এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • রজতজয়ন্তী 

    ইন্দ্রাণী লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ | ৩১০ বার পঠিত
  • একদল মরা মানুষের মাঝখানে ওদের দেখা যাচ্ছিল; ব্যাকড্রপে তিনরঙা ডোরাকাটা কাপড়ের ওপর আলোর মালার ট্রাফ আর ক্রেস্ট, তার পিছনে বাঁশের খুঁটির আভাস স্পষ্ট বোঝা যায়। এই ল্যামিনেটেড ছবি ওদের দেওয়ালে ঝুলে রয়েছে আজ পঁচিশ বছর;  সন্ধ্যার পরে, টিউবলাইটের আলো রিফ্লেক্ট করলে ছবির মানুষদের ছায়াপিণ্ড মনে হয়; দিনের আলোয় সবার মুখ  আবার স্পষ্ট দেখা যায় , হাল্কা ধুলোর সর নজরে আসে তারপর। তাপস হাত বাড়াল, ছবি পেড়ে এনে আঙুল দিয়ে ধুলো মুছল , তারপর গলা তুলে এক টুকরো পুরোনো কাপড় চাইল। ঝাড়ন কাঁধে ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে স্বাতী দেখছিল, তাপসের আঙুল ধাক্কাপাড় ধুতি, কাজকরা পাঞ্জাবি, জমকালো শাড়ি গয়নার মানুষদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওদের দুজনের  রোগা, গাল ভাঙা মুখের উজ্জ্বল হাসিতে দাঁড়িয়ে আছে।
    " পশ্চিমের আলো ডাইরেক্ট পড়ে তো, রঙ জ্বলে গেছে"- ঘাড় না ঘুরিয়েই তাপস বলল।
    -পঁচিশ বছর কম না কী। রামকৃষ্ণ ফোটোগ্রাফি ল্যামিনেট করে দিয়েছিল- ফ্রীতে-
    -তোমার নীরব প্রেমিক ছিল ছেলেটা-
    -সে আবার কী কথা-
    - ও দেখলেই বোঝা যায়, হা হা- এখনও কেমন লজ্জা পাচ্ছে দেখ-
    -হাবিজাবি কথা রেখে স্নানে যাও-
    -যাচ্ছি। দেখছিলাম... 
    -ঝুনিদিদি কী সুন্দর ছিল না তখন? বাচ্চুপিসিও। 
    -কোভিড না এলে এ ছবির অনেকেই থাকত আজ; কোভিড আর ক্যান্সার- দুই ক য়ে সব শেষ করে দিল-
    -ভবিতব্য। স্নানে যাও এখন-
    -সে যাচ্ছি।  আজ বিকেলের মধ্যেই ঠিক করে ফ্যালো কোথায় যাবে। কাল অফিস গিয়ে টিকিট কাটতে দেব। 
    -বলেছি তো কোথায় যাব-
    -কোথায়?
    -কাশ্মীরে নয়, শিলঙেও নয়...
    -রাঁচী-ই তবে? তাই তো?
    - তোমাকে বললাম না সেদিন, একটা জায়গার খোঁজ পেয়েছি। খুব দূরে নয়। বনগাঁ লাইনের ট্রেন ধরে -
    -হৃদয়পুর?
    -আরো দূরে-
    -বামনগাছি, দত্তপুকুর, অশোকনগর? এই বললে  কাছে!
    -এই তো, এসেই গেলাম-
    -গোবরডাঙা?
    -ঠাকুরনগর, চাঁদপাড়া, বিভূতিভূষণ হল্ট। সেইখানে নামব।
    -তারপর?
    - একটা ভ্যানরিকশা নিয়ে হাটে যাব। থীম হাট।
    - সবেতেই থীম আজকাল। তো, থীমটা কী?
    -সেটাই তো মজা। সারপ্রাইজ। এক এক সপ্তাহে এক এক থীম। প্রতি সপ্তাহেই বদলে যায়-
    -ঠিক করে কে?
    - উদ্যোক্তারা হয়ত। কে উদ্যোক্তা জিজ্ঞেস কোরো না।  জানি না । 
    -আরে বাবা, জিজ্ঞেস করব না। জেনে কী হবে? শারদ সম্মান তো দিতে যাচ্ছি না। কিন্তু তুমি সন্ধান পেলে কী করে? ট্রাভেল ম্যাগাজিন?
    - রুমনি বলছিল সেদিন।
    -রুমনিরা গিয়েছিল?
    -না ওর চেনা কেউ গিয়েছিল। পিসতুতো দাদার শাশুড়ির মামাতো ভাইএর ননদ, ননদাই-
    -ধ্যাৎ। ঢপ-
    - না না সত্যি। রুমনি বলল তো। সেদিন থীম ছিল, নদী। নৌকো টৌকো-ও বিক্রি হচ্ছিল নাকি।
    -কিনেছিল?
    -না, বিশাল এক ইলিশ পেয়েছিল । তাই নিয়ে বাড়ি ফিরে যজ্ঞিবাড়ির রান্না একদম। কাছাকাছি  যারা থাকে- বন্ধু, আত্মীয় আর কি- সবাইকে ঐ ইলিশের পিস পাঠিয়েছিল। সেই থেকেই তো রুমনি জানল-
    - সেদিন গেলেই তো ভালো হত
    -সেদিন তো আর বিয়ের পঁচিশ  বছর ছিল না; এ কী,  মুখ ব্যাঁকাচ্ছ কেন?
    -কেমন একটা ম্যাড়মেড়ে হবে না? 
    -হোক। পছন্দ না হলে, বাড়ি ফিরে তোমার ইচ্ছে মত শিলং কিম্বা রাঁচির টিকিট কাটব; জানো,  একটা অদ্ভুত কথা বলছিল রুমনি।  বলছিল, ননদ একটা  নদী দেখেছিলেন; নদী, নৌকা এই সব। ননদাই বলছিলেন, উনি এ সব কিছু দেখেন নি, শুধু মাছ দেখেছিলেন, মাছ, মাছের বাজার-
    -কোনো মানে হয়! আগাগোড়া ঢপ। পুরো রুমনি স্পেশাল -


    -কী থীম হবে মনে হয়?
    -ভাবি নি।
    -ভাবো নি?
    -বলতাম না তাহলে? তুমি ভেবেছ না কি?
    - সময়ই পাই নি। ভাববে এখন? মানে গেস করবে? সময়টাও কাটবে-
    - গেস করার তো কোনো সীমা নেই। যা খুশি হতে পারে ।একটা তো কিছু বেসিস লাগে।
    -অত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। একটা খেলার মত । এই দু ঘন্টার বোরিং জার্নি- গেসিং গেম খেললে তাড়াতাড়ি কেটে যাবে- খেলবে?
    -খেলার নিয়ম কানুন কী হবে? হার জিত ?
    - জেতা হারা কিছু নেই। ধরো তুমি একটা থীম গেস করলে, বললে; আমি গেস করব সেই থীমে কী বিক্রি হবে হাটে। তারপর আমি গেস করব থীম, তুমি বলবে, সেই হাটে কী এক্সপেক্ট করো তুমি। তারপর ধরো, আল্টিমেটলি, স্পটে গিয়ে আমরা যদি দেখি কারোর ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড গেস মিলে গেছে- তখন...
    -সেই জিতবে।
    -আবার হারজিত! আচ্ছা বেশ তাই হবে। 
    ট্রেনের জানলার বাইরে শীতের রোদ তেজী হচ্ছিল, হাল্কা কুয়াশা কেটে গিয়ে হলুদ কিম্বা গোলাপি বাড়ি, কমলা রোদ, সবজেটে পুকুরে আকাশের রিফ্লেকশন; স্টেশনে যাত্রীর ওঠানামা- ভীড় নেই তেমন। গান শুনিয়ে পয়সা চাইল অন্ধ মানুষ, কামরায় ঝালমুড়িওলা ঘুরে গেল দুবার, পঞ্জিকা বিক্রি হল একটা। 
    তাপস বলল, "আফ্রিকা।"
    -থীম হবে আফ্রিকা! কী রে বাবা!!
    -বললাম তো ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড গেস।  কী বিক্রি হবে বলো?
    -বই বিক্রি হবে-চাঁদের পাহাড়,  আউট অফ আফ্রিকা, তারপর ধরো, চিনুয়া আচেবে, নাডিয়ান গর্ডিমার, কোয়েটজীর বই; রানিং দ্য রিফ্ট, তারপর নইপালের কী একটা বই আছে না?
    - তুমি তো বইমেলার থীম প্যাভিলিয়ন বানিয়ে দিলে। বইয়ের বাইরে কিছু বলো-
    -জীবজন্তুর স্ট্যাচু, মাস্ক, বাওবাবের চারা... আফ্রিকান খাবারের স্টল তো থাকবেই- নাম টাম তো জানি না-
    -বাওবাবের চারা টা হেব্বি দিলে- এর বাইরে আর কিছু?
    - একটা সাফারি হবে।
    -হাটের মধ্যে?
    -কী জানি।  এবার আমার পালা।
    -বেশ বলো।
    -বুদ্ধ। মানে বুদ্ধদেব।
    -খুব সোজা। ওং মণিপদ্মে হুম লেখা জপযন্ত্র, বুদ্ধের মূর্তি, জাতকের গল্প,  তোমার বাওবাবের চারার মত বোধিবৃক্ষের চারা, খাওয়া দাওয়ার মধ্যে সুজাতার ইস্পেশাল পায়েস-
    -কিছু একটা মিস করছি -
    -কী? 
    -কেন জ্যোৎস্না? গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না?
    - সে কী আর শিশি করে বিক্রি হবে?  আরো কী যেন বলছিলাম, হ্যাঁ একটা ছোটো মেডিটেশন সেশন-
    -হাটে ওসব হবে? 
    -বা, সাফারি হতে পারে আর মেডিটেশন হবে  না?  আমি বলি এবার?
    -বলো-
    - আ বিগ জিরো। শূন্য।  গিয়ে দেখব কিস্যুটি নেই। নো থীম, নো হাট, নো দোকান।  ধূ ধূ মাঠ।
    - তাই নিয়ে ফিরব-
    -কী নিয়ে ফিরব?
    -শূন্যতা-
    "সে তো.."মুখ নামিয়ে ঝোলা হাতড়ালো তাপস। জলের বোতল বের করে আলগোছে জল ঢাললো গলায়। "তোমার টার্ন" বলে ঘড়ি দেখল।
    স্বাতী বলল, " শিশু"। অমনি ঝপ করে স্তব্ধতা নামল কামরায়। তাপস জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। 


    মধ্যাহ্নের রোদ ওদের কাঁধে আলোয়ানের মত জড়ো করা ছিল। স্টেশনে নেমে হাটের কথা বলতেই রিকশা পেয়ে যায় ; অল্পবয়সী ছেলে, শিস দিতে দিতে প্যাডল করল সারাপথ,  বড় রাস্তায় উঠে  কালভার্ট পেরোলো তারপর পেল্লায় মাঠের সামনে  কপাল মুছে বলল- "এসে গেছি। গাড়ি আর যাবে না। এখান থেকে হাঁটতে হবে আপনাদের। এই মাঠ পেরোলেই হাট পড়বে বাঁ হাতে।"
    হাটের চালা দেখা যাচ্ছিল দূর থেকে। স্থানীয় মানুষজনকে মাঠ পেরিয়ে সেদিকেই হাঁটতে দেখছিল ওরা। 
    -ফেরার পথে রিক্শা পাব?
    -বলা মুশকিল। বাস পাবেন এখান থেকে- স্টেশন নিয়ে যাবে; কলকাতায় ফিরবেন তো?
    -বাস? এখানে দাঁড়াবে? বাস স্টপ কোথায়?
    -হাত দেখালেই দাঁড়িয়ে যাবে। 
    -তুমি আসবে ভাই? এই ধরো ঘন্টা দুই পরে? 
    -আমার মোবাইল নম্বরটা রেখে দিন। আপনাদের হয়ে গেলে, ফোন করবেন একটা।
    - আজ হাটের বিষয় কী? জানো তুমি?
    - ঐখানে গেলেই দেখবেন,  লেখা আছে।  

    কালো বোর্ডে সাদা খড়ি দিয়ে লেখা - "সময়", তলায় নীল রঙে দু'মুখো তীরচিহ্ন।  মুখ চাওয়াচায়ি করল ওরা।
    - অ্যারোর ডিরেকশন ঠিক বুঝলাম না । কী অর্থ? দুদিকে ই দোকান আছে-সেটা তো অবভিয়াস। এনি ওয়ে, আগে, বাঁদিকে যাব না ডানদিকে? 
    -একদিকে শুরু করি
    -কী পাওয়া যাবে,  এনি গেস?
    -ঘড়ি টড়ি? কী জানি কি-
     স্বাতী হৈ হৈ করে বলল - ওমা ঐ দেখো কত খেলনা। 
    -কই?
    -সামনের দোকানটায়, দেখছ না? আরে ঐ তো- তালপাতার সেপাই, বাঁশি, ট্যামটেমি, ওমা কী সুন্দর চোখ বোজা পুতুল, আমার ঠিক এরকম একটা ছিল-আরে, এই দেখো দেখো, কত কমিক্স -  এই তো অরণ্যদেব, ম্যানড্রেক, বাহাদুর- 
    - কোথায় দেখছ এসব? রুমনির রোগে ধরল?
    -মানে? তুমি দেখতে পাচ্ছ না? 
    -না। কোথায় খেলনা? দ্যাখো স্বাতী,  কত বড় হাঁস। 
    -হাঁস! সে আবার কোথায়? 
    - ঐ তো, রাজহাঁস, আরে, সত্যিকারের নয়, বরফের। দেখতে পাচ্ছ না? ঐ যে - আমার আঙুল বরাবর তাকাও- বিরাট রাজহাঁস- বরফ দিয়ে তৈরি, কেমন গলে গলে পড়ছে- পাশে আর একটা সিমিলার হাঁস তৈরি করছে কারিগর- আরে ঐ তো- আঙুল বরাবর তাকাতে বলছি না?
    স্বাতী অবাক হয়ে তাপসের দিকে তাকালো। চশমার নিচে ওর চোখের মণির ধীর নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছিল সে।
    -কী বলছ কী তুমি?
    -কালই ডক্টর ব্যানার্জির অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবে- সম্ভবত ক্যাটারক্ট ডেভেলপ করছে তোমার- আরে, ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?
    -বাহাদুর কিনে আনি-
    -দাঁড়াও আমি হাঁসের ছবি তুলে আনছি মোবাইলে -
    " হ্যাঁ, তারপর বোঝা যাবে কার চোখ খারাপ হয়েছে" ; হাসতে হাসতে  এগোলো স্বাতী। তাপস অন্যদিকে।
    অরণ্যদেব ঘাঁটল স্বাতী, তারপর শিকারগড়ের নেকড়ে , অথৈ জলের গুপ্তধন আর সাদা ভূতের আড্ডা হাতে নিল; নরম লালচে পাতা- সন্তর্পণে ওল্টাতে হয়।  বাহাদুর সবে বেলাকে 'সুন্দরী ঠগিনী' বলেছে, আর বেলা বাহাদুরের হাত মুচড়ে দিচ্ছে, সেই সময় তাপসের  গলা কানে এল -ওর নাম ধরে ডাকছে। ঘাড় ঘোরাতেই তাপসকে দেখতে পেল- এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর ডাকছে।স্বাতী কাছে যেতে,  ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল,  তারপর  স্বাতীর হাত ধরে টানল - " এ কোথায় এলাম স্বাতী?"  গলা কাঁপছিল তাপসের। 
     - কেন? কী হল? 
    - এ তো শ্মশান। ওপাশে নদী। ধূপ বিক্রি হচ্ছে, ফুল, সাদা কাপড়, কাঠ। কোথায় এলাম? এ তো হাট নয়। এখানে কী কিনব আমরা ?
    স্বাতী অবাক হয়ে আবার সামনে দেখল। দেখল, পাশাপাশি ঝলমলে সব চালাঘর- খেলনা বিক্রি হচ্ছে ঢেলে- লাট্টু, ঘুড়ি, ভেঁপু, পুতুল, খেলনা গাড়ি, ব্যাটবল। পাশের চালায় ঝুড়িভর্তি গোলাপী মঠ, পাঁপড়ভাজা...
    -কী হল তোমার? শরীর খারাপ লাগছে? জল খাবে ?  বরফ-হাঁসের ছবি কই?
    -রিক্শাকে ফোন করে ডেকে নাও। আর এখানে থাকব না। এক মুহূর্তও নয়।
    তাপস সামান্য টলছিল। কপালে ঘাম। স্বাতী ওকে ধরে নিল- " চলো, একটু বসবে। খাওয়াও হয় নি কতক্ষণ।"
    " এখানে বসে খাওয়ার কোনো জায়গা আছে, দাদা? কোল্ড  ড্রিংকস পাওয়া যাবে?" স্বাতী খেলনাওলাকে জিগ্যেস করেছিল। 
    -ঐ তো । 

    ছাউনি দেওয়া কূয়ো ঘিরে কতিপয় বসবার জায়গা,ওপরে চাঁদোয়া। কপিকল ঘুরিয়ে জল তুলে আনছিল বুড়ো মানুষ।
    "কী ঠান্ডা জল", চোখে মুখে জল ছেটালো তাপস, ঘাড়ে, কানের পিছনে ভিজে হাত বুলোলো, " আঃ কী আরাম!
    -ভালো লাগছে?  দোকানবাজার দেখতে পাচ্ছ এখন?
    তাপস উত্তর দিল না।  
    স্বাতী বুড়োমানুষের দিকে এগোলো, ইতস্তত করল, তারপর বলল, " আর এক ঘটি জল তুলে দিন বাবা"। কপিকল ঘুরছিল,  স্বাতী তার পাশে  গিয়ে দাঁড়ালো, ভাবল জিজ্ঞাসা করে, কী দেখছে বুড়োমানুষ। কূয়োর জলে  চোখ  নিবদ্ধ ছিল বুড়োমানুষের। স্বাতীও জল  দেখছিল। প্রশ্ন করতে দ্বিধা করল সে - বুড়োমানুষও যদি জল-ঝরা বরফের হাঁসের গল্প করে! হাত নেড়ে তাপসকে ডাকল- " কী গভীর কূয়ো, তলা দেখা যায় না।, ঠাণ্ডা ছায়া এদিকটায়। কোথাও যেতে হবে না। এসো, জল দেখবে।" 
    শীতের বিকেলে অবিশ্রান্ত  পাতা ঝরছিল - ছাউনির ফাঁক গলে হলুদ পাতা প্রাচীন কূপের অভ্যন্তরে  খসে খসে পড়ছে। মাথার ওপরে ঝকঝকে আকাশ আর রোদ , দিন শেষ হতে যেন অনেক বাকি- হাতে যেন অগাধ সময়;  এই সব সময়ে ঝরা পাতার  সম্পূর্ণ গতিপথ নিরীক্ষণ করার কৌতূহল জাগে।  ইঁদারার দেওয়ালে কালচে সবুজ শ্যাওলা- ভেলভেটের মত ;  চটে যাওয়া পলেস্তারা, এবড়োখেবড়ো  ইঁট কারুকার্য ফর্ম করেছে -যাকে ব্যাকড্রপে রাখলে খসে পড়া পাতাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না; বিভ্রম ঘটে কখনও - পড়ন্ত পাতাকে স্থবির মনে হয়, পরক্ষণেই শ্যাওলাকে পাতার মত লাগে, তারপর  নিম্নগতি পাতাকে আবার ঠাহর করতে গেলে, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না,  সে' পাতা কুয়োর তলদেশ স্পর্শ করে গেছে ততক্ষণে। পাতা পড়তে থাকে,  আরও পাতা, অজস্র পাতা, তাদের গতিপথ  সম্পূর্ণ গোচরের আগেই আবার যাবতীয় বিভ্রম  পুনরায় ঘটে যেতে থাকে। হাওয়া উঠছিল আচমকা।  দুটো  শুকনো লালচে পাতা , হাওয়ার ঘূর্ণিতে  অনেকখানি ওপরে উঠে কাছাকাছি এল যেন  দুটো চড়ুই আকাশে ঠিকরে উঠে ঠোঁটে ঠোঁট  ঠেকালো।
    বিকেলের রোদে, গাছের ডালে পাখি এসে বসে, উড়ে যায়, ফিরে আসে। এক পাখি। অন্য পাখি। পাখিরা। 
    ওরা  দু'জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে  সেই সব পাতা ঝরা দেখছিল।
     
    [প্রথম প্রকাশ: দখিনা ২০২২ ]
  • গপ্পো | ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ | ৩১০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:২৪515402
  • এটা মনে হয় গল্পপাঠ এ পড়েছিলাম।
  • মত  | 165.225.8.115 | ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:০৩515405
  • বাকিটা ব্যক্তিগত 
  • ইন্দ্রাণী | ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:৩১515486
  • দ,
    আসলে, গত বছরের মাঝামাঝি কবি/ গল্পকার /ঔপন্যাসিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যয় সিডনিতে একটি সাহিত্যসভায় আমন্ত্রিত হন। সেই উপলক্ষে স্থানীয় প্রতিভাদের লেখা নিয়ে একটি পত্রিকা (দখিনা) প্রকাশ হয় -সেখানেই গল্পটি দিয়েছিলাম তারপর এডিট করে গল্পপাঠে।

    মত কে চেনা চেনা লাগিতেছে...
  • | ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:২১515489
  • আচ্ছা ইসে, এটা খানিকটা স্বগতোক্তি বলা যায়। 'ব্যাকড্রপ' শব্দটা কি অতি ব্যবহৃত বচ্ছে? পরপর অনেক জায়গায় দেখেছি বলেই কিনা কি জানি কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে যেন।  পশ্চাৎপট বা প্রেক্ষাপট ব্যবহার করলে অস্বস্তি কম লাগত কিনা ভাবছি।
  • ইন্দ্রাণী | ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:২৬515490
  • থ্যাংকু দ। এরপর থেকে সচেতন থাকতে হবে এই ব্যাপারে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন