যন্ত পণ্ডিত এবং প্রজ্ঞাবান ছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে জানা যায়, তিনি চীনের এক মান্দারিন পরিবারের ছেলে এবং প্রথম জীবনে কনফুসিয়াসের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি অত্যন্ত উৎসাহী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন শুধুমাত্র তীর্থ ভ্রমণের জন্য নয়, বরং বৌদ্ধ শাস্ত্র পড়তে এবং বৌদ্ধ শাস্ত্রের অনুলিপি সংগ্রহ করতে। তাঁর লিখিত বিবরণ, তাঁর পূর্ববর্তী চৈনিক সন্ন্যাসী ফাহিয়েনের মতো, একপেশে বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা নয়।

    হর্ষের রাজত্বের শেষ দিকের ঘটনাগুলিও চৈনিক বিবরণ থেকেই জানা যায়। হর্ষের সমসাময়িক চীনের তাং সাম্রাজ্যের সম্রাট তাই সুং, হর্ষের রাজসভায় দুবার রাজদূত পাঠিয়েছিলেন - একবার ৬৪৩ সি.ই.তে আরেকবার ৬৪৭ সি.ই.তে। কিন্তু দ্বিতীয় রাজদূত কনৌজে এসে পৌঁছোনোর কিছুদিন আগেই হর্ষের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় তাঁর সিংহাসন অধিকার করেছিলেন কোন এক অযোগ্য এবং অপদার্থ রাজা। হর্ষের গুণমুগ্ধ সেই চৈনিক রাজদূত এই অনাচার সহ্য করতে না পেরে, নেপাল এবং আসামে গিয়েছিলেন, সামরিক সাহায্য এবং সৈন্যসংগ্রহ করতে। নেপাল ও আসাম ছিল হর্ষের মিত্র রাজ্য। এই মিলিত শক্তি দিয়ে তিনি সেই অপদার্থ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করতে পেরেছিলেন এবং রাজাকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিলেন চীনে।

    যাই হোক হর্ষের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এবং অষ্টম শতাব্দীতে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন রাজা ললিতাদিত্য।

    ৪.৪.৬.১ হর্ষের ধর্ম
    শোনা যায় হর্ষের পিতা ও পূর্বপুরুষেরা সূর্যের উপাসক ছিলেন, কিন্তু হর্ষ ছিলেন পরম শৈব। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর ভগ্নী রাজ্যশ্রীর প্রভাবে তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষার পর তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর সাম্রাজ্য জুড়ে অনেক বৌদ্ধ বিহার ও স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলেন।

    ৪.৪.৭ সামাজিক পরিবর্তন - সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা
    এর আগে মৌর্য যুগের পর থেকে খ্রিষ্টিয় প্রথম দুই-তিন শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কিছু আলোচনা করেছিলাম। ভারত ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায়ে যাবার আগে, ভারতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও একবার আলোচনা করে নেওয়া যাক। কারণ গুপ্ত যুগের শুরু থেকে হর্ষ-যুগের শেষ পর্যন্ত – প্রায় চারশ বছর মূল ভারত ভূখণ্ডের অধিকাংশ অঞ্চলই সুশাসনে বেশ স্থিতাবস্থার মধ্যেই ছিল। তাছাড়া এই পর্যায়ে ইতিহাস রচনার উপাদানের এতই প্রাচুর্য যে তার থেকে সমসাময়িক ভারতের সামগ্রিক রূপটি বেশ সহজেই ধারণা করা যায়।   

    ৪.৪.৮.১ পোষাক আশাক ও ফ্যাসান
    সেকালের পুরুষেরা নিম্নাঙ্গে পরতেন ধুতি এবং গায়ে উত্তরীয়। ধুতি পরার নানান ধরণ ছিল, উত্তর ভারতে ধুতির কাছা ছিল আবশ্যিক এবং দক্ষিণে কোমরে জড়িয়ে রাখার নিয়ম। দরিদ্র বা সাধারণ গ্রাম্য মানুষের সাদা ধুতি হাঁটু অব্দি লম্বা হত, ধনী, সম্পন্ন এবং রাজা-রাজড়াদের হত গোড়ালি পর্যন্ত। ধনী ব্যক্তিরা নানান রঙের ধুতি পরতেন, যেমন নন্দ রাজপুত্র শ্রীকৃষ্ণ সর্বদাই পীতাম্বর পরতেন। স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ মানুষের ধুতি সুতির হলেও, ধনীদের রেশম, মসলিন বা উত্তম সূতির বস্ত্রই পরিধেয় ছিল। পুরুষদের মধ্যে অন্তর্বাস পরার প্রচলন ছিল না। শীতকালে পুরুষেরা গায়ে জড়াত পশমের বা মোটা সুতোর চাদর। তবে হিমালয়ের কাছাকাছি এবং শীতপ্রধান অঞ্চলে, পশমের জ্যাকেট যার নাম ছিল “প্রাবার”-এর প্রচলন ছিল। পুরুষদের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও সন্ন্যাসীরা মাথা মুড়িয়ে ফেলতেন, অবিশ্যি ব্রাহ্মণদের মাথার পিছনে একগুচ্ছ টিকি বা শিখা থাকত। তবে সাধারণ সম্পন্ন গৃহস্থ যুবকেরা তৈলাক্ত ও পরিপাটি লম্বা চুল রাখতেই পছন্দ করত। সম্পন্ন পুরুষদের মধ্যে সোনার অলংকার পরারও যথেষ্ট প্রচলন ছিল। কানে কুণ্ডল, আঙুলে আংটি বা উর্ধবাহুতে অঙ্গদ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অলংকার সাধারণতঃ সোনা বা রূপোর এবং সঙ্গে থাকত নানান ধরণের দামি পাথর বা রত্ন।

    মেয়েদের প্রধান পোশাক ছিল শাড়ি। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী মোটা সুতি, দুকূল, রেশম বা মসলিনের শাড়ির প্রচলন ছিল সর্বাধিক। তবে পশ্চিম এবং উত্তরপশ্চিম ভারতের সীমিত অঞ্চলে, মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের প্রভাবে মেয়েরা ঘাঘরা এবং চোলি ব্যবহার করত। শহরের উচ্চবিত্ত মহিলাদের মধ্যে অন্তর্বাসের প্রচলন ছিল।   নর্তকী এবং বারাঙ্গনারা দামি রেশম বা মসলিনের অর্ধস্বচ্ছ শাড়ি পরত এবং বক্ষে বাঁধত কঞ্চুক বা কাঁচুলি। সাধারণ জনসমাজে মহিলাদের অন্তর্বাস পরার কোন প্রচলন ছিল না। সাধ্য অনুযায়ী সুতি বা পশমের চাদরই   ছিল মহলাদের শীত নিবারণের উপায়।

    মেয়েদের অলংকারের কোন সীমা ছিল না। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী অলংকারের বহুল প্রচলন ছিল।  মাথার খোঁপায়, সিঁথিতে, অথবা চুলের বেণীতে সোনা এবং রূপার বিচিত্র অলংকারের ব্যবহার ছিল। তেমনি ছিল, নাকে, কানে, আঙুলের আংটি, হাতের বালা, বাজুবন্ধ, বাহুবন্ধ, অজস্র ধরনের কণ্ঠহার, কোমরের অলংকার এবং নিতম্বসজ্জার অলংকার, তাছাড়া পায়েরও নানান অলংকার। তবে সাধারণতঃ পায়ের পাতা বা গোছে সোনার অলংকার ব্যবহার হত না, রূপো বা পেতলের নূপুর, মল, চুটকি ব্যবহার হত। অত্যন্ত মহার্ঘ এবং মর্যাদার ধাতু হিসেবে সোনার সম্মান ছিল রূপোর অনেক উপরে। সোনার অলংকারের সঙ্গে বহুল ব্যবহৃত হত নানা ধরনের দামি পাথর, মণি এবং মুক্তা। সোনার অলংকার ছাড়াও ফুলের মালা দিয়ে অঙ্গসজ্জার প্রচলন ছিল, ফুলের মালা জড়িয়ে রাখা হত, মাথার খোঁপায় বা মুক্ত বেণীতে। 

    মেয়েদের অঙ্গরাগ বা প্রসাধনের মধ্যে ছিল চন্দন, সিঁদুর, কাজল বা অঞ্জন, কুমকুম, গোরোচনা, পুষ্পরেণু। চন্দনের প্রলেপ সারা গায়েই মাখা হত, তার সুগন্ধের জন্যে এবং গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শরীরকে শীতল রাখতে। সিঁদুর ও কুমকুমের টিপ কপালে পরা হত। পূর্বভারতীয় মেয়েদের মধ্যে কাঁচপোকা[2]র টিপ পরারও বহুল প্রচলন ছিল।  চোখের পল্লবে এবং কোলে গভীর কাজলরেখায় অঙ্কিত কটাক্ষ-বাণ পুরুষ-হৃদয় ভেদ করার মোক্ষম উপায় ছিল। হলুদ গোরোচনা[3] কণিকার বিন্দু দিয়ে সাজিয়ে তোলা হত চিবুক এবং দুই গাল। ফুলের সৌরভময় পরাগ-রেণুতেও রাঙিয়ে তুলত, চিবুক, গাল, ও গ্রীবা।   হাত ও পায়ের আঙুলগুলি অলক্তক বা আলতার রঙে রাঙিয়ে তুলত মেয়েরা। এই আলতা ছিল এক ধরনের গাছের লালরস। ঠোঁট রাঙিয়ে তুলত তাম্বুল অর্থাৎ পান-খয়েরের রসে। নর্তকী এবং বারাঙ্গনা সুন্দরীরা দুধের সঙ্গে আলতা মিশিয়ে, গোলাপি আভায় সাজিয়ে তুলতেন তাঁদের পীন পয়োধর এবং গুরু নিতম্ব।

    ৪.৪.৮.২ খাদ্য ও পানীয়
    প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বৈদিক যুগ পর্যন্ত মাংস খাওয়ার বহুল প্রচলন ছিল। এই মাংসের মধ্যে গৃহপালিত সকল পশু, এমনকি জঙ্গলের পশু, নানা ধরনের পাখি এবং মাছেরও প্রচলন ছিল। নিরামিষ আহারের প্রবণতা বেড়েছে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব থেকে এবং অবশ্যই সম্রাট অশোকের সময়ে। তিনি প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, সেকথা আগেই বলেছি। যদিও “অর্থশাস্ত্র”-এ প্রাণীহত্যা এবং নগরের কসাইখানাগুলির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্যে নিয়মিত নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। মহাযানীয় বৌদ্ধ ধর্ম এবং পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম প্রচলনের সময় থেকে নিরামিষ আহারের প্রবণতা ব্যাপক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

    প্রধান খাদ্যে আজকের ভারতীয় খাবারের থেকে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। ভাত এবং গম, যব কিংবা জোয়ারের রুটি, নানান ধরনের ডাল, সব্জিই প্রধান খাদ্য ছিল। তার সঙ্গে ছিল নানা ধরনের তেল এবং অবশ্যই ঘি, দুধ, দই, মাখন। ফল এবং মিষ্টান্নও ছিল বহুবিধ। যে যে মশলা প্রধানতঃ বিদেশে রপ্তানি হত, যেমন গোলমরিচ, তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জয়িত্রি, জায়ফল ছাড়াও হলুদ, ধনে, জিরে, সরষে, আদা, পেঁয়াজ, রসুনের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। যদিও বৌদ্ধ মহাযানী এবং হিন্দু ধর্মের সময় পেঁয়াজ, রসুন ব্যবহারে কিছুটা লাগাম পড়েছিল।    

    প্রাচীন এবং বৈদিক যুগে মদ্যপানের বহুল প্রচলন ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যজ্ঞের আয়োজনে সোমরস পানের রীতি আবশ্যিক ছিল এবং দেবরাজ ইন্দ্র যে মাত্রাতিরিক্ত সোম পান করতেন, সে কথাও জানা যাবে পঞ্চম পর্বে। বৌদ্ধধর্মে মদ্যপানকে পাপ বলা হয়েছে। তবে অর্থশাস্ত্র বিভিন্ন ধরনের মদ্যের বিবরণ দিয়ে বলেছেন, সরকারি পরিশ্রুতাগারেই মদ্য প্রস্তুত হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার কারণ তিনটি – মদ্যের শুদ্ধতা রক্ষা, মদ্যপানের নিয়ন্ত্রণ এবং সরাসরি রাজস্ব আদায়। এই মদ্যের মধ্যে ছিল চাল থেকে বানানো মদ্য “মেদক”, ময়দা থেকে বানানো, “প্রসন্না”, বেল থেকে বানানো “আসব”, গুড় থেকে বানানো “মৈরেয়” এবং আম থেকে বানানো “সহকারসুরা”। পূর্ব ভারতে মধু থেকে বানানো হত “মাধ্বী”, ঝোলাগুড় থেকে “গৌড়ী” এবং চাল থেকে বানানো হত “পৈষ্টি”। দক্ষিণ ভারতে তাল ও নারকেলের রস থেকে “তড্ডি” বা “তাড্ডি” (তাড়ি) মদ্য বানানো হত।

    ৪.৪.৯ সমাজ ও অর্থনীতি
    বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সমাজের শাস্ত্রীয় মতে যদিও মূলমন্ত্র ছিল অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগ, কিন্তু বাস্তব সমাজে তার প্রচলন ছিল বলে মনে হয় না। আড়ম্বর করার মতো অর্থনৈতিক সাধ্য যাদের ছিল না, তারাই বাধ্য হয়েই অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগের মন্ত্র মেনে চলত, অর্থাৎ সমাজের নিম্নস্তরের মানুষেরা। শাস্ত্র রচয়িতা ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রেণী যজ্ঞের আয়োজন করে, রাজাদের থেকে দানগ্রহণ করে প্রভূত সম্পদের অধিকারী এবং রীতিমতো বিত্তশালী হয়ে উঠতেন। তাছাড়াও ব্রাহ্মণশ্রেণি রাজকর্মচারী পদে এমনকি বাণিজ্য করেও যথেষ্ট সম্পদশালী হয়ে উঠতেন। অতএব, ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা পরবর্তী হিন্দু ধর্মে যে চতুর্বর্গ অর্থাৎ জীবনের চারটি লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – তাদের মধ্যে অর্থ উপার্জনেই বেশি নজর ছিল।

    প্রাথমিক ব্রাহ্মণ্য সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের অবস্থানের কথা আগেই বলেছি। কিন্তু পরবর্তী কালে অক্ষত্রিয় এবং শূদ্র রাজাদের আমলে সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের প্রভাব এবং সম্মান যথেষ্ট বেড়ে উঠেছিল। তার কারণ অবশ্য নিবিড় বৈদেশিক এবং আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য। বিশেষ করে মৌর্য আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষ যখন একই প্রশাসনিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল, সেসময় বিভিন্ন অঞ্চলের দক্ষ কারিগর ও শিল্পী এমনকি কৃষকরাও তাদের পরিশ্রম বা দক্ষতার যোগ্য মূল্য পেতে শুরু করেছিল। যার ফলে সৃষ্টি হল দক্ষ শূদ্র কারিগরদের বিভিন্ন জাতি। যেমন, স্বর্ণকার, মণিকার, তন্তুকার, তৈলকার, কর্মকার, সূত্রধর, স্থপতি, ভাস্কর, এমন বহু জাতি। গোপ ও আহির - যারা গোপালন করত এবং দুধ ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত দ্রব্যের বাণিজ্য করত। সম্পন্ন কৃষিজীবিরা আগেই বৈশ্য ছিলেন এখন তাঁদের মধ্যেও নানান বিশেষজ্ঞ (Specialist) জাতির উদ্ভব হল, যেমন যাঁরা রেশমের গুটি কিংবা সুপুরি বা পানের চাষ করতেন। এই চাষের উৎপাদন ছিল সরাসরি বাণিজ্যিক (cash crop)। সমাজে আরেকটি জাতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন – তাঁরা হলেন নাপিত। হিন্দু সমাজের নানান অনুষ্ঠানে নাপিতের গুরুত্ব তখন এবং আজও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

    মৌর্যদের সময় থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের কাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সেই বাণিজ্যের ফলে, দেশে প্রভূত সম্পদের আমদানি হচ্ছিল, রাজ্য এবং সাম্রাজ্যগুলির রাজস্ব আয়ের বড়ো অংশ আসত এই বাণিজ্য থেকে। আগেই বলেছি, এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত বণিক সম্প্রদায় এবং শ্রেষ্ঠী সমিতিগুলি। রাজ্যের রাজনীতি এবং প্রশাসনেও তাঁদের প্রভাব কিছু কম ছিল না। অতএব তাঁদের বর্ণ বৈশ্য হলেও, সামাজিক অবস্থানে তাঁরা ক্ষত্রিয়ের সমতুল্যই হয়ে উঠলেন।

    অতএব চতুর্বর্ণের একমাত্রিক বর্ণের সমাজ এখন হয়ে উঠল বহুমাত্রিক জটিল সামাজিক বিন্যাস। এর সঙ্গে মানানসই করে সামাজিক বিধি-বিধানেও অনেক আপোষ করতে হল, নতুন নিয়ম বানিয়ে তুলতে হল বারবার।

    সমাজে মহিলাদের অবস্থান সম্পর্কে খুব প্রত্যক্ষ আভাস তেমন পাওয়া যায় না। যদিও ব্রাহ্মণ্যধর্মে বা স্মৃতিশাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল, মহিলারা সর্বদাই পুরুষ-নির্ভর। বাল্যাবস্থা পর্যন্ত তাঁরা পিতার অধীন, বিবাহের পর স্বামীর এবং বার্ধক্যে তাঁদের পুত্রের অধীন থাকতে হবে। তবে মহিলারা অন্তঃপুরবাসিনী পর্দানশীন ছিলেন এমনও মনে হয় না। নানান সাহিত্যে, চিত্রকলায় মহিলাদের যে বর্ণনা বা চিত্র পাওয়া যায়, আচরণে বা জীবনযাত্রায় তাঁরা হয়তো মোটামুটি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। বহু উচ্চবংশীয় মহিলাই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে বৌদ্ধ সংঘে যোগ দিয়েছিলেন, একথা আমরা আগেই দেখেছি। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলনও ছিল বোঝা যায়। অনেক উচ্চশিক্ষিতা ব্রাহ্মণ্য মহিলাদেরও নাম পাওয়া যায়, তার মধ্যে বৃহদারণ্যক উপনিষদের “গার্গী”ই হয়তো ছিলেন অন্যতমা। তিনি ঋষি গর্গবংশীয়া, তাঁর পিতার নাম বাচক্‌নু। ব্রহ্ম প্রসঙ্গে তাঁর ও যাজ্ঞবল্ক্যের তর্কের ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহদারণ্যকের তৃতীয় অধ্যায়ের ষষ্ঠ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতি থেকে দেখে নেওয়া যাক, -
    “তারপর গার্গী, বচক্‌নুর কন্যা, জিজ্ঞাসা করলেন, “যাজ্ঞবল্ক্য, জগতের সবকিছুই যদি জলের সঙ্গে ওতপ্রোত[4] জড়িত থাকে, তাহলে জল কার সঙ্গে জড়িত?”
    “বায়ুর সঙ্গে, গার্গি”।
    “তাহলে বায়ু কার সঙ্গে জড়িত?”         “আকাশের সঙ্গে, গার্গি”।
    “তাহলে আকাশ কার সঙ্গে জড়িত?”       “গন্ধর্বলোকের সঙ্গে, গার্গি”।
    “কিন্তু গন্ধর্বদের জগত কার সঙ্গে জড়িত?” “সূর্যের সঙ্গে, গার্গি”।
    “তাহলে সূর্য কার সঙ্গে জড়িত?”          “চন্দ্রের সঙ্গে, গার্গি”।
    “কিন্তু চন্দ্র কার সঙ্গে জড়িত?”            “নক্ষত্রদের সঙ্গে, গার্গি”।
    “নক্ষত্ররা কার সঙ্গে জড়িত?”             “দেবলোকের সঙ্গে, গার্গি”।
    “তাহলে দেবলোক কার সঙ্গে জড়িত?”     “ইন্দ্রলোকের সঙ্গে, গার্গি”।
    “ইন্দ্রলোক কার সঙ্গে জড়িত?”            “বিরাজলোকের সঙ্গে, গার্গি”।
    “তাহলে বিরাজলোক কার সঙ্গে জড়িত?”   “হিরণ্যগর্ভলোকের সঙ্গে, গার্গি”।
    “হিরণ্যগর্ভলোক তাহলে কার সঙ্গে জড়িত?”
    যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, “আর না, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না, যাতে তোমার মাথা দেহচ্যুত হয়। তুমি এমন এক দেবতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছ, যাঁর বিষয়ে কোন প্রশ্ন চলতে পারে না। অতএব, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না”। এই কথা শুনে বচক্‌নু-কন্যা গার্গী চুপ করে গেলেন”। (স্বামি মাধবানন্দ কৃত বৃহদারণ্যক উপনিষদের ইংরিজি অনুবাদ থেকে – বাংলা অনুবাদ লেখক।)

    হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মের আরেক নাম। জগতের যাবতীয় বিষয়ের আদি হলেন ব্রহ্ম, কিন্তু তিনি নিজে অনাদি ও অনন্ত, অতএব তাঁর আগে এবং পরে আর কিছুই নেই, কোন প্রশ্নও নেই, কোন উত্তরও নেই। এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল বিদেহরাজ রাজর্ষি জনকের রাজসভায়। এই সভায় যাজ্ঞবল্ক্য নিজেকে ব্রহ্মজ্ঞ বলে দাবি করেছিলেন, তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাবড় তাবড় বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে জরৎকারু বংশের আর্তভাগ, লাহ্যায়নি ভুজ্যু, উষস্ত, কহোল কৌষীতকেয়, গার্গী, উদ্দালক আরুণি, বাচরুবী এবং আরও অনেকে। সেই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাজা জনক, যিনি নিজেও ছিলেন ব্রহ্মজ্ঞ এবং রাজর্ষি। ভারতের বৈদিক রাজাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ব্রহ্মজ্ঞ রাজার মধ্যে রাজা জনক ছিলেন অন্যতম। এই রাজা জনকই সীতাদেবীর পালকপিতা এবং ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শ্বশুর।

    এই সভায় গার্গী কি অব্যয়, অনির্বচনীয়, অপ্রশ্ননীয় ব্রহ্মতত্ত্বকে খোঁচা দেওয়ার জন্যেই শেষ প্রশ্নটি রেখেছিলেন?  কারণ রাজর্ষি জনকের নক্ষত্র সভায় আমন্ত্রিত একজন ব্রহ্মজ্ঞ বিদূষী হয়ে - ব্রহ্মের পরে আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না - এ তত্ত্ব তাঁর অজানা থাকার তো কথা নয়! উত্তরে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সাধারণ ভাবে বলতেই পারতেন, ব্রহ্মের পরে আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে না। তা না বলে “মাথা দেহচ্যুত” হওয়ার (নাকি করার?) ধমক দিতে হল কেন? তিনি কি বিদূষী গার্গীর প্রশ্নে ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতি সন্দেহের আভাস পেয়েই এমন কঠোর উত্তরে, প্রকাশ্য সভায় সম্ভাব্য সকল বিরোধী প্রশ্নকে সমূলে বিনাশ করলেন? কে জানে?   

    মহিলাদের প্রচুর দানের স্বীকৃতি পাওয়া যায় বৌদ্ধ শাস্ত্র থেকে। সাঁচী, ভারহুতের শিলালিপিতে অনেক মহিলার দানের কথা লেখা আছে। তবে মহিলারা এই অর্থ কোথা থেকে পেয়েছিলেন, তাঁদের নিজস্ব আয়, নাকি পৈতৃক বা স্বামীর সম্পত্তি ব্যবহার করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্রাট অশোকের পত্নী কারুবাকীও বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করিয়েছেন এবং প্রচুর দান করেছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি।

    ৪.৪.১০ শিল্প-দক্ষতা                          

    ৪.৪.১০.১ পাথরের স্তম্ভ
    সম্রাট অশোকের স্তম্ভ-নির্দেশের কথা আগেই বলেছি। এবার এই স্তম্ভগুলির বিশেষত্ব নিয়ে দুচার কথা বলা প্রয়োজন। এই স্তম্ভের পাথরগুলির অধিকাংশই বেনারস থেকে প্রায় চল্লিশ কি.মি. দক্ষিণ পশ্চিমের চুনার অঞ্চল থেকে, কিছু মথুরা অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় তিরিশটি স্তম্ভ বা তার ধ্বংসাবশেষ এখনও পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অতএব চুনার কিংবা মথুরা থেকে এই পাথরগুলি, উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি নেপালের তরাই অঞ্চলেও বহন করে নিয়ে যাওয়া, আশ্চর্য দক্ষতার পরিচয়। কারণ, স্তম্ভের পাথরগুলিতে কোন জোড় (joint) ছিল না, দৈর্ঘে প্রায় চল্লিশ ফুট (প্রায় বারো মিটার) মনোলিথিক (monolithic) পাথর। প্রত্যেকটির ওজন প্রায় পঞ্চাশ টন। কোন হাইওয়ে ছিল না, বারো বা ষোল চাকার লো-বেড (Low bed) ট্রেলার ছিল না, ক্রেনও ছিল না। তবুও এই পাথরগুলি কয়েকশ কিলোমিটার বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলদ বা মোষে টানা গাড়িতে – অসমান পাথর কিংবা ইঁট বিছানো রাস্তা দিয়ে। সেতু ছাড়াই পার করতে হয়েছিল বেশ কিছু বড়ো এবং ছোট ছোট অজস্র নদী! তারপরেও নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে, ভারি এই পাথরগুলিকে স্থাপনা (erection) করা হয়েছিল নিখুঁত। এই কারগরি দক্ষতা মিশরের পিরামিড বানানোর থেকে খুব কম কী?

    ৪.৪.১০.২ লৌহ স্তম্ভ
    দিল্লির কাছেই মেহেরোলিতে কুতুব মিনারের সামনে একটি লৌহ স্তম্ভ স্থাপনা করিয়েছিলেন, খুব সম্ভবতঃ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য। এর কথাও আগেই বলেছি। এই স্তম্ভটি শিল্পের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য না হলেও, কারগরি দক্ষতায় অবশ্যই অনন্য। এটির উচ্চতা প্রায় তেইশ ফুট (প্রায় সাত মিটার) এবং এটির মধ্যেও কোন জোড় নেই। তার থেকেও বড়ো কথা, প্রায় ষোলশ বছরের রোদ-বৃষ্টি উপভোগ করে এই লোহার স্তম্ভ আজও অটুট দাঁড়িয়ে আছে এবং তার গায়ে জং বা মর্চের (rust) চিহ্নমাত্র নেই! এমন নয় যে ভারতীয় কারিগররা তখন স্টেনলেস স্টিল বানানো আবিষ্কার করে ফেলেছিল। কিন্তু প্রায় একশভাগ বিশুদ্ধ লোহা বানানোর দক্ষতা যে তাঁরা অর্জন করেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আধুনিক লৌহ শিল্পে যাঁরা আছেন, তাঁরা সকলেই জানেন, লৌহ-আকর (iron ore) থেকে বিশুদ্ধ লোহা বানাতে কতখানি দক্ষতা এবং কারিগরি জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

    ৪.৪.১১ স্থাপত্য
    আগেই বলেছি হরপ্পা সভ্যতা এবং মৌর্যযুগের মধ্যে ভারতবর্ষে উল্লেখযোগ্য কোন স্থাপত্য নিদর্শন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সে রাজা যুধিষ্ঠিরের চোখ ধাঁধানো ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাসাদ হোক, কিংবা শ্রীরামচন্দ্রের অযোধ্যার প্রাসাদ বা লঙ্কেশ্বর রাবণের প্রাসাদ এবং তাঁর স্বর্ণপুরীই হোক। পরবর্তীকালে এই ধরনের বর্ণময় প্রাসাদগুলির প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া গেলে, ভারতের ইতিহাস হয়তো আরেকটু ঋদ্ধ হবে।

    ৪.৪.১১.১ স্তূপ
    আদিম যুগ থেকেই ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চলে মৃতদেহ সমাধি দেওয়া হত। সম্ভবতঃ অনার্যদের মধ্যে মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার প্রচলন ছিল, এবং মৃতদেহ দাহ-সংস্কারের প্রচলন শুরু হয়েছিল আর্য সমাজে।  এই সমাধিগুলি মাটি দিয়ে ছোট আকারের অর্ধ-গোলকাকৃতি ঢিবি[5] বা স্তূপের মত বানানো হত। পরবর্তীকালে সমাধির পাশে পাথরের বড় ফলক (Menhir) খাড়া করে রাখা হত মৃতের স্মৃতির ও তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধার উদ্দেশে। বৌদ্ধরা সম্ভবতঃ প্রাচীন ভারতের এই রীতিটাই গ্রহণ করেছিলেন, তবে অনেক শিল্পসম্মতভাবে। ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর দেহভস্ম অনেকগুলি রাজ্যই নিয়ে গিয়েছিল, এবং সকলেই তাঁদের রাজ্যে স্তূপ বানিয়েছিল। সেই স্তূপগুলির অস্তিত্ব এখন আর নেই এবং পরবর্তী কালে ভগবান বুদ্ধের অস্থি বৃহত্তর স্তূপগুলিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

    সম্রাট অশোকের সময়ে বানিয়ে তোলা সাঁচি, ভারহুত, সারনাথ এবং কৃষ্ণা উপত্যকার অমরাবতীর স্তূপগুলিকে পরবর্তী কালে অনেক বড়ো করে বানিয়ে তোলা হয়েছিল। মোটামুটি ২০০ বি.সি.ই-তে সাঁচীস্তূপ, অশোকের স্তূপের আকারের প্রায় দ্বিগুণ করে বানানো হয়েছিল। স্তূপের অর্ধগোলকের ব্যাস প্রায় একশ কুড়ি ফিট। এই স্তূপের চারদিকে পুরোনো কাঠের রেলিং সরিয়ে পাথরের রেলিং বানানো হয়েছিল, যার উচ্চতা প্রায় ন ফিট। পাথরের গায়ের অলংকরণে বুদ্ধের জীবনের নানান ঘটনা ও সমসাময়িক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অনেক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। তারও পরে মোটামুটি ১০০ বি.সি.ই-তে বানিয়ে তোলা হয়েছিল সাঁচীস্তূপের চার দিকের চারটি তোরণ দ্বার। পাথরে বানানো দ্বারগুলি সারা বিশ্বেই বিখ্যাত, তাদের অদ্ভূত সুন্দর অলংকরণ এবং পাথরে খোদিত অনবদ্য চিত্রগুলির জন্য। পাথরের কাজে ভারতীয় ভাস্করদের দক্ষতা এবং সূক্ষ্ম শিল্পবোধের সূচনা হয়তো এই সময় থেকেই। একই কথা প্রযোজ্য মোটামুটি একই সময়ে অনেক বড়ো করে বানানো ভারহুত স্তূপের ক্ষেত্রেও। অমরাবতী স্তূপ ২০০-৩০০ সি.ই.তে সম্পূর্ণ হয়েছিল, এই স্তূপের আকার সাঁচি স্তূপের থেকেও বড়ো এবং আরও বিশদে অলংকৃত। সারনাথের প্রথম বানানো স্তূপের ওপর বারবার নির্মাণ হয়ে, শেষ নির্মাণ হয়েছিল গুপ্তদের সময়ে। অন্যগুলির তুলনায়, এই স্তূপের উচ্চতা অনেক বেশি, এবং নিচের অর্ধগোলক ডোমের (dome) ওপরে একটি বেলনাকার (cylindrical) ডোম এই স্তূপের বিশেষত্ব।
     
     
     চলবে...

    (চতুর্থ পর্বের পঞ্চম অধ্যায় আসবে ২৮/০৭/২২ তারিখে।)

    গ্রন্থ ঋণঃ
    ১. History of Ancient India – Rama Shankar Thripathi.
    ২. Penguin History of Early India – Dr. Romila Thapar.
    ৩. The Wonder that was India – A. L. Basham.
    ৪. The Bŗhdāraņyak Upanișada – Translated by Swami Madhavananda, Advaita Ashram, Mayavati, Almora, Himalayas.

    [1] সংকাশ্য বা সংকাশিয়া প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থ শহর। আধুনিক উত্তরপ্রদেশের ফারুখাবাদ জেলায় কনৌজ থেকে ৪৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত। এখানে সম্রাট অশোক একটি স্তম্ভনির্দেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই স্তম্ভের “হস্তীমূর্তি” ক্যাপিটালের অবশেষ, বৌদ্ধ মন্দির, বিহার এবং স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়।

    [2] কাঁচপোকা  (Jewel bug)– Beetle  জাতীয় এক ধরনের পতঙ্গ, তার ডানার রঙ হত উজ্জ্বল সবুজ বা নীল। পতঙ্গের এই ডানাই টিপ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।   

    [3] গোরোচনা - গরুর শুকনো পিত্ত – হলুদ রঙের কণিকা।

    [4] ওতপ্রোত শব্দের অর্থ সমস্ত দিক দিয়েই পরষ্পর জড়িয়ে থাকা। যে কোন বস্ত্রের প্রত্যেকটি সুতো অন্য প্রত্যেকটি সুতোর সঙ্গে যেমন ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকে, তেমনই পঞ্চভূত, অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোমের সঙ্গে জগতের যাবতীয় বস্তু ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে।  

    [5] “ঢিবি” শব্দটি অবশ্যই অনার্য শব্দ। বাংলার রাঢ় অঞ্চলের পরিত্যক্ত জনপদের ধ্বংসস্তূপের প্রচলিত নাম “পাণ্ডুরাজার ঢিবি”। এই শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ স্তূপ।
     
  • ধারাবাহিক | ২২ জুলাই ২০২২ | ২৯০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন