এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ধর্মাধর্ম – পঞ্চম পর্ব  -  তৃতীয় ভাগ 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ৩০ আগস্ট ২০২২ | ৪০৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ৫.৩.১ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের রূপান্তর
    পশ্চিম ভারতের আঞ্চলিক দেবতা বাসুদেবের নাম প্রথম পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে। এই সময়েই পশ্চিম ভারতের শাসক রাজা এবং মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে আসা উপজাতি গোষ্ঠী প্রধান এবং রাজারাও দেবতা বাসুদেবের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিলেন।

    পশ্চিম ভারতের – রাজস্থান ও গুজরাট অঞ্চলে পশুপালক জনগোষ্ঠীর দেবতা ছিলেন কৃষ্ণ। আবার তামিল লোকগাথায় “কৃষ্ণবর্ণের” মায়ণ নামে এক দেবতার নাম পাওয়া যায়, যিনি পশুপালক, বাঁশি বাজাতেন এবং গোপরমণীদের সঙ্গে ক্রীড়া করতেন। তাঁর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়, তামিল ভাষার “সঙ্গম” নামক লোকগাথার সংকলনে। তাঁর অন্য আরও নাম ছিল যেমন, “পরিপাতল” এবং “মল”।  ভগবান বিষ্ণুর তামিল নাম   পেরুমল, পেরুমাল বা থিরুমলকে এই পরিপাতল ও মল নামেরই পরিবর্তিত রূপ বলে অনুমান করা হয়।  বিশ্‌দেব, যাঁর কথা এই গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করেছি, ছিলেন মধ্যভারতের অনার্য গোষ্ঠীর দেবতা। গঙ্গা-যমুনা-গোমতী-শোণ প্রভৃতি নদীর উর্বর অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের কাছে দেবতুল্য মহামানব ছিলেন শ্রীরাম। রামায়ণের বহু আগে থেকেই তাঁর বীরত্বের গাথা লোকমুখে প্রচলিত ছিল।

    অন্যদিকে মধ্য এবং দক্ষিণ ভারতের অনার্য জনগোষ্ঠীদের আরও কিছু দেবতা সাধারণ জনসমাজে, জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। যেমন পশুপতি, শিব, মহাদেব, স্কন্দ ও গণপতি, সৃষ্টির প্রতীক লিঙ্গ, নৃসিংহ, বরাহ, সিংহ, নাগ, গরুড়, পেচক, রাজহংস, ময়ূর, মূষিক[1], মৎস্য ইত্যাদি, এবং নদ-নদী - গঙ্গা, নর্মদা, গোদাবরী, পাহাড় – হিমালয়,মন্দর, মৈনাক[2], গাছপালা – বট, অশ্বত্থ, তুলসী, কদম্ব, ইত্যাদি। এখানে একটা খটকা অবশ্য থেকেই যাচ্ছে, এই অনার্য দেবতা বা দেব-আত্মাদের অনার্য মানুষরা কী নামে ডাকতেন[3]? সেটা আজ আর জানার কোন উপায় নেই, তার কারণ সংস্কৃতায়নের প্লাবনে সে ভাষা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে গেছে। সিন্ধু সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার হলে, কিছু আভাস হয়তো মিলতে পারে।    
       
    ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পক্ষে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত – কমবেশি এই আটশ বছরের পর্যায়টি - মোটেই অনুকূল পরিস্থিতি ছিল না। তার পরোক্ষ সমর্থন পাওয়া যায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যুগ-ধারণা থেকেও।
    আমরা আগের পর্বে ব্রাহ্মণ্য যুগ-ধারণায় চারটি যুগের - সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি - আলোচনা করেছি। এই যুগধর্মের লক্ষণগুলি নিয়ে তখন আলোচনা করিনি। সেই লক্ষণগুলি হল, সত্য যুগে চারপাদ পুণ্য, ত্রেতায় ত্রিপাদ, দ্বাপরে দ্বিপাদ এবং কলিযুগে একপাদ পুণ্য ও ত্রিপাদ পাপ বা অনাচার। মহাভারত থেকে আমরা জানতে পারি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নর-দেহ ত্যাগের দিন থেকে দ্বাপর যুগের শেষ ও কলির শুরু। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যদি ৯০০ বি.সি.ই-তে ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে মোটামুটি ৮৫০/৮৪০ বি.সি.ই-তে হতে পারে কলি যুগের সূচনা।  অর্থাৎ সেই সময় থেকেই আর্যাবর্তের সমাজে বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের বিপরীতে অন্যান্য ভাবনার প্রভাব শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। সেই শক্তির প্রবল ধাক্কাটা এল ভগবান মহাবীর ও গৌতমবুদ্ধের আবির্ভাবে – অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। আর ব্রাহ্মণ্য মতে বেদ-বিরোধী বা ব্রাহ্মণ্য-বিদ্বেষী মতবাদ পাপাচার ছাড়া আর কিই বা হতে পারে? অতএব কলিযুগ হয়ে উঠল ত্রিপাদ পাপের ভারে ভারাক্রান্ত। এই কথাগুলিই আমরা তন্ত্রশাস্ত্রে স্বয়ং ভগবান মহাদেবের থেকেই শুনব, পরের পর্বে।        

    যাই হোক, ব্রাহ্মণ্য-সমাজের এই প্রতিকূল পরিস্থিতির অনেকগুলি কারণের মধ্যে কয়েকটি হল,
    ১. ক্ষত্রিয় ছাড়া রাজা হওয়া যায় না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মন থেকে এমন ধারণা মুছে যেতে লাগল। কারণ নন্দবংশ থেকে ভারতজোড়া সাম্রাজ্য গড়ে তোলা মৌর্যরা কেউই ক্ষত্রিয় ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এবং পরবর্তী রাজাদের অধিকাংশই অক্ষত্রিয়, অনেকেই অনার্য – তাঁরা আর যাই করুন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায় আগ্রহী ছিলেন না।  
    ২. দেশের রাজা ক্ষত্রিয় না হওয়ায়, ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ও সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ থাকছিল না। কারণ ক্ষত্রিয় রাজা না হলে, রাজসূয় কিংবা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন কে করবে? আর্য ধনী সম্প্রদায়ের যজ্ঞ থেকে জীবন ধারণ চলতে পারে, কিন্তু সমৃদ্ধি আসে না।          
    ৩. এই সময় পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুললেন, গ্রীক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব, গুর্জর ইত্যাদি জাতি ও গোষ্ঠীর বিদেশী রাজারা। তাঁদের অনেকেই নিজস্ব ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন, যাঁদের ছিল না, তাঁরা এ দেশীয় ধর্মের মধ্যে বৌদ্ধ বা অনার্যদের ধর্ম গ্রহণ করলেন।
    ৪. ব্রাহ্মণ্যধর্মের অসহিষ্ণু দুর্ভেদ্যতার এতদিন পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছিল বৌদ্ধরা। কিন্তু বৌদ্ধদের ধর্মও পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত জটিল তত্ত্বনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ভগবান বুদ্ধের সহজ বাণীতে রাজা বিম্বিসার, অজাতশত্রু বা প্রসেনজিৎ মুগ্ধ হয়েছিলেন। ভগবান বুদ্ধের সরল বাণী ও আচার-আচরণ অনুসরণ করা স্থবিরবাদীনদের কথায় মুগ্ধ হয়েছিলেন সম্রাট অশোক। কিন্তু মহাযানী ধর্মমতের প্রবল উন্নাসিক পাণ্ডিত্যে বৌদ্ধরাও সাধারণ মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল।     
    ৫. এইরকম সময়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল দেশীয় অনার্য ধর্মশাখাগুলি, ভাগবত, শৈব, পাশুপত্য, গাণপত্য ইত্যাদি। তাঁদের ধর্মে, মূর্তিপুজো আছে। মন্ত্র উচ্চারণ আছে, কিন্তু সেই মন্ত্রের কোন বাঁধা-ধরা ধর্মতত্ত্ব নেই। এই ধর্ম আচরণের জন্যে মোহ, মায়া, অহংকার, ঈর্ষা, হিংসা, কামনা, বাসনা এবং সংসার ত্যাগ করে নির্জনে তপস্যা, ধ্যান কিছুই করতে হয় না।

    এই পুজো প্রকৃত অর্থে যেন উৎসব– যার যেমন সামর্থ্য, যার যেমন ইচ্ছে - একত্রে পালন করা যায়। ধনীরা  মহামূল্য অলংকার ও পোষাকে সেজে দরিদ্রদের অকাতরে দান করতে পারেন, তাঁদের বৈভবে সমাজের সাধারণ মানুষকে আশ্চর্য করে দিতে পারেন। সমাজের মানুষ তাঁকে ধন্য ধন্য করবে। বাড়বে তাঁর যশ – প্রতিপত্তি। সাধারণ মানুষ সকলেই এই উৎসবে মেতে উঠবে। তারা আনন্দ করবে, নানান বাদ্য বাজিয়ে নাচ-গান, কোলাহল করবে। তাদের কেউ যাবে মন্দিরে পুজো দিতে, কেউ যাবে মদ খেতে, কেউ যাবে পতিতাদের কাছে – সারা বছরের পরিশ্রম থেকে মুক্তি নিয়ে কয়েকটি দিনের উপভোগ।

    এই পুজো ও উৎসবের একটি দিনের অনবদ্য এবং নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যায় তামিল কাব্য “মাদুরাই মালিকা” থেকে। এই কাব্যের রচয়িতার নাম জানা যায় না, কিন্তু তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই, এমন সুন্দর সহজ একটি বর্ণনার জন্য। এই কাব্য খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীর পাণ্ড্য রাজা নেড়ুঞ্জেলিয়াণের সম্মানে লেখা হয়েছিল, সম্ভবতঃ আরো এক বা দুশ বছর পরে। এমন বাস্তব উৎসবের চিত্র উত্তর ভারতের কাব্যে খুব কমই পাওয়া যায়।

    “কবি বিশাল তোরণ পথে শহরে ঢুকলেন, তোরণের স্তম্ভে, খোদিত রয়েছে দেবী লক্ষ্মী[4]র মূর্তি। দেবীর সর্বাঙ্গ ঘিয়ে প্রলিপ্ত। শহরবাসী তাঁকে এই সশ্রদ্ধ নৈবেদ্য দিয়েছে, কারণ এই দেবীই তাদের দিয়েছেন শহরের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি। সে দিনটা ছিল উৎসব পালনের দিন। মহান রাজার বিজয় ও বীরত্বকে স্মরণ করার দিন। শহরের চারদিকে অজস্র বর্ণময় ধ্বজা উড়ছে, সেনাপতিদের গৃহের শিখরেও ধ্বজা উড়ছে, এমনকি তড্ডি[5] বিক্রেতাও মহানন্দে তার দোকানে ধ্বজা ওড়াচ্ছে। প্রশস্ত রাস্তাগুলি দিয়ে আজ যেন মানুষের স্রোত বয়ে চলেছে। সকল জাতির মানুষ, বাজারে বিকিকিনি করছে এবং আশ্চর্য সব বাদ্যযন্ত্রের তালে তারা গানও করছে।
    বিশাল ঢাকের বাদ্য বাজিয়ে, একটি রাজকীয় শোভাযাত্রা এগিয়ে চলেছে পথে, সেই শোভাযাত্রায় আছে হাতি এবং রথ – রথের ঘোড়াগুলি তেজ এবং শক্তিতে টগবগ করছে। তাদের পেছনে চলেছে বিজয়ী পদাতিকের দল।  চারদিকে শঙ্খ ধ্বনিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, বহুদিন বেঁধে রাখা কোন এক অতিকায় পশু হঠাৎ যেন ছাড়া পেয়ে উত্তাল সমুদ্রে নাচিয়ে তুলছে রণতরী – যতক্ষণ না তাকে আবার বন্দী করা যাবে, এই উদ্দীপনা থামবে না। 
    এর মধ্যেই পসারীরা মহোৎসাহে বিক্রি করে চলেছে তাদের পণ্য - মিষ্টান্ন, ফুলের মালা, সুগন্ধী রেণু এবং পানের খিলি। বয়স্কা মহিলারা ঘরে ঘরে মেয়েদের কাছে বিক্রি করছেন পুষ্পস্তবক এবং নানা রঙের পদক। অভিজাত মানুষেরা রথে চড়ে চলেছেন, তাঁদের পরনে উজ্জ্বল রঙিন বসন এবং অঙ্গে সুগন্ধী ফুলের মালা। তাঁদের কটিবন্ধে  সোনালী তরবারী-কোষগুলি ঝলমল করছে সূর্যের আলোয়। নানান অলঙ্কারে ভূষিতা সুন্দরী পুরনারীরা অলিন্দ ও গবাক্ষ থেকে রাজপথের শোভাযাত্রা লক্ষ্য করছেন।
    বহু মানুষ মন্দিরে জড়ো হয়েছেন পুজো দিতে, তাঁরা সমবেত সুরে প্রার্থনা করছেন, পুষ্প ও মাল্যের নৈবেদ্য নিবেদন করছেন দেবদেবীর চরণে, সাধুদের প্রণাম করছেন শ্রদ্ধায়। শিল্পীরা তাদের বিপণিতে কাজ করছেন, তাঁরা শাঁখের বালা বানাচ্ছেন, স্বর্ণকার, তাম্রকার, পটশিল্পী, তন্তুবায় সকলেই এখন ব্যস্ত; ব্যস্ত বস্ত্র, ফুল, চন্দনের ব্যাপারীরাও। খাবারের বিপণিগুলিতেও ব্যস্ততার বিরাম নেই – টাটকা সবজি, কাঁঠাল, আম, চিনির মঠ, রান্না করা ভাত এবং মাংস, কী নেই সেখানে!
    সন্ধ্যায় শহরের বারবনিতারা নৃত্য ও গীতে মনোরঞ্জন করছে, তাদের প্রিয় নাগরদের। তাদের গান ও বাঁশির সুরে রাজপথও যেন মত্ত হয়ে উঠেছে। মত্ত প্রাকৃতজন অতিরিক্ত পান করে পথেই গড়াগড়ি দিচ্ছে, অভিজাত মহিলারা এসেছেন মন্দিরের সন্ধ্যারতি দেখতে, তাঁদের হাতে জ্বলন্ত দীপ ও নৈবেদ্য, তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন তাঁদের সখীবৃন্দ ও সন্তানেরা। তাঁদের নৃত্য ও মন্ত্রোচ্চারণে গমগম করছে মন্দিরের নাটমণ্ডপ।
    অবশেষে এল রাত্রি, নগর এখন নিদ্রামগ্ন – জেগে আছে শুধু প্রেত ও অশরীরি, আর সাহসী সিঁদকাটারা। তাদের হাতে দড়ির মই, ছুরি, মাটির দেয়ালে গর্ত করার ছেনি। কিন্তু নৈশ প্রহরীরাও সকলে সজাগ, নাগরিকরা নিশ্চিন্তেই নিশিযাপন করল নিজ নিজ গৃহে।
    ভোর হল ব্রাহ্মণদের পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণে। চারণ কবিরা পল্লীতে পল্লীতে গান গেয়ে নতুন দিনের সূচনা করলেন। ব্যবসায়ীরা তাদের বিপণি খুলে পসরা সাজাতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। ভোরের পিপাসী রসিকদের জন্যে তড্ডি-বিক্রেতাও তার বিপণি খুলেছে। মত্তজনেরা আবার টলতে লাগল, চিৎকারে ভরে তুলল রাজপথ। নগরের ঘরে ঘরে দরজা খোলার শব্দ। মহিলারা বাড়ির অঙ্গন থেকে বিগত উৎসবের বাসি ফুল ঝাঁট দিয়ে সরাতে শুরু করলেন। এভাবেই নগর আবার ফিরে গেল তার প্রাত্যহিক ব্যস্ততায়”। [Wonder that was India – A L Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত – অনুবাদ - লেখক।]

    ৬. অতএব অস্তিত্ব রক্ষা এবং হারিয়ে যাওয়া প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার তাগিদে ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বেতসবৃত্তি অবলম্বন করতে হল। যাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে অথবা যাঁরা প্রশাসনের উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত তাঁদের ঘনিষ্ঠ হতে ব্রাহ্মণ্য নিয়মকে শিথিল করতেই হল। রাজা যেই হোন, বৈশ্য, শূদ্র অথবা বিদেশী যবন বা ম্লেচ্ছ – ভিন্ন পরিচয়ে তাঁরাও ব্রাহ্মণ্য ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। আগে যাঁদের “পতিত-ক্ষত্রিয়” বা “সংকর-ক্ষত্রিয়” বলে অবহেলায় ব্রাহ্মণ্য সমাজ দূরে রেখেছিল, এখন তাঁরাই “ব্রহ্মক্ষত্রিয়”, “নাগক্ষত্রিয়”, “উগ্রক্ষত্রিয়” ইত্যাদি বিচিত্র নামে ব্রাহ্মণ্য সমাজে সসম্মানে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করলেন। উপরন্তু পৌরাণিক কিছু বিখ্যাত রাজবংশ, যেমন সূর্য, চন্দ্র, ইক্ষ্বাকু, ইতাদির সঙ্গে যুক্ত করে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা এই সব রাজাদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তেও ঢুকে পড়তে সমর্থ হলেন। তাঁরা রাজাদের প্ররোচিত করলেন, রাজসূয়, বাজপেয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজনে। এই আয়োজনে একদিকে পূর্ণ হল রাজাদের আত্মশ্লাঘা এবং অন্যদিকে পুনর্প্রতিষ্ঠা পেল ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের প্রতিপত্তি ও বিপুল বিত্ত।
     
    শুধুমাত্র রাজ-বৃত্তেও নয়, ব্রাহ্মণরা আরো নমনীয় হল অনার্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতি। ততদিনে তারা চিনে ফেলেছে ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চল, বুঝে ফেলেছে দেশের আঞ্চলিক জনগনের মনোভাব। উপলব্ধি করতে পেরেছে, অনার্য মানুষের পরিশ্রমে উৎপন্ন শস্য এবং অজস্র সামগ্রী ছাড়া সমাজের অস্তিত্বই থাকবে না। অতএব অনার্য জনগণের বিদ্বেষ এবং বিতৃষ্ণা দূর করার লক্ষ্যে তাঁরা অনার্যদের প্রতিটি দেব-আত্মা, প্রতিটি ধর্মবিশ্বাস আত্মসাৎ করে নতুন উৎসাহে লেগে পড়লেন, সর্ব ভারতীয় ধর্মভাবনা রচনায়, যার নাম পুরাণ। তার জন্যে তাঁরা ধীরে ধীরে বৈদিক অনেক দেবতাকেই গুরুত্বহীন করে তুলতে এতটুকু দ্বিধা করলেন না। আবার কিছু কিছু বৈদিক দেবতাকে নব-রূপে মহিমান্বিত করে তুললেন, বেশ কিছু গৌণ বৈদিক দেবতাকে বসালেন প্রথম সারিতে। নতুন এই দেবতাদের নব নব মহিমাতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আমাদের ধর্মধারণা  – যাকে আমরা হিন্দু ধর্ম বলে থাকি।

    সেই হিন্দু ধর্ম নিয়েই এবার আলোচনা করা যাক।           

    ৫.৩.২ হিন্দু দেব-দেবী
    আর্যদের ভারতে প্রবেশ মোটামুটি ১৫০০ বি.সি.ই-তে, প্রাচীনতম ঋগ্বেদের সংকলনের সময় কাল ১০০০ বি.সি.ই-র কিছু আগে বা পরে এবং পরবর্তী ৫০০ বছরের মধ্যে সংকলিত হয়েছে ব্রাহ্মণ, উপনিষদ এবং আরণ্যক বিভাগ সহ আরও তিনটি বেদ। ঋগ্বেদের সময় দেবতাদের সংখ্যা ছিল মাত্র আট বা নয়, খুব জোর দশ জন। পরবর্তী বেদগুলিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু আরও তিনশ বছর পর অর্থাৎ মোটামুটি খ্রী.পূ. দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে এই দেবতাদের সংখ্যায় বিস্ফোরণ ঘটতে লাগল।

    দেবদেবীরা শুধু যে সংখ্যাতেই বৃদ্ধি পেলেন, তা নয়, তাঁদের গুণগত পার্থক্য অর্থাৎ মহাবিশ্বের যাবতীয় বিষয়ে তাঁদের প্রভাব, প্রতিপত্তি, কর্তব্য, দায়িত্ব এবং অধিকার বেড়ে গেল বহুগুণ। এই পর্যায়ে যে তিনজন দেবতাদের মধ্যে প্রধানতম হয়ে উঠলেন, তাঁদের একত্রে ত্রিদেব বলা হয় – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। এই  তিন দেবতার নামই আমরা বৈদিক সাহিত্যে জেনেছি। বেদের ব্রহ্ম ছিলেন, সকল দেবতাদের দেবতা – যাঁর আরেক নাম হিরণ্যগর্ভ। আমরা জেনেছিলাম, তিনিই একমাত্র সত্য, তিনিই বিভক্ত হয়ে অন্যান্য দেব-দেবী হয়েছেন। এই ব্রহ্মের অধিষ্ঠান ছিল ব্রহ্মলোকে – দ্যুলোকের উচ্চতম স্তরে। [এই স্তরের ঊর্ধে কী আছে জিজ্ঞাসা করায় বাচক্‌নু-কন্যা গার্গীকে মুণ্ডপাতের হুমকি দিয়েছিলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য, সে কথা আশা করি ভুলে যাননি (অধ্যায় ৪.৪.৯)]। বিষ্ণু ছিলেন বৈদিক সূর্য-দেবতা - দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ। বৈদিক সূর্য বা দ্বাদশ আদিত্য যেহেতু দ্যুলোকের দেবতা, অতএব বিষ্ণুর অধিষ্ঠান হল, দ্যুলোকের সর্বোচ্চ স্তরে, অর্থাৎ বৈকুণ্ঠলোকে। আর মহেশ্বর হলেন বৈদিক অগ্নির রুদ্ররূপ। তিনি পৃথ্বীলোকের দেবতা, অতএব তাঁর অধিষ্ঠান হল এই পৃথিবীর উচ্চতম স্তরে, হিমালয় পর্বতশ্রেণীর মধ্যে কৈলাস পর্বতে।

    ৫.৩.২.১ ব্রহ্মা
    হিন্দুদের মধ্যে ব্রহ্মা খুব একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর অন্যতম কারণ হয়তো, তাঁর নামের সঙ্গে পরমাত্মা ব্রহ্মের নাম-সাযুজ্য। পুরুষোত্তম ব্রহ্ম তথা হিরণ্যগর্ভ, বেদ ও উপনিষদের অব্যক্ত নিরাকার ঈশ্বর। তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, ধারণা করা যায় না, তিনি অবাঙ্মনসোগোচর, তাঁকে শুধুমাত্র উপলব্ধি করা যায়। উপনিষদ এবং বেদান্তের ব্রহ্ম ধারণা এবং হিন্দু ধর্মের ব্রহ্মা ধারণা কিন্তু মোটেই এক বিষয় নয়। কারণ হিন্দুদের ব্রহ্মা সাকার। তাঁর চতুর্মুখ, মাথায় জটা। তিনি তাঁর চারটি অঙ্গ থেকে চতুর্বণের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মন থেকে জন্ম নিয়েছেন সপ্তর্ষি সহ অনেক ঋষি ও নারদ, মনু – যাঁরা পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও উদ্ভিদের স্রষ্টা। কিন্তু এই অপার ঐশ্বর্য থাকলেও ভগবান ব্রহ্মা অত্যন্ত সরল দেবতা ছিলেন। দৈত্য, দানব, রাক্ষস ও মানুষদের অনেকেই তপস্যা করে ব্রহ্মাকে বেশ সহজেই সন্তুষ্ট করেছে এবং বহুবার এমন সব বর আদায় করে নিয়েছে, যার ফলে দেবতা এবং মানুষদের বারবার বিপদে পড়তে হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে হয় বিষ্ণু নয় শিবকে। তাঁর এই সারল্য এবং সহজেই সন্তুষ্ট হয়ে ওঠার কারণেই হয়তো তাঁর প্রভাব খর্ব হয়েছে, কমেছে জনপ্রিয়তা।

    মহাভারত ও পুরাণগুলিতে বিষ্ণু বা শিবের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে ব্রহ্মার উল্লেখ এসেছে বারবার, তার থেকেই তাঁর অনেক কাহিনী ও উপাখ্যান জানা যায়। এই প্রসঙ্গে হিন্দু পুরাণগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে নেওয়া যাক। হিন্দুদের পুরাণ সংখ্যা ঠিক কতগুলি সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে আঠারোটি প্রধান পুরাণ গ্রন্থকে প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছেন, সেগুলিকে মহাপুরাণ বলা হয়। এই মহাপুরাণগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দেওয়া হলঃ-


    মহাপুরাণ সারণি 

    উপরের সারণি থেকে বহুল প্রচলিত অষ্টাদশ মহাপুরাণগুলির বিষয়ভিত্তিক বিচার করলে, দেখা যায়, আঠারোটির মধ্যে বিষ্ণু-মহিমা বিবৃত মহাপুরাণের সংখ্যা নটি এবং শিব-মহিমার পাঁচটি। তাছাড়া একটি করে মহাপুরাণ ব্রহ্মা এবং অগ্নির। বাকি দুটি বিষ্ণু, শিব ও অন্যান্য নানান ঘটনা নিয়ে রচিত। অতএব মোট মহাপুরাণের শতকরা ৫০ ভাগ ভগবান বিষ্ণুর ভাগে, শতকরা ২৭.৭৮ ভাগ ভগবান শিবের ভাগে। ভগবান ব্রহ্মার ভাগে মাত্র শতকরা ৫.৫৫ ভাগ। এর থেকেই বোঝা যায়, ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত বিদগ্ধ পণ্ডিতরা ভাগবত ধর্মের প্রচারে কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন। আর উল্টোদিকে ভগবান ব্রহ্মার ভক্ত ভাগ্য খুবই সঙ্গীন।

    ভারতবর্ষের মন্দিরের হিসাব থেকেও এই চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভগবান বিষ্ণু ও মহাদেবের বিখ্যাত মন্দিরগুলি ছেড়ে দিলেও, প্রতিটি হিন্দুপাড়ায় ছোট-ছোট মন্দির আছে অজস্র, সেক্ষেত্রে ব্রহ্মার মন্দিরের সংখ্যা গোটা ভারতবর্ষে সাকুল্যে মাত্র ছটি, একটি আজমীড়ে পুষ্কর সরোবরের তীরে; রাজস্থানের বারমের; খোখান, (কুলু, হিমাচল); কুম্ভকোনম (তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু); পানাজি (গোয়া) এবং তিরুপাত্তুরে (তামিলনাড়ু)।  

    ৫.৩.২.২ বিষ্ণু - ভাগবত
    হিন্দুধর্মে সব থেকে বর্ণময় এবং জনপ্রিয় দেবতা বিষ্ণু, তিনি অনন্ত লীলাময়। বিষ্ণু ভক্তদের মতে তিনিই পরমপুরুষ, পুরুষোত্তম। তিনি অক্ষয়, অনাদি, অনন্ত ঐশ্বর্যবান, নির্বিকার ব্রহ্ম। তিনিই বেদস্বরূপ, তিনি চৈতন্যস্বরূপ, তিনিই এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের কারণ স্বরূপ। তিনি সকল কার্য ও ক্রিয়ার কারণ, কিন্তু তিনি কর্তা নন, কারণ তিনি কখনও কোন কর্মফল ভোগ করেন না, তিনি অব্যয় এবং অক্ষর। কর্তা না হয়েও, প্রকৃতির সঙ্গে যখন তাঁর সংশ্লেষ ঘটে, তখনই তাঁর কারণরূপে কার্যসকল ঘটতে থাকে। প্রকৃতির তিনগুণ, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। প্রকৃতির এই তিনগুণের আশ্রয় থেকেই সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ হতে থাকে। সত্ত্বগুণের প্রভাবে যখন তিনি বিষ্ণু, তখন তিনি পালন করেন। রজোগুণের প্রভাবে যখন তিনি সৃষ্টি করেন, তখন তিনিই ব্রহ্মা। আবার তমোগুণের প্রভাবে যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তিনিই হর।

    এতদিন ব্রহ্মলাভ অর্থাৎ মুক্তির উপায় ছিল যজ্ঞ, তপস্যা, ধ্যান। মন থেকে সমস্ত কামনা, বাসনা, ঘৃণা, হিংসা, ঈর্ষা, মোহ, অহংকার মুছে ফেলে নিরন্তর চিন্তন করতে হবে, এই দেহ আত্মা নয়। চরাচর বিশ্বে, যা কিছু আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করি, ব্রহ্ম সবকিছুর সঙ্গেই ওতপ্রোত জড়িত, কিন্তু সেগুলির কোনটিই তিনি নন। এই চিন্তা করতে করতে সাধক যখন নিজের আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে কোন প্রভেদ দেখতে পান না বরং পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মাকে একীভূত করতে পারেন, তখনই সাধকের পরমমোক্ষ লাভ হয়। সাধনার এই পথকে জ্ঞানযোগ বলে।

    ব্রহ্মলাভের আরও একটি পথ কর্মযোগ। কর্মযোগেও জ্ঞানযোগের মতো মনের সমস্ত বিকার দূর করতে হয়। তারপর ফলের কামনা না করে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হয়। এই যজ্ঞ শুধুমাত্র অগ্নিতে ঘৃত আহুতি দেওয়া নয়, মনের সকল কামনা, বাসনা ও প্রত্যাশা ত্যাগের অগ্নিতে আহুতি দেওয়া। নিজের জীবন ধারণের জন্যে নিত্যকর্ম ছাড়া, অন্য সমস্ত কর্মই নিষ্পৃহ চিত্তে ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণ করতে হয়। এই নিষ্কাম কর্ম সাধনা থেকেও সম্যক জ্ঞান উপলব্ধি হয়, জীবাত্মা ও পরমাত্মার রহস্য ভেদ করা যায়।

    পৌরাণিক বা হিন্দু যুগে আরেকটি পথ এল ভক্তিযোগ। বলা হল, যেহেতু কলিযুগে একদিকে মানুষের আয়ু স্বল্প, অন্যদিকে জীবনে রয়েছে বহু বাধা-বিঘ্ন। উপরন্তু তারা বড়ো অলস ও মন্দবুদ্ধি। তাদের পক্ষে বহু শাস্ত্রের বহু জ্ঞান ও কর্মের উপদেশ মেনে ধর্মাচরণ করা সম্ভব নয়। অতএব তাদের পক্ষে অনেক সহজ এবং আশু ফলদায়ী পথ হল ভক্তিযোগ। এই ভক্তিযোগই হয়ে উঠল হিন্দু সাধারণ সমাজের প্রধানতম ধর্মপথ। সে কথায় আসছি একটু পরে।

    এখানে খুব সহজ কথায় বলা হল, জীবনের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি ভাবনা-চিন্তা ঈশ্বরে সমর্পণ করো। সাধনা বা তপস্যা করতে পারলে ভাল, না পারলে পরমভক্ত হও। তাঁর কথা সর্বদা চিন্তা করো, যখনই মনে হবে, তাঁর মহিমার কথা অন্যকে শোনাও, নিজেও শোনো। তাঁর চিন্তা ছাড়া অন্য সব চিন্তা পরিত্যাগ কর। তাঁর কথা ছাড়া অন্য সব কথা বলা বা শোনা, বিষের মতো ত্যাগ কর। এভাবেই পরমভক্তিতে তাঁর শ্রীচরণে নিজেকে সমর্পণ করে দিতে পারলে, তিনি নিজেই এসে ধরা দেবেন ভক্তের হৃদয়ে। যেহেতু তিনি ভক্তপাবন, কোন ভক্তই তাঁর চোখের আড়ালে থাকে না। তিনি ভক্তের ভগবান, ভক্তের জন্যে তিনি বৈকুণ্ঠলোকের সুখ ও স্বস্তি ছেড়ে বারবার নেমে এসেছেন ধূলিমলিন পৃথিবীতে। ভক্তের আর্ত প্রাথনায় তিনি বারবার অবতীর্ণ হয়েছেন এই ধরাতলে, অধর্মের বিনাশ করে, প্রতিষ্ঠা করেছেন ধর্ম।

    এই সহজ সরল ভক্তিযোগের তত্ত্ব সর্বস্তরের মানুষের মনে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলল। সমাজে নানান বর্ণ থাক, নানান জাতি থাক, কিন্তু নিজের ঘরে বসে ভক্ত হতে তো কোন বাধা নেই। সেখানে কোন পুরোহিতের দরকার হয় না, যজ্ঞের বেদি বানাতে হয় না, কলসি কলসি ঘি ঢালতে হয় না। শুধু নাম জপ করতে হয়। সারাদিন যতবার খুশি।

    ভক্তি যোগ এবং বিষ্ণু তত্ত্বের উদ্ভব সম্ভবতঃ ভাগবত শাখার জনপ্রিয়তা থেকে। নচেৎ বৈদিক ইন্দ্র, সূর্য, অগ্নি সকলকে ছাড়িয়ে আদিত্যদের সর্বকনিষ্ঠ বিষ্ণুকে নিয়ে ধর্ম তত্ত্ব রচনার চিন্তা আসবে কেন? ভাগবত শাখার দেবতার নাম হয়তো বিশদেব>বিশ্ ছিল, যার ফলে বিশ্‌কে – বৈদিক বিষ্ণুর সঙ্গে যুক্ত করতে বেগ পেতে হল না। যেভাবেই হোক এই মহিমা প্রচারের সাফল্য পণ্ডিতদের আরও বেশি উৎসাহী করে তুলল। তাঁরা ভাগবত শাখার বিস্তৃতির জন্যে আরও বহু অঞ্চলের বিভিন্ন অনার্য দেবতা, দেব-আত্মার প্রতীক (totem), পশু-পূজা (Zoolatry বা theriomorphism), পশু-মানব পূজা (anthropomorphism) এবং তাঁদের কাহিনীগুলি কিছু কিছু গ্রহণ করলেন, কিছু কিছু সম্পূর্ণ নতুন কাহিনী কল্পনা করে বিষ্ণুর সঙ্গে জুড়ে ফেললেন। এভাবেই এসে গেল ভগবান বিষ্ণুর অবতার কাহিনী।

    আদিম ভারতের বিশেষ একটি অঞ্চলের তিনজন অনার্য দেবদেবীর কাহিনী আমি অনুমান করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে খুব স্বাভাবিক ভাবেই, বিস্তীর্ণ ভারতের ব্যাপ্ত অঞ্চলে এই দেবদেবী ও দেব-আত্মাদের সংখ্যা ছিল অজস্র। কারণ এক একটি অঞ্চলের সমাজগুলি বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছিল। দূর দূর অঞ্চলের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বণিকসম্প্রদায় ও তাদের বাণিজ্যের মাধ্যমে। কিন্তু তাতে পারষ্পরিক ধর্মীয় বিশ্বাস খুব একটা প্রভাবিত হয়নি, তার কারণ সেই যুগে কোন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না। আর্যদের বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মও, আর্যাবর্তের বাইরের বিস্তীর্ণ অনার্য সমাজকে তেমন প্রভাবিত করতে পেরেছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু হিন্দুধর্মের বিষ্ণু এবং শিব-তত্ত্ব সেটাই শুরু করল এবং সাফল্যের সঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করল। হিন্দুধর্ম যত দূর দূর অঞ্চলে প্রসারিত হতে লাগল, সেখানকার সমাজের বিশ্বাস ও আস্থাকে তারা ততই নিজেদের ধর্মতত্ত্বে অন্তর্ভুক্ত করতে থাকল।
    এবার বিষ্ণুর দশ অবতার তত্ত্বের দিকে একবার চোখ রাখা যাক। নিচের সারণিতে দশাবতারের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিলাম, মনে রাখতে সহজ হবে।


      অবতার সারণি

    বরাহ অবতার – পরমেষ্ঠী ব্রহ্মা, যখন বিষ্ণুর নির্দেশে জগতের সৃষ্টি কর্মে ব্যস্ত ছিলেন, তখন পৃথিবী তাঁর হাত থেকে পিছলে প্রবল জলের তোড়ে পড়ল গিয়ে রসাতলে। এমন অবস্থায় সৃষ্টি হতে থাকা সকল জীব ও জড়ের আশ্রয় কোথায় হবে? এই চিন্তায় তিনি যখন ব্যাকুল, তখন তাঁর নাক থেকে বেরিয়ে এলেন সূক্ষ্ম বরাহ এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বরাহ বিশাল বলিষ্ঠ আকার ধারণ করলেন (ঠিক যেন মধ্যপ্রদেশের এরান জেলার বরাহ মূর্তির মত)। সেই বিশাল বরাহরূপী বিষ্ণু রসাতলের জলে নিমগ্ন পৃথিবীকে অনায়াসে তুলে নিলেন নিজের দুই দাঁতে। কিন্তু সেখানেও তাঁকে বাধা দিয়েছিলেন পাতালে[6]র অধিপতি দৈত্যরাজ হিরণ্যাক্ষ। বরাহরূপী বিষ্ণু হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন এবং পৃথিবীকে স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা করলেন।

    মৎস্য অবতার – ব্রহ্মার দিবাবসানে এক একটি কল্পের অবসান হয় এবং রাত্রিতে তিনি নিদ্রামগ্ন হন। শ্রীহরি বর্তমান কল্পের শুরুতে ছোট্ট শফরী মাছ হয়ে আবির্ভূত হলেন রাজর্ষি সত্যব্রতর অঞ্জলিবদ্ধ জলে। সেই শফরী রাজর্ষিকে বললেন, “মাছেরা সাধারণতঃ নিজ নিজ জ্ঞাতিকে বধ ও ভক্ষণ করে, অতএব আপনি আমাকে আশ্রয় দিন, আমাকে রক্ষা করুন”। দয়ালু রাজর্ষি সত্যব্রত সেই মাছকে প্রথমে একটি ছোট পাত্রে রাখলেন, কিন্তু একরাত্রের মধ্যেই সেই মাছ এমনই বেড়ে উঠল সে পাত্রে তার সংকুলান হল না। এরপর রাজর্ষি মাছটিকে বড়ো পাত্র, তারপর সরোবর, বিশাল হ্রদে স্থাপনা করলেও, সেই মাছ অচিরেই এতটাই বেড়ে উঠতে লাগল যে সেই সব জলাশয়ও মাছটির পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে উঠল। রাজর্ষি সত্যব্রত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি নিশ্চয়ই কোন সাধারণ মৎস্য নন, আপনি কে? আপনিই কী ভগবান শ্রীহরি?”
    মৎস্যরূপী শ্রীবিষ্ণু বললেন, “এখন ব্রহ্মার নিদ্রাকাল - আজ থেকে সাতদিন পরে সমস্ত ত্রিলোক প্রলয় সমুদ্রে ডুবে যাবে। সেই সময় এক বিশাল নৌকা তোমার সামনে উপস্থিত হবে। সেই নৌকায় তুমি সপ্তর্ষি ও সকল জন্তুদের নিয়ে চড়ে বসবে, সঙ্গে নেবে সমস্ত উদ্ভিদ ও শস্যের বীজ। প্রলয় সমুদ্রের আলোড়নে তোমার তরণী যখনই চঞ্চল হয়ে উঠবে, বাসুকি[7]রূপ রজ্জু দিয়ে আমার শৃঙ্গে বেঁধে নেবে। যতদিন ব্রহ্মার রজনী থাকবে অর্থাৎ তিনি নিদ্রামগ্ন থাকবেন, ততদিন আমি প্রলয় সমুদ্রে তোমাদের পরিচালনা করব”।  

    কূর্ম অবতার – সমুদ্রমন্থনের সময় মন্দর পর্বত হয়েছিল মন্থন দণ্ড এবং সর্পরাজ বাসুকি হয়েছিলেন মন্থন রজ্জু। দেব ও অসুরগণের মন্থনে যে প্রবল ঘর্ষণের সৃষ্টি হল, সেই ভার পৃথ্বী বহন করতে পারছিলেন না - মন্দর পর্বত ভূমিতে প্রোথিত হয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় ভগবান বিষ্ণু কূর্ম হয়ে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করলেন এবং মন্দর পর্বতের আধার হয়ে তাকে নিজের পিঠে ধারণ করলেন।                       

    বামন অবতার – শ্রীবিষ্ণু বামন অর্থাৎ খর্বকায় ব্রাহ্মণরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর পিতা ঋষি কশ্যপ এবং মাতা দেবমাতা অদিতি। তিনি দানগর্বী দৈত্যরাজ বলির গর্ব খর্ব করেছিলেন। রাজা বলির গুরু ছিলেন শুক্রাচার্য এবং যজ্ঞের যাজক ঋষিরা ছিলেন ভৃগুবংশীয়। রাজা বলির প্রপিতামহ ছিলেন বিষ্ণু-বিদ্বেষী হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু, পিতামহ ছিলেন বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ ও পিতা দানবীর বিরোচন। যিনি দেবতা জেনেও ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশী প্রার্থীদের নিজের আয়ু দান করেছিলেন। পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধে, প্রবল পরাক্রান্ত দৈত্যরাজ বলি স্বর্গ জয় করে দেবরাজ ইন্দ্রকে স্বর্গচ্যুত করেন, তারপর নর্মদার উত্তরতটের ভৃগুকচ্ছে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করছিলেন। সেই অশ্বমেধ যজ্ঞে বামনরূপী বিষ্ণু যখন রাজা বলির থেকে মাত্র তিনপাদ ভূমি প্রার্থনা করলেন, রাজা বলি সানন্দে সেই দানের সম্মতি দিলেন। রাজা বলির সম্মতি পাওয়া মাত্র, শ্রীবিষ্ণু বিশ্বরূপে প্রকট হলেন। প্রথম পদে তিনি সসাগরা ধরিত্রী, দ্বিতীয় পদে স্বর্গলোক থেকে সত্যলোক পর্যন্ত আবৃত করলেন। এরপর, আর কোন স্থান অবশিষ্ট না থাকায়, নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে দৈত্যরাজ বলি নিজের মস্তকে শ্রীবিষ্ণুর তৃতীয় পদ ধারণ করলেন। অর্থাৎ সর্বস্ব হারিয়ে শ্রীবিষ্ণুর বশ্যতা স্বীকার করলেন।       

    নৃসিংহ অবতার - নৃসিংহের জন্যে পুরাণকারেরা দুর্দান্ত একটি কাহিনী রচনা করলেন। কারণ ভগবান ব্রহ্মার বরে হিরণ্যকশিপু শর্ত সাপেক্ষে অবধ্য ছিলেন। শর্তগুলি হল, তাঁকে ঘরের ভেতরে বা বাইরে, দিনে বা রাত্রিতে, মাটিতে বা আকাশে কেউ মারতে পারবে না। কোন অস্ত্র বা শস্ত্রে তাঁকে বধ করা যাবে না। কোন নর কিংবা পশু তাঁকে হত্যা করতে পারবে না। উপরন্তু, কোন প্রাণী বা প্রাণহীন এবং সুর, অসুর ও মহাসর্প ইত্যাদিও তাঁকে মারতে পারবে না। এই শর্তগুলি যেন জটিল এক ধাঁধা (puzzle), এই ধাঁধার সমাধান করতে পারলেই, হিরণ্যকশিপুকে বধ করা সম্ভব। তবে এই ধাঁধা সমাধানের জন্যে নৃসিংহদেবের সৃষ্টি, নাকি নৃসিংহদেবকে অবতার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ধাঁধার সৃষ্টি, সে কথা পুরাণকারেরাই জানেন, আমাদের পক্ষে আজ আর বোঝা সম্ভব নয়। যাই হোক অবতার নৃসিংহ, নর নন, পশুও নন, সুর বা অসুরও নন, তিনি নরপশু। তিনি দিন ও রাতের সন্ধি গোধূলি সময়ে, ঘরের ভিতরে বা বাইরে নয়, ঘরের চৌকাঠে, অস্ত্র বা শস্ত্র দিয়ে নয়, সিংহের নখে, মাটিতে বা আকাশে নয়, নিজের উরুতে রেখে হিরণ্যকশিপুর বক্ষ চিরে হত্যা করেছিলেন।

    পরশুরাম অবতার – ঋষি জমদগ্নির পুত্র ব্রাহ্মণ পরশুরাম ভয়ংকর বীর যোদ্ধা ছিলেন, তাঁর প্রধান অস্ত্র ছিল পরশু অর্থাৎ কুঠার এবং তির ও ধনুক চালনাতেও ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। হৈহয় বংশীয় ক্ষত্রিয় রাজা ও বিষ্ণু ভগবানের অংশাবতার দত্তাত্রেয়র পরমভক্ত কার্তবীর্যাজুন ঋষি জমদগ্নির কামধেনুটি জোর করে হরণ করেছিলেন। সেই ক্রোধে পুত্র পরশুরাম একাই কার্তবীর্যকে বধ করে হৈহয় বংশের বিনাশ সাধন করেন। প্রসঙ্গতঃ কার্তবীর্য ছিলেন নর্মদাতটের মাহিষ্মতীর রাজা – তিনি রাক্ষসরাজ রাবণকে অবহেলায় বন্দী করে আবার মুক্ত করে দিয়েছিলেন, এতটাই বীরত্ব ছিল তাঁর। রাজা কার্তবীর্যার্জুনের পুত্রেরা পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পরশুরামের পিতাকে হত্যা করায় পরশুরাম মাহিষ্মতী নগরীতে গিয়ে সেখানকার সকল ক্ষত্রিয়কে হত্যা করেছিলেন। এর পরেও ক্ষত্রিয়রা অন্যায়বর্তী হলেই তিনি পিতৃহত্যার প্রতিশোধে পৃথিবীকে মোট একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন।   
    পরশুরাম সত্যযুগের মানুষ হলেও, ত্রেতা যুগে তাঁর সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রের সাক্ষাতের কথা শোনা যায়, এবং দ্বাপর যুগের কাহিনী মহাভারতেও পরশুরামের কথা বেশ কয়েকবার এসেছে। আচার্য দ্রোণ তাঁর কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে গিয়েছিলেন। মহাবীর কর্ণ ব্রাহ্মণ পরিচয় দিয়ে পরশুরামের কাছে অস্ত্রশিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন, কিছু ঘটনাচক্রে তিনি ধরা পড়ে যান এবং পরশুরাম তাঁর প্রবঞ্চনায় ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন, তাঁর শেখানো সমস্ত বিদ্যাই চরম বিপদের সময় তিনি ভুলে যাবেন। সত্য যুগের মানুষ ত্রেতা যুগ পার করে, দ্বাপরে এসে পড়লেন!

    শ্রীরাম অবতার – শ্রীরাম ঐতিহাসিক চরিত্র, তিনি অযোধ্যার রাজা ছিলেন, তাঁর মাতা কৌশল্যা, কোশলের এবং বিমাতা কৈকেয়ী কেকয় রাজকন্যা ছিলেন। তাঁর পত্নী সীতা ছিলেন বিদেহরাজ রাজর্ষি জনকের পালিতা কন্যা। তবে রাবণ রাক্ষসরাজ হলেন কী করে, সেটা বোঝা যায় না। তিনি স্বয়ং ব্রহ্মার প্রপৌত্র, সপ্তর্ষির অন্যতম পুলস্ত্যর পৌত্র এবং মুনি বিশ্রবার পুত্র এবং কুবেরের বৈমাত্রেয় ভাই। যদিচ তাঁর মাতা ছিলেন মুনি বিশ্রবার রাক্ষসী পরিচারিকা কৈকেশী বা পুষ্পোৎকটা। এমন বনেদি পিতৃকূল থাকা সত্ত্বেও, রাক্ষসী মাতার পরিচয়ে তিনি রাক্ষস হয়েছিলেন! কঠোর তপস্যা করে রাবণও ব্রহ্মার থেকে বর পেয়েছিলেন, মানুষ ছাড়া আর কেউ তাঁকে কোনদিন পরাস্ত করতে পারবে না। তিনি মানুষকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি, অতএব ভগবান বিষ্ণু নররূপেই শ্রীরাম হয়ে রাবণকে বধ করেছিলেন।

    দুর্ধর্ষ এবং দেবতাদের অপরাজেয় রাবণকে বধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ব্রহ্মলোকে। দেবতাদের মুখপাত্র হয়ে হুতাশন অর্থাৎ অগ্নিদেব ব্রহ্মার কাছে গিয়ে বললেন, “ভগবন্‌, বিশ্রবা পুত্র মহাবীর রাবণের জন্যে স্বর্গে তো আর বাস করা যাচ্ছে না, কিছু একটা উপায় স্থির করুন, আমাদের রক্ষা করুন”। পিতামহ ব্রহ্ম বললেন, “ওহে অগ্নি, সে আমি আগেই ঠিক করে রেখেছি। চতুর্ভুজ বিষ্ণু নর রূপে মর্ত্যে অবতীর্ণ হবেন, তাঁর নাম হবে শ্রীরাম। তবে তার আগে তোমরা দেবতারা সবাই মর্ত্যে যাও, সেখানে ঋক্ষী ও বানরীদের গর্ভে মহাবীর পুত্রদের সৃষ্টি করো, যারা রাবণ বধের সময় বিষ্ণুর সহায় হবেন।” দেবতারা নিজেদের মধ্যে যখন মর্তে আসার পরিকল্পনা করছেন, তখন ভগবান ব্রহ্মা গন্ধর্বী দুন্দুভিকে ডেকে বললেন, “দুন্দুভি, দেবকার্য সুষ্ঠু সম্পাদনের জন্যে তুমিও মর্তে যাও”। (বন/২৭৫)

    এই দুন্দুভিই কুব্জা ও কুদর্শনা পরিচারিকা মন্থরা হয়ে, অযোধ্যার রাজা দশরথের অন্তঃপুরে রাণি কৈকেয়ীর  পরিচারিকা হয়েছিলেন। তিনিই রাণি কৈকেয়ীকে কুমন্ত্রণা দিয়ে শ্রীরামকে বনবাসে যেতে বাধ্য করেছিলেন। তা না হলে, শ্রীরামের বনবাস এবং রাবণবধ কোনোটাই হয়তো ঘটতো না। তবে সুদর্শনা গন্ধর্বী দুন্দুভি, পিঠে কুঁজ নিয়ে কেন কুদর্শনা হয়েছিলেন, সেটা জানা যায় না। হয়তো তিনি মর্ত্যের রাজ-অন্তঃপুরের পরিচারিকাদের দুর্গতির কথা জানতেন (অধ্যায় ২.৫.৩), তাই কোনরকম ঝুঁকি নেননি।

    দেবতারা মর্ত্যে এসে ঋক্ষী ও বানরীদের গর্ভে প্রচুর পরাক্রমী সন্তান উৎপাদন করলেন। যাঁরা রামচন্দ্রের সহযোগী বানরসেনা ও ভল্লুকসেনা (ঋক্ষ মানে ভালুক) হয়ে, রাবণবধ ও সীতা-উদ্ধারে সহায়তা করেছিলেন। বিজ্ঞানের জেনেটিক কোডের বিধান অনুযায়ী, মানুষ বানরী ও ভল্লুকীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করতে পারে না। অতএব স্পষ্টতঃ এই বানর ও ভল্লুক দুটিই অনার্য জনগোষ্ঠী, যাঁদের টোটেম বা আত্মা-দেবতা যথাক্রমে বানর ও ভল্লুক। প্রসঙ্গতঃ বানর গোষ্ঠীর হনুমান, শ্রীরামচন্দ্রের পরমভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডে রামচন্দ্র বহুবার বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন। এই হনুমান সংকটমোচন দেবতা হিসাবে ভারতবর্ষের সর্বত্র হিন্দুদের পূজা পেয়ে থাকেন। এই প্রসঙ্গে আরও একটি আশ্চর্য ঘটনা হল, আমরা সকলেই জানি রাক্ষসরাজ রাবণের দশটি মুখ বা মাথা ছিল, কিন্তু মূল রামায়ণে সেকথার সমর্থন মেলে না। উপরন্তু তিনি ভগবান শিবের একান্ত ভক্ত ছিলেন; আরও শোনা যায় তিনি সর্ব শাস্ত্রে এবং চার বেদেও পণ্ডিত ছিলেন!    

    ৫.৩.২.৩ মহাভারতের কৃষ্ণ
    দশ অবতারের মধ্যে সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ অবতার কৃষ্ণ। এমন সর্বগুণসম্পন্ন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ভারতীয় শাস্ত্রে আর কেউ নেই। বিষ্ণুর অবতার হয়েও, তাঁর অদ্ভূত ও আশ্চর্য লীলায় তিনি হিন্দুধর্মের স্বয়ংসম্পূর্ণ দেবতা হয়ে ভক্তদের মনে সর্বদাই বিরাজিত।

    মহাভারতে কৃষ্ণের উপস্থিতি বেশ কিছুটা পরে, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায়। দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ ও তাঁর দাদা বলরাম স্বয়ংবর সভায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে উত্তর ভারতের রাজাদের প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন, এবং পাণ্ডবরাও উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে। ছদ্মবেশে থাকলেও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিচক্ষণ কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের চিনতে ভুল করলেন না। দুর্যোধনের ষড়যন্ত্রে মাতাকুন্তী সহ পাণ্ডবদের জতুগৃহে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর জনশ্রুতি তাঁর কানে এসেছিল, কিন্তু এভাবে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে সেকথা তিনি বিশ্বাস করেননি। সেদিন স্বয়ংবর সভায় সুস্থ সবল পঞ্চপাণ্ডবদের দেখে তিনি যেমন নিশ্চিন্ত হলেন, তেমনি কিছুটা হতাশও হলেন। কারণ তাঁর মনে ক্ষীণ আশা ছিল কন্যারত্ন দ্রৌপদীকে তিনি হয়তো লাভ করতে পারবেন। কিন্তু এখন সে আশা তিনি ছেড়ে দিলেন, কারণ অর্জুন যেখানে উপস্থিত, সেখানে তাঁর কোন আশাই নেই।

    দ্রৌপদীর আশা ত্যাগ করে তিনি যে দুঃখী হলেন, তাও নয়, কারণ শত কষ্টেও তিনি কখনো দুঃখী হন না, উদ্বিগ্ন হন না, তিনি সর্বদাই আস্যমুখ। বরং তিনি দ্রুত ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে শুরু করলেন। পাণ্ডবমাতা কুন্তী তাঁর পিসি, পঞ্চপাণ্ডবেরা তাঁর পিসতুতো ভাই এবং অর্জুন তাঁর সমবয়সী। অতএব তিনি ও বলরাম পাণ্ডবদের স্বাভাবিক আত্মীয় ও মিত্র। অন্যদিকে পাণ্ডবদের জন্ম-শত্রু দুর্যোধন এবং তাঁর নিরানব্বই জন ভাই; উপরন্তু কৃষ্ণের চরম-শত্রু জরাসন্ধ দুর্যোধনের প্রিয়সখা। অর্জুন যদি দ্রৌপদীকে লাভ করতে পারে, প্রতিপত্তিশালী দ্রুপদ ও তাঁর পুত্র বীর ধৃষ্টদ্যুম্ন হবে পাণ্ডবদের আত্মীয়। সেক্ষেত্রে আর্যাবর্তের রাজনীতিতে দুটি শক্তিশালী মেরু গড়ে উঠবে। স্বাভাবিক সম্পর্ক সূত্রে তিনি পাণ্ডবপক্ষেই যাবেন, তখন তাঁর চিরশত্রু, যাঁর জন্যে তাঁদের সবাইকে মথুরা এবং বৃন্দাবন ছেড়ে দ্বারকায় সরে আসতে হয়েছে, সেই জরাসন্ধের বিনাশও তাঁর পক্ষে সহজ হয়ে যাবে। তিনি দূরদর্শী, তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন না, তিনি সুচিন্তিত পরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ রচনা করেন। অতএব সেই স্বয়ংবর সভায় দুর্যোধন, জরাসন্ধ, শল্য, শাল্ব প্রমুখ বীর রাজাদের ব্যর্থ প্রয়াস দেখার জন্যে তিনি স্মিতমুখে বসে রইলেন নিশ্চিন্তে!

    ভারতীয় হিন্দুদের কাছে মহাভারতের ঘটনাবলী অতি পরিচিত, অতএব সে প্রসঙ্গে আর বাক্য বিস্তার করছি না। বরং কৃষ্ণ প্রসঙ্গে অন্য গ্রন্থাদির আলোচনায় যাওয়ার আগে, মহাভারতের ভয়ানক অশুদ্ধির দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া।

    ৫.৩.৩ মহাভারতের অশুদ্ধি
    মহর্ষি বেদব্যাস বেদের সংকলন এবং মহাভারত রচনা তখন সমাপ্ত করেছেন। তিনি তখন বৃদ্ধ। সমগ্র দেশের পণ্ডিতমহলে তাঁর অশেষ যশ ও সম্মান। কিন্তু তাঁর মনে শান্তি নেই। মহর্ষি বেদব্যাস অদ্ভূত এক মানসিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার কারণ তাঁর যুবক পুত্র শুকদেব, যিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক সিদ্ধযোগী ব্রহ্মর্ষি। সে কখনো কখনো শিশুর মতো নগ্ন অবস্থায় বিচরণ করে, তার থাকা-খাওয়ার কোন স্থিরতা নেই। মহর্ষি এই পুত্রের জন্যে বড়ো বিব্রত বোধ করেন। একদিন আশ্রম থেকে নগ্ন হয়ে শুকদেব বেরিয়ে পড়লেন, তাঁকে আটকাতে তিনিও দৌড়লেন পুত্রের পিছনে। পথের ধারে এক সরোবরে কয়েকজন অপ্সরা স্নান করছিল, যুবক শুকদেব নগ্ন অবস্থাতেই ওই সরোবরের পাশ দিয়ে যখন হেঁটে গেলেন, অপ্সরাগণ এতটুকু বিচলিত হল না। কিন্তু বৃদ্ধ বেদব্যাস পুত্রকে অনুসরণ করে সরোবরের কাছাকাছি যেতেই অপ্সরা কন্যারা লজ্জায় সচকিতে তাদের অঙ্গ আবৃত করল। মহর্ষি বেদব্যাস বিস্মিত হলেন, তিনি অপ্সরাদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তারা সলজ্জ নতমুখে বলল, “দয়া করে অপরাধ নেবেন না, মহর্ষি বেদব্যাস, আপনার পুত্র শুকদেব শিশুর মতো, তাঁর নির্মল দৃষ্টিতে স্ত্রী-পুরুষে প্রভেদ নেই, কিন্তু আপনার...”।

    মহর্ষি বেদব্যাস আরও বিষণ্ণ হলেন। তিনি চার বেদের সংকলন করেছেন, অজস্র শিষ্যকে বেদের পাঠ দিয়েছেন। শূদ্র এবং নারীদের বেদপাঠ নিষিদ্ধ বলে, তিনি পঞ্চম বেদস্বরূপ মহাভারত রচনা করে, সকলের কাছে বেদের জ্ঞান প্রকাশ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা সত্ত্বেও, তিনি পূর্ণ ব্রহ্মলাভ করতে পারেননি। সামান্য অপ্সরাগণও তাঁর মতো জ্ঞানবৃদ্ধের দৃষ্টিতে সমদর্শন দেখতে না পেয়ে, লজ্জিতা হয়, তাঁকে সাধারণ মানুষ বলেই মনে করে! সেদিন সরস্বতী নদীর তীরে বসে, নির্জন গোধূলিতে তিনি চিন্তা করতে বসলেন, তবে কী আমার জ্ঞান অসম্পূর্ণ এবং অপরিণত?

    সেখানে উপস্থিত হলেন ত্রিকালজ্ঞ দেবর্ষি নারদ। তিনি মহর্ষিকে তাঁর বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। মহর্ষি তাঁর মানসিক অবস্থার কথা সবিস্তারে যখন বললেন, দেবর্ষি মনোযোগে শুনলেন। তারপর দেবর্ষি বললেন, “হে মুনিবর, মহাভারতে আপনি নানাবিধ অলঙ্কার ও উপমায় ধর্ম সাধনার কথা বলেছেন, ধর্ম ও অধর্মের বিচার করেছেন, তার কর্মফলের নির্দেশ দিয়েছেন। এক কথায় মহাভারতের কাহিনীসমূহ বায়স-চিত্ত-বাসনাগ্রস্ত মানুষের উপযুক্ত হয়েছে। তারা কাকের মতোই ওই গ্রন্থের অলংকার, উপমা এবং সুরচিত কাহিনীগুলি ঠুকরে উপভোগ করে, অন্যত্র উড়ে যাবে। ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত-হংসেরা কখনো মহাভারতে বিহার করবেন না। কারণ মহাভারতে ভগবানের যশোগান নেই, মহিমাগাথা নেই। অশুদ্ধপদে, ভ্রান্ত উপমায় বাসুদেবের মহিমা কীর্তন করে লেখা নিরলঙ্কার গ্রন্থও মহান গ্রন্থ, কিন্তু ভক্তিহীন জ্ঞানের আকর গ্রন্থ মূল্যহীন। কারণ ওই গ্রন্থপাঠে ভগবানকে অনুভব করা যায় না। আপনি দৃঢ়ব্রত, সত্যনিষ্ঠ, পুণ্যকীর্তি, বহুদর্শী ও বেদশাস্ত্রে পারদর্শী। আপনি অখিল বিশ্বের বন্ধনমুক্তির জন্যে শ্রীহরির লীলা কীর্তন করুন। যা পাঠ করলে, বিদ্বান ব্যক্তিদের জানার আর কোন বিষয় অবশিষ্ট থাকে না, আপনি সেই ভগবানের মহিমা কীর্তন করুন।  

    উপরের ঘটনাটি শ্রীমদ্ভাগবত-সংহিতার (পুরাণ) প্রাক-কথনের সংক্ষিপ্তসার। এরপরেই মহর্ষি বেদব্যাস এই গ্রন্থ রচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্পষ্টতঃই এই কাহিনী কল্পিত এবং আরোপিত। কারণ আমরা আগেই দেখেছি, মহর্ষি বেদব্যাসের সময়কাল, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সমসাময়িক, মোটামুটি ৯০০ বি.সি.ই-তে। বিশেষজ্ঞরা বলেন পুরাণগুলির সম্ভাব্য রচনা কাল খ্রী.পূ. দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত। এবং আমার মনে হয় শ্রীমদ্ভাগবত সম্ভবতঃ গুপ্তযুগের সমকালীন রচনা, কারণ সে সময় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সম্পূর্ণ হিন্দুধর্ম হয়ে উঠেছে। আমার এই অনুমানের আরও কারণ, অন্যান্য পুরাণ গ্রন্থগুলির তুলনায় শ্রীমদ্ভাগবত অনেক পরিণত রচনা এবং বক্তব্যের দিক দিয়েও অত্যন্ত স্বচ্ছ। মহাভারত রচনার প্রায় পনেরশ’ বছর পরে মহর্ষি বেদব্যাসের বিষণ্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কোথায়?  

     অতএব এমন সিদ্ধান্ত করাই যায়, মহাভারত রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাসের যশ ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে, পুরাণকারেরা, তাঁর নামের আড়ালে প্রায় সকল পুরাণ রচনা করেছেন। পৌরাণিক ভক্তিতে ভারতভূমিকে প্লাবিত করার আগে, উপরে বর্ণিত কাহিনীর একটি প্রেক্ষাপট রচনা তাঁদের প্রয়োজন ছিল। কাল্পনিক এই ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাঁরা মহর্ষি বেদব্যাসের রচিত মহাভারতকেও ছেড়ে দেননি। কাক-ভক্ষ্য মহাভারতকে, হংস-বিহারী মহাভারতে রূপান্তরের জন্যে মহাভারতে তাঁরা বহু অধ্যায়েরই অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন।  

    চলবে...
    পঞ্চম পর্বের চতুর্থ অধ্যায় আসবে ০৫/০৯/২২ তারিখে।

    গ্রন্থঋণঃ
    ১। শ্রীমদ্ভাগবত – মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস (?) রচিত মূল সংস্কৃত থেকে বাংলায় গদ্য অনুবাদ – সম্পাদনা তারাকান্ত কাব্যতীর্থ ভট্টাচার্য।
    ২। মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস রচিত মহাভারত – মূল সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ – মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয়। বসুমতী সাহিত্য মন্দির, কলকাতা ৭০০০১২। এই পর্বে বহু ক্ষেত্রেই এই গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি গ্রহণ করা হয়েছে।

    [1] রাজস্থানের বিকানিরে কর্ণি মাতা মন্দিরে অজস্র পবিত্র মূষিক আজও পূজিত হয়।   

    [2] মৈনাক হিমালয়ের পুত্র এবং শিব জায়া পার্বতীর ভ্রাতা। ছোট এই পর্বত নাকি উড়তেও পারতেন।    

    [3] সারা ভারতে তামিল ভাষাই প্রথম আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাই একমাত্র এই ভাষাতেই প্রাক-আর্য কিছু নাম পাওয়া গিয়েছে।

    [4] দেবী লক্ষ্মী আজও আমাদের সমৃদ্ধি দেন, কিন্তু সে সময় তিনি নিরাপত্তাও দিতেন। অতএব অনুমান করা যায়, খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে দেবী লক্ষ্মী পূর্ণ দেবী রূপেই পূজিতা হতেন। পরবর্তীকালের হিন্দুধর্মে, তিনি নিরাপত্তার ব্যাপারটা তাঁর মাতা দেবী দুর্গার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।   

    [5] তড্ডি অর্থাৎ তাড়ি – তাল, খেজুর অথবা নারকেল গাছের রস থেকে বানানো মদ।

    [6] পৌরাণিক মতে পাতালের সাতটি বিভাগ আছে – অতল, বিতল, সুতল, তলাতল,  মহাতল, রসাতল, পাতাল – এই রসাতলেই পৃথ্বীর পতন ঘটেছিল! পাতাল ছিল দৈত্যদের রাজ্য – হিরণ্যাক্ষ, হিরণ্যকশিপু, প্রহ্লাদ, বিরোচন, বলি ও বাণ এই কয়েকজন বিখ্যাত দৈত্যরাজার নাম পুরাণে পাওয়া যায়।   

    [7] বাসুকি সর্পরাজ বসুকের পুত্র। তাঁর বোনের নাম জরৎকারু (পরবর্তী কালে তিনিই মা মনসা), ভগ্নীপতি মুনি জরৎকারু এবং ভাগিনেয়র নাম আস্তিক। সর্পযজ্ঞের অনলে সকল সর্পকে বধ করা থেকে রাজা জন্মেজয়কে বিরত করেছিলেন এই আস্তিক মুনি। সর্পরাজ বাসুকিকে দু’বার রজ্জু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, একবার রাজা সত্যব্রতর নৌকা এবং আরেকবার সমুদ্রমন্থনের সময় মন্দর পর্বতকে বাঁধতে।          
     
  • ধারাবাহিক | ৩০ আগস্ট ২০২২ | ৪০৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৩:৪৫511516
  • হে কিশোর ঘোষাল 
     
    এই তব নব মেঘদূত 
    অপূর্ব অদ্ভুত 
    ছন্দে গানে 
    চলিয়াছে অলক্ষ্যের পানে 
  • Kishore Ghosal | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৫:১৯511518
  • হা হা হা - অনেক ধন্যবাদ, স্যার । তবে অলক্ষ্যের পানে বলবেন না, লক্ষ্য কিছু একটা তো রয়েছে ...  
  • হীরেন সিংহরায় | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৫:২২511519
  • আপনার লেখায় সেই অলক্ষ্যকে ধরেছেন !
  • হীরেন সিংহরায় | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৫:৫২511520
  • দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভা কি আরেকটু আগে হয় নি ? জতুগৃহে তিনি তো পাণ্ডবদের সঙ্গেই ছিলেন ? 
  • দীপ | 42.110.137.61 | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৬:৩১511521
  • ব্যাস, পরশুরাম, বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র- এঁরা ব্যক্তিবিশেষ নন,  গোত্রনাম। 
    পরশুরাম একটি সম্প্রদায় তাঁরা বংশ পরম্পরায় বা শিষ্যপরম্পরায় অস্ত্রশিক্ষা দিতেন। অর্থাৎ রামায়ণের পরশুরাম আর মহাভারতের পরশুরাম এক ব্যক্তি নন!
  • দীপ | 42.110.137.61 | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৬:৪৩511522
  • এমনকি রাবণ‌ও কোনো একক ব্যক্তি নয় বলেই মনে হয়। উত্তরকাণ্ড অনুসারে রাবণের সঙ্গে কার্তবীর্যার্জুনের যুদ্ধ হয়েছিল, যিনি রামের অনেক আগের লোক। সুতরাং রাবণ‌ও কোনো একক ব্যক্তি নন, একটি বংশের কৌলিক নাম।
    এক‌ইভাবে জনক‌ও কোনো ব্যক্তির নাম নয়, মিথিলারাজের কৌলিক নাম।
  • দীপ | 42.110.137.61 | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৬:৪৭511523
  • আর মহাভারতের সময়সীমা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই, সব‌ই বিভিন্ন ব্যক্তির অনুমান। লেখক তাঁর দাবীর পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারেননি, সবই তাঁর অনুমান।
  • Kishore Ghosal | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৬:৫৮511524
  • হীরেন স্যার, জতুগৃহ-দহন নামক গোপন ষড়যন্ত্রের বার্তা দেওয়া থেকে, পরিত্রাণের উপায় নির্দেশ এবং সকলের চোখে ধুলো দিয়ে পালানোর ব্যাপারে বিশ্বস্ত সাহায্য করেছিলেন মহামতি বিদুর। সে সময় কৃষ্ণ তাঁর নিজের সমস্যা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। যদিও এই সমস্ত বিষয়েই তিনি অবহিত ছিলেন। 
       
  • Kishore Ghosal | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৭:০৪511525
  • হীরেন স্যার, জতুগৃহের ঘটনা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভার থেকে, অনেকটাই আগের ঘটনা।  
  • Kishore Ghosal | ৩০ আগস্ট ২০২২ ১৭:০৮511526
  • দীপবাবু, অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা আমার লেখাটি পড়ে মন্তব্য করার জন্যে।  
  • Sara Man | ৩১ আগস্ট ২০২২ ১৯:২৭511532
  • এই পর্বটিও অসাধারণ।
  • Sara Man | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১০:৪৬511550
  • কিশোরবাবু, এই পর্বটি পড়ে আমার আগের পর্বে রাখা জিজ্ঞাসার অনেকটাই মিটেছে। এবারে নতুন বক্তব্য - 
     
    ১। রাম ঐতিহাসিক চরিত্র - এই কথার সপক্ষে আমি কয়েকটি প্রমাণ জানতে চাই। 
    ২। দেখুন আমার পর্যবেক্ষণ বলে যে পূর্বভারতে দেবতা হিসেবে রামের প্রভাব কম। অথচ পারিবারিক ইতিহাস চর্চা করে দেখছি পূর্ব পুরুষ ও প্রাচীন মানুষদের বেশিরভাগের নামেই রাম শব্দটি আছে। যেমন, রামরাম, রামকুমার, রামশরণ, জগতরাম - মায় কেনারাম, বেচারাম পর্যন্ত। তবে কি আগে রামের প্রভাব বেশি ছিল? 
    ৩। শিব কেন কৈলাসে থাকেন, সেটা জানতে পেরে খুবই আনন্দিত হলাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শিবের মত বর চাওয়া এবং শিবরাত্রি পালন করার প্রথাটি কবে থেকে এল? 
  • Kishore Ghosal | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০৬511552
  • শারদা ম্যাম, 
     
    শ্রীরামচন্দ্রের জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে আমি লিখেছি -  "গঙ্গা-যমুনা-গোমতী-শোণ প্রভৃতি নদীর উর্বর অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের কাছে দেবতুল্য মহামানব ছিলেন শ্রীরাম। রামায়ণের বহু আগে থেকেই তাঁর বীরত্বের গাথা লোকমুখে প্রচলিত ছিল"। সেই জনপ্রিয় দেবতুল্য মানুষটিকে বিষ্ণু - অবতার বানিয়ে দেবতা করে তুলল পুরাণ এবং রামায়ণ।  অবতার হওয়ার আগে তাঁর পূজা আরম্ভ হয়েছিল বলে মনে হয় না। আমাদের লৌকিক জীবনে রামের প্রভাব অপরিসীম। আমার বক্তব্যের সমর্থনে বলতে পারি, বাল্মিকী রামায়ণ ছাড়াও আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, নেপালে, এমনকি বালি এবং জাভা দ্বীপেও  অনেকগুলি শ্রীরাম-কথা প্রচলিত ছিল - কিছু কিছু এখনও রয়েছে। সে কাহিনীগুলির সঙ্গে আমাদের "রামায়ণ"-এর কাহিনী তেমন মেলে না। এত প্রাচীন এবং এমন বিস্তৃত অঞ্চলের লোককথার পিছনে কোন একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থাকা অসম্ভব নয়। তবে কোন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি।
     
     শিবের মতো বর চাওয়া এবং শিবরাত্রি পালন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল একথা বলা মুশকিল। 
     
    শিব-সতী এবং শিব-পার্বতী - এই দুই দাম্পত্যের মতো অতি বিশ্বস্ত এবং একনিষ্ঠ সম্পর্কের উদাহরণ আর কোন দেব-দম্পতির মধ্যে আমি  অন্ততঃ পাইনি। যার কাল্পনিক পরিণতি "অর্ধনারীশ্বর" মূর্তি। অতএব আজন্ম ভাগ্যের ওপর পূর্ণতঃ নির্ভরশীলা ভারতীয় মেয়েরা শিবের মতো বরের প্রত্যাশা করবেন বৈকি!
     
    আপনার মনের কোনে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলিকে বারবার উস্কে দিতে পারছি - এতেই আমার লেখা সার্থক।  শিব ও পার্বতী সংবাদ নিয়ে আরও আলোচনা আসবে পরবর্তী পর্বে।         
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন