এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পোষা ভূত ও ভয়াল তান্ত্রিকদের কথা - ৩

    Sudip Ghoshal লেখকের গ্রাহক হোন
    ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ৮৫ বার পঠিত
  • | | | | | | |


    পিসেমশাই  আজ নতুন একটা গল্প শুরু করলেন। সেদিন ছিল ভীষণ কুয়াশা। শীতকালের পৌষ মাসের সকাল। যথারীতি ভোর পাঁচটার ট্রেন ধরে হাওড়া যাবে বলে লাইন পার হচ্ছিল মনোজ। আর ঠিক সেই সময়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছিল গ্যালোপিং ট্রেন। তাকে পিষে দিয়ে চলে গেল নিমেষে।একটু পরেই মনোজের শরীর বেশ হালকা লাগছে। সে আস্তে আস্তে উপরে উঠতে শুরু করলো। কিন্তু দেখলো সে হাওয়ায় ভাসছে কেন? আর তার শরীরটা পড়ে আছে লাইনের উপর।শরীর ছাড়া হয়ে মনোজ বেশ উপরে উঠে উড়ে উড়ে বেড়াতে লাগল। তারপর দুপুর গড়িয়ে রাত নামলো রাতে আরো অনেকে শরীর ছাড়া। শরীর ছাড়া আত্মা উড়ে উড়ে বেড়াতে বেড়াতে তার কাছে এলো। সকলের সাথে পরিচয় হলো। সে দেখল সে একা নয় তাদের একটা দল আছে। মনোজের আত্মা দেখছে,  আজ সুপার মার্কেটের পুরো গাছগাছালির আড়াল ঘিরে শুরু হয়েছে পৌষ পিঠের মেলা। এই মেলার সামনের পাড়ায় বস্তি এলাকায় কিছু গরীব সংসারের আবাস। তারা সুপার মার্কেটের সামনে থাকে এই নিয়ে তাদের গর্বের শেষ নেই। কারণ এই মার্কেট জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় মেলা,সার্কাস আর বাজার। আর সেখানে কাজ করে তাদের ভালমন্দ খাবার জুটে যায়। শুধু বর্ষাকালে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। তখন ঝড়ে ডালপালা ভাঙ্গে আর সেই ডালপালা নিয়ে এসে তারা বাড়িতে ফুটিয়ে নেয় দুমুঠো চাল। পুকুরের গেঁড়ি, গুগুলি তখন তাদের একমাত্র ভরসা। শরীরবিহীন মনোজ দেখছে,  আজ পৌষ পিঠের মেলা। দুটি বছর দশেকের শিশু চলে এসেছে মেলায়। তাদের টাকা পয়সা নেই। ঘুরে বেড়ায় উল্লাসে। তারপর বেলা বাড়ে আর তাদের খিদে বাড়ে সমানুপাতিক হারে। খিদে নেই ওদের যারা ঘুরে ঘুরে পিঠে খায়। ফেলে দেয় অর্ধভুক্ত পিঠের শালপাতার থালা। ডাষ্টবিন ভরে  যায় খাবারসহ শালপাতায়। শিশু দুটি লোভাতুর হয়ে ওঠে। পাশে আলো মুখে একজন মহিলা এগিয়ে আসে। সে বলে, তোদের বাড়ি কোথায়। শিশু দুটি দেখিয়ে দেয় তাদের পাড়া। মহিলা বলে, আমাকে তোদের বাড়ি নিয়ে যাবি?  শিশু দুটি হাত ধরে নিয়ে আসে তাকে। পথে হাঁটতে হাঁটতে মহিলাটি বল, আমি তোদের দিদি। আমাকে দিদি বলে ডাকবি।বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শিশু দুটি বলে, মা মা দেখ দিদি এসেছে আমাদের বাড়ি। মা তো অবাক। তারপর জানতে পারে সব। পেতে দেয় তালপাতার চটাই। একগ্লাস জল খেয়ে দিদি ব্যাগ থেকে বের করে পিঠের প্যাকেট। সকলে একসাথে বসে খায়।দিদি বলে শিশু দুটির মা কে,  আমার ছেলেপুলে হয় নি। তোমার বাচ্চাদের দেখে চলে এলাম তোমাকে দেখতে। জানো ভগবান, সকলকে সবকিছু দেয় না। তোমাকে যেমন টাকা পয়সা দেয় নি আর আমাকে আবার সন্তান দেয় নি। তোমার পুত্রসন্তানদের আমি আজ থেকে দেখাশোনা করব। তুমি অনুমতি দাও।

     ৬

    মনোজ মরে গিয়েও পৃথিবীর মায়া ছাড়তে পারে নি। আকাশে ওড়ে আর মানুষের সুখ দূঃখ দেখে। হাওয়াতে ভেসে চলেছেন সুদর্শন বাবু । ফুরফুরে মেজাজে তার নিত্য আসা যাওয়া   কলেজের পথে ।একজন ছাত্রী তার নিত্য সাথী । ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলা, কলিগরা অন্য চোখে দেখে । বাঙালি একটি যন্ত্র প্রথম আবিষ্কার করে ।সেটি হলো ষড়যন্ত্র । হাসতে হাসতে বলেন কলিগদের ।উত্তরে তারা বলেন ,সত্য উদ্ঘাটিত হোক । বেশ কয়েক মাস পরে একদিন কলেজ ছুটির পর পিছু পিছু কলিগরা তাদের অনুসরণ করলো । সুদর্শন বাবু ছাত্রীদের নিয়ে ঘরে ঢুকলেন কলেজ ছুটির পরে। কলিগরা বাইরে থেকে দেখলো শিক্ষক ও ছাত্রীরা পড়াশুনোয় ব্যস্ত।  তারা শিক্ষার  আলোর সাধনায় নিবিষ্ট ।অব্শ্য সঠিক সময়ে ছাত্রীটির অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য কলেজের সকল অধ্যাপকদের  পুরস্কৃত করা হলো । মনোজের দাদু বলতেন, প্রথম স্তরে মৃত্যুর পরে আমাদের দেহ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হই। এবং দেহের কিছুটা উপরে ভাসমান অবস্থায় বিরাজ করি। এই অবস্থায় এই বোধ জন্মায় যে, আমাদের দেহ আর ‘আমি’ এক জিনিস নয়। কোনো দুর্ঘটনায় চৈতন্য হারিয়ে অথবা কোনও কোনও অনেকই এই অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হয়েছেন। এই জাতীয় অভিজ্ঞতা সব সময়েই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় না।এখন মনোজ দেখছে সত্যি তাই। মনোজের দাদুর বাবার লাঠি। যত্ন করে তুলে রাখা আছে বাঙ্কে। কার জন্য?  বৃদ্ধ আমার জন্য। কত সুখস্মৃতি জড়িয়ে লাঠির অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। দাদামশাই লাঠি ধরে পথ চলতেন। লাঠিকে বলতেন, বাবা ভাল করে ধরে রাখিস। ফেলে দিস না এই বুড়ো বয়সে। কোমর ভেঙ্গে যাবে তাহলে। বিশ্বস্ত লাঠি তার দায়ীত্ব পালন করেছে পলে পলে। এবার তার নাতির পালা। পিসেমশাই মজার হিন্দী বললেন, লে আও চায়ে। তারপর গল্প হবে। 



    পিসেমশাই  বলছেন, নাতি বয়স বাড়লেই পাবে তিনপুরুষের পরশ...।তারপরেই হয়ত মনোজের মত হবে তার অবস্থা।মনোজ ভাবে, তখন আমার আস্তানা নদীর ধারের বাংলোয়। ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে বসেছিলাম বারান্দা। সব কিছুর  মাঝেই ঋতুজুড়ে আনন্দের পসরা সাজাতে ভোলে না প্রকৃতি।  সংসারের মাঝেও সাধু লোকের অভাব নেই।  তারা মানুষকে ভালোবাসেন বলেই জগৎ সুন্দর  আকাশ মোহময়ী, বলেন আমার মা। সব কিছুর মাঝেও সকলের আনন্দে সকলের মন মেতে ওঠে।  সকলকে নিয়ে একসাথে জীবন কাটানোর মহান আদর্শে আমার দেশই আদর্শ।সত্য শিব সুন্দরের আলো আমার দেশ থেকেই সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করুক। এইসব চিন্তা করছি এমন সময়ে  হঠাৎ আমার কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল সশব্দে এক গুলি। আমি অবাক। জঙ্গলের ভিতর আমার বাংলোর হদিশ কেউ জানে না নিজের লোক ছাড়া। তাহলে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলার লোক কে?  পেশায় আমি গোয়েন্দা। শত্রুর অভাব নেই। কিন্তু আমার এই গোপন বাংলোর খবর পাঁচজন জানে। তারা সকলেই আমার নিকট আত্মীয়। আমার বৌ, ছেলে, রমেন, পিয়ু আর শ্যামল। বৌ, ছেলেকে সন্দেহ তালিকায় রাখি কি করে?  তবু...আর রমেন, পিয়ু আর শ্যামল তিনজনই আমার খুব ভাল বন্ধু। তাহলে কে?  কে? কে? এই রহস্যে মোড়া ব্যক্তি।তারপরদিন সকালে অফিসে গেলাম। হাসিমুখে সকলের সঙ্গে কথা বললাম। বুঝতে কেউ যাতে না পারে তার জন্য অনেক অভিনয় করলাম। কোন হদিস পেলাম না।খুব কঠিন এক পরীক্ষায় আমাকে সফল হতেই হবে। ছেলে, বৌ কাউকে বললাম না কথাটা।প্রায় একমাস পর বাংলোয় বসে আছি অন্ধকারে। একটা কালো মূর্তি মনে হল সামনে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে। অমাবস্যার রাতে অন্ধকারের সুযোগ নিতে চায় খুনী। আমি পাশ থেকে দেখলাম চেয়ারে বসানো বড় পুতুলটার উপর পরপর তিনটে গুলি করে খুনী পালাচ্ছে। ও বুঝতেই পারে নি আমার সাজানো নাটক। আন্দাজ করেছিলাম ঠিক। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ছুটতে লাগলাম মুখোশধারীর পিছনে পিছনে। শেষে ধরে ফেললাম বাম হাতে কলার চেপে। ডান হাতে আমার সার্ভিস রিভলবর। মুখোশ টেনে খুললাম। তাকে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।অনেকদিন থেকে শ্যামল আর পিউয়ের একটা পরকিয়া সম্পর্ক চলছিল। পিউ শ্যামলকে পছন্দ করত না। সে বারবার সেকথা আমাকে বলেছে। পিউ বলত শ্যামল কবি । ওসব কবিত্ব আমার ভাল লাগে না। শালা ভিখারি, ভ্যাগাবন্ড। বেশ পয়সাওয়ালা এক রসিকের খোঁজে আমি আছি। দুদিন শালা আমার সঙ্গে বিছানায় শুয়েছে। একদম বিনা পয়সায়। বিয়ে করা বৌ নয় আমি। ওকে বারণ করে দিবি। আমি বলেছিলাম, ও তোকে ভালবাসে। ওরকম বলিস না। টাকাপয়সার সঙ্গে প্রেমের তুলনা করিস না।পিউ বলেছিল, আমি তোকে ভালবাসি। ওর কাছে আমি যাব না।আমি রেগে বলেছিলাম, পিউ আমার সংসার আছে। ছেলে আছে। আর শ্যামল বিয়ে করেনি আর তুই বিধবা। তোরা বিয়ে করে নে। সুখে থাকবি দুজনে।পিউ জেদ করে বলল, আমি তোকেই চাই। আর যদি না পাই আমি সব শেষ করে দেব।আমি বলেছিলাম, কি শেষ করবি।
    --- আমি নিজেকে শেষ করে দেব।

    তারপর হয়ত চিন্তাভাবনা পাল্টে পিউ প্ল্যান পাল্টেছিল। আমি বিষয়টা গুরুত্ব দিই নি। কিন্তু পিউ শ্যামলের পোশাক পরে ছেলের সাজে কালো কাপড় ঢাকা দিয়ে আজ আমাকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান করেছিল।

    একটুর জন্য আমি বেঁচে গেছি...

    পিউ বলল, তাহলে আমি কাকে গুলি করে মারলাম।
    আমি বললাম, সব কথা থানায় হবে। প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবি।
    মনোজ ভাবে, অতি সুক্ষ্ম তরঙ্গের স্পন্দন শোনার অপেক্ষায় মৌন হয়ে  অপরূপ প্রকৃতির, কোলে আশ্রয় নিতে চাই।চাওয়া,পাওয়ার উর্ধ্ব জগতে ভাসতে ভাসতে ছাই হোক নশ্বর দেহের অহংকার।

    স্থূল  পদার্থ নিয়ে পরমাণু বিজ্ঞানীরা অপেক্ষায় থাকেন না।অণু পরমাণু নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত।তা না হলে হিমালয়ের চূড়া কিংবা জমি জায়গা নিয়েই তারা টানাটানি করতেন বেশি।
    আকাশকে আমরা পৃথিবীর মানুষ, স্বার্থপরের মত খন্ড খন্ড করেছি।এটা কাটোয়ার আকাশ, ওটা দিল্লীর, ওটা রাশিয়ার আকাশ। অখন্ডতার বাণী আমরা ভুলে যাই।আকাশ চিরদিন অখন্ডই থাকে।তাকে খন্ডিত করার অকারণ অপচেষ্টা না করাই ভালো।তবু কাঁটাতার হয়,সীমানা ভাগ হয়। অদ্ভূত মূর্খতার অন্ধকারে ডুবে আছে প্রাণীকুল।আলোর অন্তরে বাদ্য বাজে, 'অনন্ত নাদ' এর ভেরী।সূক্ষ্ম তরঙ্গে মিশে যায় তার অস্তিত্ব,ভুলে যায় তার  অবস্থান। এ অনুভূতি ঝর্ণার মত,কবিতার মত,ভালোবাসার মত, নদীর প্রবাহের মত। জোর করে সে গতি পাল্টায় না। সৃষ্টির সবাই ভয়ে কাজ করি। অস্তিত্ব বিনাশের ভয়ে।পৃথিবী ঘোরে ভয়ে,তা না হলে সে ধ্বংস হবে। সূর্য তাপ দেয় ভয়ে, তা না হলে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।
    সৃষ্টি মানুষের প্রশ্বাস,স্থিতি মানুষের ক্ষণিক ধারণ ,প্রলয় মানুষের নিশ্বাস।আলোর অনুসন্ধানীর  ভয় নেই, তাই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই নেই।  লোভ নেই, তাই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা নেই।অকাল বার্ধক্য নেই।
     আছে শুধু আনন্দ,ছেলেমানুষি,বোকামি,সরলতা,সোজা পথে হাঁটার সোজা রাস্তা...বন্ধু, জাতপাত নির্বিশেষে অখন্ডতার অসীম ভালোলাগায়  মনসায়রে আপনি ডুব  দিতেই পারে।মনোজ জানত,অভিনবকে সবাই নার্ভলেস বয় বলেই ডাকে।



     ছোটো থেকেই সে প্রচন্ড সাহসী। নদীতে সাঁতার কাটা কিংবা উঁচু গাছ থেকে লাফিয়ে পুকুরের জলে ঝাঁপ দেওয়া তার কাছে জলভাতের মত সহজ। তার বন্ধু চিনু বলছে বন্ধুদের আড্ডায় আত্মার অবস্থানের কথা।  দ্বিতীয় স্তরে কেউ যদি দেহ ত্যাগ করেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়, তিনি সেই ফেজ-এ প্রবেশ করেন, যেখানে চৈতন্য মন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়। মনের প্রকাশ চিন্তায়। চিন্তাই আমাদের জগৎকে তৈরি করে। এই পর্যায়ে চৈতন্য সেই জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং নিজেকে বিযুক্ত অবস্থায় দেখতে পায়। এই স্তরে আরও একটা ঘটনা ঘটে, যিনি যে ধর্মের মানুষ, যে বিশ্বাসের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন, তিনি সেই বিশ্বাস অনুযায়ী অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত হবেন। খ্রিষ্ট-বিশ্বাসী জিশুকে, কৃষ্ণ-বিশ্বাসী কৃষ্ণকে দেখতে পাবেন। স্বর্গ বা নরকের যে ধারণা তাঁরা পোষণ করে এসেছেন, তেমন স্বর্গ বা নরক তাঁদের সামনে প্রতীয়মান হবে। যিনি নাস্তিক, তাঁর কাছে এই স্তরটি একটি পাসিং ফেজ হিসেবেই থাকবে। তিনি পরবর্তী স্তরের দিকে এগিয়ে যাবেন।এই দুই স্তরের সমান্তরালে আসবে তৃতীয় স্তর। মনে রাখতে হবে, এই স্তরগুলি ‘পর পর’ ঘটে না। এগুলি সমান্তরাল। কারণ ‘সময়’ বলে কিছুই হয় না। কোনও ঘটনা আগে বা পরে ঘটে না। আমরা জীবদ্দশায় ঘটনা দিয়ে সময়ের ক্রমিকতা তৈরি করি। সেটা একেবারেই ইলিউশন। মৃত্যু-পরবর্তী তৃতীয় স্তরে এক আলোকসম্ভব অস্তিত্বের মুখোমুখি হই আমরা। এই অস্তিত্বই মহাচৈতন্য। আমরা বুঝতে পারি, আমদের আত্মা বলে যে বিষয়কে আমরা লালন করে এসেছি, তা-ও ‘আমার’ নয়। সে সেই আলোকসম্ভব মহাঅস্তিত্বেরই অংশ। আমাদের আত্মা বলে আলাদা কিছু হয় না। তা বিশ্বাত্মা। তার আমি-তুমি-সে-তাহারা ভেদ নেই। তার ক্ষয় নেই, নাশ নেই।এর একটু পরেই চলে এল নার্ভলেস বয় অভিনব। সে এসেই বসল বন্ধুদের মাঝে। বন্ধুদের বড় প্রিয় এই নার্ভলেস। সে এলেই বন্ধুদের আড্ডায় চারটে চাঁদ নেমে আসে। আলোচনা আরও জমে ওঠে। নার্ভলেস শুরু করে তার পাহাড়ে ওঠার গল্প।একবার মটর সাইকেলে ভারত ভ্রমণে বেড়িয়েছিল নার্ভলেস বয়। উত্তর ভারত ঘুরতে তার সময় লেগেছিল একমাস। সব জায়গা ঘোরা না হলেও বেশির ভাগ স্থান ঘোরা হয়েছিল। স্বামী চলে যাওয়ার পরে একদম একা হয়ে পরেছিলেন, কবিতা। মনে পরতো ফুলশয্যা,  আদর।   কি করে যে একটা একটা করে রাত, দিন পার হয়ে যায়, বোঝাই যায় না। তবু বুঝতে হয়, মেনে নিতে হয়। একটা ঘুঘু পাখি তার স্বামী মরে যাওয়ার পর থেকেই এবাড়িতে আসে। আম গাছের ডালে বসে আপন মনে কত কথা বলে। ঘুঘুর ঘু,ঘুঘুর ঘু। সবিতাদেবীর সঙ্গে পাখিটার খুব ভাব।তার মনে হয় স্বামী, ঘুঘুর রূপ ধরে আসেন। তিনি আম গাছের তলায় খুদকুড়ো ছিটিয়ে দেন। ঘুঘু পাখিটা খায় আর গলা তুলে কবিতাকে দেখে । কিছু বলতে চায়। তিনি বোঝেন। আর আপনমনেই পাখিটার সঙ্গে বকবক করেন। পুরোনো দিনের কথা বলেন। ছেলের বৌ বলে,বুড়িটা পাগলী হয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা অতশত বোঝে না। হাসাহাসি করে। শুধু তার ছেলে বোঝে মায়ের অন্তরের কথা, ব্যথা। ঘুঘু পাখিটা সারাদিন ডেকে চলে। এবার আয়, এবার আয়। কবিতার বয়স হল আশি। একদিন সবাই দেখলো, বুড়ি ফুলশয্যার রথে শ্মশানে গেলো বোধহয় স্বামীর কাছে। ঘুঘু পাখিটা ডেকে চলেছে তখনও,, ঘুঘুর ঘু... দাদুর বাবার লাঠি। যত্ন করে তুলে রাখা আছে বাঙ্কে। কার জন্য?  বৃদ্ধ আমার জন্য। কত সুখস্মৃতি জড়িয়ে লাঠির অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। দাদামশাই লাঠি ধরে পথ চলতেন। লাঠিকে বলতেন, বাবা ভাল করে ধরে রাখিস। ফেলে দিস না এই বুড়ো বয়সে। কোমর ভেঙ্গে যাবে তাহলে। বিশ্বস্ত লাঠি তার দায়ীত্ব পালন করেছে পলে পলে। এবার তার নাতির পালা।স্মৃতিকন্ঠ গ্রামের মান্যগণ্য লোক। বংশগত একটা বিরাট আভিজাত্য তার চলনে বলনে প্রস্ফুটিত। স্বভাবতই সবাই তাকে সমীহ করে চলেন। তার একটিমাত্র পুত্র সন্তান। তার পড়াশোনার জন্য গ্রামের স্কুলে নিজের অর্থে সাজিয়ে তুলেছেন লাইব্রেরী রুম। যতরকমভাবে  স্কুলকে সাহায্য করা যায় তিনি করেন। তার ছেলের নাম রতন। স্কুলে ছেলে মেয়ে একসঙ্গেই পড়াশুনা করে। রতন পড়ে এখন ক্লাস নাইনে। আর শুভ বাবুর মেয়ে পড়ে ক্লাস সেভেনে। গ্রাম্য রাজনীতিতে রেষারেষি লেগেই আছে এই গ্রামের তিনটি পাড়ার লোকজন স্বচ্ছল। টাকা পয়সার অভাব নেই। স্মৃতিকন্ঠবাবুর পাড়ায় আভিজাত্যের লড়াই লেগেই আছে। এক বাড়িতে গাজনে একটা পাঁঠা থাকলে অন্য বাড়িতে বাঁধে দুটো। পাঁঠার ঝোল আর মদ। একদম কম্পিটিশন। প্রয়োজনে চার পাঁচটা পাঁঠা এনেও বড়লোকি দেখানোর ব্যাপারটা লেগেই থাকে। বাকি গ্রামবাসীদের ভুরিভোজ ভালোই হয়। তারা মজামারা দল। একজনকে বাহাদুরি দিয়ে তাতিয়ে দেয় তো অন্য বাবুর জেদ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী যারা তারা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়। এক গানের দল হঠাৎ একদিন শুভ বাবুর নাটমন্দিরে ডেরা বাঁধল। তারা ধর্মিয় নানা গানের মধ্য দিয়ে পালাগান শোনায়। রামায়ণ, মহাভারতের ঘটনা, যীশুখ্রীষ্টের ঘটনা গান আর নাটকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে। 



    মনোজ জীবনের কথা ভুলতে পারে না মরে গিয়েও। কত জীবনের কথকথা তার মনে পড়ছে তৃতীয় স্তরের আত্মা হয়ে। হয়ত কোনদিন প্রথম স্তরের আত্মা তাকে টেনে নেবে স্বর্গদ্বারে। তাদের গ্রামে
    রাত বাড়লে নাট মন্দির লোকের ভিড়ে ভরে যায়। শুরু হয় নাটক। দেবতার গলায় গাঁদা ফুলের মালা।অভিনয় দেখে সকলেই মোহিত হয়ে যায়। নাটকের শেষে দেবতার গলায় থাকা মালা নিয়ে দরাদরি শুরু হয়। স্মৃতিকন্ঠ হাঁকেন, আমি মালার দাম দশ হাজার দিলাম। শুভবাবু পারিষদদল নিয়ে বসে আছেন। তিনি ভাবলেন,এ মালা আমাকেই নিতে হবে। তা না হলে মান সম্মান থাকবে না। তিনি মালার দর হাঁকলেন কুড়িহাজার টাকা।এইভাবে চলতে থাকল নীলামের খেলা। এদিকে নাটকের দলের মহিলা একজন বলছেন, আপনাদের গ্রামের লোক এত কৃপণ কেন। এই তো পাশের গ্রামে মালার দর পেয়েছি এক লক্ষ টাকা।শুনে মালার দর আরও বেড়ে গেল। এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকায় নীলামে একটা গাঁদার মালা কিনল গাধার দল।মুচকি হাসি আগত অভিনেত্রীর চোখেমুখে। তিনি সফল আপন কারবারে।এইভাবে  বেশ কয়েকদিন টাকা কামিয়ে নাটকের দল চলে যেত আরও মুরগির সন্ধানে....

    ---ওরে যাস না ওদিকে, পুকুর আছে ডুবে যাবি
    ----- না মা, কিছু হবে না

    ছোট থেকে চিনু দুরন্ত, একরোখা ছেলে। ভয় কাকে বলে সে জানে না। এই নিয়ে তার পরিবারের চিন্তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মনোজের বন্ধু চিনু। মনোজ জানে এই চিনুর আত্মা তাকে উদ্ধার করবে মরার পরে। 
    এইভাবে প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে যায় মানুষ । কত কি শেখার আছে প্রকৃতির কাছে। কিন্তু কজনে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কিন্তু চিনু সেই শিক্ষা নিয়েছিল। গ্রামের সকলে তাকে একটা আলাদা চোখে দেখত।বেশ সম্ভ্রমের চোখে। পরিবারের সকলে জানে না, কি করে চিনু শিক্ষা পেল। প্রথাগত শিক্ষা সে পায় নি। তবু বাড়িতে দাদুর কাছে লেখাপড়া শিখেছে। বই পড়া শিখেছে। চিনু বলত, দাদু কি করে তুমি বই পড়। আমি পারি না কেন?  দাদু বলতেন, নিশ্চয় পারবি। মনে মনে  বানান করে পড়বি। দেখবি খুব তাড়াতাড়ি বইপড়া শিখে যাবি।হয়েছিল তাই। দুমাসের মধ্যে চিনু গড়গড় করে বই পড়ত।কোনো উচ্চারণ ভুল থাকত না।দুপুরবেলা হলেই চিনু বন্ধুদের নিয়ে কদতলা, বেলতলা, আমতলা, জামতলা দৌড়ে বেড়াত। কাঁচা কদ কড়মড় করে চিবিয়ে খেত। লাঠিখেলা,কবাডি সব খেলাতেই তার অদম্য উৎসাহ। গ্রামের লোকের উপকারে তার দল আগে যায়।এই দাপুটে ছেলে চিনু একদিন এক সাধুর সঙ্গে ঘরছাড়া  হল। বাড়ির সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পরলো। কিন্তু চিনুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। একদিন গ্রামের একজন গিয়ে দেখল, সাধুর আশ্রমে সবুজ গাছ যত্নের, কাজ করছে চিনু.
     ভূত বলে কিছু হয় না জানি। তবু  ভূতের প্রতি আমার ছোট থেকেই দূর্বলতা আছে। বিশ্বাস করি। ভগবান আছেন ভূতও আছে। আমার এক বন্ধু মাঠে খেলতে গিয়ে আমাকে বললো, আমার দাদু এসেছিলেন এখনি। হয়ত তিনি মরে গেলেন। দুজনেই বন্ধুর বাড়ি গিয়ে দেখলাম কথাটা একদম সত্যি। দাদু বলেছিলেন মরার পরে তোকে একবার দেখা দেব। এই ঘটনাকে আপনি কি বলবেন বলুন? আর তাছাড়া ভূত সমাজে ভাল, মন্দ সব রকমের ভূত আছে। আমার দাদু বলতেন, একবার চাষের জমিতে জল লাগবে। টাকা পয়সার অভাবে জল দিতে পারি নি। রাতে শুয়ে ভাবছি, আমি রোগী আবার সত্তর বছরের বুড়ো। এ ঘোড়া আর ঘুরে ঘাস খাবে না।চাঁদের আলোয় বসে আছি জেগে। কি সুন্দর পৃথিবীর রঙ। সকলের যদি আহারের ব্যবস্থা থাকত তাহল দুঃখ থাকত না। আর তারজন্য চাষের জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। জলের ব্যবস্থা করতে হবে। এইসব ভাবছি, এমন সময়ে দরজায় টোকা। আমি বললাম, কে?

    বাইরে থেকে আওয়াজ এল, চলে আয় বাইরে।

     মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে  চলে গেলাম বাইরে, তারপর মাঠে। সে আমাকে বলল, তুই বসে থাক। এখানকার সব জমিতে জল দেব। একটু দূরে বড় পুকুর ছিল। ওই পুকুরে ভয়ে আমরা যেতাম না। দিনের বেলায় পর্যন্ত ওখানে হাসির শব্দ পেত সবাই। হি হি হি করে কারা যেন হাসত ব্যঙ্গ করে। শুনলাম ভয়ংকর হাসি। বার বার পাঁচবার। ভয় পেলাম প্রচন্ড। 
    তারপর আর কিছু মনে নেই। 
    পরের দিন মাঠে গিয়ে দেখি, ভালোই হয়েছে। জলে জলময় সব মাঠ। এই খরার সময় এত জল দেখে সবাই অবাক। লোকে বলল,এ তো একদম ম্যাজিক। চাষিরা বলল, এই ম্যাজিক যেন বার বার প্রতিবার হয়। 



    দাদু বললে, কি করে মাঠে এত জল  এল  আজ পর্যন্ত বুঝতে পারিনি। শরীরটা ছিল।সে সম্ভোগে ব্যস্ত।দেহের অণু পরমাণু  অংশ ভিজে।কিন্তু মন যে শুষ্ক।মনের শূণ্য অংশও অধিকারে নেই তার।সে ছুটেছে পদ্মবনে। সেখানে তার রূপ দর্শনে মোহিত তার মন। এদিকে শরীরলোভি সে খবর রাখে না। ভিজে ভিজে ভালোলাগা শেষে বিরক্তির বিশ্রাম।আর মনলোভি নাগর দখল করে নেয় প্রিয়ার মন। শরীরে তার আসক্তি নেই।ক্ষণিকের আনন্দ নয়, অসীম আনন্দের অনুসন্ধানী তার মন। 
    মনোজকে চিনু একটা রাজার গল্প বলেছিল। চিনু বলেছিলো,
    এক ছিলো রাজা।সে প্রজাদের রক্ত খেতো।তাদের পরিশ্রমের ফসলের সবটুকু হরণ করে নিত।প্রজারা বেঁচে থাকার জন্য পালিয়ে যেতে  শুরু করলো।শয়তান, রাজাকে অন্ধকার জগতে নিয়ে যেত।সে ঝগড়া কলহ নিয়েই ভালো থাকত।প্রজারা তার অন্ধকারের দাসত্ব স্বীকার না করলেই তাকে সুস্থভাবে বাঁচতে দিত না।আলোর পরশ সহ্য করার ক্ষমতা রাজার ছিলো না।অত্যাচারী,ভন্ড ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে উঠলো। একদিন প্রজাদের প্রার্থনায়  এলো আলোর ফেরিওয়ালা।তার আলোতে আলোকিত প্রজারা তার কাছে ভালো পরামর্শ পেতো।মানুষকে শান্তিতে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতো সে।  একদিন আলোর ফেরিওয়ালাও বন্দি হলো রাজার কারাগারে,নিষ্ঠুর অন্ধকারের অন্তরালে। রাজার কর্মচারিরাও আলোর ফেরিওয়ালার প্রেম পরশে চেতনা ফিরে পেলো।তারা প্রতিজ্ঞা করলো,আমরা বাঁচার মত বাঁচবো।শয়তানকে বন্দি করবো।রাজা একা হয়ে পড়লো।কারণ আলোর পরশ পেয়ে সকলের মনের অন্ধকার দূর হয়েছে।তারা ভালো মন্দের পার্থক্য বুঝতে পেরেছে।সুস্থ জীবনের সন্ধান পেয়েছে।অবশেষে অত্যাচারী রাজা আলোর কাছে পরাজিত হলো।আলোর প্রাচুর্যে অন্ধকারের রাজার অন্তর আলোকিত হলো।
    রাজা বুঝতে পারলেন,শান্তিতে বেঁচে থাকার  জন্য  পৃথিবীতে আলোর বিশেষ প্রয়োজন। সরল দে একজন সরল মানুষ। সে সস্তায় জীবন ধারণ করার জন্য ফুটপাতের সস্তা পোশাক ব্যবহার করেন। বাড়িতে এসে জামা পরতে গিয়ে দেখে সাইজে অনেক বড় হয়ে গেছে। আবার সস্তায় দর্জির দোকানে সেলাই করে ঠিক করে জামা। আবার জামা কাচাকাচি করার পরে ছোটো হয়ে যায়।  সরল সস্তায় খাবার খোঁজে। মুরগীর রোগ হলে সস্তায় কিনে খায়।   সস্তার শরীর সরলের, জোর কিন্তু বাড়ে। জমিতে ফসল ফলায়। খোলা আকাশের নিচে আনন্দে থাকে।    সস্তায় তার জীবন চলে বলে সকলে তাকে সস্তা সরল বলেই ডাকে। সরল এতে রাগ করে না। কারণ লোকে ঠিকই বলে। সস্তায় কোনো কিছু পেলে সে বাড়ি নিয়ে যায়। তারপর বকুনি খায়। সস্তায় একবার একটা প্যান্ট কিনে সে বাড়ি গিয়ে কাচার পরে দেখে সেটা আর পরণের উপযুক্ত নয়। তবু সে পরে। সে বলে, যতই হোক টাকা দিয়ে কেনা। একবার সরল রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা দুর্ঘটনায় একটি ছেলে রাস্তায় পড়ে রইলো সস্তা মুরগীর মত রক্তাক্ত অবস্থায়। দামি কেউ নেই। তারা তাদের দামি জীবন নিয়েই ব্যস্ত। সস্তা জীবনের জন্য তাদের সময় নেই। 
    কিন্তু সস্তা সরল রাস্তায় পড়ে থাকা  সস্তা রক্তাক্ত ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। চিনু নানারকম গল্প শোনাত। ভাল মানুষের, শিল্পী মানুষের। চিনু বলেছিল, ডাক্তারবাবু বললেন, রক্ত লাগবে। কিন্তু আমাদের স্টকে রক্ত নেই। সঙ্গে সঙ্গে গ্রুপ পরীক্ষায় সস্তা রক্তের সাথে সস্তা রক্ত মিলে গেলো। সরল তার সস্তা  রক্ত দিলো  । ছেলেটি প্রাণ ফিরে পেলো। সরল রাস্তায় নেমে আবার একটা সস্তা মূল্যে পাঁউরুটি কিনে   খেতে শুরু করলো। দুপাশের মূল্যবান জীবন প্রবাহ,  সরলকে দেখে হাসতে থাকলো পোকা লাগা দেঁতো হাসির মত নিয়মিত সুরে। 

    চিনুর বোন সীমার ইচ্ছে ছিলো নদী হবে। কুলু কুলু বয়ে যাবে নিরন্তর। পাড় উপচে ভাসানো ঢেউ মনে রোমাঞ্চ জাগাবে। কিন্তু কিছু লোকের বদখেয়ালে আর অর্থের লালসায় সব ইতিহাস চাপা পড়ে যায়।মিতা তার বাল্যবন্ধু। সে বলে, চাপা ইতিহাস ফুঁড়ে বেরোয় বটগাছের রূপ নিয়ে। একদিন রোদ ছিলো, সবুজ গাছ ছিলো। কিছু কাঁটাঝোপ থাকা স্বাভাবিক। সেই বাধা পেরিয়ে অনেকটা পথ একা হেঁটেছে সীমা। সঙ্গে ছিলো অদম্য ইচ্ছে। আজ সত্তরের তরুণী সীমা সফল। ইতিহাস কথা বলে মৃদুস্বরে। বেশ    কিছু  প্রকাশিত গ্রন্থে তার সমস্ত ইচ্ছে, সাধনা নিঙড়ে দিয়েছে মন। আজ সকালেই সে পেয়ে গেলো জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার পাওয়ার সংবাদ। সত্য, সুন্দর । চিনুর বয়স হল পঁচাত্তর। কুষ্ঠিতে আছে চিনু উনআশি বয়সে মরে স্বর্গে যাবে। চিনু মনোজকে খুব ভালবাসত। সে তাকে দেখলেই পুরোনো দিনের গল্প শোনাত। চিনু বলত, ন্যারোগেজ লাইনের ট্রেন ধরে চলে গেলাম কুমোরপুর হাটতলা হল্ট। মনে করলাম, তাড়াতাড়ি চলে আসব, দুপুরের আগে। পরীক্ষা হয়ে গেছে। বাড়িতে শাসনের দড়িটা একটু ঢিলে হয়েছে। মা বলেছেন, খাওয়ার সময় যেন ডাকাডাকি করতে হয় না। আর সবসময় স্বাধীন এই কটা দিন। বন্ধুরা ডাকল ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য। আমাদের ফুল টিম খেলা দেখতে চলে এলাম কুমোরপুর হল্টে বিনা টিকিটে। ভাবলাম খাওয়ার সময়ের আগে বেলা দুটোর সময় হাজির হয়ে যাব মায়ের কাছে। কিন্তু সব উল্টোপাল্টা হয়ে গেল।একটা টিম খেলতে আসে নি। এত আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবে ভেবে আমরা কমিটির কাছে একশ টাকা দিয়ে আবেদন করলাম। কমিটি রাজি হল। আমরা মাঠে নামলাম ফুল টিম নিয়ে। পরপর অনেক টিমকে হারিয়ে আমরা ফাইনালে উঠলাম।  ফাইনাল খেলা শুরু হবে বিকেল তিনটের সময়। এখন দুটো বাজে। মায়ের মুখটা মনে পরছে। ভাতের থালা সাজিয়ে বসে আছেন নিজে না খেয়ে। যেতে পারলাম না বাড়ি। খিদে লেগেছে খুব । পাশের বাড়ির কাকিমা মাঠের ধারেই বাড়ি। কাকু, কাকিমা দুজনে এসে বললেন, তোমাদের খেলা দেখে ভাল লেগেছে আমাদের। আমরা তোমাদের সাপোর্টারস। এই নাও এক থালা পিঠে তোমরা খাও। আমরা ভালোবেসে বানিয়েছি। আহা খিদে পেটে  অই পিঠে একদম অমৃত। পেট ভরে খেলাম। আমার ভাই বাবু বলল, দাদা আজ বাবা চামড়া তুলবে পিটিয়ে। আমি বললাম, কি আর করা যাবে। অন্যায় করলে তো কেউ ছাড়বে না।তারপর ফাইনালে জিতে শিল্ড নিয়ে আমরা ট্রেনে চেপে বাড়ি ফিরলাম। আমাদের বিজয় নাচ দেখতে হাজির হল গ্রামের লোকজন। বাবাকেও ভিড়ে দেখলাম। লাঠি হাতে চিৎকার করছিলেন। শিল্ড দেখে চুপ করে গেলেন। মাকে ডেকে দিয়ে নিজে চলে গেলেন ছাদে।তারপর বাড়ি ঢুকলাম সন্ধ্যাবেলায়। মা তখনও উপোসি। একসঙ্গে খেলাম পিঠে আর খেজুর গুড়। মা পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, তোদের বাবা খুব খুশি। আমাকে ডেকে দিয়ে বললেন, যাও দেখ গিয়ে গ্রামের ছেলেরা খেলে শিল্ড এনেছে। গর্বের খবর গো।তারপর থেকে বাবা আমাদের আর কোনদিন গায়ে হাত দেন নি। চিনু ভাদু জেলের কথা বলত, মাটির মানুষের কথা, ভাদু জেলে মাছ ধরে। তার আগে তার দাদুও মাছ ধরে সংসার চালাতেন। বাড়ির পাশেই কাঁদর। অনেকে বলেন ঈশানী নদী। ভাদু অত কিছু জানে না। কাঁদরে চান, কাঁদরে টান তার। একটা তালগাছের গোড়া ফাঁপা করে ডোঙা বানানো হয়েছে কাঁদর এপার ওপার করার জন্য। ডোঙার তলাটা মাঝে মাঝে রঙ করা হয়। ডোঙায় চেপে কাঁদরে জাল ফেলা শিখেছে তার দাদুর কাছে ভাদু। তারপর মাছ ধরে বাঁশের কঞ্চির তৈরি ঝাঁপিতে ভ'রে মাছ বিক্রি   করত গ্রামে গ্রামে। ছেলে ভোলাকে গাঁয়ের স্কুলে ভরতি করেছিল সাত বছর বয়সে। এখন সে হাই স্কুলে পড়ে। কিন্তু মাষ্টারমশাইরা বলেন ভাদুকে, তোর ছেলেকে বাড়িতে পড়তে বলিস। খুব ফাঁকিবাজ। এবার নম্বর খুব কম পেয়েছে। ভাদু রাতে ছেলের কাছে বসতে পারে না। সন্ধ্যা হলেই সে চলে যায় হরিনামের আখরায়। সেখানে হরিনাম হয়। ভাদু হারমনিয়াম     বাজায়। বড় সুন্দর তার হাত, সবাই বলে। এদিকে ছেলে ভোলা বই গুটিয়ে অন্ধকারে বসে থাকে কাঁদরের ধারে। পড়াশোনা তার ভাল লাগে না। কাঁদরের ধারে অনিলের সঙ্গে বসে বাঁশি বাজায়। অনিল বলে, তোর বাবা শুনলে মারবে ভোলা, সাবধানে থাকিস। ভোলা বলে, এই সবুজ আমাকে বড় টানে। এই জল আমাকে শান্তি দেয়। চান করার সময় এক ডুবে সে কাঁদর পেরিয়ে যায়। অনিল ভোলার খুব ভাল বন্ধু। সে সবসময় ভোলার সঙ্গে থাকে, থাকতে ভালবাসে। ভোলা মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল করল। ভাদু বলল, আর স্কুলে যেয়ে লাভ নাই রে ভোলা। রোজগারের ধান্দা কর। ভোলা তাই চাইছিল। সে বলল,বাবা আমি জাল ফেলা শিখব। তার বাবা ভাদু বলল,তা শেখ। কিন্তু তুই তো ভালই জাল ফেলিস। আমি চাইছিলাম রামের সঙ্গে তু কেরালা যা। সোনার দোকানে কাজ শিখে লেগা। তারপর এখানে এসে একটা দোকান খুলবি। কত নাম হবে তখন তোর দেখবি। ভোলা বলল,না বাবা আমি কেরালা যাব না। বাবা ভাদু বলল,আমি সব ঠিক করে ফেলেছি। তু আর অনিল কাল কেরালা চলে যা। মেলা পয়সা হবে, নামডাক হবে। তা না হলে জলে পচে মরবি। বাবার ভয়ে তারা কেরালায় চলে এল। দোকানে কাজ করে, কাজ শেখে। তাদের দোকান বাজার, কেনাকাটা সব কাজ করতে হয় ভোলাকে। বাঁশি বাজাতে দেয় না। তার মনে পড়ে কাঁদরের ধারে গেলেই মনটা ঘাসের গন্ধে ভুরভুর করে উঠত। একটা ঠান্ডা বাতাস গায়ে কাঁটা তুলে দিত। বাঁশির সুরে কাঁদরের জল নেচে উঠত। ভোলার বাবা, মার কথা মনে পড়ত। কিছু ভাল লাগত না। তার বন্ধু অনিল কাজ করে অনেক দূরে আর একটা দোকানে। সন্ধ্যা হলে দুজনের কথা হত। অনিল বলত, ভাল করে থাক। অনেক পয়সা নিয়ে বাড়ি যাব। কত খাতির হবে, দেখবি, অনিলের বাবা, মা নেই। সে ছোট থেকে মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছে। তাই তার পিছুটান কম। সে পরিস্থিতি বুঝে কাজ করে। কিন্তু ভোলার কিচ্ছু ভাল লাগে না। প্রায় দুমাস পরে সে জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হল। মালিক বেগতিক বুঝে অনিলকে সঙ্গে করে ভোলাকে গাঁয়ে পাঠিয়ে দিলেন। বাড়িতে এসে ভোলা মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। অনিল মামার বাড়ি গেল একটা বড় ব্যাগ নিয়ে। ভোলা কিছুই আনতে পারে নি। সে রোগে ভুগে হাড় জিরজিরে হয়ে গেছে। মা তার বাবার ওপর রেগে গিয়ে বললেন, আবার যদি তুমি ওকে কেরালা পাঠাও তো আমার দিব্যি রইল। বাবা ভাদু আর ভোলাকে কেরালা যেতে বলেনি। শুধু বলেছিল, এখানে ও খাবে কি?  আমি তো আর বেশিদিন বাঁচব না। তার মা বলেছিল, আমাদের একমুঠো জুটলে ওরও জুটবে। তারপর অনিল আবার কেরালা চলে গেল। ভোলা দুমাস বিছানায় পড়ে রইল। তারপর মায়ের সেবাযত্নে সে সুস্থ হয়ে উঠল। তারপর বছরের পর বছর কেটে গেল। ভাদু জেলে মরে গেল। তার হরিনামের দল তাকে উদ্ধারণপুর নিয়ে গেল ট্রাকটরে চাপিয়ে। ভোলা সেই হরিনামের দলে ভাল বাঁশি বাজিয়েছিল। সবাই বলল, সন্দেবেলায় পেত্যেকদিন হরিনামের আসরে যাবি। বাঁশি বাজাবি। আজ অনিল এসেছে পাঁচবছর পরে। গ্রামের মোহিনী ঠাকরুণ বলল, মামার একটু জায়গা নিয়ে গ্রামে সোনারূপোর দোকান কর। আমরা তোর খদ্দের হব। অনিল এইরকম    কিছু একটা করার কথা ভাবছিল। মামাকে বলে একটা ঘর করল রাস্তার ধারে। তারপর অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে দোকানের শুভ উদ্বোধন হল। খুব ধূমধাম করে দোকান শুরু হল। এদিকে ভোলা কাঁদরে জাল ফেলে মাছ ধরছে ডোঙায় চেপে। পাশ দিয়ে কাঠগোলার বড়বাবু যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ও জেলে ভাই মাছ পেলে?  ভোলা মাথাটা উঁচু করে বলল, পেয়েছি বাবু একটা কাতলা। তা কেজি খানেক হবে। বড়বাবু একটা দুশ টাকার নোট বার করে মাছটা নিলেন। তারপর চলে গেলেন। ভোলা টাকাটা কোঁচরে গুঁজে বাঁশি বের করে বাজাতে শুরু করল। সুরে সুরে আকাশ ভরে গেল।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন