এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • ভাগের মজা

    Sukdeb Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০৫ জুলাই ২০২৪ | ১১৫ বার পঠিত
  • ভাগের মজা

    ছোটকুকে আজ ডাকতে হয়নি, নিজে নিজেই সেই কোন সক্কালবেলা উঠে পড়েছে। আজকের দিনে বেলা করে ওঠা মানে লোকসান। স্কুল ছুটি, বাড়িতেও লেখাপড়ার কথা আজকে অন্তত কেউ বলবে না। আজ শুধু খেলা আর খেলা। যে সে খেলা নয়, রং খেলা। মজাই আলাদা। গতবারে ছোটকু একাই রং খেলেছিল এবার সাথে টুটুনদাও আছে। বাবা রং, পিচকিরি সব আগেই এনে দিয়েছিল, কাল টুটুনদা আরো কয়েক প্যাকেট রং আর তার সাথে অনেক বেলুন নিয়ে এসেছে। বেলুনে রং ভরে ছুঁড়তে ছোটকু এখনো ঠিক পারে না। টুটুনদা বলেছে শিখিয়ে দেবে। টুটুন ছোটকুর ছোট পিসির ছেলে। ছোটকুর থেকে কয়েক বছরের বড়। টুটুনদা আসাতে ছোটকুর রং খেলায় অনেক ভরসা বেড়েছে। গত বছর বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে যখন রং খেলছিল, তখন একা পেয়ে পাশের গলি থেকে কয়েকটা বাচ্চা এসে ওকে রঙে চুবিয়ে একেবারে ভূত বানিয়ে দিয়েছিল। কতদিন লেগেছে সেই রং উঠতে। এবার পাশে টুটুনদা আছে, এলে পরে বুঝবে মজা। কোনরকমে মুখ হাত ধুয়ে একটু দুধ খেয়েই ছোটকু পৌঁছে গেল উঠোনে সদর দরজার পাশে। রং গোলবার জন্যে উপযুক্ত যায়গা। টুটুনদা আগেই এসে কাজে লেগে পড়েছে। সমস্যা হল, রং খেলার জন্য মা মাত্র দুটো বালতি বরাদ্দ করেছে। এত রং, তিন চারটে জায়গায় গুলে রাখতে পারলে সুবিধে হয়। কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। এদিক ওদিক দেখে ছোটকু চুপিচুপি আর একটা বালতি আনতে বাথরুমের কাছে যেতেই ধরা পড়ে গেল।
    মা রে রে করে উঠলেন - সব কটা বালতি রঙে মাখামাখি করবি না।
    ছোটকু অনুনয় করে বলল- আর একটা দাও না মা।

    বালতির বরাদ্দ আর বাড়বে না এটা নিশ্চিত জেনে, বাবা ছাত থেকে দুটো রঙের ফাঁকা ড্রাম এনে একটা বিকল্প ব্যবস্থা করে দিলেন। হাতে বেশি সময় নেই, নটা থেকে অ্যাকশন শুরু হবে। চারটে জায়গায় চার রকমের রং গোলা হল। এরপর টুটুন চট জলদি ছোটকুকে বেলুনে রং ভরাটা হাতে কলমে শিখিয়ে দিল। নতুন জিনিস শিখে ছোটকুর তখন বেশ মাতব্বর মাতব্বর ভাব। পিচকিরিতে রং ভরে সদর দরজার বাইরে এসে ঠিক নটায় একটা গোরুর ওপর প্রথম ট্রায়াল দেওয়া হল। তারপর শুরু হল এর ওর তার গায়ে রং দেওয়া। খানিকক্ষণ এ’রকম চলার পর টুটুন ভেতরে গেল বেলুন গুলো নিয়ে আসতে। ঠিক সেই সময়েই ছোটকু দেখে গলি থেকে গতবারের সেই ছেলেমেয়েগুলো রং খেলতে খেলতে ওর দিকে ধেয়ে আসছে। গতবারের কথা মনে হতেই ছোটকু একটু ঘাবড়ে গেল। তবে ওরা কাছে আসার আগেই টুটুন সব মাল মশলা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। টুটুনকে দেখে ওদিকের বাচ্চাগুলো আর এগোল না। শুরু হল দূর থেকে মিসাইলের মত বেলুন ছোঁড়া। ওরা সংখ্যায় বেশি হলেও টুটুনের দারুণ টিপ। রং খেলা বেশ জমে উঠল। একটা বাচ্চা মেয়ে আর সাথে তার থেকে ছোট একটা ছেলে, মনে হয় ভাইবোন, রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে ওদের রং খেলা দেখছিল। মজা পেয়ে মাঝে মাঝে হাততালি দিচ্ছিল। ওদের গায়েও একটু আধটু রং ছিটকে এসে লাগছে। তাতেই ওদের কি আনন্দ। এর মধ্যে কখন যেন বাচ্চা দুটো গুটি গুটি রাস্তা পার হয়ে ওদের কাছটায় এসে দাঁড়িয়েছে। হয়ত রঙের ছোঁয়া আর একটু বেশি পাওয়ার লোভে।
    কিছু পরে মেয়েটা করুণ সুরে বলল — আমাদের একটু রং খেলতে দেবে গো!
    টুটুন জিজ্ঞেস করল - খেলবি যে তোদের কাছে রং কোথায়?
    মেয়েটা বলল—আমাদের রং কেনার পয়সা নেই।
    এদের সাথে কথা বলার সময় ওদিক থেকে একটা বড় রং ভরা বেলুন সোজা উড়ে এসে পড়ল টুটুনের মুখে। মেয়েটার জন্যে অন্যমনস্ক হয়েছিল তাই টুটুনের সব রাগ গিয়ে পড়ল ওর ওপর।
    খেঁকিয়ে বলল— তোরা যা তো এখান থেকে।
    ব্যাপারটা ছোটকুর খারাপ লাগলেও টুটুনদার মুখের ওপর কিছু বলতে পারল না।
    ছোটকুর বাবা বাইরের রকে বসে রং খেলা দেখছিলেন।
    টুটুনকে ডেকে বললেন- বাচ্চা দুটোকে সঙ্গে নিয়ে রং খেল। তোমাদের তো এত রং রয়েছে, ওরা একটু নিলে কম পড়বে না। আনন্দ ভাগ করে দেখ, তা কমবে না, আরো বাড়বে।
    রং খেলতে পেয়ে বাচ্চা দুটোর সে কি আনন্দ। মেয়েটারও হাতে বেশ টিপ আছে। প্রায় সবকটা বেলুনই নিশানায় লাগছে।। ওর ভাইটা ছুঁড়তে না পারলেও হাতে হাতে বেলুন এগিয়ে দিচ্ছে। ছোটকুরা এখন সংখ্যায় চারজন। ফলে এদিক থেকে বেলুনের আক্রমণ আরো বেড়ে গেল। এর মধ্যে একসময় সুযোগ বুঝে ওরা রে রে করে দৌড়ে গিয়ে গলির বাচ্চাগুলোকে ভূত বানিয়ে দিয়ে এল। বিপদ দেখে ওই বাচ্চাগুলো যে যার বাড়ির দিকে ছুটে পালাল। ছোটকুর আনন্দ আর ধরে না। গত বছরের অপমানের মুখের মত উত্তর দেওয়া গেছে। ছোটকুরা তখন বিজয়ী দলের খেলোয়াড়দের মত একে অপরকে ধরে নাচছে।
    খেলার শেষে বাচ্চা ছেলে মেয়ে দুটোকে ছোটকুর বাবা বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন। ছোটকুর মা ওদের নাম জিজ্ঞেস করলেন।
    মেয়েটি বলল “আমার নাম কুসুম আর ভাইয়ের হরি।”
    -- বাড়ি কোথায়?
    -- ওই রেল লাইনের ধারে যে ঝুপড়িগুলো আছে না, ঐখানে।
    তারপর ওদের পেট ভরে খাইয়ে যাওয়ার আগে আদর করে বললেন—কুসুম, মাঝে মাঝে ভাইকে নিয়ে বিকেলে ছোটকুর সাথে খেলতে এস।
    ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ভাইয়ের হাত ধরে কুসুম ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটা দিল। যেতে যেতে পিছন ফিরে সকলকে টাটা করল। তার মুখে তখন লেগে রয়েছে তৃপ্তির অনাবিল হাসি।
    ছোটকু খুব খুশি। প্রাণ ভরে রং খেলেছে। এবারে ওকে কেউ রঙে চোবাতে পারেনি, উল্টে ওরাই অন্যদের চুবিয়ে গতবারের শোধ তুলেছে, আর পেয়েছে বিকেলে খেলার দুজন সাথী। টুটুনও দোল খেলে এত আনন্দ আগে কখনো পায়নি। ভাবে, মামা ঠিকই বলেছে। অঙ্কের বইয়ের মত ভাগফল সব সময় কমে না, বাস্তবে কখনো কখনো তা বাড়েও।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ০৫ জুলাই ২০২৪ | ১১৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Mira Bijuli | ০৫ জুলাই ২০২৪ ১৪:১৮534204
  • দারুন লাগলো।
  • Sukdeb Chatterjee | ০৫ জুলাই ২০২৪ ১৫:০৪534207
  • ধন্যবাদ 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া দিন