• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • পার্টিশানের অজানা গল্প ১


    বিভাগ : আলোচনা | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৯৭ বার পঠিত
  • এই ঘোর অন্ধকার সময়ে আরেকবার ফিরে দেখি ১৯৪৭ এর রক্তমাখা দিনগুলোকে। সেই দিনগুলো পার করে যাঁরা বেঁচে আছেন এখনও তাঁদেরই একজনের গল্প রইল আজকে। পড়ুন, জানুন, নিজের দিকে তাকান...
    ===================
    ‘আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা হিন্দুস্তানে জন্মায়, বড় হয়, সারাজীবন কাটিয়ে যখন মারা যায় তখন তাদের দাহ করে সেই ছাই গঙ্গানদীর পুণ্যপ্রবাহে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তারা বয়ে চলে গঙ্গার স্রোতধারায়, যদিও গঙ্গার জল শেষপর্যন্ত গিয়ে মেশে সাগরে, সে জল তখন আর শুধু হিন্দুস্তানের নয়। আমরা মুসলমানরা এদেশে জন্মাই, বড় হই, সারাজীবন কাটিয়ে মৃত্যুর পর আমাদের কবর দেওয়া হয় মাটির গভীরে। কালক্রমে আমাদের দেহ পচেগলে সম্পূর্ণ মিশে যায় এই মাটিতে, আমরা হয়ে যাই এই মাটির অংশ, হয়ে যাই ‘হিন্দুস্তান’ – দিল্লীর হাউজ-রানী এলাকার এক দোতলা বাড়ির স্বল্পালোকিত ঘরে বসে দৃঢ়কন্ঠে বলে চলেছেন নাজমুদ্দিন খান। তাঁর চোখে, মুখে, সর্ব অবয়বে গভীর বিষাদের প্রলেপ। দেখে বোঝা যায় এই শান্ত বিষাদ আজ, কাল বা নিকট অতীতের কিছু নয়, এ বিষাদ তাঁর সাথে রয়েছে সুদূর অতীত থেকে, তাঁরই সাথে বয়স্ক হয়েছে, গাঢ় হয়েছে এ বিষাদ। আবার বলতে শুরু করেন, ‘আমার বাবা বলতেন হিন্দুস্তান আমাদের দেশ, আমাদের জন্মভূমি। আমরা মুসলমান একশোবার, কিন্তু এইই আমাদের দেশ, আমরা এই মাটিরই সন্তান। এখানে জন্মেছি আমরা, এখানেই আমাদের মৃত্যুও হওয়া উচিৎ।‘ এইই আমাদের দেশ, একে ছেড়ে কোথায় যাব? কেন যাব?’ উত্তর দিতে পারেন না সামনে বসে থাকা তরুণীটি, অঞ্চল মালহোত্রা। অঞ্চল খুঁজে বেড়াচ্ছেন দেশভাগের শিকার মানুষগুলিকে, হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তাঁদের কাছে থাকা এমন কিছু জিনিষ, স্মৃতিচিহ্ন, যা সেই রক্তমাখা আগুনঝরানো দিনগুলি পেরিয়ে এসেছে, এখনও আছে। যা তাঁদের দেশভাগের সময়টাকে মনে করিয়ে দেয়। সেই খোঁজেই অঞ্চল এসেছেন নাজমুদ্দিনের সাথে কথা বলতে।
    .
    নাজমুদ্দিনের বাবা উচ্চপদস্থ সুরক্ষাকর্মী হিসেবে চাকরি করতেন তৎকালীন ভাইসরয় হাউসে, যা এখন আমরা রাষ্ট্রপতি ভবন নামে চিনি। বাবার কাছেই তাঁর শোনা গান্ধিজী, মহম্মদ আলি জিন্নাহ_ জওহরলাল নেহেরুর গল্প। বলেন ‘১৯৪৭ এ ব্রিটিশরাজের চলে যাওয়া এবং পার্টিশানের দিনগুলোতে যা যা হয়েছে এখানে সব সঅব আমি নিজের চোখে দেখেছি। না দেখলেই ভাল হত, কিন্তু যা দেখেছি তা তো দেখেই ফেলেছি, সে তো আর অদৃশ্য করে দিতে পারব না --- কিন্তু তখনও বলেছি, এখনও বলি ‘পার্টিশান’ ভুল ছিল, ভীষণ ভুল।‘ অঞ্চলের চোখে তাঁর গভীর বিষাদে ডুবে থাকা চোখ রেখে বলতে থাকেন ‘একের পর এক বড় বড় শহরগুলোতে ঘটে চলেছিল বড় বড় হিংস্র ঘটনা, অচিন্তনীয়, অকল্পনীয় সব ঘটনা। এইসময়ই নবগঠিত সীমান্তের এপার ওপার জুড়ে শুরু হয় এক মহাপ্রস্থান; হিন্দুরা দলে দলে এসে পৌঁছাচ্ছে অপরিচিত ভূমিতে, মুসলমানরা দলে দলে পাড়ি জমাচ্ছে তাদের তাদের জন্য প্রতিশ্রুত স্বপ্নের ভূমিতে, যার নাম ‘পাকিস্তান’। দেখলাম তারা তাদের ঘরবাড়ি, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি মায় জীবন পর্যন্ত ফেলে রেখে চলে যাচ্ছে।‘ বলতে বলতে চোখ বন্ধ করে ফেলেন, আবার খুলে অঞ্চলের দিকে ঝুঁকে পড়ে গভীর সুরে জিগ্যেস করেন ‘আচ্ছা বেটা মুসলমানরাও কি এই দেশেই জন্মায়নি? এটা কি আমাদেরও দেশ নয়? যেখানে আমরা জন্মেছি, বড় হয়েছি, আমাদের কি সেই ভূমিতে কোনওই অধিকার নেই? আমার বাবা বলেছিলেন ভারত এক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হবে, কিন্তু আজ আমি সেই দৃষ্টিভঙ্গী হারিয়ে ফেলছি। তিনি আমাদের সামনে এক মহান ভারতের সুন্দর ছবি তুলে ধরতেন আর আমরা সেসব বিশ্বাসও করেছিলাম, এখন মনে হয় আমরা স্রেফ বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম সুন্দর স্বপ্ন, কিন্তু আসলে তা বোধহয় কোথাওই ছিল না। আবার স্তব্ধ হয়ে যান বৃদ্ধ। অঞ্চলের মুখে কোনও কথা যোগায় না, চেষ্টা করেও বৃদ্ধের চোখ থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নিতে পারেন না। অঞ্চলের দমবন্ধ হয়ে আসে ওই নিস্তব্ধ ঘরে, অস্বস্তি কাটাতে মনে মনে ভাবার চেষ্টা করেন এবার হয়ত নাজমুদ্দিন কোনও কাগজে বের করে আনবেন বা টুকিটাকি কোনও জিনিষ, যা হয়তবা ভাইসরয়ের বাড়ির উপহার অথবা তাঁদের সাথে থেকে যাওয়া কিছু যা সেই পার্টিশানের সময় থেকে এখনো রয়ে গেছে, অথবা তখনকার কোনও ফোটো, যার খোঁজে তাঁর এখানে আসা।
    .
    সেসব কিছুই হয় না, শুধু স্তব্ধতা ভঙ্গ করে বৃদ্ধ আবার বলতে শুরু করেন ‘আগেই বলেছি আমার বাবা কর্মসূত্রে ভাইসরয় হাউসেই থাকতেন।সেই সময় ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল --- আহা কি যেন নাম গো, সেই যে লম্বামত বৃটিশ ভদ্রলোক --- ও হ্যাঁ মনে পড়েছে মাউন্টব্যাটেন, সেই মাউন্টব্যাটেন সাহেব একদিন আমার বাবা ও সুরক্ষাবাহিনীর বাকী সব কজন মুসলমান কর্মীকে ঘরে ডেকে পাঠালেন, বাবাকে বললেন জিন্নাসাহেবের সুরক্ষাবাহিনীতে উচ্চপদস্থ অফিসার হিসেবে যোগ দিতে, সফদরজঙ্গ এয়ারপোর্টে তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের জন্য একটি বিমান অপেক্ষা করছে, তাঁরা যেন অবিলম্বে ভারত ত্যাগ করেন।‘ একটু থেমে কয়েক ঢোঁক চা খেয়ে আবার শুরু করেন বৃদ্ধ, ‘কিন্তু আমার বাবা --- আমার বাবা বলেন না স্যার আমি পাকিস্তানে যাব না, এখানেই থাকব। মাউন্টব্যাটেন তখন তাঁকে বলেন পাকিস্তান তৈরী হয়েছে সব মুসলমানের জন্য, যেহেতু আমার বাবা সরকারি চাকরিতে আছেন, কাজেই তাঁদের দায়িত্ব আমার বাবাদের সকলকে নবগঠিত পাকিস্তান সরকারের অধীনে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া। কিন্তু বাবা রাজী হন না, একদৃষ্টিতে মাউন্টব্যাটেনের দিকে তাকিয়ে তিনি শুধু বলেন যেদিন সমস্ত মুসলমান এদেশ ছেড়ে যাবে, আমি সেদিনই যাব, তার আগে নয়। তিনি ভারত না ছাড়ার ব্যপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, কাজেই পরিবারের কেউও যায় নি, আমরা পাঁচ ভাই দুইবোন সকলেই ভারতে থেকে গেলাম। এই হাউজ-রানী, বেগমপুরা, চিরাগ দিল্লি মালব্যিয়া নগর এগুলো সব তখন ছোট ছোট গ্রামের মত, মাটি আর খড়ের তৈরী বাড়িসব, কারো বাড়িতেই বিদ্যুৎ ছিল না। গরমের দিনে আমরা সবাই হয় একটা ঘরে জড়ো হয়ে ঘুমাতাম, নয়ত ছাদে। ব্যবসাপাতিও কারও তেমন ছিল টিল না। অধিকাংশই দৈনিক মজুরিতে শ্রমিকের কাজ করত, সকালে উঠে এখান থেকে আধঘন্টার দূরত্ব ধৌলা কুঁয়ায় চলে যেত কাজের খোঁজে। ওখানে মস্ত মস্ত পাথরওয়ালা পাহাড় ছিল তখন, লোকজন সেখানে সারাদিন পাথর ভাঙত, যাতে সেইসব পাথরের টুকরো দিয়ে রাস্তা বা ঘরবাড়ি বানানো যায়। আমিও ‘সওয়া রূপেয়া’ (১ টাকা ২৫ পয়সা) মজুরিতে এই কাজই করতাম।‘ এতক্ষণে যৌবনের স্মৃতিতে তাঁর মুখ কোমল হয়ে আসে, উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘দিল্লী তখন বিস্তৃত ছিল সফদরজঙ্গ এয়ারপোর্ট অবধি, আর এখন ওই যে হাসপাতালগুলো দেখছ চারপাশে ওই এলাকাগুলোতে ছিল ভুট্টার ক্ষেত। ভাবতে পার, সাউথ এক্সটেনশান, ডিফেন্স কলোনী গ্রেটার কৈলাশ সব ক্ষেতিজমি আর মাঠ ছিল! এয়ারপোর্টের পাশেই একটা পুরানো রেললাইন ছিল, এখন যেখানে ফ্লাইওভার--- হাসতে হাসতে বলেন বৃদ্ধ। অঞ্চলকে জিগ্যেস করেন তুমি হিন্দু না মুসলমান? হিন্দু জেনে আবার জিগ্যেস করেন তুমি এই দিল্লীর লোক? অঞ্চল ইতস্তত করে বলেন হ্যাঁ এখন আমার পরিবার, মা বাবা দিল্লীরই বাসিন্দা বটে, আমারও জন্ম এই শহরেই। তবে আমার ঠাকুর্দা ঠাকুমা, দাদু দিদারা অন্য অঞ্চল থেকে এসে এখানে থাকতে শুরু করেছিলেন, সেসব অঞ্চল এখন সব পাকিস্তানে।
    .
    বৃদ্ধ একটু বিরক্ত কন্ঠে বলেন ‘কে ই বা আসলে দিল্লীর লোক! সবাই এখানে উদ্বাস্তু, আমরাও’। অঞ্চল অবাক হয়ে জিগ্যেস করেন, সেকি! আপনার বাপ ঠাকুর্দা সবাই তো এই দিল্লীতে জন্মেছেন! আপনারাই তো আদত দিল্লীওয়ালা! একটু কেশে গলা পরিস্কার করে নিয়ে নাজমুদ্দিন বলেন ‘নাহ আমাদেরও দিল্লী ছেড়ে যেতে হয়েছিল পার্টিশানের সময়, আমরা বাধ্য হয়েছিলাম পালাতে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য। আমরা ফিরে এসে আবার এই একই জায়গায় থাকতে শুরু করি --- আজ যেটুকু যা আছে আমাদের, প্রাণসহ সবই আল্লার দান।‘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাজমুদ্দিন টেনে টেনে বলেন ‘মানুষে মানুষে এই যে ধর্মের জন্য লড়াই, এ মোটেই ভাল কিছু নয়, এ সমাজকে কেবল ভেঙেচুরে শেষ করে দেয়। পার্টিশানের আগে আমরা এখানে দিব্বি থাকতাম, কোনও ভাওভেদ ছিল না। কিন্তু তারপরে আমরা শুনতে শুরু করলাম যে বৃটিশরা দেশ ছেড়ে একেবারে চলে যাবে, হিন্দুদের জন্য আলাদা দেশ আর মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ হবে। কি জান, তখন তো এত রেডিও টেডিও ছিল না, খবরাখবর যা আসত সব লোকের মুখে মুখেই। আর আমরা বাবার অফিসের পিওনদের থেকেও খবর পেতাম। এখন এই হাউজ-রানী মূলতঃ মুসলমানপ্রধান এলাকা, কিন্তু সেই ১৯৪৭এ এখানে অনেক হিন্দু পরিবারও থাকত। সে কি গন্ডগোল শুরু হয়ে গেল চারপাশে --- এই হাউজ-রানীর ঠিক পাশেই মুনিরকা গাঁও, সেখানে একটা লোক ছিল, সে মুসলমানদের ভারতে থেকে যাওয়ার প্রচন্ড বিরোধী ছিল --- সে আমাদের এলাকা জুড়ে সমানে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে ফেলে ফেলে পুরো এলাকায় প্রায় সমস্তকিছুতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। সেই আগুন এত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে গেল যে এলাকার লোকে প্রাণভয়ে যত দ্রুত সম্ভব পালানোর চেষ্টা করে ---কাছেই একটা ছোট পাহাড় ছিল --- পরিবারদের বাঁচানোর মরীয়া চেষ্টায় অনেকে সেখানে আশ্রয় নিতে যায় --- সেখানেও একদল হিন্দু তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কাজেই যারা নিরাপদে পাহাড় অবধি পৌঁছাতে পেরেছিল তারা সকলেই নিহত হয়। হাজারের মত লোক ওখানে কচুকাটা হয় --- তাদের দেহ ওখানেই দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ পড়েছিল --- তাদের হাড়গুলো ওখানে দশকের পর দশক পড়েছিল, এখনও হয়ত খুঁজলে পাওয়া যাবে। আশেপাশের সেখ-সরাই, চোর মিনার এলাকায়ও অকাতরে খুন হয়, তাদের দেহগুলো কেটে টুকরো টুকরো করে একটা বড় গর্ত খুঁড়ে তাতে একের পর এক ফেলে দেওয়া হয়। রাস্তায় ‘মুসলমানদের গণকবর’ বানানো নিয়ে মানুষের উল্লাস আমি নিজের কানে শুনেছি, নিজের চোখে দেখেছি। আমরা বুঝতে পারি এরপরে যে কোনওদিনই আমাদের পালা আসবে --- বাঁচতে হলে পালাতে হবে। ‘ বৃদ্ধের মুখ আবার বিষণ্ণ হয়ে যায়, আস্তে আস্তে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন এইসব স্মৃতি আমি কত চেষ্টা করেছি ভুলে যেতে, কিন্তু নাহ_! যা দেখেছি নিজের চোখে তা কিছুতেই আমাকে ছেড়ে যায় না।‘ বৃদ্ধের গলা অদ্ভুত নির্লিপ্ত, যেন এগুলো তাঁর নিজের জীবনে ঘটে নি, যেন তিনি নিছকই টিভিতে দেখেছেন বা খবরের কাগজে পড়েছেন এসব ঘটনা। অঞ্চলের এইসময় আবার মনে পড়ে শুরুতে বৃদ্ধের কথাগুলো, মৃত্যুর পরে কীভাবে মুসলমানরা এই মাটির অংশ হয়ে যায়, হিন্দুস্তান হয়ে যায় ---শিউরে ওঠেন --- অবোধ্য অপরাধবোধে ছেয়ে যায় তাঁর মন – বড় করে শ্বাস নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেন। নাজমুদ্দিন বলতে থাকেন ‘এই সময় আমাদের আর না পালিয়ে উপায় ছিল না, কিন্তু সেই পালানোর ভেতরে এক কাপুরুষতাও তো ছিল, তাও আমাদের বড় কষ্ট দিয়েছিল, জান। লজ্জাকর সেই পলায়নের সময় আমরা শুধু কিছু জামাকাপড় ছাড়া আর কিচ্ছু নিই নি। রাতের বেলা অন্ধকারের সুযোগে ভাইসরয় হাউস থেকে পাঠানো সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে আমরা সপরিবারে চলে যাই উত্তরপ্রদেশে আমাদের এক আত্মীয় বাড়িতে। সেখানেই থেকে যাই অনেকদিন, যতদিন না দাঙ্গা থামে, পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। ফিরেওছিলাম রাতের অন্ধকারেই। এসে দেখলাম আগের জীবনযাত্রার কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না --- আশেপাশে যত চেনাপরিচিত প্রতিবেশী ছিল, কেউ নেই, একজনও না --- গোটা মহল্লাজুড়ে শুধু ছেয়ে আছে এক ভয়ানক বিকট গন্ধ, পচা ও পোড়া মাংসের অকল্পনীয় গন্ধ। সে এমন গন্ধ তুমি তাকে হাতে করে ধরতে পারবে, ছুরি দিয়ে কাটতে পারবে --- কিন্তু কিছুতেই সরাতে পারবে না। একবার পেলে সে গন্ধ আমৃত্যু সাথী হয়ে যায়। আমাদের বাড়িসহ হাউজ-রানীর সবকটা বাড়িই পোড়া ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল, কিছু ছিল না আমাদের আর, একেবারে কিচ্ছুটি না। এখানে আমাদের যা জমিজমা ছিল সরকার দখল করে পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের দিয়ে দিয়েছে, উত্তরপ্রদেশের আত্মীয়রা আমাদের কিছু সাহায্য করেন, সেই দিয়ে আমরা আবার নতুন করে জীবন শুরু করি। পরে আস্তে আস্তে জমির জন্য সরকার থেকে কাগজ পাই। কিন্তু সে তো একটুকরো কাগজ যাতে লেখা আছে এতটা থেকে এতটা জমি আমাদের নামে ছিল, সরকার এখন নিয়ে নিয়েছে। জমি ছাড়া শুধু কাগজ দিয়ে কী হবে বল তো? কাগজের মধ্যে তো আর মানুষ বাস করতে পারে না।‘ বিদ্রুপাত্মক তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে নাজমুদ্দিনের ঠোঁটের কোণে। অঞ্চল জিগ্যেস করেন সেই কাগজ আছে নাকি? বৃদ্ধ চরম ঔদাসিন্যে কাঁধ ঝাঁকান। অঞ্চল মনে মনে ভাবেন সত্যিই তো ওই কাগজখন্ডের তো আর কোনও মূল্য নেই। একটা অদ্ভুত তুলনা মনে আসে, পারটিশানের দলিলও তো অমনি কিছু কাগজ। অথচ অবিভক্ত ভারতে সেই কাগজ এত ভারী আর মূল্যবান যে তা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য, গন্তব্য সব বদলে দিল!
    .
    ‘কিন্তু এই যে আপনাদের পালাতেই হল আর ফিরে দেখলেন একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন, তখনো মনে হয় নি যে পাকিস্তানে চলে গেলেই ভাল হবে?’ আবারও জিগ্যেস না করে পারেন না অঞ্চল। বৃদ্ধের চোখ একটু উজ্জ্বল হয় ‘কোথায় যাব? এটাই তো আমার দেশ, আমাদের দেশ। দিল্লী আমার চেনা জায়গা এখানেই তবু আমরা কিছু উপায় করার কথা ভাবতে পারি। হ্যাঁ ঠিক কথা আমরা নিতান্তই সাধারণ মানুষ, কোনও বড়মানুষ, প্রভাবশালী কারো সাথেই চেনা পরিচয় নেই, কিন্তু তবু আমরা, এই হিন্দু মুসলমান, শিখ, ইসাই আমাদের সবাইকে নিয়েই তো গড়ে উঠেছে, আমরাই তো গড়ে তুলেছি ‘ধর্মনিরপেক্ষ ভারত’। আমার মনে হয় পাকিস্তান গড়ে উঠেছে ক্ষতি আর ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে। অবিভক্ত ভারত থেকে রাজনীতি, হিংসা, ধ্বংস আর অকাতরে রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে ভারতেরই যে অংশ ছিঁড়ে গেছে তারই নাম পাকিস্তান।‘
    .
    নাজমুদ্দিন খান আর অঞ্চল মালহোত্রা দুই দিল্লীপ্রেমী ভারতবাসী একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঝলমলে মুখে হাসেন।
    .

    তথ্যসূত্র: Remnants of a Separation (A History of The Partition Thru Material Memories) by Anchal Malhotra
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৯৭ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • | 236712.158.676712.186 (*) | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ০১:৪৩50894
  • #
  • i | 236712.158.891212.143 (*) | ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ ১২:৪৮50895
  • পার্টিশানের অজানা কাহিনী সিরিজের #৩ পড়েছিলাম, আজ #১ পেলাম। বাকি লেখা পড়তে চাই।
    এই সব লেখায় কোনো মন্তব্য করতে হাত সরে না। এই টুকুই বলি, পার্টিশান ও তৎসংক্রান্ত লেখাপত্র জোগাড় করা, পড়া এবং নিজের লেখালেখি- দ র এই নিরন্তর চর্চার সাক্ষী থাকতে পারা ( মানে পড়ছি/পড়ার সুযোগ পাচ্ছি সেই অর্থে ) খুব বড় ব্যাপার।
  • aranya | 890112.162.9001223.179 (*) | ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৬:৪৭50896
  • এটা শেয়ার করলাম, এক বিজেপি মাইন্ডেড গ্রুপে।
    একজন মুসলিম যে হিন্দুস্তান-কে নিজের দেশ মনে করতে পারে, এটা 'দেশভক্ত'-দের জানা প্রয়োজন
  • Damayanti Talukdar | 172.68.146.211 | ১৪ জানুয়ারি ২০২০ ১৬:৩৮45390
  • ইকিরে! লগিন একইভাবে হল কিন্তু এটা বা আগের লেখাগুলো আমার পাতায় পাসে নি। সবচে বাজে ব্যপারা ডিসপ্লে নেম বদলালেও কোত্থেকে তুলে পুরো নাম দেখাচ্ছে! দুদফুদ্দুদ্দুর্ররররররররর
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত