• হরিদাস পাল  বইপত্তর

  • রৌরব নরকের গলিঘুঁজিতে

    লেখকের গ্রাহক হোন
    বইপত্তর | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৫৫৫ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • লীসা গাজীর 'হেলফায়ার বইটি সম্প্রতি বেশ নাম করেছে, সপ্রশংস রিভিউ বেরিয়েছে কাগজে পত্রে।  বইটার খবর দেয় স্বাতী।  খোঁজাখুজি করে জানতে পারি লীসার 'রৌরব' উপন্যাস  অনুবাদ করেছেন শবনম নাদিয়া। বিডিনিউজ২৪ থেকে  ধারাবাহিক বাংলা উপন্যাসটি খুঁজেও দেন শবনম।  অতএব পড়েও ফেললাম। রাত জেগে প্রায় একবসায়  শেষ করে মনে হল দু'কথা লিখি।


    লাভলি, বিউটি  তাদের মা ফরিদা খানম, তাদের ছোট পরিবার আর গৃহকর্মীদের   ঘিরেই উপন্যাস আবর্তিত হয়েছে। একটি মাতৃতান্ত্রিক পরিবার, তার অবরোধ,  চাপা হিংস্রতা, অবদমন  আমরা দেখি লাভলির আপাত শান্ত ভীতু মাটির দিকে নামানো দুইচোখ দিয়ে। লাভলি তার চল্লিশ বছরের জন্মদিনে জীবনে প্রথমবারের মত বাড়ি থেকে একলা  বেরোবার অনুমতি পায়। খাঁচাবন্দী পাখি যেমন খাঁচার দরজা খোলা পেলেও চট করে উড়ে যেতে পারে না, এদিক ওদিক তাকায়, ডানা ঝাপটে কাছাকাছি   কোথাও বসে,  লাভলিও তেমনি বাড়ি থেকে বেরোয় কিছুটা অনিশ্চিতভাবে।   লাভলির এলোমেলো চলা, গাউছিয়ায় গিয়ে কেনাকাটা, রমনাপার্কে অনিশ্চিত বসে থাকার ফাঁকে পাঠক  দেখতে পান  লাভলি , বিউটির শৈশব কৈশোর যৌবনের দমবন্ধকরা  দিনযাপন। দুইবোনের একলা বেরোবার অনুমতি নেই, ছাদে ওঠার অনুমতি নেই, স্কুলে কলেজে পড়াও ফরিদা খানমের চোখের সামনে, তাতে স্কুল কলেজ আপত্তি করলে বরং পড়া ছড়িয়ে বাড়িতে বসিয়ে রাখা হয়।


    পিতৃতন্ত্র মেয়েদের এরকম কঠিন্ভাবে পর্দানশীন করে রাখে তাকে বিয়ে এবং শুধুই বিয়ে ও সংসারের জন্য তৈরী করতে। এই উপন্যাসে কিন্তু মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয় না। তাদের বিয়ের কোনও চেষ্টা করা হয় না, এরকম কোনও সম্ভাবনা দেখা দিলেও সেটি নির্মমভাবে ধ্বংস করেন তাদের মা। আমার পারিবারিক বৃত্তে একটা কথা মাঝে মাঝে শুনতাম 'সাত পাকে বাঁধার মা' অর্থাৎ 'সাত  পাকে বাঁধা' সিনেমার মা চরিত্রটির মত মা। অন্তর্নিহিত অর্থ যে মা মেয়ের বিবাহিত জীবন, যৌনসুখ চান না।  তো সেটি খুবই নিন্দার্হ বিষয় ছিল। ফরিদা খানমের চরিত্রটি একেবারে ঐ সংজ্ঞার সাথে খাপে খাপ বসে যায়। সামান্য অপরাধেও মেয়েদের শাস্তি দিতে হলে তিনি তাদের শোবার ঘরে চাবি দিয়ে আটকে রাখেন দিনের পর দিন, একজনের অপরাধে শাস্তি পায় দুই বোনই।  বাইরের জগৎ দেখে তারা এক অনচ্ছ পর্দার ওপাশ থেকে। বাবা চরিত্রটি এক অতি দুর্বল মানসিকতার পুরুষ, সংসারে তাঁর ভূমিকা একটি আদরের বিড়ালের মত।


    আমরা বিভিন্ন উপন্যাসে প্যাট্রিয়ার্কের গড়ে ওঠা দেখেছি। লীসা এই  উপন্যাসে এঁকেছেন এক ম্যাট্রিয়ার্ককে।   একা কুর্নিআওয়ানের 'বিউটি ইজ আ উন্ড' এ এক ম্যাট্রিয়ার্কের গড়ে ওঠা দেখেছিলাম আর দেখলাম 'রৌরব' এ।  ফরিদা খানমের চরিত্রটি, তাঁর ক্রমশঃ এক ম্যাট্রিয়ার্ক হয়ে ওঠা,  অতি  যত্নে তৈরী। পুরো উপাখ্যানে  চাপা গৃহহিংসা, মেয়েদের প্রতি, গৃহকর্মীদের প্রতি অশ্রাব্য বাক্যবর্ষণ দেখে মনে হয়  এত অন্ধকারও  হতে পারে কোনও বাড়ির, পরিবারের পরিবেশ!!   উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টেনে রাখে। তবু দুই একটা ছোটখাট অপ্রাপ্তিও থাকে।  মেয়েদের এই সম্পূর্ণ বন্দী করে রাখার পেছনে ফরিদা খানমের আপাত কারণটি খুব বিশ্বাসযোগ্য লাগে নি। শ্বাসরোধকারী ঘটনাক্রম এক একসময় মার্গারেট অ্যাটউডের হ্যান্ডমেড্স টেল মনে করিয়েছে কিন্তু ডিস্টোপিয়া আর সাররিয়ালিজমে অ্যাটউডের মত সফল হয় নি। কোথাও যেন একটু আটকে গেছেন লীসা। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে আমি  চরম হতাশার মধ্যেও একটু আধটু আশার আলো খোঁজার চেষ্টা করি। সেদিক থেকে এই উপন্যাসটি খুবই ডার্ক। বোকা ভীতু লাভলির আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়াও বড় বেশী মূল্য দিয়ে হয়। তবে এটুকু উপেক্ষা করাই যায়।


    থিয়েটারকর্মী লীসা বিখ্যাত তাঁর তথ্যচিত্র 'রাইজিং সায়লেন্স'এর  জন্য। এটি তাঁর  প্রথম উপন্যাস। সেই হিসেবে যথেষ্ট ভাল।   উপমহাদেশের এক পরিবারের মধ্যে দিয়ে পাঠককে  রৌরব নরকই দেখায়।


    #মাসকাবারি_বইপত্তর

  • বিভাগ : বইপত্তর | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৫৫৫ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • শঙ্খ | 203.99.212.224 | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১১:৪৫102288
  • পড়বো. কটা কিস্তি আছে গো?

  • | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১১:৫৯102289
  • ১২টা কিস্তি । শবনম যিনি অনুবাদ করেছেন বলেছেন লেখক নিজে সামান্য কিছু বদলেছেন অনুবাদের সময়। তাছাড়আপুরোটাই মূলানুগ। 


    ডকুটাও দেখো। যদিও সেটা এর সাথেযুক্ত নয় তাবু  লীসার কাজ হিসেবে  দেখো। ভাল কাজ। 

  • Sankha subhra Ghosh | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২১:৩৫102296
  • ওকে, দেখ্বো। 

  • অনিন্দিতা | 110.235.236.189 | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১১:৫৮102309
  • উপন্যাসটি পড়তে আগ্রহ বোধ করছি। সাত পাকে বাঁধার মা, ব্যাপিকা বিদায়ের মা, নারায়ণীর মা দিগম্বরী- নানা ধরনের মায়ের কর্তৃত্বপ্রবণতা আর অনধিকার চর্চা- খুব অপিরিচিত নয় আমাদের কাছে। 

  • | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৯:৩৪102312
  • আরে হ্যাঁ দিগম্বরীর কথা ভাল মনে করিয়েছেন। মনেই ছিল না। পড়ে ফেলুন। 


    (অন্য লেখাটায় শাখাওয়াতের ড্রেসের রং ভুল হয়েছে লিখেছেন দেখেছি। ধন্যবাদ। ) 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন