গণতন্ত্রের মোড়কে বৈষম্যের ভারত: কেকের ওপর ক্রিমের আড়ালে অগণতন্ত্রের ইতিহাস
কলমে : শংকর হালদার শৈলবালা
রচনাকাল : ২১ জুলাই ২০২৬
ভারতবর্ষ বড় বিচিত্র দেশ। এখানে গরিব মানুষ ভোট দিয়ে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে, অথচ ধনী ও প্রভাবশালী শ্রেণি সরকার পরিচালনা করে। আর এই দুইয়ের মাঝে এমন কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ অবস্থান করে, যারা গণতন্ত্রের এমন অদ্ভুত ও সুবিধাবাদী ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, প্রাচীন গ্রিসের প্রখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে বিষের পেয়ালা বা হেমলক পান করার পরিবর্তে সরাসরি গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতেন।
আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে, যখন স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচিত হচ্ছিল, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দূরদর্শী নেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর এক গভীর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ভারতের মাটিতে গণতন্ত্র হলো কেকের ওপর ক্রিমের মতো।” অর্থাৎ, বাইরে থেকে ওপরের অংশটি অত্যন্ত নরম, মিষ্টি ও চকচকে মনে হলেও, একটু আঙুল ডোবালেই নিচে বেরিয়ে পড়ে সেই পুরনো, জমাট বাঁধা ও বৈষম্যমূলক অগণতন্ত্রের আসল রূপ। বাহ্যিক সংবিধানের মোড়ক যতই উজ্জ্বল হোক না কেন, দীর্ঘ decades ধরে সমাজের গভীরে প্রোথিত এই বৈষম্য আজ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ও নির্মম সত্য।
সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকালে ড. আম্বেদকরের সেই কেকের ওপর ক্রিমের তত্ত্বের এক নিখুঁত ও নির্মম বাস্তব রূপ দেখতে পাওয়া যায়। বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে কাগজ-কলমে সবকিছুই একদম নিখুঁত মনে হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সাধারণ মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে, এবং টেলিভিশনের রঙিন ক্যামেরায় গোটা প্রক্রিয়ার এক সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান বা মার্জিন দেখানো হয়েছে তিরিশ লক্ষ ভোট। কিন্তু এই সংখ্যার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ঙ্কর ও অমানবিক পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলেই গণতন্ত্রের আসল কঙ্কালটি বেরিয়ে পড়ে—যেখানে প্রায় একানব্বই লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাতিল বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে।
এই বিশাল সংখ্যক বাদপড়া মানুষের ভাগ্যে যা ঘটেছে, তা আধুনিক যুগের নাগরিক অধিকারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের পকেটে সরকারের দেওয়া বৈধ পাসপোর্ট রয়েছে, যা দিয়ে তাঁরা অনায়াসে পৃথিবীর যেকোনো দেশে ভ্রমণ করতে পারেন, ভিনদেশের আকাশসীমা পার হতে পারেন; অথচ পরম irony হলো, তাঁরা তাঁদের নিজ জন্মভূমিতে, নিজেদের বুথে দাঁড়িয়ে একটি ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁদের কাছে আইনসম্মত বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক মারপ্যাচে তাঁরা নাগরিকের তালিকা থেকে উহ্য হয়ে গেছেন। বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র মিললেও, নিজের দেশের মাটিতে নিজের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার মৌলিক অধিকারটুকু আজ তাদের কাছে এক দুর্লভ বিলাসিতা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার বলা হয়, তা আজ এক সুনিপুণ কৌশলে বুমেরাং হয়ে সাধারণ মানুষের মুখের ওপর এসে পড়েছে। ভোটের বাক্স বা ইভিএমের বোতাম টিপতে পারলেই যদি গণতন্ত্র সুরক্ষিত বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে ভোটারের এই বিশাল অংশকে ভোটাধিকার থেকে নির্বাসনে পাঠানোর ব্যাখ্যা রাষ্ট্র কী দেবে? আজ আমাদের এই প্রহসনমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেবল নথিপত্র আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে বন্দি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি আজকের এই ডিজিটাল যুগের বাকসর্বস্ব ও কাগজসর্বস্ব গণতন্ত্রের এই নতুন রূপ সচক্ষে দেখতে পেতেন, তবে তিনি হয়তো তাঁর চেনা সুরের গণ্ডী পেরিয়ে গভীর অভিমানে নতুন করে লিখে ফেলতেন—
*“আমার ভোটের অধিকার আমার দপ্তরে হারায়।”*
স্বাধীনতার সাত দশক পর দাঁড়িয়ে আজকের এই নাগরিক বঞ্চনা কেবল একটি নির্বাচন কমিশনের ত্রুটি নয়, এটি হলো সাধারণ মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক সত্তাকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অস্বীকার করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।
আজকের দিনে বন্দুকের নল কিংবা পেশিশক্তির মহড়া দিয়ে সরাসরি গণতন্ত্রকে হত্যা করার দিন বুঝি ফুরিয়ে এসেছে; এখন গণতন্ত্রকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, শিক্ষিত ও মার্জিত কায়দায় খুন করা হয় কম্পিউটারের কীবোর্ডে নিখুঁত ডাটা এন্ট্রি (Data Entry) দিয়ে। কলমের এক খোঁচায় বা মাউসের এক ক্লিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিক পরিচয় ও ভোটাধিকার মুছে দেওয়ার চেয়ে বড় স্বৈরতন্ত্র আর কী হতে পারে?
আমরা বুক ফুলিয়ে ভারতকে বিশ্বের “সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র” বলে অভিহিত করি এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে করতালির ঝড় তুলি। নানা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও বহুভাষিক এই বিশাল দেশকে ঐক্যবদ্ধ রেখে নিয়মিত বিরতিতে নির্বাচন আয়োজন করা নিঃসন্দেহে এক জটিল ও বড় ব্যাপার। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধুমাত্র নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেই কি তাকে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা যায়? ভোটদান প্রক্রিয়া যদি কেবল একটি লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয় এবং ভোটের বাক্স খোলার আগেই যদি পূর্বনির্ধারিত ছকে ঠিক করে দেওয়া হয় যে কোন এলাকার কোন মানুষগুলো ভোট দিতে পারবে আর কারা ভোটাধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবে, তবে সেই নির্বাচনী ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের বিন্দুবিসর্গও কোথায় অবশিষ্ট থাকে?
এটি তো নির্বাচনের নামে এক ধরনের চরম প্রতারণা। পরীক্ষাকেন্দ্রে ছাত্রছাত্রীরা সারা বছর পড়াশোনা করে মেধার ভিত্তিতে পরীক্ষা দেবে—এই স্বাভাবিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যদি পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে ফলাফল তুলে দেওয়া হয়, তবে সেই মূল্যায়ন যেমন প্রহসনে পরিণত হয়, বর্তমানের এই যান্ত্রিক ও কারচুপির নির্বাচনও ঠিক তেমনি এক অনিয়মিত ও পূর্বপরিকল্পিত ছক। যেখানে নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষা করার কথা ছিল রাষ্ট্রের, সেখানে আজ আধুনিক প্রযুক্তির ডাটা এন্ট্রি আর আমলাতান্ত্রিক কৌশলের বেড়াজালে সাধারণ মানুষের ভাগ্যই সিলগালা হয়ে যাচ্ছে।
আজকের এই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে স্বৈরতন্ত্র বা ভোটাধিকার হরণের পদ্ধতিগুলোও আমূল বদলে গেছে। অতীতে যেখানে পেশিশক্তি বা বুথ দখলের মতো স্থূল উপায়গুলো ব্যবহার করা হতো, আজ তার স্থান দখল করেছে ঝকঝকে কর্পোরেট অফিস বা সরকারি দপ্তরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে করা নিখুঁত সব কারসাজি। সার্ভারে এক ফোঁটা এদিক-ওদিক করে, টেকনিক্যাল ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে কিংবা সূক্ষ্ম ডাটা এন্ট্রি ভুলের বেড়াজালে ফেলে এক নিমেষে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারছে না যে, তার নাগরিক সত্তার টুঁটি কীভাবে নিপুণভাবে টিপে ধরা হয়েছে।
এই ডিজিটাল জালিয়াতির সবচেয়ে বড় শিকার হন প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষগুলো, যাঁদের পক্ষে এই জটিল প্রযুক্তিগত মারপ্যাচ বা নথিপত্রের ভুলত্রুটি সংশোধন করা প্রায় অসম্ভব। যাঁদের কাছে দু'বেলা অন্নসংস্থান করাই প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম, তাঁরা কীভাবে লড়বেন এই অদৃশ্য আমলাতান্ত্রিক দেওয়ালের বিরুদ্ধে? রাষ্ট্র যখন পরোক্ষভাবে বেছে নেয় যে কাদের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে আর কাদের ভোটাধিকার থেকে চিরতরে মুছে ফেলা হবে, তখন সেই নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হয়ে দাঁড়ায়—যেখানে জনগণের রায় প্রতিফলিত হয় না, বরং ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করার এক সুনিপুণ নীল নকশা বাস্তবায়িত হয়। যে দেশের সংবিধানে সাধারণ মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে, সে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এমন নির্বিচারে ভোটাধিকার হরণের এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলকেই আজ এক গভীর প্রশ্নাঙ্ক চিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।