এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • দ্য  স্পাই  হু লাভস  মি 

    ইন্দ্রাণী লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ | ৬৫৫ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৩ জন)
  • মধ্যদিনে যশোর রোড ঝ্লসে যাচ্ছিল- যেন আধপোড়া ময়াল,  খোলস থেকে ধোঁয়া উঠছে। পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, আর্তনাদ আর যতেক ছটফটানি চাপা পড়ে যাচ্ছিল ব্যস্ত ট্রাফিকে। দুপুরের রোদের স্বাভাবিক প্রতিসরণ ঘটছিল। ফলে পোড়া অ্যাসফল্টও ভেজা ঠেকছিল শহরের  চোখে। প্রাচীন সরণিকে নিজের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারছিলাম।  এয়ারপোর্টের কাছে একটা গাছতলায় অপেক্ষা করছি - কার্গোতে স্পাইয়ের বডি আসবে, খবর ছিল ;  গত রাতে  আমার কাছে ফোন এসেছিল- স্পাই নেই, আমি যেন এয়ারপোর্টে আসি ।  কে ফোন করেছিল, কোথা থেকে করেছিল জানি না- জানার চেষ্টাও করি নি- কারণ সেরকমই কথা ছিল। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও স্টাইলে স্পাই বলত, এই সব মানডেন ব্যাপারে  যত মাথা ঘামাবে, তোমার লেখায় মেদ জমবে তত। কে কী করে, কোথায় থাকে -জেনে কী লাভ। লেখায় মন দাও। সবটুকু। তোমার নিজস্ব একটা শহর হোক, নদী হোক। 

    আমার কোনো নদী ছিল না, শহরও নয়। অথচ লেখক হতে গেলে নিজস্ব নদী ও শহর থাকা  জরুরী। এসব কথা আমাকে সে বলেছিল। স্পাই। গুপ্তচর শব্দটা সে পছন্দ করত না, বড্ড ভারি আর আড়ম্বরপূর্ণ- কত বেশি বলা আছে;  বলত,  “স্পাই কত হালকা শব্দ- ভাওয়েল অবধি নেই- চড়াইপাখির মতো -ফুরুৎ করে এই ডালে বসল , তো ও বাড়ির কার্ণিশে কী টিভির অ্যান্টেনায়, তুমি খেয়ালও করছ না, অথচ চড়ুই সব দেখে নিচ্ছে - তোমার ঘর দোর, তোমার ডে টু ডে রুটিন।  দেখো,  কোন শব্দটা ভারি, কোনটা হাল্কা, কোনটা সুগন্ধি, কোন শব্দে দীপ্তি, কোনটায় মালিন্য- এসব তোমাকে চিনতে হবে। স্পাইরা যেমন চট করে চিনে নিতে পারে কে শত্রু কে মিত্র। জেমস বন্ড দেখো নি? “

    আশপাশের ঢ্যাঙা ঘরদোর ছাড়িয়ে সূর্য  একদম স্ট্রেট লাইনে আকাশে এখন।  স্পাইয়ের বডি নিয়ে আমার কী করা উচিত ভাবছিলাম- খুব যে কান্না পাচ্ছিল তা নয়। ঘটনাটা প্রত্যাশিত কারণ, সবাই জানে  স্পাইরা একদিন কোনো অজানা দেশে আচমকা মরে যায়। নো টাইম টু ডাই বলেও জেমস বণ্ড মারা গিয়েছিল সী অফ জাপান না কোথায়। অ্যাকচুয়ালি, আমি স্পাইয়ের ডেডবডি দেখতে চাইছিলাম; এই রকম একটা ডেথ হয়তো একজন স্পাইয়ের আইডেনটিটি কনফার্ম করে।  আমি ঘড়ি দেখলাম। একটা পাখি উড়ে গেল খুব কাছ দিয়ে, তার ডানায় হাওয়া কাটার আওয়াজ । ফ্লাইট নামতে দেরি এখনও।

    আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে প্লেন দেখতাম;  নামা ওঠা বোঝা যেত বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। মুখ মাটির দিকে, ডানা কাত হচ্ছে ক্রমশ-  এ প্লেন নামবে এখন। নাক উঁচু  করে উড়ে গেল মানে টেক অফ করেছে সদ্য।  পুরোনো কম্পাসে দিক চিনে নিতাম। ছুটির দিনে উড়োজাহাজের এই সব নামা ওঠার হিসেব রাখতাম আমি। একটা প্যাটার্ন তৈরি হত-  সকালে কুড়িটা প্লেন উত্তর দিকে গেছে, সতেরোটা পশ্চিমে,  পনেরোটা দক্ষিণের দিকে, সন্ধ্যের মুখে উত্তর থেকে হয়তো পনেরোটা  ফিরল , স্রেফ দশটা পশ্চিম থেকে- এইরকম আর কী। অন্ধকার হয়ে গেলে শব্দ শুনে সংখ্যার আন্দাজ পেতাম, যদিও  টিভির আওয়াজ, প্রেশার কুকারের সিটি, কুকুরের ডাক, রিক্শার হর্নের দাপটে ঘরে বসে  দিকের হদিশ পাওয়া টাফ ছিল;  একটা অসমাপ্ত  নকশা তৈরি হত ফলত  বদলেও যেত প্রতিদিন- এই সব হিসেব না মেলা সংখ্যাদের জ্যান্ত দেখাতো- আলাদা রং, আলাদা শেপ- যেন একটা বোর্ড গেমের ঘুঁটি সব- খেলার নিয়ম তৈরি হওয়ার অপেক্ষা করছে; মনে হত, আমাকেই এই গেমের রুল ঠিক করতে হবে- তার আগে নকশাটা চিনে নেওয়া খুব জরুরী । নকশা বা একটা গল্প -স্পাই বলেছিল।

    সেদিন আকাশে ঘন মেঘ- প্রবল বৃষ্টির পূর্বাভাষ; অঙ্ক কষতে কষতে প্লেনের আওয়াজ পেয়েই জানলায়। নিচে স্পাই দাঁড়িয়েছিল-  সে তখন আমার কাছে জাস্ট একজন লোক। বলেছিল- "বেলুচিস্তান থেকে আসছি।" তারপরেই হেসে বলল- "জোকিং, জাস্ট জোকিং। পুলিশ ডেকো না যেন। আমি তোমার বাবার ছাত্র। ভিতরে আসতে পারি?"
    বাড়িতে বাবা আর মা র ছাত্র ছাত্রী প্রায়ই আসত- নতুন পুরোনো। আমি বললাম, "আসুন, বাবাকে কী নাম বলব?" সে বলল- "খোকন, বলো খোকন এসেছে।" বাবা খাতাপত্র থেকে মুখ তুলে ভুরু কুঁচকেছিল," খোকন? মনে পড়ছে না কিছু। বসিয়েছিস?  যাচ্ছি দাঁড়া।" বাবাকে প্রণাম করেছিল স্পাই, কোন বছর পাশ করেছে, ঐ সময়ের গোল্ড মেডেল পাওয়া ছাত্র ছাত্রীদের নাম বলেছিল। 
    - তোমার ভালো নাম কী?
    -খোকন, স্যার।
    - ও
    - আমি তেমন চোখে পড়ার মতো কিছু ছিলাম না স্যার, তাই হয়তো ...
    বাবাকে বিব্রত দেখাচ্ছিল, বলছিল, ছাত্র তো বটেই নিশ্চয়ই তুমি আমার ছাত্র। বোসো। চা খাও। এখন কী করছ?
    - প্রাইভেট অরগানাইজেশনে আছি। আই টি তে।
    এই সময় বাবার ফোন এল। আর চা খেতে খেতে আমার সঙ্গে কথা শুরু করল স্পাই - "কী করছ? অঙ্ক? বাবার মতো হতে চাও? না মা র মতো? "
    লোকটাকে খুব আপন লাগল আমার। ঐ বয়সে সব বাচ্চাই যেমন নিজেদের ড্রয়িং খাতা, খেলনা অতিথিকে দেখাতে থাকে, তার পাশে দাঁড়িয়ে অচেনা মানুষের গায়ের গন্ধ নেয়,  তার জামা কাপড় , পায়ের গোড়ালি খুঁটিয়ে দেখে- আমিও  তেমন প্লেনের হিসেব সম্বলিত খাতা  খুব আগ্রহের সঙ্গে স্পাইকে দেখালাম। স্পাই কিছুক্ষণ খাতার হিসেব দেখল , তারপর ডাক্তার  যেমন রোগী দেখে ঠিক তেমন চেয়ে রইল আমার চোখের দিকে। এই সময় রাস্তা দিয়ে হর্ন বাজিয়ে একটা রিক্সা গিয়েছিল। স্পাই বলল, " কী বলল, বলতো?"
    -প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক
    -পথিক তুমি পথ ছেড়ে দাও প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁকর প্যাঁকর-
    -ভ্যাট, এই সব আবার কখন বলল?
    - বলেছে, তুমি শুনতে পাও নি-
    আমার ভয় করে উঠল-" তুমি শুনতে পেলে আর আমি পেলাম না? আমার কি অসুখ করেছে?”
    -শুনতে চাইতে হয়- মন দিয়ে শুনতে চাইতে হয়- তোমার অর্ধেক মন এখন এই খাতায়, কোয়ার্টার অংশে আমার নাম, বাকিটা ভাবছে, এই লোকটা চলে  গেলেই  বাবাকে জিজ্ঞেস করব-হ্যাঁ বাবা, তোমার ছাত্র? সত্যি?  তাই তো? তাই না?
    ততদিনে অন্তর্যামী শব্দটা স্কুলে শিখে ফেলেছি। অ ন ত র অক্ষরগুলো উইপোকাদের মতো উড়তে লাগল মাথার মধ্যে। মুখে বলেছিলাম, "- আমি শুনতে চাই”
    -জানি
    -কী করে জানলে?
    -গেস।
    তারপর,  চুপ করে আছি দেখে নিজেই বলল, "উড়োজাহাজের হিসেব দেখে। "
    বাবা ফিরে এসেছিল এই সময়।
    স্পাই যখন চলে যাচ্ছে, এ’বাড়ির নিয়মমতো , চেঁচিয়ে বললাম- "আবার এসো।" সে বলল- "আসব।"
    পরদিনই এসেছিল। দুপুরে। বলেছিল, "ছাতা ফেলে গেছি।"  না পেয়ে বলেছিল, "তবে বাসে ফেলে এসেছিলাম হয়তো।" ঐ যে বলল হয়তো- আমার কেমন মায়া পড়ে গেল ওর ওপর। বাবা না বলতেই  জল দিলাম, মিষ্টি দিলাম ।  পাখার রেগুলেটর বাড়িয়ে দিলাম আরো দু পয়েন্ট। সে মাথা চুলকে বলল,    " লিখছ না?"
    -কী লিখব?
    -উড়োজাহাজের গল্প?

    এর প্রায় বছর পনেরো পরে সত্যি  সত্যি এরোপ্লেনের  গল্প লিখে ফেলেছিলাম- আমার দশ নম্বর গল্প।  একটা পত্রিকায় ছাপা হল, প্রশংসাও শুনলাম এদিক ওদিক। সে রাতে ফোন এলো একটা- ল্যান্ডলাইনে। আমি-ই ধরেছিলাম। লাইনে ডিস্টার্ব্যান্স - শোঁশো শোঁশো ঝড়ের আওয়াজ  , বাজ পড়েছিল দু’বার।
    - গল্পটা লিখতে এতদিন লাগল?
    - আপনি কে বলছেন?
    -গেস
    একটা শব্দে ফিরে এল সেই দুপুর, বাবা, আর খোকন নামের একজন লোক যাকে কেউ প্লেস করতে পারে না।
    - আপনি খোকন বাবু?
    বাজের শব্দের মধ্যে দিয়ে একটা হাল্কা হাসি ভেসে এসেছিল- " আমার আসল নাম খোকন নয়। নাম ধামের মতো মানডেন ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না কখনও ।  শুধু লিখে যাও।
    -বাবাকে দিই?
    -না না, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম।
    -আপনি কোথা থেকে বলছেন? ঝড় হচ্ছে ওখানে?
    -এই তো শুনতে শিখেছ। জায়গার নাম দিয়ে কী হবে? একটা জায়গা যেখানে এখন দুর্যোগ-  সেখান থেকে ফোন এসেছে তোমার কাছে- এর বাইরে সব বাড়তি-
    "আপনি আইটিতে ছিলেন তাই না? অফশোরে এখন"? স্মার্টনেস  দেখাতে চাইলাম।
    - আমি কখনও আইটি, কখনও বেকার, কখনও পুলিশ, কখনও চোর
    লোকটা কী ইয়ার্কি করছে রে বাবা! মাতাল নাকি?
    -মানে?
    -তুমিও তো তাই। কখনও প্লেন, কখনও বিড়াল, কিম্বা বাঘ, কখনও নায়ক, কখনও নায়িকা-
    -হ্যাঁ, সে তো গল্পে...
    কথার মাঝপথেই হো হো করে হাসল সে- "আমি একজন স্পাই। লিখতে গেলে তোমাকে তাই  হয়ে উঠতে  হবে।"
    কেটে দিল ফোনটা। র ট তে কাজ করে হয়তো। আর কিছু ভাবি নি।

    একটা প্রাইজ পেলাম - ছোটো গল্পে নবীন প্রতিভাদের দেয় - মোটামুটি প্রেস্টিজিয়াস। সে রাতে আবার ফোন- আমার মোবাইলে সটান। আজ লাইন পরিষ্কার। একবার শুধু  মনে হল- মালগাড়ির শান্টিংএর আওয়াজ পাচ্ছি।
    - নম্বর পেলেন কোথায়?
    -গেস
    স্পেসিফিক কিছুই গেস করতে পারলাম না - আবছা মনে হল, পাবলিশারের থেকে জোগাড় করেছে হয়তো- চুপ করে রইলাম।
    -কনগ্র্যাটস।
    "থ্যাঙ্কু" বলে মনে হল, লোকটা এত খবর রাখে! র আমাকে ওয়াচ করছে নাকি রে বাবা!
    - প্রাইজ পেয়ে খুশি?
    - হ্যাঁ মানে তা তো একটু বটেই-
    - মোটামুটি ভালই  লিখছ, তবে তোমার গল্পের বড়ো খামতি কী জানো? 
    - কী?
    -সেভাবে প্রেম থাকে না-
    - থাকে তো- এই তো ...ঐ যে ….
    - বড্ড সাজানো। ফ্ল্যাট। অক্ষরই শুধু। বই থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামে না, হাঁটাহাঁটি করে না- জ্যান্ত নয়।  তুমি প্রেম করো না? করো নি কোনদিন? ব্রেক আপ হয় নি?
    আমি চুপ করে রইলাম। মাঝরাতে অচেনা লোকের সঙ্গে ব্যক্তিগত কথা বলার অর্থ হয় না- লাইন কেটে দেব না কী ভাবছি-
    -তোমার গল্পে চুমু আছে, সেক্স আছে,  সেই সময়ের অনুভূতি নিয়ে চমৎকার সব বাক্য পর পর-  কিন্তু পাঠক  কিচ্ছু ফীল করে না-
    আমার বিরক্ত লাগছিল।
    -খারাপ লাগছে শুনতে?  কিন্তু এটা ফ্যাক্ট। চুমুর শব্দ নেই,  জিভে স্বাদ পাওয়া নেই,  শীৎকারে তীব্রতা নেই, ঘাম, সিক্ততা টের পাওয়া যায় না- লাইফলেস। মোমেন্টগুলো ধরতেই পারো নি।  তুমি কোনোদিন কাউকে ভালোবাসি বলো নি।
    একটা স্টেটমেন্টের মতো শোনালো - ভোঁতা হাতুড়ি দিয়ে হৃদপিণ্ডে যেন ঘা দিল কেউ।
    -প্রেম করবে আমার সঙ্গে?
    -হোয়াট?
    শান্টিংএর আওয়াজের মধ্যে দিয়ে  যেন শুনলাম- "আই লাভ ইউ।"
    ফোন রেখে দিল স্পাই। কিম্বা কেটে গিয়েছিল লাইন ।

    বেশ ক' মাস লিখি নি। নিজের গল্পগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়লাম। প্রেমের জায়গাগুলো সত্যি সাজানো লাগছিল।  বন্ধুদের জনে জনে জিজ্ঞেস করলাম;  ওরা বলছিল- প্রাইজ পেয়ে ন্যাকামি বেড়েছে আমার। নিজেই কাটাকুটি শুরু করলাম পুরোনো গল্পে।
    একবার ভাবলাম, যে নম্বর থেকে ফোন করেছিল স্পাই, সেই নম্বরে ফোন করি; দ্বিধা হল, একটু ভয়ও- 'আই লাভ ইয়ু' কেন বলেছিল ? ড্রিঙ্ক করেছিল খুব? না কী জাস্ট ভড়কালো আমাকে?
    প্রেম ট্রেম এড়িয়ে কায়দা করে দুটো গল্প লিখলাম- কিঞ্চিৎ সাররিয়াল। একজন খ্যাতনামা লেখক  প্রশংসা করেছেন খুব- লোকমুখে শুনতে পেলাম।  সে রাতে আবার ফোন এলো- অন্য নম্বর। আজ একটা বিড়াল ডাকছে কনস্ট্যান্ট।
    - এড়িয়ে যাচ্ছ?
    -কী?
    -প্রেমে ভয় বুঝি তোমার?
    আমি চুপ।
    -ভালোবাসি তোমাকে। ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি।
    প্রথমে মিউ মিউ মিউ মিউ শুনলাম, তারপর অক্ষরগুলো পরপর- কেটে কেটে; আচমকাই যেন জড়িয়ে গেল শব্দগুলো- প্রথমে অবয়বহীন পিণ্ড, তারপর একটা মুখ, বাঘের গায়ের গন্ধ।  শিরশির করছিল শরীর। জল খেলাম।
    -জল খাচ্ছো? হুঁ?  জল লেগে আছে তোমার ঠোঁটে। এই মুছো না মুছো না। চুমু খাবো।
    দীর্ঘ চুম্বনের আওয়াজ হল লাইনের ওপারে।
    -তোমার কণ্ঠ নালী বেয়ে জল নামছে এখন , চুমু খাচ্ছি।  তোমার শরীরের মধ্যে দিয়ে জল বইছে নদীর -গলা পেরিয়ে বুকে, পেটে- আমাকে ঠোঁট ছোঁয়াতে দাও-
     আমার খুলি ফুটো করে যেন আঙুল ঢুকিয়েছে কেউ- রক্ত বেরোচ্ছে অথচ খুব আরাম হচ্ছে - আরো আরো আরো। শরীর মোচড়াচ্ছিলাম -  অসতর্ক মুহূর্তে আওয়াজ বেরিয়ে গেল মুখ থেকে- ডিমের খোলা ফেটে পাখির ছানা বেরোনোর আওয়াজের মত মৃদু,  স্টীলের পাতে ছুরি ঘষার মত একই সঙ্গে তীক্ষ্ণ আর অস্বস্তিকর,  তারপর রক্তাক্ত ক্ষত চেপে আর্তনাদের মতো তীব্র আর ঘন-
    -এই শব্দগুলো লিখতে পারবে?
    কেটে দিলো লাইন।

    উপন্যাস বেরিয়েছিলো আমার। ফোন আসবে - জানতাম। আজ ব্যাকগ্রাউন্ডে পাখি -  সকালের ডাক, যেন ভোর হচ্ছে।
    - জীবন তো অনেক হল -প্রেম ভালোবাসা বিরহ, এবার মৃত্যু লেখো, এখন থেকে শুরু না করলে কব্জা করতে পারবে না আল্টিমেটলি-
    -লিখেছি তো, এই উপন্যাসেও মৃত্যু আছে নানাভাবে-
    -লিখেছ।  কোথায় মৃত্যুর পায়ের আওয়াজ শুনতে চাইছ? তাকে দেখতে চাইছ? তাকে শুনতে চাইছ? জীবনমশায়ের মতো আকুতি কোথায়?
    - চেষ্টা তো করছি।
    - সেই লেখা আমি দেখে যেতে পারব?
    আমার বুক কেঁপে উঠল।
    -কেন এমন বলছ স্পাই? কী হয়েছে?
    - ওয়ারজোনে আছি। কখন কী হয়-
    - ওয়ারজোন? কোথায় গেছ? ইউক্রেন?
    -কত রণক্ষেত্র পৃথিবী জুড়ে -সব কিছু খবরের কাগজে পাবে?  নিজেকেই খুঁজে পেতে হবে তো- হাই টাইম নাউ। 
    - আমি তো পাখির ডাক শুনছি-
    -যুদ্ধক্ষেত্রে পাখি ডাকবে না, এমন কোনো কথা আছে? কী গাইছে পাখি- সেটা শোনা আবশ্যক।
    খুব কান্না পেলো- বালিতে ঢেউ ভেঙেই যেমন তৎক্ষণাৎ জল সরে, তেমনি কান্না গিলে বললাম, "ফিরে এসো স্পাই।"
    -কোথায়? তোমার লেখায়?
    দুটো পাখি ডাকল। তারপর সব চুপ।

    কালকের রাতের ফোনে আমাকে বলা হয়েছিল -প্লেন ল্যাণ্ড করলে কার্গোর সামনে ডেকে নেওয়া হবে। স্পাইয়ের আত্মীয়্স্বজন বন্ধুবান্ধব নিশ্চয়ই থাকবেন, আমাকে একা হ্যান্ডল করতে হবে না ব্যাপারটা- এই রকম ভাবছিলাম। একটা কফিনে স্পাই জাস্ট কার্গো হয়ে আসবে- অবিশ্বাস্য লাগছিল আর সেজন্যই কান্না পাচ্ছিল না। বস্তুত দুঃখ , শোক, কান্না , শূন্যতা-  যে কোনো একটা অনুভূতির জন্য কফিনটা জরুরী -এরকম মনে হচ্ছিল।
    ডিপার্চার টার্মিনালের সামনে গাড়ির লাইন। মানুষজন দরজা খুলে নামছিল, ডিকি থেকে লাগেজ নিয়ে ঢুকে যাচ্ছিল ভিতরে, পিছন ফিরে হাত নাড়ছিল।
    আমার ফোন বেজেছিল এই সময়।
    - এসে গেছেন?  কার্গো নয়, অ্যারাইভালের চার  নম্বর গেটের সামনে আসুন।
    - আপনাকে  চিনব কী করে?
    -আমি চিনে নেব-
    অ্যারাইভালে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে মানুষজন বেরিয়ে আসছে। সবাই একরকম  - ক্লান্ত আর আনন্দিত।  আমার কাঁধে টোকা পড়েছিল- দাড়ি, গোঁফ, রুদ্রাক্ষ, গেরুয়া। আর সানগ্লাস।
    - আপনাকে এই বাক্সটা দেওয়ার ইন্স্ট্রাকশন আছে।
    -কিন্তু কফিন?
    -আমি আর কিছু জানি না। বাক্সটা ধরুন।  দুহাতে ধরুন।
    কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এই বাক্সে কী আছে?  লম্বাটে  ফুট দুয়েকের বাক্স- প্রথমে হাল্কা,  তারপর অবহ লাগল। একবার ভাবলাম - হয়তো চিতাভস্ম। তারপর  মনে হ'ল, স্পাই কি বন্দুক পিস্তল পাঠালো?  কী করব এখন? কাকে বলব? থানায় যাবো?
    দগ্ধ ময়ালের শরীরের ওপর গোটা শহর ততক্ষণে যানজটে পড়েছে। ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। লেখার টেবিলে বাতি জ্বেলে বাক্স খুলেছিলাম;  ঘন লালচে বাদামী কাঠের পালিশ করা বেহালা, পাশে ছড়, একটি চিরকুট - তোমাকে বাজিও।
     
     
    [প্রথম প্রকাশ :  চৌকাঠ ২০২২ ]
  • গপ্পো | ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ | ৬৫৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাঠ প্রতিক্রিয়া ​​​​​​​ | 2600:1002:b033:43d:b015:20fd:337:d78 | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:৪৭516160
  • হুঁ 
     
  • তৃণা | 73.45.132.229 | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:৪৮516161
  • শুধু স্পাই নন, এই গল্প পড়ে পাঠক মাত্রই হয়তো বলতে চাইবেন-- অন্তত আমি তো বলবোই-- লাভ ইউ দিদি! অনবদ্য লেখা। 'চার রঙের উপপাদ্য' উপন্যাস পাঠের আনন্দ বয়ে বেড়াচ্ছি। এ গল্প সে মাত্রায় রং ছড়ালো।
  • সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য। | 43.251.179.219 | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০০:৫৯516162
  • শিরোণাম জেমস বন্ডের সিনেমার নামে হলেও বন্ডীয় থ্রিলার নয়। তবে থ্রিলারের থ্রিল আছে নিজের লেখার আত্মসমালোচনা- স্মৃতিচারণায় মধ্যে, ফেলিনির "এইট অ্যান্ড হাফ"- এর মতো। তবে জীবনের একান্ত কিছু অনুভূতির দুয়ার হাট করে খুলে দিলে সেটা শিল্প না হয়ে, হয়ে ওঠে আর একটা "পরমা"। 
      শেষদিকে যথার্থ এক জননেতার অন্তর্ধান রহস্য! এখানেও আরও এক গুমনামী বাবা.... 
  • শক্তি দত্ত রায় | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৯:১৫516163
  • গতানুগতিকের বাইরে  বিষবস্তুতে,স্টাইলে।ভালো লগলো
  • সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য | 2409:4060:2e8e:6940::d188:5b14 | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৮:৪২516167
  • গতকাল তাড়াহুড়ো আর একটা কথা বলা আর হয়ে ওঠেনি, সেটা আজ জানাচ্ছি : বাক্স বন্দী বেহালাটি যেন 'রোম' আর 'নিরো'- র সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিল..... 
  • kk | 2601:14a:500:e780:49ad:f7c4:781d:c0ef | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২১:৩৮516168
  • আমি গল্পের মধ্যেকার শব্দদের রাস্তায় ঘুরছি। ঐসব ভারী, হাল্কা, দীপ্ত বা মলিন শব্দদের গলিপথ, রাজপথে। কখনো কখনো ছায়া ছায়া কোনো মুখ উঁকি মেরে চলে যাচ্ছে। কাউকে চেনা মনে হয়। কিম্বা মনে হওয়াটাও মনে হওয়া, তাও হতে পারে। আগের চিঠিতে কানেকশনের কথা লিখেছিলে ইন্দ্রাণীদি। সেই কানেকশনকেও ছুঁতে পারলাম। এই ঘুরে বেড়ানোর শেষ এখনই দেখতে পাচ্ছিনা। এই মাত্রার লেখায় মন্তব্য করার জন্য কিছুটা সাহস ও আত্মবিশ্বাস লাগে। সেটা আমার নেই। কিন্তু শব্দের রাস্তায় ঘুরতে আমার ভালো লাগছে। শেষ লাইনে এসে আমার নীল ডায়মন্ড মনে পড়লো -- "You're the words, I'm the tune. Play me."
  • Ranjan Roy | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৭:০১516184
  • বাজাও, আমারে বাজাও!
  • বিদিশা দাশ | 223.191.34.58 | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২১:৫৫516191
  • ভাওয়েল পর্যন্ত নেই এমনি নির্ভার তাই তার  ভস্মাধারে বেহালার ছড়। 
  • ইন্দ্রাণী | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:০৫516194
  • কী ভেবে কী লিখেছিলাম, সে কথা অবান্তর এখন।
    সমস্ত পাঠককে নমস্কার।
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন