ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ধর্মাধর্ম - তৃতীয় পর্ব - ষষ্ঠ ও অন্তিম ভাগ 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ০১ জুলাই ২০২২ | ৫২৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • তৃতীয় পর্ব - ৬০০ বিসিই থেকে ০ বিসিই - ষষ্ঠ ও অন্তিম ভাগ

     
    ৩..১  মৌর্য শিল্প-ভাস্কর্য-স্থাপত্য
    এক সিন্ধুসভ্যতা ছাড়া ভারতের প্রাক-মৌর্য প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিল্প এবং স্থাপত্যের পরিমাণ বিরল। হয়তো কিছু ছিল, কালের নিয়মে ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ মৌর্য যুগের আগে পাথরের স্থাপত্যের প্রচলন ছিল, রাজধানী বা রাজপ্রাসাদের প্রাচীরে অথবা দেওয়ালে। ভারতবর্ষের স্থাপত্যে পোড়া-ইঁট এবং আমা-ইঁটেরই বহুল ব্যবহার ছিল, তার সঙ্গে ছিল অলংকৃত কাঠের স্তম্ভ এবং কাঠের কারুকাজ। পাথরের শিল্প-স্থাপত্য তৈরির কারিগরি দক্ষতার কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। চন্দ্রগুপ্ত এবং পরবর্তী কালে অশোক অবশ্যই অ্যাকিমিনিড সাম্রাজ্যের পারসিপোলিস শহরের প্রাসাদ এবং অন্যান্য পাথরের স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তাঁরা ওই অঞ্চলের বেশ কিছু দক্ষ শিল্পীকে পাটলিপুত্রে নিয়ে এসেছিলেন। পাটলিপুত্রের রাজপ্রাসাদের প্রধান স্থপতিরা ছিলেন পারস্য এবং ব্যাক্ট্রিয়া থেকে আসা বেশ কিছু দক্ষ শিল্পী।

    সেলুকাসের গ্রীক রাজদূত মেগাস্থিনিস দীর্ঘদিন পাটলিপুত্রে ছিলেন। তাঁর ভারত ভ্রমণের মূল গ্রন্থ “ইণ্ডিকা” লুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু পরবর্তী বহু গ্রীক পর্যটক এবং পণ্ডিতদের রচনায়, তাঁর গ্রন্থের বহু উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। সেই উদ্ধৃতি থেকে জানা যায়, “পাটলিপুত্র শহর ছিল গঙ্গা এবং শোন নদীর সঙ্গমে। দৈর্ঘে ১৪.৫০ কি.মি এবং প্রস্থে ২.৪০ কি.মি.। রাজধানীর সীমানা জুড়ে ছিল কাঠের প্রাচীর, তারমধ্যে ৫৭০টি কাঠের টাওয়ার এবং ৬৪টি দরজা ছিল”। যদিচ পাটলিপুত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে সামান্য কিছু কাঠের কড়ি-বরগা আর পাটা পাওয়া গেছে। আর পাওয়া গেছে ৮০টি প্রস্তর-স্তম্ভের অবশেষ – বিশেষজ্ঞরা তার পালিশ এবং শিল্প-দক্ষতাকে মৌর্য-শিল্প নাম দিয়েছেন। তাঁরা অনুমান করেন, এই পাথরের স্তম্ভের ওপর কাঠের কাঠামোর ছাদ নিয়ে হয়তো কোন বড়ো সভাঘর ছিল পাটলিপুত্র রাজধানীতে। হয়তো এটি পারসিপোলিসের “শত-স্তম্ভ সভাঘর” (“hundred -pillared hall”)-এর অনুকরণে তৈরি হয়েছিল।

    ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সম্রাট অশোক অজস্র বৌদ্ধ বিহার ও স্থাপত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের অতিরঞ্জিত মতে ৮৪০০০!  তার মধ্যে সামান্য কিছুর হদিশ পাওয়া যায়, অধিকাংশই কালের নিয়মে ধ্বংস হয়েছে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সম্রাট অশোকের বানানো অনেকগুলি স্তূপের মধ্যে সারনাথ স্তূপের অবশেষটুকুই সম্রাট অশোকের বানানো। তক্ষশিলার “ধর্মরাজিকা” স্তূপ সম্ভবতঃ কুষাণরাজ কণিষ্কের বানানো, তিনি “ধর্মরাজ” অশোককে অনুসরণ করেই হয়তো এটির নামকরণ করেছিলেন। কারণ সারনাথের স্তূপটিরও নাম “ধর্মরাজিকা”। প্রত্নখননে দেখা গেছে, অশোকের স্তূপটিকে আবৃত করে দ্বিতীয় থেকে দ্বাদশ শতাব্দী সি.ই.-র মধ্যে ছটি স্তূপ বানানো হয়েছিল। অশোকের স্তূপটির চারপাশে পাথরের রেলিং রয়েছে যার পালিশ এবং ফিনিশিং মৌর্য-শিল্পের অনুগামী। অশোক যে সাঁচী স্তূপ বানিয়েছিলেন, সেটিকেও চাপা দিয়ে পরবর্তীকালে অনেক বড় করে স্তূপ বানানো হয়েছিল। অশোকের স্তূপের শীর্ষে থাকা পাথরের ছাতার কিছুটা অবশেষ থেকে তাকে মৌর্য-শিল্পের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সাঁচী স্তূপের প্রত্নখননে অশোকের যে স্তূপটি পাওয়া যায়, সেটির আকার অর্ধগোলক, যার ব্যাস প্রায় ৬০ ফুট। স্তূপটি বড়ো বড়ো ইঁট দিয়ে বানানো। অশোকের বানানো সারনাথ স্তূপের আকার ও উপাদান সাঁচী স্তূপের মতোই। বৈরাত স্তূপের ভিত, পাথরের দুটি স্তম্ভ, ছাতা এবং একটি পাত্র পাওয়া গেছে, যেগুলি বিশেষজ্ঞরা মৌর্য-শিল্পের নিদর্শন বলে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। পাথরের ছাতাটি নিশ্চয়ই স্তূপের শীর্ষে বসানো ছিল।

    পাহাড় কেটে বারাবর গুহাবাসগুলি অশোক এবং পরবর্তী কালে তাঁর পৌত্র দশরথ বানিয়েছিলেন। এই গুহাবাসগুলিই ভারতবর্ষের প্রথম গুহা স্থাপত্য। গুহাগুলি আজীবিক সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের জন্যে নির্মিত হয়েছিল। পাথর খোদাই করে, কাঠের কাঠামোর অনুকরণে গুহাগুলির ছাদ, দেওয়াল ও গুহামুখ বানানো হয়েছিল। একই পদ্ধতিতে অজন্তা-ইলোরার গুহাগুলিও পরবর্তী সময়ে বানানো হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাথর কেটে এই গুহাগুলি বানানোর অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন পারসিপোলিস এবং নকশ্‌-ই-রুস্তম্‌- এর ছোট ছোট পাহাড় কেটে বানানো গুহাগুলি দেখে। যেগুলির নির্মাণ কাল ৩৩৫-৩৩০ বি.সি.ই।

    অশোকের সময়ের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন যা পাওয়া গেছে, সেগুলি হল পাথরের স্তম্ভগুলি (Stone pillars)। অশোক নিজে এই স্তম্ভগুলিকে “শিলা থভে”  (শিলা স্তম্ভ) বলতেন।  পাথরের স্তম্ভগুলি নিখুঁত গোল, নিচ থেকে ওপরে সামান্য সরু (tapered), একটিমাত্র পাথর কেটে বানানো অর্থাৎ মনোলিথিক (monolithic) এবং চকচকে পালিশ করা। হলদেটে বাদামি রঙের এই বেলেপাথরগুলি সম্ভবতঃ উত্তরপ্রদেশের চুনার এবং মথুরা অঞ্চল থেকে আনা হত। মৌর্য-শিল্পের পালিশ বলতে বার্ণিশের প্রলেপ নয়, বরং শক্ত কোন পাথর ঘষে মসৃণ করা হত। স্তম্ভগুলির উচ্চতা ৩০ থেকে ৪৫ ফুট এবং তার মাথায় থাকত অপূর্ব সুন্দর অলংকৃত শীর্ষফলক। এই শীর্ষফলকের অনেকগুলিই নষ্ট হয়ে গেছে, যে কটি পাওয়া গেছে, সেগুলি হল (ক) একক সিংহ মূর্তি – বিহারের রামপূর্বার একটি স্তম্ভ – এখন কলকাতা মিউজিয়মে রাখা আছে। (খ) একক বৃষ মূর্তি – বিহারের রামপূর্বার অন্য একটি স্তম্ভ – এখন দিল্লি মিউজিয়মে রাখা আছে। (গ) সারনাথ এবং সাঁচীর স্তম্ভ – চারটি সিংহমূর্তি, পিঠে পিঠ দিয়ে বিপরীত মুখে বসে আছে। এই মূর্তিটিই ভারতের জাতীয় প্রতীক – “অশোকস্তম্ভ”। দুই স্তম্ভেরই চার সিংহের মাথার ওপরে বসানো ছিল, বত্রিশ অরের (spokes) ধর্মচক্র। সেগুলি ভেঙে গেছে। এই পশুমূর্তিগুলি অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সুন্দর এবং তাদের দৃপ্তভঙ্গির জন্যে সারা বিশ্বের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে। পাথরের এই সূক্ষ্ম মূর্তি এবং স্তম্ভগুলি নির্মাণে বিদেশী শিল্পীর স্পর্শ যে ছিল সেকথা সহজেই অনুমান করা যায়। কারণ পাথরের কাজে ভারতীয়দের এই দক্ষতা সেই সময় ছিল না, তবে পরবর্তীকালে ভারতীয় শিল্পীরাও যে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছিল, তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে আছে সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মৌর্য-পালিশ, পাথরের স্তম্ভ, শীর্ষফলক, পশুমূর্তি, পদ্মপাপড়ির নকশা - এই সবই ছিল অ্যাকিমিনিড স্থাপত্যের সাধারণ চরিত্র।
     
     
                                                                                                                                                              অশোক স্তম্ভ - বৈশালী,বিহার 

    অতএব একথা সহজেই স্বীকার করা যায়, ভারতীয় স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের যে আশ্চর্য সুষমা সারা বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছে, তার সূত্রপাত করেছিলেন মৌর্যবংশের দুই রাজা – চন্দ্রগুপ্ত এবং বিশেষ করে অশোক।

    ৩.৬. অশোকের ধম্ম (ধর্ম) ধারণা
    অশোকের ধর্মধারণা – যাকে আমি ধর্ম থেকে আলাদা করতে “ধম্ম” (সংস্কৃত “ধর্ম”-এর প্রাকৃত “ধম্ম”) বলেছি, সেগুলি খুবই সাধারণ কিছু সদ্‌গুণের উপদেশ। এই সদ্‌গুণগুলি রাজা অশোক তাঁর প্রজাদের মনের মধ্যে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন। এবং সেই কারণেই তিনি তাঁর পাথরের নির্দেশগুলিতে প্রায় একই কথা বারবার বলে গিয়েছেন, তাঁর রাজত্বকালের শেষ পর্যন্ত।

    সেই সদ্‌গুণগুলি হল, সমস্ত জীবের প্রতি করুণা; ব্রাহ্মণ, শ্রমণ বা সন্ন্যাসীদের দান; বন্ধু, আত্মীয় এবং পরিচিতজনকে উপহার। বিশ্বস্ততা, সততা, শুদ্ধ চিন্তা, বিনয়, কৃতজ্ঞতা, আত্ম-সংযম, বিপদে-আপদে দৃঢ় মানসিকতা, মিতব্যয়িতা। মা-বাবা-গুরুজন-শিক্ষককে ভক্তি, ব্রাহ্মণ, শ্রমণ, আত্মীয়, ভৃত্য এবং ক্রীতদাসদের প্রতি ভদ্র আচরণ। হিংস্রতা, নৃশংসতা, ক্রোধ, অহংকার এবং ঈর্ষা ত্যাগ করা, শুভকর্ম, বৃদ্ধ, দুঃস্থ এবং দুর্বলের সেবা। অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহিষ্ণুতা। অর্থহীন সংস্কার এবং প্রথা বিসর্জন দেওয়া, ধর্মীয় গোঁড়ামি ত্যাগ করা।

    একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তিনি বেদ বা উপনিষদের বক্তব্য থেকে খুব আলাদা কিছু বলেননি। মহাভারতের শান্তিপর্ব, অনুশাসন পর্বে এমন উপদেশ দেওয়া আছে অধ্যায়ের পর অধ্যায় জুড়ে।  বৌদ্ধ এবং জৈনধর্ম থেকে তিনি একটা গুণই নিয়েছিলেন – প্রাণীহত্যা না করা। অবিশ্যি সে কথাও উপনিষদে বহু জায়গাতেই বলা আছে, যদিচ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ব্রাহ্মণরা যজ্ঞে জীববলি আবশ্যিক করেছিলেন। আসলে তাঁর ধম্মের অধিকাংশ গুণগুলিই নৈতিক গুণ, যেগুলি অনুসরণ করলে মানুষের দুঃখ-কষ্ট কমবে, জীবনে আসবে স্বস্তি আর শান্তি।

    তিনি নিজে বৌদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু তাই বলে তিনি কখনোই অন্য বিশ্বাসীদের অস্বীকার করেননি, বরং বারবার বলেছেন, পরমত সহিষ্ণু হতে এবং অন্যান্য বিশ্বাসকেও শ্রদ্ধা করতে। তিনি নিজেকে “দেবতাদের প্রিয়” বলেছেন, কিন্তু কোনদিন কোন জায়গাতেই কোন দেবতার নাম উল্লেখ করেননি এবং কখনো কোন দেবতার পূজা বা যজ্ঞ করতে বলেননি। অশোকের ধম্ম আসলে “শীলতা” অর্থাৎ সৎ স্বভাব – বিশেষ কোন ধর্মবিশ্বাস, মতবাদ, প্রথা, সংস্কার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা পূজা নয়। অশোক কখনো মোক্ষ, নির্বাণ, ধ্যান, সন্ন্যাস, তপস্যা, আত্মত্যাগের কথাও বলেননি, যে কথাগুলি ভারতীয় প্রত্যেকটি প্রধান ধর্মেরই মূল বক্তব্য।

    সম্রাট অশোকের এই শিলা-নির্দেশটি, আমার মতে তাঁর ধম্ম-কথার সার সংক্ষেপঃ-          
    “দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী এই কথা বলেন, - লোকে নানাবিধ মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অসুস্থ হলে, অথবা পুত্র বা কন্যার বিবাহে, অথবা সন্তানের জন্ম হলে, অথবা (কোথাও) যাত্রার প্রাক্কালে – লোক এই সব এবং অন্য আরো অনেক মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই সব অনুষ্ঠানে মেয়েরা আবার বহুবিধ এবং নানান ধরনের তুচ্ছ এবং অর্থহীন মঙ্গল-ব্রত পালন করে। মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন নিশ্চয়ই করা উচিৎ, কিন্তু এই ধরনের মঙ্গল অনুষ্ঠানে অতীব তুচ্ছ-ফল লাভ হয়ে থাকে।

    কিন্তু কোন (কোন) মঙ্গল অনুষ্ঠানে মহাফল লাভ হয়ে থাকে, যেমন ধম্ম-মঙ্গল অনুষ্ঠান। এর (অনুষ্ঠানের) মধ্যে রয়েছে, ক্রীতদাস এবং ভৃত্যদের প্রতি সঠিক আচরণ; গুরুজনদের প্রতি সশ্রদ্ধ এবং প্রশংসনীয় বাধ্যতা; প্রাণীদের প্রতি প্রশংসনীয় নম্র ব্যবহার; সন্ন্যাসী ও শ্রমণদের প্রতি প্রশংসনীয় দান; এইগুলি এবং এই ধরণের অন্যান্য (আচরণ)-কেই ধম্মের মঙ্গল অনুষ্ঠান বলা যায়। অতএব, (এই) কথাগুলি একজন পিতার অথবা এক পুত্রের অথবা এক ভ্রাতার অথবা একজন প্রভুর বলা কর্তব্য – “এই(আচরণ)গুলি প্রশংসনীয়;  এই মঙ্গল অনুষ্ঠান যতদিন না লক্ষ্যপূরণ হচ্ছে ততদিন আচরণ করা উচিৎ”।

    এবং একথাও বলা হয় যে, “দান করা প্রশংসনীয়”। কিন্তু ধম্ম-দান অথবা ধম্ম-উপকারের তুল্য কোন দান বা উপকার হতে পারে না। অতএব একজন বন্ধু, বা একজন শুভাকাঙ্খী বা একজন আত্মীয় বা একজন সহকর্মী সঠিক অনুষ্ঠান করার জন্যে অন্যকে (এই বলে) উৎসাহ দেবে, যে “এই কাজই করা উচিৎ, এই কাজই প্রশংসনীয়, এই কাজেই স্বর্গলাভ করা সম্ভব”। এবং এ ছাড়া আর কোন্‌ শুভ কর্তব্য হতে পারে, যাতে স্বর্গলাভ (হয়)?” (শিলা-নির্দেশ ৯, গিরনার – ত্রয়োদশ রাজত্ব বর্ষ – ২৫৫ বি.সি.ই - ইংরিজি অনুবাদ ডঃ অমূল্যচন্দ্র সেন, বাংলা অনুবাদ – লেখক।)

    অর্থাৎ অশোকের ধম্ম-এর মূল কথা হল- সমাজের সকল মানুষের সঙ্গে এমনকি সকল প্রাণীদের সঙ্গেও – সৎ-আচরণ, সহমর্মীতা, সাহায্য, অহিংসা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। এই কথাগুলির কোনোটাই নতুন কথা নয় এবং এটুকু বুঝতে অগাধ পাণ্ডিত্য বা গভীর তপস্যারও প্রয়োজন হয় না। সত্যি বলতে প্রত্যেকটি মানুষই তার পরিবার, প্রতিবেশী এবং সমাজের অন্য মানুষদের থেকে এটুকু প্রত্যাশা করে থাকে। অতএব, এমন সিদ্ধান্ত করাই যায়, তিনি নিজে বৌদ্ধ ধর্ম অবলম্বন করলেও, তাঁর প্রজাদের মধ্যে কোনদিনই বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেননি। সকলকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হতে তিনি কখনোই নির্দেশ বা উপদেশ দেননি।

    ৩.৬.সম্রাট অশোকের বৈদেশিক ধম্ম প্রচার
    সম্রাট অশোক সিংহাসনে বসার নবম বর্ষ বা কলিঙ্গ বিজয়ের একবছর পর থেকে ধম্ম প্রচারকেই অন্যতম কর্তব্য মনে করেছিলেন। তারপরেও তাঁর ঊনত্রিশ বছরের রাজত্বকালে কোনদিন সেই ব্রত থেকে তিনি চ্যুত হয়েছিলেন, এমন শোনা যায়নি। ভারতবর্ষ জুড়ে তাঁর সাম্রাজ্যের ভেতরে ধর্মপ্রচার এবং সেই প্রসঙ্গে তাঁর শিলা-নির্দেশের কথা আগেই বলেছি। এবার তাঁর বৈদেশিক ধম্ম প্রচারের দিকে লক্ষ্য করা যাক।

    যদিও অশোক তাঁর শিলা-নির্দেশে কোথাও উল্লেখ করেননি কিন্তু তিনি যে নিকটতম বিদেশ সিংহল দ্বীপ, বার্মা (মায়ানমার) এবং নেপালে ধম্ম প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেকথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ২৪৭ বি.সি.ই-তে পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন হয়েছিল। এই সম্মলনেই বৌদ্ধধর্মের অন্ততঃ আঠারোটি শাখার উদ্ভব হয়েছিল, যার মধ্যে প্রধান ছিল প্রাচীনপন্থী থেরাবাদিন গোষ্ঠী, সর্বাস্তিবাদীন গোষ্ঠী এবং মহাসংঘিকা গোষ্ঠী। এই সম্মেলনে তিনি বেশ কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী বৌদ্ধ গোষ্ঠীকে সঙ্ঘ থেকে এবং সম্মেলন থেকে বহিষ্কারেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন।

    হয়তো এই বৌদ্ধ সম্মেলনেই বিদেশে ধর্ম প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কারণ এর পরেই তিনি তাঁর পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সঙ্ঘমিত্রাকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্যে সিংহলে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় সিংহলের রাজা ছিলেন তিস্র। সিংহলের দুই বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ “মহাবংশ” এবং “দীপবংশ” থেকে জানা যায় মহেন্দ্র তাঁকে এবং সঙ্ঘমিত্রা তাঁর রাণি এবং রাজপরিবারের মহিলাদের বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। রাজা তিস্রর সঙ্গে অশোকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং প্রায় ক্ষেত্রেই তিনি রাজা অশোককে অনুসরণ করতেন। রাজা অশোক বন্ধু রাজা তিস্রকে, বোধিবৃক্ষের একটি চারা উপহার দিয়েছিলেন। কথিত আছে, সেই চারার অশ্বত্থবৃক্ষ আজও সিংহল দ্বীপে বিদ্যমান। কিন্তু ভারতে উরুবিল্বর বোধিবৃক্ষ পরবর্তীকালে বৌদ্ধ-বিদ্বেষীরা কয়েকবার কেটে ফেলেছিল। সিংহলের অনুরাধাপুরমের সেই প্রাচীন বোধিবৃক্ষের চারা এনে ১৮৮০ সালে বুদ্ধগয়ায় নতুন বোধিবৃক্ষর প্রতিষ্ঠা হয়েছে[1]

    রাজা তিস্র তাঁর প্রায় চল্লিশ বছরের রাজত্বে, তাঁর দ্বীপ রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে নিবিষ্ট ছিলেন এবং অজস্র বৌদ্ধমঠ ও বিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর রাজধানী অনুরাধাপুরা পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মহাতীর্থ হয়ে উঠেছিল এবং সিংহল হয়ে উঠেছিল থেরাবাদ অর্থাৎ প্রাচীনপন্থী বৌদ্ধদের মূল কেন্দ্র। পরবর্তী পর্যায়ে বৌদ্ধ ধর্ম যখন ভেঙে হীনযান, মহাযান হয়েছে, তখনও তাঁরা সম্রাট অশোক এবং তাঁর পুত্রের প্রচারিত ধর্মমতেই পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। অশোকপুত্র মহেন্দ্র সিংহলেই থেকে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় ২০৪ বি.সি.ই-তে। অনুরাধাপুরার কাছেই আজও রয়েছে তাঁর স্মৃতি-মন্দির। অশোকের প্রচারিত বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যকেই আজও বহন করে চলেছেন সিংহভাগ সিংহলবাসী।
       
    অশোকের ত্রয়োদশ রাজত্ববর্ষের শিলা-নির্দেশ ১৩ থেকে জানা যায়, সুদূর পশ্চিমের পাঁচটি দেশে তিনি ধম্ম-দূত পাঠিয়েছিলেন। যে পাঁচজন রাজার নাম তিনি শিলা-নির্দেশে উল্লেখ করেছেন, তাঁরা হলেন –

    ক. সিরিয়ার রাজা অ্যান্টিওকাস ২য় থিয়োস (২৬১-২৪৬ বি.সি.ই) – ইনি অ্যান্টিওকাস ১ম-এর পুত্র এবং সেলুকস নিকেটারের পৌত্র। এই সেলুকাসকেই অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত পরাস্ত করেছিলেন এবং তাঁর কন্যাকে বৈবাহিক সূত্রে মৌর্য পরিবারে এনেছিলেন। অতএব স্পষ্টতঃই এই পরিবারের সঙ্গে মৌর্য পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেলুকাস যেমন চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় গ্রীকদূত মেগাস্থিনিসকে পাঠিয়েছিলেন, তেমনি অ্যান্টিওকাস ১মও বিন্দুসারের সভায় ডিমাকসকে দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। অনুমান করা যায় ২য় অ্যান্টিওকাসও অশোকের সভায় কোন দূত পাঠিয়েছিলেন, যদিচ তার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না।

    খ. ইজিপ্টের রাজা টলেমি ২য় ফিলাডেলফস (২৮৫-২৪৭ বি.সি.ই) -  ঐতিহাসিক প্লিনির বর্ণনা থেকে জানা যায় দ্বিতীয় টলেমি ভারতবর্ষের পাটলিপুত্রের রাজসভায় তাঁর দূত ডিয়োনিসিয়াসকে পাঠিয়েছিলেন, হয়তো সেই রাজা বিন্দুসার অথবা অশোক। দ্বিতীয় টলেমির রাজত্বকালে আলেকজান্দ্রিয়া পশ্চিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর হয়ে উঠেছিল এবং সম্ভবতঃ বিশ্বের বৃহত্তম নগর এবং বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় টলেমি তাঁর রাজত্বকালে আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত গ্রন্থাগার ও মিউজিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার ফলে আলেজান্দ্রিয়া শহর গ্রীস ও মিশর সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। অতএব পশ্চিমের প্রাচীন দুই মহান সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার অঙ্গন, আলেকজান্দ্রিয়ায় অশোকের ধম্ম-দূতেরা পা রাখলেন তাঁদের পূর্বের জ্ঞান ও সংস্কৃতি নিয়ে। এর প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী, কারণ তাঁদের প্রাচ্য জ্ঞানের প্রভাবেই পরবর্তীকালে বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাস। কিন্তু সে কথা আসবে পরবর্তী পর্বে।   
    গ. ম্যাসিডোনিয়ার রাজা অ্যান্টিগোনাস গোনাটাস (২৭৮ বি.সি. – ২৩০ বি.সি.ই)
    ঘ. সাইরেনির মেগাস (৩০০-২৫০ বি.সি.ই)
    ঙ. এপিরাসের আলেক্সাণ্ডার  (২৭২-২৫৫ বি.সি.ই)
    এই রাজাদের সকলেই ছিলেন মহান গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডারের সেনাপতিদের বংশধর। যাঁরা আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন।

    ৩.৬.৪. মৌর্যদের পতন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি

    মোটামুটি ২৩২ বি.সি.ই নাগাদ অশোকের মৃত্যুর ঘটনাটি খুবই অস্পষ্ট। কোথায় এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল সঠিক জানা যায় না, তবে একটি বৌদ্ধমতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল তক্ষশিলায়। অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার হয়তো দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর পৌত্র দশরথকে। তবে নানান সূত্র অনুসারে অনুমান করা যায়, বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্য বেশ কয়েকটি টুকরোতে ভেঙে গিয়েছিল। প্রধান গাঙ্গেয় উপত্যকায় মগধের রাজা ছিলেন দশরথ। দশরথ আজীবিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তাছাড়া পশ্চিম ভারতের রাজধানী উজ্জয়িনীর রাজা ছিলেন তাঁর আরেক পৌত্র সম্প্রতি। এই সম্প্রতিই পশ্চিম ভারতে জৈন ধর্ম প্রচারে উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কাশ্মীর অঞ্চলের রাজা ছিলেন অশোকের এক পুত্র জলোকা। অশোকের আরও দুই পুত্রের নাম পাওয়া যায়, কুনাল এবং তিবারা, তাঁদের সম্বন্ধে নাম ছাড়া তেমন আর কিছু জানা যায় না। এর পরবর্তী ইতিহাস খুবই ঝাপসা, স্পষ্ট করে কিছুই জানার উপায় নেই।

    পৌরাণিক সূত্রে আভাস পাওয়া যায় মোটামুটি ১৮৫ বি.সি.ই-তে মৌর্য বংশের শেষ রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে, তাঁরই সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মগধের সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। শুঙ্গ বংশের রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, শোনা যায় তাঁদের বংশের রাজত্বকালে অন্ততঃ দুবার অশ্বমেধ এবং একবার বাজপেয় যজ্ঞের আয়োজন হয়েছিল। বৌদ্ধসূত্র অনুযায়ী পুষ্যমিত্র শুঙ্গ নাকি ঘোরতর বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন এবং তাঁর রাজত্বকালে নাকি অনেক বৌদ্ধ বিহার, মঠ এবং স্থাপত্য ধ্বংস করা হয়েছিল। বিখ্যাত বৈয়াকরণ এবং দার্শনিক পতঞ্জলি হয়তো পুষ্যমিত্রের সমসাময়িক ছিলেন। শুঙ্গবংশ মোটামুটি একশ বারো বছর রাজত্ব করেছিল এবং মোটামুটি ৭৩ বি.সি.ই-তে শেষ শুঙ্গরাজা দেবভূতিকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁরই ব্রাহ্মণ মন্ত্রী বসুদেব। শোনা যায় দেবভূতি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র রাজা ছিলেন। সে সময় শুঙ্গদের আয়ত্তে শুধু মগধরাজ্যটুকুই অবশিষ্ট ছিল।

    বসুদেব যে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার নাম কাণ্ব বংশ। তাঁদের প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর রাজত্ব কালে তাঁদের বংশের চারজন রাজা হয়েছিলেন। তাঁদের সম্বন্ধেও স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না। মোটামুটি ২৮ বি.সি.ই-তে কাণ্ব বংশের শেষ রাজাকে হত্যা করে, মগধ জয় করেছিলেন অন্ধ্রের রাজা, নাম হয়তো সিমুক। এই রাজবংশের নাম সাতবাহন।
     
    মৌর্য পরবর্তী যুগে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজা ছিলেন কলিঙ্গের রাজা খারবেল। তাঁর রাজ্যের বিস্তার সম্পূর্ণ কলিঙ্গ এবং উত্তর অন্ধ্রের অনেকটা। খারবেল জৈনধর্মে নিষ্ঠাবান ছিলেন। অহিংস জৈন হলেও তাঁর রাজ্য জয় এবং যুদ্ধবিগ্রহে বিশেষ উৎসাহ ছিল। তিনি বেশ কয়েকবার মগধ রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, হয়তো কিছুদিনের জন্যে মগধ অধিকারও করতে পেরেছিলেন। শোনা যায়, সুদূর দক্ষিণে তিনি পাণ্ড্য রাজ্যও আক্রমণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কোন এক যবন (গ্রীক) রাজার সঙ্গে মথুরায় যুদ্ধ হয়েছিল এমনও শোনা যায়। উড়িষ্যার উদয়গিরির হাতিগুম্ফায় তাঁর একটি শিলালেখ পাওয়া গেছে। সুদীর্ঘ সেই শিলালেখে তাঁর নিজের সম্পর্কে এবং প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে তিনি কী কী কাজ করেছিলেন, তার বর্ণনা লিখে গিয়েছেন। সেই শিলালেখের শুরু হয়েছে, এই ভাবে, “অর্হৎ (জিন)-দের প্রণাম জানিয়ে, মহামহিম খারবেল, ঐর, মহান রাজা, মহামেঘবাহনের বংশধর, চেদিবংশের মহিমা বৃদ্ধিকারী, সকল পরমাগুণ এবং মঙ্গল লক্ষণে ভূষিত, যাঁর সুকীর্তির যশ কলিঙ্গ ছাড়িয়ে চারদিকেই ব্যাপ্ত...”, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর্য শব্দের প্রাকৃত ঐর এবং শ্রেষ্ঠ অর্থেও আর্য শব্দের ব্যবহার তখন প্রচলিত ছিল। সে যাই হোক খারবেলের মৃত্যুর পর কলিঙ্গ বহুদিন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।                     
              
    উত্তরপশ্চিম ভারতের প্রায় সবটাই মৌর্যদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। মোটামুটি ১৭৫ বি.সি.ই থেকে গ্রীক ও ব্যাক্ট্রিয়ান রাজাদের উৎসাহী সেনাপতিদের অনেকেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে নিজের নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করছিলেন। যাঁদের মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত মিনাণ্ডার। তাঁর রাজ্য পশ্চিমের সোয়াত উপত্যকা, কাবুল থেকে পূর্বে মগধ রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও তাঁর রাজত্বের সময় কাল মাত্র পনের বছর - ১৫০ বি.সি.ই থেকে ১৩৫ বি.সি.ই। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে রাজা মিনাণ্ডারই রাজা মিলিন্দ। তাঁর সঙ্গে বৌদ্ধ দার্শনিক নাগসেনের বৌদ্ধধর্ম নিয়ে সুদীর্ঘ প্রশ্নোত্তর পর্ব চলেছিল, বৌদ্ধদের সেই গ্রন্থের নাম “মিলিন্দ-পন্‌হ” – যার অর্থ মিলিন্দের প্রশ্নাবলী। শোনা যায় এর পরেই মিনাণ্ডার বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

    এরপর আবার গ্রীক এবং ব্যাক্ট্রিয় রাজাদের জয়-বিজয় এবং আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে, বেশ কিছুদিন ডামাডোল চলতে লাগল। এবং এইসময়েই উত্তর সীমান্ত পথে ভারতে ঢুকতে লাগল পার্থিয়ান, শক ইত্যাদি জাতি বা গোষ্ঠী। পার্থিয়ান এবং শকরা ছিল মধ্য এশিয়ার পশুপালক উপজাতি।

    সমগ্র উত্তর ভারত জুড়েই তখন অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রচুর রাজ্য - নিত্য ভাঙছে, নিত্য গড়ছে। বিচিত্র তাদের শাসনপদ্ধতি। বিচিত্র তাদের সংস্কৃতি। তাদের কোন রাজ্যে রাজশাসন, কোথাও গোষ্ঠী শাসন (oligarchy), আবার কোথাও বা দলপ্রধান (chiefdom)। কেউ কেউ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী, কেউ বা বৌদ্ধ অথবা জৈন, কেউ বা সম্পূর্ণ বিদেশী। আবার কেউ বা অনার্য ধর্মী, অর্থাৎ সুপ্রাচীন কাল থেকেই যাঁরা পশুপতিদেব, বিশ্‌দেব এবং মাতৃকাদেবীর পূজক।

    উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ ভারতের পরিস্থিতি বরং অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল। তারা তখন প্রাক্‌-ঐতিহাসিক যুগ থেকে ঐতিহাসিক যুগে পা রাখতে শুরু করেছে। অশোকের শিলা-নির্দেশে দক্ষিণের যে কটি জনগোষ্ঠীর নাম পাওয়া গিয়েছিল, চোল, চের, পাণ্ড্য এবং সাতিয়াপুত্র – তারা মৌর্য সাম্রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। মনে করা হয়, মৌর্য সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক প্রশাসক হিসাবেই তাদের রাজ্যশাসনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। তারপর মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর তারা নিজ নিজ এলাকায় রাজ্য গড়ে তুলল। এই চারটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মিলেমিশে গড়ে উঠল তামিলিক সংস্কৃতি। তাদের ভাষা হয়ে উঠল তামিল এবং লিপি হয়ে উঠল ব্রাহ্মী-তামিল।

    বি.সি.ই প্রথম শতাব্দীতে দাক্ষিণাত্যের পশ্চিম অঞ্চলে আরেকটি শক্তিশালী রাজবংশের সৃষ্টি হয়েছিল, তার নাম সাতবাহন। এই বংশকে অন্ধ্রবংশও বলা হয়ে থাকে, কারণ তাদের রাজ্যের সূত্রপাত পূর্বে কৃষ্ণা – গোদাবরীর ব-দ্বীপ থেকে গোদাবরী বরাবর, পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত। সম্রাট অশোকের শিলানির্দেশে এই অন্ধ্রগোষ্ঠীরও উল্লেখ পাওয়া যায়। এই অঞ্চলও মৌর্যদের বিজিত রাজ্য নয়, কিন্তু অধীনস্থ রাজ্য ছিল। অতএব তামিলিকদের মতোই তারাও আঞ্চলিক প্রশাসক ছিল এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর, অন্ধ্রবংশের প্রথম রাজা সাতবাহন নাম নিয়ে, নতুন রাজবংশের স্থাপনা করেছিলেন।

    সাতবাহন বংশের সব থেকে উদ্যোগী রাজা ছিলেন সাতকর্ণি। তাঁর রাজধানী ছিল প্রতিষ্ঠান নগরে, যার আধুনিক নাম পাইথান। সাতকর্ণি নর্মদার উত্তরে পূর্ব মালব্য পর্যন্ত রাজ্যবিস্তার করেছিলেন। শকরাজা এবং কলিঙ্গরাজ খারবেলের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের কথা শোনা যায়। একসময় সাতবাহন সাম্রাজ্য পশ্চিমে মহারাষ্ট্রের কিছুটা, গুজরাট এবং উত্তরপশ্চিমে সিন্ধ প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সাঁচির একটি শিলালেখে তিনি নিজেকে “রাজন শ্রী সাতকর্ণি” বলে পরিচয় দিয়েছেন। উত্তরভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হওয়াতে, সাতকর্ণি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন কিন্তু তিনি নিজেকে এক “ক্ষত্রিয়-বিনাশী” ব্রাহ্মণ বলে দাবি করেছেন। মনে করা হয়, তিনি মধ্য এবং পশ্চিম ভারতের অনেকগুলি ক্ষত্রিয় গোষ্ঠীরাজ্য অধিকার করেছিলেন, এ তারই উল্লেখ। সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু মোটামুটি ৫০ বি.সি.ই-তে এবং তাদের রাজত্বকাল ২৪৮-৪৯ এ.ডি.র কাছাকাছি সময় পর্যন্ত। অতএব যথেষ্ট শক্তিশালী এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েই সাতবাহন সাম্রাজ্য নতুন যুগে (Common Era) পা রেখেছিল।            

    মৌর্যবংশের চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন জৈন, অশোক ছিলেন বৌদ্ধ, বিন্দুসার এবং অশোকের পৌত্র দশরথ ছিলেন আজীবিক। অতএব এই তিন ধর্মই তামিলিক সংস্কৃতিতে আগে থেকেই মিশে ছিল। শক্তিশালী সাতবাহন সাম্রাজ্য পশ্চিম এবং মধ্য ভারতে আধিপত্য বিস্তার করায়, তাঁদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে, এবং সাতবাহন বংশের পরবর্তী রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মেই বিশ্বাসী ছিলেন।
     
    অতএব তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণরা তাঁদের ভাগ্য অন্বেষণে উত্তরের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল দক্ষিণভারতে পৌঁছতে শুরু করলেন তাঁদের ব্রাহ্মণ্যধর্ম নিয়ে। সেখানে শুরু হল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের নতুন এক পর্ব। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্ষাত্রধর্মের শক্তি খাটিয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রতিষ্ঠার দিকে না গিয়ে, তাঁরা কৌশল বদলে ফেললেন। আঞ্চলিক মানুষদের ধর্ম বিশ্বাসগুলি সংগ্রহ করতে করতে বদলে ফেলতে শুরু করলেন তাঁদের সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্ম। এই প্রসঙ্গের বিস্তারিত আলোচনা আসবে পরবর্তী পর্বে।

    ৩.৬.৪ সমসাময়িক বাণিজ্য পরিস্থিতি
    ভগবান মহাবীর এবং ভগবান বুদ্ধের সময় থেকেই আমরা বেশ কিছু শ্রেষ্ঠী এবং বণিকের নাম জেনেছি, যাঁদের ধনসম্পদের কোন সীমা ছিল না এবং সমাজে তাঁদের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। অশোকের দ্বিতীয় রাণি কারুবাকী ছিলেন বিদিশার সম্পন্ন বণিকদুহিতা। সম্রাট অশোকের সঙ্গে কারুবাকীর পিতার যথেষ্ট সৌহার্দ্য ছিল বলেই হয়তো, তাঁদের সাক্ষাৎ ও পরিচয় হয়েছিল এবং ভালোবেসে বিয়ে করতে কোন অসুবিধে হয়নি। বণিক অনাথপিণ্ডিক কোশল রাজকুমার জেতকে হতবাক করে দিয়েছিলেন তাঁর দান করা বিপুল সম্পদসম্ভারে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বণিকের সামাজিক স্থান ছিল তৃতীয় বর্ণের বৈশ্যস্তরে। অতএব অব্রাহ্মণ্য রাজা এবং সম্রাটের আমলে, আরও স্পষ্ট করে বললে, ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী সামাজিক পরিবেশে বণিকরা যে তাদের প্রাপ্য সম্মান, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধে পাচ্ছিলেন সে কথা বলাই বাহুল্য। এবং যাঁদের কারণে তাঁদের এই সামাজিক সম্মান লাভ, কৃতজ্ঞতাবশতঃ সেই ভগবান মহাবীর ও বুদ্ধদেবের জন্যে তাঁরা মুক্ত হস্তে দান করেছিলেন – দুই ধর্মের প্রচার এবং সংগঠনে।

    এই বণিকদের রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল অপরিসীম, কারণ একদিকে প্রচুর বাণিজ্য কর দিয়ে তাঁরা যেমন রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি করাতেন, অন্যদিকে নানান উপহার এবং দৈব-দুর্বিপাকে রাজাদেরকে অর্থ সাহায্য (অথবা ঋণ) দিয়ে রাজাদের ওপর প্রভূত প্রভাবও বজায় রাখতেন। আজ থেকে মাত্র কয়েকশ’ বছর আগে (১৭৫৬-৫৭ সি.ই.), নবাব সিরাজদ্দৌলাকে সরিয়ে ক্লাইভ ও তাঁর অনুগত মিরজাফরকে সিংহাসনে বসাতে বণিক মহতাব চাঁদ ও স্বরূপ চাঁদের (ইতিহাসে যাঁরা “জগৎ শেঠ” (Banker of the World) উপাধিতে বিখ্যাত) ভূমিকা এবং তাঁদের বিপুল অর্থব্যয়ের হিসেব জানলে চমকে উঠতে হয়। অতএব রাজাকে রাজা বানিয়ে তুলতে (king-maker) বণিকসম্প্রদায়ের প্রভাব আজও যেমন আছে, সে সময়েও ছিল – এমন অনুমান করাই যায়। কেন অনুমান করা যায় সে কথায় আসার আগে, সমসাময়িক ভারতীয় বাণিজ্যের ব্যাপ্তি এবং বিস্তার বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

    বৌদ্ধ এবং জৈন শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠীবহুল যে যে নগরের নাম পাওয়া যায় সেগুলি হল শ্রাবস্তী, বিদিশা, গান্ধার (তক্ষশিলা), পাটলিপুত্র, উজ্জয়িনী। এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ যে যে বন্দর শহরের নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল পশ্চিমে ভৃগুকচ্ছ (গুজরাটের ভারুচ), সোপারা ও কল্যাণ (মহারাষ্ট্রে মুম্বাইয়ের কাছাকাছি), পূর্বে তাম্রলিপ্তি এবং চন্দ্রকেতুগড় (পশ্চিমবঙ্গ) এবং দক্ষিণে কোডাঙ্গালুর (কোচি, কেরালা), কোরকাই, আলাগনকূলম, আরিকামেডু (তামিলনাড়ু), মসুলিপতনম (অন্ধ্র) ইত্যাদি। গুজরাটের ভারুচ এবং অন্ধ্রের মসুলিপতনম ছাড়া, সবগুলিই এখন গুরুত্বহীন জনপদ, কারণ সমুদ্র অনেকটাই সরে গেছে, এই শহরগুলি থেকে। এই বন্দর শহরগুলি থেকে যে যে সামগ্রী রপ্তানি হত, তার মধ্যে প্রধান ছিল,

    ক. মশলা - লবঙ্গ, এলাচ, দারচিনি, জয়িত্রি, জায়ফল, পান, সুপুরি, তেজপাতা এবং ভীষণ দামি ছিল গোলমরিচ। মশলাগুলির ব্যাপক চাহিদা ছিল গ্রীস, মিশর এবং পরবর্তী কালে রোমান সাম্রাজ্যেও। শোনা যায় গোলমরিচ রপ্তানি করেই, ভারতীয় বণিকেরা সব থেকে বেশি রোমান স্বর্ণমুদ্রা অর্জন করতেন। এই প্রসঙ্গে সুপুরি নিয়ে একটা মজার কথা বলি। সুপুরির প্রধান উৎস ছিল আসাম, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বভারত। সে অঞ্চলে  তার নাম ছিল গুয়া[2], যে কারণে আসামের রাজধানি গুয়াহাটি (গুয়ার হাট)। বাংলার বণিকেরা শোনা যায় এই গুয়াহাটি থেকে নদীপথে তাম্রলিপ্তি বন্দর এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে পশ্চিম উপকূলের সোপারা বন্দরে গুয়া বা গুবাক পৌঁছে দিত। সোপারা বন্দর থেকে গুয়া রপ্তানি হত আরব, মিশর এবং গ্রীসে। মিশরীয়রা এই ফলের নাম দিয়েছিল “সোপারার ফল”। পরবর্তীকালে এই “সোপারার ফল” নামটি সমগ্র ভারতবর্ষেই “সুপুরি” হয়ে উঠেছিল এবং অসম ও উত্তরপূর্বের কিছু কিছু অঞ্চল ছাড়া, গুয়া শব্দটির আর তেমন প্রচলন নেই। বাংলার চণ্ডীমঙ্গল কাব্যগুলিতে (যদিও অনেক পরবর্তী কালের- পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দীর রচনা) বলা হয়েছে, বাংলার বণিকেরা সুপুরির ব্যবসা করে নাকি মাণিক্য অর্জন করতেন! অতএব সুপুরি রপ্তানিও যথেষ্ট লাভজনক ব্যবসা ছিল।    
    খ.  বস্ত্র – কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গদেশ ও অসমের চার রকম বস্ত্রের প্রশংসা পাওয়া যায় - দুকূল, পত্রোর্ণ, ক্ষৌম এবং কার্পাসিক। বঙ্গের দুকূল বস্ত্র খুবই সূক্ষ্ম – অর্ধস্বচ্ছ এবং মসৃণ, সাপের খোলসের মতো। এই বস্ত্রের চাহিদা ছিল মিশর, গ্রীস এবং পরবর্তী কালে রোম সাম্রাজ্যের রাজপরিবারেও। ক্ষৌম একটু মোটা বস্ত্র – সাধারণের পরার জন্যে।  পত্রোর্ণ সাদা বা ধোয়া কৌষেয় বস্ত্র - এণ্ডি বা মুগার বস্ত্র। ষষ্ঠ শতাব্দীতে লেখা “অমরকোষে” পত্রোর্ণের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে – এক বিশেষ কীট পাতার মধ্যে উর্ণা (জাল) সৃষ্টি করে, সেই উর্ণা থেকে বানানো হত পত্রোর্ণ বস্ত্র। সেরা কার্পাসিক বস্ত্র অর্থাৎ কাপাস তুলোর বস্ত্র তৈরি হত মাদুরা, কলিঙ্গ, কাশী, বঙ্গ, বৎস জনপদে। তুলো থেকে অতি সূক্ষ্ম বস্ত্র বানানোর প্রযুক্তি সম্পূর্ণভাবেই ভারতীয়। বি.সি.ই-র দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই ভারতের ধুনুরিরা ধুনুক (cotton carders’ bow) দিয়ে তুলে ধুনে, বাছাই করা হাল্কা তুলো দিয়ে সূক্ষ বস্ত্র বানিয়ে দেশে বিদেশে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
       
    গ. এছাড়া নানান বিলাস দ্রব্য যেমন, হাতির দাঁত এবং হাতির দাঁতের নানান উপহার সামগ্রী। মুক্তা এবং নানান ধরনের দামি পাথর, বিশেষ করে পান্না – অলংকারে বসানোর জন্যে, চন্দনকাঠ এবং মহার্ঘ আসবাব বানানোর জন্যে আবলুস (ebony) কাঠ। বস্ত্রের শুভ্রতা রাখার জন্যে নীল (indigo)। কয়েকশ বছর আগেও ব্রিটিশ রাজত্বে সমগ্র বঙ্গ এবং বিহারের চাষীদের ওপর এই নীল চাষের অত্যাচার মারাত্মক বিভীষিকার সৃষ্টি করেছিল। ইওরোপের নীলের চাহিদা বহুদিনের।
     
    ঘ. পোষ্যপ্রাণী – বাঁদর, ময়ুর, কাকাতুয়া, টিয়া, মোনাল, চিতা ইত্যাদি। রোমান রাজপরিবারে এই পোষ্য প্রাণীদের দারুণ চাহিদা ছিল।

    ঙ. ওষধি – নানাবিধ ওষধি মলম বা প্রলেপ, গাছ-গাছড়া, পান, প্রসাধনী ও গন্ধ সামগ্রী এবং বিশেষ করে যৌন শক্তি বর্ধক ওষধির ভীষণ চাহিদা ছিল। 

    ঐতিহাসিক প্লিনি অভিযোগ করেছিলেন, রোম সাম্রাজ্য তাদের বিলাসিতার সামগ্রী আমদানির জন্যে পূর্বের দেশগুলিতে বছরে অন্তত ৫৫০০ লক্ষ সেসটার্স[3] ব্যয় করে। যদি পূর্বের দেশগুলির মধ্যে ভারতের ভাগে এর পঞ্চমাংশ ব্যবসাও প্রতিবছর এসে থাকে তাহলে তার মূল্য ছিল ১২,৫৬,৭৫,০০০ গ্রাম রূপো! অতএব শ্রেষ্ঠীদের ধনসম্পদের পরিমাণ কিছুটা আন্দাজ করা যায় বৈকি!

    বিদেশে সবকিছুই যে রপ্তানি হত, তা নয়, বিদেশ থেকে অনেক জিনিষ আমদানিও হত, যেমন, সোনা ও রূপোর মুদ্রা, নানান ধরনের সুরা, গন্ধদ্রব্য, প্রসাধনের জন্যে জলপাই তেল, কাচ ইত্যাদি।

    এত গেল বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এর সঙ্গে ছিল নিবিড় অন্তর্দেশীয় বাণিজ্য। অন্তর্দেশীয় বাণিজ্য চলত প্রধানতঃ নদীপথে এবং স্থলপথে। তক্ষশিলা থেকে পাটলিপুত্র হয়ে, তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত প্রাচীন দীর্ঘতম স্থলপথের কথা আগেই বলেছি। তাছাড়াও দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল নদী এবং সমুদ্রের উপকূলবর্তী পথের অন্তর্জাল। গাধা, খচ্চর, ঘোড়া, বলদের গাড়ি, উত্তর-পশ্চিমের মরু-অঞ্চলে উঠের পিঠেও বাণিজ্য সামগ্রী বহন করে বণিকদের বড়ো বড়ো দল (caravan) একত্রে চলাফেরা করত। নদীগুলি পার হওয়ার জন্যে সেতু ছিল না, ফেরি নৌকা ব্যবহৃত হত। এই স্থলপথে দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই এমনকি তক্ষশিলা হয়ে সুদূর আরব এবং পারস্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন নগরীতেও বাণিজ্য সম্ভার পৌঁছে যেত। আবার তক্ষশিলা থেকে বেগ্রাম এবং বামিয়ান হয়ে উত্তরে অক্সাস (আমু দরিয়া) নদী পথে আরল সাগর এবং পশ্চিমে ক্যাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণ সাগর এবং ভূমধ্য সাগর পর্যন্ত এই বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের নিদর্শন পাওয়া যায়। বামিয়ানের বৌদ্ধ উপনিবেশ যে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল, তার নিদর্শন পরবর্তীকালে বানিয়ে তোলা (৫০৭ সি.ই.) বামিয়ান বুদ্ধমূর্তিগুলি থেকে বোঝা যায়। যদিও ২০০১ সালের মার্চে, এই মূর্তিগুলি ধ্বংস করে, আফগানিস্তানের তালিবান প্রশাসন তাঁদের ধর্মের অনুশাসনকে চরিতার্থ করেছেন। ভারতীয় বণিকরা এই পথের ওপর অনেকগুলি শহরে, তাঁদের বাণিজ্য আবাসও গড়ে তুলেছিল, যেমন কাশগড়, ইয়ারকান্দ, খোটান, মিরন, কুচি, খারাশহর এবং তুরফান। এই পথের অনেকটাই সুদূর অতীত থেকে চীন ও মধ্য এশিয়া যাতায়াতের রেশম পথের (silk route) সঙ্গে সংযুক্ত। আশ্চর্যের বিষয়, এই বণিকদলগুলির সঙ্গে প্রত্যেকটি জায়গাতেই পৌঁছে গিয়েছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রচারকরাও!   

    স্থল-বাণিজ্যে পণ্য সামগ্রীর কোন সীমা ছিল না। পূর্ব ভারত থেকে যেত নানান ধরনের বস্ত্র, পান, সুপুরি, নারকেল, মুক্তা, উৎকৃষ্ট ধান বা চাল, তামা বা ব্রোঞ্জের তৈজসপত্র, মাটির পাত্র। দক্ষিণদেশ থেকে আসত দামি পাথর – পান্না, প্রবাল, সোনা, মুক্তা, কড়ি, শঙ্খ, নানান মশলা। পশ্চিম থেকে আসত রূপো, তামা, ব্রোঞ্জ, লোহা এবং খনিজ লবণ। আরব এবং পারস্য দেশ হয়ে সুদূর মিশরে হাতি এবং গণ্ডার রপ্তানি হওয়ার কথাও শোনা যায়, আবার উল্টোদিকে আরব থেকে ভারতে আমদানি করা হত ভালো জাতের ঘোড়া।

    দেশ জুড়ে এই নিবিড় বাণিজ্যিক অন্তর্জাল গড়ে তুলত এবং নিয়ন্ত্রণ করত বিভিন্ন শহরের ব্যবসায়ী শ্রেণী বা পুগা (পালি ভাষায় সমিতি বা সমবায়) (guilds)। সমিতির প্রধানরা সকলেই বংশপরম্পরায় সম্পন্ন বণিক হতেন। সর্বস্তরে তাঁরা তাঁদের অর্থ লগ্নী করতেন, সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে নদীপথে চলা বাজরা। গাছের গুঁড়ি কেটে বড়ো বড়ো নৌকা বানানো হত, অনেকগুলি গুঁড়ি পাশাপাশি বেঁধে জাহাজ বানানো হত। ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে এই সব জাহাজ লোহিত সাগর পর্যন্ত চলে যেত বাণিজ্য করতে। প্লিনির বর্ণনায় পাওয়া যায়, ভারতের বৃহত্তম জাহাজের ওজন ছিল প্রায় ৭৫ টন এবং সাতশ জন পর্যন্ত নাবিক সে জাহাজে যাত্রা করতে পারত! শুধু পশ্চিমের দেশগুলিতেই নয়, বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে পূর্ব উপকূলের বন্দর তাম্রলিপ্তি থেকে পূর্বের বার্মা, জাভা, কম্বোজ, শ্যাম, সুমাত্রা দ্বীপেও বণিকেরা নিয়মিত যাওয়া আসা করত।  

    ব্যবসায়ী সমবায় বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন পেশার দক্ষ শিল্পীদের দিয়ে সামগ্রী বানিয়ে নিত। উৎপন্ন সমস্ত সামগ্রীর গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করার জন্যে থাকত পরিদর্শকমণ্ডলী। গুণগত মান নিশ্চিত করে, সামগ্রীর গায়ে, ব্যবসায়ী সমিতি তাদের নিজস্ব মোহর (seal) ছাপ দিয়ে দিত। বিখ্যাত সমবায়গুলির মোহর দেশে-বিদেশে সুপরিচিত ছিল। স্পষ্টতঃ বাণিজ্যের উন্নতি নির্ভর করত এই মোহরগুলির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রত্যেকটি সামগ্রীর আন্তর্দেশীয় এবং অন্তর্দেশীয় মূল্যও নির্ধারণ করে দিত, যাতে কোন অসৎ খুচরো বণিক (retailer) অত্যধিক লাভের লোভে স্বদেশে কিংবা বিদেশের গ্রাহকদের ঠকাতে না পারে। সমবায় থেকেই রাষ্ট্র বা রাজ্যের বাণিজ্য করও মিটিয়ে দেওয়া হত, মিটিয়ে দেওয়া হত বিদেশের আমদানি এবং রপ্তানি শুল্ক। মৌর্য যুগে বাণিজ্য সামগ্রীর মূল্যের, এক পঞ্চমাংশ ছিল উৎপাদন কর এবং উৎপাদন করের এক পঞ্চমাংশ ছিল বাণিজ্য কর। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এই কর ফাঁকি দিলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। 

    ব্যবসায়ী সমবায়ের প্রধানরা অত্যন্ত ধনী ছিলেন, এর উদাহরণ আমরা আগেই পেয়েছি। তাঁরা মহাজনী প্রথায় ঋণও দিতেন। সাধারণতঃ এই ধরণের ঋণের সুদ ছিল বছরে শতকরা পনের টাকা। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্যের মতো ঝুঁকির ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁরা ঋণ দিতেন শতকরা ষাটটাকা বাৎসরিক সুদে। রাজারা বিভিন্ন সময়ে পারষ্পরিক রাজ্য জয় করলেও, বিজিত রাজ্যের এই ধরনের প্রভাবশালী ও বিত্তশালী বণিক সম্প্রদায়কে তাঁরা সাধারণতঃ ঘাঁটাতেন না। বরং নিজেদের স্বার্থেই তাঁদের সঙ্গে মৈত্রী এবং সদ্ভাব রাখার চেষ্টা করতেন। যার ফলে এই ধরনের সমবায়গুলি সারা দেশ জুড়ে মোটামুটি নিশ্চিন্ত প্রভাবে তাঁদের বাণিজ্য চালু রাখতে পারতেন। কোন রাজা কাকে জয় করলেন কিংবা কোন রাজা রাজ্যচ্যুত হলেন, তাতে এই বণিক সম্প্রদায়ের খুব একটা এসে যেত না।

    তবে অযোগ্য রাজার প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে, পথেঘাটে, নদীপথে কিংবা সমুদ্রপথে ডাকাতি, লুঠপাট – এক কথায় অরাজকতা বেড়ে গেলে। কিংবা বিলাসী রাজারা খেয়াল খুশী মতো অযৌক্তিক কর বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করলে, সেই রাজারা বণিকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতেন।  এরকম কোন রাজার ওপর বণিকরা বিরক্ত হয়ে উঠলে, প্রতিবেশী বা উৎসাহী বিরোধী রাজাকে তাঁরা পরোক্ষে সাহায্যই করতেন। আমরা আগেই দেখেছি নন্দরাজারা সাম্রাজ্যের সমস্ত ভূমি ও ভূমিসম্পদ কর যোগ্য করে তুলেছিলেন। নতুন এই নিয়মে সাধারণের মনে বিক্ষোভ আসা অস্বাভাবিক নয়। উপরন্তু শোনা যায়, নন্দবংশের শেষ রাজা ধননন্দ ছিলেন সীমাহীন রমণীবিলাসী উচ্ছৃঙ্খল রাজা এবং অযোগ্য প্রশাসক। অতএব শক্তিশালী ধননন্দকে সরিয়ে অনেকটাই দুর্বল চন্দ্রগুপ্তকে সিংহাসনে বসানোর পেছনে বণিক সম্প্রদায়ের অকুণ্ঠ সাহায্য যে ছিল, এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

    ৩.৬.৫ ভারতের প্রথম সুবর্ণ যুগ
    এই পর্বের প্রাককথায়, ৬০০ বিসিই থেকে ০ বিসিই পর্যন্ত সময়কালকে আমি “সুবর্ণ যুগ” বলেছিলাম। আশা করি সে বিষয়ে আর খুব বেশি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। এই যুগে অখণ্ড ভারতবর্ষ, এক দেশ - এক মহাদেশ হয়ে সমকালীন বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ভারতের চিন্তা-ভাবনা-দর্শন নির্দিষ্ট রূপ নিয়ে বিস্তার লাভ করছিল, দেশের ভিতরে এবং বাইরে। এই ভাবনা-চিন্তার প্রসার ও প্রচারের হাত ধরে সারা দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় ধীরে ধীরে সাক্ষর হয়ে উঠছিল। তাদের ভাবনা-চিন্তায় প্রভাব ফেলছিল বিশ্বের অনেকগুলি প্রাচীন সভ্যতা – যেমন পারস্য, মিশর, গ্রীস, ব্যাক্ট্রিয়া, রোম; পশ্চিমের বেশ কিছু যুদ্ধবাজ পশুপালক উপজাতিও – শক, পার্থিয়ান, কুষাণ। এইসব বিদেশী ভাবনা চিন্তার সঙ্গে দেশজ অনার্য-ব্রাহ্মণ্য-জৈন-বৌদ্ধ দর্শন মিলেমিশে - একই সূত্রে বেঁধে ফেলছিল সুদূর চট্টগ্রাম থেকে কান্দাহার, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর ভারতবাসীকে। অঞ্চলভেদে তাদের ভাষা এক নয়, খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণও বিচিত্র – কিন্তু ভাবনা-চিন্তা এবং মূল প্রথা ও রীতিতে তাদের আশ্চর্য ঐক্য। রাজনৈতিক স্বার্থে প্রাদেশিকতার বিষ আজ আমাদের মনে সঞ্চারিত হলেও, ব্যক্তিগত পরিসরে সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছেন প্রত্যেকটি সাধারণ ভারতবাসী।             

    ..০০..

    চলবে…
    (তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত। চতুর্থ পর্বের প্রথম ভাগ আসবে ০৭/০৭/২০২২)

    চিত্র ঋণঃ -  https://en.wikipedia.org/wiki/Pillars_of_Ashoka                                                                     

    গ্রন্থ ঋণঃ -
    ১) The Penguin History of Early India: Dr. Romila Thapar
    ২) Mauryan Empire – Mr Ranabir Chakravarti, Jawaharlal Nehru University, India – The Encyclopedia of Empire, First Edition. Edited by Mr John M. MacKenzie.
    ৩) Candragupta Maurya and his importance for Indian history – Mr Johannes Bronkhorst, University of Lausanne, Switzerland– publication at: https://www.researchgate.net, uploaded on 15 November 2015.
    ৪) The Oxford History of India – Late Vincent Smith; Revised by Sir Mortimer Wheeler and Mr A. L. Basham (1981)
    ৫) The wonder that was India – A. L. Basham  
    ৬) Asoka’s Edicts – Dr Amulyachandra Sen – Published by Indian Institute of Indology (July 1956)
    ৭) বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) – ডঃ নীহাররঞ্জন রায়।

    [1] বোধিবৃক্ষর বিনাশ নিয়ে অনেকগুলি বিতর্কিত জনশ্রুতি শোনা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকেরই কোন এক রাণি নাকি প্রথমবার এটিকে কেটে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পুরোপুরি সফল হননি। এর পর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা করেছিলেন গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক ৬১০-৬১৫ এডি-র কোন সময়ে – তিনি বোধিবৃক্ষটিকে সম্পূর্ণ কেটে ফেলেছিলেন। যদিও কয়েক বছর পরে, এই গাছের শিকড় থেকে নতুন গাছের উদ্ভব হয়। এরপর গাছটি ১৮৭৬ সালের এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়। স্যার আলেকজাণ্ডার কানিংহাম, যিনি Indian Archaeological Survey-র প্রথম ডিরেক্টর ছিলেন, ১৮৮০ সালে সিংহলের অনুরাধাপুরম থেকে বোধিবৃক্ষের চারা এনে একই জায়গায় রোপণ করেন। সেই গাছই এখন দেখা যায়।        

    [2] গুয়া শব্দটি প্রাক্‌-আর্য অর্থাৎ অনার্য শব্দ, সংস্কৃতায়নের পর এটি “গুবাক” হয়ে যায়।  

    [3] সেসটার্স (sesterces) – প্রাচীন রোমান তামা বা ব্রোঞ্জের মুদ্রা, চার সেসটার্সে এক ডিনারিয়াস রৌপ্য মুদ্রা – যার ওজন ৪.৫৭ গ্রাম।    

     
  • ধারাবাহিক | ০১ জুলাই ২০২২ | ৫২৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বামাক্ষ্যাপা | 2a00:23c4:2400:2c01:dc3c:20:e6c5:625c | ০১ জুলাই ২০২২ ২১:৫৪509539
  • আচ্ছা এই ব্যাপারটা কেউ জানেন ?
    আমার ধর্মাধর্ম হলো কোদন্ড স্বরূপ 
    উনক্ষেত্র মাঝে কাটিলাম কূপ 
     
    এই 
    কোদন্ড জিনিস টা কি ?
    আর উনক্ষেত্র কি কুরুক্ষেত্র র মত কিচু ?
  • &/ | 151.141.85.8 | ০১ জুলাই ২০২২ ২২:১৬509540
  • আমরা শুনেছিলাম,
    "ষড়রিপু হইল কোদন্ডস্বরূপ
    পুণ্যক্ষেত্রমাঝে কাটিলাম কূপ"

    কোদন্ড মানে ধনুক। এখন কথা হল,কোদন্ড দিয়ে তো আর মাটি খোঁড়া যায় না, তীর হলেও একটা কথা ছিল। কবি এখানে কোদাল বোঝাতে চেয়েছিলেন। আর্ষ প্রয়োগ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।
  • বামাক্ষ্যাপা | 2a00:23c4:2400:2c01:dc3c:20:e6c5:625c | ০১ জুলাই ২০২২ ২২:৫৩509541
  • ধন্যবাদ 
  • হীরেন সিংহরায় | ০২ জুলাই ২০২২ ০১:১১509542
  • কিশোর 
     
    অর্থনৈতিক দিকটা অত্যন্ত ভালো করে বোঝালেন । সে আমলের কর এবং বাণিজ্য ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমার জ্ঞান একেবারে শূন্য- সমৃদ্ধ হলাম। বনিকের মানদণ্ডের সঙ্গে রাজ দণ্ডের সম্পর্কটি মনোগ্রাহী - দু পক্ষের প্রয়োজন ছিল পারস্পরিক। অনেক ভাবনা চিন্তায় ইন্ধন দিলেন! 
     
    মৌর্য যুগের তুলনায় , হাজার বছর বাদে ইউরোপের হানসা লিগের খেলাটা ( দ্বাদশ শতাব্দী থেকে) ছিল উলটো - প্রথমে গেছে সৈন্য বহর , যাজকের দল । তাঁদের পেছনে এসেছেন শ্রেষ্ঠী,  এঁরাই পরে হলেন  জমিদার । মজাটা এই যে এঁরা সেই সব দেশের রাজার কাছে একটা ফরমান নিয়েই খালাস।  শহর শাসন নিজেরাই করতেন রাজাকে পাত্তা দিতেন না। আর একটা অদ্ভুত মিল লক্ষ করলাম । হানসা লিগের শহরের  ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায়ীদের হাতে - উৎপাদকের হাতে নয় । উৎপাদক মালটি বাজারে আনবেন , তারপরে ব্যবসায়ীরা বেচবেন । জাপানের শোগোশসা বা কোরিয়ার চেবলদের কথা মনে করুন! তাঁরা বিশ্বের বাজারে বেচেছেন , বানাননি কিছুই মিতসুই কোম্পানির প্রথম ইউরোপিয়ান অফিস লন্ডনে , ১৯০২ সালে কেবলমাত্র ট্রেডিং করেছেন । অনেক পরে মিতসুই মিতসুবিশি সুমিতোমো উৎপাদনে ঢুকে পড়লেন  কারণ নিসান বললে আমাদের গাড়ি আমারই বেচতে পারি ! 
     
     উনবিংশ শতকে খেলা বদলাল - প্রথমে বনিক , তার পেছনে নৌ বহর, সৈন্য ( বিসমার্ক: প্রথমে যাবে বাণিজ্য বহর তাদের সুরখারথে যাবে সৈন্য  )। এই বিজনেস মডেলটা পর্তুগিজ , ডাচ , ডেনিশ প্রায় সবাই ধরে ফেলল।  ব্যতিক্রম হয়তো স্প্যানিশ ও ফরাসি -তারা বললে আমরা রাজা, আমরা বলে দেব কে কি কিনবে বানাবে বেচবে। 
     
    হানসা লিগের দুটি দৃষ্টান্ত এখনো মজুত - হামবুর্গ এবং ব্রেমেন । 
  • Amit | 121.200.237.26 | ০২ জুলাই ২০২২ ০১:৫৪509543
  • এই পার্শিয়া বা ব্যাক্ট্রিয়া থেকে যে শিল্পী দের নিয়ে আসা হতো -এই জায়গা গুলোয় পাথর শিল্পী দের দক্ষতার কারণ কি কি হতে পারে ? বেটার টুলস ? এমনি কাস্ট আইরন দিয়ে বাসন কোসন ভালো বানানো যেতে পারে , কিন্তু পাথর কাটার টুলস বানাতে গেলে ওতে হবেনা। ফর্জড আইরন লাগবে। তাহলে কি ​​​​​​​ওসব ​​​​​​​জায়গা ​​​​​​​গুলোয় ​​​​​​​মেটালারজি টেকনিকগুলো তখনকার ভারতের থেকে ​​​​​​​বেটার ডেভেলপড ​​​​​​​করেছিল ? একই ​​​​​​​সন্দেহ ​​​​​​​আসে ​​​​​​​ইজিপ্ট ​​​​​​​এর ​​​​​​​পিরামিড ​​​​​​​এর ​​​​​​​পাথর ​​​​​​​কাটা ​​​​​​​নিয়ে  বা গ্রীস এর টেম্পল  গুলো নিয়ে। ​​​​​​​ভালো ​​​​​​​স্ট্রং টুলস ​​​​​​​ছাড়া ​​​​​​​ওরকম ​​​​​​​আখাম্বা ​​​​​​​সাইজ এর ​​​​​​​সব ​​​​​​​পাথর ​​​​​​​কাটতো ​​​​​​​বা ​​​​​​​পালিশ ​​​​​​​করতো ​​​​​​​কি ​​​​​​​ভাবে ? (সুকি কে ​​​​​​​ও ​​​​​​​জিগাতে ​​​​​​​হবে ​​​​​​​এটা) 
     
    প্রি-ইসলামিক ইন্ডিয়াতে সোনা রুপো বা কাস্ট আইরন ইন্ডাস্ট্রি যতটা ডেভেলপড ছিল -ফরজিং স্কীল অতটা ছিল কিনা জানিনা। তখনকার যুগের সোর্ড বা স্পিয়ার্স এর সেরকম নমুনা পাওয়া যায় ? 
     
    হিরেন বাবুকে একখান ছোট্ট কোশ্নো। ইয়ে দাদা যদ্দুর পড়েছি মিতসুবিশি  তো অনেক দিন ধরে ম্যানুফ্যাকচারিং এ ছিল ? ওদের ১৯২০ র দশকে বানানো মিঃ-০ তো নাকি তখনকার দিনের বেস্ট ফাইটার জেট। আপনি কি তারও আগের কথা বলছেন ? 
     
     
  • হীরেন সিংহরায় | ০২ জুলাই ২০২২ ০২:২৯509544
  • অমিত 
     
    ১৮৫৩ সালে কমোডোর পেরি জাপানের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটালে শোগোশোসারা বিপুল বিশ্বে বেওসা করার ভার নিলেন। উৎপাদনের নয় । বিংশ শতাব্দীতে ট্রেডিং আর ম্যানুফ্যকচারিংএর সীমা রেখা ভাঙতে শুরু করে।  তবু বহু বছর লাগলো । নিসান বানিয়েছে গাড়ি, বিক্রি করেছে কোন শোগোশোসা ( মিতসুই, সুমিতোমো, ইতোচু, মারুবেনি ইত্যাদি ) দ্বিতীয় দশকে মিতসুবিশি ( তিনটে হীরে) ফাইটার প্লেন বানানোয় পয়সা ঢেলেছে - জাপানের সামরিক আগ্রাসনের দাবিতে ( ক্রুপ যেমন বানাল কামান )। সেটা তাঁদের মূল লাইন নয় । আরেকটা কথা - সব শোগোশোসাতেই ক্রস হোল্ডিং চালু ছিল। কে কার কতটা মালিক বুঝে ওঠা শক্ত । অর্থনীতিতে পরতে হয়েছে , পরে সিটি ব্যাঙ্কে জাপানি করপোরেট সেবা করেছি ! 
  • Amit | 193.116.79.121 | ০২ জুলাই ২০২২ ০৩:১০509545
  • ওকে। এবারে টাইম লাইন টা বুঝতে পারলাম। থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু। 
  • Kishore Ghosal | ০২ জুলাই ২০২২ ০৯:৫৮509546
  • @ বামাক্ষ্যাপাবাবু ও &/ বাবু, অনেক ধন্যবাদ আলোচনার জন্য। পাঁচালিকার শ্রী দাশরথি রায় (১৮০৫-৫৭)-এর রচিত গানটিতে দুটি পাঠই প্রচলিত "ধর্মাধর্ম / ষড়রিপু হল কোদণ্ড স্বরূপ"।  কোদণ্ড মানে ধনুক, তবে এই গানে "কোদণ্ড"-র অর্থ আর্ষ প্রয়োগে কোদাল। 
     
    হীরেনস্যার ও অমিতবাবু, ভারতীয় বাণিজ্যিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমকালীন বিশ্ব-বাণিজ্যের পর্যায়গুলি জানতে পেরে ঋদ্ধ হচ্ছি এবং আশ্চর্য হচ্ছি। আমার লেখাটি, আপনাদেরও নানান চিন্তা-ভাবনাকে উস্কে দিতে পারছে দেখে আনন্দিতও হচ্ছি।        
  • বামাক্ষ্যাপা | 2a00:23c4:2400:2c01:193f:f32b:8932:58bc | ০২ জুলাই ২০২২ ১৫:০৩509549
  • কিশোর বাবুকে অনেক ধন্যবাদ 
    ষড়রিপু শুনে নিজের অজ্ঞ তায় লজ্জিত হয়ে পড়েছিলাম , পান্নালাল এর গানে বোধ হয় ধর্মাধর্ম কথাটি ই আছে 
     
    আমার জ্ঞানের পরিধি অত নয় , আর্স প্রয়োগ টা কি সেটা অল্প কথায় একটু বুঝিয়ে দেবেন ? লিংক দিলেও চলবে , পড়ে নেবো 
  • Sara Man | ০২ জুলাই ২০২২ ১৫:৫৩509550
  • "পারস্য, মিশর, গ্রীস, ব্যাক্ট্রিয়া, রোম; পশ্চিমের বেশ কিছু যুদ্ধবাজ পশুপালক উপজাতিও – শক, পার্থিয়ান, কুষাণ। এইসব বিদেশী ভাবনা চিন্তার সঙ্গে দেশজ অনার্য-ব্রাহ্মণ্য-জৈন-বৌদ্ধ দর্শন মিলেমিশে - একই সূত্রে বেঁধে ফেলছিল সুদূর চট্টগ্রাম থেকে কান্দাহার, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর ভারতবাসীকে" - মানসিক, বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার তো বহন করছি। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছে, চেহারার পরিবর্তন কিছু এসেছে কী? ৬০০ বিসিই থেকে ০ বিসিই তে ভারতীয়দের চেহারা আর আজকের চেহারার মধ‍্যে কতটা মিল আর কতটা অমিল? 
  • Kishore Ghosal | ০২ জুলাই ২০২২ ১৮:৫৩509554
  • @ বামাক্ষ্যাপাবাবু, "আর্ষ" কথাটির মূল ঋষি। কোন কবি বা সাহিত্যিকের কালজয়ী রচনায়, যদি ব্যাকরণগত বা অর্থগত ভুল থাকে, সেটিকে আর্ষ প্রয়োগ বলে পণ্ডিতেরা মেনে নেন। তাঁদের বক্তব্য, মর্মস্পর্শী কোন গানে বা রচনায় কবি কিছু ভুল-ভ্রান্তি করে ফেললেও, বিশেষ ওই গানের ক্ষেত্রে কবির উদ্দিষ্ট অর্থটিকেই মান্যতা দেওয়া হবে। কিন্তু সে অর্থ সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমন, গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী - "চল কোদাল চালাই, ভুলে মানের বালাই " - গানে, কোদালের বদলে "কোদণ্ড" ব্যবহার কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। 
     
    @ শারদা ম্যাম, এই বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা কঠিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছেন, "শক, হুন দল, পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন"। এই লীন হওয়ার কারণে আমাদের চেহারায় কিছু কিছু পরিবর্তন হয়েছে বৈকি! তবে  গ্রামীণ ও খেটে খাওয়া  জনসাধারণের চেহারায় আহামরি কিছু পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার মনে হয়না। তবে তখনকার তুলনায়, আধুনিক শহরের শ্রমহীন উচ্চবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তদের চেহারার জৌলুষ ও চাকচিক্য বেড়েছে, তাদের খাদ্যের বিবিধতায়, নিরন্তর প্রসাধন, ত্বক চর্চা ও নিয়মিত তরিবতের ফলে। তৎকালীন ভারতীয়দের প্রসাধন ও রূপটান নিয়েও আলোচনা আসবে চতুর্থ পর্বে।             
  • Kishore Ghosal | ০২ জুলাই ২০২২ ১৯:২৮509555
  • @ অমিতবাবু, শিল্পীদের দক্ষতা নির্ভর করে স্থানীয় উপাদানের ওপর, সেই সময়ে তো বটেই, এমনকি আজও। 
     
    আমাদের নদীমাতৃক দেশের পলিমাটি থেকে মাটির জিনিষপত্র এবং শিল্প সামগ্রী বানিয়ে তোলায় আমাদের শিল্পীরা দক্ষ ছিলেন। সিন্ধুসভ্যতার যুগেও মাটির পাত্র বানানোয় ভারতীয় শিল্পীদের জুড়ি মেলা ভার ছিল। 
      
    তৎকালীন ভারতীয় স্থপতিদের কাছে পলিমাটির - আগুনে অথবা রোদে পোড়ানো ইঁট, আর দেশ জোড়া অরণ্যের কাঠ - শাল, সেগুন, মেহগনিই ছিল, যে কোন নির্মাণের একমাত্র উপাদান। 
     
    পারস্য, মিশর, গ্রীস অঞ্চলে এমন সীমাহীন জঙ্গল আর নদীবাহিত পলি তো ছিল না। সর্বত্রই পাথুরে জমি আর পাথুরে পাহাড়। কাজেই ওখানকার শিল্পীরা ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পাথরের কাজে দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।
     
    আধুনিক যুগেও স্থাপত্য কর্মে বাংলার দক্ষশ্রমিকের চাহিদা সারা ভারত জুড়ে - কিন্তু পাথরের কাজে দক্ষতা রাজস্থান ও কর্ণাটকের শিল্পীদের। কারণ দুই অঞ্চলেই রয়েছে পাথরের প্রাচুর্য। বাংলায় পাথর যেমন অপ্রতুল, দক্ষ প্রস্তর শিল্পীও বিরল। কিন্তু আজও বাংলার মৃৎ-প্রতিমা শিল্পীদের দক্ষতা ও শৈলীর সমকক্ষ ভারতের কোথাও দেখা যায় না।      
  • হীরেন সিংহরায় | ০২ জুলাই ২০২২ ২২:১৯509560
  • কিশোর

    নানান চিঠি পত্র পড়ে আলোচনায় যোগ দেবার বাসনা প্রবল রূপে জেগে উঠল।  বারমিংহামে বৃষ্টি হচ্ছে । খেলা বন্ধ তাই কোন অজুহাত নেই।

    সারদা মানুষের মাপের কথা বলেছেন । আমার দীর্ঘদিনের ইউরোপ প্রবাসে মনে হয়েছে দূর উত্তর বাদ দিলে গড়পড়তা ইউরোপিয়ানের উচ্চতা কম ছিল। পুরনো ঘরবাড়ি এমনকি রাজবাড়ীর অন্তঃপুরের দরোজা নিচু। গতকাল রাইগেটের কাছে বনের ভেতরে একটি প্রাচীন পাথরে তৈরি পাবে লাঞ্চ ছিল । তার  দরোজা এমন নিচু যে মস্তিষ্কে আঘাত অনিবার্য। জানা গেলো সেটি ছিল অষ্টম হেনরির শিকার ভবন ( হান্টিং লজ) বয়েস প্রায় পাঁচশ বছর ! উচ্চতার বিবর্তন কবে কি ভাবে হলো ?আজকের ডাচ ইউরোপের সবচেয়ে লম্বা মানুষ। দুশ বছর আগে গড়পড়তা ডাচ এমন কিছু উঁচু মাপের ছিলেন না আমার ডাচ বন্ধুরা বলেন – এই আকস্মিক দৈর্ঘ্যের কারণ আলু  খাওয়া ! সত্যি মিথ্যে জানি না তবে ডাচের পরেই যে জাতি দীর্ঘদেহী সেটি লিথুয়ানিয়ান তাঁদের গ্রামের বাড়িতে দেখেছি আলুর বিশাল উপস্থিতি! জুন মাসে গ্রিসের  সান্তরিনিতে গিয়েছিলাম । সেখানে আস্ত একটা প্রাচীন শহর খুঁড়ে পাওয়া গেছে – আক্রতিরি , তার বয়েস সাড়ে তিন হাজার বছর। কি নিচু দরোজা ! এটা নৃতত্বের দফতর। যা চোখে পড়েছে তাই লিখছি !

    ইউরোপিয়ানদের মেনু আর ভোজনের সময়ে বিশাল ফারাক । এতো স্বল্প জায়গাতে যদি এতো তফাৎ আমাদের দেশে আরও বৈচিত্র্য অবশ্যম্ভাবী ।

    মিশরে গাছ ছিল না । ফারাওরা লেবানন থেকে সেদার গাছের গুঁড়ি আনতেন বহু মূল্য দিয়ে।  কিশোর যথার্থ বলেছেন পারস্য বা  গ্রিসের শিল্পীদের যত খোদকারি পাথরের ওপরে।  আমাদের দেশের শিল্পীরা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন – মাল মশলা পেয়েছেন তা ফলানোর জন্য !  

    আপনার ওই বনিক বিশ্লেষণ মাথার ভেতরে গেঁথে গেছে – কেবলই হানসা লিগের তুলনা চলে আসে।  এমনকি গত পাঁচশ বছরে ইউরোপে যত শিল্প সমবায় বা গিলড তৈরি হয়েছে তার জননী তো ভারতীয় সভ্যতা !  

    আপনাদের হাতে কাজ কর্ম আছে। তাই  আর উটকো চিন্তা প্লান্ট করে সামগ্রিক ভাবে মাথা খারাপ করার চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখি।

    খেলা এখনো বন্ধ।

     
  • Kishore Ghosal | ০৩ জুলাই ২০২২ ১০:৪৫509600
  • হীরেনস্যার, 
     
    আমার লেখাকে উপলক্ষ্য করে এত যে গুণী মানুষের সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত হচ্ছে, তাতেই আমি কৃতার্থ। কত যে নতুন শিখছি, জানছি, নতুন ভাবছি, তার সীমা নেই।  আজকে মানুষের উচ্চতা নিয়ে আপনার লেখাটি পড়ে অনেক নতুন ভাবনার উদয় হল, তাতে মনে পড়ে গেল কলেজে পড়া একটি বিষয় - বাস্তু বিজ্ঞান (Civil Engineering Planning)-এর সেকাল ও একাল।    
     
    প্রাচীন  এবং চার-পাঁচশ বছরের পুরোনো ঘরবাড়িতেও দরজা জানালা ছোট হত, তার কারণ সেসময়কার মানুষজন বেঁটে-খাটো হত - এই অনুমান হয়তো সঠিক নয়। 
     
    ঘরের দরজা-জানালা ছোট রাখার কারণ  বাইরের শীত-গ্রীষ্ম আবহাওয়ার প্রকোপকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখা। এস্কিমোদের ইগলুর দরজা খুবই ছোট হয় - হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয় এবং জানালা থাকে না - তার কারণ তাদের উচ্চতা নয় - মেরু অঞ্চলের তীব্র শীতল হাওয়ার প্রকোপকে যথা সম্ভব ঠেকিয়ে রাখা। আমাদের রাজস্থানের মরুপ্রান্তরের গ্রামগুলির বাড়িতেও দরজা ছোট এবং জানালা খুবই কম রাখা হয়, ভয়ংকর গরমের লু-কে এবং শীতের কনকনে বাতাস ঠেকাতে। 
     
    আমাদের দেশের সাধারণ বাড়িতেও - এমনকি আমাদের গ্রামের (বর্ধমানে) মাটির বাড়িগুলিতেও, ছোটবেলায় দেখেছি, ঘরে ঢুকতে বাবা-কাকাকে মাথা নিচু করতে হত, এবং জানালাগুলিও বেশ ছোটই হত, তারও কারণ ওই গরম ও শীতের প্রকোপকে আটকানো। 
     
    আবার ভারতের প্রাচীন মন্দিরে গর্ভগৃহের দরজা খুবই ছোট রাখা হত - তার প্রথম কারণ ওয়েদার আর দ্বিতীয় কারণ দেবতা বা দেবীর সামনে বাধ্যতামূলক প্রণত হয়ে প্রবেশ।  
     
    দিল্লীর মোগল প্রাসাদের দরজাগুলি অবশ্য বড়ো বড়োই ছিল, কারণ সে দরজায় জলে ভেজানো ভারি ভারি শীতলপাটি বা খসখসের পর্দা ঝোলানো হত, দিল্লির ভয়ংকর লু-কে শীতল করার জন্যে। সে পর্দা নিরন্তর ভিজিয়ে তোলার জন্যে থাকত নির্দিষ্ট  ক্রীতদাস। ব্রিটিশরা ভারতে এসেও তাদের বাংলোগুলিতে মোগলপদ্ধতিই অনুসরণ করেছিল।   
     
    আমার মনে হয়, সাধারণ বাড়িতে প্রমাণ সাইজের দরজা জানালা বানানো শুরু হয়েছে - ইলেক্ট্রিক বিশেষ করে, ইলেকট্রিক পাখা আবিষ্কারের পর। এখন তো এসি, রুমকুলার ও রুমহিটার হয়ে জষ্টির দুপুর বা মাঘের মধ্যরাত্রিতে - আমাদের একই অনুভব।   
  • হীরেন সিংহরায় | ০৩ জুলাই ২০২২ ১৬:৩৪509602
  • কিশোর 
     
    একেবারে ঠিক। আরেকটু পাতা উলটে আপনার মত শিরোধার্য করছি ।  বাড়ির ভেতরে উত্তাপ বা শীতলতা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে এই শীর্ণ দরোজা জানালা ! ইংল্যান্ডে সেন্ট্রাল হিটিং এসেছে হয়তো ছয়ের দশকে রান্নাঘরে উনুনের আঁচ , বাথরুমে গরম জল শয়নকক্ষে লেপ। সেন্ট্রাল হিটিং আবার কেন ? ? ওপেন প্ল্যান বসার ঘর দেখা গেছে হয়তো  বিশ আগে। সবটাই টেকনিকাল কারিকুরির কারণে । 
     
    দ্বিতীয় মন্তব্য মেনে নেওয়া যাচ্ছে না! গত দুশ বছরে গড়পড়তা ডাচ মানুষের দৈর্ঘ্য আট ইঞ্চি বেড়েছে সেটা প্রমাণিত সত্য । এ নিয়ে বিশদ গবেষণা চলছে! মাত্র একশ বছরে গোটা ইউরোপের মানুষের উচ্চতা বেড়েছে অন্তত  পাঁচ ইঞ্চি।  জাপানিদেরও তাই । সেটা কিসের কারণে কে জানে । 
     
    আপনার বই প্রকাশিত হবার আগে একটা পরিশিষ্টের কথা একটু ভাববেন ? বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থা ও তার পরিচালনার তুলনামূলক আলোচনা?  
  • Kishore Ghosal | ০৩ জুলাই ২০২২ ২১:৪৭509609
  • হীরেন স্যার, 
    এই উচ্চতা বাড়ার ব্যাপারটা নিয়ে আমার ধারণাই ছিল না। জেনে আশ্চর্যই হলাম। বিগত প্রায় দুশ বছরে ডাচদের গড় উচ্চতা বেড়েছে আট ইঞ্চি!  
     
    এর কারণ কী সামগ্রিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পুষ্টিকর খাদ্যের বিপুল সংস্থান? বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন। 
     
    পরিশিষ্ট নিয়ে অবশ্যই ভাবছি। কারণ এই লেখার সূত্র ধরে আপনার এবং আরও অনেকের প্রাসঙ্গিক আলোচনায় অনেক নতুন তথ্য এবং তত্ত্ব  পাচ্ছি  এবং আশা রাখি ভবিষ্যতেও পাবো। সেগুলির অন্তর্ভুক্তি আমার এই লেখাকে অবশ্যই সমৃদ্ধ করবে।  
  • উজ্জ্বল | ০৪ জুলাই ২০২২ ১৯:০২509639
  • আমার মনে হয়, পুষ্টিকর খাবার মানুষের গড় উচ্চতা বাড়ার পিছনে একটা বড় কারণ। এটা অবশ্য অনুমান। এটাও মনে হয়, প্রথম দিকে আর্থিক অসাম্য ছিল খুব বেশি, সমাজের একটা বিরাট অংশ এই ব্যবসা বাণিজ্য, যুদ্ধ বিগ্রহ, ধর্মাধর্ম থেকে দূরে রাজা, ভূস্বামী, বণিক, ধর্মপ্রচারক সবাইয়ের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে প্রায় পশুর মত বাঁচত। তাছাড়া অসুখবিসুখ, বন্যা দুর্ভিক্ষ এসব তো ছিলই। অধিকাংশ মানুষের পেটভরে খাওয়াই জুটতো না, পুষ্টিকর খাবার তো নয়ই। দেখতে ছিল শীর্ণ, কালো, রুগ্ন - অনেকটা পশুর মতই, কথাও ঠিকমত বলতে পারত না, ভেউ ভেউ করে খালি কাঁদতো আর প্রার্থনা করত পরলোকে স্বার্গপ্রাপ্তির জন্যে । এদের ওপর ছড়ি ঘোরাত মুষ্টিমেয় বামুন, ধর্মপ্রচারক, ব্যবসায়ী, রাজার ও জমিদারের অনুচর, এরা ছিল পেটমোটা, হয়তো ফর্সা, সংস্কৃতে বা সেকালের সাধুভাষায় কথা বলত, কিছুটা ভালোভাবে বাঁচতো। কাব্য-সাহিত্যেও এরাই প্রাধান্য পেয়েছে, যা থেকে উপাদান সংগ্রহ করে ইতিহাস রচনা হয়েছে। এদের দিকেই ইতিহাসকারের ফোকাস ঘুরে গেছে, গরিবরা হারিয়ে গেছে। এদের কথাও একটু লিখবেন।
  • Kishore Ghosal | ১২ জুলাই ২০২২ ১১:২২509815
  • উজ্জ্বলবাবু, 
    ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলির সন্ধান করাই এই লেখার উদ্দেশ্য। তবে ওই যে মোক্ষম কথাটি বলেছেন, ইতিহাস সর্বদাই উচ্চবর্ণের কথা মনে রেখেছে। সেই উচ্চবর্ণের ইতিহাসের ফাঁকে ফাঁকে গরিব বা সাধারণের যেটুকু ইতিহাস পাওয়া যায়, সেটাই খুঁজে চলেছি এই লেখায়।      
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন